৩১. উর্জা
৩১. উর্জা
ক্যাব বুক করে ফোনটা রাখল উর্জা। তার পর ঘরটার দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। নাঃ, কিছুই মনে হল না ওর। এই বাড়িতে ছোটবেলা কাটলেও, আজ আর বাড়িটার ওপর ওর কোনও টান নেই। এখন শুধু মনে হয়, এটা ওর বাড়ি নয়। এখানকার কিছুই ওর নয়। ও শুধু ক্ষণিকের অতিথি।
উর্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর মনে পড়ল যে-দিন বিদেশ থেকে এসে এই ঘরে ঢুকেছিল, সে দিন কী ভালই না লেগেছিল! এই ক’টা দিনে সেই সব ভাললাগা কর্পূরের মতো উবে গেল। মানুষের মন সত্যি খুব জটিল একটা জায়গা।
তবে মানুষের সঙ্গেই যখন মনের যোগাযোগ থাকে না, তখন নিষ্প্রাণ পদার্থের আর কী মূল্য! এই যে বীরেন্দ্র, তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকার অভ্যেসটা মা ছোটবেলায় করিয়েছিল বলে ও এখনও বাবা বলে ডাকে। আসলে কিন্তু মন থেকে একদম কিচ্ছু অনুভব করে না। এ অনেকটা বাসের কন্ডাক্টরকে ‘দাদা’ বা বাজারে শাক বেচতে আসা মহিলাকে ‘মাসি’ বলে ডাকার মতো। কিছু একটা নামে ডাকতে হবে বলে ডাকা।
মা যে এই লোকটাকে বিয়ে করেছিল, সেটা পুরোপুরি ব্যবসায়িক একটা ব্যবস্থা। সেটা বড় হওয়ার পর বুঝেছে ও। মায়ের একটা নিজের জগৎ আছে। সেখানে বাবা বা উর্জা হাত দেয় না। লালু বলে ছেলেটা মায়ের সঙ্গে সহকারী হিসেবে থাকে। মায়ের একটা ফ্ল্যাট আছে রাজারহাটে। সেখানে উর্জা যায়নি কোনও দিন। যাবেও না। মা মাঝে মাঝে ওখানে নাকি বন্ধুদের নিয়ে যায়। এইটুকু জানে উর্জা। আর কিছু জানে না। জানতে চায়ও না।
আসলে সেই যে ওর ছোটবেলায় মা এই বীরেন্দ্রকে বিয়ে করল, তারপর থেকেই খুব ধীরে ধীরে মায়ের থেকে সরে গিয়েছে উর্জা। এ যেন ঠিক আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে বেরিয়ে আসা ভারতীয় উপমহাদেশের ভূখণ্ড !
উর্জার মনে হয়, আমাদের এখানে বহু বহু বছর ধরে মা-বাবাকে ভগবানের মতো করে দেখার যে মিথ তৈরি হয়েছে, তার ফলে কত সন্তানকে যে সারা জীবন পিষ্ট হতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। দায়িত্বজ্ঞানহীন বাবা-মায়ের অভাব যে সমাজে নেই, সেটার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। জৈবিক তাড়নায় অনেকেই বিয়ে করে ও স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী সন্তান উৎপন্ন করে। কিন্তু তার পরেই হয় আসল সমস্যার শুরু। কারণ, অধিকাংশ বাবা মা-ই বোঝে না যে, সন্তানকে খাদ্য এবং বস্ত্র দেওয়া আর স্কুলে ভর্তি করিয়ে পীড়ন করে পড়াশোনা করানোটাই শুধু বাবা-মায়ে কাজ নয়। সন্তানের মনের কথা বোঝা এবং তাদের ইচ্ছেগুলো মানবিক ভাবে দেখাটাও বাবা-মায়েরই কাজ। আর সম্ভবত এটাই আসল কাজ। কারণ, সুস্থ আর সহজ মন না থাকলে মানুষের বিকাশ হয় না। আর মানুষের বিকাশ না হলে সামগ্রিক ভাবে সমাজের অধঃপতন হয় । কিন্তু সেটা বোঝে ক’জন! আর বোঝে না বলেই চারিদিকে এরকম ভয়ঙ্কর অবস্থা।
কলেজে পড়ার সময়ে উর্জা ওর বান্ধবীদের বাড়ি গিয়ে একটা ব্যাপার দেখেছে। দেখেছে, সেই বান্ধবীর বাবা আর মা বলছে, “আমরা খুব ওপেন মাইন্ডেড। আমরা তো মেয়েকে বলেই দিয়েছি, যাকে খুশি বিয়ে করো, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু পরে কিছু ঝামেলা হলে কিন্তু আমাদের কাছে আসতে পারবে না। তখন তোমাকে নিজেকেই সামলাতে হবে সব।”
উর্জার হাসি পেত কথাটা শুনে। এমন শর্তসাপেক্ষে উদারতা দেখে মনে হত, সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা করলে কেউ এমন কথা বলতে পারে। এ-ও তো এক ধরনের ব্ল্যাকমেলিং! ঘুরিয়ে বলা যে, আমাদের কথা শুনলে আমরা হেল্প করব। না হলে তুমি জাহান্নমে যেতে পারো। সেই আদি কাল থেকে সস্তান, বিশেষ করে মেয়েরা যেন একরকমের ব্যবসায়িক কারেন্সি। যেন ক্রীতদাসী।
জোর করাকে ভীষণ ঘৃণা করে উর্জা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটাই ক্রমাগত হয়ে চলেছে চারিদিকে। ওদের এই বাড়িও তার ব্যতিক্রম নয়। গতকাল রাতেও তো এই নিয়ে বীরেন্দ্র ঝামেলা করতে চেয়েছিল বাড়িতে।
রাতে খাওয়ার পরে সুটকেস গুছিয়ে সব কাগপজপত্র ঠিক করছিল উর্জা। তখনই কোনও রকম নক না করেই ওর ঘরে ঢুকে পড়েছিল বীরেন্দ্র। সঙ্গে মা-ও ছিল। উর্জা তো রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিল। হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল ফাইলের কাগজপত্র।
“তুই চলে যাচ্ছিস? কোথায়?” বীরেন্দ্রর গলায় রাগটা ভালই টের পেয়েছিল উর্জা।
উর্জা সত্যিটা চেপে গিয়েছিল। বলেছিল, “গুজরাত। অফিসের কাজে। কেন? কী হয়েছে?”
মা বলেছিল, “এখন যাবি! চারিদিকে করোনাভাইরাস যে ভাবে ছড়াচ্ছে। সামনে কী হবে….”
“মা, কাজকর্ম তো বন্ধ হয়নি। কোম্পানি শুনবে কেন বলো!” উর্জা বলেছিল।
বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “তোর বসের সঙ্গে কথা বলাবি আমায়। দেখি কে তোকে কলকাতার বাইরে পাঠায়! উমেশরা কী ভাববে? ওরা দেরি করতে আর রাজি নয়। এপ্রিলেই বিয়ে দিয়ে দেব। সব তৈরি আছে।”
“কী!” উর্জা না চাইতেও জোরে চিৎকার করে উঠেছিল।
“এপ্রিল। বিয়ে। উমেশ,” বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিল ওর ।
“আমি তো না করে দিয়েছিলাম,” উর্জা অবাক হয়ে গিয়েছিল, “এখনও সেখানে আটকে আছ তোমরা!”
“আটকে মানে?” বীরেন্দ্র রাগ দেখিয়েছিল, “আমি কি জানি না তুই কার সঙ্গে মেলামেশা করছিস? তোকে রাজু ফোন করেনি?”
উর্জা চুপ করে গিয়েছিল। হ্যাঁ, রাজু ফোন করেছিল ওকে। বলেছিল, কী ওদের বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে এসেছে বীরেন্দ্র।
রাজু তো রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। গলা থরথর করে ওর। বলছিল, “আমার বাড়িতে ঢুকে আমার মা-ভাইয়ের সামনে হেনস্থা করা! আমি মজা দেখিয়ে ছাড়ব বীরেন্দ্রবাবুকে। তোমার বলে কিন্তু রেয়াত করব না।”
উর্জা বুঝতে পারেনি, এরকম একটা ঘটনা ঘটে যাবে। ও অবাক হয়ে এই ভেবে যে, বীরেন্দ্র কী করে জানল ওর সঙ্গে উর্জার সম্পর্কের । রাজু ওদিকে ফোনের মধ্যে দিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছিল। ক্রমাগত নানা কথা বলে যাচ্ছিল।
উর্জা বুঝতে পারছিল রাজুর এই রাগ অসহায়তা থেকে তৈরি হচ্ছে। মনের মধ্যে এমন ফ্রাস্ট্রেশন জমে থাকলে সেটা ভাল নয়। তাই সেটা বেরিয়ে যেতে দেওয়াই ভাল। উর্জা তাই চুপচাপ শুনছিল রাজুর চিৎকার।
টানা পাঁচ মিনিট চিৎকারের পরে রাজু দম নিয়েছিল। কথা বলে বলে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল বলে কাশছিল। উর্জা মনে মনে দেখতে পাচ্ছিল রাগে লাল হয়ে যাওয়া রাজুর মুখটা। কষ্ট হচ্ছিল ওর। রাজুর অসহায়তাটা ও বোঝে। কিন্তু এমন রাগ করলে তো কিছু হবে না। মাথা ঠান্ডা রাখতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।
উর্জা বলেছিল, “আমরা তো চলেই যাচ্ছি। সবার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছি। কেউ কিছু করতে পারবে না আমাদের। শোনো, ইগো আমাদের ক্ষতিই করে। ও সব ভুলে যাও। আমরা চলে যাচ্ছি। টিকিট, ভিসা সব হয়ে গিয়েছে। পেপার্সও রেডি। তা হলে অসুবিধে কোথায়? মাথা গরম কোরো না। আমায় কিছু বললে আমি বুঝে নেব। নাউ চিল। সব কিছুর উত্তর দিতে হবে, পাল্টা দিতে হবে, এমন মোটেও নয়। আমাদের কাজই হবে আমাদের উত্তর।”
“কী রে, কথা কানে যাচ্ছে না? রাজু ফোন করেনি তোকে?” বীরেন্দ্র চিৎকার করেছিল।
উর্জা সামলে নিয়েছিল নিজেকে। আর মাত্র একটা দিন। তার পরেই ও চলে যাচ্ছে। উর্জা বলে, “করেছিল। যা বলার আমি বলেছি।”
“কী বলেছিস?” বীরেন্দ্র ফুঁসছিল। মা বীরেন্দ্রর পেছনে শঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়েছিল।
উর্জা তাকিয়েছিল বীরেন্দ্রর ঝগড়া করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকা মুখটার দিকে। ও বুঝতে পারছিল বীরেন্দ্র একদম তৈরি হয়ে এসেছে। কিন্তু উর্জা একটা জিনিস বুঝে গিয়েছে। মন্ত্রগুপ্তির চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। সব জায়গায় সবাইকে বুঝিয়ে কোনও কাজ হয় না। উর্জা জানে, বয়সে বড় মানুষের সঙ্গে লজিক খাটে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের মানসিকতা পাল্টানোর মতো যুক্তি সাজানোও সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ওর এই বিয়ের সঙ্গে বীরেন্দ্রর উচ্চাকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। বীরেন্দ্র কিছুতেই সেখান থেকে সরে আসবে না!
উর্জা বলেছিল, “বলেছি এখন আমি বিয়ে করব না। রাজুর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখব না। কারণ, সামনে আমার অনেক কাজ। অফিস থেকে বড় প্রজেক্ট আছে। বুঝেছ?”
বীরেন্দ্র থমকে গিয়েছিল। তার পর বলেছিল, “বিয়ের পরেও কাজ করতে পারবি। উমেশ ওপেন মাইন্ডেড ছেলে। কোনও অসুবিধে হবে না।” উর্জা বলেছিল, “তুমি শিয়োর?”
বীরেন্দ্র ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল এবার। স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “হ্যাঁ, শিয়োর। উদয়বাবু তাই বললেন। আর অন্যের কোম্পানিতে চাকরি করবি কেন? ওঁদের এত বড় বিজনেস। সেখানেই জয়েন করতে পারবি ইচ্ছে হলে।”
উর্জা সামান্য হাই তোলার অভিনয় করেছিল। বোঝাতে চেয়েছিল যে, ঘুম পাচ্ছে। তার পর বলেছিল, “আমি গুজরাত থেকে ফিরে আসি। তার পর ভাবব। ঠিক আছে? তবে এপ্রিলে নয় বিয়েটা একটু পিছিয়ে দিয়ো!”
বীরেন্দ্র হেসেছিল এবার। যেন মাথা থেকে বড় বোঝা নামল। বলেছিল, “সে তুই ফিরে আয়। তার পর বসে আমরা ঠিক করে নিচ্ছি। আর, ইউ হ্যাভ টেকন দ্য রাইট ডিসিশন। আমি রাজুদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওটা বাড়ি? ওখানে তুই থাকবি! আমি বুঝি, তোদের মতো বয়সে এই বিপ্লবের রোমান্টিসিজম ভাল লাগে। কিন্তু ইন দ্য লং রান, বিপ্লবটাও বিজনেস। ক্ষমতা হাতানোর টুল। রেভোলিউশন ইজ্ জাস্ট আ ব্র্যান্ড। আ ট্যাগ। ক্ষমতা পেলে সব এক হয়ে যায়। রাজু উইল বি নো বেটার। আমার বয়স হয়েছে। দুনিয়া দেখেছি। যাক গে। তুই ফিরে আয়, তার পরে কথা বলছি। শুয়ে পড়।”
বীরেন্দ্র ঘর থেকে বেরোনোর জন্য দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। উর্জা হেসেছিল সামান্য। বীরেন্দ্র আর অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে।
মা এবার এগিয়ে এসেছিল উর্জার দিকে। মাথায় আলতো করে হাত দিয়ে বলেছিল, “যা বলছে করে নিলেই তো হয়। ঝামেলা করিস কেন! এই যে ছেলেটার সঙ্গে যোগাযোগ শেষ করেছিস, এতে তোর বাবা খুব খুশি হয়েছে। আমিও হয়েছি। যাক, শুয়ে পড়। আমি আসি।”
মাঝে মাঝে জীবনের সম্পর্কগুলো যুদ্ধের মতো হয়ে যায়। সেখানে স্বাভাবিক কথাবার্তা, সহজ সুখ-দুঃখ বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না । সবটাই হয়ে যায় কৌশল। আর কে না জানে, কোনও সম্পর্কে যখন কৌশল ঢুকে পড়ে, তখন বলে দেওয়াই যায় যে, সেই সম্পর্কের মৃত্যু হয়েছে!
বীরেন্দ্রর সঙ্গে কোনও দিন সে ভাবে কোনও বাবা-মেয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়ে ওঠেনি উর্জার। আর গতরাতে মায়ের মনোভাব জানার পরে মায়ের প্রতিও সে ভাবে আর কোনও টান অনুভব করছে না ও। আসলে উর্জার মনে হয় আমাদের দেশে বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ককে যতটা না লজিকালি দেখনো হয়, তার চেয়ে বেশি সেন্টিমেন্টাল করে দেখানো হয়। তার মধ্যে উচিত-অনুচিত কৃতজ্ঞতা ইত্যাদি ঢুকিয়ে এনে সম্পর্কটাকে ঠিক রাখার দায়িত্ব অনাবশ্যক ভাবে সস্তানদের ওপর নিয়ে এসে ফেলা হয়। যেন বাবা-মায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার দায়িত্ব শুধু সন্তানদের। মা কী করে বলতে পারে যে, ওর যাতে কষ্ট হবে সেটা করায় বাবা খুশি হয়েছে! আর মাও খুশি হয়েছে! মানে ওর কষ্টের গুরুত্ব নেই। শুধু বাবা-মাকে খুশি করার জন্য ও বেঁচে আছে। ও কি বাবা-মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত!
ট্রলি ব্যাগের হাতলটা টেনে তুলল উর্জা। তার পর পাসপোর্ট, ইনশিওরেন্স আর ডলার রাখা ছোট্ট ব্যাগটা পিঠে গলিয়ে নিল। মোবাইলটার মাথার কাছের সুইচ টিপে দেখে নিল কতটা চার্জ আছে। তার পর একটা নাম্বার ডায়াল করল।
দু’বার রিং হওয়ার পরে ফোনটা ধরল রাজু।
উর্জা বলল, “আমি বেরোচ্ছি। রাসবিহারি মোড়ে চলে এসো দ্রুত। আই উইল পিক ইউ আপ। ডোন্ট ওয়েস্ট টাইম। এখন রাত সাড়ে দশটা বাজে, তুমি পৌনে এগারোটায় এসো। তাড়াতাড়ি সব সেরে চেক-ইন করে নিলে নিশ্চিন্ত। কেমন?”
রাজু শব্দ করে শ্বাস ফেলল। বলল, “আমার কেমন টেনশন হচ্ছে। আসলে জীবনে বাইরে যাইনি তো! আর এ ভাবে এত শর্ট নোটিসে সব ছেড়ে চলে যাওয়া! মানে…”
“আরে, তুমি এখন এ সব বলছ!” উর্জার রাগ হয়ে গেল একটু, “যাওয়ার আগে এমন কথা কেউ বলে! তুমি খুশি হওনি? আমাদের একটা আলাদা জীবন হবে। তুমি মাকে ভাইকে সাপোর্ট করতে পারবে বেটার ভাবে। সে সব ভাবো। আর বিদেশে গেলে দেখবে ওখানকার মানুষজন অনেক সেনসিবল। এখানকার মতো সারাক্ষণ অন্যের জীবনে উঁকিঝুঁকি দেয় না। সারাক্ষণ অন্যের কাজে আঙুল দিয়ে সেটা পণ্ড করতে চায় না! সারাক্ষণ নিজের ইনসিকিওরিটি লুকোতে অন্যকে অপমান করে না। তুমি অনেক মন খুলে বাঁচতে পারবে। আনন্দ করে বাঁচতে পারবে। কে কী ভাবল সেই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
রাজু হাসল শব্দ করে, “আরে, তুমি তো খুব রেগে আছ দেখছি! আমি এমনি বললাম। আসলে সারা জীবন এমন একটা দম বন্ধ সময় কাটিয়েছি। তুমি ছিলে তাই এই মুক্তি এল। কিন্তু তাও একটা কেমন তো লাগবেই! তবে মা খুব খুশি।”
উর্জা ঘড়ি দেখল। মোবাইলেও পিকপিক শব্দ শুনল একটা। ও কানের কাছ থেকে ফোন সরিয়ে স্ক্রিনটা দেখল। গাড়ি বুক করেছিল। সেটা এসে গিয়েছে।
উর্জা আবার কানে মোবাইল লাগাল, “গাড়ি এসে গিয়েছে আমার । হারি আপ। আমি বেরোচ্ছি। রাখলাম।”
উর্জা ফোনটা রাখামাত্র গাড়ির ড্রাইভারের ফোন ঢুকল। উর্জা অপেক্ষা করতে বলে ফোনটা কাটল। তার পর ঘরের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। সব নিয়েছে তো! মনে মনে মিলিয়ে নিল।
আসলে বেশি জিনিসপত্র নেয়নি উর্জা। বীরেন্দ্র বা ওর লোকজন সন্দেহ করলেই বিপদ। কিছু একটা ঝামেলা বাঁধাতে ওস্তাদ এরা। তাই একটা ট্রলিতে যেটুকু ধরে, সেটুকুই নিয়েছে। ওরা নিউ জিল্যান্ডের অকল্যান্ডে থাকবে। কোম্পানির ফ্ল্যাট। সেটা ফার্নিশড। মার্চ মাস বলে এখন ওখানে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। গিয়ে গরমের জামাকাপড় কিনে নেবে। তবে রাজুর তো আর এই সমস্যা নেই। ওর দুটো বড় সুটকেস রয়েছে। সেখানে নাকি ও নিজের মতো করে উর্জার কিছু জিনিস নিয়ে নিয়েছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এল উর্জা। বাড়ি বেশ শুনশান। মা নিজের ঘরেই আছে। আসলে উর্জা তো মাঝে মাঝেই এরকম টুকটাক ট্রিপে যায় তাই মা আর সে ভাবে গা করে না।
উর্জা দেখল বিন্দি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ও বিন্দির দিকে তাকিয়ে হাসল। তার পর একটা দু’হাজার টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিল ওর দিকে।
বিন্দি অবাক হল, “দিদি, এটা কেন?”
উর্জা হাসল, “এমনি। অনেক দূরে চলে যাচ্ছি তো! তাই….”
“মানে?” বিন্দি অবাক হল।
“আরে, কিছু না। রাখ তো! মা কই?” উর্জা হাসল।
“ম্যাডাম ঘুমিয়ে পড়েছে। আমায় বলেছে আপনাকে বলে দিতে যে, কাল সকালে যেন আমদাবাদ পৌঁছে ফোন করেন। আর সাহেব ফেরেননি এখনও,” বিন্দি কথাটা বলেই পায়ের দিকে তাকাল উর্জার। বলল, “আপনার জুতোর ফিতে খোলা। আসুন, আমি বেঁধে দিই।”
বিন্দি ঝুঁকে পড়ার আগেই পিছিয়ে গেল উর্জা। বলল, “আরে, আমিই পারব।”
হাঁটু গেড়ে বসে জুতোর ফিতে বাঁধার জন্য ঝুঁকল উর্জা। পিঠের ব্যাগটা কাত হয়ে গেল হঠাৎ। আর ভেতর থেকে প্লেনের টিকিটের কাগজ আর পাসপোর্টটা বেরিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আরে, চেনটা খোলা ছিল! খেয়াল করেনি তো!
বিন্দি তাড়াতাড়ি সেগুলো তুলে ধরে রইল। তার পর উর্জার জুতোর হয়ে গেলে ওর হাতে দিল।
ফিতে বাঁধা উর্জা পিঠের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল ওগুলো। তার পর চেন আটকে বলল, “আমি আসি রে। তুই ভাল ভাবে থাকিস।” বিন্দি তাকাল ওর দিকে। তার পর কী যেন হল মেয়েটার! ও এসে আচমকা হাত ধরল উর্জার। ছলছলে গলায় বলল, “আপনিও সাবধানে থাকবেন দিদি। আপনি … ”
“আরে পাগলি! কাঁদছিস কেন? নো কান্নাকাটি। আমি এলাম। ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছে। আমি ফোন করব তোকেও। মাকেও করব। ঠিক আছে?”
বিন্দি আঁচল দিয়ে চোখটা মুছল। তার পর ট্রলিটা নিজে বয়ে নিয়ে উর্জার সঙ্গে নেমে এল নীচে।
উর্জা ওকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দিল না। ট্রলিটা টানতে টানতে এগিয়ে গেল মূল ফটকের দিকে। এবার একবার থমকাল উর্জা। পিছন ফিরে গোটা জায়গাটা দেখল। আবার কবে যে ফিরবে কে জানে! যা করতে যাচ্ছে, সেটা করার পরে বীরেন্দ্র যে কত দিন রাগ করে থাকবে, মা যে কত দিন মুখ ঘুরিয়ে থাকবে, সেটা ও জানে না।
উর্জা দেখল, দূরে ওই আউট হাউসের ওখানে কমজোরি আলো জ্বলছে। জিনি কি বসে আছে বারান্দায়! এখান থেকে দেখে বুঝতে পারছে না ও।
সে দিন মেয়েটা এমন করে এসেছিল ওর কাছে। ওর আর কবির জন্য দুটো ঘড়ি কিনেছিল উর্জা। সেটা দিতে উর্জা যেতই জিনির কাছে। কিন্তু তার আগেই মেয়েটা এসেছিল।
জিনি যে ভালবাসে কবিকে, সেটা জানে উর্জা। সেটা নিয়েই কথা বলেছিল ও। কিন্তু মেয়েটা কিছু বলেনি। চুপচাপ শুনছিল মাথা নামিয়ে।
জিনি চলে যাওয়ার পরে উর্জার মনে হয়েছিল, কেন এসেছিল জিনি! কী বলতে এসেছিল! সেটা তো জানা হল না।
সেই জিনি কি বসে আছে দূরে, বারান্দায়! বোঝা যাচ্ছে না এখান থেকে। গাছের ছায়া আর অল্প আলোর জন্য সবটাই কেমন যেন আবছা উর্জা হাসল মনে মনে। ওরা ভাল থাকুক।
হঠাৎ কোকিল ডেকে উঠল একটা। আজও রাতের বেলায় কোকিল ডাকছে। এর আগেও শুনেছে উর্জা। ওর কেমন যেন লাগল। পাখিটা যে ওদের বাগানের মধ্যেই কোথাও আছে সেটা বুঝতে পারল। ক’দিন হল কোকিলটা ডাকছে। বসন্তকাল বলেই কি এমন! তা বলে রাতের বেলায় কেন? পাখিটা কি খুব কাতর! ওর কি খুব কষ্ট! মানুষও কি এমন কোকিলের মতো? শুধু সে ডাকতে পারে না। হবেও-বা।
বাগানের দিক থেকে এবার হাওয়া দিল একটা। চুল উড়ল সামান্য। ভাল লাগল উর্জার। অনেক স্বাধীন লাগছে। যেমন চাইছে তেমনটা করতে পারার আনন্দই আলাদা। ও আর সময় নষ্ট না করে গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
দারোয়ানদের বলাই ছিল। ওরা উর্জাকে দেখে সেলাম করল। ওঃ, কী সব নিয়ম করে রেখেছে বীরেন্দ্র! সত্যি, সামস্ত প্রভুরা আসলে আজও বেঁচে আছে! যাক গে। ওর কী! ও তো আর নেই এখানে।
উর্জা দেখল সামনে একটা সাদা রঙের সেডান দাঁড়িয়ে আছে। ও মোবাইলের নোটিফিকেশনের সঙ্গে গাড়ির নাম্বারটা মিলিয়ে নিল। এটাই।
ডিকিতে সুটকেস রেখে গাড়িতে উঠে বসল উর্জা। ড্রাইভার ছেলেটা অল্পবয়সি। গালে হালকা চাপ দাড়ি। দেখেই উর্জার কবির কথা মনে পড়ল। যাওয়ার আগে ছেলেটার সঙ্গে দেখা হল না। কে জানে ঘড়ি পছন্দ হয়েছে কি না!
উর্জা বলল, “রাসবিহারী মোড় হয়ে যাবেন প্লিজ। আর, এসি চালাবেন না।”
“হ্যাঁ ম্যাডাম,” ছেলেটা গাড়ি স্টার্ট করল।
কলকাতায় রাত বাড়ছে। জানলা দিয়ে নরম ঠান্ডা হাওয়া আসছে। ভাল লাগছে উর্জার। এই হাওয়াটার জন্যই এসি চালাতে বারণ করেছে ও। জানলা খোলা রাখতে ইচ্ছে করছে।
আমেরিকা আর ইউরোপ করোনাভাইরাসের প্রকোপে খারাপ অবস্থায় পড়ে গিয়েছে। এই দেশেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষজন ধরা পড়েছে বেশ কিছু। কে জানে ফ্লাইট কবে বন্ধ করে দেবে! ভাগ্যিস টিকিট করেছিল সময় মতো!
গোপাল নগর থেকে ভেতরের রাস্তা ধরল গাড়িটা। এই জায়গাটা খুব একটা পরিচ্ছন্ন নয়। রাস্তার পাশের বাড়িঘরগুলোও কেমন পুরনো, রংচটা। তবে আজকাল কলকাতায় যেহেতু ঝাঁ ঝাঁ আলো লাগানো হয়েছে, তাই সবটাই কেমন যেন ফ্ল্যাশগানে তোলা ছবির মতো লাগে! এত আলো কেন চারিদিকে! এমন চোখ ঝলসে যাওয়া আলো কেন! ইউরোপ আমেরিকায় অনেক ঘুরেছে উর্জা। সেখানে কিন্তু এমন আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় না। সেখানকার আলো অনেক নরম। শৈল্পিক। সব দেখা যায়, কিন্তু উৎকট বাড়াবাড়ি নেই।
সামনে রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা লোক গায়ে গামছা জড়িয়ে কানে মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার করছে। ড্রাইভার, লোকটাকে যেতে দেবে বলে গাড়িটাকে আস্তে করল, আর ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
একটা এসইউভি আচমকা পেছন থেকে এসে ওদের সেডানটার সামনে আড়াআড়ি ভাবে পথ আটকে দাঁড়াল। ড্রাইভার ছেলেটা মুখ বাড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারল না। সামনের গাড়ি থেকে চারটে ছেলে দ্রুত নেমে এগিয়ে এল ওদের গাড়ির দিকে।
তার পর একটা রোগা ফ্যাকাসে মতো ছেলে সোজা উর্জার সামনে এসে খোলা জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে দরজার লকটা খুলে দরজাটা হাট করে দিল। উর্জা ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গেল খুব। ছেলেটা উর্জার দিকে একটা পিস্তল তুলল এবার। তার পর নরম কিন্তু নিশ্চিত গলায় বলল, “আসুন ম্যাডাম । আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”
উর্জা কী বলবে বুঝতে পারল না। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে ওর। কাঁপছে ও। ড্রাইভার ছেলেটার দিকেও আর-একজন পিস্তল তাক করে রয়েছে।
উর্জা ভাবল, কারা এরা! কী চায়! ও দেখল, পিস্তল তাক করে থাকা ছেলেটা হাসছে সামান্য। আর রাতের হাওয়ায় ছেলেটার মাথার লাল চুলের গোছা নড়ছে।
