১১. লালু
কবির কী হয়েছে কে জানে! এমনিতেই চুপচাপ থাকে। তার পর বীরেন্দ্রর ওপর হামলার পর থেকে আরওই কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ গুম হয়ে থাকে আজকাল। কথা বললে উত্তর দেয় না। মাঝে মাঝেই রাতে খেতে যায় না। একদিন তো লালু কাঁদতেও দেখেছিল ওকে, ওই পিছনের বাগানটার বেঞ্চে বসে।
না, লালু তখনই গিয়ে জিজ্ঞেস করেনি কী হয়েছে।
বড়দাদু ওকে বলত, কেউ একা বসে কাঁদলে তখন তাকে বিরক্ত করতে নেই। কান্না তো এক ধরনের সাফাই প্রক্রিয়া, তাই সেটাকে চলতে দিতে হয়। পরে অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলে তখন তাকে না-হয় জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, কিসের কষ্ট হল।
তাই পরের দিন সন্ধেবেলা লালু ধরেছিল ওকে। কবির সেদিন বেরোনো ছিল না। নিজের ঘরে বসে কী একটা বই খুলে পড়ছিল। লালু দরজায় নক করতে গিয়ে দেখেছিল, দরজা খোলাই রয়েছে।
“কী রে, কী করছিস?” লালু মুখ বাড়িয়ে হেসেছিল। কবি মাথা নেড়েছিল, “কিছু না। আয়।”
লালুর হাতে ছোট একটা মদের বোতল আর এক প্যাকেট চানাচুর ছিল। ও বোতলটা বিছানার পাশের টেবিলে রেখে বলেছিল, “বড় বাড়িতে আজ ছোট পার্টি আছে। মেয়ে এসেছে না! ম্যাডাম মাল আনতে বলেছিল আমায়। অনেক টাকার জিনিস। লোকটার থেকে দুটো ছোট নিপ নিয়ে এসেছি এক্সট্রা। ভাল জিনিস। জিভে লাগলেই সারা শরীরে আর ডি বর্মন বাজতে শুরু করে! খাবি?”
কবি হাত বাড়িয়ে চানাচুরটা ওর হাত থেকে নিয়ে বলেছিল, “না। তুই ওটা খা, আমি এটা খাব।”
লালু হেসে বলেছিল, “জানতাম শালা, এমনটা করবি। রাখ ওটা তুই। আমার আছে আরও।”
লালু ঢোলা পাজামার পকেট থেকে আর-একটা চানাচুরের প্যাকেট বের করে বলেছিল, “কাজুবাদামও আছে অনেক। কিন্তু গ্যাঁড়াতে পারিনি। বিন্দি দিয়ে যাবে বলেছে।”
কবি কিছু না বলে বালিশে ঠেস দিয়ে চানাচুরের প্যাকেট খুলেছিল। লালু বসে বোতলটা নিয়েছিল হাতে। তার পর এক মোচড়ে বোতলের প্যাঁচটা খুলে বলেছিল, “আজ ঠিক আছিস?”
কবি তাকিয়েছিল ওর দিকে। চোখে প্রশ্ন।
লালু হেসে বলেছিল, “বাগানে বসে কাঁদলে লোকের চোখে পড়বে না। তা কেসটা কী? কেউ দাগা দিল নাকি? জিনিও জিজ্ঞেস করছিল কিন্তু।”
কবি ওর দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। উত্তর দেয়নি কোনও। শুধু চুপচাপ বসে চানাচুর খাচ্ছিল।
লালু বোতলে মুখ লাগিয়ে মদে চুমুক দিয়ে বলেছিল, “তোদের মাইরি হেভি সুবিধা। এই যারা চুপ করে থাকে আর কী। উত্তর না দিতে দিতে সেটাই স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গিয়েছে। রাজার যে দুঃখ কিসে হয়, সেটাই জানা যায় না।”
কবি বলেছিল, “এ ভাবে কাঁচা মদ খাস না। মরে যাবি।”
লালু হিহি করে হেসেছিল, “বেঁচে আছি আমরা? তাই মনে হয়। তোর? সাড়ে বারো হাজার পাই। ম্যাডামের লাগানোর ইচ্ছের জন্য আরও হাজার দেড়েক-দুয়েক জোটে। সঙ্গে এটা-ওটা থেকে আরও কিছু ম্যানেজ করি। আমার এ সব ভাল লাগে মনে হয় তোর কবি? বলে কিনা মরে যাবি! মাইরি!”
কবি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলেছিল, “সবার কেন এত কষ্ট কে জানে!” লালু হেসেছিল, “মন হেভি সেনসিটিভ জিনিস। যখন-তখন পাংচার হয়ে যায়! দূর, এ সব নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না। কোথায় মাল খেয়ে একটু আরাম করব, না, তুই শালা ফিলসফির ক্লাস খুলে বসলি! আমার বি এ-তে ছিল। কী ভাবে যে পাশ করেছিলাম আমিই জানি। তবে যাই বল, সে দিন ওই হামলা থেকে বিশাল বেঁচে গিয়েছিস। এ সব বীরেন্দ্রফীরেন্দ্র সুবিধের মাল নয়। পারলে অন্য কোথাও কাজ নিয়ে কেটে পড়। খামোকা প্রাণ দিবি?”
কবি তাকিয়েছিল ওর দিকে। কী যেন বলবে বলে মনে হচ্ছিল লালুর। মনে হচ্ছিল কবি কিছু একটা জিনিস বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেটার জ্বালায় অস্থির হয়ে আছে।
কবি বলল, “রাতের বেলা আজকাল মাঝে মাঝেই একটা কোকিল ডাকে, শুনেছিস? ডাকটা শুনলেই কেমন যেন লাগে! আমার বাবা যে দিন মারা যায় তার আগের রাতেও কোকিল ডেকেছিল আচমকা। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। আর স্যরের ওপর এই গুলি চালানোর আগের রাতেও ডেকেছিল, জানিস!”
লালু আর-একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তো? আটভাট যত কুসংস্কার! তুই অন্য কিছু বলবি? বলতে পারিস। কাউকে বলব না। দেখ, সে দিন যে স্যরের ওপর আক্রমণ হল, সেখানে তো তুইও ছিলিস। সেখানে কি কিছু হয়েছে? ওই শকটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিসনি, না? তাই বলছি, ইচ্ছে হলে বলতে পারিস আমায়।”
কবি চোয়াল শক্ত করে সরিয়ে রেখেছিল চানাচুরের প্যাকেটটা। তার পর বলেছিল, “কিছু না। আমার একটু কাজ আছে। তুই যদি…”
লালু উঠে পড়েছিল। হেসে বলেছিল, “পেচ্ছাপ আর মনের কথা চেপে রাখতে নেই। অনেক রোগ হয়। আমি মাল খেয়ে মরলেও তুই মনের কথা চেপে রেখে মরবি বলে দিলাম!”
কথাটা মনে পড়তে হাসি পেল লালুর। আজ কবি বাড়িতে নেই। লালু ম্যাডামের সঙ্গেই আজ বিকেলে ফিরে এসেছে বাড়িতে। ম্যাডামের শরীরটা ভাল নেই। মাথা ব্যথা করছে নাকি। ভালই হয়েছে। বাইরে থাকলেই নানা কাজের হুকুম হয়।
বাড়িতে ফিরে ম্যাডাম ওকে ওষুধ আনতে দিয়েছে। মাথায় লাগানোর বাম, আর কী একটা ট্যাবলেট। যখন বাড়ি ফিরছিল তখন কিনে নিতে কী হয়েছিল কে জানে! খালি ফালতু খাটানোর ধান্দা!
ওষুধগুলো নিয়ে দাম মিটিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল লালু। সন্ধে হয়ে এসেছে প্রায়। একবার হাজরা মোড়ে যেতে হবে ওকে। এখন সওয়া পাঁচটা বাজে, ওকে সাড়ে ছ’টার আগে পৌঁছোতে হবে ওখানে। ছুটিকে নিয়ে অঞ্জনা আর মোহর আসবে ডাক্তার দেখাতে। অঞ্জনা ওকেও যেতে বলেছে।
. অঞ্জনা। মেয়েটাকে দেখলেই এখনও মন ভাল হয়ে যায় ওর। ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো।
তখন প্রথম প্রথম এখানে আসছিল লালু। ম্যাডামের একজন ড্রাইভার ছিল সে সময়। বিহারের লোক। নাম ভানুপ্রসাদ শর্মা। বছর পঞ্চাশেক বয়স। বেঁটে, মাথায় টাক। আস্তে আস্তে কথা বলত। দেখলে বোঝা যেত না, কিন্তু মনে মনে বিশাল রসের ভান্ডার ছিল লোকটা। লালুকে ‘লালুয়া’ বলে ডাকত।
একদিন বিকেলবেলা নিজের ঘরে লালুকে ডেকেছিল ভানুপ্রসাদ। বলেছিল তৈরি হয়ে আসতে, একটা জায়গায় নিয়ে যাবে।
ভানুপ্রসাদের ঘরটা ছিল গ্যারাজের পাশে। একদম ছোট্ট ঘর। তাতে একটা খাট আর একটা আলমারি ছাড়া আর কিছু ছিল না। লালু গিয়ে দেখেছিল, ভানুপ্রসাদ নিজেও বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছে।
লালু কী বলবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। কোথায় নিয়ে যাবে ওকে লোকটা। কলকাতার কিছুই চেনে না ও। তা ছাড়া ম্যাডাম যদি ডাকে! তা হলে?
ভানুপ্রসাদ বলেছিল, “কীরে, এমন চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? খুশিতে থাক। তোকে আজ দারুণ জায়গায় নিয়ে যাব।”
“যদি ম্যাডাম ডাকেন?” লালু ইতস্তত করেছিল। “আমি তোর হয়েও ছুটি নিয়ে নিয়েছি। ফালতু চিন্তা করবি না।” “কিন্তু কোথায় যাব?” লালু অবাক হয়েছিল।
“তোকে আসল জায়গায় নিয়ে যাব। তোর এই বয়সে এমন সুখা সুখা থাকলে হবে? মুঠ মারকে ক্যায়া জিন্দেগি বিতানা হ্যায়?”
এ সব কী বলছে লোকটা! ওর চেয়ে বয়সে এত বড় একটা মানুষ! এ রকম অসভ্যতা করছে কেন?
ভানুপ্রসাদ বোধহয় ওর মুখ দেখে বুঝেছিল যে, এমন কথায় ও বিব্রত হচ্ছে। তাই হেসে বলেছিল, “আরে, আমরা তো বন্ধু আছি। বাড়ি থেকে দূরে আমরা একে অপরের খেয়াল না রাখলে কে রাখবে বল! তোকে আজ সোনাগাছি নিয়ে যাব আমি। আমার সেখানে একজন আছে। তোকেও আজ আমি মানুষ করে দেব।”
“কী!” লালু একটু আঁতকে উঠেছিল। এ সব কী বলছে ভানুপ্রসাদ! মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! জায়গাটার নাম শুনেছে লালু। সেখানে যারা থাকে, তারা যা কাজ করে তা নিয়ে ওর কোনও বক্তব্য নেই। কারণ, কে যে জীবনের কোন দুর্বিপাকে পড়ে কী করতে বাধ্য হয় কেউ জানে না। কিন্তু সেখানে ওর যাওয়ার ইচ্ছে নেই। বরং ভয় আছে একটা। নানা গল্প শুনেই সেই ভয়টা তৈরি হয়েছে।
ভানুপ্রসাদ বলেছিল, “ভয়ের কিছু নেই। এই বয়সে এ সব করবি না তো কবে করবি? আমার চেনাজানা আছে। তোর কোনও অসুবিধে হবে না। আজ আমি তোর টাকা দেব। পরের বার থেকে যার যার, তার তার। ঠিক হ্যায়?”
“না না, আমি যাব না,” লালু ভয় পেয়ে যাওয়া গলায় বলেছিল। “আরে শালা ডরপোক আদমি! মর্দ বন! চল!” ভানুপ্রসাদ এসে চেপে ধরেছিল ওর হাত, “শালা, এখানে কে আছে তোর? আর আমি কি তোকে বিপদে ফেলব নাকি? শালা গান্ডু। ফালতু ভয় খালি। চল!”
লালুকে এক রকম ঘাড় ধরেই নিয়ে গিয়েছিল ভানুপ্রসাদ। মেট্রো রেল। স্টেশন। সেখান থেকে নেমে হাঁটা। রাস্তার বাঁক। গলি। ধেয়ে আসা কিছু মহিলা। দালালির পেশার কিছু পুরুষ। লালুর মাথা কাজ করছিল না। কী সব হচ্ছে ওর সঙ্গে! ভানুপ্রসাদ ওর হাত চেপে ধরে রেখেছিল শক্ত করে। লালুর মনে হচ্ছিল এই জগতে কিছু মানুষ আছে, যারা তথাকথিত নিষিদ্ধ কাজকর্ম একা করতে পছন্দ করে না। তারা নিজেদের সঙ্গে অন্যকেও টেনে সেই খাদে নামাতে চায়।
বড় একটা বাড়ির তিনতলায় ওকে নিয়ে গিয়েছিল ভানুপ্রসাদ। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এগিয়ে এসেছিল ওদের দেখে। না, সিনেমায় যেমন দেখা যায় সে রকম সাজপোশাক নয়। বরং সাধারণ আটপৌরে সাজ।
ভানুপ্রসাদ তাকে বলেছিল, “আমার দোস্ত। নতুন। প্রথমবার। ঠিক জায়গায় নিয়ে যাও কমলা। ভয় পাচ্ছে আসলে।”
কমলা নামে মহিলাটি হেসেছিল ওর দিকে তাকিয়ে, “ভয়? কেন গো? এখানে কি দানো থাকে নাকি? ভয় মাথায় থাকলে কিছু করতে পারবে না। বাবু জাগবেই না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। রিল্যাক্স থাকো। ভানুদা আমাদের পুরনো লোক। তোমার চিন্তা নেই। রোজির কাছে নিয়ে যাচ্ছি তোমায়। একটাই শট কিন্তু। কী বলো?” শেষের প্রশ্নটা কমলা জিজ্ঞেস করেছিল ভানুপ্রসাদকে।
ভানুপ্রসাদ হেসে বলেছিল, “আরে, দো কর সকে তো দো শট। ওর বউনি আজ। কোনও অসুবিধা নেই আমার।”
কমলা একটা ঘরের সামনে নিয়ে গিয়েছিল লালুকে। তার পর বন্ধ দরজায় টোকা দিয়েছিল। সামান্য পরে খুলে গিয়েছিল দরজাটা। আর লালু অবাক হয়ে দেখেছিল একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। সামান্য শ্যামলা রং। টানা চোখ। ছোট্ট কপাল। ধনুকের মতো ঠোঁট। আর থুতনিতে একটা ছোট্ট টোল। এ কে!
“রোজি,” কমলা বলেছিল, “এই তোর নতুন গেস্ট। প্রথমবার। সামলে দিস। বুঝলি? আর ছুটি কোথায়?”
“ও মোহরের কাছে আছে।”
“ঠিক আছে,” বলে কমলা, লালুকে ছোট্ট একটা ঠেলা দিয়ে চলে গিয়েছিল। দূরে দাঁড়িয়ে ভানুপ্রসাদ হেসেছিল ওর দিকে তাকিয়ে, তার পর কমলার সঙ্গে চলে গিয়েছিল অন্য একটা ঘরের দিকে।
রোজ়ি অল্প হেসে ওকে বলেছিল, “ঘরে এসো।”
ঘরটা ছোট হলেও সাজানো। একটা মাঝারি মাপের বিছানা ঘরের বেশির ভাগটাই দখল করে রেখেছে। দেওয়ালের ওপরে একটা টিভি লাগানো আছে। তার পাশে ছোট্ট একটা তাক এ চারজন ভগবানের ছবি। তাতে ছোট ছোট গাঁদার মালা দেওয়া। সামনে ছোট্ট স্টিলের প্লেট আর গ্লাসে প্রসাদ আর জল রাখা।
লালু ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। রোজি বিছানায় বসে ওর পাশে হাত দেখিয়ে বলেছিল, “বোসো আমার পাশে। আর, একটু তাড়াতাড়ি করো প্লিজ।”
লালু তাও দাঁড়িয়েছিল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল রোজির দিকে। রোজি এবার সামান্য বিরক্তির গলায় বলেছিল, “কী হল? এসো। দেরি করছ কেন?”
লালু ইতস্তত গলায় বলেছিল, “আপনি এত সুন্দরী!”
“তো?” রোজি অবাক হয়েছিল।
লালু বলেছিল, “আমায় দেখতে এত খারাপ! আপনার আমাকে পছন্দ হবে না আমি জানি। তাই জোর করে কিছু না করাই ভাল!”
““মানে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে! ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাউকে দিয়ে কিছু করাতে নেই। বড়দাদু বলত,” লালু বলেছিল।
জোর করে মানে?” রোজি এবার বেশ অবাক হয়েছিল।
রোজি কী বলবে বুঝতেই পারেনি খানিকটা সময়। তার পর যেন কিছুটা জোর করেই বলেছিল, “এটা আমাদের কাজ। ইচ্ছে অনিচ্ছের দাম নেই। তুমি বেকার সেই নিয়ে চিন্তা কোরো না!”
“আমি যেখানে ইনভলভড, সেখানে আমি তো চিন্তা করবই। তাই না? তাই আমি একটু বসে চলে যাচ্ছি। আপনি বলবেন আমি করেছি। টাকা আপনি পেয়ে যাবেন,” কথাটা বলে ঘরের কোনার একটা মোড়ায় বসেছিল লালু।
রোজি কী বলবে বুঝতে পারেনি। খানিকক্ষণ ওই ভাবে বসে থাকার পর বলেছিল, “আশ্চর্য ছেলে তো তুমি! পাগল নাকি?” “ধরে নিন তাই।”
“কে বলেছে তোমায় দেখতে খারাপ?” রোজি জিজ্ঞেস করেছিল।
“সারা জীবন শুনে এসেছি। জানেন, আমাদের গ্রাম থেকে আঠারো কিলোমিটার দূরে একটা কলেজ ছিল। সেখানে আমি পড়তাম। বি এ। ক্লাসে একটা মেয়ে ছিল। সৌমনা নাম ছিল তার। তাকে আমার খুব ভাল লাগত। এক বন্ধুকে একদিন বলে ফেলেছিলাম। সে মজা করার জন্য কি
না জানি না, সৌমনাকে লাগিয়েছিল সেটা। আমি কিন্তু সৌমনাকে বলার জন্য কিছু বলিনি। ও-ই মজা দেখার জন্য বলে দিয়েছিল হয়তো। মেয়েটা বলেছিল, আমার মুখ দেখলে নাকি ওর বমি পায়! বলেছিল, আমার বাড়িতে আয়না না থাকলে ও কিনে দেবে। তার পর ওদের গ্রুপের সবাই আমাকে দেখলেই বলত, ‘ঘোড়া ল্যাং ল্যাং ল্যাং/ কার বাড়িতে চুরি করেছে কে ভেঙেছে ঠ্যাং!’ আমার এত কষ্ট হত! কী জানেন, এই পৃথিবীতে সবাই সবাইকে কষ্ট দিয়েই বেঁচে আছে। কেউ কাউকে ভালবাসে না। আমায় দেখতে খারাপ, জন্ম থেকেই আমার পায়ে ডিফেক্ট আছে। সেটা কি আমার দোষ, বলুন!”
বলতে বলতে কেন কে জানে চোখে জল চলে এসেছিল লালুর। সে দিন কেন যে এ সব কথা ও রোজিকে বলেছে আজও তা জানে না। এখন লালু ভাবে, মাঝে মাঝে মনের মধ্যে কিসের থেকে যে কী হয়ে যায়, মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না। কে জানে হয়তো জীবনে সে দিন প্রথম কোনও মেয়ে ওর কথা মন দিয়ে শুনছিল বলেই ওকে ভূতে পেয়েছিল!
রোজি উঠে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। তার পর আচমকা ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, “এ সব ভেবো না। সবার সঙ্গেই নানা রকম খারাপ ঘটনা ঘটে। আমাকেও এখানে ফুসলে এনে রেখে গিয়েছিল একজন। কাঁচা বয়সে আমিও বুঝিনি। বিশ্বাস করেছিলাম। ও সব বাদ দাও। চকোলেট খাবে? একজন দিয়ে গিয়েছে।”
চকোলেট নিয়ে বসেছিল লালু। জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার মেয়ে আছে, না?”
রোজি সামান্য চমকে গিয়েছিল, “হ্যাঁ। ছুটি। কী করে বুঝলে?” লালু বলেছিল, “ওই যে পুতুল রাখা আছে। দেওয়ালে মোম রঙের আঁকিবুকি। খাটের পাশে টেপজামা রাখা। তাই…”
“ওরে বাবা! তুমি ডিটেকটিভ নাকি?” রোজি হেসে ফেলেছিল। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “সত্যি কিছু করবে না?”
“নাঃ” মাথা নেড়েছিল লালু, “ওটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। এই যে কথা বললাম, এতেই ভাল লাগল। শরীরের আরামের চেয়ে মনের আরামটা জরুরি।”
মিনিট কুড়ি পরে কমলা এসে দরজা ধাক্কা দিয়েছিল। একটু সময় নিয়ে খুলে দিয়েছিল রোজি।
কমলা বলেছিল, “একটা শট তো? সেরকম টাকা নেব।” রোজ়ি কিছু বলার আগেই লালু বলেছিল, “না, দুটো হয়েছে!”
“ও বাবা! এর মধ্যেই!” কমলা হেসে ফেলেছিল, “ঠিক আছে, সেরকমই টাকা নিচ্ছি। আমি বাইরে আছি ভানুর সঙ্গে। তুমি এসো!” কমলা চলে গিয়েছিল।
হাতের চারটে চকোলেট থেকে একটা পকেটে রেখে তিনটে রোজির হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল লালু। বলেছিল, “একটা রাখলাম। বাকিগুলো ছুটির জন্য রেখে দিন!”
রোজি কেমন করে যেন তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “আর আসবে না?”
“আমি!” লালু কী বলবে বুঝতে পারেনি।
রোজি ওকে “দাঁড়াও” বলে আলমারি থেকে একটা খাতা বের করে তাতে কী একটা লিখে, পৃষ্ঠা ছিঁড়ে হাতে দিয়েছিল ওর। লালু দেখেছিল ফোন নাম্বার!
লালু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রোজির দিকে।
বলেছিল, হাসির মধ্যে। “তুমি এলে আমার খুব ভাল লাগবে। ফোন করে এসো। ফাঁকা থাকব।” “আচ্ছা,” লালুও হেসেছিল।
রোজি হেসেছিল। সামান্য বিষণ্ণতা ছিল যেন
রোজি বলেছিল, “আর আমার আসল নাম কিন্তু রোজি নয়, অঞ্জনা।”
ভানুপ্রসাদ আর কাজ করে না এখানে। বছরখানেক আগে দেশে গিয়েছিল ছুটিতে। তার পর সেখান থেকে খবর আসে, হার্ট অ্যাটাক করে মারা গিয়েছে। একটা জলজ্যান্ত লোক আর নেই! ভাবলেই কেমন যেন লাগে।
তার জায়গায় এখন সুজিত বলে একটা ছেলেকে রাখা হয়েছে। ম্যাডামের গাড়ি চালানোর জন্য। ছেলেটা প্রচণ্ড তোতলা। মানে, একটা বাক্য বলতে গেলেই কষ্টে মুখ-চোখ লাল হয়ে যায় ওর। তাই চুপচাপ থাকে ছেলেটা। গাড়িতে ম্যাডামের সঙ্গে যখন যায়, তখন সামনে সুজিতের পাশেই বসে লালু। ছেলেটা একটাও কথা বলে না। লালু ভাবে, এমন মানুষই ম্যাডামের জন্য ঠিকঠাক।
ওষুধের দোকান থেকে ওদের বাড়িটা পাঁচশো মিটারের মতো। ওইটুকু যেতে যেতে একটা সিগারেট খেয়ে ফেলল লালু। কাল দুটো কিনেছিল। তার একটা পকেটে রয়ে গিয়েছিল। আসলে আজ টেনশন হচ্ছে। ছুটিকে ডাক্তার দেখে কী বলবে কে জানে!
সে দিন কলেজ স্ট্রিটের ওখানে ফোন পাওয়ার পরে ম্যাডামের দেওয়া কাজ সেরে লালু গিয়েছিল অঞ্জনার কাছে। গিয়ে দেখেছিল, ঘরের সামনের বারান্দায় বসে আছে অঞ্জনা আর মোহর।
মোহর মেয়েটাও ওখানে থাকে। কমলার মেয়ে। ওকে কাজে নামায়নি কমলা। ক্লাস ইলেভেনে পড়ে মোহর। ভাল গান করে। আবার কবিতাও নাকি লেখে। খুব মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে মোহর। মুখে একটাও খারাপ কথা নেই। মেয়েটার সামনে গেলে ভাল লাগে লালুর। মোহর অনেকটা সময় কাটায় অঞ্জনার সঙ্গে। ছুটির সঙ্গেও।
সে দিন গিয়ে দেখেছিল, অঞ্জনা থমথমে মুখে বসে আছে। আর মোহর পাশে বসে নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে!
লালু প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিল, “ছুটি কই?”
অঞ্জনা বলেছিল, “ঘুমিয়ে আছে। জ্বর এসেছিল। এখন ছেড়েছে। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে!”
লালু একটা টুল টেনে বসে পড়েছিল। বলেছিল, “কী বলল ডাক্তার? কাকে দেখিয়েছ?”
“পাড়ার ডাক্তারকেই দেখিয়েছি। গত দু’সপ্তাহ ধরেই জ্বর আসছে আর যাচ্ছে। তাই দেখালাম। বলল, বড় ডাক্তার দেখাতে। অনেক টেস্টও দিয়েছে। অনেক টাকার ব্যাপার গো! কী যে হবে! ওইটুকু মেয়ে! মুখের দিকে তাকালে পাগল পাগল লাগে মাথাটা।”
লালু চোয়াল শক্ত করে বসেছিল। মাঝে মাঝে জীবনে এমন ঘটনা ঘটে যে, তখন মনে হয় ভগবান-টগবান বলে কিছু নেই। বিশেষ করে বাচ্চাদের কিছু হলে তো আরওই এরকম মনে হয়।
অঞ্চনা বলেছিল, “আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কমলাদিকে বলেছি, আমি কিছুদিন বসতে পারব না। আমায় ক্ষমা কোরো। দিদিও বলেছে ঠিক আছে। এই ডাক্তারবাবুই হাজরার ওখানে একজন বড় ডাক্তারের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। ওঁর স্যর। ফোনেও বলে দিয়েছেন যা বলার। এখন টেস্টগুলো করিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
লালু অস্ফুটে বলেছিল, “এত কিছু হয়ে গেল! জানলাম না!”
অঞ্জনার গলায় আচমকা কান্না এসে জমেছিল এবার। ও বুজে আসা গলায় বলেছিল, “জানবে কী করে? কত দিন আসো না! আমায় ভুলে গিয়েছ আমি জানি। আজ নেহাত মেয়েটার জন্য মাথা কাজ করছে না। মোহর বলল তোমায় ফোন করতে।”
কথাটা ঠিক। অনেক দিন এদিকে আসা হয়নি লালুর। কাজের এমন চাপ যে, সেটা বলে বোঝানো যায় না। ম্যাডাম সারাক্ষণ টো-টো করে খুলছে ম্যাডাম।
ঘোরায় ওকে। তার ওপর নতুন আর একটা ব্যবসাও কিন্তু লালু বুঝেছিল, এখন এ সব বলতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। তাই চুপ করে ছিল।
মোহর এবার তাকিয়েছিল লালুর দিকে। জিজ্ঞেস করেছিল, “এবার কী হবে লালুদা?”
লালু মনে মনে ঠিক করেছিল নিজেকে। এ ভাবে সবাই একসঙ্গে ভেঙে পড়লে হবে না। ও বলেছিল, “কী হবে আবার! বড় ডাক্তার দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। এত ভয় পেলে হবে নাকি? টেস্ট করতে দিয়েছে তো। টেস্ট করানো হবে। কোথাও কোনও সমস্যা হলে টেস্টে ধরা পড়ে যাবে।”
অঞ্জনা তাকিয়েছিল ওর দিকে, “কত টাকা লাগবে সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।”
লালু সময় নিয়েছিল। সে দিনই তিনশো টাকা পেয়েছিল ও। তার ওপর ওর নিজের কাছে আরও পাঁচশো ছিল। লালু দুশো টাকা রেখে বাকি ছশো টাকা বের করে দিয়েছিল। বলেছিল, “এটা রাখো। আমি আরও ব্যবস্থা করব দরকার মতো!”
অঞ্জনা টাকার দিকে তাকায়ওনি। বলেছিল, “কেন নেব? কে হও তুমি আমার! আমার ছুটিরই বা কে হও তুমি?”
“কেউ হই না?” লালুর খারাপ লেগেছিল।
“হলে তো খবর নিতে। এত দিন যোগাযোগ না করে থাকতে পারতে? আমি তোমায় ভালবাসি লালু, কিন্তু তুমি বাসো না আমি জানি। আর কেনই বা বাসবে! আমি বেশ্যা। টাকার জন্য অন্যের সঙ্গে শুই। আমি তো তোমাদের কাছে খারাপ মেয়েছেলে। শোনো লালু, আমি কারও থেকে দয়ার দান নিই না,” অঞ্জনার কান্না ছাপিয়ে এবার রাগ উঠে আসছিল।
“অঞ্জনা, অঞ্জনা,” লালু টুল থেকে এবার মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল। অঞ্জনার হাতটা ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিল। বলেছিল, “আমায় তোমার মতো কেউ ভালবাসেনি। তুমি প্লিজ একটু বোঝো!”
“তাতে কী হল! আমি তো বোকা, তাই ভালবেসেছি। যারা পরিণাম না ভেবে সব দিয়ে ভালবাসে তারা তো বোকাই হয়। আমিও তাই। তার মানে তো এই নয় যে, তুমিও আমায় ভালবাস!”
“বাসি বাসি,” লালু অফুটে বলেছিল, “আমি গুছিয়ে ঠিক বলতে পারি না। আমার সব গুলিয়ে যায়। কী করে তোমায় বলি! আমার নিজেরই ঠিক নেই জীবনের। সেখানে…”
“কী সেখানে? আমি কি বলেছি যে, আমায় নিয়ে সংসার বাঁধো? আমায় ঘর দাও? আমায় দেখাশোনা করো? আমরা মেয়ে আর মা দু’জন। ঠিক কেটে যাবে আমাদের।”
লালু বলেছিল, “এখন রাগ করে না। প্লিজ, টাকাটা রাখো। আমি ও সব বলিনি। নিজে সারাক্ষণ একটা সঙ্কোচের মধ্যে থাকি। তোমায় যে কী করে বোঝাই!”
মোহর বুঝতে পারছিল ওর আর এখানে থাকা ঠিক নয়। ও চুপচাপ উঠে চলে গিয়েছিল। তখন সন্ধে নামছিল কলকাতায়। আশপাশের এলোমেলো বাড়িঘরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা জ্যামিতিক আকাশের রং গাঢ় হচ্ছিল ক্রমশ। বড়রাস্তার গাড়ির আওয়াজের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল আশপাশ থেকে আসা শাঁখের আওয়াজ। বড় বাড়িটার বিভিন্ন অংশ থেকে ভেসে আসছিল অস্ফুট কথাবার্তা। তবু কিছুই যেন স্পর্শ করছিল না লালুকে! ও শুধু দেখছিল নিভে আসা দিনের আলোয় অঞ্জনা তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। বাদামি চোখের মণিতে কিসের এমন আলো! এই আলো ওর জন্য জ্বলতে পারে কোথাও! সত্যি! লালুর কেমন একটা লাগছিল। ভয়, আনন্দ আর মনখারাপ সব এক সঙ্গে ইয়ার ফোনের তারের মতো গিঁট পাকিয়ে গিয়েছিল মনে। কেউ ওকে সত্যি ভালবাসে!
লালু অল্পনার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল এবার। তার পর বলেছিল, “আমি আছি অঞ্জনা। বিশ্বাস করো একটু।”
অল্পনা বলেছিল, “আমার মেয়ে ছাড়া তো কেউ নেই।” লালু বলেছিল, “আমি আছি। তুমি কেঁদো না। বলো, কবে ডাক্তারের কাছে যাবে?”
“না, বলব না। কেন বলব?” জেদের গলায় বলেছিল অল্পনা।
“প্লিজ, অমন জেদ করে না!” লালু কাতর গলায় বলেছিল, “তুমি তো জানো ঝগড়াঝাঁটি বা এমন জেদ আমি ঠিক সামলাতে পারি না। তুমি প্লিজ বলো। কবে?”
অল্পনা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছেছিল। তার পর একটু সময় নিয়ে বলেছিল কবে ছুটিকে নিয়ে যাবে ডাক্তারের কাছে।
আজ সেই দিন। কী বলবে ডাক্তার? খারাপ কিছু কি? পেটের ভেতরটা কেমন যেন গুড়গুড় করছে লালুর। শরীর খারাপ ব্যাপারটা ঠিক নিতে পারে না ও। মন খারাপ লাগে, ভয় লাগে।
সে দিনের পর থেকেই ছুটির মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। হাসিখুশি একটা মেয়ে কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। আট-নয় বছর বয়স ওর। শরীরের ভালমন্দ বোঝার বয়স হয়েছে। তাই বুঝতে পারছে, ওর এমন কিছু একটা অসুখ হয়েছে যে, সেটা ওর মাকে নাড়িয়ে দিয়েছে একদম।
ছুটি একদিন তো বলেওছিল লালুকে, “লালুকা আমি কি মরে যাব?” লালু জোর করে হেসে বলেছিল, “দূর পাগলি! লোকে তো বুড়ো হলে মরে। এখন মরবি কেন?”
“তুমি কিছু জানো না। আমাদের পাশের গলিতে অমিয় বলে একটা ছেলে ছিল, সে তো মরে গেল অল্প বয়সে। ‘কাল হো না হো’ সিনেমায় শাহরুখ খানও তো মরে গেল। বুড়ো না হলেও লোকে মরে যায় গো লালুকা।”
ছুটির মাথায় আলতো করে হাত রেখে লালু বলেছিল, “খুব শখ, না? স্কুল না যাওয়ার ধান্দা খালি!”
ছুটি বলেছিল, “আমি মরে যেতে চাই না। কিন্তু যদি যাই! তুমি মাকে দেখবে তো! মা আমায় খুব ভালবাসে। আমি মরে গেলে মা পাগল হয়ে যাবে।”
মা পাগল হয়ে যাবে! লালুর সারা শরীর ঝনঝন করে উঠেছিল। ওর মা-ও এমন হয়ে গিয়েছিল না ওর ছোট ছোট ভাইবোন মারা যাওয়ার পর? এখনও চোখের সামনে মায়ের সেই অদ্ভুত ধীরে ধীরে নিভে যাওয়া মুখটা ভাসে। যেন ছোট্ট এক প্রতিমা! পুকুরের জলে ধীরে ধীরে ডুবে গেল!
লোকে বলত, লালুকে ওর বাপের মানে বাচ্চুর মতো দেখতে হয়েছে। মায়ের কিচ্ছু পায়নি ও। কিন্তু লালু জানে ও পেয়েছে, মায়ের মতো মন পেয়েছে ও।
ছুটি মারা গেলে অঞ্জনাও কি ওর মায়ের মতো হয়ে যাবে? অল্পনার মধ্যেও কি ওর মা আছে? তাই কি অঞ্জনার মধ্যে ভালবাসার সঙ্গে এমন মমত্ব ছলছল করে!
লালু বলেছিল, “আমি আছি ছুটি। তোর কিচ্ছু হবে না, দেখিস।”
বাড়িতে ফিরে ম্যাডামকে ওষুধগুলো দিয়ে লালু বলল, ওর কাজ আছে একটু। ম্যাডাম অনুমতি দিলে বেরোবে। এ-ও জিজ্ঞেস করল ম্যাডামের আর কিছু দরকার আছে কি না!
ম্যাডাম না বলে ওষুধ নিয়ে চলে গেল ঘরে। লালু বুঝল, ম্যাডামের শরীর সত্যিই খারাপ। এটা হলে ওর একটু সমস্যা হয়। উপরিটা বন্ধ হয়ে যায় কয়েক দিনের জন্য!
কিন্তু আজ আর সেটা নিয়ে ভাবল না লালু। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখল। এখান থেকে একটা বাসেই পৌঁছে যাবে। সময় লাগবে না বেশি।
এবার পা চালিয়ে নিজের ঘরে গেল লালু। তার পর চকোলেটের বাক্সটা থেকে দু’হাজার টাকা বের করল। আপাতত এটা দেবে অঞ্জনাকে। তার পর যখন যেমন পারবে, তখন তেমন দেবে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লালু আর দাঁড়াল না। সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নীচে নেমে গেল। দেখল, জিনিদের দরজা বন্ধ। এদিকটায় কেউ নেই। ও মেন গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
“এত হনহন করে যাচ্ছ কোথায়?”
গলাটা শুনে একটু থমকে গিয়ে পাশে তাকাল লালু। দেখল, বিন্দি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেয়েটা তো চট করে এদিকে আসে না সন্ধ্যার আগে। তা হলে এখন এখানে কী করছে?
“তুই?” লালু অবাক হল।
বিন্দি বলল, “ম্যাডাম শুয়ে আছে। উর্জাদিদি নেই। সাহেবও বাইরে। আমার কাজ নেই এখন। তাই একটু ঘুরছিলাম। তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
লালু বলল, “কাজ আছে একটু। হাজরা মোড়ে যাব। কেন?” “এমনি… আসলে মনটা ভাল নেই। মায়ের ফোন এসেছিল। ছোট বোনটার বিয়ের কথা হচ্ছে। কিন্তু অনেক টাকার দরকার। মা একবার যেতে বলছে। কিন্তু এখানে ছুটি পাব না। উর্জাদিদি না এলে হয়তো পেতাম। কিন্তু এখন আর দেবে না।”
বিন্দি উত্তরপ্রদেশের মেয়ে। এখানে আছে কয়েক বছর। তাই বাংলাটা এখন ভালই বলে। এই মেয়েটাও বেশ ভাল। কাজকর্মেও চটপটে। লালুর কাছে এসে আড্ডা মারে। ওর জন্য লুকিয়ে-চুরিয়ে ভাল ভাল খাবার নিয়ে আসে বড়-বাড়ি থেকে। বিন্দির সঙ্গে কথা বলার সময় ওকে মেয়ে বলে আলাদা করে মনে হয় না লালুর। ও এখন বোঝে সব সম্পর্কে ছেলে বা মেয়ের ভাগ হয় না। আসলে বন্ধুত্বের সম্পর্কে কোনও লিঙ্গভেদ নেই।
দিনের আলো কমে এসেছে চারিদিকে। ওদের বাগানে বেশ নরম করে ঝাপসা কাচ ঢাকা আলো লাগানো আছে। সেগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই আলোয় বিন্দির মুখটাকে কেমন বিষণ্ণ লাগছে। মেয়েটা তো এমন থাকে না! কী হল!
“ঠিক কী হয়েছে বল তো? আমার মনে হচ্ছে তুই কিছু লুকোচ্ছিস। কী হয়েছে রে?” লালু ভুরু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে।
বিন্দি বলল, “আসলে… একটা কথা… কাউকে বলতে পারি না। কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না!”
“কী?” লালু ভুরু কুঁচকে তাকাল বিন্দির দিকে। মেয়েটার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। এখনও তো সূর্য ডুবলে হাওয়ায় ঠান্ডার আমেজ লেগে থাকে। সেখানে এমন ঘাম হওয়ার তো কথা নয়! লালু বুঝল, মেয়েটা মনে মনে কোনও কিছু নিয়ে খুব অস্বস্তিতে আছে। কিন্তু কী নিয়ে!
বিন্দি ঠোঁট কামড়ে বলল, “বলব তোমায়। আমার আর কাউকে বলার নেই লালুদা। এত কষ্ট হয়! কিন্তু কিছু করার নেই। আচ্ছা তোমার তো এখন তাড়া আছে। তাই পরে বলব না হয়।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে যাই হোক এমন মন খারাপ করে থাকিস না! তুই এত হাসিখুশি মেয়ে! এমন করলে ভাল লাগে কারও?”
বিন্দি দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে জোর করে হাসল একটু। তার পর আস্তে আস্তে ওই আলোআঁধারি পেরিয়ে চলে গেল বড় বাড়ির দিকে!
লালু আর দাঁড়াল না। ব্যাপারটা পরে শুনবে। এখন অঞ্চনার কাছে যেতে হবে।
হাজরা মোড়ে খুব জ্যাম। কোনও গাড়ি এক ইঞ্চিও এগোচ্ছে না। সব যেন জমাট বেঁধে গিয়েছে! শুধু অস্থির গাড়ি চালকরা প্যাঁ-পু করে অনর্থক হর্ন বাজিয়ে আকাশ-বাতাস দূষিত করে তুলেছে!
বড্ড দেরি হয়ে যাবে এবার। তাই আর কোনও উপায় নেই দেখে, ফায়ার ব্রিগেডের কাছে নেমে পড়ল লালু। ডাক্তারের চেম্বারটা মোড়ের কাছে। এটুকু হেঁটেই যাবে। হাঁটতে হাঁটতে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইলটা বের করল। ফোনটা বুড়ো হয়েছে। গলার জোর কমে গিয়েছে। সামান্য ভিড় জায়গায় থাকলে আর রিং শোনা যায় না।
ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখল এবার। আরে, অঞ্জনা ফোন করেছিল সওয়া ছ’টার সময়। কেন? কী হল আবার? সাড়ে ছ’টায় তো দেখানোর কথা ছিল। তা হলে কি ক্যানসেল হয়ে গেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট!
কিন্তু আর ফোন না করে প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই দৌড় দিল লালু। দূরত্ব বেশি নয়। তবে ফুটপাথে লোকজন রয়েছে। তাদের কাটিয়ে এগোতে লাগল। যদিও পায়ের জন্য বিশেষ সুবিধে হল না কিছু।
জায়গায় পৌঁছে থমকে গেল লালু। ওকে আর চেম্বারে ঢুকতে হল না। দেখল, ফুটপাথের পাশে একটা ছোট্ট দোকানের সিঁড়িতে বসে আছে অঞ্জনা। মাথায় হাত। পাশে ছুটির হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মোহর।
মোহরের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, খুব খারাপ কিছু একটা হয়েছে। লালু গিয়ে দাঁড়াল সামনে। অঞ্জনা মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো ভেজা। লাল।
লালু জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, এ ভাবে এখানে বসে আছো? কী হয়েছে। ডাক্তার দেখাবে না!”
মোহর পাশ থেকে কোনও মতে বলল, “আগেই দেখে দিয়েছে। পেশেন্ট কম ছিল। তাই দিদি তোমায় ফোন করছিল!”
লালু এবার হাঁটু গেড়ে বসল অঞ্জনার সামনে। বুঝল, ওদের এ ভাবে দেখে লোকজন যেতে-আসতে তাকাচ্ছে। আশপাশে দু’-একজন দাঁড়িয়েও আছে, হয়তো কী হয়েছে সেটা শোনার আশায়!
কিন্তু এ সবে লালু পাত্তা দিল না। অঞ্জনার হাতে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, হয়েছে?”
অঞ্জনা তাকাল ওর দিকে। স্খলিত গলায় বলল, “আর হল না… আর না…”
“কী হল না অঞ্জনা?” লালু আবার জিজ্ঞেস করল।
অঞ্জনা এলোমেলো চোখে তাকিয়ে বলল, “আমাদের মতো বাড়িতে এমন রোগ কেউ দেয়! বলে মিনিমাম দশ-বারো লাখ টাকা লাগবে। দশ-বারো লাখ! তাও মিনিমাম! না হলে নাকি ছুটি বাঁচবে না!”
“কী!” লালু বিহ্বল হয়ে ফুটপাথেই বসে পড়ল এবার।
“এত টাকা! কোথা থেকে পাব আমি? কে দেবে আমায়? অঞ্জনা বলল, লালু তুমি… তুমি দেবে? দিতে পারবে? পারবে না জোগাড় করে দিতে?”
