৩. বিন্দি
ছোট্ট একটা আলোর লাঠি এসে পড়ছে বিছানার ওপর। আবছা অন্ধকার ঘরে, ওই দূরের ভেন্টিলেটর থেকে আলোর লাঠিটাকে যেন কোনও অদৃশ্য হাত ধরে রেখেছে। আর সেই আলোর রেখার মধ্যে ধুলোর কণারা কী সুন্দর পাক খাচ্ছে! ভেসে আছে। সোনার সূক্ষ্ম গুঁড়ো যেন! চারিদিকে এত ধুলো ভেসে থাকে সব সময়! বোঝা যায় না তো! মিহি ধুলোরা অনেকটা যেন মুখচোরা, শান্ত, ভদ্র মানুষের মতো। আছে, কিন্তু সে ভাবে জানান দেওয়ার ব্যাপার নেই।
বিন্দি হাতের পাতাটা তুলে আলোর বিমটার মাঝে ধরল। পুরনো দুটাকার কয়েনের মাপের একটা চাকতি হাতের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন ধরল। পুরনো দু’টাকার কয়েনের মাপের একটা চাকতি হাতের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন সোনার মোহর! মেমসাহেবের কাছে এমন সোনার মোহর দেখেছে বিন্দি। একটা তো লকেট করে গলাতেও পরে থাকে মেমসাহেব। মাঝে মাঝে পিঠে মাসাজ অয়েল লাগিয়ে মাসাজ করার সময় কয়েনটা হাতে নিয়ে দেখেছে ও। একজন অশ্বারোহীর ছবি একদিকে আর অন্য দিকে কী সব লেখা। মেমসাহেব হাসে। বলে, এটা নাকি টিপু সুলতানের সময়কার মোহর। কে টিপু সুলতান তা জানে না বিন্দি। কিন্তু নামটা শুনে কেমন একটা মনে হয় ওর। টিপু কোনও সুলতানের নাম হয় নাকি? ওদের গ্রামে একটা ছোট সিনেমাঘর আছে। তার মালিক রামধনের ছেলের নাম টিপু। ছেলেটা রোগা, একদম হাড়-জিরজিরে ৷ নাকটা এত বড় যে, নিজে এক পাড়ায় থাকলে নাকটা যেন সামনের পাড়ায় চলে যায়! আর মাথায় এত অল্প বয়সেই কী বিশাল টাক!
রামধনের শুধু সিনেমা হল নয়, সঙ্গে একটা বড় মিঠাইয়ের দোকান আছে। আর আছে কানপুরে লেবার সাপ্লাইয়ের বিজ়নেস! অনেক টাকার মালিক লোকটা। টিপুর একটা বউ ছিল। কিন্তু বাচ্চা হতে গিয়ে গতবছর মারা গিয়েছে। সত্যি কি না কে জানে! ওদের গ্রামে কে যে কেন মারা যায় সেটা ঠিক করে বলা মুশকিল ।
বিন্দিরা কানপুরের মানুষ। কিন্তু মূল শহরে ওদের যেটুকু যা ছিল, সব বেচে দিয়ে ওরা দীর্ঘদিন হল উত্তরপ্রদেশেরই একটা ছোট্ট সেনসাস টাউন, চাকেরিতে চলে এসেছে।
চাকেরি অনেকটা মফস্সলের মতো একটা জায়গা। ওর মা এখানে একটা হাসপাতালে আয়ার কাজ করত। তার পর এখন আর সে ভাবে কিছু করে না। ওই টুকটাক বাঁধনি আর সেলাইয়ের কাজ করে মাত্র ৷ তার সঙ্গে যে সামান্য জমিজমা আছে, সেখান থেকে অল্প-স্বল্প আয় হয়। এ ছাড়া ওদের বাকিটা নির্ভর করে বিন্দির রোজগারের ওপর।
তা, মেমসাহেবের এখানে কাজ করে বিন্দি মাসে ন’হাজার টাকা করে পায়। সঙ্গে থাকা-খাওয়া জামাকাপড়, সাবান-শ্যাম্পু সব ফ্রি। তাই নিজে হাজার টাকা রেখে বাকিটা পাঠিয়ে দেয় গ্রামে।
মানিঅর্ডার করে না বা ব্যাঙ্কের মাধ্যমে পাঠায় না। টাকাটা পাঠিয়ে দেয় মাধু।
খটখট করে দরজায় কে যেন শব্দ করল। কে এল এখন! বিন্দি বিছানায় উঠে বসে পাশ থেকে টেনে নিল কুর্তিটা। ব্রেসিয়ার পড়ে আছে পাশে। কিন্তু এখন পরার সময় নেই। ও দ্রুত কুর্তিটা মাথা দিয়ে গলিয়ে নিল। রক্ষে একটাই যে, কুর্তিটা বেশ লম্বা। নীচে কিছু না পরলেও হবে।
সিফনের ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে দরজার কাছে গেল বিন্দি। তার পর সামান্য গলা তুলে বলল, “কে?”
“মাধু আছে?” একজন বয়স্ক মহিলার গলার আওয়াজ।
যাক, বুড়িদি এসেছে। মাধুর ঘরের মালকিন।
“দাঁড়াও বুড়িদি,” বিন্দি বড় পেতলের ছিটকিনি টেনে দরজাটা খুলে দিল।
আবছায়া ঘরটা যেন আলোয় ধুইয়ে গেল নিমেষে। বুড়িদির বয়স ষাটের কোঠায়। বেশ লম্বা। সারাক্ষণ পান খায় বলে ঠোঁট আর জিভ লাল। দাঁতগুলো তরমুজের বীজের মতো। কথা বললেই জর্দার গন্ধ ওড়ে হাওয়ায়। এখনও সেই গন্ধটা পেল বিন্দি।
বুড়িদি বলল, “অ, তুই আজ এসেছিস! বেশ কিছুদিন পরে এলি এবার! তা এত কম এলে মাধুর চলবে? কার না কার কাছে যাতায়াত শুরু করবে তার ঠিক আছে?”
“উফ, তুমি না!” বিন্দি ভুরু কোঁচকালেও হেসে ফেলল।
বুড়িদি নিজের পাটকিলে রঙের চুলে হাত বুলিয়ে হেসে বলল, “আহা, ভুল বললাম নাকি! এখানে আসিস কেন জানি না? ঘর বন্ধ করে কী করিস জানি না? ও পারে ঠিক মতো? ওই তো বিশাল ভুঁড়ি!” বিন্দি কী বলবে বুঝতে পারল না। বুড়িদির বয়স হলেও এখনও মুখ অল্পবয়সিদের মতো আলগা । যা খুশি বলে। তাও বলল, “তুমি না!”
বুড়িদি আরও চওড়া করে হাসল। বলল, “মাগি দেখ! ও সব করার সময় তো লজ্জা লাগে না । তখন তো খুব রস! আর আমি বললেই দোষ! আমি বলে আমার ঘরে এ সব করতে দিই। অন্য কেউ হলে কবে মাধুকে বের করে দিত! দেশে বউ-বাচ্চা রেখে এখানে অন্য মাগিকে সোহাগ মারাচ্ছে! আর আমি একটু…”
“তুমি কী বলবে বলো!” বিন্দি বুড়িদিকে কথা শেষ করতে দিল না।
বুড়িদি বলল, “আরে, মাধুর কী একটা পার্সেল এসেছে। দোকানে থাকে সারা দিন তাই আমার ঠিকানায় দিয়ে যায়! সেটাই দিতে এলাম। আজ তুই আসবি বলে তো দোকান বন্ধ রেখেছে। তাই ভাবলাম এখন দিয়ে আসি।”
বিন্দি দেখল বুড়িদির হাতে একটা বাক্স। তাতে স্টিকার লাগানো। ও বাক্সটা নিয়ে নিল।
বুড়িদি বলল, “মাধু কই?”
“দোকানে গিয়েছে। খাবার আনতে।”
“ও!” বুড়িদি হাসল, “তুই এলেই ছুটি ওর! না হলে তো সারাক্ষণ ওই পানের দোকান নিয়ে পড়ে থাকে। কলকাতা বলে এ সব নিয়ে কেউ মাথায় ঘামায় না। কিন্তু এই যে তোরা এ সব করিস, বাইরে হলে কিন্তু মার খেতিস।”
বিন্দি হাসল। সেটা ও জানে। মাধুর সঙ্গে ওর এই সম্পর্কটা আইনি নয়। কিন্তু মাধু সেটা মানে না ৷ বলে, “আমি তোমায় ভালবাসি। ভালবাসা সব আইনের ওপরে। গ্রামে আমাদের বিয়ে হত না । জাতে তোমরা নিচু বলে। সেরকম হলে কে জানে তোমায় হয়তো মেরেও ফেলত! তাই তো বাধ্য হয়ে বাবার দেখে দেওয়া মেয়েকে বিয়ে করতে হল। জানো বিন্দি, বিয়ের দিন কী কেঁদেছিলাম আমি! এখনও কান্না পায়। তোমায় ছেড়ে থাকতে আমার যে কী কষ্ট হয়! বউয়ের বাচ্চা চাই বলে বাচ্চা দিয়েছি। তার পর একদিনও ছুঁয়ে দেখিনি। দ্যাখো তো চাকেরিতেও যাই না সেরকম। তুমি ছাড়া আমি আর কাউকে ভালবাসি না বিন্দি।”
কথাগুলো কতবার যে বলেছে মাধু! বলার সময় মুখ কেমন যেন লাল হয়ে ওঠে। কপালে ঘাম জমে ওঠে। চোখ ছলছল করে। বিন্দি বোঝে মাধু সত্যি বলছে। অনেক সময়ই দেখে, মাধুর মোটা শরীরটা কথা বলতে বলতে কাঁপে, তার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে বিন্দির কোলে!
মাথায় বড় টাক আছে মাধুর। যখন ওর কোলের ওপর মুখ গুঁজে বাচ্চাদের মতো কাঁদে, তখন বিন্দি ওর টাকে হাত দেয়। কেমন তেলতেলে । নতুন চামড়ার বলের মতো। ঘামে সামান্য ভেজা। ও দেখে, মাধু কাঁদছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বিন্দির কিছুই মনে হয় না! ফিলিং-টিলিং বলে যাকে, সে সব কিছু হয় না। বরং আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে, একটা মানুষ কেমন অদ্ভুত দুটো জীবন নিয়ে বেঁচে আছে!
কিন্তু ছাড়ার কথাও ভাবে না। বিন্দিকে প্রাণের চেয়ে, সত্যি করে ভালবাসে বলে দাবি করে, কিন্তু এমন করে নিজের ঘরের আবছায়ায় লুকিয়ে দেখা করে! মানুষের সত্যিকারের জীবনটা কি তা হলে এমনই লজ্জার যে, সেটা সবার সামনে মেলে ধরা যায় না!
বৌকে ভালবাসে না বলে মাধু। কান্না-ভেজা মুখ তুলে তার পর মাধু জড়িয়ে ধরে ওকে। গোগ্রাসে চুমু খায়। বিন্দির মুখের মধ্যে জিভ ভরে কী যেন খুঁজতে থাকে। দু’হাত দিয়ে পিষে ফেলতে চায় বিন্দিকে। নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে চায় যেন! বিন্দিও পরে একটা সময় সাড়া দেয়! কিন্তু তাও ও বোঝে, ওর মধ্যেকার আসল যে বিন্দি, সে যেন ওর শরীর থেকে বেরিয়ে, এই ক্রীড়া থেকে দূরে বসে থাকে আনমনে। সে ভাবে যেন কিছু অনুভবই করে না ও। শুধু যেন সহযোগিতা করে। যে ওকে খুব ভালবাসে বলে দাবি করে, তার সঙ্গে সহযোগিতা করে মাত্র!
আজও তাই হয়েছে। মাধু ওর ওপর হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করার সময় বিন্দি কেবল সহযোগিতা করেছে। কেউ ওকে ভালবাসলে ও তাকে ভালবাসতে দিয়েছে মাত্র!
বিন্দির মাঝে মাঝে মনে হয়, ও কি মাধুকে ঠকাচ্ছে? মানে সে ভাবে, কোনও ফিলিং না থাকলেও ফিলিং আছে দেখানোটা কি ঠকানো নয়? এই জোচ্চুরির হয়তো সামাজিক কোনও ন্যায়-অন্যায় ভাগ নেই, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে কি বিন্দি অন্যায় করছে না! এই জন্যই কি বোন বলত, “দিদি, তুই একটা মিথ্যুক! তোর একটুও বিবেক বলে কিছু নেই? কীরকম মেয়ে তুই?”
বোনের কথা মনে পড়ায় বিন্দি হেসে ফেলল। এই বিবেক ব্যাপারটা এখন সেই প্রায় হারিয়ে যাওয়া অভিনেতার মতো হয়ে গিয়েছে! আর এমন অন্যায় বা জোচ্চুরি তো সবাই সর্বত্র করছে শুধুমাত্র বেঁচে থাকবে বলে।
“তুই হাসলি কেন?” বুড়িদি সামান্য ঠেলা দিল বিন্দিকে, “কাজের বাড়িতে কী বলে আসিস এখানে?”
বিন্দি বলল, “বলি দেশের একজন দাদা আছে তার কাছে মাইনের টাকা দিতে যাচ্ছি। মেমসাহেব আপত্তি করে না।”
“দাদা!” বুড়িদি হাসল, “সেই আলিপুর থেকে এই গিরিশ পার্ক! দম আছে তোর!”
মাইনেটা মাকে পৌঁছোনো জরুরি। গ্রামে মাধুর এক বন্ধু আছে, সে মাসের চার তারিখের মধ্যে টাকা দিয়ে আসে মাকে। এই বন্ধুটিই একমাত্র জানে ওদের ব্যাপারে। কিন্তু বিশ্বাসী ছেলে। কাউকে বলে না।
বিন্দি যে সব সময় চার তারিখের মধ্যে টাকা দিতে পারে মাধুকে তা নয়, কিন্তু মাধু ও সবের অপেক্ষা করে না। নিজেই দিয়ে দেয়। এই বারই তো দু’মাস পরে এল। কিন্তু মাধু ঠিক দিয়ে গিয়েছে টাকা। আর ফোনে কথা বলার সময় সেই নিয়ে একটা কথাও বলেনি ও। মাধুর প্রতি তাই প্রেম অনুভব না করলেও কৃতজ্ঞতাটা আছে ওর। আর যেহেতু বিন্দির জীবনে কেউ নেই, তাই মাধুকে জায়গা দিতে ওর অসুবিধে হয় না। কিন্তু বিন্দির জীবনে যদি কেউ আসে? তখন?
মাধু বলে, “যেদিন তুমি বিয়ে করবে সেদিন আমি চক্ররেলে গলা দেব!”
বিন্দি হাসে। বলে, “ও, তুমি যে বৌ-বাচ্চা সব নিয়ে আছো! আমার একটা বর, দু’-তিনটে বাচ্চার শখ থাকতে পারে না? খুব স্বার্থপর তো তুমি!”
মাধু কী বলবে বুঝতে পারে না। কিছুক্ষণ ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আবার কাঁদতে শুরু করে। এমন ছিঁচকাঁদুনে লোক কোনও দিন দেখেনি বিন্দি।
মাধু ওর কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি চক্ররেলে গলা দেব। একদম শিওর দেব, দেখো!”
বিন্দির হাসি পায়। ওর বলতে ইচ্ছে করে, ‘তোমার দোকানের পাশেই তো মেট্রোরেল চলে। সেখানে দাও না কেন?’ কিন্তু বলে না। তা হলে মাকে একদম সময় মতো ঘরে গিয়ে টাকাটা পৌঁছে দেবে কে? এই শহরে দায়ে দফায় ওকে সাহায্য করবে কে? অন্যের ফিলিংটা সে ভাবে অনুভব করতে না পারলেও নিজের স্বার্থটা ভালই অনুভব করতে পারে বিন্দি।
“যাক গে, এটা দিয়ে দিস,” বুড়িদি ওর হাতে পার্সেলটা ধরিয়ে দিল। তার পর ঘরের মধ্যে মাটিতে পাতা বিছানা দেখিয়ে বলল, “মাধুকে একটা খাট কিনতে বলতে পারিস না? নাকি ওতে বেশি আওয়াজ হয়!”
“ধ্যাত,” হাসল বিন্দি, “কিছু আটকায় না তোমার মুখে।”
“তোরা ও সব করলে অসুবিধে নেই আর আমি বললেই দোষ! না! ঠিক আছে আমি গেলাম। দরজা বন্ধ করে দে।”
বুড়িদি হেসে চলে গেল।
বিন্দি দরজা বন্ধ করে দিল। হাতের পার্সেলটা হালকা বেশ। কী আছে এতে? ও জানে, খুলে দেখলেও মাধু কিছু মনে করবে না। কিন্তু ও খুলল না বাক্সটা। ছুড়ে বিছানার এক পাশে রেখে দিল।
ওড়নাটাও খুলে রাখল একটা ট্রাঙ্কের ওপর। তার পর বসল বিছানায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল চারিদিকটা। নিজেরই অবাক লাগল। সেই মাধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় থেকে এতটা দিন কী ভাবে যে কেটে গেল! ও কোনও দিন ভেবেছিল, কলকাতায় কোনও বাড়িতে ওকে কাজ করতে আসতে হবে? ভেবেছিল, মাধুর সঙ্গে এখানে এ ভাবে দেখা হয়ে যাবে!
বিন্দি ক্লাস নাইনের পরে স্কুল ছেড়ে দিলেও বোনের পড়াটা বন্ধ হতে দেয়নি। পড়া ছেড়ে ও বাঁধনি আর সেলাইয়ের কাজ করত মায়ের সঙ্গে। এখনও ম আছে সেই সতেরো বছর বয়সে একদিন কাপড়ের গাঁটরি নিয়ে মহাজনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে দেখা হয়েছিল মাধুর সঙ্গে।
ট্রেকারে কী ভিড় ছিল সে দিন! মনে হচ্ছিল মৌচাক যেন ছেঁকে ধরেছে মৌমাছিরা! ট্রেকারটায় উঠতেই পারেনি।
নিজের বড় কাপড়ের গাঁটরি নিয়ে খুব বিপদে পড়েছিল ও! এদিকে বিকেল শেষ হয়ে আসছিল। ট্রেকারটা যেমন ধুঁকতে ধুঁকতে এসেছিল, তেমনই কিছু লোক নামিয়ে, তার চেয়েও বেশি লোক তুলে, ধুঁকতে ধুঁকতে চলে গিয়েছিল। আর দীর্ঘ হাইওয়ের পাশে কমলা রঙের বিকেলে, গরম বালির মতো হাওয়ার তলায় দাঁড়িয়ে বিন্দি ভাবছিল আঠারো কিলোমিটার দূরের চাকেরিতে ও ফিরবে কেমন করে!
ঠিক তখনই আগুনের শিখার ওপরে গরম ভাপের মতো কাঁপতে থাকা হাইওয়ের শেষপ্রান্তে দেখা দিয়েছিল একটা ছোট্ট ম্যাটাডোর!
ম্যাটাডোরটা এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। ছোট্ট গাড়িটার পেছনে পাঁঠা বোঝাই করা। আর সাম স্টিয়ারিং-এ বসেছিল মাধু। মোটা ফরসা একটা ছেলে। মাথায় অল্প চুল। গালে অল্প অল্প দাড়ি। আর চোখ দুটোয় যেন অপার একটা সারল্য!
ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “যাবেন? কত দূর?”
কত দূর একজন মানুষ অন্যজনের সঙ্গে যায়? প্রথম দেখা হওয়ার সময় কেউ কি তা বুঝতে পারে? বিন্দিও বুঝতে পারেনি।
সেই ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের মাধু আজ আটত্রিশ! সামান্য যা চুল ছিল মাথায়, সেটাও আর নেই। এর মধ্যে কত পাল্টে গিয়েছে ওদের জীবন । উত্তরপ্রদেশের চাকেরি থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা! বিন্দিও পালটে গিয়েছে অনেক! কোনও দিন ভাবতে পেরেছিল, ওকে কারও বাড়িতে কাজ করে খেতে হবে? শুনেছে, ওর ঠাকুরদা সরকারি চাকরি করত। মায়ের বাবা পড়াত কোনও একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু সেই বাড়ির মেয়ে এখন কারও বাড়ির কাজের মেয়ে! না, কাজের মেয়েদের প্রকাশ্যে অসম্মান করে না ও বাড়ির কেউ। কিন্তু তলায় তলায়? সেখানে কি খুব কিছু সম্মান দেয়! কিন্তু কিছু করার নেই ওর। দাদা বেঁচে থাকার সময় সর্বস্ব খুইয়েছিল ব্যবসা করবে বলে। তার পর থেকে ও আর মা যে কী করে বেঁচে ছিল! ছিল? আর এখন নেই? হ্যাঁ, এখন মাস গেলে একটা নিশ্চিত টাকা পায় ও। মা-বোনকে দিতে পারে। কিন্তু তার পর? ওর নিজের জীবন? নিজের মনের দিক থেকে কি ভাল আছে ও? কত সুন্দর সেলাই করতে পারত বিন্দি! ভেবেছিল টেলারিংয়ের একটা দোকান দেবে। বা ছোট্ট একটা কারখানা খুলবে। সেখানে হাতের কাজের জিনিস বিক্রি করবে। ওদের চাকেরিতে বিনোদ মিশ্র আছেন। ওকে কতবার বলেছে, “বিন্দি, তুই ঠিক পারবি। ব্যাঙ্কের লোন তুলে মাল কেন। কুর্তা, ব্লাউজ়, ব্যাগ, টেবিল ক্লথ, ওয়াল হ্যাংগিং, জামা তৈরি কর। আমি লটে মাল তুলব। কোনও অসুবিধে হবে না!”
কিন্তু লোন কে দেবে? ওরকম মনে হয় যে, লোন পাওয়া যাবে। সিনেমাতেও দেখায়। কিন্তু বাস্তবে সে সব কিছু হয় না। তাই কিছু করতে পারেনি। কিন্তু কিছু টাকা যদি পেত, তা হলে এখানকার কাজ চাকেরি ফিরে গিয়ে, ও একটা লেডিস টেলারিংয়ের দোকান অন্তত দিত।
বাবার এক বন্ধু আছে। জামিল চাচা। কানপুরে তার কত দোকানঘর! সব ভাড়া দেয়। জামিল চাচা বলেছে, ওকেও ভাড়া দেবে। কোনও সেলামি দিতে হবে না। কিন্তু মূলধন? দোকান সাজানোর টাকা? তিন-চার লাখের ধাক্কা। বেশিও হতে পারে। কে দেবে ওকে অত টাকা! বিন্দি বুঝতে পারছে ঝি-গিরি করেই বাকি জীবনটা কেটে যাবে ওর। আর এ-ও বুঝতে পারছে, মনখারাপ করাটা একটা বিলাসিতা। টাকা না থাকলে সেটা করা যায় না।
দরজায় খটখট করে শব্দ হল। নিশ্চয়ই মাধু এসেছে। পিতলের ছিটকিনিটা খুলে দিল বিন্দি। হ্যাঁ মাধু। কলকাতায় গরম পড়েনি এখনও। কিন্তু তাও মাধু ঘেমেনেয়ে একশা হয়ে গিয়েছে। এই ক’বছরে মাধু আরও মোটা হয়েছে। সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করে। ঘুমিয়ে পড়লে বিকট শব্দে নাক ডাকে। মাঝে মাঝে বসে থাকা অবস্থায় শ্বাস নিলেও নাক ডাকে! এমন কোনও দিন দেখেনি বিন্দি! এই লোকটা ওকে পাগলের মতো ভালবাসে! আর ও? বোনের মুখটা আবার মনে পড়ল বিন্দির।
ঘরে ঢুকে হাঁপাল মাধু। হাতে একটা সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ। সেটার গায়ে লাল কালি দিয়ে একটা রেস্তরাঁর নাম ছাপানো। কড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। এই দুপুরে বিরিয়ানি! আসলে মাধু বিরিয়ানি খেতে ভালবাসে খুব। তাই খাবারটা যতটা না বিন্দির জন্য আনে, তার চেয়ে বেশি আনে ওর নিজের জন্য। আসলে বিন্দি এলেই মাধুর জীবনটা পাল্টে যায়। এমনিতে ছাতু, আচার, হাত-রুটি, পেঁয়াজ লঙ্কা, ডাল-ই ওর রোজকার খাবার। এ ভাবে নাকি টাকা বাঁচায় মাধু। কিন্তু বিন্দি এলেই রাজ্যের খাবার কিনে আনবে!
মাধুর হাত থেকে খাবারের প্লাস্টিকটা নিল বিন্দি। বলল, “বাব্বা! বেশ ভারী যে! আবার এত কিছু এনেছ!”
মাধু হাসল। হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিতে নিতে বলল, “ওই একটু… তুমি আর ক’দিন আসো বলো! আমাকে তো একদম দূরে দূরে রাখো। একই শহরে থাকি, তাও দেখা করো না। যখন-ত ফোন করাও বারণ। সাধারণত তুমি যোগাযোগ করলে তবেই যোগাযোগ হয়।”
বিন্দি জানে এ সব সত্যি। কিন্তু ও তো মাধুর জন্য মরে যাচ্ছে না, তাই গায়ে পড়তে দেয় না। বিন্দি জানে, এমন ভ্যাদভ্যাদে প্রেমে পড়া লোকদের কী ভাবে দূরে রাখতে হয়!
ও বলল, “ঠিক আছে, যোগাযোগ রেখো না। আমি আর আসব না।” “আরে আরে, তাই বললাম নাকি!” মাধু ঘাবড়ে গেল। তার পর আচমকা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বিন্দির সামনে। হাতজোড় করে বলল, “এমন কোরো না বিন্দি। আমি মরে যাব। মাইরি বলছি, সুইসাইড করে নেব। চক্ররেলে গলা দেব, দেখো!”
বিন্দির হাসি পেল খুব। কিন্তু এখন হাসলেই খেলা পাল্টে যাবে। ও একই ভাবে বিরক্ত গলায় বলল, “না, এত যখন তোমার অভিযোগ, তখন আমি আর আসব না! আমার অসুবিধেটা যে বোঝে না, সে আমায় ভালবাসে না একটুও।”
“আমি… আমি বুঝি তো… তাই তো ফোন করি না নিজে থেকে খুব একটা। কিন্তু আমারও তো মনখারাপ হয়… তাই বলে ফেলেছি। মাইরি আর কিছু নয়। তুমি না এলে আমি মরে যাব!” মাধু হাঁটু ছেঁচড়ে এগিয়ে এল।
বিন্দি পিছিয়ে গেল। বলল, “মেমসাহেব কী কড়া জানো? তার ওপর মেয়ে এসেছে বিদেশ থেকে। এখন কত কাজ! তাও একটা দিন ছুটি নিয়ে এসেছি কেন? কার জন্য? কাকে ভালবাসি বলে আমি এখানে এসে এ ভাবে শুয়ে…”
মাধু এবার বসে পড়ল মাটিতে। ওই যে ভালবাসে বলেছে, তাতেই যে মাধু কাত, সেটা বুঝতে পারল বিন্দি। মনের মধ্যে যেন দেখল, বোন বসে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখ দিয়ে বলছে, তুই মিথ্যুক!
কোনওরকম শরীর খারাপ হয়নি বিন্দির। ও শুধু একটা সুযোগ নিয়েছিল এই ইমোশনাল অবস্থার। যদি টাকাটা না দিতে হয়। দেখল, মাধু বেমালুম গিলে নিল টোপটা। মনে মনে হাসল বিন্দি।
মাধু বলল, “আমায় দশটা জুতো মারো। কিন্তু আমায় ছেড়ে দিয়ো না। আমি মরে যাব!”
“ঠিক আছে। ওঠো,” বিন্দি বুঝল আর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। এই ডোজ়টাই একটু কড়া হয়ে গিয়েছে।
মাধু পাশের ট্রাঙ্কে ভর দিয়ে উঠল। ট্রাঙ্কটা মড়মড় করে শব্দ করল।
বিন্দি খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ঘরের কোণের বাসন রাখার জায়গার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “ভালবাসা না বুঝলে আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ রেখো না।”
“বিন্দি বিন্দি!” বলতে বলতে এসে মাধু এবার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল ওকে। বলল, “আমায় মাফ করে দাও। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আর কোনও দিন বলব না!”
বিন্দির কী যে হাসি পেল! আরে বাবা, মাধু বলেছেটা কী! কিছুই তো বলেনি! শুধু সামান্য অনুযোগ করছিল, কেন বিন্দি ওর সঙ্গে মসৃণ ভাবে যোগাযোগ রাখতে দেয় না। কিন্তু তাতেই হাঁদাটাকে এমন দিয়েছে!
প্রেম একটা বেজায় ভুলভাল জিনিস। মানুষকে ভিখিরি বানিয়ে ছাড়ে! তার মনের সমস্ত গার্ড নামিয়ে দেয়। কেমন ছেঁড়া ন্যাতার মতো করে দেয়। বিন্দি তাই মানুষকে ব্যবহার করায় বিশ্বাস করে। তাতে ওকে যে যা খুশি ভাবতে পারে। নিজের স্বার্থের জন্য ও যে-কোনও কাজ করতে পারে। যাকে-তাকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে পারে। জীবন ওকে এমনটাই হতে শিখিয়েছে।
মাধু ওকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল, “দু’মাস পরে দেখছি তোমায়। তোমায় না দেখলে আমার মাথার মধ্যে কী যে কষ্ট হয়! পাগল পাগল লাগে।”
“আর আমার কষ্ট হয় না?” বিন্দি যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করে বলল কথাগুলো, “জানো, আমি কত অসুস্থ ছিলাম! তোমায় বলিনি তুমি চিন্তা করবে বলে। তার জন্য এত টাকা খরচ হল। সব আমায় খরচ করতে হয়েছে। মেমসাহেব কিছু দেয়নি। তুমি মায়ের কাছে নিজের থেকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছ। আমার যে কী খারাপ লেগেছে! লালু বলে একটা ছেলে আছে, তার থেকে ধার করে এই দু’মাসের ষোলো হাজার টাকা নিয়ে এসেছি আমি। তোমার কাছে আমি ধার রাখতে চাই না।”
“শরীর খারাপ? তোমার? আগে বলোনি তো!” মাধু যেন কুয়োয় পড়ে গেল, “সব টাকা তোমাকে দিতে হয়েছে! আমি কি মরে গিয়েছি? আর তোমার মা কি আমার কেউ নয়! কিচ্ছু ষোলো হাজার টাকা দিতে হবে না আমায়। আমার ধান্দা খারাপ চলে না। আর লালু ভুলু কারও কাছ থেকে টাকা ধার করবে না। কোনও ছেলের থেকে টাকা ধার করবে না বলে দিলাম!”
“আরে পাগল,” বিন্দি ঘুরে মাধুর মুখোমুখি হল, “লালু আমার দাদার মতো। কিন্তু ষোলো হাজার টাকা ধার তোমার কাছে আমি রাখব না।”
“ধার? কিসের ধার বিন্দি?” মাধুর চোখে আবার জল এল, “আমার যা, তা কি তোমার নয়? আমি জানি তোমার টেলারিং-এর দোকান দেওয়ার ইচ্ছে। আর চার বছর টাইম দাও, আমিই সেই টাকা জমিয়ে ফেলব। শালা বউ বাচ্চা ঘাড়ে না থাকলে আমি এখনই দিয়ে দিতে পারতাম। শালা লাইফ এমন পেছনে দিল আমার!”
কোনওরকম শরীর খারাপ হয়নি বিন্দির। ও শুধু একটা সুযোগ নিয়েছিল এই ইমোশনাল অবস্থার। যদি টাকাটা না দিতে হয়। দেখল, মাধু বেমালুম গিলে নিল টোপটা।
শালা প্রেম! মনে মনে হাসল বিন্দি। বোন বলত, “তুই শুধু মিথ্যুক নোস। একটা ক্রিমিনালও বসে আছে তোর মধ্যে! আমাদের সমাজে শারীরিক আর আর্থিক ক্ষতি করলে তার বিচার হয়। কিন্তু কত মানুষ যে অন্যদের ইমোশন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাদের জীবন শেষ করে দিল, তার বিচার হয় না!”
বোন পড়াশোনা করে খুব দিগ্গজ হয়েছে! বিন্দি শুধু জানে এই পৃথিবীটা খাদ্য-খাদকের সম্পর্কে বেঁচে আছে! এখানে খাদ্য হওয়ার চেয়ে খাদক হওয়াটা দরকার। আর তার জন্য যা যা অস্ত্র প্রয়োগ করতে হয়, সেটা করতে বিন্দি রাজি আছে।
“কিন্তু টাকাটা…” বিন্দি আর-একবার কথাটা তুলে কনফার্ম হতে চাইল। “আরে গোলি মারো টাকাকে!” মাধু উতলা হয়ে বলল, “তোমার শরীর খারাপ? কী হয়েছিল? আজ তা হলে সেক্স না করলেই পারতে! আমি তো জানি না। জানলে আমি… আমি মাফ চাইছি বিন্দি। তুমি বোসো, আমি খাবার বাড়ছি। বোসো তুমি।”
কথাটা বলে বিন্দির হাত থেকে খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে নিল মাধু। বিন্দির হাসি পেল খুব। কিন্তু ও কিছু বলল না। বরং বসল বিছানায়।
দেখল, মাধু নিজেই প্যাকেট খুলে খাবার পরিবেশন করতে শুরু করেছে। করুক। ওই বাড়িতে খেটে খেটে জান কয়লা হয়ে যায়। মেমসাহেবের তো ফিরিস্তির অন্ত নেই! তার সঙ্গে এখন উর্জা এসে জুটেছে। এরা টাকা দেয় বলে খাটায় খুব।
বিন্দি বলল, “বুড়িদি এসেছিল। কী একটা পার্সেল এসেছে তোমার। ওই যে রেখেছি।”
“পার্সেল?” মাধু ঘুরে তাকাল বিন্দির দিকে। বিন্দি দেখল, মাধু যেন সামান্য ঘাবড়ে গিয়েছে!
“হ্যাঁ ওই যে,” বিন্দি আবার দেখাল হাত দিয়ে। তার পর জিজ্ঞেস করল, “কী এসেছে?”
মাধু আরও ঘাবড়ে গেল যেন। বলল, “না না কিছু না। ওই ইয়ে আর কী!”
বিন্দি ভুরু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে। তার পর চট করে উঠে গিয়ে প্যাকেটটা নিল হাতে। দেখল, মাধুর ফর্সা মুখ রক্তশূন্য হয়ে যেন আরও ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে!
বিন্দি চট করে প্যাকেটটা খুলে ফেলল। তার পর ভেতর থেকে বের করল একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। আরে, এটা তো একটা ব্রেসিয়ার!
দ্রুত মেরুন রঙের ব্রেসিয়ারটার ভাঁজ খুলে দু’হাত দিয়ে মেলে ধরল বিন্দি। বেশ বড় জামাটা। লেসের কাজ করা। ট্যাগটা হাতে নিয়ে দাম দেখল। বাহ্, বেশ দামি তো!
“কার এটা?” বিন্দি সোজা তাকাল মাধুর দিকে, “এটা তো আমার সাইজ় নয়!”
মাধু বোকার মতো হাসল। তার পর কোনও মতে বলল, “কমলা।”
মানে ওর স্ত্রী। বউয়ের জন্য এ সব কেনা হচ্ছে! মাধু কি হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে? সেটা তো হতে দেওয়া যায় না! বিন্দি জানে এখানে ওকে কী করতে হবে।
ও চোয়াল শক্ত করে বলল, “এ সব কিনে দিচ্ছ? এদিকে আমায় বলো বউকে টাচ করো না। আর এ সব… বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে…” “কী ঠিক আছে?” মাধু আতান্তরে পড়ল।
বিন্দি জামাটা হাত থেকে ফেলে নিজের ব্রেসিয়ারটা তুলল। তার পর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি চলে যাচ্ছি।”
“এ মা, কেন!” মাধু ঘাবড়ে গেল খুব। তার পর বলল, “আরে, কমলা ঘ্যানঘ্যান করে যে, ওর ভেতরে পরার জামা নেই। তাই এটা নিজেই পাঠিয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপে কিনতে চাই বলে। আমি ঝামেলা না করে কিনে দিয়েছি। কিছু তো করি না ওর জন্য! কিছু দিই না। তাই… মানে… তুমি একটু বোঝো, প্লিজ।”
“ছেলেরা এরকম দু’মুখোই হয়। আমারই ভুল হয়েছে। আর আমি কোনও দিন আসব না তোমার কাছে! শোয়ার বেলা আমার সঙ্গে। কিন্তু এ সব কিনে দেওয়ার বেলায়…” বিন্দি কথা শেষ না করে দুপদাপ শব্দ করে ঘরের অন্য দিকে গেল জামা পাল্টাবে বলে।
“এমন কোরো না বিন্দি… আমি মরে যাব… মা কসম মরে যাব তুমি ছাড়া…” মাধু কী করবে বুঝতে না পেরে সোজা গিয়ে বিন্দির পা দুটো জড়িয়ে ধরল।
বিন্দি দাঁড়িয়ে পড়ে দেখল, মাধু ওর থাইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে দিয়ে কত কী বলে চলেছে ওর রাগ ভাঙানোর জন্য।
বিন্দির হাসি পেল। লোকটা একদম গাধা। বা হয়তো লোকে আকণ্ঠ প্রেমে পড়লে এমন গাধা হয়ে যায়! কোনও মানুষ কি সত্যি কোনও মানুষের হতে পারে? বিন্দির মতে, পারে না। তা হলে যে তার নয় তাকে নিজের করে রাখার জন্য এত আকুতি কিসের? কী ভাবে কেউ মনে করে যে, অন্য একজন সম্পূর্ণ তার হয়ে থাকবে? একটা ভুল অধিকার বোধ। ভুল হারিয়ে ফেলার ভয়। আরে বাবা, যা তোর নয় তা তুই হারাবি কেমন করে?
কিন্তু হয়তো এই অধিকার বোধটাই প্রেমের চালিকাশক্তি। এই বোধের ওপরেই মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সম্পর্কের সুতোগুলো টিকে আছে।
বিন্দি এটা বোঝে যে, দু’জনের প্রেমের সম্পর্কে যে অন্যজনকে কম ভালবাসে, সে-ই সম্পর্কটা নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যেমন বিন্দি করছে। ও যেমন চাইছে তেমন করে নাচছে মাধু। এই যে ওর পা ধরে আছে, সেটা তো এক ধরনের বশ্যতা স্বীকার করাই।
বিন্দি জোর করে হাসিটা চেপে কড়া গলায় বলল, “আমি মিথ্যে কথা বলি না। আর যারা বলে তাদের সহ্য করতে পারি না।”
বলল, মাধু ওর পা ছেড়ে হাতজোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থাতেই ·“আমি সত্যি বলছি। ও বলেছিল বলে কিনে দিয়েছি। কী করব বলো! কিন্তু তুমি তো জানো যে, আমার সবটা আমি তোমাকেই দিয়ে দিয়েছি। আমার আর নিজের কিছু নেই।”
বিন্দি দেখল মাধুর চোখ ছলছল করছে। এই রে, আবার কাঁদবে! কী জ্বালা। এ সব ন্যাকামো সহ্য হয় না ওর। কথায় কথায় চোখে জল। কেন রে ভাই! এমন ভিক্ষে করে কি প্রেম পাওয়া যায়?
বিন্দি বলল, “আমি ও সব জানি না। হাতে যা প্রমাণ পেলাম তাই বললাম।”
মাধু বলল, “আমি আমার সবটা তোমাকেই দিয়ে দিয়েছি। এই যে মাসে মাসে তুমি আট হাজার টাকা করে পাঠাও, এটা আমার নিতে খুব খারাপ লাগে। কলকাতায় আমার চারটে পানের দোকান। মেন মেন লোকেশনে। আয় যথেষ্ট। সেখানে তোমার মাকে কিছু টাকা দিতে পারি না মাসে মাসে? পারি তো! কিন্তু জানি তুমি নেবে না।”
“নেব নাই তো! কেন নেব? তুমি কে আমার? এবারও ষোলো হাজার টাকা…” বিন্দি ইচ্ছে করে একটু থামল।
“না না এবার তো নেবই না… তোমার অত শরীর খারাপ গেল! এবার আমি নেবই না! আর এই যে তোমার বোনের বিয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকা
মাধু ওর পা ছেড়ে হাতজোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থাতেই বলল, “আমি সত্যি বলছি। ও বলেছিল বলে কিনে দিয়েছি। কী করব বলো! তুমি তো জানো যে, আমার সবটা আমি তোমাকেই দিয়ে দিয়েছি।”
লাগবে জানলাম, সেটাও আমিই দিতাম উপায় থাকলে। কিন্তু অত টাকা তো নেই। না হলে…” মাধু চুপ করে গেল আচমকা।
বিন্দি থমকে গেল। এটা কী বলল মাধু? ওর বোনের বিয়ে? মানে? কার সঙ্গে?
বিন্দি চোয়াল শক্ত করে তাকাল মাধুর দিকে। তার পর বলল, “চোখ মোছো। কথায় কথায় কেঁদে নাটক করবে না। ন্যাকামো সহ্য হয় না আমার। আর বোনের বিয়ের কী ব্যাপার? আশ্চর্য! আমার বোনের বিয়ে আর আমিই জানি না!”
মাধু থমকে গেছে। বিন্দির মনে হল এই ব্যাপারটা মাধু ভুল করে বলে ফেলেছে।
“কী ব্যাপার বলো,” বিন্দি সোজা তাকাল মাধুর দিকে।
মাধু আমতা আমতা করে বলল, “মানে তোমায় বলা মানা ছিল। তোমার বোন মানে একটা কেস করে ফেলেছে… মানে তাই…” “কী হয়েছে?” বিন্দি বসে পড়ল মাধুর সামনে।
“দুর্জয় নামে একটা ছেলের সঙ্গে… মানে ও এখন ইয়ে…” মাধু ঢোঁক গিলল।
“থাপ্পড় খাবে, না সোজা ভাবে বলবে?” বিন্দি এবার সত্যিকারের কড়া গলায় বলল।
“দুর্জয়ের সঙ্গে তোমার বোন ইমলি ইয়ে করে… এখন প্রেগন্যান্ট! তোমার মা আমায় ফোন করেছিল কাল। খুব কাঁদছিল। তোমায় বলতে মানা করেছে। ভয় পায় তো তোমায়… আমায় বলছিল তোমাদের বাড়ি আর সামান্য যেটুকু জমি আছে বিক্রি করা যায় কি না! পাঁচ লাখ লাগবে। দুর্জয় ইমলিকে বিয়ে করতেই চায়, কিন্তু ওর বাড়ির লোকেরা চায় না। মানে চায়, কিন্তু পাঁচ লাখ না পেলে… দুর্জয়রা এমনিতেই উঁচু জাত! তাও ওর বাবা-মা এ সব নাকি মানে না। বিয়ে দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু পাঁচ লাখ না দিলে… ইমলি এদিকে বলেছে দুর্জয়কে বিয়ে না করতে পারলে নাকি সুইসাইড করবে!”
“প্রেগন্যান্ট!” বিন্দি হাঁ করে তাকিয়ে রইল মাধুর দিকে। মাধু এত বড় একটা খবর জেনেও ওকে এতক্ষণ বলেনি! আর মা ওকে ফোন না করে মাধুকে ফোন করেছে! কেন? পাঁচ লাখ না হলে বিয়ে করবে না দুর্জয়! ও জানে এমন করাটা অন্যায়। কিন্তু ওরা যেখান থেকে এসেছে, সেখানে পণ ছাড়া বিয়ে হওয়ার ব্যাপারটাই প্রায় নেই। বিন্দির মনে হয় সঠিক আর সুস্থ চিন্তাভাবনা দেশের অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যেই কেবল আটকে আছে। না হলে পণপ্রথার মতো একটা ঘৃণ্য প্রথা এই একুশ শতকেও কী ভাবে বেঁচে থাকে! ওর বোন যে প্রেগন্যান্ট, সেটাতে দুর্জয় নিজেও তো জড়িয়ে। তা হলে ওদের কাছে এমন দাবি করে কী করে!
মাধু বলল, “তুমি বলে দিয়ো না যে, আমি বলেছি তোমায়! আসলে তোমার মা খুব টেনশন করছে। জানাজানি হয়ে গেলে জানো তো, কী হতে পারে ওখানে! তাই তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চায়। যা আছে তা বিক্রি করে… আমার ওই টাকা থাকলে দিয়ে দিতাম। কিন্তু…”
বিন্দির মাথা ভোঁ ভোঁ করছে! বোন এটা কী করল! আর পাঁচ লাখ দিয়ে বোনের বিয়ে দিতে হবে? চাকেরিতে আর ক’জন জানে ব্যাপারটা! ছোট জায়গা চাকেরি। সবাই সবার জীবনের খবর রাখতে চায়। অন্যের জীবনে নাক না গলালে কারও ঘুম হয় না। সামান্যতেই নিন্দে হয়। একঘরে করে দেওয়া হয়! সামাজিক ভাবে অপমান করা হয়। সেখানে অবিবাহিত মেয়ের গর্ভবতী হয়ে যাওয়াটা খুব বড় ব্যাপার। তাই মা চাইছে যে করেই হোক বিয়েটা দিয়ে দিতে। সবই বুঝতে পারছে বিন্দি। কিন্তু পাঁচ লাখ পাবে কোথায়? কে দেবে ওকে এত টাকা!
মাধু খুব সাবধানে বিন্দির হাতটা ধরল এবার। তার পর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমার ওপর রেগে আছ?”
বিন্দি তাকাল ওর দিকে। গবেট লোক একটা। এমন খবর জানার পরে ওর কি আর মাধুর কথা মাথায় আসবে? এটাও বোঝে না গাধাটা।
বিন্দি বলল, “আমাদের বাড়ি আর সামান্য একটু জমি আছে। সেটা চলে গেলে মা থাকবে কোথায়?”
মাধু কী বলবে বুঝতে পারল না। শুধু অস্ফুটে আবার বলল, “আমার থাকলে আমি…”
বিন্দি বলল, “তুমি মাকে বলবে যে বাড়ি আর জমি বিক্রি করতে পারবে না। বুঝেছ?”
“তা হলে অত টাকা! মানে… কী করবে?” মাধু কী বলবে বুঝতে পারল না।
বিন্দি মাধুর কথার উত্তর না দিয়ে কতকটা নিজের মনেই বলল, “জানি না। দরকারে কিডনি বেচব। কিন্তু বাড়ি আমি বিক্রি করতে দেব না। ওটা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই আমাদের। বোনের বিয়ে আমি দেবই। কিন্তু বাড়ি বিক্রি করব না। তাতে আমাকে যা করতে হয় করব।”
