৩৩. রাজু
সুটকেস দুটো বেশ ভারী হয়ে গিয়েছে। নেব না, নেব না করেও এত কিছু নেওয়া হয়ে গিয়েছে যে, বলার নয়! আসলে উর্জার অনেক কিছু যে ওকেই নিতে হয়েছে! উর্জা কোথায় যাচ্ছে সেটা তো সত্যি করে বলেনি নিজের বাড়িতে। বলেছে অফিসের কাজে গুজরাত যাচ্ছে! কিন্তু বিদেশ যেতে গেলে ন্যূনতম কিছু জিনিস তো লাগেই! তাই সে সব নিয়েছে রাজু নিজেই।
রাজু ঘড়ি দেখল। দশটা কুড়ি বাজে। রাত হয়েছে বেশ। এবার উর্জার ফোন পেলেই বেরিয়ে যাবে! পেটের মধ্যে কেমন একটা করছে। সব ছেড়ে এত দূরে যাওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়। একটা সংশয়ও হচ্ছে। যা করল ঠিক করল তো? কিন্তু পর মুহূর্তে আবার ভাবছে, এ ছাড়া আর কী উপায়ইবা ছিল! এখানে কেউ নেই ওকে সাপোর্ট করার। দিনকে দিন কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ির হালও খারাপ। টাকা রোজগার করাটা যে ভীষণ জরুরি। ও তো মোবাইল নেটওয়ার্ক খোলার জন্য টাকা চাইছে না! ফুটবল বা ক্রিকেট টিম কেনার জন্যও টাকা চাইছে না! ওর টাকা দরকার স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার জন্য। তাই উপস্থিত পরিস্থিতে এটাই ওর একমাত্র উপায় রোজগার করার!
মা যে খুব খুশি সেটা মাকে দেখেই বুঝতে পারছে। মায়ের খুশির কারণটা ও বুঝতে পারছে। এক তো নিয়মিত অর্থচিন্তার থেকে একটা মুক্তির আশা দেখতে পাচ্ছে। দু’নম্বর কারণ হল, বীরেন্দ্রর মতো লোক বাড়িতে এসে যাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, সে বাড়িতে না থাকলে একটা ঝামেলাও মেটে! আর তিন নম্বর কারণ এই যে, ওর আর মায়ের নামে উর্জা দশ লাখ টাকার একটা ফিক্সড করে দিয়েছে। এর ফলে মায়ের একটা ভরসা এসেছে। সারা জীবন ধরে অর্থ চিন্তায় কাতর মা যেন একটু মন খুলে শ্বাস নিচ্ছে!
রাজু দেখে অবাক হয়েছে যে, মা একবারও টাকাটা নিয়ে আপত্তি করেনি। বরং অনেকটা যেন হাত পেতেই নিয়েছে। আঁকড়ে ধরেছে। খারাপ লেগেছে রাজুর। কিন্তু কিছু বলেনি। কার যে কিসে শান্তি হয়, সেটা সত্যি বোঝা দায়। তা ছাড়া মায়ের বয়স হচ্ছে, টাকাপয়সার একটু জোর থাকলে দুর্ভাবনাটা কাটে।
রানার মনটা কিন্তু খারাপ। মানে, আগে যেমন খুশি হয়েছিল, তেমন আর নেই। কে জানে কেন ওর মনে হচ্ছে, রাজু দেশের বাইরে গিয়ে ওদের ভুলে যাবে।
আজ দুপুরের খাবার পরে নিজের ছোট্ট চৌকিটার ওপর বইপত্র মেলে বসেছিল রাজু। রাজনৈতিক বইপত্র আছে অনেক। এ সব তো আর সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না। আবার সত্যি বলতে কী, প্রাণে ধরে এ সব ফেলেও দিতে পারবে না। তাই গুরানকে ডেকেছে। রাতে এলে দিয়ে দেবে সব। গুরান কার সঙ্গে যেন কথা বলেছে। সে বলেছে এ সমস্ত বই অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে নেবে ও।
চৌকির কোনায় যখন অনেকগুলো বই জমা হয়েছিল, তখন রানা এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে। রানা এমনিতে চুপচাপ নিজের মতো থাকে। বাড়িতে কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। নিজের পড়াশোনা নিয়ে খুব সিরিয়াস। তাই এ ভাবে এসে দাঁড়ানোয় বেশ অবাক হয়েছিল রাজু।
“কিছু বলবি?” বই থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করেছিল রাজু।
রানা সময় নিয়েছিল একটু। তার পর চৌকির ওপর ছড়ানো বইয়ের মধ্যে থেকে একটা বই তুলে ফড়ফড় করে পৃষ্ঠাগুলো শাফল করে বলেছিল, “তুই আর ফিরবি কোনও দিন?”
রাজু হেসে তাকিয়েছিল রানার দিকে। তার পর বলেছিল, “ফিরব। ফিরতে তো হবেই। মাকে নিয়ে যাব ওখানে। ইচ্ছে আছে তোকেও নিয়ে যাওয়ার, যদি তোর ইচ্ছে থাকে আর কী!”
রানা বলেছিল, “দাদা তোকে কি যেতেই হত? মানে কোনও উপায় ছিল না এখানে থাকার? আর এত হুড়োহুড়ি করছিস কেন?”
“পরের উত্তরটা আগে দিই,” বইগুলো এক পাশে সরিয়ে রাজু বসেছিল খাটে। তার পর বলেছিল, “কোভিড পরিস্থিতি চলছে। এখনও ফ্লাইট চলছে। কবে দুম করে বন্ধ হয়ে যাবে কে জানে! তার আগেই আমাদের ওই দেশে পৌঁছোতে হবে। বুঝেছিস? আর এখানে থাকার উপায়? নারে, ছিল না। আমি সারা জীবনটাই রাজনীতিকে দেব ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম দেশের কাজে, মানুষের কাজে, পার্টির কাজে আমার জীবন কাটবে। কিন্তু আমরা ভাবি এক আর হয় আর-এক!”
“তুই থাকতে পারবি এ সব ছেড়ে?”
রাজু মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, “পারতে হবে। মানুষের মতো এত ফ্লেক্সিবল প্রাণী আর কেউ নেই! তা ছাড়া দেখ, যে-আদর্শ নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলাম, সেটা আসলে শোকেসে সাজিয়ে রাখার বিষয় হয়ে গিয়েছে এখন! এমন অনেক কাজের সাক্ষী আমি ছিলাম, যা এখন ভাবলেও ঘৃণা হয়, লজ্জা লাগে! কিন্তু তখন ভাবতাম ক্লাস স্ট্রাগল একটা যুদ্ধ। আর যুদ্ধ বলেই সেখানে রক্ত ঝরবে! সেখানে ঠিক কাজ করতে গেলে আইনের বাইরে যেতে হবে মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে আঙুল বেঁকাতে হবে। রাস্তার ঠিক ভুল নিয়ে মাথা ঘামাইনি। গন্তব্যটা যেন সাধারণের কাছে লাভদায়ক হয়, সেটাই ছিল লক্ষ্য।”
“আর সেটা এখন বদলে গেল!” রানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
“আসলে সবই এক আছে। আমি ভাবতাম বদলাবে। কিন্তু কিছুই বদলায়নি। বরং আরও খারাপ হয়েছে! একটা কথা ভাব তুই, আমরা সাধারণ মানুষজন আসলে কী? ভোটের আগে নেতারা আর তাদের ভাড়া করা দালালরা আমাদের কী বোঝায়? বোঝায় যে, মানুষের হাতেই সব ক্ষমতা। কিন্তু আসলে কি তাই? সাধারণ মানুষ আছে দুটো কাজের জন্য— এক, ট্যাক্স দেওয়া, আর দুই ভোট দেওয়া! এর বাইরে গিয়ে তুই ন্যায্য কিছু চেয়ে দেখ। দেখবি লোকাল দাদা থেকে নেতা সবাই তোকে ডিফিউজ করতে নেমে পড়েছে। সবচেয়ে অদ্ভূত হল আসল ক্ষমতা যাদের হাতে, তাদের কাছে তুই জীবনেও পৌঁছোতে পারবি না। তারা আমাদের এই নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজনদেরই ব্যবহার করে আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে! যে-কোনও জায়গায় যা কোনও কাজ করানোর জন্য দেখবি, তোকে ঘোরানো হচ্ছে। তোকে নানা ভাবে হেকেল করা হচ্ছে। কে করছে হেকেল? নেতা মন্ত্রীরা করছে কি? তারা করছে না। করছে এত দশকের পর দশক ধরে তৈরি করা তাদের সিস্টেম থেকে উদ্ভূত মানুষজন! এই সব মানুষ কেউ আমাদের বাবা, কাকা, মা বা মাসিমা! এরাই আমাদের এগোতে বাধা দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে? কারণ, এরা এমন একটা সিস্টেম থেকে এসেছে, যে সিস্টেম তাদের সাহস দেয়নি, উল্টে তাদের ভিতু করে দিয়েছে, ইনসিকিওরড করে দিয়েছে। সেই ইনসিকিওরিটির বশবর্তী হয়ে সাধারণ মানুষজন একে অপরকে নিপীড়ন করে যাচ্ছে। ভাবছে এভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে অতিরিক্ত টাকা বের করতে পারলেই তার জীবন সুরক্ষিত থাকবে। আর আসল ক্ষমতা যারা ভোগ করছে, তারা এ সবের থেকে দূরে বসে রয়েছে। ভাব, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থার কাজ কী ছিল? কাজ ছিল কবির, রবীন্দ্রনাথ এঁদের মতো ফ্রি থিঙ্কার তৈরি করার। অন্তত চেষ্টা করার। কিন্তু কী তৈরি হচ্ছে? না, সমর্থক ভক্ত অনুগামী! হ্যাঁ-তে হ্যাঁ বলা লোক! আমি সব দলের কথা বলছি। নতুন চিন্তা করার কথা কেউ বললে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, এত এত বছর ধরে চলা দোকান না হলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে যে! এ সব দেখে আমি বুঝেছি আমার এখানে কিছু করার নেই। নিজেরটা নিজেকে বুঝতে হবে। কিন্তু তাই বলে আমি এমন তেল দিতে পারব না কাউকে। নির্লজ্জের মতো নিজের ধান্দার জন্য বিশ্বাস বদলে অন্যের পা চাটতে পারব না। ক্ষমতায় থাকা মানুষের ব্যাগ বইতে পারব না, গাড়ির দরজা খুলে দিতে পারব না। তাদের পিওন হয়ে পেছন পেছন ‘দাদা দাদা’ বলে ঘুরতে পারব না। তাই সময় থাকতে সৎ পথে আমাকে নিজের জীবনটা তৈরি করে নিতে হবে।”
“দাদা, তোর সব কথা ঠিক নয়,” রানা বলেছিল, “কিন্তু আমি এই নিয়ে তোর সঙ্গে ঝগড়া বা মতবিরোধে যাব না। আমি শুধু বলব তুই আমাদের ভুলে যাস না। আমাদের কষ্ট হবে খুব!”
রাজু কিছু না বলে হেসেছিল শুধু।
রানা বলেছিল, “তুই হাসছিস। কিন্তু আমি সত্যি বললাম। আমি কিছু বলি না মানে কিছু ফিল করি না তা তো নয়!”
“তুই ভাল করে পড়াশোনা করিস। তার পর ওখানে যেতে চাইলে আমি আছি, উর্জা আছে। ভাবিস না। আমি একেবারে চলে যাচ্ছি না রানা।”
রানা যাওয়ার আগে চারটে বই বেছে নিয়েছিল। বলেছিল এগুলো ও রাখতে চায়! বাকিগুলো গুরান নিয়ে যেতেই পারে!
“কী রে রেডি তো?”
দরজার কাছ থেকে গুরানের গলা শুনে তাকাল রাজু। সামান্য হাসল। বলল, “এই, ফোন এলেই বেরোব। উর্জা যে-কোনও সময়ে ফোন করবে।”
গুরান দেওয়ালে ঝোলানো রংচটা প্লাস্টিকের ঘড়িটা দেখে জিজ্ঞেস করল, “দশটা পঁচিশ। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ধরতে হলে অনেক আগে বেরোতে হয়, না?”
রাজু মাথা নেড়ে বলল, “আমি সব বই রেডি করে রেখে দিয়েছি। তোর সুবিধে মতো এসে নিয়ে যাস কিন্তু!”
গুরান থমকাল একটু, তার পর আচমকা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল রাজুকে। রাজু সামান্য অবাক হল। তার পর আলতো করে পিঠে হাত রাখল ওর। দেখল, ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে রানা চোখ মুছল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে।
গুরান ওকে ছেড়ে দিয়ে হাসল। তার পর বলল, “স্কুল লাইফে বেশ ভাল স্বাস্থ্য ছিল। গোল করার পড়ে তোকে জড়িয়ে ধরতাম, মনে আছে! এত বছর বাদে ধরলাম আবার। রোগা হয়ে গেছিস রাজু। ভাল করে খাওয়াদাওয়া করিস! আর ফোন করিস, প্রথম প্রথম। ”
“প্রথম প্রথম কেন?” অবাক হল রাজু।
গুরান বলল, “কারণ, পরে আর কেউ করে না। যারা দূরে চলে যায় তারা মনে মনেও দূরেই চলে যায়! কম তো দেখলাম না। সবটাই আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড! তুই প্রথম প্রথম অন্তত করিস।”
“আরে, আমি মাকে ভাইকে নিয়ে যাব। তোকেও নিয়ে যাব দেখিস!” রাজু হাসল।
“এক কাজ কর, পাশের কচুরির দোকানের ভজাদা, ওষুধের দোকানের পার্থদা, কেবল-এর মন্টু, মুদির দোকানের মধু পাল, অটোওলা পিঙ্কু, লটারির টিকিট বিক্রি করা ভোলা- সবাইকে নিয়ে চল। ওখানেই একটা টালিগঞ্জ ফাঁড়ি বানিয়ে ফেল। আমিও মোবাইল রিপেয়ারিং শপ খুলে বসব। ভজাদা মবিলে ভাজা কচুরি বিক্রি করবে। মধু পাল শিয়াল কাঁটা মেশানো তেল দেবে লোকজনকে। আর পিঙ্কু এলপিজি-র অটো নামিয়ে দেবে! নিউ জিল্যান্ডে বিপ্লব চলে আসবে। কী বল!”
রাজু হাসল। কিন্তু কিছু বলার আগেই মোবাইলটা বেজে উঠল টেবিলের ওপর। ও দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তুলে নিল ফোনটা। উর্জা! যাক ঠিক সময়ে ফোন করেছে।
রাজু ফোনটা ধরে বলল, “হ্যালো।”
উর্জা বলল, “আমি বেরোচ্ছি। রাসবিহারি মোড়ে চলে এসো দ্রুত। আই উইল পিক ইউ আপ। ডোন্ট ওয়েস্ট টাইম। এখন রাত সাড়ে দশটা বাজে, তুমি পৌনে এগারোটায় এসো। তাড়াতাড়ি সব সেরে চেকিং করে নিলে নিশ্চিন্ত। কেমন?”
রাজু শব্দ করে শ্বাস ফেলল। বলল, “আমার কেমন টেনশন হচ্ছে! আসলে জীবনে বাইরে যাইনি তো! আর এ ভাবে এত শর্ট নোটিসে সব ছেড়ে চলে যাওয়া। মানে…”
“আরে তুমি এখন এ সব বলছ!” উর্জার রাগ হয়ে গেল একটু, “যাওয়ার আগে এমন কথা কেউ বলে! তুমি খুশি হওনি? আমাদের একটা জীবন হবে আলাদা! তুমি মাকে ভাইকে সাপোর্ট করতে পারবে বেটার ভাবে। সে সব ভাবো। আর বিদেশে গেলে দেখবে ওখানের মানুষজন অনেক সেনসিবল! এখানের মতো সারাক্ষণ অন্যের জীবনে উঁকি ঝুঁকি দেয় না! সারাক্ষণ অন্যের কাজে আঙুল দিয়ে সেটা পণ্ড করতে চায় না। সারাক্ষণ নিজের ইনসিকিওরিটি লুকোতে অন্যকে অপমান করে না। তুমি অনেক মন খুলে বাঁচতে পারবে। আনন্দ করে বাঁচতে পারবে। কে কী ভাবল সেই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
রাজু হাসল শব্দ করে, “আরে, তুমি তো খুব রেগে আছ দেখছি! আমি এমনি বললাম। আসলে সারা জীবন এমন একটা দম বন্ধ সময় কাটিয়েছি। তুমি ছিলে তাই এই মুক্তি এল। কিন্তু তাও একটা কেমন তো লাগবেই। তবে ভাই আর মা খুব খুশি।”
কিছুটা সময় নিস্তব্ধ। রাজুর মনে হল, উর্জা কি রাগ করল নাকি? কিন্তু উর্জার গলা পেল আবার, “গাড়ি এসে গিয়েছে আমার। ইউ হারি আপ। আমি বেরোচ্ছি। রাখলাম।”
ফোনটা কেটে মা আর রানার দিকে তাকিয়ে হাসল রাজু।
দেখল, রানা চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। রানা বলল,
“আমি মোটেও খুশি নই দাদা। আমাদের দেশ থেকে সব ঠিকঠাক মানুষ যদি চলে যায় তা হলে কী হবে?”
“তুই চুপ কর,” মা ধমকে উঠল, “খালি বড় বড় কথা তোদের। জীবনে রাজু এই একটা ভাল কাজ করছে। ওকে পেছনে টানবি না! রাজু সাবধানে যাবি। আমাদের জন্য ভাববি না। আমরা ঠিক থাকব।”
গুরান হাসল, “সবাই একদম ঠিক থাকবে। তুই চিন্তা করবি না! কেমন? চল এবার ট্যাক্সি ধরতে হবে তো? আমি একটা ব্যাগ নিচ্ছি।”
গুরান একটা ব্যাগ নিল। রানা এগিয়ে এসে রাজুর আগেই ধরল আর-একটা ব্যাগ। রাজু হাসল। পিঠের ব্যাগটা গলিয়ে নিল এবার। তার পর মাকে প্রণাম করল।
মা থুতনিটা ধরে আদর করে বলল, “তোকে খুব বকি আমি। আসলে তোর ওপর জোর আর ভরসা আমার বেশি। মেয়েটাকে ভাল ভাবে রাখবি। কষ্ট দিবি না। পৌঁছেই যোগাযোগ করবি। জানাবি সব। বুঝলি? আয় এবার। দুগ্গা দুগ্গা!”
রাস্তায় ভিড় বেশ কম এখন। একটা ট্যাক্সি নিতে হবে রাজুকে। শুরান আর রানা সুটকেস দুটো নিয়ে এক পাশে রেখেছে। ট্যাক্সি করে অবশ্য বেশি দূরে যেতে হবে না। রাসবিহারী মোড় মাত্র। সেখানেই আসছে উজা।
কিন্তু একটা ট্যাক্সিও নেই! মহা মুশকিল! বাসে করা এই দুটো ব্যাগ নিয়ে তো যাওয়া যায় না আর।
মোবাইলটা বের করে সময় দেখল রাজু। উর্জা তো বলল, গাড়ি এসে গিয়েছে। এতক্ষণে তো বেরিয়েও পড়েছে নিশ্চয়। ওকে এসে অপেক্ষা করতে হলে বাজে ব্যাপার হবে। অন্য সময়ে কত ট্যাক্সি ঘোরে এখানে। কিন্তু এখন যেহেতু দরকার, অমনই কোনও ট্যাক্সির টিকির দেখা নেই। রাজু দেখল, গুরান আর রানা দু’জনে দু’দিকে এগিয়ে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছে!
“দাদা যাবেন?” আচমকা একটা সাদা গাড়ি এসে পাশে দাঁড়াল রাজুর।
রাজু দেখল, সরকারি ফলক লাগানো গাড়ি। লাল একটা চৌকো বোর্ডের ওপর সরকারি ডিপার্টমেন্টের নাম সাদা দিয়ে লেখা!
রাজু জানে, কলকাতায় এরকম হয়। নানা গাড়ি, সে সরকারি কাজে বা বেসরকারি কাজে ব্যবহৃত হোক না কেন, এমন করে কাজের বাইরে খেপ মারে। যা অতিরিক্ত টাকা পাওয়া যায় আর কী!
রাজু ড্রাইভারটিকে দেখল। মধ্যবয়স্ক মানুষ। মাথায় টাক। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখমুখে একটা পাকানো ভাব। যদিও সওয়ারির আশায় মুখে একটা হাসি হাসি ভাব আনার চেষ্টা করছে। সামনের সিটে একটা লোক বসে আছে ড্রাইভারটির পাশে। লোক না বলে ছেলেই বলা ভাল। ভাল জামাকাপড় পরা। পিঠের ব্যাগ কোলের ওপর রাখা। রাজু বুঝল একেও তুলেছে।
রাজু কিছু বলার আগেই গুরান দৌড়ে এল। বলল, “বেশি দূরে না। ওই রাসবিহারী মোড় অবধি যাবে। সঙ্গে দুটো সুটকেস আছে!”
লোকটা অবাক হল, “ওইটুকু যাবেন, তাতে এত বড় দুটো সুটকেস!” “কেন দাদা, আপনার অসুবিধে আছে?” গুরান বিরক্ত হল।
“আসলে এত ছোট ট্রিপ! আচ্ছা সত্তর টাকা দেবেন!”
“এইটুকু সত্তর টাকা!” রাজু ভুরু কুঁচকে বলল।
লোকটা হাসল পুরো দাঁত দেখিয়ে। বলল, “এত বড় দুটো সুটকেস! ক’টা টাকা আর আমাদের থাকে বলুন!”
রাজু মাথা নাড়ল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া আর এই ক’টা টাকার জন্য দরদাম করতে ইচ্ছে করছে না।
ও বলল, “ডিকি খুলুন। “
ড্রাইভারটি ডিকি খুলে দিল। ওরা তিনজনে ধরাধরি করে ডিকিতে তুলে দিল সুটকেস দুটো।
ডিকি বন্ধ করে রানা তাকাল ওর দিকে। তার পর জড়িয়ে ধরল। রাজু বুঝল রানা কাঁদছে। পিঠটা নড়ছে ওর। ফুলে ফুলে উঠছে। ঠিক সেই ছোটবেলার মতো। ক্রিকেট ব্যাট ভেঙে গেলে, বল হারিয়ে গেলে, অরণ্যদেবের কমিক্স না কেনা হলে এ ভাবেই কাঁদত রানা। আজও কাঁদছে।
রাজুর নিজের চোখে জল চলে এল হঠাৎ। বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে! কিসের একটা যন্ত্রণা। কিছু যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। উপড়ে যাচ্ছে। এমন কেন হচ্ছে ওর! ও তো স্বেচ্ছায় যাচ্ছে। তা হলে এমন ভাব আসছে কেন মনে? এত কষ্ট হচ্ছে কেন?
ও দেখল, দূরে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মা। মা-ও কি কাঁদছে! ও জানে না। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। ওরও দৃষ্টি ঝাপসা।
রাজু ওই অবস্থাতেও চোখ মুছল। তার পর রানার মাথায় হাত দিয়ে চুল ঘেঁটে দিল একটু। তার পর ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল, “কাঁদিস না। আমি তো আসব আবার। তোরাও যাবি। সামনে নতুন দিন আসছে। এমন ভেঙে পড়লে হবে না। কোনও দরকারে আমায় বলবি। পড়াশোনাটা ভাল করে করিস! আমি পৌঁছেই তোকে খবর দেব। বুঝলি? পাগল ছেলে!”
রাজু, গুরানের দিকে তাকাল হাসল। তার পর মায়ের দিকে হাত তুলল। গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করেও হাত বাড়াল রানার দিকে। রানা হাতটা চেপে ধরল ওর।
রাজু বলল, “তুই জানিস তো আমি তোকেই সবচেয়ে বেশি ভরসা করি?”
ড্রাইভার গাড়ির পেছনের দরজাগুলো সুইচ টিপে লক করে দিল। গাড়িটা ছেড়ে দিল এবার। রাজু ঘুরে বসে পেছনের কাচ দিয়ে তাকাল রাস্তার দিকে। ওই ছোট হতে হতে দূরে চলে যাচ্ছে গুরান, রানা, মা, ওর ছোটবেলার রাস্তা, পাড়ার মোড়, ঘুড়ির দোকান, রোলের ঠ্যালা, আড্ডার চাতাল। ওই চলে যাচ্ছে ওর বড় হয়ে ওঠার পথঘাট। আলো হাওয়া। চলে যাচ্ছে মাঝরাতে একা জেগে থাকার সেই ছোট্ট ঘর। মনখারাপের বারান্দা। চলে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে রাজু নামক একটি বালকের গল্প।
“দাদা, আমি একটু ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বড় রাস্তা দিয়ে নয়। টালিগঞ্জ রোড দিয়ে। প্রাইভেট গলির মুখে উনি নামবেন,” ড্রাইভারটি পাশে বসে থাকা ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল।
ছেলেটা কার সঙ্গে যেন মোবাইলে কথা বলছে খুব নিচু স্বরে। রাজু কিছু না বলে মাথা নাড়ল। তার পর কী মনে হওয়ায় উর্জাকে ফোন করল একটা। আরে, ফোন বন্ধ কেন! অবাক লাগল রাজুর! এমন তো হওয়ার নয়! ও আবার চেষ্টা করল। নাঃ এখনও বন্ধ। কী আশ্চর্য! রাজু বুঝতে পারল না ব্যাপারটা।
গাড়িটা এরই মধ্যে টালি নালার ওপরের ব্রিজ টপকে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে ঢুকে পড়েছে টালিগঞ্জ রোডে। এই রাস্তাটা সামান্য অপ্রশস্ত। লোকজন একটু বেশি। রাস্তার পাশে গাড়ি, ঠ্যালা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে পথ।
গাড়িটা এগোচ্ছে! রাজু রাস্তার দিকে আর তাকাল না। উর্জার ফোন বন্ধ কেন? এমন তো হওয়ার কথা নয়! সামান্য টেনশান হচ্ছে ওর।
গাড়িটার গতি কমে এল এবার। রাজু দেখল ডান দিকে একটা গলির মুখ। এই রাস্তায় এসে মিশেছে গলিটা। গাড়িটা গিয়ে থামল সেই গলির মুখে। আর সঙ্গে সঙ্গে খট করে শব্দ হল একটা। গাড়ির পেছনের দরজার লকগুলো খুলে গেল। ড্রাইভারটি যে খুলে দিয়েছে সেটা বুঝল রাজু। কিন্তু কেন?
রাজু কিছু বোঝার আগেই দু’পাশের দরজা খুলে দুটো দশাসই চেহারার লোক একদম আচমকা উঠে এল গাড়ির মধ্যে। আর উঠেই দু’দিক থেকে রাজুকে চেপে ধরল শক্ত করে।
“আরে, আরে…” রাজু কিছু বলতে গেল, কিন্তু তার আগেই একজন কালো মোটা কাপড়ের একটা ঢাকনা পরিয়ে দিল ওর মাথায়!
“কে আপনারা? কী চান?” রাজু ধস্তাধস্তি করতে করতে চিৎকার করল। “বাঞ্চোতকে চুপ করা!”
রাজু বুঝল সামনের সিট থেকে কথাটা এল। তার পর কিছু বলার আগেই রাজুর মাথায় যেন বিস্ফোরণ হল। মনে হল খুলির হাড় ভেঙে বোধহয় লাভা বেরিয়ে আসবে। আর আস্তে আস্তে সব নিভে এল ওর। সারা শরীর হালকা থেকে ক্রমশ ‘নেই’ হয়ে গেল। রাজু অজ্ঞান হয়ে একটা লোকের কাঁধে ঢলে পড়ল।
আচমকা নড়ে উঠল রাজু। ভেজা কিছু একটা পড়েছে মুখে। জল!
কোথায় আছে ও! ঘুমিয়ে পড়েছিল কি? রাজু চোখ খুলে তাকানোর চেষ্টা করল। আর সঙ্গে সঙ্গে কট করে উঠল মাথাটা। কী যন্ত্রণা! আর এই যন্ত্রণাটাই যেন ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে দিল ওকে। ওর মনে পড়ে গেল, বাড়ি থেকে বেরোনো, উর্জার ফোন না পাওয়া । গাড়ির মধ্যে উঠে আসা দুটো লোক। তার পর মুখ ঢেকে দেওয়া। মাথায় আঘাত পাওয়া।
চোখ ভাল করে খুলে তাকাল রাজু। হলদেটে আলো জ্বলছে। ওই অনেক ওপরে করোগেটেড টিনের ঢেউ খেলানো সিলিং! লম্বা ফ্যাক্টরি শেড! পুরনো, ভাঙা!
“জ্ঞান এসেছে?” মাথার কাছ থেকে কে যেন বলল।
রাজু মাথা ঘুরিয়ে দেখতে গেল। কিন্তু তার আগেই কেউ একটা এসে ওর বগলের তলায় হাত দিয়ে ওকে উঠিয়ে, বসিয়ে দিল পাশের একটা টিনের চেয়ারে। পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলাল রাজু। ও কোথায় এসেছে? কেন এখানে এসেছে ও? কারাই বা আনল ওকে?
রাজু দেখল, ওকে ঘিরে চারজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর ভয় লাগল। এখানে এবার কী হবে? মাথা কাজ করছে না।
রাজু জিজ্ঞেস করল, “আমাকে এখানে কেন এনেছ? তোমরা কারা?” কিন্তু কেউ কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সামনে থেকে পায়ের শব্দ এল এবার। রাজু দেখল, সামনের গাঢ় খয়েরি অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসছে কয়েকটা ছায়া!
ও বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখল, আবছায়া থেকে ঘোলাটে হলুদ আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে বীরেন্দ্র।
ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল রাজুর। মাথার যন্ত্রণাটাও যেন অনুভূত হচ্ছে না! কারণ, বীরেন্দ্র শক্ত করে ধরে রেখেছে উর্জাকে। উর্জার হাত আর মুখ বাঁধা। ছটফট করছে। বীরেন্দ্রর পেছনে সেই দোকানে আসা লাল চুলের ছেলেটা। আর তার পাশে পেটানো চেহারার আর-একজন। সুন্দর দেখতে। এই ছেলেটা ওর বাড়ি গিয়েছিল না?
এখানে ওদের ধরে আনা হয়েছে কেন?
বীরেন্দ্র, উর্জাকে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল এবার। এমন সর্ষের তেলের মতো আলোয় বীরেন্দ্রকে ঠিক রাক্ষসের মতো লাগছে!
রাজুর দিকে তাকিয়ে বীরেন্দ্র শান্ত গলায় বলল, “আমি বারণ করেছিলাম। শুনিসনি। বলেছিলাম উর্জার সঙ্গে মিশবি না। সেখানে তোরা দেশ ছেড়ে পালাবি ভেবেছিলিস? কী ভেবেছিলিস, আমি জানব না? আজ এর ফল পাবি তোরা।”
রাজুর আচমকা কেমন যেন রাগ হল। ওর সামনে উর্জাকে ও ভাবে ধরে রেখেছে! ওকে এ ভাবে নিয়ে এসেছে! সব কি ক্ষমতা দিয়েই এরা চালাবে? জীবনে ঠিক ভুল, ইচ্ছে-অনিচ্ছে বলে কিছু নেই!
রাজু বলল, “আমায় মেরে দেবেন? অনার কিলিং! এই সময়ে দাঁড়িয়েও এমন করবেন? জাতপাত নিয়ে এখনও এতটা…”
ওকে কথা শেষ করতে দিল না বীরেন্দ্র। বলল, “ইগো কিলিং! অ্যাম্বিশনের জন্য কিলিং! শোন, জাতপাত ইমপর্ট্যান্ট নয়! ওটা পলিটিকাল টুল। প্লাস সেতুও চায় তুই যাতে মরে যাস! ওকেও নাকি থ্রেট করছিস তুই! ব্ল্যাকমেল! শুয়োরের বাচ্চা! সেতুর ওই জগা ঘোষকে খুনটা এখনও পুষে রেখেছিস মনে। জানিস না, সেই খুনের পেছনে শুধু সেতু নয়, আমিও ছিলাম। আর সেতু চায় না তুই বেঁচে থাকিস। একদিন ও আমার কাজ করেছিল, আজ আমি ওর কাজ করব। সে দিন ওই খুনের জায়গায় না থাকলে আজ হয়তো তুই মরতিস না। আর তোদের এত সাহস, আমার প্ল্যান ভেস্তে দিতে গিয়েছিলিস। উদয় জেনে গিয়েছে তোদের সম্পর্কের কথা। ওর অপমান হয়েছে। উদয় এখন দেখতে চায় আমি কতটা লয়াল। দেখতে চায় ওকে যে তোরা অপমান করলি তার জন্য তোদের কী শাস্তি দিই আমি। ওদের কাছে জায়গা পাওয়াটা এই সময়ের রাজনীতিতে একটা ইমপর্ট্যান্ট সাকসেস! আর সাকসেস নিডস স্যাক্রিফাইস। পাওয়ার নিডস স্যাক্রিফাইস। আমাকেও তো গ্রুভ করতে হবে যে, আমি কঠোর হতে পারি। বারবার কেউ ধোঁকা দেবে আর তার জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে না? আর আমাকেও অন্য ধাপে যেতে হবে। লাইফ সাপলুডোর মতো! তোরা আমার কাছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আর আমি তোদের কাছে সাপ!”
“মারতে চাও? আমাকে মারতে চাও?” রাজুর গলা শুকিয়ে গিয়েছে, “উর্জাকে…. উর্জাকে….”
বীরেন্দ্র ঘৃণার সঙ্গে তাকাল উর্জার দিকে। বলল, “পেটও বাঁধিয়েছিস হারামজাদি!”
উর্জা গোঙাল। মুখ বাঁধা থাকায় কথা বেরোচ্ছে না।
এটা কী বলল বীরেন্দ্র! উর্জা প্রেগন্যান্ট! এই কথাটাই কি উর্জা বলতে চাইছিল! রাজু কী করবে বুঝতে পারল না। “উর্জা..” বলে অসহায় ভাবে চিৎকার করল!
বীরেন্দ্র আচমকা উর্জাকে ঠেলে মাটিতে ফেলে দিয়ে পিস্তল তুলল উর্জার দিকে। রাজুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। নাই-বা হল নিজের বাবা, কিন্তু ছোট থেকে বাবা হিসেবেই তো বড় করেছে উর্জাকে ! সেখানে বীরেন্দ্র এটা কী করে করতে পারে! উর্জা মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। গোঙানির মতো শব্দ করছে মুখ দিয়ে।
রাজু দেখল, পেছনের সুন্দর দেখতে ছেলেটা আচমকা এগিয়ে এল এবার। বীরেন্দ্রর হাত ধরে বলল, “স্যর প্লিজ, ম্যাডামকে মারবেন না! প্লিজ… স্যর মারবেন না, প্লিজ। স্যর…”
বীরেন্দ্র এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে ঘুরে থাপ্পড় মারল ছেলেটাকে। “এত বড় সাহস তোর? আমার গায়ে হাত দিস! আমার গায়ে। নেহাত… নেহাত…” বলল,
“মারবেন না, প্লিজ মারবেন না… আমি সরে যাব। প্লিজ….” রাজুর কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সারা শরীরের রক্ত যেন জমা হয়েছে মাথায়। জল পড়ছে চোখ দিয়ে। লালার সুতো ঝুলছে মুখ থেকে! উর্জাকে মেরে দেবে! সত্যি কি লোকটা মেরে দেবে উর্জাকে?
বীরেন্দ্র জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার তাকাল ছেলেটার দিকে আর একবার রাজুর দিকে। তার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে উর্জার মাথা লক্ষ করে গুলি চালিয়ে দিল! পুরনো ফ্যাক্টরির শেডের মধ্যে পিস্তলের শব্দটা বোমার মতো ফেটে পড়ল যেন! গরম গোলাপি বাষ্প উর্জার মাথার পেছন থেকে বেরিয়ে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়! ঘিলুর অংশ ছিটকে গিয়ে লাগল পেছনে দাঁড় করানো ড্রামের গায়ে।
বীরেন্দ্র হিসহিসে গলায় বলল, “শাস্তি। উদয় খুশি। আমিও খুশি!” রাজুর গলায় শ্বাস আটকে গেল যেন! দেখল, মাটিতে ওর সামনে চিৎ হয়ে পড়ে আছে উর্জা। মাথার মাঝে লাল গর্ত দিয়ে রক্ত চুঁইয়ে নামছে। চোখ দুটো খোলা! ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে!
সেই ছেলেটা বসে পড়েছে মাটিতে। বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে উর্জার দিকে। ছেলেটার কপালের শিরা জেগে উঠেছে। মুখ লাল! বীরেন্দ্রর চোখে খুনে দৃষ্টি এখনও! হাঁপাচ্ছে বীরেন্দ্র। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। সেটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছছে বারবার। কী করবে যেন বুঝতে পারছে না !
রাজুর শরীরে যেন অসুর ভর করল আচমকা। ও “রাক্ষস” বলে চিৎকার করে লাফিয়ে পড়ল বীরেন্দ্রর ওপর। বীরেন্দ্র সরল না। রাজুও পৌঁছোতে পারল না বীরেন্দ্রর কাছে। তার আগেই চারটে হাত শূন্য থেকে তুলে নিল ওকে। তারপর নিখুঁত হাতে পেছন থেকে ওর গলাটা ধারালো ছুরি চালিয়ে দু’ফাঁক করে মাটিতে ছুঁড়ে দিল!
শরীর শূন্য। যন্ত্রণায় সব অসাড়। গরম রক্ত ছিটকে বেরোচ্ছে! মুখে বুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে রক্তের ফেনা। ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে রাজুর। নিবে আসছে আলো। খয়েরি অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে, গ্রাস করে নিচ্ছে ওকে। ঝাপসা সব।
বৃষ্টি পড়ছে কি কোথাও! কে আসছে বৃষ্টি ভেঙে? রানা? কী হয়েছে? রানা কাঁদছে কেন? আর মা? ছোট মোমের আলোর মধ্যে বসে মা কি সেলাই করছে? শব্দ পাচ্ছে সেলাই কলের! আবছা, সব আবছা। রফির গান কি ওটা! গুরান, গুরান হাত বাড়াল ওর দিকে? ভাজা মৌরির গন্ধ আসছে। গুরান ধরবি আমায়! রানা আমায় ধরবি!
মাটিতে পড়ে সামনের দিকে হাত বাড়াল রাজু। উর্জার বাঁধা হাত ওই সামনে। একটু ধরতে পারবে না? রাজুর শরীরের আলো নিবে এল ক্রমে। চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। শেষবারের মতো তাকাল উর্জার দিকে। দেখল, সেই ছেলেটা হাঁটু গেড়ে বসে আছে উর্জার সামনে। মাথা নিচু।
রাজুর বুকে কী যে কষ্ট! ও শেষবারের মতো শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। বুকে কে যেন চাপিয়ে দিয়েছে পাথর! নড়ে উঠল রাজু। দেখল, কে যেন ওর মাথার দিকে পিস্তল তুলল। রাজু বন্ধ করে নিল চোখ।
আর দেখল, একটা গাড়ি চলছে। রাত নেমে এসেছে চারিদিকে। আর গাড়ির মধ্যে বসে জানলা দিয়ে আসা হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল সামলাতে সামলাতে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে উর্জা! ওর মনে হল, উর্জা হাসে, উর্জা ওকে ভালবাসে, তাই জীবন এত সুন্দর।
