১৩. ঝিরি
ঝিরি কুমার মুখুটি! এটা কোনও নাম হল! ছোটবেলায় লোকে ওর নাম শুনে হি হি করে হাসত। বলত, “এর মানে কী রে?” ঝিরি কোনও উত্তর দিতে পারত না। শুধু বলত, “জেনে বলব।”
তা এই জানাটা আর কোনও দিন হয়ে ওঠেনি। বাড়ির বড়রা কেউই বলতে পারেনি। শুধু মায়ের কাছ থেকে এটা জেনেছিল যে, ওর জন্মের সময় নাকি এক দূর সম্পর্কের ঠাকুরমা এসেছিল ওদের বাড়িতে। তার মাথার একটু সমস্যা ছিল। ছেলে হওয়ার পর সে-ই নাকি নাম রাখে ঝিরি কুমার। বয়স্ক মানুষ এমন নাম দিয়েছে। তাকে কেউ দুঃখ দিতে চায়নি বলে এই নামটাই সবাই মেনে নিয়েছে।
ছোটবেলায় ঝিরির মনে হত কে এক অসুস্থ মানুষ কী নাম রাখল সেটাই বাবা-মা মেনে নিল! ওদের স্কুলে কী সুন্দর সুন্দর নামের ছেলেরা পড়ে! অয়নাংশু, মৃগাঙ্কশেখর, সৌপ্তিক, আর্যবন্ধু। আর সেখানে ও? ঝিরি কুমার! যেন রেল কলোনির মাঠে বসে সারা দিন আড্ডা মারা বখাটে ছেলে!
ওর স্কুল লাইফের বন্ধু রূপবান ওকে বলত, “তুই বড় হলে নামটা এপিঠ ওপিঠ করে পালটে নিস বুঝলি। তখন একটা দারুণ নাম রাখিস।”
ঝিরি জিজ্ঞেস করত, “কী নাম রাখব?”
“কী নাম?” রূপবান চিন্তিত হয়ে পড়ত। তার পর খানিকটা ভেবে বলত, “এই ধর বেশ ভারিক্কি একটা নাম।”
“আঃ, কেমন ভারিক্কি নাম? একটা উদাহরণ দে,” ঝিরি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকত।
রূপবান হেসে বলত, “এই ধর সিলভেস্টার স্ট্যালোন
“অ্যাঁ! কী!” ঝিরি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকত।
“হ্যাঁ, সিলভেস্টার স্ট্যালোন, এটাই ঠিক নাম,” রূপবান মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মতো বলত, “খুব আনকমন নাম কিন্তু। সেদিন সিনেমায় দেখলাম এর একটা বই। কী ঝাড়পিট! ‘র্যাম্বো’ নাম। একাই সবাইকে কেলিয়ে পাট করে দিয়েছে। ইয়া ইয়া হাতের গুলি। বুকের পাটা যেন লাহিড়ীদের দুর্গা পুজোর চাতাল! এই নামটাই দারুণ। এটাই রাখবি। ভাল হবে।”
ঝিরি হাঁ করে তাকিয়ে বলত, “সিলভেস্টার স্ট্যালোন মুখুটি! দুটো টাইটেল!”
“তাতে কী হয়েছে? এমন হয় না? মান্না দে। গোটা নামটাই তো সারনেম! তোর হলে অসুবিধে কী? তুই কি মান্না দের চেয়েও কেউকেটা নাকি?” রূপবান ভুরু কুঁচকে তাকাত।
ঝিরি তাও গজগজ করত, “না না, মা মানবে না। অসুবিধে হবে। পরীক্ষায় নাম লিখতেই চল্লিশ মিনিট কেটে যাবে। অ্যাডমিট কার্ডে নামের বানান ভুল আসবে। না, এটা ঠিক দেখাবে না।”
“তা হলে স্ট্যালোনটা বাদ দিবি। সিলভেস্টার মুখুটি। ব্যাপক নাম! লোকজন অন্য রকম ইজ্জত দেবে। পাগলা খাবি কী, গন্ধেই মরে যাবি টাইপ!”
রূপবান নিশ্চিত হয়ে বলত, “এপিঠ ওপিঠ করার সময় বানানটা দেখে নিস কিন্তু! তুই বানানে হেব্বি কাঁচা!”
এপিঠ ওপিঠ ব্যাপারটা বুঝত না ঝিরি। মানুষের নাম কি রুটি না পরোটা না মাছ যে, এপিঠ ওপিঠ করবে! পরে বড় হয়ে বুঝেছে ব্যাপারটা কী। এফিডেভিটকে গ্রামের কিছু লোকজন ওরকম বলত। এখন ভাবলে ঝিরির হাসি পায়। সেই জায়গার সাদাসিধে লোকজন কত কী না বলত। স্পোকেন ইংলিশ-কে স্মোকিং ইংলিশ! কমপার্টমেন্টালকে কমপার্টমেন্ট! সেন্ট্রাল এক্সাইজ়কে সেন্ট্রাল এক্সারসাইজ়! আরও কত কী!
কিন্তু বড় হওয়ার পরে নাম পাল্টানোর কথা আর মনে হয়নি ঝিরির। আসলে নিজের নামটার ওপর এখন কেমন যেন মায়া পড়ে গিয়েছে। বাবা এই নামে ডাকত একদম ছোটবেলায়। মা এই নামে ডাকত। বন্ধুরা এই নামে ডাকত। এক-একটা নামের সঙ্গে কত মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। কত ঘটনা জড়িয়ে থাকে। স্মৃতিই তো মানুষের আসল সঞ্চয়। সেটা চলে গেলে আর কী-ই বা থাকে এই জীবনে!
ঝিরি ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে! কলকাতার রাস্তা আলোয় ঝলমল করছে। ওই সামনে, ফুটপাথের উল্টোদিকে একটা মণিহারি দোকানে দাঁড়িয়ে রয়েছে লালু। দোকানে ভিড় বেশ। তাই লালু এখনও কিছু কেনার সুযোগ পায়নি। এই লালু এখান থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে, সেটাই এখন দেখার।
ঝিরি পকেট থেকে একটা চুয়িংগাম বের করে মুখে দিল। মনে পড়ল, ফেরার পথে প্রতুলবাবুর স্ত্রী মানে কাকিমার জন্য জর্দা কিনতে হবে। শিয়ালদা স্টেশনের কাছে যে-মার্কেট আছে, সেখানে বলাই নামে একটা ছেলের থেকে জর্দা কেনে ঝিরি। লুজ জর্দা। বলাই নিজে কী সব দিয়ে যেন বানায়। কাকিমার ফেভারিট। কাকিমার নেশা বলতে পান-জর্দা। তবে প্রতুলবাবু সেটা নিয়েও কাঁইমাই করেন। তাই কাকিমা লুকিয়ে এটা আনতে দেন ওকে। রিপা এসে বলে দিয়ে যায় যে, মায়ের জর্দা ফুরিয়ে গিয়েছে!
না, এর জন্য টাকা নেয় না ঝিরি। সামান্য ক’টা টাকা। সে সব কেউ নেয়! আর সত্যি বলতে কী, টাকার অভাব ওর নেই। ও যাদের হয়ে কাজ করে, তারা মাস গেলে অনেক টাকা দেয় ওকে। কিন্তু যেহেতু খুব সাধারণ জীবন যাপন করে ঝিরি, তাই কাঁড়িকাঁড়ি টাকা জমে যায়।
মাসে একবার হোটরে যায় ঝিরি। সেখানে বাচ্চা মেয়েদের একটা অনাথাশ্রম আছে। কিছু টাকা আর জিনিসপত্র দিয়ে আসে। ওর আর কে আছে! এত টাকা নিয়ে ও কী-ই বা করবে!
লালুকে আবার দেখল ঝিরি। এখনও সুযোগ পাচ্ছে না জিনিস কেনার। ঝিরি মনে মনে বলল, ‘এই ছেলেটাই কাজের জন্য ঠিক। একেই ধরতে হবে!
এর মধ্যে বীরেন্দ্রদের বাড়ির লোকেদের সম্বন্ধে খবরাখবর নিয়েছে ও। কিন্তু কেউ ঠিক ওর কাজে লাগবে না। উর্জাকে তো ছেড়েই দিল। সে নিজের কাজ আর বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ব্যস্ত। কবির ব্যাপারেও খোঁজ নিয়ে দেখেছে। ও বড্ড সৎ আর একরোখা ছেলে। ওকে দিয়েও কাজ হবে না।
বিন্দি বলে একটা মেয়ে আছে। কিন্তু ওকে দিয়েও সরাসরি কোনও কাজ হবে না। সেই মালমশলা নেই ওর মধ্যে। তাই ওকে অন্য ভাবে কাজে লাগাচ্ছে ঝিরি।
ঝিরি বিশ্বাস করে, যে-কোনও কাজ করতে হলে আবহাওয়া লাগে। বিন্দি সেই আবহাওয়া তৈরি করবে। আসলে ঝিরি জানে, কোনও গাছে ফুল ধরাতে গেলে শুধু মাটিতে জল দিলেই হয় না। তার জন্য আরও জিনিস, যেমন রোদ, সার এ সবও লাগে। বিন্দি মেয়েটা এই কাজটাই করবে। চৌকস মেয়ে বিন্দি। আর ব্যাপারটা যে সবার থেকে গোপনে করতে হবে, সেটা ও নিজেই বুঝেছে। ঝিরি জানে সবটা ঠিক পারবে বিন্দি। আসলে ওকে পারতেই হবে। না-পারাটা ওর কাছে কোনও অপশন নয়।
তবে মূল গাছটি হল এই লালু। বিন্দির সঙ্গে কথা বলেই বুঝেছিল। তবে শুধু কথায় ভরসা করলে তো হয় না। তাই ক’দিন দূর থেকে দেখেছে লালুকে। বুঝেছে কাজের ছেলে। কিন্তু আরও স্টাডি করতে হবে। কারণ, যে কাজটা করাতে হবে, সেটাতে যাতে কোনওরকম গোলমাল না হয়, তার জন্য একশো শতাংশ নিশ্চিত হতে হবে। তবে ও এটাও বুঝতে পারছে যে, কাজে লাগলে একমাত্র এই লালুই লাগতে পারে। কিন্তু কাজটাই এমন যে, সরাসরি বললে এ ছেলে সেই কাজ করবে না। উপরন্তু সব পরিকল্পনা বেরিয়ে পড়ে গোলমাল হয়ে যেতে পারে। তাই আবহাওয়া তৈরি করিয়ে ওকে ঠিক জায়গায় পুশ করে কঠিন কাজটা পরোক্ষ ভাবে করিয়ে নিতে হবে। আর সেই কারণে ক’দিন হল লালুকে চোখে চোখে রাখছে ও। আসলে পুশ করতে হলেও ‘কোথায় পুশ করবে, সেই বোতামটা তো খুঁজে বের করতে হবে।
গত সপ্তাহে লালুর গ্রামে গিয়ে সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছে ঝিরি। বুঝেছে, সেখানে লালুর কোনও টান নেই। সেখানে সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই ওর। তার মানে টাকার জোর যে নেই, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটার টাকা দরকার কতটা, সেটাই জানতে হবে।
ক’দিন আগে লালুকে ফলো করে হাজরা মোড়ে গিয়ে দেখেছে, লালু একজনের সঙ্গে খুব বিপন্ন অবস্থায় কথা বলছিল। একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে এসেছিল দু’জন। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে অল্পবয়সি। আর অন্যজন তিরিশের কাছাকাছি। মহিলাটি একটা দোকানের সিঁড়িতে বসে কাঁদছিল। লালুও কথা বলতে বলতে বসে পড়েছিল ফুটপাথের ওপর। পাশ দিয়ে দু’-একবার হেঁটে গিয়েছিল ঝিরি। তাতে যেটুকু শুনেছে তাতে বুঝেছে যে, কিছু একটা ব্যাপারে এদের টাকার দরকার। যেহেতু মহিলাটি ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়েছিল, তাই ঝিরি অনুমান করেছিল যে, ব্যাপারটা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত। কিন্তু ঠিক কী, সেটা বুঝতে পারেনি। তবে লালুকে দেখে বুঝতে পারছিল যে, ব্যাপারটা গুরুতর।
এবার ব্যাপারটা ঠিক কতটা গুরুতর, সেটাই বুঝতে হবে। সে দিন লালুকে ফলো করেই কেটেছিল দিন। আর সেটাই ভুল হয়েছিল। সে দিন মহিলাটিকে ফলো করলে বরং কাজের কাজ হত।
যাই হোক, ভুল হয়েছে ওর। কী আর করবে! তাই আজও ফলো করছে লালুকে। যদি লালু সেই মহিলাটির কাছে যায়। আসলে সেই মহিলাটি কোথায় থাকে এখনও জানে না ও। সেটা জানা জরুরি। এটাও জানা জরুরি যে, মহিলাটির প্রতি লালুর কতটা টান।
ঝিরি দেখল, লালু একটা বড় চকোলেটের বাক্স কিনল। বাহ্, এটা ভাল। যে-ক’দিন লালুকে ফলো করছে ঝিরি, তাতে কখনওই সে ভাবে রাস্তায় কিছু খেতে দেখেনি ওকে। কালেভদ্রে সিগারেট কিনে খেয়েছে। সেই ছেলে আজ দামি চকোলেটের বাক্স কিনছে কেন! কোনও বাচ্চার জন্য কি? কোন বাচ্চা? সেই বাচ্চাটা?
ঝিরি সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওই তো লালু বেরোল দোকান থেকে। এবার হাঁটছে বড়রাস্তা ধরে। ঝিরি একটু দূরত্ব রেখে পিছু নিল ওর।
সন্ধে কলকাতায় বেশ ভিড় এখন। নর্থের দিকে ফুটপাথে নানা খাবারের দোকান আছে। তার ফাঁক দিয়ে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে লালু। ফোনে কাকে যেন একটা ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু ধরতে পারছে না। নিজের মনেই লালু মাথা নাড়ছে। ও কি বিরক্ত?
কোথায় যাচ্ছে লালু? সামনে তো সোনাগাছি? সেইখানেই কি যাচ্ছে? আচ্ছা, সেই মহিলা কি ওইখানে থাকে?
ভাবতে ভাবতেই ঝিরি দেখল লালু ডান দিকে বাঁক নিল। ঝিরি বুঝল ওর অনুমান ঠিক।
ফুটপাথে নানা পোশাকে মহিলারা দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা মাতালকে দেখল ঝিরি। টলতে টলতে রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে চলেছে। কোনও গাড়িঘোড়া যে ওকে ধাক্কা দিচ্ছে না সেটাই আশ্চর্যের!
আশপাশ থেকে কয়েকজন দালাল-গোছের লোক এগিয়ে আসছে ঝিরির দিকে। কিন্তু ঝিরি পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ওর চোখ লালুর দিকে।
লালুর পায়ে একটা সমস্যা আছে। তাই ছেলেটা খুঁড়িয়ে হাঁটে। হাঁটার জোরও তেমন নয়। ঝিরিও ধীরেসুস্থে হাঁটছে।
ওই লালু বাঁ দিকে বেঁকে একটা গলির মধ্যে ঢুকল এবার। ঝিরিও ঢুকল। এই গলিটা সরু। দু’দিকে মহিলারা খুব সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাশেই একটা ড্রেন। আর তার পাশে ময়লা পড়ে রয়েছে ডাই হয়ে। লালুর দিকে কেউ এগোচ্ছে না। কিন্তু ঝিরির হাত ধরে টানছে কেউ কেউ। কেউ আবার ডাকছে। ঝিরি পাত্তা দিচ্ছে না একটুও।
এই গলিটাতে আলো কম। রাস্তাও ভাঙাচোরা আর নোংরা। লালু এই সব পার করে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সন্ধের আবছায়ায় বাড়ির রংটা বোঝা যাচ্ছে না। লালচে মতো হবে হয়তো। বাড়িটার এক তলায় কয়েকটা মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাজপোশাক খুবই উগ্র। পাশেই একটা চায়ের দোকানে কয়েকটা লোক বসে চা খাচ্ছে।
দোকানদার লোকটা লালুকে দেখে হাত তুলে “লালু ভাই” বলে ডেকে উঠল। ঝিরি দেখল লালুও হাত তুলে লোকটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। বাড়িটার পাশ দিয়ে একটা সরু প্লাস্টার-খসা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। সেখানেও কিছু মেয়ে সিঁড়ির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লালু সিঁড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, “এই বৈশাখী, অঞ্জনা আছে ঘরে? তখন থেকে ফোন করছি ফোন ধরছে না!”
বৈশাখী নামের মেয়েটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আছে মুখে রং মেখে। একটা পাতলা শিফনের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “কমলাদির সঙ্গে মহিলা সমিতিতে গিয়েছে। ছুটির ডাক্তারি পরীক্ষার কাগজপত্র নিয়েছে সঙ্গে। যদি কিছু পাওয়া যায়! তুমি অপেক্ষা করো।”
লালু বিরক্ত হয়ে বলল, “তা হলে ফোন ধরছে না কেন!”
“তা আমি কী জানি!” বৈশাখী বিরক্ত হল, “ওপরে গিয়ে অপেক্ষা করো, না হলে কাটো। ফালতু দিমাগ খেয়ো না। আমার কি এখানে তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিপ ফেললে মাছ উঠবে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাজা ব্যথা হয়ে গেল!”
লালু দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবল। তার পর পা টেনে টেনে উঠে গেল ওপরে। ঝিরি দেখল। ওপরে উঠে আর লাভ নেই। কিন্তু ব্যাপারটা মোটামুটি বুঝতে পারছে। কিন্তু আরও জানতে হবে। স্পষ্ট করে বুঝতে হবে লালুর জীবনের ক্রাইসিস পয়েন্টটাকে।
বৈশাখী নামে মেয়েটা নেমে এসেছে নীচে। গলি পেরিয়ে নিশ্চয়ই বড় রাস্তার দিকে যাবে। ঝিরি এগোল সামনে। মেয়েটা ওকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। আবছায়ার মধ্যে মেয়েটার মুখের চড়া রংটা কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে। মেয়েটা ওকে দেখে হাসল সামান্য।
ঝিরি আরও এক পা এগোল। বোঝাল যে, ওর আগ্রহ আছে। বৈশাখী এবার হাসল বড় করে। হাত দিয়ে শাড়ির আঁচলটাকে সামান্য সরিয়ে, এগিয়ে এল সামনে।
ঝিরিও হাসল পাল্টা। মেয়েটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সস্তা প্রসাধনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এমন জায়গায় আবছায়া গলির মধ্যে এ ভাবে একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আচমকা ঝিরির রিপার কথা মনে পড়ল। রিপা যদি ওকে এই ভাবে দেখত!
“কী, যাবে? পাঁচশো লাগবে। পার শট,” বৈশাখী সোজাসুজি বলল। ঝিরি হাসিটা বজায় রেখে নরম গলায় বলল, “আমি আর-একটু বেশিই দেব…”
“কেন?” বৈশাখী সতর্ক হয়ে গেল। ওকে শেষ করতে না দিয়ে বলল, “বেশি কেন দেবে? আরও কিছু করবে নাকি? ভিডিয়ো করবে নাকি ফোনে? তা হলে তিন হাজার নেব।”
“না না,” ঝিরি ব্যাপারটা সামাল দিতে বলল, “ও সব না। একটু কথা বলব জাস্ট!”
“কথা!” বৈশাখী সতর্ক হল, “কেন? কে তুমি? পুলিশ?”
“না পুলিশ নই। তোমায় হাজার টাকা দেব,” ঝিরি সোজা বৈশাখীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “জাস্ট কয়েকটা প্রশ্ন!”
“কয়েকটা কথার জন্য হাজার!” বৈশাখী বলল, “বারোশো নেব!”
“বাদ দাও তা হলে। আমি অন্য জায়গা থেকে জেনে নেব,” ঝিরি মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিতে গেল।
“আরে!” বৈশাখী হাত ধরে টানল ওকে, “ঠিক আছে ওতেই হবে। চলে যেয়ো না।”
ঝিরি হাসল, “এখানে না বলে অন্য কোথাও গেলে হবে?”
“বড় রাস্তায় বুড়োদার রোলের দোকান আছে। আমায় রোল খাওয়াবে? ওখানে দাঁড়িয়ে কথাও বলা যাবে।”
ঝিরি বলল, “ঠিক আছে, চলো। কিন্তু একটা কথা। যা জিজ্ঞেস করব তা আমাদের মধ্যেই থাকবে। আর কাউকে বলবে না।”
“ঠিক আছে,” বৈশাখী মাথা নাড়ল।
“তোমায় বিশ্বাস করা যায় তো?” ঝিরি সতর্ক হল।
বৈশাখী রাগের সঙ্গে তাকাল ওর দিকে। বলল, “না বিশ্বাস করার কী আছে! কত লোকে কত কী করতে আসে এখানে। আমরা কি সে সব পাঁচ কান করে বেড়াই! সব বলে বেড়ালে তোমরা ভদ্রলোকেরা টিকতে পারবে সমাজে! যা বলবে আমাদের মধ্যেই থাকবে। কাউকে বলব না, ঠিক আছে?”
