২৩. লালু
আজকাল কাজ ছাড়া একটুক্ষণ বসে থাকলেই মাথার ভেতরটা কেমন যেন করে লালুর। মনে হয় কে যেন একটা বিছে ভরে দিয়েছে খুলির মধ্যে! এমন কষ্ট হয় যে কী আর বলবে! ছুটির মুখটা মনে পড়ে। ওইটুকু একটা মেয়েকে শেষে কিনা বিনা চিকিৎসায় চলে যেতে হবে? কী করবে ও? কার কাছে যাবে? ম্যাডামকে কি বলবে?
আজ সারা দিনে কয়েকবার ম্যাডামকে বলার চেষ্টা করেছে লালু। কিন্তু ঠিক ফাঁক পায়নি। আসলে সে দিন কবির সঙ্গে ম্যাট্রেস কিনতে যাওয়ার সময় যে কথা হয়েছিল, তার পর থেকেই কেবল মনে হচ্ছে ম্যাডামকে অন্তত বলে দেখতে পারে।
লালু জানে একটা একটা করে দিন চলে যাচ্ছে। বিপদ খুব ধীর কিন্তু নিশ্চিত পদক্ষেপে এসে দাঁড়াচ্ছে ওদের সামনে। অঞ্জনার অবস্থা চোখে দেখা যাচ্ছে না। লালুর ভয় লাগছে যে, ছুটির আগে অঞ্জনার না কিছু হয়ে যায়!
লালু ঘড়ি দেখল। সাড়ে আটটা বাজে। এখন সন্ধেবেলা হলেও ওদের এই আলিপুরের বিশাল কম্পাউন্ডের মধ্যে যেন রাত অনেক তাড়াতাড়ি নামে।
কবি এখনও ফেরেনি। ফিরলে একটু ওর সঙ্গে বসা যেত। হ্যাঁ, কবি বিশেষ কথা বলে না, কিন্তু শোনে তো! সেটাই যে আসল। জীবনে বলার লোক প্রচুর হলেও শোনার লোক যে কম।
লালু উঠল। নাঃ, এই টেনশন সহ্য করা যাচ্ছে না আর। চুপচাপ বসে থাকলে আরও মুশকিল হচ্ছে। বিছেটা কামড়াচ্ছে ক্রমাগত। যা হয় হবে, কিন্তু ম্যাডামকে একবার বলেই দেখবে। ম্যাডাম এই সময়টায় ফ্রি থাকে ও জানে। ম্যাডাম ক’দিন বেশ চুপচাপ আছে। যেন কিছু নিয়ে চিন্তিত। মেয়ের সঙ্গে ঝগড়ার পরেই এমনটা হয়ে গিয়েছে যেন। আসলে সে দিন সকালে মা মেয়ের ঝগড়াটা এমন হয়েছিল যে, গাড়িতে বসে ম্যাডামের জন্য অপেক্ষা করতে করতেও কানে এসেছিল লালুর।
কিন্তু সত্যি বলতে কী, এখন এত সব ভাবার মতো মনের অবস্থা ওর নেই। সামান্য তো ঝগড়া! ও মিটে যাবে। তার উল্টোদিকে একটা বাচ্চা মেয়ের জীবনের ব্যাপার। তাই যা থাকে কপালে, আজ ও ম্যাডামকে বলেই ফেলবে।
আসলে অনেক ভেবে দেখেছে লালু। ম্যাডাম ছাড়া আর কেউ নেই যাকে বলতে পারে। ম্যাডামদের অনেক টাকা। ওদের কাছে দশ-বারো লাখ টাকা কোনও ব্যাপার নয়। স্যর, মানে বীরেন্দ্র মাঝে মাঝে ওয়াইনই কেনে এক-একটা বোতল দেড়-দু’লাখ টাকার! আর লালু তো পালাচ্ছে না। ওর মাইনে থেকে কেটে নিক টাকা মাসে মাসে। লালু শোধ দিয়ে দেবে বলেই টাকা চাইবে।
ঘরে একটা অ্যালুমিনিয়ামের আলনা আছে। সেখান থেকে ফুলহাতা একটা টি শার্ট নিয়ে পরে নিল লালু। ম্যাডামের কাছে যাবে। ও আবার নিজেকে বলল, আজ সারা দিন যেটা বলতে পারেনি, এখন বলতেই হবে। এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
ছোট ঘরটার এক পাশে একটা টেবিল আছে। সেখান থেকে মোবাইলটা তুলল লালু। অভ্যেসবশত সময় দেখল। আর ঠিক তখনই দরজায় আলতো একটা টোকা পড়ল। এখন আবার কে এল! জিনি নাকি! মাঝে মাঝে জিনি এটা-ওটা খাবার তৈরি করলে দিয়ে যায়। রাতে যদিও বড় বাড়ির বাইরের দিকে কর্মচারীদের খাওয়ার জায়গায় লালু খায়, কিন্তু তাও জিনি কিছু দিলে সে দিন সেটা দিয়েই রাতের খাওয়া সেরে নেয়। খাওয়ার ঘরে আর যায় না।
জিনি মেয়েটা খুব ভাল। মানে, ওকে মাঝে মাঝে খাবার দেয় বলে ভাল নয়, সত্যিকারের মন ভাল মেয়েটার। এখানে ওর বাবা মানে তপনকাকুকে খুব অপমানের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। সে দিন নাকি মারও খেয়েছে বীরেন্দ্রর কাছে! লালু ভাবতেই পারে না। এমন কেউ করে? এই বাড়ির মালিকরা জানোয়ার! জিনির জন্য কষ্ট লাগে লালুর।
গতকাল জিনির সঙ্গে এই নিয়ে কথা হচ্ছিল লালুর।
ওদের ওই ছোট্ট বাগানটায় বসে জিনি বলছিল, কী ভাবে বীরেন্দ্র ওর বাবাকে হেনস্তা করেছে। কী ভাবে মেরেছে। তার পর এ-ও বলেছিল যে, কবি এসে কী ভাবে সামলেছিল বাবাকে।
কথা বলতে বলতে জিনির চোখে জল এসে গিয়েছিল।
লালু ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখেছিল। মেয়েটার কষ্টটা ও বোঝে, এখানে থাকার মধ্যে যে একটা সূক্ষ্ম অপমান সারাক্ষণ হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়, সেটা জিনিকে কষ্ট দেয়। আসলে প্রকৃত শিক্ষা তো মানুষের মধ্যে মান-অপমান বোধটাও তৈরি করে দেয়।
লালু বলেছিল, “আরে পাগলি, যা হয়ে গিয়েছে সেটা নিয়ে ভাবিস না। যত ভাববি কষ্ট পাবি!”
জিনি চোখের কোণ দুটো আলতো করে মুছে বলেছিল, “আমি যে দিন চাকরি পাব, মা-বাবাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাব। আর লালুদা, তুমিও অন্য জায়গায় কাজ খুঁজে নিতে পারো না?”
লালু হেসেছিল এবার। বলেছিল, “উপায় থাকলে কি আর এখানে থাকতাম রে?”
জিনি ঘুরে বসে জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার কাজটা ঠিক কী বলো তো? ম্যাডামের সঙ্গে সারাক্ষণ ঘোরো? এটা-ওটা করে দাও?
এটা কোনও কাজ?”
লালু কী বলবে বুঝতে পারেনি প্রথমে। তার পর বলেছিল, “ওই নানা কাজে হেল্প করতে হয়। অনেক সাপ্লায়ারের কাছে যেতে হয়। বিল জমা দিতে হয়। ব্যাঙ্কের কাজ আছে। আরও নানারকম আর কী।”
জিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “আমি জানি চাকরি পাওয়া খুব মুশকিল। চারিদিকে অবস্থা খুব খারাপ। তাও যদি পাও, এখানে থেকো না আর। বাবা যে কবে এখান থেকে মুক্তি পাবে! বাবার মিলটা বন্ধ না হলে এখানে আমাদের আসতে হত না।”
পুরো ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য লালু বলেছিল, “এসে ভালই হয়েছে বল, কবির সঙ্গে আলাপ হয়েছে তোর!”
কবির কথাতে ওই আবছায়ার মধ্যেও জিনির চোখে যেন অন্য রকম একটা আলো দেখেছিল লালু।
তাও জিনি রাগের গলায় বলেছিল, “ছাড়ো তো! বাবুর সারাক্ষণ বিশাল ঘ্যাম! যেন উদ্ধার করে দিচ্ছে ভাল করে কথা বলে! এত কিসের লেজ মোটা গো তোমার বন্ধুর?”
লালু হেসে বলেছিল, “তোর সঙ্গে তো কথা হয়। জিজ্ঞেস করিস তুই।”
“ভারী বয়ে গিয়েছে!” জিনি বলেছিল, “সে দিন পিসির টেস্ট রেজাল্ট আনতে গিয়েছিল আমার সঙ্গে। কোথায় আমায় নিয়ে আসবে, না, কী একটা কাজ আছে বলে উনি লেজ তুলে ছুট লাগালেন। খুব ঘ্যাম। এত অহঙ্কার কেন কে জানে! আমি নিজে থেকে যাই বলেই এমন করে। আমি দেখেছি এটা। কেউ কাউকে গুরুত্ব দিলেই সে অসভ্যতা শুরু করে।”
“তাই? অসভ্যতা করে? তা এই যে বললি লেজ মোটা! সেটা আবার তুলল কী করে?” লালু জোরে হেসেছিল এবার।
“এমন কেউ করে! সব দিক থেকে এই জায়গাটা অসহ্য হয়ে উঠেছে। তুমি দেখো, আমি চাকরি পেয়েই এখান থেকে চলে যাব,” জিনি জেদের গলায় বলেছিল।
লালু মাথা নেড়েছিল নিজের মনে। এমন যদি আমাদের জীবনে সত্যি হত! যদি আমরা যেমন যা চাইতাম সেরকমই হত! জীবনটা কী ভালই না হত। কিন্তু তা তো হয় না।
জিনি উঠে দাঁড়িয়েছিল, “যেখানে সম্মান নেই, সেখানে কেন থাকবে কেউ!”
লালু বোঝে যে, জিনির নানা রকম কষ্ট আছে ঠিকই, কিন্তু তাও সে ভাবে ওকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি। তাই ওকে বোঝানো সম্ভব নয় যে, কেন মানুষ চাকরির ক্ষেত্রে অপমানিত হলেও সেই কাজ ছেড়ে দিতে পারে না। আসলে আমাদের পেট একটা বিশাল বড় চুল্লি। তাকে ক্রমাগত জ্বালিয়ে রাখতে মানুষকে তার পরিশ্রমের সঙ্গে সঙ্গে নিজের মানসম্মানও সেই চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে জোগান দিয়ে যেতে হয়।
জিনি চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, “সত্যি বলছি আমি চাকরিটা পাই একবার, তার পর দেখো কী করি!”
লালু তার পরেও কিছুক্ষণ একা বসেছিল ওই বাগানে! বড় বাড়ি থেকে হালকা স্বরে ভেসে আসছিল ইংরেজি গানের সুর। ম্যাডাম শোনে এই গান। চারিদিকের এই মায়াবী পরিবেশের মধ্যে গানের সুর যেন সব কিছুকে আরও মোহময় করে তুলেছিল। তবু কিছু ভাল লাগছিল না ওর। ও বুঝতে পারছিল, জিনি যেমন ওকে সব বলে কিছুটা হলেও হালকা হয়ে গেল, তেমন কিন্তু ওর হওয়ার উপায় নেই। ওকে এই পাথরের মতো ঠান্ডা আর ভারী জীবনটাকে একার কাঁধে তুলে নিয়ে হেঁটে যেতে হবে।
আবার টোকা পড়ল দরজায়। এবার আর একটু জোরে। যেন সম্বিৎ ফিরল লালুর। ও মোবাইলটা আবার টেবিলে রেখে দু’পা এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল।
আরে বিন্দি যে!
সামনের ছোট্ট বারান্দার আলোতে বিন্দিকে কেমন যেন লাগছে। কী হয়েছে মেয়েটার? লালুর আচমকা মনে পড়ে গেল কয়েক দিন আগের সেই শেষ বিকেলটার কথা। অঞ্জনার সঙ্গে দেখা করার জন্য ও হাজরা মোড়ে যাওয়ার তাড়ায় ছিল, সে দিন বিন্দি এসেছিল কিছু বলতে, কিন্তু বলেনি। কী বলতে এসেছিল মেয়েটা? কোনও বিপদে পড়েছে কি? তা ছাড়া আর-একদিনও সেই বীরেন্দ্র ওকে ডেকে কিছু বলার পর, বিন্দি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে গিয়েছিল। কেন? ব্যাপারটা কী?
লালু বলল, “কী রে, তুই!”
“তুমি ব্যস্ত আছ?” বিন্দির গলাটা কেমন যেন কাঁপছে। “ঘরে আয়।” লালু সরে দাঁড়াল। বুঝল ম্যাডামের কাছে যেতে ওর দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু করার নেই। বিন্দি মেয়েটা ভাল, ওকে এড়ানো যাবে না।
বিন্দি ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর বসল। মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছে। জল-ভর্তি গ্লাসের মতো হয়ে আছে চোখ। একটু টোকা দিলেই গড়িয়ে পড়বে। লালু কিছু বলল না। সময় দিল বিন্দিকে। কিছু একটা হয়েছে। তাই এমন করছে মেয়েটা।
বিন্দি ওড়নার কোণা দিয়ে চোখের কোণ দুটো টিপে মুছল। তারপর ঢোক গিলে বলল, “লালুদা তোমায় একটা কথা জানাতে চাই আমি। অনেক দিন ধরেই বলতে চাই। কিন্তু পারছিলাম না। তবে কয়েকদিন আগে এমন একটা ব্যাপার হল যে, আমি তোমায় না বলে পারছি না।”
“কয়েকদিন আগে? মানে সেই চপ কিনে ফেরার সন্ধেবেলা?” লালু অবাক হল, “আগে বলিসনি কেন?”
“কারণ, আমি ভাবছিলাম যে বলা ঠিক হবে কি না! কিন্তু আজ আবার ফোন করে এমন বলল! কিন্তু তুমি বলো কাউকে বলবে না! প্লিজ়, বলো বলবে না!” বিন্দির গলাটা কাঁপল আবার।
লালু বিছানার অন্যদিকে বসল এবার। বলল, “বলব না। কথা দিচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা কী? কী হয়েছে সেটা তো বল।”
বিন্দি বলল, “স্যর… স্যর লোকটা জানোয়ার!”
এই ভয়টাই করছিল লালু। বুঝতে পারছিল এমনই কিছু হতে পারে।
বিন্দি বলল, “দীর্ঘ দিন ধরে আমার ওপর অত্যাচার করছে। আমার শরীরটা যেন মাংসের তাল!”
“মানে? তোকে কী করেছে?” লালু জিজ্ঞেস করল, “গায়ে-ফায়ে হাত… মানে জোর করে…
“না লালুদা,” বিন্দি মাথা নাড়ল, “ও নিজে কিছু করে না। মানে কিছু করার ক্ষমতা আর নেই! স্যরের শরীর অকেজো। কোনও একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। তারপর থেকে হয়ে গিয়েছে অমন।”
লালু অবাক হল। হ্যাঁ এই লোকটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কয়েকবার। এর ওপর খুনের চেষ্টাও হয়েছে। সেই কোনও একটা থেকেই কি অকেজো! তাই কি ম্যাডাম পাখিদার থেকে ছেলে আনায়!
বিন্দি বলল, “নিজে কিছু করে না। কিন্তু বাইরের লোক আনিয়ে তাদের করায়… আর নিজে বসে বসে দেখে!”
“কী বলছিস!” লালুর মাথা ঝন্ঝন্ করে উঠল! মনে হল কে যেন সটান থাপ্পড় মারল ওকে।
বিন্দির চোখে জল এল আবার। বলল, “বেশ কিছুদিন ধরে চলছে এসব। আমার যে কী লজ্জা লাগে! কিন্তু জানোই তো কী রাক্ষস টাইপের লোক! কয়েকবার বলেছি পারব না। তাতে এমন মেরেছে! মেয়েদের যারা জোর করে এই কাজে ঠেলে দেয় তাদের যে কী কষ্ট তুমি বুঝবে না লালুদা। জানো এই সবের বিনিময়ে বাড়িতে পাঠানোর জন্য একস্ট্রা টাকা দেয় আমায়। মানে… আমি কি সেইরকম মেয়ে? সব নিয়ে খুব প্যাঁচালো অবস্থায় পড়ে গিয়েছি। জানোই তো বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে কেমন অসুবিধের মধ্যে চলে!”
লালু চোয়াল শক্ত করল। সত্যি এই কাজে যারা মেয়েদের এ ভাবে বাধ্য করে, তারা অমানুষ! অঞ্জনার মুখটা ভেসে উঠল সামনে। এত রাগ হল ওর! মনে হল বীরেন্দ্র হচ্ছে সেই রাক্ষসদের প্রতিনিধি, যারা নারীমাংসের ব্যবসা করে। মাথাটা দপদপ করতে লাগল ওর। ছুটির কষ্টের সঙ্গে এসে মিশল এই যন্ত্রণা।
লালু বলল, “এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার! কী বলব বুঝতে পারছি না।”
“হ্যাঁ,” বিন্দি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল মুছল আবার। বলল, “এমনকি, বিজনেসের গেস্টদের নিয়ে এসেও ও সব করায় আর বসে বসে দেখে। তোমায় আমি বলে বোঝাতে পারব না কী জঘন্য অবস্থা!”
লালু বলল, “এত দিন সহ্য করছিস কী করে?”
“জানি না!” বিন্দি মাথা নাড়ল, “তার পর নিজের নানান কাজ আমায় দিয়ে করায়। কে কী করছে সে সবের খবরাখবর নেওয়ায়। নজর রাখতে বলে।”
“রিসেন্টলি কিছু হয়েছে? সাহেব তো এখন নেই, বাইরে গিয়েছে,” লালু নরম ভাবে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” বিন্দি মাথা নাড়ল, “আজকাল রাক্ষসটার আরও খাঁই বেড়েছে। আজ… আজ ফোনে বলে কী…” বিন্দি আবার মাথা নামিয়ে কেঁদে ফেলল।
লালু উঠে গিয়ে মাথায় আলতো করে হাত দিল ওর। বলল, “কী হয়েছে, বল।”
বিন্দি বলল, “আজ বলে বাইরের ক্লায়েন্ট আসবে। তার সামনে দুটো ছেলের সঙ্গে… দুটো ছেলের সঙ্গে…” আর কিছু না বলে বিছানায় মুখ গুঁজল ও।
লালু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী শুনল ও এ সব! কোন বাড়িতে কাজ নিয়েছে ও! যৌন বিকৃতি কোন জায়গায় নিয়ে গিয়েছে এদের!
“এ সব করতে পারবি না বলিসনি?” লালু চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল।
বিন্দি মাথা গোঁজা অবস্থাতেই মাথা নাড়ল।
লালু বলল, “উঠে বোস। আর এই কাজ ছেড়ে দে তুই। এখানে কাজ করতে হবে না।”
“সেটাও ভেবেছি। কিন্তু বোনের বিয়ে। স্যর টাকা দেবেন। দিয়েছেনও। মা বোনরা তাকিয়ে আছে। ওরা তো জানে না আমাকে কোন নরক ঘেঁটে টাকা আনতে হচ্ছে! এখন কাজ ছেড়ে দিলে বোনের বিয়ে-টিয়ে সব আটকে যাবে। কী যে হবে!”
লালু ভুরু কুঁচকে বলল, “ম্যাডামকে বল। এটা ম্যাডামের জানা উচিত।”
বিন্দি মাথা তুলে ভেজা চোখে বলল, “ম্যাডাম জানে না ভেবেছ? সব জানে! দু’জনে দু’জনেরটা সব জানে।”
“মানে?” লালু অবাক হয়ে তাকাল।
বিন্দি বলল, “এটাই যে, ম্যাডাম ছেলে নেয়। সেটা কি জানে না স্যর? তুমি যে যোগাযোগ করিয়ে দাও, সেটা কি জানে না স্যর? দু’জনে দু’জনের লাইফে নাক গলায় না। যেমন থাকতে চায় থাকতে দেয়। স্যর জানে, সে কী পারে না। তাই নিজের বউয়ের ওই সব ব্যাপারে ঢোকে না। আমি ম্যাডামকে বলেছিলাম। ম্যাডাম বলেছিল যে, এ সব নিয়ে কিছু করতে পারবে না। তেমন হলে যেন কাজ ছেড়ে দিই। আর শুধু তাই নয়, স্যরকেও বলে দিয়েছে। স্যার আমায় বেল্ট দিয়ে মেরেছে সেজন্য। বলেছে আমি যদি এ সব আর কাউকে বলি তো মেরে এমন জায়গায় পুঁতে দেবে যে, কেউ কোনও দিন খুঁজে পাবে না। জানো লালুদা, আমি ভেবেছিলাম এ সব কথা আমি উর্জাদিদিকে জানাব। কিন্তু আমারও প্রাণের ভয় আছে। স্যার তো রাক্ষস! আমি জানি রাক্ষসরা কী করে।”
লালু মাথায় হাত দিয়ে আবার বসে পড়ল বিছানায়। সত্যি ওরা কী করতে পারে! টাকার পায়ের তলায় পৃথিবী চাপা পড়ে আছে! ও নিজে ইতিহাসের ছাত্র, ইতিহাস জুড়ে ও এ সবই দেখেছে। বীরেন্দ্র এখন এখানে নেই। তাই হয়তো ভরসা করে বিন্দি এসে ওকে এ সব বলছে। কিন্তু ও-ই বা কী করবে!
বিন্দি বলল, “আমি জানি তোমার কিছু করার নেই। তাও কাউকে তো বলব, বলো! আমার আর কে আছে এখানে! তুমি বিরক্ত হোয়ো না লালুদা। তোমায় আমি নিজের দাদা হিসেবেই দেখি। তাই বললাম।”
লালু বলল, “আমার অসহায় লাগছে রে! এতগুলো দিন ধরে এ সব ঘটছে আর আমি কিছু জানি না!”
“জানবে কী করে?” বিন্দি বলল, “আমি তো বড় বাড়িতে থাকি। সেখানে তো সহজে তোমাদের কেউ ঢুকতে দেয় না। আমিও চাইনি এ সব বলে তোমায় ডিস্টার্ব করতে। কিন্তু আজ ফোনটা পেয়ে আর পারিনি গো!”
লালুর মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবী ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। মনে হয় শ্বাস নিতে পারছে না। তখন ওর ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে। সেই আবছা জ্ঞানের বয়স থেকে চারিদিকে তো শুধু অন্যায় আর মনখারাপই দেখে যাচ্ছে। দেখে যাচ্ছে কী ভাবে একটা শ্রেণি অন্য একটা শ্রেণিকে গলা টিপে ধরে আছে সারাক্ষণ! এই সব বাধা-বন্ধন কাটাতেই লালুর মাঝে মাঝে মনে হয় বোমার মতো ফেটে পড়ে সব কিছু ধ্বংস করে দেয়!
বিন্দি উঠল এবার। বলল, “তুমি কোথাও যাচ্ছিলে। আমি তোমায় বেকার আটকে দিলাম।”
“দূর!” লালু মাথা নাড়ল, “কিছু আটকাসনি। আমি ম্যাডামের কাছে যাচ্ছিলাম। চল, এক সঙ্গেই বেরোই।”
“ম্যাডামের কাছে।” বিন্দি অবাক হল, “কেন গো?”
লালু সামান্য ইতস্তত করল, তার পর বলল, “ওই কিছু টাকার দরকার আসলে। তাই ধার চাইব ভাবছি।”
“ধার!” বিন্দি কী যেন বলতে গিয়েও বলল না।
“কেন? কী হয়েছে?”
বিন্দি একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, “আসলে ম্যাডামেরও মুড খারাপ। তবে তুমি তার কাছের লোক। তোমায় মানা করবে না। কিন্তু মুডটা…”
“কেন বল তো!” লালু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? দেখলাম কয়েকদিন বেশ চুপচাপ আছে।”
“মেয়ে বেঁকে বসেছে বিয়ে করতে। ওদের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করবে না,” সামান্য চাপা গলায় বলল বিন্দি, “বাইরে যাওয়ার আগে আমি সাহেবকে কথা বলতে শুনেছি, দরকারে মেয়েকেও ছাড়বে না। সেই কারণে ম্যাডাম চিন্তায় আছে। মেয়েও তো ঠ্যাঁটা। সে দিন উমেশ মানে ওই পাত্র এসেছিল। তাকে বাড়ি থেকে দূর করে দিয়েছে। সেও সিনেমার মতো ডায়লগ দিয়ে গিয়েছে। আমি শুনেছি আড়াল থেকে। উর্জাদিদি রাতে লুকিয়ে কাকে যেন ফোন করে। স্যরকে যদিও আমি জানাইনি। জানালেই জিজ্ঞেস করবে, কাকে করে? কী বলে? না বলতে পারলেই আবার গালি দেবে!”
লালু টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে পকেটে ঢোকাল। তার পর দু’জনে মিলে বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে।
এখানে দরজায় ইয়েল লক লাগানো। বাইরে থেকে টেনে দিলে বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ সময়ে ঘরের দরজা খুলেই রাখে লালু। কিন্তু আজ বন্ধ করে দিল টেনে। প্যান্টের পকেটে দরজার চাবি থাকেই। ফলে খুলে ঢুকতে অসুবিধে হবে না।
নীচে জিনি দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছিল। ওদের দেখে, হাসল। হাত নাড়ল। তারপর ফোনটা কানের থেকে সরিয়ে বলল, “কাল রোল বানাব। দিয়ে আসব তোমায় লালুদা!”
লালু কোনওমতে হেসে মাথা নাড়ল। আসলে কিছু ভাল লাগছে না। বিন্দির কথাগুলো এখনও মাথার মধ্যে ধাক্কা খাচ্ছে!
বিন্দি বলল, “আর আমায়! আমি খাব না?”
“খাবে তুমি?” জিনি উজ্জ্বল মুখে বলল, “সন্ধে সাতটা নাগাদ এসো প্লিজ। আমি বানিয়ে রাখব কিন্তু।”
লালু বড় বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখল, জিনি আবার ফোনে ফিরে গিয়েছে। লালু পাশে হাঁটতে থাকা বিন্দির দিকে তাকাল। মেয়েটার মনের জোর আছে। এ সব সহ্য করে এখানে পড়ে আছে ঠিক। ওর ঘরে এসে কান্নাকাটি করল, কিন্তু জিনির সামনে ঠিক নিজেকে সামলে নিয়েছে।
বড় বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে। যেন বিশাল কোনও জাহাজ! লনের মধ্যে দিয়ে নুড়ি ফেলা রাস্তা থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি উঠে গিয়েছে বড় চওড়া খোলা বারান্দায়।
স্বভাবসিদ্ধ আড়ষ্টতায় লালু বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল। আসলে ম্যাডাম না ডাকলে যায় না ভেতরে। মানে সেরকমই নির্দেশ থাকে। আর এখন তো ম্যাডাম ডাকেনি। ও নিজের দরকারে এসেছে।
বিন্দি বারান্দা থেকে কাচের দরজা পেরিয়ে মূল বাড়িতে ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। তার পর পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, “দাঁড়িয়ে পড়লে যে? ভেতরে আসবে না?”
লালু বলল, “আমি আসলে নিজের কাজে এসেছি। ম্যাডাম ডাকেননি। তুই একটু ম্যাডামকে বলবি যে, আমি এসেছি?”
বিন্দি হাসল, “তুমি এমন টেনশন করছ কেন? ম্যাডাম তোমায় ‘না’ করবে না। ম্যাডাম তোমার ওপর কত ভরসা করে!”
“বলছিস?” লালু যেন একটু সাহস পেল! বিন্দি বলল, “হ্যাঁ। বিশাল ভরসা করে।”
“তা হলে তুই একটু খবর দে। না বললে তো ঢুকতে দেবে না…” লালু উত্তেজিত হয়ে ঠোঁট চাটল।
বিন্দি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ্যাঁ এটাই নিয়ম। হুটহাট করে এই বাড়িতে ঢোকার পারমিশন নেই! ও বলল, “ঠিক আছে দাঁড়াও, আমি জিজ্ঞেস করে আসছি।”
বিন্দি চলে গেল। বাড়ির ওপরতলা থেকে ইংরেজি গান ভেসে আসছে হালকা। কী গান জানে না লালু। ইংরেজি গান ওর ভাল লাগে না। ওর আর ডি বর্মন আর শঙ্কর এহসান লয় ভাল লাগে।
“কী রে, তুই!”
লালু সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। এবার দেখল বাড়ির ভেতর থেকে কবি বেরিয়ে আসছে। লালু মনে মনে যেমনই হয়ে থাকুক না কেন, সবার সামনে ও নিজেকে হাসিখুশি আর ঠিকঠাক রাখে। কাউকে বুঝতে দেয় না ওর মনের মধ্যে কী চলছে। একটা জিনিস বোঝে লালু, এই পৃথিবীতে সবাই একা। কারও কিচ্ছু এসে যায় না অন্যের কী হল সেটা নিয়ে। সবাই ভদ্রতার আড়ালে নিজের নিস্পৃহতাকে লুকিয়ে রাখে।
কবি এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। মুখ-চোখে পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট। বীরেন্দ্র নেই, হয়তো ওকে কাজ দিয়ে গিয়েছে কিছু। একটা জিনিস ও দেখেছে যে, কবি কিন্তু এই বাড়িতে ইচ্ছেমতো যায়-আসে। মানে, ওকে বীরেন্দ্র কিছু বলে না। লালু বোঝে কবি বীরেন্দ্রর খাস লোক হয়ে উঠেছে! কিন্তু এখন কী কাজ এখানে ওর! বীরেন্দ্র তো নেই!
কবি জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করবি?”
“হ্যাঁ, তুই এখানে?” লালু না চাইতেও যেন জিজ্ঞেস করে ফেলল। কবি বলল, “কিছু পেপার্স স্যর দিয়ে গিয়েছিলেন। ব্যাঙ্কের কাজের পেপার্স । কাজ হয়ে গিয়েছে তাই স্যরের স্টাডিতে রেখে এলাম!”
লালু বুঝল, এই ছেলেটাকে বীরেন্দ্র বেশ বিশ্বাস করে। না হলে এতটা অ্যাকসেস দিত না।
লালু মাথা নাড়ল, তার পর কথা ঘোরাতে বলল, “রোল খাবি?”
“কী!” কবি অবাক হল, “রোল! এখন!”
লালু বলল, “না কাকা, এখন না। কালকে। খাবি?”
কবি উত্তর না দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। লালু বুঝতে পারল, কবি বোঝার চেষ্টা করছে কথাটা কোনদিকে যাবে। ভাল ছেলে কবি । সরল। কিন্তু লালু ওর সঙ্গে এমন এমন ইয়ার্কি মারে যে, ও বোঝার চেষ্টা করে কোন কথার কী মানে। এই এখন যেমন রোলের কথা শুনেই ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। খোলসা করে জিজ্ঞেস করছে না ব্যাপারটা কী!
লালু বলল, “কী রে বল? খাবি? কাল সন্ধে সাতটার সময়। দারুণ রোল। গৃহপালিত রোল। খেলে বুঝবি।”
“গৃহপালিত!” কবি ঘাবড়ে গেল।
“আরে শালা, বোঝে না!” লালু হাসল সামান্য, “জিনি বানাবে। কাল। তোকেও বলবে শিওর। আমাকে তো বলেছে। আমি যাব খেতে। তুই? যাবি না?”
কবি বিরক্ত হল এবার, “সারা দিন পরে এ সব ভাল লাগে না।”
“যা ব্বাবা!” লালু বলল, “তা হলে দিনের শুরুতেই বলব। মনে মনে তো খুব খুশি। ওরকম একটা মেয়ে সিগনাল দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুখে তোর ঢ্যামনামো। তুই বল একটা কথা, ওরকম মেয়ে তুই নিজে স্কোর করতে পারতিস?”
“খালি বাজে কথা তোর!” বলে কবি ভুরু কুঁচকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেল।
কিন্তু লালু যেতে দিল না। হাত ধরে টেনে কবিকে দাঁড় করাল। বলল, “খালি রাগ করিস। ট্রান্সফরমার এত গরম কেন রে! শোন না, তোর কেসটা কী? তোর কি মেয়েদের পছন্দ নয়?”
কবি বলল, “সারাক্ষণ এ সব কী বলিস! আমার ভাল লাগে না।”
“আচ্ছা আচ্ছা। গরম হচ্ছিস কেন? তুই রোল না খেয়ে বরং কাল কোল্ড ড্রিঙ্ক খাস। আমি জিনিকে বলে দেব। তুই টেনশন নিস না,” লালু হাসল ।
কবি বিরক্ত হয়ে কিছু বলত, কিন্তু পারল না। কারণ, বিন্দি গলা তুলে ঠিক তখনই লালুকে ডাকল, “লালুদা, তুমি এসো। ম্যাডাম ডাকছেন।”
কবি কিছু না বলে চোখের ইশারায় লালুকে যেতে বলে, নিজে ছোট বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
লালু সামান্য মাথা ঝাঁকাল। যতই ইয়ার্কি করুক, ভেতরে টেনশন হচ্ছে। সঙ্গে বিন্দির ব্যাপারটা শোনার পরে রাগও। কিন্তু এখন ওর নিজের সমস্যার ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়ার দরকার। ম্যাডামের কাছে সমস্যাটা গুছিয়ে বলা দরকার। তবে ভয় হচ্ছে এই ভেবে যে, ম্যাডাম কী বলবেন কে জানে! যদি ‘না’ করে দেন তা হলে ছুটিটার কী হবে!
লালু আর ভাবতে পারল না। ও জুতোটা বাইরে খুলে রেখে ঘরের মধ্যে ঢুকল।
বিন্দি বলল, “ম্যাডাম নীচের বসার ঘরে আছেন। আর লালুদা, আমি যা বললাম কাউকে বোলো না প্লিজ!”
“কাকে বলব?” লালু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পর বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
বসার ঘরের আলোটা কমানো আছে। তার মধ্যে কৌশানি একটা নীল রঙের সাটিনের নাইট গাউন পরে বসে আছে। গান বাজছে ইলেক্ট্রনিক রেকর্ড প্লেয়ারে। কৌশানির সামনে একটা ওয়াইন গ্লাসে অর্ধেক গাঢ় বাদামি রঙের তরল।
লালু গিয়ে সামনে দাঁড়াল। বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার হাতি এক সঙ্গে ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। ও যে-কথাটা বলবে সেটা শুনে ম্যাডাম কী বলবে? খুব রেগে যাবে কি? নাকি টাকাটা দিয়ে দেবে? চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দেবে না তো!
কৌশানি সামনের টেবিলে রাখা রিমোটটা তুলে মিউজিকটা বন্ধ করে দিল। তার পর কাচের গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই এ সময়ে!”
লালু মাথা নেড়ে সামান্য নার্ভাস গলায় বলল, “ম্যাডাম, আমার খুব দরকার। তাই…”
“কী দরকার? ছুটি চাই?”
“না ম্যাডাম,” লালু মাথা নাড়ল, “আসলে ম্যাডাম। আমার এক দিদি আছে। তার মেয়ে…. মানে…” লালু মনে মনে গুছিয়ে নিল অঞ্জনার সঙ্গে মিথ্যে মিথ্যে সম্পর্কটা। কারণ, অঞ্জনা কে এবং ওর সঙ্গে কী সম্পর্ক, সেটা কিছুতেই বলা যাবে না ।
ম্যাডাম ওয়াইনে চুমুক দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
লালু বলল, “তার মেয়ে…. মানে ছুটি…. খুব অসুস্থ। এক ধরনের ক্যানসার হয়েছে। তবে এখনও খুব গাড়িয়ে যায়নি। চিকিৎসায় ঠিক হয়ে
যাবে। শুধু…” লালু ঢোঁক গিলল, “অনেক টাকা লাগবে। আপাতত পাঁচ লাখ। তার পর আরও ছয়-সাত। মানে টোটাল বারো মতো।” ম্যাডাম গ্লাসটা এবার নামিয়ে রাখলেন সামনের টেবিলে। তার পর বললেন, “তো, আমায় কী করতে হবে?” কচলে বলল, “যদি টাকাটা ধার দেন! আমি “ম্যাডাম,” লালু হাত শোধ করে দেব ম্যাডাম। মেয়েটা বেঁচে যায় আর কী।”
কৌশানি চুপ করে মাথা নিচু করল। তার পর নিজের মনেই মাথা নাড়ল। বলল, “এত টাকা দিতে পারব না লালু। আমি বড়জোর দু’লাখ দিতে পারি।”
“দু’লাখ!” লালু কী বলবে বুঝতে পারল না। এই টাকায় তো কিছুই হবে না।
“তোর মাইনে সাড়ে বারো হাজার। মানে, বছরে হয় দেড় লাখ। তুই সাত-আট বছর টানা বিনা মাইনেতে কাজ করলে বারো লাখ শোধ হবে।
মাইনে বাড়বে ধরে নিলে তাও পাঁচ-ছ’বছর মিনিমাম। কী, করবি পাঁচ বছর বিনে মাইনেতে কাজ?”
“ম্যাডাম!” লালু কী বলবে বুঝতে পারল না! “দেখ লালু, তুই সিনসিয়ার। ভাল কাজ করিস। তার মানে এই নয় যে, আমি তোকে এত টাকা দিয়ে দেব। আমাদের হয়তো টাকা আছে, কিন্তু সেটা ওড়ানোর জন্য বা দান-খয়রাতি করার জন্য নয়।” “ম্যাডাম প্লিজ, যদি একটু ভাবতেন! একটা বাচ্চার জীবন বলে কথা !
ওটা যদি…” লালু কী বলবে বুঝতে পারল না।
“পাগল তুই! টাকা খোলামকুচি নাকি? আমি আমার বিজনেস আরও এক্সপ্যান্ড করব। আমারই টাকার দরকার। তাও তো তোকে বললাম যে, দু’লাখ দেব। সেটাও কী করে শোধ দিবি ভেবে দেখ,” ম্যাডাম আবার গ্লাসটা তুলে নিলেন।
লালুর অসহায় লাগল। ও ভাবল এবার কী করবে। ছুটির কী হবে?
ও দ্রুত হাতজোড় করে হাঁটু গেড়ে বসল ম্যাডামের সামনে। বলল, “প্লিজ ম্যাডাম, আমি বিনা পয়সায় কাজ করে দেব! প্লিজ…” লালু আচমকা ওরকম করে মাটিতে বসে পড়ায় কৌশানি ঘাবড়ে গিয়ে পিছিয়ে গেল। ওর হাত থেকে ওয়াইন চলকে পড়ল মাটিতে। কৌশানি চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট দ্য ফাক! কী নাটক হচ্ছে এ সব! সিনেমা করছিস?”
“ম্যাডাম প্লিজ!” লালু মিনতি করল, “বাচ্চা মেয়ে একদম। দেখুন, আমার কাছে ছবি আছে। আমি দেখাব? বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যে বলছি না। আপনি…” লালু এগিয়ে গিয়ে কৌশানির পা ধরল। আর লালু যাতে ওকে ধরতে না পারে সেই জন্য কৌশানি আচমকা পা চালাল। পা-টা এসে লাগল লালুর বুকে। লালু থমকে গেল। হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। এটা কী হল! ওর বেশ লেগেছে। কিন্তু এটা ম্যাডাম কেন করলেন!
কৌশানি চিৎকার করে বলল, “ইউ ফাকিং বাস্টার্ড! আমার গায়ে হাত দিচ্ছিস! তোর চাকরি করার ইচ্ছে নেই? কী রে বল, ইচ্ছে নেই?”
“ম্যাডাম!” লালু হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল কৌশানির দিকে। ম্যাডাম এমন করল কেন? ম্যাডাম কখনও তো এমন করে না!
কৌশানি বলল, “চাকরি রাখতে হলে আর একটাও কথা না বলে নিজের ঘরে যা। আর একটা কথাও বলবি না। বীরেন্দ্র যদি জানে এখানে এসে তুই আমার গায়ে হাত দিয়েছিস, তোর ছাল ছাড়িয়ে নেবে। শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার! যা, দূর হ!”
লালু উঠে দাঁড়িয়ে কোনও মতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জুতো পড়ল। মাথা কাজ করছে না ওর। সব কিছু ধোঁয়াশা। ও শুয়োরের বাচ্চা। ফাকিং বাস্টার্ড। ওকে বাবা তুলে গালি দিল। পা দিয়ে আঘাত করল। কেন? একটা বাচ্চা মেয়েকে বাঁচাতে চেয়েছে বলে! এ কেমন জীবন ওর! ওর মরা বাবাকে এই জন্য গালি খেতে হল!
লালুর মাথা কাজ করছে না। সারা পৃথিবী দুলছে। মনে হচ্ছে সব ভেঙে পড়ছে চারিদিকে। ছুটির কী হবে! আর ওর জীবন এ ভাবে এখানে কাটবে! এ ভাবে মারল ওকে! কার কাছে কাজ করে ও! সামনে সব কিছু আবছা লাগছে লালুর। চোখে কি জল এল?
“কী হয়েছে লালুদা?” বিন্দির গলা।
লালু আবছা চোখে তাকাল ওর দিকে।
বিন্দি বলল, “ম্যাডাম চিৎকার করছিলেন কেন? কী হয়েছে?” লালু বলল, “আমি… আমি শুয়োরের বাচ্চা! আমায় লাথি মেরে… আমি…. তুই যে বললি ভরসা করে… বললি, ‘না’ করবে না। তা হলে? সেখানে বলে কিনা…. আমি নাকি….”
বিন্দি ওকে ধরল। বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। তোমায় তো বলেইছি এরা কেমন শয়তান। পারলে এদের আমি খুন করতাম। অপমানটা ভুলো না লালুদা। আর তুমি একা একদম ঘরে থাকবে না এখন। আমি জানি তোমার মনখারাপ। চলো, আমরা রাস্তায় একটু হেঁটে আসি। এই বাড়ির বাইরে। চলো একবার।”
লালু তাকাল ওর দিকে। বাইরে? হ্যাঁ, বাইরে যাওয়াই ভাল। মাথা কাজ করছে না যে ওর। বিন্দি ঠিক বলছে। কিন্তু না, কারও সঙ্গ ওর ভাল লাগছে না। ও একাই যাবে। রাস্তায় দাঁড়াবে। এই যন্ত্রণার ওষুধ খুঁজতে হবে ওকে।
“আমি একা যাব… আমায় একা ছেড়ে দে… প্লিজ…” লালু ঘরে না গিয়ে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
রাত এখন ক’টা? আলিপুরের নির্জন রাস্তাটা যেন সময়ের ভাঁজে থমকে আছে। মাঝে মাঝে হুস হুস শব্দে গাড়ি যাচ্ছে। টেল লাইটগুলো সব আবছা। মাথার মধ্যে কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে আছে সব। ও হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল।
কিছু দূরে দক্ষিণাদার পান-সিগারেটের গুমটির আলো দেখা যাচ্ছে। পাশেই স্ট্রিট লাইটের আলো দপদপ করছে। লালু সেই দিকে এগিয়ে গেল। একটা সিগারেট খেতেই হবে। যে করে হোক, এই অবস্থা থেকে নিজেকে বের করে আনতে হবে।
দক্ষিণাদা ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। লালু ওর সামনে দাঁড়িয়ে, কাউন্টারে টাকাটা রেখে হাত দিয়ে সিগারেট দেখাল। দক্ষিণাদা কথা বলতে বলতেই একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিল। খুব একটা খেয়াল করল না। লালু সিগারেটটা নিয়ে পাশের রেলিং-এ ঝোলানো দড়ির আগুনটা ধরল। তার পর সিগারেটের সামনে ছুঁইয়ে সেটা জ্বালিয়ে নিল। চোখ বন্ধ করে টান দিল। তেতো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল বুকের মধ্যে!
লালু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে এবার? যেমন নোংরা বীরেন্দ্র তেমনই নোংরা কৌশানি। পারলে এদের খুন করে দিত ও। সারা শরীর জ্বলছে এখন। আচ্ছা, এত অপমানের পরেও কি কাজ করবে এখানে! কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। মাথার মধ্যে বিছেটা আবার নড়ছে।
“লালুবাবু!”
একটা গলা শুনে লালু যেন মাটির গভীর থেকে উঠে এল। কী হল? কে ডাকল? ও আবার চোখ মুছে তাকাল সামনে। একটা লোক। দোহারা চেহারা। লম্বা। গালে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। চোখে চশমা। লোকটা সাদা-কালো জামা-প্যান্ট পরে আছে। দেখতে বেশ ভালই! লোকটাকে এই রাস্তার আলোয় কেমন যেন পুরনো বাংলা সিনেমার সাদা- কালো ছবি থেকে বেরিয়ে আসা কোনও চরিত্র বলে মনে হচ্ছে।
কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
লালু লোকটা হাসল। তার পর বলল, “শুনবেন একটু? কথা আছে।” লালুর মাথার কুয়াশা তখনও কাটেনি। ও কী বলবে বুঝতে পারল না । তাও জিজ্ঞেস করল, “কথা! কী কথা! কে আপনি?”
লোকটা হাসল। তার পর হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলল, “আমি? ধরে নিন আমার নাম রূপবান বা সিলভেস্টার স্ট্যালোন। আসলে আমার সঙ্গে আপনার খুব দরকার। কিন্তু আপনি সেটা নিজেও জানেন না। এখন কথা বলা যাবে?”
মাথার ওপর স্ট্রিট লাইটের আলো দপ দপ করছে। হুস হুস করে চলে যাচ্ছে আবছায়া গাড়ির লাল ব্যাক লাইট। তার মধ্যে সাদা-কালো লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল লালু। তার পর আচমকা চিনতে পারল। আরে, এ তো সেই লোকটা! দমদম জংশনে যে ওকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল। বলেছিল আবার দেখা হবে। তা হলে আজকেই কি সেই দেখাটা হল? কেন দেখা হল? কী চায় লোকটা? নাকি ও কিছু চায় লোকটার থেকে!
লালু কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
