২৭. ঝিরি
জায়গাটা বেশ বড়। বাগান ঘেরা। গেট দিয়ে ঢুকে সামনে অনেকটা ছড়ানো লন। তার এক পাশে দোতলা বাড়ি। এখন যদিও রংচটা অবস্থা, কিন্তু ঝিরি জানে এটাকে সারিয়ে, রং করিয়ে, গুছিয়ে নিলে দারুণ দেখতে লাগবে। বাগানটাও আগাছায় ভরা। এটাকেও পরিষ্কার করে সুন্দর করে নিতে হবে। গোটা বাড়ি আর বাগানটা ঠিকঠাক করার পরে কেমন অবস্থায় আসবে, মনে মনে সেটা ভেবে ভাল লাগল ঝিরির।
কলকাতা থেকে এত দূরের জায়গা, তার ওপর বাড়িটা সামান্য ভাঙাচোরা অবস্থায় আছে। তাও দামটা একটু বেশিই লাগছে। কিন্তু অত ভাবছে না ঝিরি। অনেক টাকা তো জমে গেল। এবার একটু খরচ করাও দরকার।
ঘড়ি দেখল ও। সকাল দশটা বাজে। এই বাড়িটা থেকে প্রভারানি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের দূরত্ব হেঁটে পাঁচ মিনিটের মতো। ও জানে সাড়ে এগারোটায় ছুটি হয় স্কুলের। মানে রিপারও। এখানেই তো পড়ায় ও। মর্নিং স্কুল।
কিন্তু হোক না ছুটি তাতে ঝিরির কী! ঝিরি আর রিপা পরস্পরের কী হয়? কে হয়?
ঝিরি মন ঘোরানোর জন্য কানুর দিকে তাকাল। দেখল, লোকটা দু’আঙুলে বিড়ি ধরে এখনও ফোনে কথা বলে যাচ্ছে।
কানু লাহিড়ী বাড়ির দালালি করে। সঙ্গে মাখনপুর স্টেশনের কাছে একটা লটারির টিকিটের দোকানও চালায়। লোকটার বয়স বছর পঞ্চান্ন মতো। মাথায় বড় টাক। কিন্তু তাও যে-ক’টা চুল অবশিষ্ট আছে, তাতে যত্ন করে রং করা। দাড়ি-গোঁফ কামানো। বার্নিশ করা মেহগনি কাঠের মতো গায়ের রং। তাতে আবার ছোপ ছোপ পাউডার লাগিয়ে কেমন একটা অদ্ভূত সেজে থাকে। দেখলে মনে হয় বাটিক প্রিন্ট করা মানুষ!
গত দু’দিন আগে কানুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঝিরির। তখন কানুকে বলেছিল একটা বাড়ি কিনতে চায় ও। যদি কাছাকাছি কোথাও তেমন থাকে ওকে বলে। আর তার সঙ্গে নিজের বাজেটও বলে দিয়েছিল।
যেন আর গতকাল রাতেই খবর দিয়েছিল কানু। বলেছিল প্রভারানি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে নদীর পাশে একটা বাড়ি আছে। বাগান ঘেরা। তবে যা বাজেট দিয়েছে, ঝিরি তার চেয়ে পাঁচ লাখ বেশি চাইছে।
এমনটা যে হয় জানত ঝিরি। তাই বাজেট বলার সময় সে ভাবেই কমিয়ে বলেছিল। বাড়ির দাম, রেজিস্ট্রেশনের খরচ, টু পারসেন্ট দালালির টাকার সঙ্গে বাড়িটা সারানোর খরচও আছে। সব যোগ দিলে হয়তো একটু বেশিই হয়ে যাবে, ঝিরি জানে। কিন্তু ঠিক আছে। বাড়ি যখন কিনবে তখন হাত খুলেই কিনবে।
কিন্তু আচমকা কেন যে এমন বাড়ি কেনার ইচ্ছে চাগিয়ে উঠল, সেটা নিয়েই চিন্তা হচ্ছে ঝিরির। এ সব তো ভাল লক্ষণ নয়। ওর যা কাজ সেটা সোজা পথের কাজ নয়। নানা রকম খারাপ লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। তাদের সঙ্গে নানা বাদ-বিবাদেও জড়িয়ে পড়তে হয়। সেই ক্ষেত্রে নিজের কোনও দুর্বলতা তৈরি হওয়াটা কাজের কথা নয়। কারণ, বিপক্ষ সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু এখন যেন সেই অকাজের ব্যাপারটাই ঘটছে।
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এ সব কারও হাতে থাকে না। তাই এত বছর ঠিক থেকেও আচমকা মনটা কেমন যেন বেগড়বাই করছে। চিন্তা হচ্ছে ঝিরির, নিজের জন্য চিন্তা হচ্ছে খুব।
কানু ফোনটা কেটে পকেটে ঢুকিয়ে, ভাঙাচোরা দাঁত বের করে, আলো-বাতাস খেলানো হাসি ঝুলিয়ে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। বলল, “বোসবাবুদের সঙ্গে কথা বলে নিলাম। বললাম যে, আপনার পছন্দ হয়েছে বাড়ি। এখন দলিলের ফোটোকপি দিলেই সার্চিংটা করিয়ে নেওয়া যাবে। কী বলেন!”
বোসবাবু মানে সুধাময় বসু। এই বাড়ির মালিক। এখন থাকেন পাণ্ডুয়ায়। এই বাড়ি বিক্রি করে নাকি পাকাপাকি ভাবে বেঙ্গালুরুতে শিফট করে যাবেন। বাগানবাড়ি হিসেবে এই বাড়িটা শখ করে বানিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেমেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ায় এখন গলার কাঁটা হয়ে গিয়েছে! গলার কাঁটা! সত্যি তাই। জগন্নাথমামা বলত, “ক্যাপিটালিজমের ব্যাড এফেক্ট সবচেয়ে বেশি পড়ে মনে। মেন্টাল হেলথ-এ। এই দিকটা চট করে ভেবে দেখে না কেউ। আরে বাবা, যতটুকু দরকার তার চেয়ে বেশি টাকাপয়সা থাকলে লাইফে ঝামেলা আসতে বাধ্য! তাই দেখ না, আমি কেমন ঝাড়া হাত-পা নিয়ে থাকি! তোকেও বলে দিলাম ঝিরি, এমন করে থাকবি। দশের জন্য দেশের জন্য কাজ করবি। কিন্তু জড়াবি না কিছুতেই। সেই ঠাকুরের বলা পাঁকাল মাছ। সেটা হয়ে থাকতে হবে, বুঝলি?”
ঝিরি তাকাল কানুর দিকে। লোকটা করিতকর্মা আছে। তবে সেটাই স্বাভাবিক। কম টাকা তো পাবে না এখান থেকে।
ঝিরি বলল, “তা হলে সেটাই আনার ব্যবস্থা করুন তাড়াতাড়ি। আমি পজেশন নিতে চাই দ্রুত। তার আগে বাড়িটা ঠিকঠাকও তো করাতে হবে।”
“নিশ্চয়ই সার। আপনি একদম চিন্তা করবেন না এই নিয়ে। সেই লোকও আছে আমার কাছে। ময়দানবের মতো লোক। যা বানিয়ে দেবে না! একদম ইন্দ্রপুরী!” কানু আবারও হাসল। তার পর একটু সিরিয়াস হয়ে বলল, “আমি আবার রাতে কথা বলব। ফোটোকপিটা কুরিয়ার করে দিতে বলব দ্রুত। আজকাল তো ই-মেলও হয়েছে। সেখানেও পাঠাতে পারে। আপনার ই-মেল থাকলে দেবেন। আমি সেই ভাবে বলে দেব। মোদ্দা কথা হল, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ঠিক পেয়ে যাবেন।”
ঝিরি মাথা নাড়ল।
কানু জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আর একবার ভেতরটা দেখবেন? এখানে কাছেই মালো পাড়ায় বোসবাবুদের একজন পরিচিত থাকেন। তাঁর কাছেই চাবি থাকে। তাই… মানে চাবিটা নিয়েছি তো, আবার দিয়ে দিতে হবে। বার বার তো চাওয়া যাবে না! কারণ, নানা লোক দেখতে আসছে। তাই বলছিলাম আর কী…”
“আমি এক লাখ যদি দিয়ে রাখি আপাতত?” ঝিরি জিজ্ঞেস করল। “এক লাখ?” কানু মাথা নাড়ল, “বুঝেছি। মানে বুকিং আর কী। সার্চিং ক্লিয়ার হয়ে গেলেই বাকিটা, তাই তো সার?” ঝিরি হ্যাঁ বলল।
“কোনও অসুবিধে নেই। আমি সেটাও বলে নেব। তা হলে এখন কি আর একবার দেখবেন?”
“না,” মাথা নাড়ল ঝিরি। বার বার কী দেখবে! যা দেখার ও দেখে নিয়েছে।
“তা হলে এখন যাওয়া যাক। আর ইয়ে, আমার…” কানু আবার আলো-বাতাস খেলানো হাসিটা দিল।
ঝিরি পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে ধরাল ওর হাতে। কানু টাকাটা নিয়ে পকেটে ঢোকাল।
মেন গেটের তালা বন্ধ করে কানু বলল, “তা হলে স্যর আমি আসি?” “জানাবেন কিন্তু,” ঝিরি বলল, “আমি মধ্যমগ্রামের দিকেও একটা বাড়ি দেখেছি। যারা আগে জানাবে, তাদেরটা টাকা দিয়ে বুক করে নেব।”
“না না, আরে!” কানু একটু ঘাবড়ে গেল, “মধ্যমগ্রামে নদী কই! খালি গাড়ি-ঘোড়া। ঘিঞ্জি জায়গা! হাইপার টেনশন হয়ে যাবে আপনার। হার্টের প্রবলেমও হবে। বাড়ির দামের চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি, তাই না স্যর! আপনি এখানেই থাকুন। আমি পাণ্ডুয়ায় ফোন করে ই-মেলে দলিল আনিয়ে নিচ্ছি। কুরিয়ার বাতিল। আপনি একদম চাপ নেবেন না। ই-মেল – এর ঠিকানাটা শুধু… হে হে।”
কানু এত কথা বলে! নিজের ই-মেল আইডি লোকটাকে দিল ঝিরি। লোকটা আবার বড় করে হাসল। তার পর চলে গেল।
লোকটা চলে যেতে চারিদিকটা খুব শান্ত লাগছে ঝিরির। মফস্সল শহর এমনিতেই ফাঁকা। আর এ দিকটা তো আরও বেশি নির্জন। সার্চিংয়ে সব ঠিকঠাক থাকলেই হয় এখন।
ঝিরি দেখল রাস্তা দিয়ে স্কুলের মেয়েরা বাড়ি ফিরছে। মানে, ছুটি হয়ে গিয়েছে স্কুল। তবে তো রিপারও ছুটি হয়েছে। স্কুলের সামনের একটা স্ট্যান্ড থেকে ডিজেল অটো ছাড়ে। তাতে করেই রিপা যাতায়াত করে। রিপা কি চলে গিয়েছে?
নিজের অজান্তেই ঝিরির হাঁটার গতিবেগ বাড়ল। এ সব কী হচ্ছে! কেন হচ্ছে! নিজেকে দেখে অবাক লাগছে ঝিরির। এ কোন ঝিরি!
ওই স্কুল দেখা যাচ্ছে। আর তার একটু দূরেই ডিজেল অটোর স্ট্যান্ড। বাস স্টপও রয়েছে। তবে সেটা আর-একটু দূরে। ঝিরির পকেটে ফোনটা গোঁ গোঁ করে ডেকে উঠল এবার। আঃ, জ্বালাতন! লোকের কি এখনই সব কাজের কথা মনে পড়ে!
অচেনা নাম্বার। ঝিরি ফোনটা ধরল, “বলছি।”
“আমি,” ও দিক থেকে একটা গলা এল।
“আরে সানুদা! এই নাম্বার থেকে?” ঝিরি অবাক হল।
“এটা কাল নিয়েছি। আসল নাম্বার সব ট্যাপ হচ্ছে মনে হয়। জানিসই তো সারাক্ষণই আমাদের ওপর নজর রাখা হয়। তুই ডেটা অন রাখবি। তা হলে নেটে কল করতে পারব। ওতে ট্যাপের চান্স কম,” সানুদা যেন সামান্য বিরক্ত।
“বলো,” ঝিরি সরাসরি মূল কথায় আসতে চাইল।
“বলবি তো তুই!” সানুদার গলায় বিরক্তিটা আরও প্রকট হল, “একটা সেটিং করতে এত টাইম লাগছে কেন? এ দিকে মাইরি ভাইরাস তো ছড়াচ্ছে! এ দেশে মহামারি শুরু হয়ে গেলে কী যে হবে! সবার পেছনে যাবে। তুই কী করছিস ঝিরি?”
ঝিরি বলল, “সহজ কাজ নয় সানুদা। ডাইরেক্ট গিয়ে দেখলে তো কী হল! ইনডাইরেক্টলি করতে হবে। প্রেশার পয়েন্টে হাত দিয়ে। তুমি ভেবো না একদম।”
“জানিস তো, অসুখকে যত বেশি ছেড়ে রাখবি সে তত শক্তি গ্যাদার করবে। আর এ ভাবে বাইরে থেকে ইনডাইরেক্টলি কি কাজ হবে আদৌ? দেখ, টাকা খরচ করতে আমার আপত্তি নেই। তোকেও আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু টাকা যেন নষ্ট না হয়। তুই না পারলে এখনও বল। আমি অন্য ব্যবস্থা করব,” সানুদা সোজাসুজি বলল।
“হয়ে যাবে,” ঝিরি শাস্ত গলায় বলল, “গাছ লাগানো হয়ে গিয়েছে। কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। তুমি শুধু লোক রেডি রেখো। যখন নোটিস আসবে, তখন যেন কাজে লাগানো যায় সেটা দেখো।” সানুদা বলল, “ঠিক আছে। তবে জলদি কর।”
ফোনটা কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ঝিরি। সানুদার সবেতে তাড়া! এ সব লোকের সঙ্গে কাজ করতে হয় ওকে। বিন্দি তো কাজ করছে। এক লাখ দিয়ে এসেছে ও। বাকিটা ওই মাধুকে দিতে হবে। সেটাও মেয়েটা পরের দিন ফোন করে বলেছে।
মেয়েটা লালুকে অনেকটা তৈরি করে এনেছে। এমনকি, ওর দেওয়া টাকাটাও লালুকে দেখিয়ে উস্কেছে। লালু এখন অ্যাক্টিভ হলেই হয়। বাইরে থেকে বীরেন্দ্রকে কিছু করা যাবে না। তাড়াহুড়ো করে সুন্দররা করতে গিয়েছিল। তাতে বীরেন্দ্র নিজের সিকিওরিটি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন ব্রুট ফোর্স দিয়ে বাইরে থেকে ওই নিরাপত্তার চাদর ভেদ করে মারা যাবে না কিছুতেই। তা হলে এমন শুট আউট হবে যে, চারিদিকে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আর বীরেন্দ্র যে তাতে মারা পড়বে তারও গ্যারান্টি নেই। প্রথমবার হামলার পর বীরেন্দ্র নিজের সিকিওরিটি বাড়ালেও প্রতিশোধমূলক কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, স্তর ছাড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে যেতে চায় ও। তাই চায় না কোনও ঝামেলায় জড়াতে। চায় না নতুন করে কোনও দাগ লাগুক ওর কেরিয়ারে। কিন্তু দ্বিতীয়বারও যদি মিস হয়, তা হলে কিন্তু বীরেন্দ্র ছেড়ে কথা বলবে না। তাই মাথা খাটিয়ে আটঘাট বেঁধে কাজ করতে হবে। সাদা একটা গোঁয়ার। কিছু ভাবে না।
আর শুধু তাই নয়, এর মধ্যে সানুদা একদিন বলেছিল স্নাইপার আনাবে। এটা কি সিনেমা! স্নাইপার! পাগল নাকি! আসলে সানুদাদের সবটাই এক্ষুনি চাই। সব চাই। ঝিরি জানে, এরা বিষধর সাপের চেয়েও বিষাক্ত লোক। সমাজের মাথা হয়ে বসে এরা সমাজকেই শেষ করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষকে এরা চায়ের ভাঁড়ের মতো দেখে। ব্যবহার করে ফেলে দেয়।
এদের হয়ে কাজ করতে হয় ওকে। তাও আইনের বাইরের কাজ । রোজগারের জন্য মানুষকে কত কী যে করতে হয়! ঝিরি জানে অঞ্জনার কাজ আর ওর কাজের মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নেই।
অঞ্জনার কথা মনে আসতেই ঝিরির মনে হল, ওকে একটা ফোন করতে হবে। এত সুন্দর সকালটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ঝিরি ভাবল আর দু’-একটা বছর চোখ-কান বুজে কাজ করে আরও কিছু টাকা জমিয়ে, তার পর এ সব ছেড়ে দেবে। তখন ও নার্সারির ব্যবসা করবে। গাছ আর ফুলের ব্যবসা। তাতে যেটুকু যা হওয়ার হবে।
“এ কী! মেয়েদের স্কুলের সামনে তুমি ঘুরঘুর করছ কেন? বুড়ো বয়সে এ কী রকম ভীমরতি!”
কথাটা শুনে মুখ ঘুরিয়ে ঝিরি দেখল, সামনেই রিপা দাঁড়িয়ে আছে। মুখ-চোখ বিরক্তিতে কুঁচকে আছে।
ঝিরি হাসল। বলল, “এই এসেছিলাম কাছের একটা বাড়ি দেখতে।” “বাড়ি? কেন? আমাদের বাড়ি আর ভাল লাগছে না? নতুন জায়গায় উঠে যাবে?” রিপা এখনও ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে।
“আসলে একটা বাড়ি কিনব। স্কুলের কাছেই। হেঁটে একটুখানি। তাই দেখতে এসেছিলাম,” ঝিরি বলল।
“ও!” রিপা থমকে গেল একটু। তার পর বলল, “বুঝলাম। তা ভালই। অন্যের বাড়িতে পড়ে থাকবেই-বা কেন! আমিও তো চলে যাব কিছু দিন পরে।”
ঝিরি নিজেকে আটকাতে চাইলেও পারল না। জিজ্ঞেস করে ফেলল, “কোথায়?”
“কেন, মা বলেনি এখনও?” রিপা অবাক হল সামান্য ।
“না, কাকিমার সঙ্গে দু’দিন কথা হয়নি,” ঝিরি বলল, “একটু ব্যস্ত ছিলাম তো!”
“আমার বিয়ে হয়ে যাবে। সে দিন বললাম না?”
“স্পষ্ট করে তো কিছু… মানে….” ঝিরি কী বলবে বুঝতে পারল না। বিয়ে হয়ে যাবে রিপার! তাই! সে দিন কথার মধ্যে একটা হিন্ট ছিল বটে, কিন্তু স্পষ্ট ছিল না। আচমকা কেমন একটা তেতো স্বাদ লাগল যেন মুখে ।
বুকের মধ্যে মনে হল বিশাল একটা দ্বীপখণ্ড তলিয়ে গেল সমুদ্রে! এই যে বাসন্তী রঙের রোদ দেখে এতক্ষণ মন ভাল হচ্ছিল, সেটাই কেমন যেন জন্ডিস রোগীর চোখের মতো লাগছে! হাওয়ায় কেমন যেন মনখারাপের রেণু মিশে যাচ্ছে কোনও গোপন নরকের ফুল থেকে বেরিয়ে। রিপা বলল, “একটি পাত্র দেখে গিয়েছে আমায়। নাম রাধানাথ । জেনেওছে আমার শ্বাসের কষ্ট আছে। মানে, আমিই বলেছি আর কী, যেমন বলি। তাতে ওর আপত্তি নেই। ছেলেটা ভাল। একটা নামী গাড়ি কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারের ম্যানেজার। বাড়িতে বাবা-মা আর এক বোন আছে। বোন ভাল গান গায়। আমায় মেসেজে বোনের গান পাঠিয়েছে। মেয়েটা রেডিয়োতে গায় মাঝে মাঝে। এর মধ্যে রাধানাথ দু’দিন দেখা করেছে আমার সঙ্গে। স্টেশনের কাছে একটা হোটেল আছে না ‘ফুড ফ্যাক্টরি’? সেখানে। শুধু একটাই প্রবলেম, বিয়ের পরে একটু দূরে যেতে হবে আমায়। মানে শ্বশুরবাড়ি এখান থেকে একটু দূরে। স্কুলে আসতে বেশ টাইম লেগে যাবে।”
চোয়াল শক্ত করে ঝিরি তাকিয়ে রইল রিপার দিকে। বুকের মধ্যে কী যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর! রাধানাথ! দু’দিন দেখা করাও হয়েছে। বোনের গান পাঠিয়েছে মেসেজে। মানে, মেসেজে ভালই কথাবার্তা হয়। ঝিরির সারা শরীরে কষ্ট হচ্ছে আচমকা। মনে হচ্ছে একশো শ্রমিক কোদাল দিয়ে বুকের ভেতরে ঝুপঝুপ করে মাটি কুপিয়ে চলেছে। কী তৈরি করছে ওরা? সহ্যের বাঁধ? নাকি হিংসের নদী? সত্যি, হিংসের মতো ক্ষতিকারক ফিলিং আর কিছু হয় না। এর চেয়ে খারাপ আগুন মানুষের জন্য কিছু নেই। চিরকাল এই একটা জিনিসের থেকেই বাঁচতে চেয়েছে ঝিরি আর দ্যাখো এমন কপাল যে, আজ সেটাতেই পুড়ে যাচ্ছে ও।
ঝিরি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আবার সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো মনে হল, এর মধ্যে দু’দিন দেখা করেছে। ফুড ফ্যাক্টরি-তে গিয়েছে। আর কোথায় গিয়েছে? কী কী করেছে? হাত ধরেছে? আর? আর কিছু করেনি ?
ঝিরির মাথার মধ্যে যেন গোটা পৃথিবীর সমস্ত স্টিলের বাসন এক সঙ্গে ঝনঝন করে পড়ল! ওর মনে হল এক্ষুনি ওই সব ফ্যাক্টরি না কী ছাই, সে সব তুলে দেয় গিয়ে। বাইরের খাবারের বিরুদ্ধে একটা বড়সড় ক্যাম্পেন করার জন্য মনটা আকুল হয়ে উঠল।
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে রিপা বলল, “ভালই হল। সামনের বৈশাখে বা শ্রাবণে ওরা দিন দেখছে। বাবা-মায়ের কষ্ট ছিল এত দিন। আর থাকবে না।”
ঝিরি নিজেকে সামলাল অনেক কষ্টে। নিজেকে এ ভাবে বয়ে দিয়ে যেতে পারে না ও। এতগুলো বছর কাউকে ছাড়াই তো কাটিয়েছে। বাকিটাও না-হয় কাটিয়ে দেবে। মনের মধ্যেকার একা কুম্ভকে ও জোরে ঠেলা দিল। বলল, ‘লড়াই কর। লড়াই ছাড়বি না বলে দিলাম!’ তার পর সংযত গলায় বলল, “ ভালই তো। প্রতুলবাবুর চিন্তা কমবে!”
“যাক গে। তা কোন বাড়িটা কিনবে?” রিপা জিজ্ঞেস করল।
ঝিরির মধ্যে হঠাৎ কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব এল যেন। কী হবে আর এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলে! আর সত্যি বলতে বাড়ি কিনেই-বা কী হবে! অত বড় জায়গা-সহ বড় একটা দোতলা বাড়ি কিনে কী করবে ও? একা ভূতের মতো বসে থাকবে? আর-একটা স্বার্থপর দৈত্যের বাগান তৈরি করবে?
ঝিরির গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বেরোচ্ছে না। তা-ও ও জোর করেই বলল, “ওই বসু ভিলা!”
“ওরে বাবা! সে তো বিশাল বাড়ি!” রিপা অবাক হয়ে তাকাল, “অনেক টাকার ব্যাপার! আচ্ছা, কী করো তুমি? স্মাগলিং নাকি ? বাড়িতেই তো অনেকটা সময় শুয়ে-বসে থাকো। এত টাকা পাবে কোথা থেকে?”
“কী করবে জেনে?” ঝিরি এবার সামান্য কঠিন গলায় বলল, “আমি আসি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“যাবে? আমি ভাবলাম …”
রিপা তাকাল ওর দিকে। “কী ভাবলে ?”
রিপা বলল, “না, আমি একটু টিচার্স রুম থেকে ব্যাগটা নিয়ে আসতাম। তার পর এক সঙ্গে যেতাম।”
ঝিরি জোর করে হাসল সামান্য। জিভ দিয়ে ঠোঁটটা চাটল একবার। তার পর বলল, “সেটা ঠিক হবে না। মাখনপুর ছোট জায়গা। লোকের মনটাও অত প্রসারিত নয়। সামনে বিয়ে তোমার। সেখানে আমার সঙ্গে যাওয়াটা ভাল দেখাবে না। আমি আসি।”
ঝিরি আর অপেক্ষা না করে অটো স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দিল। ও না-তাকিয়েও বুঝতে পারল, রিপা অবাক হয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
মনের মধ্যে একটা জ্বালা করছে। নাঃ, এটাকে বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। জগন্নাথমামা সেই যে বলত, “কিছু তোর নয় রে ঝিরি। কিচ্ছু তোর নয়।” সেই কথাটাই বার বার মনে পড়তে লাগল ওর। কিন্তু তাতে খুব কিছু সফল হল না। বুকের মধ্যেকার সেই হিংসা-বিষের নদী যেন সময়ের সঙ্গে আরও স্রোতস্বিনী হয়ে উঠছে। এত জোর কী করে বাড়ছে এর। পৃথিবীতে কার চক্রান্তে যে এ সব হয়! যে করেই হোক এর থেকে মন ঘোরাতে হবে ওকে। বাড়িতে থাকলে আরও মাথাখারাপ লাগবে। কলকাতায় ব্যাঙ্কের কাজ আছে কিছু। এখন গেলেও করা যাবে সে সব। নিজেকে এনগেজেড রাখতে হবে।
কিন্তু তার আগে সেই ফোনটা করা দরকার। সানুদার কাজটাতে চাপ বাড়ানোর সময় এসেছে। আর তাতে নিজের মনটাও কিছুটা ব্যস্ত থাকবে।
মোবাইল বের করে কলটা করল ঝিরি। চারবার রিং হওয়ার পরে ফোন ধরল লালু।
ঝিরি বলল, “কী ভাবলে? আর বেশি দিন সময় দিতে পারব না কিন্তু! ছুটির শরীর কেমন আছে?”
“ছুটি!” লালুর গলায় ভয়!
ঝিরি বলল, “তোমার বাবার মামার বাড়িও গিয়েছিলাম। সবটাই জানি লালু। কিন্তু তুমি জানো না। তাই বলছি কাজটার কী হল!”
লালু কাঁপা গলায় বলল, “আর-একটু সময়… প্লিজ… আমি তো সরাসরি পারব না। কিন্তু একজন… মানে আর একটু সময়…
ঝিরি কড়া গলায় বলল, “চুটির কথা মনে রেখো। ওকে বাঁচাতে চাও? নাকি ওর মৃত্যুটা দেখবে?”
ফোনটা কেটে চোয়াল শক্ত করল ঝিরি। মনের মধ্যে অস্বস্তি আর কষ্টটা বাড়ছে। এটাকে কাটাতে হবে। যে করেই হোক !
ও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অটোর পেছনে উঠে বসল। শুনল, ড্রাইভার ছেলেটা জোরে জোরে বলছে, “বালিমোড়, চাঁপাকল, পাম্প হাউস, টকি সিনেমা, ফুড ফ্যাক্টরি…
“ফুড ফ্যাক্টরি!” ঝিরি চোয়াল শক্ত করল। সামান্য একটা নাম যে এমন গুলির মতো এসে বুকে লাগতে পারে, ও ভাবতে পারেনি কোনও দিন।
ও চোয়াল শক্ত করে শুনল ছেলেটা বলেই যাচ্ছে, “বালিমোড়, চাঁপাকল, পাম্প হাউস, টকি সিনেমা, ফুড ফ্যাক্টরি…
ধুস শালা! যাবেই না অটো করে।
অটো থেকে নেমে হাঁটা দিল ঝিরি। আর তখনই দেখল, ওকে একদম উপেক্ষা করে ওই অটোতেই গিয়ে বসল রিপা। তার পর ড্রাইভারকে বলল, “এই ভাই, ফুড ফ্যাক্টরি যাবে তো? জলদি করো, আমার তাড়া আছে।”
ঝিরি কী করবে বুঝতে পারল না। দেখল, কথাটা বলেই ওর দিকে তাকাল রিপা। তার পর হাতের সানগ্লাসটা পরে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ঝিরি ভাবল, সত্যি জগন্নাথমামাই ঠিক বলত। একা থাকাটা জরুরি। বন্ধনহীন হওয়াটা জরুরি। মোহমুক্তির কথা কি এমনি বলা আছে ধর্মের বই-টইতে! এই মোহ-র আইডিয়াটা যে প্রথম দিয়েছিল, সে-ও শিয়োর কাউকে ভালবেসেছিল। সত্যি, খারাপ অভিজ্ঞতাই কিন্তু মানুষকে শেখায়। কোনও কিছুর ওপর মায়া বাড়িয়ে দুর্বলতা তৈরি করেছ কী মরেছ! ইস মামা বেঁচে থাকলে কী যে ভাল হত! কে যে মামাকে হঠাৎ খুন করে দিল! তাকে এখন একবার পেলে না মজা দেখিয়ে দিত ঝিরি।
