২৮. রাজু
‘আমার ঘুমন্ত দিন, আমার ঘুমন্ত সব রাত
অগোচরে ছুঁয়ে আছে তোমার জীবনদায়ী হাত।’
পত্রিকাটা ছোট। পাতলা। রাজু উল্টেপাল্টে দেখল। এমন একটা পত্রিকা গুরানের দোকানে কী করছে?
রাজু পত্রিকাটা খুলে আরও পাতা ওল্টাল। লিটল ম্যাগাজিন। গুরান তো এ সব পড়ে না! তা হলে? আরে, এটা কী! একটা লটারির টিকিট।
রাজু দেখল বইয়ের ভাঁজে একটা লটারির টিকিট গোঁজা। কার এটা?
রাজুরাও একসময় ম্যাগাজিন বের করত। না, ঠিক এরকম সাহিত্যের নয়, রাজনীতির। পার্টির। সেতুদা লিখত তখন। ও নিজে লিখত। এমনকি, আরও নানা বড় বড় নেতাও লিখত। তবে সে সব লেখার বেশির ভাগটা আড়ালে ওকেই লিখে দিতে হত। ভালই বিক্রি হত পত্রিকাটা। পার্টির লোকেদের সেই ম্যাগাজিন কেনা কমপালসারি ছিল।
বাংলার লিটল ম্যাগাজিন ওদের সংস্কৃতির অঙ্গ। পত্রিকাগুলো নামে লিটল হলেও আসলে ছোট নয় কিন্তু। নামটা কেন যে এমন হয়েছে কে জানে! সাহিত্যের বড়-ছোট বলে কিছু হয় না। এটাই বিশ্বাস করে রাজু গ্রহণযোগ্যতার তারতম্য হতে পারে, মানুষের কাছে পৌঁছোনোর সংখ্যার তারতম্য হতে পারে, কিন্তু সেই ভাবে ছোট-বড় মাপার কোনও অৰ্থ হয় না!
রাজু পত্রিকাটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকল। তার পর নিজের মনেই হাসল একটু। ছোটবেলায় এমন করত। কোনও বই পেলেই গন্ধ শুঁকত। সবাই হাসলেও ওর ভাল লাগত এটা। বইয়ের মধ্যে কেমন একটা সুন্দর গন্ধ পেত ও। অনেকটা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরের গন্ধের মতো। আজও সেই গন্ধটাই পেল। রাজুর বেশ ভাল লাগল।
শরীরটা এখনও দুর্বল হলেও আজ মনটা ভাল লাগছে ওর। কেউ যদি ওকে সামান্য ভেবে পায়ের তলায় পিষে দেবে ভাবে, তা হলে সে ভুল করবে। আজ এটাই একদম মুখের ওপর জবাব হিসেবে ছুড়ে দিয়ে এসেছে। ভেতরে একটা কনফিডেন্স পাচ্ছে। নতুন জীবন শুরু করার কনফিডেন্স। অবশেষে ভাল কিছু যে হতে যাচ্ছে, সেই কনফিডেন্স। জীবন পাল্টে ফেলার কনফিডেন্স!
লটারির টিকিটটা আর-একবার দেখে, পত্রিকাটা একটা ড্রয়ারের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল রাজু। তার পর হাত বাড়িয়ে রেডিয়োর ভলিউমটা বাড়িয়ে দিল।
গুরানের দোকানে এলেই যা একটু রেডিয়োর গান-টান শোনে ও। আজও চলছে রেডিয়ো। তবে আজ মহম্মদ রফি নয়, আজ চলছে কিশোর কুমার— ‘তেরা মুঝসে হ্যায় পহলে কা নাতা কোই / ইউ হি নেহি দিল লুভাতা কোই।’ আর ডি বর্মণের মিউজিক। সাহির লুধিয়ানভির লেখা।
যে-গান ভাল লাগে রাজুর, সেই গানের লিরিসিস্টের নামটা জেনে রাখে ও। আর সাহির লুধিয়ানভি তো ওর অন্যতম প্রিয় লিরিসিস্ট! এখনও মনে আছে স্কুলের সেই এগারো ক্লাসে শোনা গানটা— “হর ইক জি ঘায়েল / হর এক রুহ প্যায়াসী / নিগাহোঁ মেঁ উলঝন / দিলোঁ ঘেঁ উদাসী / ইয়ে দুনিয়া হ্যায় ইয়া আলম-এ-বদহওয়াসী / ইয়ে দুনিয়া আগার মিল ভি যায়ে তো কেয়া হ্যায় / ইয়ে দুনিয়া আগার মিল ভি যায়ে তো কেয়া হ্যায়” ।
এখনও গানটা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। ভাবে সত্যি সব পেলেও-বা কী লাভ! সত্যিই কি কোনও লাভ আছে!
কিন্তু এই মনুষ্য জীবন বড় বিচিত্র। সব কিছু ক্ষণস্থায়ী জেনেও সে সবটুকু হাতের মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করে চলে নিরন্তর। নিজের কাছে, নিজের করে রাখার চেষ্টা করে সারাক্ষণ। আর এখান থেকেই তো যত দূরত্ব বাড়ে, গোলমাল হয় আর ঝামেলা লাগে। এই যে সেতুর সঙ্গে ঝামেলাটা হল সেটাও কি এই জন্য নয়!
পকেটের ফোনটা বেজে উঠল রাজুর। গুরান। প রাজু রেডিয়োর ভলিউমটা কমিয়ে দিয়ে ফোনটা ধরে কানে লাগাল। গুরান বলল, “আমার আর-একটু দেরি হবে ভাই। বাড়িতে লোকজন এসেছে। মিষ্টি আর শিঙাড়া কিনে দিয়ে আসব। তুই আর-একটু বসতে পারবি তো?”
“তুই আয় ধীরেসুস্থে। আমার তেমন কাজ নেই,” ফোনটা কেটে পকেটে রাখল রাজু।
বিকেল শেষ হয়ে আসছে। টালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে বেশ ভিড়। তার মধ্যে বসে কেমন যেন লাগল রাজুর। আর ক’টা দিনই-বা এখানে থাকবে! এবার তো খেলা গুটোনোর পালা।
সারা পৃথিবীতে করোনাভাইরাস নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
এই দেশে মার্চের এই সময়ে এখনও সে ভাবে বিশাল কিছু হয়নি। নিউজিল্যান্ডেও সে ভাবে বিশাল কোনও প্রভাব নেই।
ওদের টিকিট হয়ে গিয়েছে। ভিসারও ইন্টারভিউ হয়ে গিয়েছে। এবার পাসপোর্টে ভিসার ছাপ মেরে আসার অপেক্ষা শুধু। গত পরশু এই নিয়ে কথা হয়েছিল উর্জার সঙ্গে। সন্ধেবেলা অফিস থেকে উর্জা এসেছিল ওর সঙ্গে দেখা করতে। আজকাল প্রায়ই এমনটা হয়।
প্রচুর আদর করেছিল ওরা দু’জন দু’জনকে। তার পর এক সময় ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিল। উর্জা ওর কাঁধের মধ্যে মুখ গুঁজে বলেছিল, “এই যে সব ছেড়ে চলে যাব, এতে আমার কিন্তু কষ্ট হচ্ছে না। বরং ভালই লাগছে। তোমার?”
রাজু উর্জার দিকে ফিরে, উর্জাকে টেনে নিয়েছিল নিজের কাছে। তার পর বলেছিল, “আমার টেনশন হচ্ছে। কষ্ট নয়।”
“কিসের টেনশন?” উর্জা অবাক হয়েছিল, “তোমায় টাকার কথা ভাবতে হবে না আমি বলেছি তো। সব ভার আপাতত আমার।”
“আসলে কী জানো?” রাজু উঠে বসেছিল। তার পর বালিশ নিয়ে বিছানার হেডবোর্ডে ঠেস দিয়ে বসে ওকে সেতু আর জহরের ব্যাপারে সবটা খুলে বলেছিল! বলেছিল, কী ভাবে দশ লাখ টাকা পাওয়ার একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু কী ভাবে সেতুর থেকে সরে আসছে বলে ওর আর কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে না, ঠিক সবটা যে বলেছে, তা নয়। বহু বছর আগের সেই রাতটার কথা, জগন্নাথ ঘোষের কথা বা বাচ্চু প্রধানের কথা ও বলেনি একটুও। কারণ, রাজু জানে সে সব উর্জাকে কোনও দিন বলা যাবে না।
উর্জা, জহরের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার ব্যাপারটা শুনে বলেছিল, “এ ভাবে টাকা নেবে কেন তুমি? এ ভাবে টাকা নেওয়া কি ঠিক?”
রাজু মাথা নেড়ে বলেছিল, “না, ঠিক নয়। কিন্তু এটা এখন খুব কমন ! পলিটিকাল ব্রোকারেজ খুব লাভজনক কাজ। এ ভাবে কত মানুষ যে কত টাকা রোজগার করে! আর আমি তো কোনও ক্রাইম করছি না। কিন্তু যেই সেতুদার থেকে সরে আসার কথা বলেছি, এই সুযোগগুলোও আর নেই। মা আর ভাইয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে আমার। মাসে মাসে কিছু টাকা না-হয় পাঠালাম। কিন্তু থোক কিছু টাকা রেখে যেতে পারলে ভাল হত।”
উর্জা উঠে মুখোমুখি অবস্থায় কোলে বসেছিল রাজুর। দুটো পা দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল রাজুর কোমর। হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল পিঠ। তার পর বলেছিল, “এই জন্য এত চিন্তা! আমি কি মরে গিয়েছি! তোমার মা-ভাই আমারও তো কিছু হয়! আমরা ওখানে ভাল ভাবে থাকব আর ওঁরা এখানে খারাপ ভাবে থাকবে তা তো হয় না। কিন্তু সেই জন্য তোমায় এমন কাজ করতে হবে না। তুমি পলিটিক্স থেকে সরে এসেছ এটাই ভাল, আর এ ভাবেই থাকবে।”
রাজু দু’হাত দিয়ে ধরেছিল উর্জার মুখটা। স্থির চোখে তাকিয়ে দেখছিল উর্জার বড় বড় চোখ। ছোট্ট নয়নতারার পাপড়ির মতো ঠোঁট। মসৃণ মোমের মতো গাল।
রাজু নাক বুলিয়েছিল গালে। কানের লতিতে। গলায়। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল উর্জাকে। ওর গায়ের গন্ধ নিয়েছিল বুক ভরে।
উর্জা আরও ঘন করে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি দশ লাখ টাকার একটা ফিক্সড করে রেখে যাব তোমার আর তোমার মায়ের নামে। কোনও অসুবিধে হবে না। তুমি আমায় এই ছুঁয়ে কথা দাও যে, আর পলিটিক্সে যাবে না। কুড়ি তারিখ আমরা চলে যাব। তার আগে সব গুটিয়ে নেবে তুমি।”
অবাক হয়ে উর্জার দিকে তাকিয়েছিল রাজু। বলেছিল, “তুমি টাকা দেবে?”
“হ্যাঁ, কেন নয়!” উর্জা এবার রাজুর মুখটা ধরেছিল দু’হাতে, “মেল ইগোতে লাগছে!”
রাজু হেসে বলেছিল, “একটু তো লাগছেই। কেমন একটা আবহাওয়ায় ছোটবেলা থেকে আমরা মানুষ হই জানো না। কয়েকটা জিনিস জীবনে রিফ্লেক্সের মতো হয়ে গিয়েছে। জানি লাগা ঠিক নয়, জানি জেন্ডার বায়াসনেস রিগ্রেসিভ। কিন্তু ওই যে, রিফ্লেক্স! এক সেকেন্ডের জন্য হলেও উকি মারে মনে। ছোট্ট একটা আঁচড় কাটে।”
“আচ্ছা আচ্ছা, আর ও সব মনে করতে হবে না,” উর্জা রাজুকে চুপ করানোর জন্য আলতো করে চুমু খেয়েছিল ওর ঠোঁটে। তার পর বলেছিল,
“উই আর ডিপলি কানেক্টেড নাউ। মোর দ্যান ইউ নো।”
রাজু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, “মানে?”
“পরে বলব,” উর্জা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। তার পর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিল, “আর করবে না? তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছ! আবার তো অন্য দেশে গিয়ে যা হওয়ার হবে। এই মহাদেশে এটাই তো আমাদের শেষ আদর করার সময়, তাই না!”
রাজু তাকিয়েছিল উর্জার দিকে। তার পর জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়েছিল আবার। উর্জার গন্ধের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে ভেবেছিল, সত্যি জীবন এত সুন্দর!
“দাদা, গুরানদা নেই?”
সামনে থেকে আসা প্রশ্নে ঘোর কাটল রাজুর। দেখল, একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কম বয়স। পরনে টি-শার্ট আর জিনস। কাঁধে একটা ঝোলা। খুব রোগা! ফ্যাকাসে। মাথায় একটা টুপি।
“বাড়িতে গিয়েছে, আসবে একটু পরে। কিছু বলতে হবে?” রাজু জিজ্ঞেস করল।
“দেরি হবে?” ছেলেটা কেমন যেন কিন্তু কিন্তু করছে!
“মিনিট দশ-পনেরো।”
ছেলেটা ঠোঁট চাটল একটু। তার পর বলল, “ইয়ে, মানে আমি আমার মোবাইলটা সারাতে দিতে এসেছিলাম দুপুরে। তখন একটা পত্রিকা… মানে ইয়ে বইয়ের মতো… ভুল করে ফেলে গিয়েছিলাম। ওতে একটা দরকারি জিনিস ছিল। তাই মানে আমি যেখানে যেখানে গিয়েছি, তার পর থেকে সব জায়গায় খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। তাই এখানেও এলাম… যদি ফেলে যাই… আসলে খুব দরকারি একটা জিনিস….”
“লটারির টিকিট?” জিজ্ঞেস করল রাজু।
“হ্যাঁ হ্যাঁ,” ছেলেটা যেন বুকে বল ফিরে পেল, “সৌভাগ্যলক্ষ্মী। আড়াই কোটি টাকার ফার্স্ট প্রাইজ।”
রাজু হাসল। তার পর ড্রয়ার খুলে পত্রিকাটা বের করে দিল। বলল, “দেখে নিন।”
ছেলেটা মুখে “না না” বললেও পত্রিকাটা খুলে দেখে নিল ভেতরটা। ‘আছে টিকিটটা।
রাজু হাসল। জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এতে কিছু হয়? মানে লটারি লাগে? সো কল্ড সৌভাগ্য লাভ হয়?”
ছেলেটা হেসে বলল, “সৌভাগ্য দুর্ভাগ্য তো লেগেই থাকে। চেষ্টা করে যেতে হয় আর কী। নিজের ভালটা নিজেকেই বুঝতে হয়, তাই না?”
রাজু বুঝতে পারল না কী বলতে চাইল ছেলেটা। কিন্তু আর ঘাঁটাল না।
ছেলেটা হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল। লটারির টিকিটের জন্য খুঁজে খুঁজে ফিরে এসেছে। রাজুর অবাক লাগল। আজও, মানে এই একবিংশ শতাব্দতেও কত মানুষ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে! কিন্তু ও জানে আসল হল পুরুষকার। জীবনে তুমি কী করবে আর কী করবে না তার গোটাটাই তোমার নিজের ওপর নির্ভর করছে। না হলে আজ ও ভাবে হেলায় অতগুলো টাকা সরিয়ে দিতে পারত!
রাজু হাত বাড়িয়ে গুরানের রাখা ওই ভাজা মৌরি আর মিছরির টুকরো মিশিয়ে রাখা প্লাস্টিকের ডিবেটা হাতে নিল। প্যাঁচ খুলে হাতের পাতায় একটু ঢেলে মুখে দিল। তার পর ডিবেটাকে মুখ বন্ধ করে রেখে দিয়ে গুরানের প্লাস্টিকের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল। সেতুর ওই চড় খাওয়ার মতো মুখটা মনে পড়ে যাওয়ায় হাসি পেল খুব।
যে সব মানুষ ভাবে যে, তাদের হাতেই সব কিছু আছে আর তারা যা খুশি তাই করতে পারবে, তারা যে কী ভুল করে! মাঝে মাঝে তাই তাদের ভুল ভাঙিয়ে দিতে হয়।
আজ দুপুরে বাড়িতে বসে সব জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল রাজু। এই যে চলে যাবে ক’দিন পরে, সেটা নিয়ে মায়ের খুব কিছু হেলদোল নেই। মাসে মাসে যে টাকা পাঠাবে সেটাতেই খুশি।
বরং মা তো বলছিল, “ঠিক করেছিস। এখানে সবটাই পচা পাঁক। এখান থেকে বেরিয়ে গেলেই বেঁচে যাবি। এমনি এমনি কি লোকে বাইরে যায়! এখানে কিছু পায় না বলেই তো যায়! না হলে কেউ মায়ের মাটি ছেড়ে যেতে চায় নাকি? আমাদের নেতাদের তো মুখে বাতেলা ছাড়া আর কিছু নেই। ওদের রোজগারের চিন্তা নেই। তাই বড় বড় কথা বলতে পারে।
সাধারণ মানুষ তো আর গায়ের জোরে টাকা কামাতে পারে না। তাকে তাই নিজের পেটের ব্যবস্থার জন্য প্রাণপাত করতেই হয়। তুইও করছিস। এটাই ভাল। আমাদেরও লাভ হবে। এই যে জীবনে উন্নতি করছিস, দেখেই আমার খুব আনন্দ হচ্ছে।”
রাজু জানে যে, রানাও খুশি। আসলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ও নিজেও নাকি চলে যেতে চায় বাইরে। সেখানে ওর দাদা বিদেশে থাকলে বাড়তি একটা সুবিধে হবেই।
উর্জা যে মা আর ওর নামে বেশ কিছু টাকা ফিক্স করে দিয়ে যাবে, সেটা রাজু এখনও মাকে জানায়নি । ও নিশ্চিত এটা জানলে মা আরও খুশি হবে। রাজু ঠিক করেছে যাওয়ার ঠিক আগে এই বিষয়টা জানিয়ে যাবে।
এ সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই রাজু জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল। আর তখনই এসেছিল ফোনটা। এখন আবার কে ফোন করল! পাশের নড়বড়ে টেবিলে রাখা ফোনটা দেখে একটু অবাক হয়েছিল রাজু। সেতু!
সামান্য দ্বিধা নিয়ে ফোনটা ধরেছিল রাজু। আসলে শেষের দিন এক রকম শাসানি দিয়েই বেরিয়ে এসেছিল অফিস থেকে। তার পর আর কথা হয়নি। সেখানে সেতু নিজে ফোন করছে!
রাজু ফোনটা ধরে সময় নিয়েছিল একটু, তার পর বলেছিল, “হ্যাঁ, বলছি।”
সেতু খুব সাধারণ গলায় বলেছিল, “কী রে, বাড়িতে নাকি? খুব ব্যস্ত? একবার চলে আয়। আমি নতুন ফ্ল্যাট কিনেছি হিন্দুস্থান পার্কে। টেক্সট করে দিচ্ছি ঠিকানা। দরকারি কথা আছে। চলে আয়।”
মনের ভেতরটা একটু আড় হয়ে আছে রাজুর। সে দিন ভালই রাগারাগি হয়েছিল দু’জনের মধ্যে। সেখান থেকে সেতু এমন করে কথা বলছে যেন কিছুই হয়নি!
রাজু বলেছিল, “এখন?”
“আরে পাগলা, তুই রেগে আছিস এখনও? মাথা গরম করে খারাপ কথা বলে ফেলেছিলাম। ভুলে যা। শোন না, আমি পাঠিয়ে দিলাম ঠিকানা। চলে আয়। খুবই জরুরি কথা আছে। তোর লাভের কথাই। আয়।”
রাজু ফোনটা রাখতে রাখতে দেখেছিল সেতুর মেসেজ ঢুকছে। ঠিকানা, হিন্দুস্থান পার্ক। মানে গড়িয়াহাটার কাছে। ওখানে আবার কবে ফ্ল্যাট কিনল সেতু! ও সব জায়গায় তো বিশাল দাম হয় ফ্ল্যাটের। মানে, ও শুনেছে তো তেমনই। কিন্তু যাই হোক। এত দিনের পরিচয়। সেতু যখন ডেকেছে ও যাবে। আর ওর নাকি লাভ হবে। দেখা যাক কোনটাকে ওর লাভ বলছে সেতু।
মাকে বলে বেরিয়ে গিয়েছিল রাজু। তার পর বাসে করে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছোতে লেগেছিল তিরিশ মিনিট মতো।
কী বিশাল ফ্ল্যাটবাড়ি! কমসে কম দশতলা! দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একদম নতুন। রং করা দেওয়ালে রোদ এসে পিছলে যাচ্ছিল। নতুন রঙের ভাপ বেরোচ্ছিল যেন বাড়িটার শরীর থেকে। রাজু জানে এই ভাপ শুধু উন্নত পেন্ট-এ হয় না। এ ভাপ আসলে টাকার!
গেটের কাছে সেতুর নাম বলাতেই দারোয়ান লিফট দেখিয়ে দিয়েছিল। ফোর্থ ফ্লোর!
ফ্ল্যাটের দরজা খুলেছিল সেতু নিজে। ওকে দেখেই একদম প্রাণখোলা গলায় বলেছিল, “আরে, এসেছিস! আয় আয়!”
পিঠে হাত দিয়ে সেতু রাজুকে ঢুকিয়ে নিয়েছিল ঘরে।
সুন্দর পারফিউমের গন্ধ পেয়েছিল রাজু। সেতুর গা দিয়ে এখন
কী সুন্দর গন্ধ বেরোয়! কিন্তু মুড়াপোঁতার দিনগুলোয় এমন ছিল না। মুড়াপোঁতা মনে করতেই চোখের সামনে সেই রাতটা ঝলসে উঠেছিল ওর। নিজের হাতে সেতু ওটা কী করে করেছিল!
ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর করে সাজানো। রাজু দেখেই বুঝেছিল ওর অঙ্ক বোধের বাইরে এর দাম।
“এখানে জুতো খোল,” একটা জায়গা দেখিয়ে হাসিমুখে বলেছিল সেতু।
রাজু নিজের ধূলিমলিন আর চার জায়গায় সেলাই-করা জুতো ওই দামি মার্বেলের মেঝেতে খুলে রাখতেও কুণ্ঠাবোধ করেছিল।
বসার ঘরে ঢুকে চমকে গিয়েছিল রাজু। না, দামি আসবাব, গোড়ালি ডুবে যাওয়া কার্পেট বা মাথার ওপর ঝলমলে ঝাড়বাতি দেখে নয়, জহরকে দেখে!
রাজু অবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জহর এখানে কী করছে! “বোস,” একটা দুধসাদা সোফা দেখিয়ে দিয়েছিল সেতু, তার পর নিজে একটা বড় গদি আঁটা চেয়ারে বসে পরনের পাঞ্জাবিটা ঠিক করেছিল। সঙ্কুচিত হয়েই বসেছিল রাজু। এমন সোফা নাইন্টিজের হিন্দি ছবিতে দেখা যেত।
ও ভাবছিল এই সেই সেতু! কোথা থেকে কোথায় পৌঁছেছে! এত টাকা পেল কী করে? সোর্সটা কী? চাকরি-বাকরি তো করে না।
সেতু বলেছিল, “জহরকে আমি ডাকিয়ে আনিয়েছি। দেখ রাজু। তুই আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমাদের মধ্যে রাগারাগি হতেই পারে। এক ফ্যামিলিতে হয় না? হয় তো! আমাদেরও হয়েছে। আমি ভুলে গিয়েছি। আমি জানি তোর টাকার দরকার। তাই, জহর।”
রাজু তাকিয়েছিল জহরের দিকে। দেখেছিল, জহর কুইনাইন খাওয়ার মতো মুখ করে বসে আছে।
সেতু হেসে বলেছিল, “দশ লাখ বলেছিস তুই। ও আমায় বলেছে পাঁচ লাখ! আমি সাতে ডান করেছি। ঠিক আছে? আজ ও তোকে চার দেবে। আমি ওর প্লটটার ব্যবস্থা করে দিলে বাকি তিন পেয়ে যাবি।”
কথাটা বলে সেতু হেসে জহরের দিকে চোখ দিয়ে ইশারা করেছিল। জহর কষ্ট করে হেসে একটা ব্যাগ থেকে দু’হাজার টাকার দুটো বান্ডিল বের করে রেখেছিল সামনের টেবিলে।
“নো রসিদ। নাথিং। নিয়ে নে রাজু। নর্থ বেঙ্গলে যখন যাবি ওখানেও ব্যবস্থা করে দেব। পার্টি থেকেও ভাল টাকা পাবি। প্লাস নিজে আরও কামাতে পারলে কামিয়ে নিবি। কিন্তু সামনের ইলেকশনে আমাদের সব সিট চাই-ই চাই! বারেন্দ্রভূমি আমাদের হাতে থাকা খুব জরুরি। বুঝলি?” সেতু হেসে তাকিয়েছিল রাজুর দিকে।
রাজুও পাল্টা হেসেছিল এবার। বলেছিল, “জানো সেতুদা, আমাদের পাড়ায় একজন বাউল আসত। রূপদাস বাউল। কী যে অসাধারণ গান গাইত! ভাবতে পারবে না! আমরা ছোটরা সবাই ওর গলা পেলেই দৌড়ে বাইরে চলে যেতাম। এক পায়ে ঘুঙুর পরে হাতে একতারা নিয়ে ঘুরে ঘুরে, নেচে নেচে গাইত। টানা পাঁচ-ছ’টা গান। তার পর গান শেষ হলে এক গ্লাস জল খেত। সঙ্গে নিজের আনা বাতাসা। আমরা যে যা দিতাম নিত। আমাকে একতারাটা ধরতে দিত। তার পর পাড়ায় নতুন একটা পরিবার এল। সেই দাদার নজরে পড়ল রূপদাস বাউল। দাদাটির চেনাজানা ছিল অনেক। ফলে রিয়ালিটি শোতে চান্স পেয়ে গান গাইল রূপদাস। সিনেমাতেও গান গাইল। নাম হল। তুমিও শুনে থাকবে। অনেক দিন পরে আমাদের কলেজেও এসেছিল গাইতে। আমি গানের পরে ব্যাক স্টেজে ধরেছিলাম ওকে। বলেছিলাম আমি কোথাকার ছেলে। বলেছিলাম আমাদের পাড়ায় রূপদাস আসত এক সময়। বলেছিলাম, তুমি আমায় তোমার একতারা ধরতে দিতে, মনে আছে? এখনও আছে তোমার সেই একতারা?”
“জানো সেতুদা, লোকটা আমায় জড়িয়ে ধরে কী যে কেঁদেছিল! বাচ্চাদের মতো একদম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। আমায় বলেছিল, ‘একতারাও নেই, রূপদাসও নেই!”
“সেতুদা, আমি কিন্তু থাকতে চাই। নিজের পরিশ্রমে যা সামান্য জোটে তাতেই খুশি থাকতে চাই। জানি, সমাজ টাকাকেই এখন সাফল্য হিসেবে দেখে। তাই বড় বড় গুন্ডা বদমাশরা টাকা করে সমাজের মাথায় বসে আছে। কিন্তু আমি তা হতে চাই না। আমার একতারা যেন ঠিক থাকে। মুড়াপোঁতার সেই রাতে তুমি হয়তো নিজের কেরিয়ার দেখেছিলে, আমি পার্টির আদর্শ আর তোমার প্রতি বিশ্বাস দেখেছিলাম। তুমি ছিলে তাই আমিও ছিলাম সেতুদা। কিন্তু আজ আমায় কিনতে চেয়ে সেই তুমি-টা যে আর নেই, বুঝলাম। তাই আমিও থাকব না। আমি পার্টির সদর দফতরে পাঠিয়ে দিয়েছি চিঠি। চলেও যাচ্ছি এই দেশ ছেড়ে। তোমরা ভাল থেকো। মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু অন্তত কোরো। সবাই তোমরা নিজের আখের গোছানোর জন্য ব্যস্ত। এটা যে ঘোর অন্যায় সেই বোধটা তোমাদের কী করে হারিয়ে গেল কে জানে! মানুষ হওয়ার চেষ্টা কোরো। আজকের পর থেকে আমায় আর ফোন কোরো না। আমি রাজনীতি করতে এসেছিলাম, দালাল হতে বা ক্রিমিনাল হতে নয়।”
সেতুকে নড়তে দেয়নি রাজু। দেখেছিল, জহরের সামনে টকটকে লাল মুখ নিয়ে বসে আছে সেতু।
রাজু, জহরের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে সোফার ওপর রেখে বলেছিল, “ধার নিয়েছিলাম। দিয়ে গেলাম। ব্যস, সব হিসেব শেষ!”
রাজু আর কথা না বলে বেরিয়ে এসেছিল। নিজের ওই ধূলিমলিন, ছিন্ন জুতোকেই মনে হচ্ছিল রাজার নাগরা। মনে হচ্ছিল পৃথিবী যত রসাতলেই যাক না কেন, সততার মার নেই। কোনও দিন হবেও না।
“আরে, দেরি হয়ে গেল। সরি ভাই!” গুরান এসে হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে রাখা প্লাস্টিকের টুলে বসল।
রাজু বলল, “আরে, ঠিক আছে। আমার সেরকম কাজ নেই। আর তো ক’টা দিন, তার পর এ সব থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে চলে যাব। এখানে বসে আশপাশের সব কিছু মনে মনে টুকে রাখছিলাম। নে, তুই তোর সিংহাসনে বোস।”
রাজু উঠে গুরানকে ওর জায়গা ছেড়ে দিল। গুরান বসল নিজের চেয়ারে। বলল, “বাড়িতে মেসোরা এসেছে। শুনলাম, ওই ভাইরাস নাকি ছারখার করে দিচ্ছে! ‘ছ’ থেকে নাকি প্যান্ডেমিক ঘোষণা করা হয়েছে! সত্যি তাই?”
মাথা নাড়ল রাজু, “হ্যাঁ। ইউরোপের হাল খুব খারাপ। এখানে সে ভাবে এখনও হয়নি। যদি হয়…. কী যে হবে!”
“তুই যেখানে যাচ্ছিস সেটা কি ইউরোপ?” গুরান মৌরি-মিছরির ডিবেটা হাতে নিয়ে একটু হেলান দিয়ে বসল।
“মাইরি! নিউ জিল্যান্ড ইউরোপে নাকি? অস্ট্রেলিয়ার পাশে, নীচের দিকে। চারিদিকে সমুদ্র। ম্যাপ দেখিস না?” রাজু হাসল।
“ম্যাপ!” গুরান বলল, “নিউ ব্যারাকপুর কোথায় তাই জানি না, তো নিউ জিল্যান্ড! আমরা লোয়ার মিডল ক্লাস ভাই! বেঁচে আছি না মরে গিয়েছি, তাতে কারও কিছু যায় আসে না। ওই ভাঙা বাড়ি আর এই দেশলাই বাক্সের মতো দোকানেই আমাদের জীবন কেটে যাবে। আমাদের কাছে ঘুরতে যাওয়া মানে ডায়মন্ড হারবার বা দিঘা! ম্যাপ দেখে কী করব বল?”
“আচ্ছা, একটা ছেলে এসেছিল। বেশ রোগা। একটা পত্রিকা ফেলে গিয়েছিল। লিটল ম্যাগাজিন। নিতে এসেছিল। আমি দিয়ে দিয়েছি।”
“কাঁধে ব্যাগ আর মাথায় টুপি?” ডিবেটা আবার জায়গায় রেখে গুরান তাকাল।
“হ্যাঁ, ঠিক। কী নাকি মোবাইল সারাতে দিয়েছে তোকে!”
“আমায়? মোবাইল?” গুরান মৌরি চিবোতে চিবোতে বলল, “কই না তো! ও এসেছিল তোর খোঁজ করতে। দুপুরে।”
“আমার! মানে!” রাজু কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু ছেলেটা যে অন্য কথা বলল! তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই “দাদা” ডাকটা শুনল। রাজু দেখল, সাইকেল চালিয়ে দোকানের সামনেই এসে দাঁড়াল রানা। রানা হাঁপাচ্ছে। চুল এলোমেলো। মুখ-চোখ লাল! ভয় পেয়ে গেল রাজু। মায়ের কিছু হল নাকি! দু’দিন পরে যাওয়ার কথা, আর সেখানে মায়ের কিছু হলেই সব ঘেঁটে যাবে। পরমুহূর্তেই নিজেকে ধমক দিল ও। এ সব কী ভাবছে! ও এমন স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে!
রাজু উঠে গেল, “কী হয়েছে রে?”
রানা সাইকেলের সিটে বসেই বলল, “তুই এখনই বাড়ি চল। সাইকেলে ওঠ। কারা সব এসেছে। তোকে খুঁজছে। প্লিজ চল।”
রাজু থমকে গেল। ওকে খুঁজছে! কারা? কেন?
“কে এসেছে?” রাজু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। “আঃ, তুই চল না!” রানা ছটফট করে উঠল।
“আসছি রে গুরান,” রাজু আর কথা না বাড়িয়ে সাইকেলের সামনের রডে উঠে বসল।
বাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নেমে থমকে গেল রাজু। দুটো বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ওদের বাড়িতে ঢোকার দরজার বাইরেও দুটো বিশাল চেহারার লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেমন যেন পাথরের মতো মুখচোখ। আর এদের পাশে দাঁড়িয়ে সেই রোগা, ফ্যাকাসে ছেলেটা। যদিও মাথায় টুপি নেই এখন। লাল চুলের একটা গোছা, অদ্ভুত ভাবে ছাঁটা চুলের পাশ দিয়ে ঝুলে আছে।
এই ছেলেটা এখানে কী করছে! এরাই বা কারা! অবাক হয়ে সবার দিকে তাকাল রাজু। লালচুলো ছেলেটা হাসল ওকে দেখে। রাজু আর কথা না বাড়িয়ে রানার সঙ্গে ঢুকে গেল বাড়িতে। ওদের বাড়িতে ঢুকেই একটা ছোট্ট উঠোন। তার পরে দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘর।
কিন্তু ঘরে যেতে হল না। রানার সাইকেল রাখার জায়গাতেই দেখল দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। চমকে উঠল রাজু। এ যে বীরেন্দ্র ত্রিবেদী! উর্জার বাবা! পাশে ফর্সা পেটানো চেহারার একটা ছেলেও দাঁড়িয়ে। ছেলেটার গালে হালকা দাড়ি। এলোমেলো চুল। দেখতে বেশ ভাল হলেও চোখের দৃষ্টিতে একটা চাপা হিংস্রতা আছে।
রাজু কী বলবে বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বীরেন্দ্র তাকাল ওর দিকে।
রাজু কোনও মতে বলল, “আপনি… মানে, ভেতরে আসবেন?” বীরেন্দ্র সময় নিল। ভাল করে দেখল ওকে। তার পর বলল, “ভেতরে যাওয়ার সময় নেই। একটা কথা বলতে আসা। এ সব কাজ সচরাচর আমার লোকজন করে। কিন্তু আমার মেয়ে জড়িত বলে নিজে এসেছি।” লোকটার কথার মধ্যে যে চাপা ঔদ্ধত্য আছে, সেটা রাজুর মাথা গরম করে দিল। হতেই পারে উর্জার বাবা প্রভাবশালী মানুষ, তার মানে এই ভাবে কথা বলবে নাকি!
ও বলল, “স্যর, আমি আগে বলে নিতে চাই যে, আমি আপনার মেয়েকে ভালবাসি। আমরা এক সঙ্গে থাকার ব্যাপারে ঠিক করেছি। দু’জনেই প্রাপ্তবয়স্ক আমরা। কেউ কিছু করতে পারবে না। উর্জার থেকে দূরে থাকার জন্য টাকার প্রস্তাব থাকলে দেবেন না, শুধু শুধু অপমানিত হবেন।”
“টাকা! প্রস্তাব!” বীরেন্দ্র হাসল একটু, “এটা কি সিনেমা হচ্ছে? মেয়েটাকে নিয়ে আমার অন্য প্ল্যান আছে। তা ছাড়া তুমি প্রতিষ্ঠিত হলে একটা কথা ছিল। আমাদের বাড়িতে এমন হা-ঘরে লোকের সঙ্গে বিয়ে হয় না। তাই ভাল করে প্রথম ও শেষবার বলে গেলাম, উর্জার থেকে দূরে থাকো। আমি চাই না তোমার ক্ষতি করতে।”
“হা-ঘরে মানে!” রাজু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এটা কী ধরনের ছোটলোকামো? আপনার শুধু টাকাই আছে। শিক্ষাদীক্ষা নেই! আপনি মানুষ! বাড়ি বয়ে এসে এ সব বলছেন!”
“আমি কি সেই নিয়ে তোমায় কৈফিয়ত দেব নাকি? যা বললাম, শুনবে শুধু। বুঝেছ?” বীরেন্দ্র রাগে গরগর করে উঠল!
“আরে, আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকেই হুমকি দিচ্ছেন? কী করবেন আপনি?” রাজুও গলা চড়াল এবার। দেখল, রানা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মা দরজার কাছে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করল, “যা করার তাই করব!” তার পর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বোঝান ছেলেকে। এই সব রংবাজি নভেলে ভাল লাগে। যুদ্ধে নামলে হাতে বন্দুক নিতে হয়, চামচ নয়! বুঝলেন?”
রাজু বলল, “বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে। গুন্ডামি করতে এসেছেন? থ্রেট?”
বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করে একবার তাকাল রাজুর দিকে। তার পর বলল, “আসি আজ। ”
ওরা বেরিয়ে গেলেও উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল রাজু। সারা শরীর রাগে কাঁপছে। পাতি গুন্ডা একটা! টাকার জোরে দাপিয়ে বেড়ায়! সে বাড়িতে এসে যা খুশি তাই বলবে? এর একটা প্রতিকার হবে না?
রাজু কী করবে বুঝতে না পেরে সেতুকেই ফোন করল। বীরেন্দ্র তো ওদের পার্টির লোক।
চারবার রিং হওয়ার পর সেতু ধরল ফোনটা। গলায় বেশ একটা খুশির ভাব।
“কী রে! মাথা ঠান্ডা হয়েছে? বাউল নেমেছে ঘাড় থেকে? বল।”
“না সেতুদা। আমি ফোন করেছি বীরেন্দ্র ত্রিবেদীর জন্য। লোকটা আমার বাড়িতে এসে থ্রেট করেছে! ওর মেয়েকে আমি ভালবাসি বলে এ সব বলবে! তুমি….” রাগের চোটে রাজুর কথা গুলিয়ে যাচ্ছে, “ভুলে যেয়ো না আমি সব কেলেঙ্কারি জানি তোমার। যদি মুখ খুলি না! খুনের মামলা… আমি সাক্ষী নিজে, মনে রেখো!”
“ও, আবার থ্রেট করছিস!” সেতুর গলা পাল্টে গেল নিমেষে, “এ সব আমি জানি না। তুই কোথায় মেয়ে নিয়ে কী করেছিস, তার দায় তোর। আর পার্টিতে তোর রেজিগনেশন নেওয়া হবে না। পার্টি থেকে তোকে বহিস্কার করা হবে। ফান্ড নয়ছয় করেছিস তুই। চিঠি পেয়ে যাবি। আর তোর যা করার তুই করতে পারিস। আমাকে আর কোনও দিন ফোন করলে আমি ধরব না। তুই বিরোধীদের হাতে বিক্রি হয়ে গিয়েছিস। তোর কেলেঙ্কারি আমি ধরেছি বলে আমার নামে ফলস অ্যালিগেশন আনছিস। আর এ সব নিয়ে আমার সঙ্গে ফারদার যোগাযোগ করবি না!”
ফোনটা কেটে গেল। হতভম্ব মুখে একবার ফোনের দিকে তাকাল। সেতু এ সব কী বলল! রাজু কী করবে বুঝতে না পেরে তাকাল মায়ের দিকে। দেখল, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের মুখে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। রানা ভয়ে ঘামছে ভীষণ। ওদের ছোট্ট মলিন বাড়িটাকে আজ কেমন যেন আরও ছোট আর ভাঙাচোরা মনে হল। মনে হল ওরা ধুলোবালির চেয়েও সামান্য।
রাজু চুলের মধ্যে হাত ডোবাল। চোখ বন্ধ করে ভাবল, এবার তা হলে কী করবে ও! কার কাছে যাবে? এ জীবনে কি ভাল ভাবে, সৎ ভাবে বাঁচা যাবে না আর!
