২৫. কবি
“তুমি কি নিদ্রিত? নাকি তুমি জেগে থাকো? তুমি আদি, না অন্ত? তুমি আলো, না অন্ধকার? তোমার জল ভাল লাগে, না আগুন? তুমি আকাশ, না ভূ-অভ্যন্তর? সূর্যালোক, নাকি অতল খনির মধ্যেকার তমসা? তুমি জীব, না জড়? তুমি খিদে, না উদরপূর্তি? তুমি শস্য, না খরা? নদী, না মরুভূমি? তুমি প্রেম, না হিংসা? তুমি শান্তিবারি, না তেজস্ক্রিয় ছাই? কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ তুমি? শুক্রাণুর মধ্যে তুমি লীন ছিলে, নাকি ডিম্বাণুর মধ্যে বিন্দুবৎ শরীর নিয়ে বিরাজ করছিলে অনন্তকাল? তুমি কি তুমি? নাকি অন্য কেউ? নিজের মনের মধ্যেটুকু তুমি? না অন্যের ধারণায় তোমার উৎপত্তি? তুমি এক, না বহু? তুমি অগাধ প্রসারিত নক্ষত্ররাজি? না প্রলয়পয়োধি জলে ভাসমান ডিম্ব? তুমি অরণ্য, না শহর? তুমি দেবতা না রাক্ষস? কে তুমি? কী তুমি? কেন তুমি? কী ভাবে তুমি? তুমি ভালবাসা, না দ্বেষ? তুমি শ্লোক, না মৃত্যু-চিৎকার? তুমি নারী, না পুরুষ? তুমি সম্ভোগ না ত্যাগ? তুমি স্পর্শ করো, স্পর্শ করো, স্পর্শ করো। নিজের অভ্যন্তর তুমি স্পর্শ করো একবার। দ্যাখো, এ জগৎ সত্যি নাকি মিথ্যে? দ্যাখো, তুমি শুরু, না তুমি শেষ?”
লোকটা বেঁটে, মাথায় টাক। সামান্য কুঁজো। পরনে একটা নীল কাপড়ের লুঙ্গি আর গোলাপি রংচটা হাফ শার্ট। বাঁধানো গাছের গোড়ায় বসে রয়েছে। সামনের ভাঙাচোরা সিমেন্টে পাতা একটা গামছা। তাতে কয়েকটা দশ টাকার নোট, পাঁচ টাকার কয়েন পড়ে আছে। সে সব দিকে লোকটা খুব একটা তাকাচ্ছে না। বরং একটানা বলে যাচ্ছে কথাগুলো।
জায়গাটা খুব যে জনবহুল তা নয়। এখানে বসে খুব যে আয় হবে তাও নয়। তা হলেও লোকটা কেন এখানে এসে বসে আছে কে জানে!
জীবনে নানা রকম ভিক্ষুক দেখেছে কবি। কিন্তু এমন করে কথা বলতে কাউকে দেখেনি। ওর কেবলই আজ মনে পড়ে যাচ্ছে গ্রামের হাওয়াদাদুর কথা।
নিজেরই অবাক লাগল কবির। যখনই এমন কিছু শোনে, ওর হাওয়াদাদুর কথা মনে পড়ে। একটা মানুষ কী ভাবে এমন নির্মোহ অবস্থায় কাটাতে পারে জীবন! আচ্ছা, প্রথম থেকেই কি হাওয়াদাদু এরকম, নাকি জীবনের কোনও এক বিশেষ ঘটনার পর থেকে এমন হয়ে গিয়েছে!
স্কুল না-থাকলে, হাওয়াদাদুর ডিসপেনসারিতে গিয়েই বসে থাকত কবি। স্টেথো কানে দিয়ে নিজের বুকে লাগিয়ে শুনত লাবডুব লাবডুব। দূরে বসে হাওয়াদাদু দেখত ওকে। হাসত। বলত, “হ্যাঁ ভাল করে দেখ, শোন। ঠুকে বাজিয়ে নে। জানবি, এই তুইটাই একমাত্র সারা জীবন তোর সঙ্গে থাকবে। আর সব টেম্পোরারি। আসবে যাবে। যে যতই ভালবাসা দেখাক, ঘৃণা দেখাক সবাই চলে যাবে। কেবল কেউ আগে আর কেউ পরে। শুধু এই তুইটা থেকে যাবে তোর সঙ্গে। জীবনে কোনও কিছু পাওয়ার স্মৃতি না থাকলেও মৃত্যুর স্মৃতি বহন করতে হবে তোকে। সে বড় একার সময়! সেই সময়ের জন্য সারা জীবন ধরে প্রস্তুত হতে হয়। তাই দেখে নে নিজেকে। দেখ, তুই কী ও কেন? দেখ, তোর মধ্যে শুরু থাকলেও শেষ আছে কি না!”
কবি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। এ সব কথার মানে বুঝত না। তবে শুনত। কেমন একটা লাগত কথাগুলো শুনে। কেমন একটা ছমছম করত মনের মধ্যেটা। ধরি ধরি করেও কথাগুলোর মানে ঠিক ধরতে পারত না! আর সেই কারণেই যেন কথাগুলো মনে থেকে গিয়েছে ওর। আর আজ এই লোকটার কথাগুলো শুনে আবার পুরনো কথার সঙ্গে মনে পড়ে গেল হাওয়াদাদুকে!
মা আর কবির তো কেউ ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পরে কেউ ফিরেও তাকাত না ওদের দিকে। শুধু হাওয়াদাদু ছিল। দায়ে দফায় বিপদে-আপদে সাহায্য করত সব সময়।
এই যে কবি কলকাতায় আসবে, সেটা ও বলতেও গিয়েছিল মানুষটাকে। যদিও হাওয়াদাদু ছিল না তখন। বর্ধমানের কোন এক গ্রামের ভেতরে গিয়েছিল কাকে যেন সাহায্য করার জন্য।
আসলে হাওয়াদাদু যে কোথায়, কার সঙ্গে এবং কার জন্য মাঝে মাঝে চলে যেত, সে সব কেউ খুব একটা জানত না। শুধু সবাই জানত হাওয়াদাদু ডাক্তার, তাই রোগী দেখতে গিয়েছে।
কবি সে দিন পায়নি হাওয়াদাদুকে। তাই একটা ছোট চিঠি লিখে এসেছিল মাত্র। আসলে হাওয়াদাদু মোবাইল ব্যবহার করে না যে!
যাওয়ার আগে দেখা হবে না! কবির মনের মধ্যে একটু খচখচ করছিল বটে, কিন্তু উপায় তো ছিল না কিছু। হাওয়াদাদু সাতদিন নেই। আর তার মধ্যেই ঠিক হয়েছিল কলকাতায় চলে আসার ব্যাপারটা। তাই আগে জানানো হয়নি।
হাওয়াদাদুর খবর নেই অনেক দিন। মায়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় কবির। কিন্তু হাওয়াদাদুর কথা জিজ্ঞেস করা হয় না। আজ এই গোলাপি রংচটা জামার লোকটা আবার মনে করিয়ে দিল মানুষটাকে। নিজেকে কেমন যেন অকৃতজ্ঞ লাগল কবির।
“কেসটা কী বলো তো? স্যর এত টাইম নিচ্ছেন!” বুলা জিজ্ঞেস করল। বুলা ছেলেটা নতুন। কিছু দিন হল বীরেন্দ্রর অফিসে জয়েন করেছে। রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা। ফ্যাকাসে সাদা। মাথার চুল খুব কায়দা করে কাটা। আর তার সঙ্গে একটা গুচ্ছ আবার লাল রং করা! ছেলেটাকে বীরেন্দ্রর অফিসে দেখেছে কবি। কিন্তু বীরেন্দ্র সঙ্গে করে এই প্রথম নিয়ে এসেছে আজ।
বীরেন্দ্র গতকাল গভীর রাতে কলকাতায় ফিরেছে। আর ফিরেই নিজের ঘরে ডেকেছিল কবিকে। কবি দেখেছিল রাত একটা বাজে। কবি জানত এমনটাই হবে। কারণ, রবিবার খুব ঝামেলা হয়েছে বাড়িতে। উর্জা যে উমেশকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, সেটা লালুর থেকে শুনেছে। আর কারণটাও জানে কবি। রাজু!
ক’দিন উর্জাকে ফলো করে রাজুর ব্যাপারটা বুঝেছে কবি। ছেলেটা পলিটিক্স করে। প্রভাবশালী নেতা সত্যভাষের কাছের লোক। কবি খোঁজখবর নিয়ে যেটুকু জেনেছে তাতে বুঝেছে রাজু ছেলেটা সৎ। বাড়ির অবস্থা ভাল নয় খুব একটা। টানাটানির মধ্যেই দিন যায়। মায়ের সেলাইয়ের একটা ছোট ব্যবসা আছে। রাজুর ভাই রাজুর তুলনায় বেশ ছোট। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ৷
এরকম একটা বয়সে এতটা বড় ছেলের সঙ্গে কেন যে উর্জা ঘোরে, জানে না কবি। তবে হ্যাঁ, উর্জাকে কখনও রাজুর খুব একটা ক্লোজ হতে দেখেনি ও। সে দিন যে এয়ারপোর্টের কাছ থেকে ওদের ফলো করল, সেখানে দেখেছিল উর্জার গাড়িতে রাজু উঠেছে মাত্র। তার পর উর্জা ওকে বাড়ির কাছে নামিয়ে দিয়েছিল। ব্যস, এইটুকুই। রোজই আজকাল উর্জাকে অফিসের পরে ফলো করে কবি। কিন্তু এর বেশি কিছু পায়নি।
সেটাই রাতে ও বলেছিল বীরেন্দ্রকে।
বীরেন্দ্র সবটা মন দিয়ে শুনেছিল। তার পর বলেছিল, “রাজু! বন্ধু ও হতে পারে, তাই না? পার্টি করে বললি? সেতুর কাছের ছেলে? তবে তো হাতের মধ্যেই আছে। কিন্তু তোকে দেখতে হবে ওদের কতটা ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। বা আদৌ হয়েছে কি না। বুঝলি?”
কবি মাথা নেড়েছিল। তার পর নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে, কী মনে হওয়ায় এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করেছিল বীরেন্দ্রকে।
বীরেন্দ্র চমকে গিয়েছিল একটু। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “প্ৰণাম করলি? কী হয়েছে?”
কবি বলেছিল, “আজ মানে রাত বারোটার আগে, ইয়ে গতকাল আমার জন্মদিন ছিল।”
“জন্মদিন?” বীরেন্দ্র থমকে গিয়েছিল একটু। তার পর বলেছিল, “বাহ্, ভাল। ঠিক আছে। এটা রাখ,” পকেটে থেকে কয়েকটা দু’হাজার টাকার নোট বের করে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “কিছু কিনে নিস। আর কাল তুই আমার সঙ্গে বেরোবি। কাজ আছে। সারতে বিকেল হবে। সেখান থেকে উর্জার ডিউটিতে যাবি, বুঝলি?”
“স্যর, স্কুটিটা…” কবি কথা শেষ না করে তাকিয়েছিল বীরেন্দ্রর দিকে। “আমাদের গাড়ির পেছনে একজন স্কুটিটা নিয়ে থাকবে। কাজ শেষ হয়ে গেলে, তুই স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে যাবি। ক্লিয়ার?” বীরেন্দ্র উঠে দাঁড়িয়েছিল।
মাথা নেড়েছিল কবি। তার পর ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে।
সেই যে ছেলেটি স্কুটি নিয়ে ওদের গাড়ির পেছনে আসবে বলা হয়েছিল, সেই ছেলেটাই বুলা।
বুলা বলল, “গাছতলার দাদু কিন্তু হেব্বি জ্ঞানী। আমি শুনছিলাম। কী সব বলছিল বলো তো? কিচ্ছু মাথায় ঢুকছিল না। আর তখনই বুঝতে পারলাম, দাদু পুরো জ্ঞানের গুদাম।”
কবি তাকাল বুলার দিকে। ছেলেটা বড্ড বকছে। মানুষ কেন যে এমন অনর্থক কথা বলে কে জানে! ও দেখেছে দিনের বেশির ভাগ কথাই ফালতু, মূল্যহীন। কিন্তু তা-ও জাবর কাটার মতো করে বলে যায় মানুষজন। কেন বলে এমন? এই জীবনটা আশাহীন আর একঘেঁয়ে লাগে বলে? কিন্তু নিজের একঘেঁয়েমি কাটাতে গিয়ে অন্যকে যে বিরক্ত করছে, সেটা কি বোঝে না!
বুলা আবার বলল, “আমাদের স্কুলে যে বাংলার স্যর ছিলেন, তিনিও এমন কী সব আন্টুবান্টু বলে যেতেন। কেউ কিছু বুঝত না। মানে পাড়ার রবীন্দ্র জয়ন্তীতে সারকে সভাপতি করা হত। তিনি বক্তৃতা দিতে গিয়ে কী সব যে বলতেন না! রবি ঠাকুরের লেখা নীল আকাশ থেকে নেমে আসা বজ্রের মতো আমাদের হৃদয় বিদ্ধ করে মাটিতে মিশে যায়। রবি ঠাকুরের গান আমাদের মনে পাখনা জুড়ে দেয় আর আমরা তার জন্য উড়াল দিতে দিতে বেঁচে থাকার এক অন্য আলোকে গিয়ে উপনীত হই। আমরা আসলে স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে থাকি আর রবি ঠাকুর আমাদের সেই বেঁচে থাকাকে আরও স্বপ্নময়তায় ভরিয়ে দেন। এমন আরও কী সব কী সব বলতেন। লোকে খুব বাধ্য হয়ে খুশি খুশি মুখে ঘাড় নাড়ত। হাততালি দিত। পরে তাদের আমি ‘কী বুঝলে’ জিজ্ঞেস করলে তারা বলত, কিছুই বোঝেনি। বরং প্রচণ্ড বোর হয়েছে। কিন্তু সার পড়াশোনা জানা মানুষ। তাই যা বলেছেন নিশ্চয় কিছু মানে আছে ভেবে, সব বাধ্য ছাত্র হয়ে বসে থাকত। কিন্তু জানো গুরু, আমার কী মনে হয়? প্রচুর মানুষ এমন পড়াশোনার দোহাই দিয়ে ঢপবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে চার অক্ষরের বোকা বানিয়ে যাচ্ছে। আর কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। কিন্তু লোকটা পড়া আর নোট মুখস্থ করে গোটা কতক পাশ দিয়েছে বলে কেউ কিছু বলতেও পারছে না। ঠিক না?”
কবি সামান্য হাসল। বুলার অর্ধেক কথা ও শোনেইনি। ও গাড়ির মধ্যে রাখা ব্রিফকেসটা দেখল একবার। এতে টাকা আছে। বীরেন্দ্র বললেই এটাকে বাড়ির ভেতরে দিয়ে আসতে হবে ওকে।
বুলা আবার বলল, “আমার এক বন্ধু ছিল। আমাদের মধ্যে ও-ই ভাল ছিল পড়াশোনায়। ও বলত, ‘আসলে কী জানিস এই আধ পাকা আঁতেল টাইপের লোকগুলোকে পলিটিকাল নেতারা পোষে। এতে দু’পক্ষেরই লাভ হয়। এই ভাবে এই ইন্টেলেকচুয়াল ঢ্যামনামোগুলোর বৃদ্ধি হয়। আর কিছু পাবলিক তো যা বোঝে না সেটাকেই গাল ফুলিয়ে ভাল বলে। এ দিকে তলায় তলায় সলমন খানের সিনেমা দেখে দেখে চোখের পর্দা ফাটিয়ে ফেলছে! এমনি এমনি না হলে ওই ছবিগুলো অত ব্যবসা করে! আমার বন্ধু বলত, এই জন্য আমাদের কিছু হবে না। শালা, সবাই হাগা চেপে বসে আছে। কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মুখে ভাব যেন মোক্ষলাভ করেছে। আমার মনে হয়, বিশেষ করে আমাদের বাঙালিদের এই দশা। ঢপবাজিকে মাথায় চড়ে বসতে দিয়েছে। গোলমালটা হল এই যে, নোবেলটা রবি ঠাকুর পেয়েছেন কিন্তু বহু বাঙালি ধরে নিয়েছে যে, ওটা তারাই পেয়েছে। আমাদের ওই স্যর টাইপের লোকগুলো কিন্তু চারিদিকে প্রচুর আছে। দেখবে, কেমন ঢপবাজি করে চালিয়ে যাচ্ছে। আর লোকেও না বুঝে সবার সামনে নিজেকে বিজ্ঞের বাটখারা বোঝাতে খুব মাথা নাড়াচ্ছে আর খুব কালচার করছি ভেবে ইগোর আইসক্রিম চাটছে। শালা, শুনছ তো বিদেশে সব ভাইরাসে খাবি খাচ্ছে! সে মাল এখানেও এসে পড়েছে। এবার দ্যাখো না কী হয়! দেখবে আন্টুবান্টু কথা বলে যারা সারা জীবন ঢ্যামনামো করে গেল, তারা কী করে এবার।”
কবির প্রচণ্ড বিরক্ত লাগল। ও কড়া গলায় বলল, “তুমি স্কুটির কাছে যাও। আর মুখটা একদম বন্ধ করো। যাও।”
বুলা কোমরে হাত দিয়ে হি হি করে হাসল খুব। তার পর বলল, “আরে গুরু, খচে গেলে নাকি! আমি তো মানে এট্টু সমাজ বিশ্লেষণ করছিলাম।” কবি কড়া চোখে তাকাল।
বুলা হেসে বলল, “গুরু, এই বয়সে তুমি পুরো চাবুক আছো কিন্তু, তা না?”
কবির আচমকা হাসি পেল খুব। কী ছেলে এই বুলা! এ ভাবে বলার পরেও এমন উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাসির আগেই ফোনটা এল এবার। স্যর।
“হ্যাঁ সার!” কবি ফোন কানে লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“নিয়ে আয়। দরজায় বলা আছে, ঢুকতে অসুবিধে হবে না।”
কবি গাড়ির দরজাটা খুলে তার মধ্যে রাখা লেদারের ব্রিফকেসটা বের করল। তার পর দরজা বন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকাল। দেখল, বুলা স্কুটারে গিয়ে বসেছে। ওদের সিকিয়োরিটির গাড়িটা একটু দূরে দাঁড়ানো। গাছের তলায় বসা লোকটা এখনও কী সব বলে যাচ্ছে। কবি বাড়ির দিকে এগোল।
এই বাড়িটা কার ও জানে না। আগে আসেনি এখানে।
বাড়িটা বেশ বড়। তিনতলা। অনেকটা ছড়ানো। মধ্য কলকাতায় যে এমন বাড়ি এখনও আছে, ও ভাবতেও পারেনি।
দরজায় অবাঙালি কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে। তাদের চেহারা বাউন্সারদের মতো। পরনে পাজামা পাঞ্জাবি। চোয়াল শক্ত। ওরা কবিকে যেতে দিল।
বলল, তিনতলায় যেতে হবে, লিফট আছে!
বাড়ির মধ্যে বেশ আধুনিক লিফট।
তিনতলায় লিফট থেকে বেরিয়েই কবি দেখল, আবার ওরকম চেহারার চারজন দাঁড়িয়ে। আর তাদের পাশে সাফারি সুট পরা একটা লোক। সে-ই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল কবিকে।
কবি যে ঘরে এসে দাঁড়াল সেটা বিশাল। চারিদিকে শুধু মার্বেল আর মার্বেল। তার মধ্যে কালো মখমলের বসার জায়গা। মাথার ওপর বিশাল ঝাড়বাতি। কবির মনে হল হিন্দি সিরিয়ালের সেট দেখছে যেন।
সোফায় বীরেন্দ্রর সামনে বসে আছে উমেশ আর উমেশের বাবা উদয়-সহ আরও কয়েকজন। সব মিলিয়ে মোট পাঁচজন।
এবার বুঝতে পারল কবি। এখানে সে দিনের ঝামেলার পরে মিটমাট করতে এসেছে বীরেন্দ্র। কারণ, এই লোকটার ওপর বীরেন্দ্রর অনেক কিছু নির্ভর করছে। নিজের দলে বীরেন্দ্র বা বীরেন্দ্রর চ্যালাদের পছন্দ মতো টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। তাই বীরেন্দ্র বিরোধী শিবিরে এসেছে নিজের জায়গা পাকা করতে।
উমেশের বাবা বৃহত্তর স্তরের রাজনীতির একজন মাথাবিশেষ। মেয়ের বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা বাড়লে বীরেন্দ্রর বিশাল লাভ হবে। তাই উমেশকে যে সে দিন অপমান করা হয়েছিল, তাতে মলম লাগাতে এসেছে!
এদিকে এ-ও জেনেছে কবি যে, সে দিন যারা মারতে এসেছিল বীরেন্দ্রকে, তারা নাকি এই উদয়ের দলেরই লোক। যদিও কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না কিছু। সামনে সবাই কেমন যেন ইস্ত্রি করা, মাড় দেওয়া একটা ভদ্রতা নিয়ে বসে আছে।
কবির মনে হল, আচ্ছা, বীরেন্দ্র কি সেই জন্যই উর্জার সঙ্গে এই উমেশের বিয়ে দিতে চায়? উর্জাই কি আসলে এই গোটা সম্পর্কের মধ্যেকার সেই মলম?
কবি এই শহরে এসে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে, সাধারণ মানুষ নিজেদের মধ্যে এই পার্টি ওই পার্টি বলে ঝগড়া করে। গন্ডা গন্ডা ন্যায়- অন্যায় নিয়ে যুক্তি সাজায়। পার্টির এথিক্স কী হওয়া উচিত এ সব নিয়ে ঝগড়া করে। মারামারি কাটাকাটি করে। আসলে সব ফালতু।
ওপরের মহলে টাকা আর ক্ষমতাই হল আসল। যার হাতে টাকা তার হাতে ক্ষমতা, আবার উল্টোটাও ঠিক। আর সেটা ধরে রাখার জন্য যা যা করার সব করা হয়। ধর্ম, বর্ণ, জাতি থেকে শুরু করে বিখ্যাত মানুষ, ঘটনা মিডিয়া সব কিছুকে এরা ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করে। সেখানে এথিক্স শুধু লোকের সামনে দেখানোর মতো একটা বেড়ালছানা। সাধারণ মানুষ এ সব ধারণাই করতে পারে না।
ওর মাঝে মাঝে মনে হয় এই ওপরতলার লোকজনরা যে লাইফ স্টাইলটা মেনটেন করে, সেই জীবনটা যদি গরিব মানুষজনকে কয়েক দিনের জন্য দেওয়া হত, তা হলেই লোকজন বুঝতে পারত তারা কেমন অনর্থক নিজেদের মধ্যে মাথা ফাটাফাটি করছে!
“এখানে রাখ,” বীরেন্দ্র সামনের কাচের টেবিলটা দেখাল।
কবি ব্রিফকেসটা রাখল। তার পর দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াল। বীরেন্দ্র ঝুঁকে পড়ে নাম্বারিং লক ঘুরিয়ে খুলে ফেলল ব্রিফকেসটা। কবি অবাক হল। এমন দৃশ্য সিনেমাতেই দেখা যায়। কিন্তু সেটা যে এ ভাবে চোখের সামনে দেখবে ভাবেনি!
ব্রিফকেসে থরে থরে সাজানো দু’হাজার টাকার নোটে হাত রেখে বীরেন্দ্র, উদয়কে বলল, “এই যে, আপাতত পঞ্চাশ লাখ আছে। বিয়ের সময় আরও এসে যাবে। আপনি প্লিজ রাগটা মনে নেবেন না। এখনকার মেয়ে, বিদেশে ছিল। সেলফ ডিপেনডেন্ট। শি উইল কাম আরাউন্ড।”
উদয় টাকা দেখে এমন কিছু প্রতিক্রিয়া দিলেন না। শুধু বললেন, “ভাল হলেই ভাল। উমেশ লাইকস ইয়োর ডটার। তাই এখনও আমরা কথা বলছি। আপনি মেয়েকে দেখুন। আমরাও কিন্তু নজর রাখব। আর যদি তাও বেচাল হয়, আপনি আপনার মেয়ের যোগ্য শাস্তি নির্ধারণ করবেন। আমার অপমান আপনি নিজের অপমান হিসেবে দেখবেন। ক্ষমতা পেতে গেলে স্যাক্রিফাইস লাগে। উইল লাগে। কঠোর হওয়া লাগে। ইউ হ্যাভ টু প্রুভ ইওরসেলফ। সুন্দর মাইতি আগে আপনাদের দলে ছিল। এখন আমাদের সঙ্গে আছে। ও আপনার নামে ভাল কিছু কথা করছে না কিন্তু চাইছে না আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন। আসলে গোল্ডেন টিকিট একটাই মিস্টার ত্রিবেদী। ইউ হ্যাভ টু প্রুভ ইওর ওয়ার্থ। বুঝেছেন নিশ্চয়ই?”
“সুন্দর! আরে ও তো একটা ফালতু লোক। আগে তো আমার কাছেই ‘ছিল। পরে নিজেকে শের ভাবতে লাগল। সরে গেল। এই যে আমার ওপর হামলা হল। সেগুলো আই থিঙ্ক ও-ই করিয়েছে।”
উদয় হাসলেন। বললেন, “এমন কথা করবেন না যা আপনি প্রুভ করতে পারবেন না। ও আমার দলের লোক। আপনি এখনও আসেননি আমাদের সঙ্গে। আই উইল নট টলারেট দিস কাইন্ড অফ স্লান্ডার।”
বীরেন্দ্র থমকে গেল একটু। কবি দেখল, সবার সামনে বাঘ হয়ে থাকা লোকটা এখানে যেন খানিকটা শিয়াল!
বীরেন্দ্র বলল, “আমি সম্ভাবনার কথা বলছি উদয়জি। আর আপনাকেই তো বলছি, প্রেসকে তো বলিনি কিছু। পার্টিতে আমার কিছু ঝামেলা আছে। সেগুলো মিটিয়েই আমি আপনাদের পার্টিতে জয়েন করব। একটা গ্রামের দিকে আমার কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি আছে। ওতে পলিউশনের একটা ঝামেলা হচ্ছে। স্টেট ম্যাটার। সেটা সামলাতে হবে। আমি পার্টি বদল করতে পারি জেনেই আমায় হ্যারাস করা শুরু করেছে। বুঝতেই তো পারছেন!”
উদয় মাথা নড়লেন। বললেন, “আপনি স্যাক্রিফাইসের কথাটা মন দিয়ে শুনলেন না বোধহয়!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সে ঠিক আছে। আমি সব সামলে নেব…”
উদয় হাত তুলে থামালেন বীরেন্দ্রকে। তার পর কবিকে দেখিয়ে বললেন, “ওকে ছেড়ে দিন।”
“আরে হ্যাঁ,” বীরেন্দ্রর যেন এবার খেয়াল হল। ও বলল, “তুই কাজে বেরিয়ে পড়। গাড়ির চাবিটা বুলাকে দিয়ে ওর থেকে স্কুটিটা নিয়ে নে। আছে তো সঙ্গে? আমি বাড়িতেই থাকব। কাজ সেরে সোজা আসবি আমার কাছে। বুঝেছিস?”
কবি মাথা নাড়ল। তার পর আর দেরি না করে লিফটের দিকে দিল।
নীচে নেমে গাড়ির চাবিটা বুলাকে দিয়ে ওর থেকে স্কুটির চাবিটা নিয়ে কবি।
বুলা হেসে কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু কবি তার আগেই বলল, স্যরকে নিয়ে যাবে যখন, একটা কথাও বলবে না। বুঝেছ?”
বুলা, কবির গলা আর বলার ভাব দেখে ঘাবড়ে গেল একটু। শুধু মাথা বলল যে, বুঝেছে।
কবি আর সময় নষ্ট করল না। স্কুটির কাছে গিয়ে পকেট থেকে বের করল। পৌনে ছ’টা বাজে। ছ’টায় অফিস ছুটি উর্জার। পর ও কোথায় যায় দেখতে হবে।
মোবাইলের ওয়াল পেপারে উর্জার ছবিটা আবার দেখল ও। এটা একটু সাহসের কাজ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কী করবে! যত দিন যাচ্ছে উর্জা ওর মনে, শরীরে পুরনো বট-অশত্থের মতো শিকড় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ভাবছে, ভাববে না ওর কথা, ততই মনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে উর্জা। ওই হেসে কথা বলা। কানের পেছনে চুল সরিয়ে নেওয়া। চোখ তুলে তাকানো। ওরকম সুন্দর আঙুল দিয়ে বাগানে ছড়িয়ে থাকা ফুল কুড়োনো। কবি দেখবে না ভেবেও অসহায়ের মতো দেখে। না তাকিয়ে, চোখ বন্ধ করেও দেখে, সারাটা সময়।
কবি জানে, এটা কোনও সম্পর্ক নয়। হতে পারে না। জানে, ওরা দু’জন দুটো ভিন্ন গ্যালাক্সির বাসিন্দা। তবু কেন কে জানে ওর মনের মধ্যে সারাক্ষণ ঝরে যাওয়া মল্লিকা কুড়িয়ে চলে উর্জা।
এ ভাবে কেন যে জীবনে কেউ না এসেও আসে! কেন তাকে পাবে না জেনেও তার প্রতি অনুগত হয়ে থাকে এই বেঁচে থাকা! কেন, তাকে ছাড়া, বাকি সব কিছু অদৃশ্য আর ঘষা কাচের মতো লাগে! বুকের ভেতর খুব ধীরে কেন যে জন্ম নেয় বৃশ্চিক! তার হুল ছিন্নভিন্ন করে মন! কেন যে রাগের বিষফুল শরীরে, মনে কুড়ি ধরে অলক্ষ্যে! জীবন যে কী নিষ্ঠুর এক যাত্রাপথ! কী অসহনীয়, নিরাময়হীন এক যন্ত্রণা হয়ে থেকে যায় মাঝে মাঝে!
এই যে সে দিন দোলনা লাগানো হল। ও তো ছিল। দেখছিল সব। দোলনা টাঙাতে সাহায্যও করছিল। তার পর সেই দোলনায় এসে বসেছিল উর্জা।
উর্জা দোল খাচ্ছিল। হাওয়ায় ভেসে উঠছিল ওর চুল। নরম, সোনালি রোদ এসে পড়ছিল উর্জার মুখে। দূরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কবি। না, উর্জা দেখছিল না কাউকে। তাকাচ্ছিল না কোনও দিকে। শুধু নিজের মনে দোল খাচ্ছিল। হাসছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে মেখে নিচ্ছিল মার্চের সব রোদ আর হাওয়া।
কবি বুঝতে পারছিল, এমন দৃশ্য জীবনে একবারই দেখা যায়। আর যায় না। মানুষের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে এমন হাওয়া একবারই বয়। এমন রোদ একবারই ওঠে। এমন করে কোনও মেয়ে একবারই দোলনায় ভেসে থাকে উজ্জ্বল ফুলের মতো।
কবি সবার অলক্ষ্যে মোবাইল বের করে কয়েকটা ছবি তুলেছিল উর্জার। তার পর তার থেকে একটাকে বেছে রেখেছিল ফোনের ওয়াল পেপারে। ভেবেছিল ফোন খুললে তো দেখতে পাবে অন্তত।
উর্জার কথা কাউকে বলতে পারে না কবি। ও জানে বলা সম্ভবও নয়। কে বুঝবে ওর কথা! কে মানবে যে, ওর কোনও খারাপ উদ্দেশ্য নেই! কেউ না। এই পৃথিবীতে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই ও বলেনি কাউকে কিছু। বলবেও না।
এই যে লালু ওকে সারাক্ষণ জিনির কথা বলে, সেটা কেন ও কি জানে না? ও কি জানে না কেন জিনি ওর জন্য কিনে আনে উপহার? বানিয়ে আনে পায়েস? বাড়িতে খেতে ডাকে? কেন বলে ওকে ভাল লাগে জিনির? ও জানে। কিন্তু ও কী করবে? ওর যে আর কাউকেই কিছু দেওয়ার মতো নেই। জিনি খুব ভাল মেয়ে, কবি চায় ও ভাল থাকুক। কিন্তু কবি? ও কি থাকবে ভাল? এই যে রাজু বা উমেশ কোনও একজনের সঙ্গে চলে যাবে উর্জা, তখন কী হবে ওর? কী ভাবে থাকবে এখানে?
নাহ, কিচ্ছু ভাবতে পারে না কবি। শুধু জানে, উর্জার বিয়ের আগে এই শহর ছেড়ে ও চলে যাবে দূরে কোথাও। অন্য কেউ উর্জাকে ধরছে, এটা ভাবলেই কবির মনে হয় ওর গোটা শরীরটাকে কেউ যেন করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করছে। মনে হয় বৃশ্চিক তার হুলের সমস্ত বিষ ঢেলে দিচ্ছে বুকে। মনে হয় বিষফুল ফেটে গরল আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ওর শরীর, ওর মন।
কিন্তু সহ্য করে নিতে হবে। সহ্য করে নিতে হয়। ও সমাজের যে-স্তর থেকে এসেছে, সেই স্তরকে সমস্ত চাপ তাপ সহ্য করে নিতে হয় মুখ বুজে।
ও জানে মনের মধ্যে ফুল কুড়িয়ে নেওয়া মেয়েটা থাকলেও, বাস্তবের জীবনে ওর পথ শূন্য। মল্লিকা ফুল সেই পথে ঝরে পড়ে থাকবে একাকী। কোনও পার্থিব হাত এসে কুড়িয়ে নেবে না তাকে।
উর্জার অফিসের সামনে পৌঁছে স্কুটির স্টার্ট বন্ধ করতে হল না, কবি দেখল, উর্জা নিজের গাড়িতে উঠছে!
ওঃ, আর একটু হলেই মিস হয়ে যেত। ঠিক সময়ে এসে পড়েছে কবি। উর্জা গাড়িটাকে একটু জোরেই চালাচ্ছে আজ। কবি স্কুটিটাকে গাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই রেখেছে।
সন্ধে নেমে এসেছে কলকাতায়। দিকে দিকে আলো জ্বলে উঠেছে। বিলবোর্ড ঝলসাচ্ছে। বাস, ট্যাক্সি, অটো আর গাড়ির মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড়োচ্ছে উর্জার গাড়ি। পেছনে একটু দূরত্ব রেখে যাচ্ছে কবি। ওর মাথায় ক্র্যাশ হেলমেট। চেনার উপায় নেই।
ও বুঝতে পারল, বাড়ির দিকে যাচ্ছে না উর্জা। তা হলে কোথায় যাচ্ছে! উর্জা গড়িয়াহাটার ফ্লাইওভার ধরল। এই পথে আবার কোথায় যাচ্ছে! কবি বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে ব্যাপারটা।
যাদবপুর মোড় পার করে এইট বি-র দিকে এগোচ্ছে উর্জা। তার পর এইট বি মোড় পার করে আর একটু সোজা গিয়ে বাঁ দিকে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল গাড়িটা।
এখানে কে থাকে? উর্জা তো এই ক’দিনে এখানে আসেনি! কবি সামান্য দূরত্ব রেখে স্কুটি চালাতে লাগল। রাস্তাটা নির্জন। আশপাশে লোকজন কমে এসেছে। উর্জা আর একটা গলির মধ্যে ঢুকল এবার। তার পর একটা বাড়ির সামনে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড় করাল গাড়ি।
এখানে রাস্তায় আলো বেশ কম। পাশের একটা ইলেকট্রিকের পোলের বড় আলোটা নেবানো আছে। এই আবছায়াতেই স্কুটিটাকে দাঁড় করিয়ে আলো নিবিয়ে দিল কবি ।
ও দেখল, গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক দেখল উর্জা। না, ওকে দেখতে পায়নি।
উর্জা রিমোট লক দিয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করে পাশের প্রায় অন্ধকার একটা বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লোহার বড় গেটটা খুলল। তার পর ভেতরে ঢুকে গেল!
কবি হেলমেটটা স্কুটির সিটের নীচে রেখে এগোল। কার কাছে এসেছে উর্জা, এরকম একটা আলো আর জানলা-দরজা বন্ধ বাড়িতে?
ও দেখল, উর্জা এবার বাড়ির বারান্দায় উঠল আর সঙ্গে সঙ্গেই সামনের কাঠের দরজাটা খুলে গেল। রাজু বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। বেল বাজানোর আগেই বেরিয়ে এল। মানে রাজু অপেক্ষা করছিল। প্ল্যানড মিটিং!
কবির বুকের ভেতরটা কেমন একটু নড়ে গেল। রাজু বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক তাকাল, তার পর আচমকা উর্জার কোমরটা পেঁচিয়ে ওকে টেনে নিল কাছে। ঠোঁটে ঠোঁট ঠেসে ধরে রাখল। উর্জা একটু সময় পরে ঠেলে সরিয়ে দিল রাজুকে। হেসে উঠল সামান্য। কাচের চুড়ি বেজে ওঠার মতো মিহি শব্দ ভেসে এল এখানেও! রাজু আর উর্জা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গিয়ে বন্ধ করে দিল দরজাটা।
কবি যেন নড়তে পারল না। এখানে এ ভাবে কী করছে ওরা! মানে, যা ভাবছে সেটাই কি হচ্ছে?
বুকের ভেতর কেমন একটা করছে কবির। মনে হচ্ছে একটা নয়, এত দিনে লক্ষ লক্ষ বৃশ্চিক জন্ম নিয়েছে ওর শরীরের সর্বত্র। তাদের দংশনে যেন মাথা ঘুরছে ওর। চারিদিক যেন টালমাটাল। হিংসে হওয়া কি একেই বলে! কিন্তু রাজুকে তো ভালবাসে উর্জা। কত দিনের পরিচয়। সেখানে কবি কে! এমনকি, কবি বলে যে কেউ এই পৃথিবীতে আছে, সেটাও হয়তো মনে থাকে না উর্জার। তা হলে কবি এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে ওর সব কিছু এলোমেলো আর ওলটপালট হয়ে গেল এক ধাক্কায় !
রাগ জন্মাচ্ছে কবির মধ্যে। ইচ্ছে হচ্ছে খুন করে ফেলে রাজুকে। মনে হচ্ছে বেঁধে রাখে উর্জাকেও। তার পর নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয় উর্জার পায়ে। নিজেকে ভেঙে ফুলের মতো ছড়িয়ে দেয় উর্জার জন্য। এরকম একই সঙ্গে কী করে কাউকে শাস্তি দিতে আর ভালবাসতে ইচ্ছে করতে পারে? এমন করে আগুন আর বরফ একই সঙ্গে থাকে কী ভাবে! এ কোন রহস্য পৃথিবী মেলে ধরছে কবির সামনে! এখন কী করা উচিত ওর? কী জানতে চাইছে ও? কী না জানলে ও দম আটকে এখানেই শেষ হয়ে যাবে?
টালমাটাল পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল কবি। শব্দ হওয়ার ভয়ে লোহার গেটটা খুলল না। বরং হালকা পায়ে নিমেষে টপকে গেল পাঁচিল। বাড়ির দরজা জানলা সব বন্ধ। পুরনো দিনের বাড়ি। সামান্য ভাঙা ফাটা চারিদিক। কবি ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বাড়ির জানলায় জানলায় কান পাতল। আর অবশেষে একটা জানলায় শুনতে পেল আওয়াজ। অস্ফুট। আহত আরামের শব্দ।
নিজেকে আটকাতে পারল না কবি। খুব অন্যায় জেনেও ও আলতো করে জানলার খড়খড়ির একটা কাঠ ফাঁক করল।
পুরনো দিনের একটা বিছানা। আর তার ওপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মন্থনে রত দুই প্রাপ্তবয়স্ক দেহ। রাজুর ওঠা-পড়া আর আদরের মধ্যে উর্জা পিঠ খামচে ধরে আছে ওর। আশ্লেষে, সৃষ্টির ধ্বনি গুঞ্জন তুলছে এই মহাবিশ্বে।
দেখল, ঘরের ভেতর ম্লান আলো জ্বলছে।
আচমকা কবির সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে গেল। যেন এই মুহূর্তে ও নিজেও বুঝল, কেমন অজান্তেই ও তীব্র ভাবে জড়িয়ে পড়েছে উর্জার সঙ্গে। ও জানলার কাঠটা নরম ভাবে নামিয়ে দিয়ে কোনও মতে দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলাল ।
সব ঝাপসা লাগছে ওর। এ কী দেখল! কেন দেখল! ঈশ্বর বলে কেউ যদি থাকে, সে আর কত কষ্ট দেবে ওকে! যে হত্যার গ্লানি থেকে জীবনে ফিরে আসার জন্য মনে মনে উর্জার হাত ধরেছিল কবি, সেটাও আজ চলে গেল। ওর প্রিয় নারী অন্যের শরীরের তলায় পিষ্ট হচ্ছে। আর তাতে সুখীও হচ্ছে। এ জীবনে তা হলে আর কী রইল কবির? কে রইল?
ও চোয়াল শক্ত করে আবার দেওয়াল টপকে রাস্তায় এল। না, আর থাকবে না এখানে। এর চেয়ে আর কী করতে পারে উর্জা, যা ওকে দেখতে হবে?
কবি টলতে টলতে ফিরে এল স্কুটির কাছে। হেলমেটটা বের করে মাথায় পড়ল ভূতগ্রস্তের মতো। তার পর গাড়িতে বসে চালিয়ে দিল সেটা। কলকাতায় আজ কে যেন লেপটে দিয়েছে সব আলো। কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না কবি। ও ক্র্যাশ হেলমেটের ভাইজার সরিয়ে নিজের চোখে হাত দিল। কাঁদছে ও! ছিঃ, এমন ন্যাকামো করার সত্যি কি কিছু আছে! কবির ভেতরের আর-একটা কবি যেন ধমক দিল ওকে। কিন্তু এই কবিটি আজ শ্রবণশক্তি হারিয়েছে। সঙ্গে মস্তিষ্কও কাজ করছে না ওর।
কবি কী ভাবে যে গাড়ি চালাল, নিজেও জানে না। ক’টা সিগনাল মিস করল, কাকে কোথায় ওভারটেক করল বুঝতে পারল না। বাড়িতে ঢোকার মুখে কোন কোন দারোয়ান গেটে আছে, তাও খেয়াল করল না। আজ সব যেন ঝাপসা। সব যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া জলরঙের ছবি।
স্কুটি আর হেলমেট গ্যারাজে রেখে, গ্যারাজের পাশে গাড়ি ধোয়ার জন্য যে কলটা আছে, সেটা খুলে ভাল করে চোখে-মুখে আর ঘাড়ে জল দিল কবি। তার পর পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছল। ঘাড়, মাথা মুছল। লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে উর্জার ছবিগুলো মুছে দিল সব। তার পর পাল্টাবে বলে ওয়াল পেপার সেটিং-এ গেল। কিন্তু ছবি পাল্টানোর আগে এক মুহূর্ত থমকাল কবি। শেষবারের মতো দেখে নিল নরম বাসন্তী রোদে হলুদ ওড়না উড়িয়ে ভেসে থাকা মেয়েটাকে। তার পর মুছে দিল সেটাও। আকাশের দিকে তাকাল একবার। মাথার ওপর অশেষ অন্ধকার। ওর মনেও কি তাই নয়?
বিষ আবারও উঠে আসছে গলা বেয়ে। চোখ বেয়ে। এই জীবন বেয়ে। চোয়াল শক্ত করে, হাতের মুঠো বন্ধ করে প্রাণপণে নিজেকে সামলাল কবি। গলার ব্যথাটা মনের জোরে মুছে ফেলার চেষ্টা করল। তার পর এগোল বীরেন্দ্রর ঘরের দিকে।
কী বলবে বীরেন্দ্রকে? যা দেখেছে বলে দেবে? আবার মনের মধ্যে ফুটে উঠল মিলন দৃশ্য। ফুটে উঠল আরামে উর্জার কেঁপে ওঠা শরীর। তৃপ্তির গুঞ্জন। আর এবার কষ্টের বদলে প্রচণ্ড একটা রাগ পাকিয়ে উঠল মনের মধ্যে। নিষ্ঠুর, সংহারক এক রাগ। মনে হল এর জন্য শাস্তি পেতে হবে রাজুকে। কোনও যুক্তি নয়, কোনও কারণ নয়, অন্ধ কুয়াশার মতো, বজ্ৰগৰ্ভ কৃষ্ণমেঘের মতো রাগ এসে আচ্ছন্ন করে দিল কবিকে।
বীরেন্দ্র বসেছিল নিজের ঘরেই। সেই কালো পোশাক। গুনগুন করে এসি চলছে। সামনের টেবিলে মদের গ্লাস। কাজু, পেস্তার রুপোর প্লেট। কবিকে দেখে সামান্য অবাক হল বীরেন্দ্র। সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?”
“না স্যর,” কবি চোয়াল শক্ত করল। বীরেন্দ্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। তার পর জিজ্ঞেস করল, “উর্জা ফেরেনি, তুই ফিরে এলি যে!”
“স্যর, আমি যা দেখার দেখে এসেছি,” কবি বীরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বলল।
“কী দেখেছিস?” বীরেন্দ্র চোয়াল শক্ত করে তাকাল।
“ম্যাডাম এখন রাজু বলে ছেলেটার সঙ্গে একটা বাড়িতে আছেন।”
“বাড়িতে মানে?” ভুরু কুঁচকে আছে বীরেন্দ্রর, “ছেলেটার বাড়িতে?”
“না স্যর, ফাঁকা বাড়িতে। দু’জনে….” কবি মাথা নামিয়ে নিল।
“কী দু’জনে?” বীরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, “কী করছে ওরা বাড়িতে?”
কবির বুকের মধ্যেকার কৃষ্ণমেঘ, হিংসা আর দ্বেষে সবুজ হয়ে গেল। পরাগ ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত শরীরে। ও সোজা তাকাল বীরেন্দ্রর । তার পর বলল, “আমি নিজে দেখে এসেছি স্যর, ওরা সেক্স করছে।”স
