৬. জিনি
সেকেন্ড পিরিয়ডের সময়ই জ্বরটা এসেছিল জিনির। মাথা টিপটিপ করছিল। শরীরের মধ্যে কেমন যেন একটা ম্যাজমেজে ভাব। চোখও জ্বালা করছিল। আর এখন, এই ফোর্থ পিরিয়ডের শেষে তো আর বসেই থাকতে পারছে না।
নিধি বলল, “কী হয়েছে তোর? চোখ এমন লাল কেন? দেখি।” নিধি হাত দিল ওর কপালে। তার পর চোখ বড় বড় করে বলল, “ওরে বাবা! এ যে গা পুড়ে যাচ্ছে! কখন থেকে এল? চল, একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিবি। তার পর ডাক্তার দেখাবি বাড়ি গিয়ে। আর ক্লাস করতে হবে না। চল।”
জিনি হাসল কোনওমতে। ওর কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ও সহ্য করে নিতে পারবে। ছোট থেকেই ওর সহ্যগুণ বেশি। ছোটবেলায় পা ভেঙে একটা গোটা রাত কাটানোর পরে ও মাকে বলেছিল যে, ওর শরীর খারাপ করছে একটু। আর-একবার চোখে শুঁয়োপোকা পড়েছিল। সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সেটাতেও অনেক পরে বলেছিল মাকে। সেবার বছরখানেক লেগেছিল চোখ ঠিক হতে।
ডাক্তাররা অবাক হয়ে বলেছিলেন, “এইটুকু মেয়ের এত সহ্যক্ষমতা! বাপরে!”
তা কষ্ট সহ্য করতে পারে জিনি। আর এই জন্যই মা ওকে বকে। তবে তাতে জিনি কিছু মনে করে না। জিনি জানে, মা ওকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে। মায়ের সারা জীবনের সব কিছু যেন ওকে ঘিরেই। মা বলে, “কেন সহ্য করিস তুই? কিসের জন্য করিস? কষ্ট হলে বলিস না কেন? জানবি, তুই না বললে পৃথিবী পেয়ে বসবে আরও। কেউ তোর মনের কথা জানতে যাবে না। জানিস না এই পৃথিবী কতটা নৃশংস। নিষ্ঠুর। কতটা অমানবিক। কারও ঠেকা পড়েনি তোর কষ্টের কথা নিজে থেকে জানার। বুঝেছিস?”
পৃথিবীর ঠেকা না পড়লেও নিধির ঠেকা পড়ে। এই মেয়েটা সারাক্ষণ সবার সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। কার শরীর খারাপ করছে। কার টাকার সমস্যা। রাস্তায় কোথায় কোন কুকুরের শরীর খারাপ। ফুটপাথে থাকা কোন মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সব নিয়েই নিধি চিন্তিত।
জিনি ভাবে, পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলেও, এখনও ভগবান নিধিদের মতো কাউকে না কাউকে ঠিক পাঠিয়ে দেনই। আর, একটা ভাল মানুষ একশোটা খারাপ মানুষকে ঠিক ব্যালেন্স করে দেয়। নিধিদের বিশাল বড় ব্যবসা আছে। চাল, চিনি, আলু, পেঁয়াজের হোলসেলের ব্যবসা। সঙ্গে বর্ধমানে রাইস মিলও আছে দুটো। দার্জিলিংয়ে থ্রি স্টার হোটেল আছে একটা। ওর বাবা সেই কাজেই ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ।
নিধির মায়ের ম্যাট্রিমোনিয়াল সার্ভিসের অফিস আছে। সঙ্গে ইন্টিরিয়র ডেকরেশনও করে। জিনি অবাক হয়ে দেখে, নিধি ছাড়া ওদের বাড়ির বড়রা সবাই সারাক্ষণ টাকা রোজগারে ব্যস্ত!
নিধির একটাই বোন। ক্লাস নাইনে পড়ে। জিনি দেখেছে, সেও সারাক্ষণ সেজেগুজে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত।
শুধু নিধি ওরকম নয়। বাবার কাছ থেকে এক পয়সাও নেয় না নিজের জন্য। বরং অনলাইনে নানা কনটেন্ট লিখে রোজগার করে। পাশাপাশি নাইট স্কুলে বাচ্চাদের ফ্রি-তে পড়ায়। আর চেনা-অচেনা কারও কোথাও কোনও অসুবিধে হচ্ছে জানতে পারলে, নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে তাদের সাহায্য করে।
মেয়েটার কোনও সাজগোজ নেই। অহঙ্কার নেই। তবে হ্যাঁ, খুব চটপটে আর ঠোঁটকাটা মেয়ে। যেটা ওর ঠিক মনে হয়, মুখের ওপর বলে দেয়। আসলে রাস্তাঘাটে নানারকম ঝামেলা সামলায় বলেই হয়তো এমন হয়ে গিয়েছে।
জিনি দেখল, নিধি উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
জিনি সামান্য হেসে বলল, “তুই প্লিজ় এত টেনশন নিস না। ও ঠিক হয়ে যাবে।”
নিধি আবার কপালে হাত দিল ওর। তার পর বলল, “কোনও কিছু নিজে থেকে ঠিক হয় না। ঠিক করতে হয়। নাঃ, যা বুঝতে পারছি তুই নিজে ডাক্তারের কাছে যাবি না। আমাকেই নিয়ে যেতে হবে।”
বিধান এসে দাঁড়াল। কাঁধে একটা মেরুন রঙের ঝোলা। সেটাকে ঠিক করে কাঁধে তুলে নিয়ে জিনিকে বলল, “চলে যাচ্ছিস? সেতুদা আসবে। শুনবি না বক্তৃতা?”
জিনি মাথা নাড়ল, “আসলে কাল রাতে মাথার কাছে জানলাটা বন্ধ করা হয়নি। সারা রাত তো হিম পড়ে, তাই ঠান্ডা লেগে গিয়েছে। সকাল থেকেই গা-টা ম্যাজম্যাজ করছিল। আর এখন…”
“চল চল, আর কথা বলতে হবে না,” জিনিকে ওর বইয়ের ব্যাগটা নিতে দিল না নিধি।
জিনি উঠল। তার পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল ক্লাসের বাইরে।
ঠান্ডা আর অ্যালার্জির ধাত জিনির। একটু এদিক-ওদিক হলেই জ্বর আসে। কত কিছু যে ওর খাওয়া বারণ! সারাক্ষণ খুব বুঝেশুনে চলতে হয় ওকে। কিন্তু কাল রাতে এত ঘুম পেয়েছিল যে, জানলা বন্ধ করার কথা আর মনে ছিল না। মা-ও ভুলে গিয়েছিল।
ক্লাস-রুমের বাইরের করিডরে অনেক ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কথা বলছে। আজ কিসের যেন একটা জমায়েত আছে কলেজ স্কোয়ারে। ফেস্টুন মাইক হোর্ডিং সাজানো হচ্ছে চারিদিকে। শুনেছে সত্যভাষ নাথ, মানে সবাই যাকে সেতুদা বলে ডাকে, সে নাকি আসবে মিটিংয়ে। রাজ্যে নেতা হিসেবে সেতুদার এখন খুব নামডাক! দারুণ বক্তৃতা করে। মঞ্চ আর মাইক পেলে শ্রোতাদের কাউকে নড়তে দেয় না। ঠিক ভুল যাই বলুক, মানুষকে আটকে রাখার একটা ক্ষমতা আছে লোকটার।
কারও কারও থাকে। জানে জিনি। কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের মধ্যে একটা অকারণ চৌম্বকীয় বল কাজ করে। তারা এমন বেঁধে রাখতে পারে মানুষজনকে। আর কথাটা মনে আসতেই রোগাপাতলা, সামান্য দাড়িওলা ফর্সা ছেলেটার মুখটা মনে পড়ল জিনির। মনে হল বুকের খুব গভীরে কোথাও ছোট্ট একটা গিঁট পড়ল যেন। দু’চামচ রক্ত চলকে উঠল শিরায়। মনে হল নাগরদোলা থেকে জিনি আচমকা পড়ে গেল মাটির দিকে।
চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল জিনি। এ সব মনে করতে চাইছে না ও। কিন্তু তাও কেন যে মনে পড়ছে!
“জিনি জিনি, এই জিনি!”
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার মুখে পেছন থেকে বিধানের গলা পেল জিনি। সামান্য বিরক্ত লাগল। এই ছেলেটা কিছুতেই ওকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
জিনি দাঁড়াল। নিধি পাশ থেকে বলল, “কাটিয়ে দে কাটিয়ে দে। এক্ষুনি ঘ্যান ঘ্যান করবে। বুর্জোয়া, সাম্যবাদ, জনজাগরণ, এই সব নিয়ে নোট মুখস্থ বলবে। আসল ধান্দা তো তোর সঙ্গে প্রেম করা! শালা! কাটিয়ে দে।”
জিনি ঘুরে দেখল, বিধান দৌড়ে আসছে। একটা বিস্কিট রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরে আছে। দেখেই শরীর খারাপের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল জিনির। এই ছেলেটাই আবার রক ব্যান্ডের গান শুনতে যাওয়ার সময় কালো টি-শার্ট পরে। দোলে পরে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। কোনও বিয়েবাড়িতে চওড়া পাড়ের ধুতির সঙ্গে পাঞ্জাবি। আবার প্লেনে করে কোথাও গেলে কোট-প্যান্ট।
বিধান এসে দাঁড়াল। সামান্য হাঁপাচ্ছে। ঘামে চকচক করছে কপাল। কাঁধে একটা মেরুন রঙের ঝোলা। সেটাকে ঠিক করে কাঁধে তুলে নিয়ে বিধান বলল, “চলে যাচ্ছিস? সেতুদা আসবে। শুনবি না বক্তৃতা?”
জিনি কিছু বলার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল নিধি, “না, শুনবে না ও সব ভাটের কথা। সব ক’টা এক। স্বাধীনতার পর থেকে শুধু বক্তৃতা আর বাতেলা। দিনকে দিন দেশের মানুষের কষ্ট বাড়ছে। তা নিয়ে কথা নেই, শুধু থিয়োরি আওড়ে হাততালি। নিজের তিনটে খারাপ কাজের হিসেব ঢাকতে অন্যের চারটে খারাপ কাজের ফিরিস্তি দেওয়া। চ্যানেলে পোষা লোকজন দিয়ে প্রোপাগান্ডা চালানো। শুনবে না এ সব! ভাগ!”
“তুই চুপ কর না!” বিধান ঘাবড়ে গেলেও সেটা লুকোতে তেজ দেখাল, “সারাক্ষণ অন্যের ব্যাপারে নাক গলাবে!”
“বেশ করব!” নিধি ভুরু কুঁচকে বলল, “এমনিতেই জিনির জ্বর আর উনি এলেন বিপ্লব করতে! সর, সরে দাঁড়া।”
“জ্বর!” বিধান গলা কাঁপিয়ে এমন করে কথাটা বলল যেন এইমাত্র শুনেছে যে, জিনি মরে যাবে।
বিধান এগিয়ে এসে জিনির কপালে হাত দিতে গেল। নিধি আটকে দিল হাতটা, “শালা, চান্স পেলেই মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার ধান্দা, না! পড়িস তো হিস্ট্রি নিয়ে, ডাক্তার নাকি তুই? সর, সরে যা।”
বিধান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তার পর কী বলবে বুঝতে না পেরে সরে গেল। নিধি তাকাল বিধানের দিকে। বলল, “এই রঙের পাঞ্জাবি পরিস কেন? তোকে একটুও মানায় না! ছাগল একটা! নীল পরবি নীল। ব্লু ইজ় ইওর কালার!”
জিনির এ সব ভাল লাগছে না একদম। বাড়ি যেতে পারলে যেন বাঁচে। জ্বর এলেই জিনির সেই ছোটবেলায় গরমকালের দুপুরে মামার বাড়ির কাঁঠাল গাছটার কথা মনে পড়ে। ওর মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে। ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে সেখানে যেত ও। মামার বাড়িতে অনেক বই ছিল। সুন্দর সুন্দর ছবির বই। সে সব বইয়ের পাতা উল্টে ছবি দেখতে কী যে ভাল লাগত ওর!
এ ছাড়াও মামার বাড়ির মধ্যে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে বাগান ছিল একটা। লিচু, সবেদা, জামরুল, পেয়ারা, আম আর কাঁঠালের গাছ ছিল বেশ কয়েকটা। জিনি তার আলোছায়ার মধ্যে ছুটে, খেলে বেড়াত মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে।
মাঝে মাঝে যখন কেউ আশপাশে থাকত না, জিনি একটা কাঁঠাল গাছের ওপর উঠে, মাটির সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে থাকা ডালে বসে থাকত একা। রোদ এসে পড়ত ওর গায়ে। ধীরে ধীরে তেতে উঠত মুখ, কপাল! চারিদিকে সবুজ কাঁঠাল পাতার গন্ধ। জিনির কী যে অদ্ভুত লাগত। ও চোখ বন্ধ করে কল্পনা করত কোনও ট্রপিকাল রেনফরেস্টের মধ্য দিয়ে একা একা যাচ্ছে যেন। আবার কোনও দিন চোখ বন্ধ করে ভাবত, এই যে মুখ কপাল তেতে উঠছে, তা আসলে মরুভূমির মধ্য দিয়ে একা-একা হাঁটছে বলেই। চোখ বন্ধ করলেই কত রকম জায়গায় যে মনে মনে ঘুরে বেড়াত জিনি!
আসলে কোথাও কোনও দিন সে ভাবে ঘুরতে যায়নি ও। ঘোরার মতো অবস্থা ছিল না ওদের। এখনও নেই। তাই নিজের মতো করে ভেবে নিত জিনি।
আজও এমন জ্বর হলে তাই ছোটবেলার সেই মামাবাড়ির কাঁঠাল গাছটার কথা মনে পড়ে ওর। সেই তেতে ওঠা কপাল, মুখ। সেই ছোটবেলার মতো তাপ। বাইশ বছরের জিনি এখনই বুঝতে পারে, মনে মনে ঘুরতে যাওয়ার জন্য ছোটবেলার মতো সুন্দর জায়গা এ জীবনে আর কিছু হয় না!
রাস্তায় নেমে জিনি দেখল চারিদিকে ভিড়টা বেড়েছে বেশ। কলেজ স্কোয়ার থেকে লোকজন উপচে উঠে রাস্তায় চলে এসেছে। চারিদিকে মাইকের আওয়াজ। চিৎকার। পুলিশের গার্ডরেল ঘেঁষে ছেলেপিলেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জিনি দেখল, নিধি মোবাইল খুলে গাড়ি বুক করছে। ও বলল, “এই, অনেক টাকা নিয়ে নেবে। আমি বাসে বাসে চলে যাব।”
“নিক অনেক টাকা। আমি দেব। একদম ওস্তাদি করবি না।” নিধি গাড়ি বুক করে চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা আর বাড়তে থাকা আসলে জিনি চায় না কেউ ওর বাড়ি, বা বলা ভাল থাকার জায়গায়, যাক। কারণ, ওদের তো নিজের বাড়ি নেই। বীরেন্দ্র ত্রিবেদীর আউট হাউসে থাকে ওরা। একতলায়। সেখানে টিভি ফ্রিজ এসি সব ওদের দিয়েছে বীরেন্দ্র। শুধু সম্মানটা দেয়নি।
ভিড়টাকে দেখল বিরক্ত মুখে। বলল, “রাজনৈতিক জমায়েতগুলো দেখলে না আমার গা-পিত্তি জ্বলে! কোনও নেতা এসে ভাষণ দেবে যেই, অমনি চ্যালা-চামুণ্ডাগুলো এসে জুটবে। আর নেতাগুলো যা বলে তার বেশির ভাগটাই কিন্তু গপ্পো। চ্যালাগুলো জানেও। তাও এসে হ্যা হ্যা করে জিভ বের করে দাঁড়িয়ে থাকবে। কী? না দাদা যদি একটু সুবিধে পাইয়ে দেয়। নিজের যোগ্যতা নেই কারও, তাই পাইয়ে দেওয়ার ওপর নির্ভর করতে করতে একটা দেশকে শেষ করে দিল সবাই। এদিকে কারও সমস্যা হোক, একটাকেও দেখতে পাবি না। সব পাশ কাটাবে। শুধু ক্যামেরা এলে দাঁত বের করে সব সমাজসেবী সাজবে। বিধানটা গাধা। ওর কাছে এগুলো হল লাক্সারি। নিজেকে ইমপর্ট্যান্ট ভাবার একটা হল। ভাবের ঘরে চুরি। গাড়িটা এখনও আসছে না।”
জিনির ভাল লাগল না এ সব। ও জানে মোটেও সবাই এমন নয়। মানুষের বিপদে এখনও অনেক অল্পবয়সি ছেলেরা মেয়েরা ছুটে যায়! ইয়ংদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলে পার পাওয়া যায় বলে মানুষজন এমন বলে। কিন্তু জিনি এই নিয়ে আর ঝামেলা বাড়াল না। ও জানে কথায় কথা বাড়ে। তা ছাড়া শরীরটাও ঠিক নেই। ও ম্লান ভাবে হাসল। তার পর বলল, “যা না, মঞ্চ রেডি আছে, উঠে পড়!”
নিধি মোবাইল খুলে বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে, গাড়িটা ওরকম চক্কর খাচ্ছে কেন!”
জিনি হাত ধরল নিধির। বলল, “আমি পারব একা যেতে। সত্যি।” নিধি ওকে পাত্তা না দিয়ে বলল, “দেখলি শালা, বুকিং ক্যানসেল করে দিল! এখন কী করি?
“শোন না, আমি একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিচ্ছি। তার পর বাসে করে বাড়ি চলে যাচ্ছি। প্লিজ, শোন আমার কথাটা,” জিনি কাতর চোখে তাকাল নিধির দিকে।
আসলে জিনি চায় না কেউ ওর বাড়ি, বা বলা ভাল থাকার জায়গায়, যাক। কারণ, ওদের তো নিজের বাড়ি নেই। বীরেন্দ্র ত্রিবেদীর আউট হাউসে থাকে ওরা। একতলায়। সেখানে টিভি ফ্রিজ এসি সব ওদের দিয়েছে বীরেন্দ্র। শুধু সম্মানটা দেয়নি।
ওর বাবা সারা বাড়ির ম্যানেজারি করে। মাসে কুড়ি হাজার টাকা পায়। সঙ্গে ইলেকট্রিক বিলও দিতে হয় না। বাড়ির লনে একটা বিশেষ জায়গার পরে না ডাকলে ওদের যাওয়া বারণ। তেমনই আবার বাড়ির পিছনের দিকে সুইমিং পুলের কাছেও যাওয়া বারণ। এমন নানা নিয়ম আছে ওখানে। এই সর্ব নিয়মের মধ্যেই কেমন একটা হেয় ভাব আর অপমান লেগে থাকে যেন। তাই ও চায় না ওর বন্ধুরা ওদের থাকার জায়গায় যাক।
নিধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবার। মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে আছে। বলল, “দেখ, কী আর বলি আমি! যা ইচ্ছে তোর।”
“নিধি, রাগ করিস না প্লিজ। অ্যাই নিধি!” জিনি, নিধির হাতটা ধরল। আর তখনই একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল ওদের থেকে একটু দূরে। বেশ বড়, দামি গাড়ি। জিনি একটু অবাকই হল!
ও দেখল, গাড়ির পিছনের দরজার কাচটা নামানো হল এবার। একটা মেয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “আরে, জিনি না? চিনতে পারছিস?”
জিনির চিনতে এক সেকেন্ড মতো সময় লাগল। তার পরেই মুখটা হাসিতে ভরে গেল ওর। উর্জাদি! এখানে! কী ভাবে!
উর্জা হাত বাড়িয়ে ওকে ডাকল কাছে। জিনি একটু সময় নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে গেল ওর দিকে। নিধিও এল সঙ্গে।
“কী হয়েছে তোর?” জিনি কাছে যেতেই উর্জা ভুরু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে, “মুখ-চোখ এমন ন? কী হয়েছে রে? শরীর খারাপ?”
জিনি বলার আগেই নিধি বলল, “প্রচণ্ড জ্বর এসেছে ওর। এই নিয়ে বলছে বাসে করে বাড়ি যাবে? কোনও মানে হয়, বলুন?”
উর্জা বলল, “সে কী! আরে, বাসে যাবি কেন? আমি তো বাড়িতেই যাচ্ছি। আমার সঙ্গে চল।”
“বেস্ট!” নিধি যেন নিশ্চিন্ত হল, তার পর জিনিকে সামান্য ঠেলে বলল, “ওঠ গাড়িতে।”
জিনি ইতস্তত করল একটু। তার পর সামান্য হেসে গাড়ির সামনের সিটে দিকের এগিয়ে গেল।
“আরে, এদিকে আয়,” উর্জা গাড়ির পেছনের দিকে দরজা খুলে সরে বসল, “উঠে বোস। আশ্চর্য মেয়ে৷”
জিনি সঙ্কোচের সঙ্গে উঠে বসে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বেশ ঠান্ডা গাড়ির মধ্যে। ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল জিনি। এই শীতের শেষ এখন। ঠান্ডা নেই। তাও গাড়িতে এসি চলছে!
উর্জা সামনে বসা ড্রাইভারকে বলল, “বুরুদা, এসিটা কমিয়ে দাও। একদম মিনিমাম করে দাও।”
নিধি ঝুঁকে পড়ে জিনির ব্যাগটা জানলা গলিয়ে জিনির হাতে দিয়ে বলল, “বাড়ি গিয়ে একটা মেসেজ করে দিবি। আর ওষুধ খাবি। দরকারে ডাক্তারও দেখাবি। আমি রাতে ফোন করব। কেমন?”
জিনি হেসে মাথা নাড়ল। দেখল, নিধি সরে দাঁড়াল এবার। বুরুদা জানলার কাচ তুলে দিল। তার পর গাড়ি ছেড়ে দিল।
গাড়িটা বড়। সিটটাও খুব নরম। আর রাস্তার ওপর দিয়ে কেমন যেন ভেসে ভেসে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। বাসে করে যাওয়ার সময় যেমন মনে হয় যে, পার্টির হয়ে কৌটো নাচিয়ে পয়সা তোলার মতো কেউ যেন শরীরের সমস্ত কিছু নাচিয়ে, ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে, এ গাড়ি তেমন নয় মোটেই। ও ভাবল টাকাপয়সা থাকলে বেঁচে থাকাটা সত্যিই মসৃণ হয়ে যায়।
শীত লাগছে। তার ওপর এমন গাড়ি! মনে মনেই যেন একটু জড়সড় হয়ে বসল জিনি।
ও শুনেছিল, উর্জা ফিরে এসেছে দু’দিন হল। কিন্তু দেখা হয়নি। আসলে চার বছর পর ফিরেছে ঊর্জা। কিন্তু ওই দিকে তো না ডাকলে যাওয়া বারণ। তাই আর দেখা করতে পারেনি।
তবে হ্যাঁ, যখন এখানে থাকত উর্জা, তখন মাঝে মাঝেই লনে বা বাগানের কাছে ডেকে নিয়ে কথা বলত জিনির সঙ্গে। টুকটাক এটা ওটা কিনে দিত। জিনিকে দিয়ে কুলের আচার, চালতার আচার, ফুচকা কিনিয়ে আনাত।
আসলে উর্জার মা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার মেয়ে এ সব খাবে, ভাবতেই পারত না। তাই জিনিকে দিয়ে লুকিয়ে এ সব কিনে আনাত উর্জা। তবে নিজে খেত সামান্যই। বেশির ভাগটাই দিত জিনিকে।
মাঝে মাঝে ওকে পড়াও দেখিয়ে দিত উর্জা। গান গাইত। লুডোও খেলেছে কয়েকবার।
কারণ সেই, সঙ্কোচ। উর্জারা যে ওদের মনিব, সেই ব্যাপারটা মা-বাবা এমন করে মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, সেটা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারত না জিনি। ও বুঝত, এই মনিব-ভৃত্য ব্যাপারটাই মধ্যযুগীয়। কিন্তু এটাও বুঝত, আজও পৃথিবীতে অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যযুগ বেঁচে আছে। তাই ঊর্জা যতই সহজ সরল ব্যবহার করুক না কেন, মনে মনে জিনি জানত উর্জা দিদির মতো, কিন্তু দিদি নয়!
ঊর্জা দেশে ফিরেছে। এত দিনে হয়তো পাল্টে গিয়েছে। আর জিনিও কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে এখন। ওর মনও পাল্টে গিয়েছে অনেক। আগের চেয়ে অনেক বেশি কনফিডেন্স এসেছে! অর্থনৈতিক শ্রেণিভাগের ব্যাপারে জেনেছে। তার ভেতরের কলকব্জা সম্বন্ধে ধারণ! হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে উর্জার প্রতি কেমন একটা দূরত্বই তৈরি হয়ে গিয়েছে মনে মনে। তাই এই ঠান্ডা, মসৃণ গাড়ির মধ্যে বসে একটা অস্বস্তি বোধ করছে জিনি।
উর্জা হাত বাড়িয়ে জিনির কপালে ছোঁয়াল। বলল, “ভালই তো জ্বর আছে। দাঁড়া, একটা ওষুধ আনাই। একজনকে বলি।”
সবটাই খুব ভাল লাগত জিনির। কিন্তু বেশি কিছু বলতে পারত না।
উর্জা ফোনটা কানে ধরে কাউকে একটা প্যারাসিটামল আনতে বলল এক পাতা। তার পর ফোনটা রেখে জিজ্ঞেস করল, “খুব কষ্ট হচ্ছে? সামনেই উঠবে একজন। ওকেই বললাম।”
সামনে? কে উঠবে আবার! আর ওর জন্য ওষুধ উর্জা কিনবে কেন? কী বিপদ! জিনির খারাপ লাগছে। কিন্তু উর্জা এমন করে বলছে যে, না-ও করতে পারছে না। ও সামান্য হেসে গাড়ির জানলা দিয়ে রাস্তা দেখতে লাগল।
একটু পরে উর্জা বলল, “ওই যে দেখ জিনি। ওই… বুরুদা, বাঁ দিকে দাঁড় করাও তো গাড়িটা।”
জিনি অবাক হয়ে দেখল, গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে কবি। এখানে ও? বুকের মধ্যে আবার খালি খালি ভাবটা নাগরদোলায় চড়ে দ্রুত নেমে এল নীচের দিকে। জিনির মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। জ্বরটা কি বাড়ল আরও?
সামনের দরজা খুলে এবার উঠে বসল কবি। জিনিকে দেখে অবাক হলেও সেটা লুকিয়ে নিল দ্রুত। বলল না কিছু। বরং ওষুধটা বাড়িয়ে দিল উর্জার দিকে।
উর্জা বলল, “আমার জন্য নয়! জিনির জন্য। ওকে দাও। আর জিনি, এই নে জল।”
দরজার খাপে রাখা জলের একটা বোতলের মুখ খুলে জিনির দিকে বাড়িয়ে দিল উর্জা!
জিনি তাকাল কবির দিকে। শান্ত মুখ। তাকিয়ে আছে। চোখে কি জিজ্ঞাসা! জিনির জ্বর হয়েছে শুনে কি ওর উদ্বেগ হয়েছে!
কবি এতক্ষণ রোদে ছিল বলে ওর মুখ লাল হয়ে আছে। গালে হালকা দাড়িতে বাদামি আভা। কী যে ভাল লাগল জিনির। ও কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিল।
কবি দিল ওষুধটা। কবির হাত সামান্য স্পর্শ করল জিনির হাত। জিনির হাতের জলের বোতলটা কেমন যেন কেঁপে গেল। একটু জল চলকে পড়ল জামায়।
উর্জা দ্রুত হাতটা ধরল জিনির। জিনি তাকাল দেখল, উর্জার দিকে।
না-হেসেও উর্জার চোখে হাসি, ইঙ্গিত!
জিনি মাথা নামিয়ে নিল। যেন জ্বর এল আরও। রোদে হাওয়ায় আরও কত কী যে এল! আর তার সঙ্গে এল কবিও। কিন্তু বড্ড ভুল সময়ে এল এরা। উর্জাকে কি এমন সময়টাতে সামনে থাকতেই হত! কবি আর জিনি কি এমন একটা সময়ে একটু একা থাকতে পারত না! জীবনে সবই হয়, কিন্তু ভুল সময়ে হয়। তাই তো মনখারাপের শেষ হয় না। শীতকাল চলে, চলতে থাকে, অনস্ত সময়ের দিকে।
