ক. জগন্নাথ (বড় দিনের ঠিক এক দিন আগে)
আজকাল মাঝে মাঝেই প্রচণ্ড কাশি হয়, তবু বিড়িটা কিছুতেই ছাড়তে , পারছে না জগন্নাথ। মিনিট দশেক না খেলেই মনে হয় বুকের মধ্যে যেন একটা কারখানা আস্তে আস্তে কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে! মাথার মধ্যে অদ্ভুত একটা ভোঁতা শব্দ শুরু হয়। শিরায় শিরায় রক্তকণিকা সব ঝিমিয়ে পড়ে। চোখের সামনে কেমন যেন ছোট ছোট পোকার মতো কী সব নড়ে। সারা পৃথিবী টলমল করে। তাই বাধ্য হয়েই তখন আবার বুক-পকেটে হাত দিয়ে বিড়ির বান্ডিলটা বের করতে হয়। প্রায় তেতাল্লিশ বছর বয়স হল জগন্নাথের। বিয়ে-শাদি করেনি ।
দাদার সংসারে থাকে। কাছের একটা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়ায়। মানে, ঠিক পড়ায় না, লাইব্রেরিয়ান। তবে সেটা নামকাওয়াস্তেই। স্কুলে-টুলে যায়-টায় না বিশেষ। পার্টির কাজ করতে হয়, ফুরসত কই! আর স্কুলেও কেউ এই নিয়ে কিছু বলে না। জগন্নাথ ঘোষকে কিছু বলবে সেই হিম্মত ক’জনের আছে এই মুড়াপোঁতায়!
জগন্নাথের দাদা, মানে হারু ঘোষের চারটে বিশাল চালকল আছে। সঙ্গে জমিজমাও কম নেই। তার ওপর আজকাল আরও কী সব নতুন ব্যবসা খোলার তাল করছে নাকি! টাকার তো অভাব নেই কোনও! এখানকার বাড়িটাও বিশাল বড়। মানে, দূর থেকে দেখলে রাজপ্রাসাদ বলেই মনে হয় ৷
সেখানে জগন্নাথ, পুঁজির এই ধরনের এক হাতে একত্রিত হওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলে। তার থেকে উদ্ভুত ক্ষমতার যে বিষ, তার বিরুদ্ধে কথা বলে। ক্যাপিটালিজমের বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধে কথা বলে। দাদার চালকলের শ্রমিকদের হয়ে দাদার কাছেই দরবার করে।
হারু এতে রেগে যায় খুব। কিন্তু লীলার জন্য কিছু বলতে পারে না। লীলা হল জগন্নাথের বৌদি। হারু ঘোষের স্ত্রী। হারু জগন্নাথকে যতই উচিত শিক্ষা দিতে চাক না কেন, লীলা ঠিক আটকে দেয় হারুকে ।
হারু রেগে বলে, “তোমার জন্য জগাটার এত বাড় বেড়েছে। ওকে এতটা লাই দিয়ো না। ও একদিন আমাকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়বে বলে দিচ্ছি!” জগন্নাথ জানে লীলা ওকে আগলাবেই। কারণ, লীলার সঙ্গে সামাজিক ভাবে ওর দেওর-বৌদি সম্পর্ক হলে কী হবে, আসলে তলায় তলায় ওদের সম্পর্কটা অনেক আদিম! এই যে লীলার দুই সন্তান, তারা কার? হারু ঘোষের নাকি?
হারু প্রায়ই বর্ধমান, বাঁকুড়া ইত্যাদি জায়গায় যায় সেখানকার চালকলগুলোর তদারকি করতে। লীলার রাতগুলো তখন কাটে জগন্নাথের সঙ্গেই ।
সেখানে জগন্নাথ, পুঁজির এই ধরনের এক হাতে একত্রিত হওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলে। তার থেকে উদ্ভুত ক্ষমতার যে বিষ, তার বিরুদ্ধে কথা বলে। ক্যাপিটালিজ়মের বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধে কথা বলে। দাদার চালকলের শ্রমিকদের হয়ে দাদার কাছেই দরবার করে।
হারু এতে রেগে যায় খুব। কিন্তু লীলার জন্য কিছু বলতে পারে না। লীলা হল জগন্নাথের বৌদি। হারু ঘোষের স্ত্রী। হারু জগন্নাথকে যতই উচিত শিক্ষা দিতে চাক না কেন, লীলা ঠিক আটকে দেয় হারুকে ।
হারু রেগে বলে, “তোমার জন্য জগাটার এত বাড় বেড়েছে। ওকে এতটা লাই দিয়ো না। ও একদিন আমাকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়বে বলে দিচ্ছি!” জগন্নাথ জানে লীলা ওকে আগলাবেই। কারণ, লীলার সঙ্গে সামাজিক ভাবে ওর দেওর-বৌদি সম্পর্ক হলে কী হবে, আসলে তলায় তলায় ওদের সম্পর্কটা অনেক আদিম! এই যে লীলার দুই সন্তান, তারা কার? হারু ঘোষের নাকি?
হারু প্রায়ই বর্ধমান, বাঁকুড়া ইত্যাদি জায়গায় যায় সেখানকার চালক- লগুলোর তদারকি করতে। লীলার রাতগুলো তখন কাটে জগন্নাথের সঙ্গেই ।
লীলা বলে, “তোমার দাদার টাকা ছাড়া কিছু নেই। কিচ্ছু না। ব্যাটাছেলে নাকি ও? ওর দ্বারা কোনও কাজ হয় না। কেন বিয়ে করেছিল আমায়! আমার ওপর উঠে একটু নড়াচড়া করেই সব শেষ হয়ে যায় ওর! আমার ওতে হয় নাকি!”
লীলার যে ওতে হয় না সেটা জানে জগন্নাথ। মানে যাকে বলে হাড়ে হাড়ে জানে। বিড়ি খেয়ে দম কমে গিয়েছে জগন্নাথের। তাই আজকাল রীতিমতো কষ্ট হয় লীলাকে সামলাতে। লীলা আঁচড়ে- কামড়ে শেষ করে দেয় ওকে। সেই সব মুহূর্তে আহত বাঘিনির মতো হয়ে যায় লীলা!
আদরের সময় লীলা উত্তেজিত হয়ে বলে, “আমাকে বাঁধো, আমাকে বেঁধে করো। কামড়ে দাগ করে দাও… জোরে কামড়াও… মাগো… এবার এইখানে… হ্যাঁ, এ ভাবে…”
জগন্নাথের ইদানীং কষ্ট হলেও সে সব সামলে আদর-টাদর ভালই পারে এখনও । লীলার মনমতো আদর করতে পারে। তাই লীলা সময় পেলেই এসে জগন্নাথের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর শরীরের বৃত্তি শেষ হয়ে গেলে বলে, “অন্য কোনও রাক্ষসীর কাছে যদি যাও, তা হলে দেখো কী করি?”
হাঁপিয়ে, ঘেমে, চিত হয়ে শুয়ে জগন্নাথ হাসে। প্রাণপণে শ্বাসবায়ু শুষে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে, “কেন, কী করবে?”
লীলা হিসহিসে গলায় বলে, “জগন্নাথ ঘোষ খুন হয়ে যাবে আমার হাতে।”
“তাই?” জগন্নাথ আরও হাসে।
লীলা চিত হয়ে শুয়ে থাকা জগন্নাথের ওপর ওঠে আবার। এলো চুল বুকের ওপর থেকে পেছনে সরিয়ে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। তার পর জগন্নাথকে নিজের মধ্যে গেঁথে নিয়ে বলে, “আসুক কোনও রাক্ষসী, দেখবে!”
জগন্নাথ বুক পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করল। তার পর চোয়াল শক্ত করল। ভাবল, লীলা জানে না যে, ওর রাক্ষসী এসে গিয়েছে। জানে না সেই জন্য আজকাল লীলাকে আদর করতে এত পরিশ্রান্ত লাগে, বিরক্ত লাগে ওর!
বেশ কয়েক বছর হল রতি নামে একটি মেয়ে পার্টিতে যোগ দিয়েছে। তবে আগে অন্য অঞ্চলে কাজ করত।
কয়েক মাস আগে মুড়াপোঁতার প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেয়েছে রতি, তাই এখন এখানেই থাকে। ফলে এখানে পার্টির কাজে পাওয়া যাবে বলে ওকে কিছু বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পার্টির তরফ থেকে।
রতির বয়স তিরিশ। মালোপাড়ায় একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। বিয়ে করেনি বলে একাই থাকে সেখানে। একজন কাজের দিদি আসে দু’বেলা কাজকর্ম করে দেওয়ার জন্য।
পার্টির সকলের সঙ্গে আলাপ হওয়ার ক’দিন পরে জগন্নাথ খেয়াল করেছিল যে, রতি যেন ওর দিকে একটু বেশিই তাকিয়ে থাকে। ওর কথায় যেন একটু বেশিই হাসে। এমনকি, সকলের আড়ালে ওর জন্য রান্নাও করে নিয়ে আসে।
বাচ্চু, জগন্নাথের খুব ঘনিষ্ঠ। তাই হয়তো সকলের চোখের আড়ালে এ সব হলেও বাচ্চুর চোখে ঠিকই পড়েছিল ব্যাপারটা।
তাই বাচ্চু মাঝে মাঝেই একা থাকলে গলা নামিয়ে গোপন কথা বলার মতো করে বলেছে, “জগাদা,
মেয়েটা তোমায় হেভি সিগনাল দিচ্ছে। তুমি লাইন ক্লিয়ার করে দাও একবার, তার পর দেখো মজা!”
জগন্নাথ পাত্তা দেয়নি। উত্তরে বলেছে, “তোর খালি বাজে কথা।”
বাচ্চু হেসে বলেছে, “মধ্য চল্লিশ চলছে তোমার। এবার চোখের নিমেষে ষাট-পঁয়ষট্টি হয়ে যাবে। আর কতদিন এমন সন্ন্যাসীর মতো কাটাবে? মেয়েটা বয়সে অনেকটা ছোট তোমার চেয়ে। কিন্তু আজকাল এ সব কেউ দেখে না। তুমি এবার কিছু একটা করো।
পার্টি তোমায় বুড়ো বয়সে দেখবে না। সব শুষে নিয়ে ছিবড়ে করে সাইড করে দেবে। তাই বলছি নিজেরটা নিজে দ্যাখো। এমন মেয়ে রোজ আসে না। লেগে পড়ো সময় থাকতে।”
বাচ্চু শুধু জগন্নাথের ঘনিষ্ঠই নয়, ওদের পার্টিও করে। সভা-সমিতিতে জগন্নাথের সঙ্গে যায়। ওর টুকটাক ফাইফরমায়েশ খেটে দেয়!
বাচ্চুর সেই কথাটা তখন পাত্তা দেয়নি জগন্নাথ। কিন্তু ক্রমশ যেন বুঝতে পারছিল, ওর মনও টাল খাচ্ছে। কোনও কারণ ছাড়াই রতির শ্যামলা মুখটা মনে পড়ছে। হাসির সময় বেরিয়ে পড়া সেই পড়া সেই গজদাঁতটা মনে পড়ছে। খুব সাধারণ দেখতে মেয়েটা হাসলেই কেন যে ওরকম শরৎকালের নদীর পারের মতো সুন্দর হয়ে ওঠে! এই বয়সে এসেও এমন একটা মেয়ে ওকে মনোযোগ দিচ্ছে! তা হলে কি ওর মধ্যেকার খেলা শেষ হয়ে যায়নি এখনও! তা হলে কি এখনও প্রেম হতে পারে ওর! কী ভাবে যেন হারিয়ে যাওয়া এক কিশোর বুকের মধ্যে জেগে উঠেছে জগন্নাথের।
রতি ওর কাছাকাছি থাকার সময়, জগন্নাথের সারাক্ষণ কেমন যেন একটা অস্বস্তি হত। রতির গা থেকে ভেসে আসা সামান্য পাউডারের গন্ধও অবশ করে দিত ওর মাথা। সবার মধ্যে বসেও ও শক্ত হয়ে উঠত। কাঁধের ব্যাগটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে কোলের ওপর রাখতে হত ওকে।
এ ভাবেই চলছিল দিন। কিন্তু তার পর একদিন রাতে একটা কাণ্ড হয়েছিল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে শুয়েছিল জগন্নাথ। শরীরের অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কেবলই রতির মুখটা মনে আসছিল।
ওর দিকে রতির সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মনে আসছিল। গরম লাগছিল জগন্নাথের।
কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল জগন্নাথ। বাচ্চুটা যে কোথায় থাকে! কাজের সময় মাঝে মাঝেই হাওয়া হয়ে যায়! চা খেয়ে আসতে এত সময় লাগে কারও? এদিকে যেখানে যাওয়ার, সেখানে যে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, সেই বিষয়ে হুঁশ নেই!
জগন্নাথ বিড়ি থেকে মন ঘোরানোর জন্য টেবিলে রাখা ব্যাগটা টেনে কাছে নিয়ে, তার মধ্য থেকে ম্যাগাজ়িন বের করল একটা। পুনু বলে একটা ছেলে এসেছিল কয়েক দিন আগে। ওরা ম্যাগাজ়িন বের করে। লিটল ম্যাগাজ়িন। তার একটা কপি দিয়ে গিয়েছে ওকে।
এ সব বুর্জোয়া গল্প, কবিতা পড়ে না জগন্নাথ। কিন্তু পুনুকে কিছু বলে না এই নিয়ে। ছেলেটা করে কী, ওদের ম্যাগাজ়িনের কোনও নতুন সংখ্যা বেরোলেই নিয়ে আসে জগন্নাথের কাছে। মুখে কেমন একটা আনমনা ভাব। উস্কোখুস্কো চুল-দাড়ি নিয়ে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ায় পুনু। কাঁধে একটা ঝোলা। দেখে হাসি পায় জগন্নাথের। এটা হল ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালিদের পোশাক। ভেক না ধরলে ভিখ জোটে না বলেই বোধহয় এরা এরকম পোশাক পরে!
তাও পুনুকে পছন্দ করে জগন্নাথ । সাদাসিধে ছেলে। ধান্দাবাজ নয় ৷ নিজে লেখালিখি করলেও কলকাতায় গিয়ে নামী কবি-সাহিত্যিকদের তেল মেরে লেখা ছাপাতে চায় না। নিজের মতো লেখে, কাগজ করে। তাতে যেটুকু যা হয়, তাই নিয়েই পুনু খুশি থাকে। বলে, “জগন্নাথদা, ‘আমি’-টা আমার কাছে একদম ইমপর্ট্যান্ট নয়। আমরা সবাই নিজের মতো করে যে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করছি সেটাই আসল ।’
জগন্নাথ হাসে। কিছু বলে না। তবে বিনে পয়সায় ম্যাগাজ়িন নেয় না । কিনে নেয়। মোটা পত্রিকা। দাম করেছে কুড়ি টাকা। পুনু লজ্জা লজ্জা মুখে টাকাটা নেয়।
এখন সেই ম্যাগাজিনটা খুলল জগন্নাথ। মনটাকে ঘুরিয়ে না রাখলে আবার বিড়ি খেতে ইচ্ছে করবে।
নির্দিষ্ট কোনও লেখা নয়, এমনিই বইটা খুলল জগন্নাথ। আর দেখল, একটা গল্পের পাতা খুলেছে। নাম ‘বৃষ্টির শব্দ’। ওঃ, এই বৃষ্টি নিয়ে লোকের ন্যাকামোর আর শেষ নেই!
নামের নীচেই একটা ছবি। হাতে আঁকা । সাদা-কালো রেখায় ফুটে উঠেছে একটা মেয়ের মুখ ৷ আচমকা যেন ছ্যাঁকা খেল জগন্নাথ! মেয়েটার মুখটা যেন অবিকল রতির মতো! এটা কী করে সম্ভব!
চোয়াল শক্ত করে ছবিটার দিকে তাকাল জগন্নাথ। আজকাল সব মেয়ের মুখেই কেন যে রতিকে দেখতে পায় ও! এমন কী করে হয়! প্রেমে পড়লে এম- নটাই হয় নাকি!
মনের মধ্যে কেমন একটা উচাটন হল। নিজের ওপরই যেন নিজের আর নিয়ন্ত্রণ নেই। মেয়েটা বড্ড বেঁধে ফেলেছে ওকে। বইটা বন্ধ করে দিল জগন্নাথ। তার পর ঢুকিয়ে রাখল ব্যাগের মধ্যে। শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। ও চোখ বন্ধ করল, আর আবার সেই , দিনের কথাটা মনে পড়ে গেল ওর।
হারু সে দিন বাড়ি ছিল না। যথারীতি ছেলে আর মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর লীলা এসেছিল ওর কাছে। জগন্নাথ ঘরের দরজা খোলা মাত্র লীলা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপর।
তার পরের কুড়ি মিনিট লীলা রীতিমতো যুদ্ধ করেছিল ওর সঙ্গে। সবশেষে লীলার ওপর শুয়ে ওঠাপড়ার মাঝে, মিলনের শীর্ষে পৌঁছোনোর সময় চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল জগন্নাথ । তার পর কেঁপে উঠে স্খলন হওয়ার মুহূর্তে যেন মনে মনে দেখেছিল ওর বুকের নীচে লীলা নয়, শুয়ে আছে রতি! আর সেই পাউডারের গন্ধটা আচমকা ভেসে উঠেছিল স্মৃতিতে!
মনের মধ্যে কেমন যে করছিল জগন্নাথের! সেই শিহরনের সঙ্গে সঙ্গে বালিশে মুখ গুঁজে ও সামলানোর চেষ্টা করছিল নিজেকে। আশ্লেষে মুখ দিয়ে রতি নামটা বেরিয়ে আসতে চাইছিল বারবার । আর সেটাকে আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল।
লীলা কিছুক্ষণ পরে আবার ওকে ধরে নানা ভাবে চেষ্টা করছিল। কিন্তু কিছুতেই উত্তেজিত হচ্ছিল না জগন্নাথ। বরং কেবলই যেন দেখতে পাচ্ছিল, ওর দিকে চোখ তুলে কেমন একটা মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে রতি!
বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পরে হাল ছেড়ে দিয়েছিল লীলা ।
মুখ তুলে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “কী হল তোমার? এমন ম্যাদা মেরে আছ কেন? আর পারবে না? তোমার দাদা চলে আসবে কাল। তার পর তো আর মাসখানেক হবে না। এমন করছ কেন?”
জগন্নাথের বিরক্ত লাগছিল লীলাকে । এই যে সামনে নগ্ন হয়ে বসে রয়েছে! বয়সের থাবা বসানো মুখের রেখা। পেটে চর্বি। শিথিল স্তন। সব দেখে কেমন যেন খারাপ লাগছিল বুঝতে পারছিল এটা জগন্নাথের। অন্যায় হচ্ছে। যে-মহিলার সঙ্গে এত বছর ধরে সহবাস করেছে, তার প্রতি এমন বিতৃষ্ণা আসাটা উচিত নয়। কিন্তু আবার এ-ও মনে হচ্ছিল, ওদের এই সম্পর্কটাই তো অবৈধ! এটা তো সারা জীবন চলতে পারে না! বাচ্চুর মুখটা মনে পড়ছিল ওর। মনে পড়ছিল বাচ্চুর কথাগুলো, “নিজেরটা দেখো!” সত্যি, ওর কী হবে? ওকে যদি এই বয়সেও কোনও যুবতী ভালবাসতে পারে সেটা কি সামান্য কথা? লীলার সঙ্গে তো মূলত ওর শরীরের সম্পর্ক! লীলার প্রতি তো ও কোনও দিন তীব্র ভাবে মানসিক আকর্ষণ টের পায়নি! তা হলে? আচ্ছা, রতির প্রতি কি ওর সত্যি সত্যি , মানসিক টান তৈরি হয়েছে? রতির মুখটা আবার মনে পড়েছিল জগন্নাথের। আর সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল ও। নিজেরই অবাক লেগেছিল। লীলা এত চেষ্টা করেও যা পারল না, সেটা কী করে এমন নিমেষে হয়ে গেল শুধুমাত্র একটা মেয়ের মুখ মনে পড়ায়!
লীলা ওই আবছা ঘরে নগ্ন হয়ে বসে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে তোমার?”
জগন্নাথ কোলবালিশে নিজেকে আড়াল করে দুর্বল গলায় বলেছিল, “আজ এত পরিশ্রম গিয়েছে যে, খুব ক্লান্ত লাগছে । ঘুম পাচ্ছে।”
লীলা সন্দেহ নিয়ে দেখছিল ওকে। তার পর বলেছিল, “আমায় গাধা ভাবো? ক’দিন ধরেই দেখছি, শরীরে এখানে আছ, কিন্তু মনটা নেই? কোথায় তোমার মন? কার কাছে? কী হয়েছে তোমার? সত্যি করে বলো আমায়।”
বিরক্ত হয়ে লীলাকে ঠেলে সরিয়ে লুঙ্গি পরে নিয়েছিল জগন্নাথ। তার পর বলেছিল, “আমার ঘুম পাচ্ছে! তুমি এখন এসো।
লীলা চোয়াল শক্ত করে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ওর দিকে। চোখে কী যে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ছিল! এর পর আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হাতে পোশাক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল লীলা ।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে শুয়েছিল জগন্নাথ। শরীরে অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কেবলই রতির মুখটা মনে আসছিল। ওর দিকে রতির সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মনে আসছিল। গরম লাগছিল জগন্নাথের । গলা শুকিয়ে আসছিল । শরীরে জমে থাকা বিষ ওকে ঘুমোতে দিচ্ছিল না। শ্বাস ঘন হয়ে আসছিল দ্রুত। ও বুঝতে পারছিল, এই বিষ মোচন না করলে ওর নিস্তার নেই। আর না থাকতে পেরে কোমরের কষি আলগা করে খুলে ফেলেছিল লুঙ্গি । তার পর ডুব দিয়েছিল কল্পনায়।
পরের দিন সকালে উঠে তীব্র এক পাপবোধ ঘিরে ধরেছিল জগন্নাথকে । মনে হয়েছিল এটা কী করছে ও! লীলার দুই সন্তানকে দেখছিল দূর থেকে। বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। হাসছে।
কথা বলছে। কলেজে, স্কুলে যাচ্ছে। মনে হয়েছিল পৃথিবী যাই জানুক, আসলে এরা কারা সেটা তো ও জানে সবচেয়ে বেশি ।
আর রতির কত অল্প বয়স! সারা জীবন পড়ে আছে ওর। এমন একটা মেয়ের পেছনে, এমন করে পাগল হওয়ার বয়স কি আর আছে জগন্নাথের! নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছিল ওর। মনে হচ্ছিল এর পর যদি রতি কিছু আনে, ও খাবে না কিছুতেই। বরং বুঝিয়ে দেবে ওদের মধ্যে একটা পাঁচিল থাকা জরুরি।
এর সপ্তাহ দুয়েক পরে একদিন পার্টি অফিসে একাই বসেছিল জগন্নাথ । বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল সে দিন। বাচ্চু ছিল ওর সঙ্গে। পার্টির নানান বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে একটা ছেলে এসে খবর দিয়েছিল যে, বাচ্চুর ছেলেটার নাকি জ্বর এসেছে। তাই আলোচনা বন্ধ রেখে বাচ্চু চলে গিয়েছিল তাড়াতাড়ি।
ক’দিন পরেই পার্টির একটা মিটিং ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনায়। জগন্নাথকে সেখানে গিয়ে বক্তৃতা দিতে হবে। তাই সেই নির্জনতার সুযোগ নিয়ে একা একা বসে বক্তৃতার একটা খসড়া তৈরি করছিল ও। আশপাশে কেউ নেই বলে কাজ করতে সুবিধে হচ্ছিল। মন দিতে পারছিল।
আচমকা দরজার কাছে কিসের একটা শব্দ হয়েছিল। লেখা থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছিল জগন্নাথ। আর সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠেছিল ওর শরীর।
জগন্নাথ দেখেছিল, দরজার কাছে ভেজা লাল ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে রতি। রতির দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না জগন্নাথ। ছোট্ট ছাতা রতিকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রাখতে তো পারেইনি, বরং এমন করে ভিজিয়ে দিয়েছে যে, সেটা আরও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রতির মুখে, ভুরুতে, ঘাড়ের কাছে ভেঙে পড়া চুলে অভ্রর কুঁচির মতো চিকচিক করছিল বৃষ্টির ছাঁট ।
“তুমি?” জগন্নাথের গলা গলা কেঁপে উঠেছিল ।
রতি কিছু না বলে ঘরে ঢুকে ছাতাটা বন্ধ করে একটা প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছিল । তার পর জগন্নাথকে অবাক করে দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল দরজাটা।
জগন্নাথ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছিল শুধু। হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল পেন!
রতি কোনও কথা না বলে এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে। তার পর একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বসে থাকা জগন্নাথের মুখের কাছে রতির দুটো বুক, মেঘ ভেদ করে ভেসে ওঠা চূড়ার মতো ভেজা শাড়ির মধ্য থেকে জেগে ছিল ।
রতি জিজ্ঞেস করছিল, “আপনি আজকাল আমায় এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন জগন্নাথদা?”
জগন্নাথ কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা করছিল ওর। মনে হচ্ছিল একটা প্রাগৈতিহাসিক ফড়িং ফড়ফড় করছে পাঁজরের মধ্যে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। রক্তের ভেতরে ঝড়ের মধ্যে পড়া জাহাজ নাচছিল প্রবল ভাবে। ও সেই কালান্তক পাউডারের গন্ধটা পাচ্ছিল!
রতি আচমকা আরও সরে এসেছিল ওর দিকে। তার পর ওর পাঁচ-ছ’দিনের না কামানো কাঁচা-পাকা দাড়ি ফুটে থাকা থুতনি ধরে মুখটা তুলেছিল নিজের দিকে। চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হল, বলুন?”
জগন্নাথ মাটির কয়েক হাজার ফুট ভেতর থেকে নিজের গলার স্বর খুঁড়ে বের করে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কী পাউডার লাগাও?”
রতি থমকে গিয়েছিল এক মুহূর্ত। তার পর দ্রুত হাতে শাড়ির আঁচল ফেলে দিয়ে ব্লাউজ়ের হুক খুলে দিয়েছিল। এক মুহূর্ত থেমে তাকিয়েছিল জগন্নাথের দিকে। দেখেছিল, জগন্নাথ অপলক তাকিয়ে রয়েছে ওর বৃত্ত দু’টির দিকে ।
রতি আচমকা জগন্নাথের মুখটাকে টেনে নিয়ে ডুবিয়ে নিয়েছিল বুকের মধ্যে। তার পর ঘন শ্বাসের ওঠাপড়ার সঙ্গে আবছা গলায় বলেছিল, “তুমি বলো দেখি কী পাউডার!”
তার পর বৃষ্টি আর বৃষ্টি! ঘরে, বাইরে ও সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এক মহাপ্রলয়! লেখার সেই পাতা, পেন, ব্যাগ কোথায় যে ছিটকে গিয়েছিল গ্রহ নক্ষত্রের তীব্র আকর্ষণে, তা আর মনে ছিল না জগন্নাথের।
অনেকক্ষণ পরে জগন্নাথের যেন হুঁশ এসেছিল। দেখেছিল, বড় টেবিলের ওপর শুয়ে রয়েছে ও। আর ওর ওপর নিজেকে বিছিয়ে রেখেছে রতি।
জগন্নাথ রতিকে সরিয়ে উঠে বসেছিল। জামাকাপড় পরতে পরতে বলেছিল, “এটা ঠিক হল না রতি।”
রতি বলেছিল, “সব ঠিক হয়েছে! বেশ হয়েছে! আরও হবে!” বলেছিল, “আমি চাই বারবার এমন হোক!”
সেই দিন আর আজকের দিন। এর আরও মধ্যে রতির সঙ্গে জগন্নাথের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। শরীরের দেওয়াল টপকে এখন মন খুঁজে পেয়েছে শান্তি। রতিকে শুধু জড়িয়ে ধরে থাকলেও জগন্নাথের ভাল লাগে। ওর গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকতে ইচ্ছে করে সারাক্ষণ। রতি কাছে না থাকলে কেমন একটা শূন্য হলঘর যেন বুকের মধ্যে থমথম করে! বাতাসে কমে আসে অক্সিজেন! রাতে ঘুমের মধ্যে রতিকে দেখতে পায় যেন! জীবনের এই জায়গায় এসে এ ভাবে যে কারও সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে, সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি জগন্নাথ । রতি বলেছে জগন্নাথকে ভালবাসে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, জগন্নাথকে ওকেই বিয়ে করতে হবে ।
শুধু ওকে কাছে রাখলেই হবে। কিন্তু জগন্নাথ বিয়ে করতে চায় রতিকে। এমন লুকোচুরি আর ভাল লাগে না। লীলাকে আর ও আসতে দেয় না ওর ঘরে। নানান অজুহাতে দূরে রাখে। লীলা রাগ করে। খিটখিট করে। এম- নকি, কান্নাকাটিও করে। মাঝে মাঝে ভয় দেখায় বিছানায় অন্য ছেলেকে তুলবে বলে ।
কিন্তু তাতে জগন্নাথের আর কিচ্ছু আসে-যায় না। যা খুশি করুক লীলা। মন ঘুরে গিয়েছে মানে, মন ঘুরেই গিয়েছে। আর লীলাকে সহ্য হচ্ছে না ওর। জীবন জীবন ওকে একটা সুযোগ দিয়েছে। কেন নেবে না সেটা? ও জানে লীলা দু’দিন এ সব করবে, তার পর নিজেই চুপ করে যাবে। লীলা তো আর হারুকে বলতে যাবে না যে, কী সব চলেছে এত বছর ধরে!
তবে জগন্নাথ এটাও বুঝতে পারছে যে, এই মুড়াপোঁতার পাট ওকে ওঠাতে হবে। ওর ইচ্ছে আছে মুড়াপোঁতার পাশের গ্রাম, মানে মুক্তদহে গিয়ে বাড়ি ভাড়া নেবে। কারণ, এখানে থাকলে লীলা ওকে শান্তিতে থাকতে দেবে না ।
লীলা মুক্তদহর মেয়ে। ওখানেই ওর বাপের বাড়ি। চেনা লোকজনও আছে চারিদিকে। এমনকি, লীলার বোন শিউলির বিয়েও ওখানেই হয়েছে। এত চেনাশোনার মধ্যে লীলা ওখানে বেগড়বাই করতে পারবে না। সবটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে ওর।
রতিকে এত সব খুলে বলেনি জগন্নাথ। শুধু বলেছে, “এখানে থাকলে তোমায় বিয়ে করায় আমার অসুবিধে আছে। তুমি আমার সঙ্গে মুক্তদহে থাকতে পারবে? একটা না-হয় স্কুটি কিনে নিয়ো। পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে তো স্কুল! সুবিধে হবে।”
রতি একবারও ওকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেনি, কেন এখানে থেকে ওর রতিকে বিয়ে করার ব্যাপারে অসুবিধে আছে! বরং ওর সঙ্গে ঘন হয়ে বলেছিল, “ঠিক আছে। শুধু একটা কথা।”
“কী?” জিজ্ঞেস করেছিল জগন্নাথ ।
রতি ওর বুকের কাঁচাপাকা লোমে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে বলেছিল, “বিড়িটা আর খেয়ো না ।”
বাচ্চুকে ঘরে ঢুকতে দেখে জগন্নাথ বলল, “বাচ্চু চল, অনেক দেরি হয়ে গেল ।”
বাচ্চু অনিচ্ছের সঙ্গে তাকাল ওর দিকে ।
পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করেও আবার ঢুকিয়ে রাখল জগন্নাথ।
খুব ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু মনকে শক্ত আগে দিনে চল্লিশ- করতে হবে। আগে পঞ্চাশটা বিড়ি খেত ও। সেটা এই মাস খানেকে কমিয়ে এনেছে কুড়িটায়। । আরও কমাতে হবে। এখনই একবারে ছাড়তে পারবে না। কিন্তু আস্তে আস্তে ছেড়ে দেবে। নিজের সঙ্গে এই যে যুদ্ধ চলছে ওর, সেটাতে ওকে জিততেই হবে।
মুড়াপোঁতার পশ্চিম দিকে একটা নদী আছে। মণি নদী। তার পাশে বিহারির বাড়ি। বিহারি ওদের দলের লোক। কিন্তু শুনছে, বিরোধী দলের লোকদের সঙ্গে খুব মেলামেশা করছে আজকাল । সেখানে নাকি যোগও দেবে। এত বাড় যে ভাল নয় সেটা বোঝাতে হবে বিহারিকে। কয়েক মাস পরে পঞ্চায়েত ভোট। বিহারির একটা ভাল ‘পুল’ আছে। ওকে যে বিরোধীরা ভাঙানোর চেষ্টা করবে, সেটা তো স্বাভাবিক।
জগন্নাথ ভাবল বিহারির সঙ্গে বোঝাপড়ার ব্যাপারটা ওর মনে একটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে। আজকে কথা বলে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিলে ওর মাথার ওপর থেকে একটা ভার নামবে। তার পর কাল একবার শান্তিপুর ঘুরে আসবে। লতাদি আগের সপ্তাহেই বলেছিল যেতে, কিন্তু সময় করতে পারেনি।
লতা মানে লতা মুখুটি। লতাকে জগন্নাথ দিদি বললেও আসলে ওরা প্রায় সমবয়সি। লতাদির স্বামী বরুণদার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল জগন্নাথের। পার্টিরই লোক বরুণকুমার মুখুটি। কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে একটা ভোটের আগে লোকটা খুন হয়ে যায়। এই সব অঞ্চলে রাজনীতি খুবই হিংসাত্মক রূপ নেয় ভোটের আগে। কিন্তু কিছু করার নেই। এমনটাই হয়ে এসেছে বছরের পর বছর ধরে। আর সত্যি বলতে কী, জগন্নাথও তো এরকম রাজনীতিরই অংশ। কালার কথা কি ও ভুলে গিয়েছে!
লতাদি একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। শান্তিপুর শহরের ওপরেই একটা ভাড়াবাড়িতে মা আর ছেলে থাকে। লতাদি খুবই ভাল মানুষ। দারুণ রান্না করে। গেলেই নিমেষে কিছু না- কিছু তৈরি করে ওকে খাওয়ায় ।
লতাদির ছেলে ঝিরির সঙ্গে জগন্নাথের খুব গল্প হয়। ছেলেটা চুপচাপ, কিন্তু বুদ্ধিমান। প্রায় সারাক্ষণ পড়াশোনা করে। নানান দেশের খবরাখবর রাখে। কথা বলে আরাম হয় ৷ জগন্নাথ নিজের মতো করে ঝিরিকে জীবনের অনেক কথা বলে । ঠিক ভুল, ভালমন্দের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে ।
জগন্নাথ ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ভাবল পুনুর এই ম্যাগাজিনটা কাল ঝিরিকে দিয়ে আসবে। ও নিজে এই বয়সে এ সব বুর্জোয়া সাহিত্য বর্জন করেছে বটে, কিন্তু ঝিরির যা বয়স তাতে এখন ওর মন খোলা রেখে জীবনের সব দিকটাই নেড়েচেড়ে দেখা উচিত।
পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল জগন্নাথ। রাস্তায় এখন বেশ অন্ধকার। লোডশেডিং হয়ে আছে চারিদিকে। এখানে এ সব রোজকার ব্যাপার। তার মধ্যে এবার শীতটাও পড়েছে জব্বর।
সারা দিন খুব যে ঠান্ডা থাকে তা নয়। কিন্তু শেষ বিকেল থেকেই ঝুপ করে ঠান্ডা পড়ে যায়। মাটি থেকে কিছুটা ছেড়ে একটা কুয়াশার আস্তরণ কে যেন সাদা চাদরের মতো টাঙিয়ে দিয়ে যায় মাঠে মাঠে। গাছপালাদের গোড়া আর মুড়োটাই দেখা যায় শুধু ।
অন্ধকার যত ঘনায়, শীত যেন তত আঁকড়ে ধরে মুড়াপোঁতাকে। আজও তার অন্যথা হয়নি।
বাচ্চুর সাইকেলটা জগন্নাথই চালায়। পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে পাশের বারান্দা থেকে সাইকেলটা নিল জগন্নাথ ।
বাচ্চু বলল, “তুমি যাও জগন্নাথদা । আমার শরীরটা আজ ভাল নেই! আমি আর যাব না! ছেলেটাও ঘ্যানঘ্যান করছিল। জানোই তো ওর মা থেকেও নেই!”
“ইয়ার্কি হচ্ছে? হচ্ছে? খালি ছেলের বাহানা দেওয়া, না!” জগন্নাথ বিরক্ত হল, “বিহারির বন্ধু তুই। আমি নেতা হলেও এ সব কথাবার্তা বলার ব্যাপারে পার্সোনাল টাচটা থাকা দরকার। জানবি আন্দোলন, দল এ সব মানুষ আর মানবিকতা বাদ দিয়ে হয় না। শরীর কতবার তোদের বলব? খারাপের ঢপবাজি, ছেলের ঘ্যানঘ্যানানি অনেক দিয়েছিস! কাল বড়দিন। ছুটি আছে। বাড়িতে শুয়ে রেস্ট নিবি। আমি কি জানি না যে, তুই এখন গিয়ে হয় বাংলার ঠেকে বসবি, নয়তো ন্যাপার সাট্টার ঠেকে মাথা দিবি। সংযম বলে কি কিচ্ছু নেই তোর! ওঠ ক্যারিয়ারে! যাব না! মামার বাড়ির আবদার!”
বাচ্চু অনিচ্ছার সঙ্গে সাইকেলের পেছনে উঠল ।
সাইকেলে বসে জগন্নাথ প্যাডেল ঘুরিয়ে বলল, “হ্যাঁরে, গত সপ্তাহে তুই আমাদের বাড়ি গিয়েছিলিস কেন রে? দাদার ঘরে দেখলাম তোকে!”
বাচ্চু সময় নিল একটু। তার পর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “ওই আমার মামাতো ভাইয়ের কাজের জন্য আর কী!”
জগন্নাথ সাইকেল চালাতে চালাতে বলল, “দাদার মিলে কাজ করিস নিজে। ভাইকেও ঢোকাবি? হারু ঘোষ আমার দাদা হলেও জানবি একটা আস্ত পিশাচ। জানিস না কী ভাবে টাকা মারে কর্মচারীদের? কী ভাবে ওভারটাইম না দিয়ে খাটায়?”
বাচ্চু এর উত্তরে কিছু না বলে কথা ঘুরিয়ে আবার বলল, “আমায় নামিয়ে দাও জগন্নাথদা। আমার সত্যি ভাল লাগছে না শরীর। পেটের মধ্যে উস্তুম কুস্তুম করছে। বমি হবে মনে হচ্ছে!”
সামনের রাস্তাটা মাটির। দু’দিকে খেত। কিন্তু ধান কাটা হয়ে যাওয়ায় এখন ফাঁকা। আকাশে কুয়াশা আছে অল্প। তার মধ্য দিয়েও তারা দেখা যাচ্ছে। চারিদিক অন্ধকার হলেও আকাশ থেকে অদ্ভুত একটা আলোর ভাপ এসে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। তাতেই অস্পষ্ট ভাবে এই মাঠ, গাছপালা, ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে। আসলে এখন চোখ সয়ে গিয়েছে জগন্নাথের। চারিদিক একদম ফাঁকা বলেই ঠান্ডাটা বেশ জমাট এখানে । যেন পুরনো শীতল পাথর কেউ ছুঁইয়ে রেখেছে গায়ে! রাস্তায় লোকজনও নেই। জগন্নাথ সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিল । তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে হবে।
বাচ্চু আবার বলল, “আমার মনে হয় জ্বর আসবে।
“ননীর পুতুল আমার! জ্বর আসবে!
আবহাওয়ার খবর পড়িস নাকি আজকাল? এই নিয়ে পলিটিক্স করবে! বিপ্লব করে সমাজ পাল্টাবে! চুপ করে বসে থাক। জানিস না আমাদের এখানকার কী হাল! সুন্দর দল পাল্টে ওই দিকে চলে গিয়েছে। ও ছিল শক্ত খুটি। তা ছাড়া ওদের ওই মাধো, শমীক, , সেতু কী ভাবে ক্যাম্পেন করছে! কলকাতা থেকে বীরেন্দ্র নামে একটা লোকটা তো আছেই। ওই মালটা টাকা ঢালছে কাঁড়িকাঁড়ি। জানিস না, ওর সঙ্গে আমার একবার ঝামেলাও হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে বিহারিকে আমাদের ধরে রাখতেই হবে। ওর হাতে অনেক ভোট। আর, তার সঙ্গে ওর মাসল পাওয়ারটাও আমাদের জন্য জরুরি।’
জগন্নাথ মুখে আদর্শের কথা বললেও জানে, ও সব মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আর প্রবন্ধ লেখার জন্য ঠিক আছে। মাঠে নেমে লড়াই করতে হলে মাসল পাওয়ারটাই পাওয়ারটাই এখানে আসল। জগন্নাথ জানে, কী গ্রাম কী শহর, সাধারণ মানুষ অত তত্ত্ব-ফত্ত্ব বোঝে না। তারা দিনের শেষে হাতে কী পেল সেটাই বোঝে। আর বোঝে কে বেশি শক্তিশালী। যার শক্তি বেশি, তার কাছেই লোকে ভিড় করে। বছর দেড়েক আগে বিরোধীদের একটা ছেলে, কালাচাঁদ, খুব চেগে উঠেছিল। লোকজন আস্তে আস্তে ঘুরে যাচ্ছিল ওর দিকে। কলকাতা থেকে এখানে এসে জগন্নাথের তৈরি করা গাছের ফল নিজে তুলতে চাইছিল । জগন্নাথ বুঝতে পেরেছিল, ওর সাজানো খেতে এই কালাচাঁদ একটা পরগাছা। একে সমূলে তুলে ফেলতে হবে, না হলে ওর খেতের বারোটা বেজে যাবে।
তাই ব্যাপারটা নিয়ে বিহারির সঙ্গে পরামর্শ করেছিল ও। তার পর এমনই এক শীতের রাতে বিহারি ধরেছিল কালাকে। অপ্রস্তুত কালা কিছু বোঝার আগেই কাস্তে দিয়ে গলাটা টেনে নামিয়ে দিয়েছিল নিমেষে। বড় রাস্তার এক দিকে কালার ধড়টা ফেলে রেখে, অন্য দিকের একটা বাবলা গাছে বিহারি ঝুলিয়ে দিয়েছিল কালার মুন্ডুটা! আসলে শুধু খুন নয়, খুনের পদ্ধতি ও প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই বিরোধীদের বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, কী হবে ওদের বিরোধীতা করলে! জীবনের সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন জরুরি। সেই রাতেই কাজ সেরে বিহারি এসে খবর দিয়েছিল জগন্নাথকে । বলেছিল, “জগাদা, শেষ করে দিয়েছি।”
জগন্নাথ বলেছিল, “ক’দিন বাইরে চলে যা। ঠান্ডা হলে আমি ডেকে নেব। মাস চারেক লেগেছিল ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে। তার পর বিহারি আবার ফিরে এসেছে।
জগন্নাথ সাইকেলে প্যাডেল করতে করতে ভাবল, এবার বিরোধীরা বিহারিকেই ভাঙিয়ে নিতে চাইছে। বিহারিকে নিজেদের কাছে রাখতে হলে পার্টির লোকাল কমিটিতে কিছু একটা পদ দিতে হবে আর তার সঙ্গে সরকারি কাজের কনট্রাক্টও পাইয়ে দিতে হবে ওকে। এ সব ছুটকো গুন্ডাদের একটু সম্মান দিলেই এরা চেগে যায়! তার পর এই বিহারিকে দিয়ে এই মাধো, শমীক আর সেতুকে সরাতে হবে।
জগন্নাথ বলল, “বাচ্চু…”
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই পাশের ঝোপ থেকে একটা তীব্র টর্চের আলো এসে চোখে ধাক্কা মারল জগন্নাথের।
চোখ কুঁচকে কোনও মতে সাইকেলটা ব্রেক কষল জগন্নাথ। বুঝল, পেছন থেকে বাচ্চুও নেমে দাঁড়িয়েছে মাটিতে।
জগন্নাথ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোন শুয়োরের বাচ্চা রে?”
ঝোপের ভেতর থেকে উত্তর এল, “তোর বাপ, শুয়োরের বাচ্চা!”
তার পর জগন্নাথ কিছু বোঝার আগেই ঝোপ থেকে তিনটে মানুষ বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। টর্চের আলোয় সব কিছু কেমন কালো আর ভূতুড়ে লাগছে। তাও একটা লম্বা ছেলেকে দেখে চিনতে পারল জগন্নাথ। সেতু। পাশে মোটা বেঁটে ছেলেটা মাধো। আর অন্য একজ- নকে ঠিক চিনতে পারল না!
জগন্নাথ সাইকেলে বসে মাটিতে এক পা রেখে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী চাস? এ ভাবে রাস্তা و আটকালি কেন?”
সেতু কিছু না বলে আচমকা ডান হাতটা তুলল । আর জগন্নাথ দেখল, ওর হাতে একটা পিস্তল ।
“কী করছিস? কী করছিস এটা?” জগন্নাথ চেঁচিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে গিয়েছে ওর! সেতু এটা কী করছে!
“কালাদাকে তুই যা করেছিলিস,” সেতুর গলা কাঁপছে ।
জগন্নাথ বুঝল এদের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। মাথায় খুন চেপেছে এদের! কোনও যুক্তিতর্ক কাজ করবে না এখন!
ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। তার পর সাইকেলের ব্রেকটা ছেড়ে জোরে প্যাডেল করে ছেলেগুলোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে গেল। কিন্তু পারল না ৷ পিছনে কী যেন আটকে আছে।
নিমেষে পিছনে ঘুরল জগন্নাথ। আর অবাক হয়ে দেখল, বাচ্চু সাইকেলের ক্যারিয়ারটা টেনে ধরে রেখেছে দু’হাত দিয়ে! ও এগোতে দিচ্ছে না জগন্নাথকে ।
“বাচ্চু, তুই! প্রথমে সুন্দর, তার পর তুই… তোরা সবাই…” বিহ্বল হয়ে বাচ্চুর দিকে তাকাল জগন্নাথ ।
বাচ্চু কাঁপা গলায় বলল, “ক্ষমা করে দাও জগন্নাথদা । কিন্তু উপায় নেই!”
ভয়ে এবার সামনের দিকে তাকাল জগন্নাথ। দেখল, লক্ষ্য নিশ্চিত করতে সেতু আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। পিস্তলটা কাঁপছে সেতুর হাতে।
জগন্নাথ বলল, “আমায় মারিস না! প্লিজ়, মারিস না আমায়! আমি সব ছেড়ে দিচ্ছি! সব ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে। বিশ্বাস কর, রাজনীতিতে আমি আর থাকব না । মারিস না না আমায়… পায়ে পায়ে পড়ছি তোদের…
সেতু চোয়াল শক্ত করে বলল, “কালাদাকে গিয়ে ‘প্লিজ়’-টা বলিস শুয়োরের বাচ্চা! আজ তোকে…”
জগন্নাথ বুঝল আর কথা বলে লাভ নেই! এ ভাবেই তবে সব শেষ হল! ও বড় করে শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করল এবার। হাল্কা একটা পাউডারের গন্ধ পেল যেন! আর দেখল, একটা মেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ছোট্ট ঠোঁটের ফাঁকে গজদাঁতের হাসিটা কেন যে এত সুন্দর, কে জানে!
