১৮. কবি
“টল ডার্ক হ্যান্ডসামের কনসেপ্টটা কোথা থেকে এসেছে বল তো?” লালু হাতের ঠোঙা থেকে চারটে ছোলা মুখে ফেলে জিজ্ঞেস করল।
কবি কোনও উত্তর দিল না। লালুর সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনও মানে হয় না। ও অনেক কিছু বলে।
কবি পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখল। সাড়ে সাতটা বাজে। রাস্তায় এখনও অফিস ফেরতা মানুষের ভিড় ঘন হয়ে আছে। মার্চ মাসের শুরু সবে। এ বছর আবহাওয়াটা একটু অদ্ভুত। এই গরম পড়ছে দু’-এক দিন তো তার পরই আবার কেমন যেন একটা পাতলা ঠান্ডা জড়িয়ে যাচ্ছে শহরের গায়ে। ক’দিন আগেও যেমন একটু গরম ছিল, কিন্তু আজ আবার হালকা ঠান্ডা। ভালই লাগছে কবির।
ওর ঘরটা দোতলায়। বেশ বুঝতে পারছে সামনে, গরমকালে বেশ গরম লাগবে ওই ঘরে। কিন্তু ঘরে এসি লাগানো আছে। দরকারে চালাতেই পারে। কিন্তু এসি না-থাকলেও অবশ্য ওর খুব একটা সমস্যা হত না। ওদের মুক্তদহের বাড়িতে একটা সময়ের পরে আর ফ্যান ছিল না। এমনকি, সার্কাসে যখন কাজ করত, তখন একটা টিনের ঘরে শুতে হত ওকে। কী যে তেতে থাকত ঘরটা! মনে হত সারা গায়ে রসগোল্লার রস মেখে শুয়ে আছে যেন। একটা পেডাস্টাল ফ্যান চলত বটে। কিন্তু তার হাওয়ায় ডিম সেদ্ধ হয়ে যাবে সহজেই। সেই তুলনায় এখানে স্বর্গে আছে ও। কিন্তু স্বর্গে থাকার মূল্য যে কী সাংঘাতিক, সেটা বুঝতে পারছে। কেন মা এখানে পাঠা ওকে! কিসের যোগাযোগ মায়ের সঙ্গে এখানকার! মা যদি ওকে এখানে না পাঠাত, তা হলে তো এমন একটা অবস্থায় পড়তে হত না।
“কী রে, বললি না?” লালু আলতো করে ঠেলল ওকে। কবি সামান্য বিরক্ত হয়ে তাকাল, “কী বলব?”
“ওই যে টল ডার্ক হ্যান্ডসাম! কনসেপ্ট! কোথা থেকে এসেছে বল তো?” লালু আবার কয়েকটা ছোলা মুখে দিল।
কবি সামান্য সময় নিয়ে বলল, “তোর থেকে।”
“শুরু, এ তো হিটিং বিলো দ্য বেল্ট হয়ে গেল! আমি টলও না, হ্যান্ডসামও না। শুধু ডার্ক! আর তুইও তেমন নোস। তুই টল আর হ্যান্ডসাম, কিন্তু ডার্ক না। পড়েছি মহাভারতের নকুলকে নাকি হেব্বি দেখতে ছিল। আর নকুল ছিল টল, প্রকৃত ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম। সেই নিয়ে চাপা অহঙ্কারই নাকি ওর পতনের অন্যতম কারণ! আচ্ছা, ডার্ক বলতে কতটা ডার্ক বল তো?” লালু আগ্রহ নিয়ে তাকাল ওর দিকে।
কবি বলল, “আমি এ সব জানি না। এর শেড কার্ড হয় নাকি?”
“তুই বেঁচে আছিস কেন রে?” লালু বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোর সঙ্গে কথা বলা আর গোবি মরুভূমিতে জল খোঁজা একই কেস! আচ্ছা, তোর প্রবলেমটা কী! ক্ষুধামান্দ্য? পেট ফাঁপা? হাইড্রোসিল? শীঘ্রপতন? নাকি লিঙ্গ ছোট ও বাঁকা?”
“বাজে কথায় পিএইচ ডি করেছিস?” কবি বিরক্ত হল।
“মানে, লিঙ্গ ঠিক আছে বলছিস। তা হলে প্রবলেমটা কী? সারাক্ষণ বাংলার পাঁচের মতো মুখ। মাঝে মাঝে পৃথিবী থেকে চাঁদ অবধি লম্বা দীর্ঘশ্বাস। জিনি এত লাইন দিচ্ছে, তাও তোর কাউন্টার অবধি পৌঁছতে পারছে না। কেন রে?” লালু ভুরু নাচাল।
কবি উত্তর না দিয়ে এবার দোকানের দিকে এগোল। এ সব শুনতে ভাল লাগে না ওর।
দোকানটা বেশ বড়। আলো ঝলমল করছে। বালিশ, তোশক, গদিতে ঠাসা। আর যেন একটা তোয়ালে রাখারও জায়গা নেই।
কবি জিজ্ঞেস করল, “দাদা, আর কতক্ষণ? বললেন আধঘণ্টা। দেড় হতে চলল!”
দোকানদার ভদ্রলোক বয়স্ক। ডিমের মতো মাথা। মাথার পেছনের দিকে একটু চুল। বড় বড় চোখ। মুখে সারাক্ষণ একটা হেঁ হেঁ ভাব লেগে রয়েছে!
লোকটি হেসে বলল, “ভেরি সরি স্যর। আসলে ফোমটা আবার তৈরি করে, কাটিং করতে হল তো, তাই। ম্যাডামের লোক আপনারা, যেমনতেমন তো আর দিতে পারি না আপনাদের! আমার ঘাড়ে ক’টা মাথা বলুন!”
পাশ থেকে লালু এসে দাঁড়াল। বলল, “একটাই। তাতে আবার চুল নেই! আপনি সময় নিন। চাপ নেই। আমরা আছি।”
লোকটা মাথায় হাত বুলিয়ে হেঁ হেঁ করল আবার। বলল, “সার, আসলে ছোটবেলায় এমন পেটের রোগ হল যে, সব চুল উঠে গেল! আমি তাড়াতাড়ি দেখছি। আর-একটু সময় স্যর… প্লিজ।”
আরও সময়! কবি চোয়াল শক্ত করল।
লালু ওর হাত ধরে আবার দোকানের সামনে থেকে রাস্তার ধারে নিয়ে এল। বলল, “এত সার সার শুনলে রাতে আমার ঘুম হবে না। যাক গে, তোকে কী জিজ্ঞেস করলাম, বললি না তো!”
কবি পাল্টা বলল, “আমার কথা জেনে কী হবে? টল ডার্ক হ্যান্ডসাম ব্যাপারটা কী হল? এত সাবজেক্ট পাল্টাস কেন?”
“আর বলিস না!” লালু আচমকা গলাটা নিচু করল। তার পর বলল, -ম্যাডামের কাল একজনকে লাগবে। টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম। নিউটাউনে নিয়ে যেতে হবে। পাখিদা সব ছবি পাঠিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে কে যে টল ডার্ক হ্যান্ডসাম বুঝতে পারছি না। সবাই এমন মেক আপ করে ছবি দিয়েছে! তুই দেখ তো।”
পাখিদা নামটা চেনে কবি। লালুর মুখে এর আগেও শুনেছে। লোকটা দালাল। লালু এর থেকেই ম্যাডামের জন্য জিগোলো নিয়ে আসে। লোকটা কলেজ স্ট্রিটের কাছে থাকে। এইটুকু শুধু জানে। আর কিছু জানে না। আর জানতেও চায় না। লোকটা নাকি টেন টু ফিফটিন পার্সেন্ট কাট নেয়। সেখান থেকে টু পার্সেন্ট দেয় লালুকে। লালুর কাছে এটা একটা বিজনেস!
লালু কাঁধের ঝোলা থেকে একটা পাতলা মতো ট্যাব বের করল। এটা ম্যাডাম ওকে দিয়েছে। জিনিসটা খুব একটা বড় নয়। ছোট পেপারব্যাক বইয়ের আকারের। লালু সেটা অন করল। নানা ছবি আর শব্দ ফুটিয়ে ট্যাবটা খুলল। লালু একটা পিডিএফ ফাইল খুলে সেটাকে ওপর থেকে নীচ অবধি স্কুল করতে লাগল। বলল, “এর মধ্যে টল ডার্ক হ্যান্ডসাম কে বল তো?”
খুব ভাল স্বাস্থ্যের বেশ কিছু ছেলের ছবি। সবাইকেই দেখলেই বোঝা যাচ্ছে নিয়মিত জিম করে। ছোট্ট জাঙিয়ার মতো কী একটা পরে আছে ছেলেগুলো। বাকি শরীর খোলা। শরীরে মাপমতো পেশি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এমন শরীর মেনটেন করতে যথেষ্ট খরচ করতে হয়। প্রতিটা ছবির তলায় ছেলেগুলোর নাম লেখা। রক, বুলেট, ডিক্সন, বুল ইত্যাদি। সঙ্গে বয়স ও শরীরের মাপ। নামগুলো দেখেই কবি বুঝল সব বানানো। আসল নাম কেউ দেয়নি। স্বাভাবিক। কেনই-বা দেবে!
কিন্তু মুশকিল হল, সবাই বেশ মেক আপ করে আছে। আর ছবিগুলো এডিটও করা হয়েছে। কবি মুখ ফিরিয়ে নিল।
“কী হল, বল?” লালু জিজ্ঞেস করল। কবি মুখ ফিরিয়ে নিল। বলল, “আমি জানি না!”
“আচ্ছা কেলো হল! ম্যাডাম বলেছেন এরকম আনতে। আর ম্যাডাম নিজেও ছবি দেখে বুঝতে পারছেন না। কাকে আনি বল তো! পাখিদাকে জিজ্ঞেস করলে হাবিজাবি বলবে। আসলে মালটা যার থেকে বেশি কাট পাবে তাকে গছিয়ে দেবে। এই হয়েছে মহা বিপদ,” লালু ট্যাবটা বন্ধ করে নিজের মনেই বলল, “আমি কাল চাক্ষুষ দেখে তার পর ডিসাইড করব। কী সব কাজ করতে হয় মাইরি! শালা বীরেন্দ্র মালটা ম্যাডামকে লাগাতে পারে। না? অবশ্য না পারাই ভাল। গরিবের পেটে লাথি পড়বে বেকার। লাইফ মাইরি কেমন ব্যস্তানুপাতিক ভাবে কানেক্টেড, না?”
কবি পকেট থেকে একটা চুইংগাম বের করল। লালু চট করে হাতের ঠোঙাটা মুড়ে বুক-পকেটে রেখে কবির হাত থেকে চুইংগামটা নিয়ে মুখে পুরে দিয়ে বলল, “জানিস, এ সবের থেকে টু পাইস হয় বটে আমার, কিন্তু শালা ভাল লাগে না! এ সব করব বলে কি ইতিহাসে অনার্স করেছিলাম? বল? গরিব বাড়ির ছেলে বলে যা খুশি তাই কাজ করিয়ে নেবে লোকজন! এত অপমানিত মনে হয় মাঝে মাঝে! তার পর ভাবি, দূর কী হবে! ফলে স্রোতে ভাসিয়ে দিই গা। পড়াশোনা করার বছরগুলো একদম বেকার গেল আমার। টাইম ওয়েস্ট। ভাল কথা, তুই এখান থেকে তো ডিসট্যান্সে গ্র্যাজুয়েশনটা করে নিতে পারিস, তাই না? ফাঁকা সময়ে টুকটুক করে পড়ে নিবি!”
কবি তাকাল লালুর দিকে। তার পর পকেট থেকে আর-একটা চুইংগাম বের করে মুখে দিল। সে দিন এই কথাটা জিনিও বলেছিল ওকে। সবাই ওর পড়াশোনা নিয়ে পড়েছে কেন কে জানে!
ওরা যেখানে থাকে তার পেছন দিকে ছোট হলেও সাজানো একটা বাগান রয়েছে। সেখানে একটা বেঞ্চও রাখা আছে। মাঝে মাঝে সেই বেঞ্চে গিয়ে একা বসে থাকে কবি। সে দিন বীরেন্দ্র ওকে বলেছিল, উর্জা অফিস থেকে ফিরলেই যেন ওর কাছে পাঠিয়ে দেয়।
কথা মতো কাজ করে ওই বেঞ্চটায় এসে একা বসেছিল কবি। আর একটু পরেই জিনি এসেছিল ওখানে। তার পর সামান্য সঙ্কোচ নিয়ে ওর পাশে বসে বলেছিল, “তোমার কি মনখারাপ? মানে, বাড়ির জন্য বা মায়ের জন্য মনখারাপ করছে?”
কবি কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
জিনি —নি বলেছিল, “না, মানে এই যে যখন কাজ থাকে না, তুমি একা একা এখানে এসে বসে থাকো। এই সময়টায় তো একটু পড়াশোনা করলে পারো। গ্র্যাজুয়েশনটা করে নাও। লালুদা আমায় বলেছে, তুমি টুয়েলভ অবধি পড়েছ। তাই এবার কলেজটা অন্তত করে নাও। দেখবে, কাজের মধ্যে থাকলে আর মনখারাপ হবে না।”
জিনির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল কবি। কী বলবে ও জিনিকে? বলতে পারবে ক’দিন ধরে কেন ওর মনমেজাজ এমন খারাপ? কেন থেকে থেকেই এমন কান্না পাচ্ছে?
আর শুধু তাই নয়, কবি জানে, শরীরও যেন বশে নেই ওর। মাঝে মাঝেই হাত কাঁপছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠে জেগে যাচ্ছে। আর এই সব কিছুর মধ্যে সেই লোকটার মুখ দেখতে পাচ্ছে। চোখ বিস্ফারিত। মুখটা সামান্য হাঁ করে খোলা। চোখ থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। এই লোকটাকে মেরে দিয়েছে কবি! ওর হাত দিয়ে খুন হয়ে গিয়েছে! এটা কী করে সম্ভব হল! খুব সাধারণ বাড়ির ছেলে ও। সামান্য কাজের খোঁজে এসে এ কী বিপদে পড়ল!
তবে বীরেন্দ্র ওকে আসতে দেয়নি সামনে। পিস্তলটা বীরেন্দ্রর নামে। সেটা পুলিশ আসার সময় নিজের হাতেই রেখেছিল। পুলিশ আসার পরে সেই নেতাটিও নিজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল দেহরক্ষী সমেত।
বীরেন্দ্র খুব ঠান্ডা মাথায় সামলেছিল গোটা ব্যাপারটা। তা ছাড়া বীরেন্দ্রর পুলিশে ও রাজনৈতিক মহলে এতটাই পরিচিতি যে, কবির ওপর কোনও আঁচ আসেনি। নিউজে কিছু দিন মাতামাতি হয়েছে বটে। কিন্তু ওইটুকুই। কবি জানে আজকাল চারিদিকে এত কিছু ঘটতে দেখে জনগণ আর কিছুই যেন সিরিয়াসলি নেয় না। সবটাই একই চোখ দিয়ে দেখে। ক্লান্ত, নিরুপায় আর বিষণ্ণ এক চোখ।
ঘটনাটার পরে পুলিশ রুটিন কিছু প্রশ্ন করে ছেড়ে দিয়েছে ওকে। বীরেন্দ্ররও সে ভাবে কিছু হয়নি। একটা কেস আছে। কিন্তু পুলিশকে বলা হয়েছে যে, সেলফ ডিফেন্সের জন্য গুলি করেছে বীরেন্দ্র। ফলে সেই কেস নিয়ে কী হবে বা কবে হবে কেউ জানে না। কবি বুঝেছে, কানেকশন আর পয়সার জোর থাকলে এখানে সব কিছু করা সম্ভব!
কিন্তু এ সব তো বাহ্যিক ব্যাপার। কবির মনের মধ্যে যে-তোলপাড়টা হচ্ছে, সেটা এতে কমে নাকি? ওর খালি বাবার মুখ মনে পড়ছে। “অমলকান্তি অমলকান্তি” করে যেন বাবা ওকে ঘুমের মধ্যে ডাকছে! কিছুতেই ভাল করে খেতে পারছে না, ঘুমোতে পারছে না ও। কেবলই মনে পড়ছে, লোকটাকে ও মেরে দিল! লোকটার বাড়িতে কে কে আছে? বৌ আছে? বাচ্চা? লোকটার বয়স তো বড়জোর আটত্রিশ-চল্লিশ। বাচ্চা থাকলেও তো তার বয়স কম। সে কি বাবাকে খুঁজছে? ঘুমের মধ্যে কি বাবার শূন্য বালিশে হাত দিচ্ছে? বাবা-মা আছে কি লোকটার! কেন এমন একটা কাজ বেছে নিয়েছিল সে? খুব কি অভাব বাড়িতে? এ ছাড়া কি অন্য কাজ করার উপায় ছিল না!
হাজার হাজার প্রশ্ন ঘুরছে মাথার মধ্যে। মনখারাপের বড় একটা বেলুন ফুলিয়ে কে যেন ঢুকিয়ে দিয়েছে ওর শরীরে! মনে হচ্ছে এমন একটা গোলকধাঁধায় ও ঢুকে পড়েছে, সেখান থেকে বেরোনোর কোনও পথই খুঁজে পাচ্ছে না কিছুতেই।
এ সব কথা ও কী ভাবে বলবে জিনিকে? বলা যাবে না ও জানে। আর শুধু জিনিকেই-বা কেন, কাউকেই কোনও দিন বলতে পারবে না এই হত্যার কথা। বুড়ো কচ্ছপের মতো এই ঘটনা নিশ্চল হয়ে বসে থাকবে ওর মনের মধ্যে। সারা জীবন যেন অঙ্গুলি নির্দেশ করবে, বলবে, তুমি হত্যাকারী!
সেই সন্ধেবেলা জিনি ওর পাশে বসে আরও কিছু কথা বলেছিল।
বলেছিল, “সে দিন তুমি এসে বাবাকে যে ভাবে সামলালে, তাতে আমরা গ্রেটফুল। বীরেন্দ্রবাবু লোকটা চণ্ডাল। কেউ কাউকে ও ভাবে অপমান করে! আমার বাবা খুব নরম-সরম মানুষ ছিল। আর্ট, লিটারেচার পছন্দ করত। সেখান থেকে এখন দ্যাখো কী হয়েছে! টেনসড, খিটখিটে। বাবার উপায় নেই। না হলে এখানে কেউ চাকরি করে!”
কবি বলেনি কিছু। শুধু শুনে গিয়েছিল। আসলে সে দিন সত্যিই তপনকাকুর জন্য খারাপ লেগেছিল ওর। বয়স্ক মানুষকে তার সন্তানের সামনে কেউ ওরকম ভাবে অপদস্থ করে! এত রাগ হচ্ছিল বীরেন্দ্রর ওপর! তাই ও এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করেছিল মাটিতে পড়ে যাওয়া মানুষটিকে। জিনিকে সামান্য দু’-একটা কথা বলেছিল সাহস দেওয়ার জন্য। আসলে ও জানে বেশি কিছু বলার থাকে না এমন পরিস্থিতিতে। জীবনের বেশির ভাগ অপমান আর কষ্ট মানুষকে গিলে নিতে হয়।
কবি এখানে আসার পর থেকে ক্রমশ একটা ব্যাপার বুঝতে পারছে। বুঝতে পারছে এই পৃথিবীতে এমন একটা শ্রেণি আছে, যাদের কাছে টাকাপয়সার অভাব নেই। মানে, তাদের কাঁচা টাকা এতটাই আছে যে, সেটার পরিমাণ তারা হয়তো নিজেরাই সঠিক জানে না। তাই এই ধরাকে তারা সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। তারা সমাজের সম্পূর্ণ অন্য একটা স্তরে বাস করে। তাদের চিন্তাভাবনা, ঠিক ভুলের হিসেব, মরালিটি, সিমপ্যাথি, আনন্দ বা দুঃখের প্রকাশ সব কিছুই একদম আলাদা। রোজ কলুর বলদের মতো সংসারের জাঁতাকল টানা সাধারণ মানুষজন ধারণাই করতে পারবে না, তাদের পৃথিবীর বাইরে আর-একটা অন্য মাত্রার পৃথিবী কী ভাবে এগজিস্ট করে এখানে!
লালু সামান্য ঠেলা দিল কবিকে। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোর? যত দিন যাচ্ছে কেমন যেন আরও চুপ করে যাচ্ছিস? আগে তো তাও কিছুটা কথা বলতিস, এখন একদম কথাই বলিস না। কেন রে? কিছু হয়েছে? জনাদা মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখছি এমন। কেন বল তো?”
কবি মাথা নাড়াল। সে দিনও এমন কথাই লালু জিজ্ঞেস করছিল ওর ঘরে এসে। কিন্তু লালুকে কিছু বলা যাবে না। আসলে কাউকেই কিছু বলা যাবে না এ সব ব্যাপারে।
সে দিনও জিনিকে কিছু বলেনি কবি। মাথা নামিয়ে চুপ করে বসেছিল মাত্র। শুনছিল জিনি।
জিনি কিছুক্ষণ আর কিছু বলেনি। উঠে যাওয়ার আগে কেমন একটা বিষণ্ণ গলায় বলেছিল, “আমি জানি তুমি হয়তো আমায় দেখলে বিরক্ত হও। কিন্তু আমি কী করব? আমার যে তোমাকে ভাল লাগে। তোমার কাছে এসে বসতে ইচ্ছে করে। আমার মনে হয় ওই বীরেন্দ্র নামক গুন্ডাটার সঙ্গে ঘুরে তুমি নিজেকে নষ্ট করছ। আমার এক বান্ধবী আছে। নিধি। ওদের অনেক রকমের ব্যবসা আছে। আমি নিধিকে বলেছি তোমার ব্যাপারে। যদি একটা কাজ দেয়। মানে, তোমার জীবন এ ভাবে এখানে কাটবে নাকি? সারা জীবন নিশ্চয়ই এখানে পড়ে থাকবে না! তাই বলছি গ্র্যাজুয়েশনটা করা থাকলে কাজের স্পেকট্রামটা বেড়ে যেত।”
কবি অবাক হলেও সেটা বুঝতে দেয়নি জিনিকে। কী সরল মনে মেয়েটা বলে দিল যে, জিনির ওকে ভাল লাগে! এখনকার মেয়েদের এই ব্যাপারটা খুব ভাল লাগে কবির। লুকোছাপা নেই। যেটা মনে হয় সোজা ভাবে বলে দেয়। খারাপ, ভাল সবটা। জিনিও নানা কথার মধ্যে কী সহজ ভাবে বলে দিয়েছিল যে, জিনির ভাল লাগে কবিকে।
তবে ওর বেশ খারাপ লাগছিল জিনির জন্য। জিনি ওকে পছন্দ করে মানেই যে ও নিজেও জিনিকে পছন্দ করবে, এমনটা নয়। এ সব তো এ ভাবে হয় না! কিন্তু তাও কেউ কাউকে ভালবাসলে, সে মুখে না বললেও মনে মনে ভালবাসাটুকু ফেরত চায়। আর সেটা না পেলে খুব কষ্ট পায়। ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া একটা কষ্ট পাথরের মেঘের মতো ঘুরে বেড়ায় তার মাথার ওপর।
কবি জানে জিনিও এর জন্য কষ্ট পাবে। আসলে এই একতরফা ভাবে ভালবাসা ব্যাপারটা খুবই যন্ত্রণার! এই যন্ত্রণা যে পায়, সে জানে। কবি জানে।
আজকাল ওর জীবনটাই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। একটা ভোঁ শব্দ সারাক্ষণ ঘিরে রাখে ওকে। সে দিনও রেখেছিল। জিনির ওই ভাল লাগার কথায় ওর মনে পড়েছিল উর্জার মুখ! ওই পাতলা ঠোঁট। বড় বড় চোখ। গাঢ় লাল নেলপলিশ লাগানো কী সুন্দর আঙুল! ওর মনে হয় উর্জা যখন কথা বলে, তখন যেন সারা ঘরে প্রজাপতি ওড়ে! উর্জার চোখের দিকে তাকাতেই পারে না কবি। একটা মানুষ বাহ্যিক ভাবে সুন্দর হতেই পারে, কিন্তু সেটাই তো আকর্ষণের একমাত্র কারণ হতে পারে না। কবির আসলে ভাল লাগে উর্জার ব্যবহার। কী সহজ, প্রাণখোলা একটা মেয়ে! কোনও জটিলতা নেই। কোনও বিরক্তি নেই। কারও ওপর হুকুম চালানো নেই। সবার সঙ্গে কী সাবলীল ভাবে মেশে। এই সব দেখেই যেন কবির পায়ের তলার জমি আরও নরম হয়ে যায়। ও যেন আরও ডুবে যায় ভাললাগায়! ঠিক-ভুলের বোধ গুলিয়ে যায় ওর। বয়স, সামাজিক অবস্থান এ সবের কথা মাথায় আসে না। মাথায় আসে না যে, উর্জা ওকে ওই চোখে দেখেই না!
এমন অনুভূতি এর আগে কোনও দিন কারও জন্য হয়নি কবির। ক’দিন ও দেখছে উর্জাকে? কথা বলেছে কতটুকু? তাও এমন মনে হয় কী করে ওর? কাউকে এত অল্প জেনে এমন মনে হতে পারে? আচ্ছা, একমুখী, পরিণামহীন এই যে ভাললাগা, এটা কি ভালবাসা না অবসেশন? একাকিত্ব থেকে মানুষের মনের মধ্যে নানান কিছু ঘটে। তার ওপর ওরকম একটা মৃত্যু। সেখান থেকেই কি কবির মনে এ সব আসছে? ভালবাসার মধ্যে কি সুরক্ষা খুঁজছে ও? জানে না। কিচ্ছু জানে না কবি। আর এখন যা মনের অবস্থা ওর, তাতে জানতেও চায় না। ওর শুধু মনে হয় এই জীবনের, এই মনের সমস্ত ক্ষত সেরে যেত, যদি ও একবার মাত্র উর্জাকে জড়িয়ে ধরে ওর কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকত পারত! ওর যেন ক্রমশ মনে হচ্ছে আজকাল সঠিক মানুষের স্পর্শ পেলে সবাই সেরে উঠবে এই পৃথিবীতে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না বলেই যেন মানুষের মনে এমন ক্ষোভ, লোভ আর হিংস্রতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
এই যে সে দিন উর্জা একটা পাখির ডাক শুনে বেরিয়ে এসেছিল বাগানে, কবি তো নিজে থেকে সেখানে না গেলেই পারত। স্যরের সঙ্গে কথা বলে তো সোজা নিজের ঘরে ফিরে যেতেই পারত। কিন্তু নিজেকে আটকাতে পারেনি ও। উর্জার ওই পাখির ডাক শুনে পাখিটাকে খোঁজার মধ্যে কী যে একটা সৌন্দর্য ছিল! একটা ছোটবেলার মতো বিস্ময় জড়ানো ভাল লাগা ছিল। কবিকে সেই সবই যেন টেনে নিয়ে গিয়েছিল উর্জার দিকে। ও হাত তুলে বলেছিল, “ওই যে বসে আছে।”
পাখিটা উড়ে চলে গিয়েছে। উর্জা ফিরে গিয়েছে ঘরে। সেই দিনটা কেটে গিয়েছে অন্য দিনের মতোই। তবু কেন কে জানে পাখিটা আজও কবির বুকের মধ্যে বসে ডেকে চলেছে। যেন বলছে, “বুকে থাকো। বুকে থাকো।”
কে থাকবে বুকে? কে থাকে সেখানে! কাকে ভাললাগে বলে মানুষ আর অন্য কোনও দিকে তাকাতে পারে না কোনও দিন। কেবল একাকী দূরের পাহাড়ি গাছের মতো, সবার অলক্ষ্যে ফুটিয়ে যায় ফুল। ভালবেসে যায় নিভৃতে! কিন্তু সেই ফুল দেখে না কেউ। সেই ভালবাসা ফেরত পায় না কখনও। কী যে কষ্ট হয়! কী যে দুঃসহ হয় বেঁচে থাকা! কবি জানে।
“স্যর হয়ে গিয়েছে,” দোকানদার লোকটি গলা তুলে ডাকল ওদের। লালু ঘুরে বলল, “আপনার লোকদের পাঠান। গাড়িতে লোড করে দিন। আমি ভ্যানের পেছনটা খুলে দিচ্ছি।”
লালু, কবির কাছ থেকে চাবিটা নিয়ে ভ্যানের পেছনের দিকের দরজাটা খুলতে চলে গেল।
কবি দেখল, দোকান থেকে চারজন মিলে সিঙ্গল বেডের একটা গদি ধরাধরি করে বের করে আনছে। ম্যাডামের বয়স্ক কাজের দিদিটির নাম হল অমলা। তার শোওয়ার গদিটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে একদম। তাই লালুকে ম্যাডাম পাঠিয়েছে একটা গদি তৈরি করিয়ে নিয়ে যেতে।
বীরেন্দ্রর কাল থেকে জ্বর এসেছে সামান্য। সেই কারণে আজ আর বেরোয়নি। ফলে সারা দিন কবি বসেই ছিল। লালু তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ওকে। কবি বীরেন্দ্রর থেকে অনুমতি নিয়েই এসেছে।
জনা মারা যাওয়ার পরে বীরেন্দ্র দু’জন নতুন বডিগার্ড রেখেছে। তবে তারা আর ওদের গাড়িতে ওঠে না। বীরেন্দ্রর গাড়ির পেছনে একটা এসইউভি নিয়ে থাকে। এতে নাকি আরও ভাল করে চারিদিকে নজর রাখা যায়।
বীরেন্দ্র এখন নিজের সঙ্গে রাখে শুধু কবিকে। আর শুধু তাই নয়, কবিকে এখন একটা পিস্তলও দেওয়া হয়েছে। নতুন জিনিস। কালো, মসৃণ। নদীর তলায় কয়েক হাজার বছর বসে থাকা পাথরের মতো ঠান্ডা! স্প্রিংফিল্ড এক্সডি (এম), নাইন এমএম পিস্তল। উনিশ রাউন্ড বুলেট ধরে।
কবি যখন গাড়ি চালায়, ওর কোলের কাছে পোষমানা ছোট্ট গিনিপিগের মতো রেখে দেয় পিস্তলটা। এ ভাবেই ওটাকে রাখতে বলেছে বীরেন্দ্র। কারণ, বীরেন্দ্রর মতে যারা একবার ওকে মারার চেষ্টা করেছে তারা আবার চেষ্টা করবে। আর এবার আক্রমণটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। যে-কোনও দিন হতে পারে।
কথাটা শোনার পর থেকেই কবির কেমন অস্থির লাগে। খালি মনে হয়, আবার কি ওকে গুলি চালাতে হবে? মানুষ মারতে হবে? চোখের সামনে ঝলসে ওঠে একটা মুখ! হাঁ করে আছে! রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে চোখ থেকে! লোকটার বাড়িতে কে আছে? বৌ, বাচ্চা? বাবা মা? তারা কী করছে এখন! কী ভাবছে!
বীরেন্দ্র ওকে মনমরা দেখে বলেছে, “আমরা আসলে কিন্তু জঙ্গলেই থাকি জানবি। এখানে হয় তুই ওদের মারবি নয়তো ওরা তোকে মারবে! আইনকানুন আছে। তবে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে সেটা আর কাজ করে না। কাজ করতে দেওয়া হয় না। কারণ, আইন কাজ করলেই সমাজ নামক বড় যন্ত্রটা যারা চালায়, তারা আর সেটা নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে। চলতে পারবে না। জানবি সবটাই একটা বড় যন্ত্রের অংশ। পলিটিক্স হল পাওয়ার আর মানির খেলা। সে এই যন্ত্রটাকে চালায়। সেখানে আইন একটা টুল মাত্র। সেটাকে জাস্ট ব্যবহার করা হয়। আইন সাধারণ মানুষজনের জন্য। তাদের খুন, ডাকাতি, রেপ, ছিনতাই, বৌ পেটানো এ সবের জন্য। পাওয়ারের আসল খেলা যেখানে, সেখানে এ সব আইন কাজ করে না। তোর বেলাতেও করবে না। আমি আছি তো! ফলে যা হয়ে গিয়েছে, সে নিয়ে ভাবিস না। কিছু হবে না তোর। আইন কিচ্ছু ক্ষতি করতে পারবে না। ক্ষতি করলে করবে শত্রুরা। তাই বি কেয়ারফুল। আর বোকার মতো সেন্টিমেন্টাল হয়ে লাভ নেই। তুই খুন করিসনি। নিজেকে সেভ করেছিস মাত্র। সেলফ ডিফেন্স। আর আমাকেও সেভ করেছিস তার সঙ্গে। পারসপেক্টটিভ চেঞ্জ কর, দেখবি লাইফ চেঞ্জ হয়ে যাবে। এখানে কাজ করতে এসেছিস। কাজ করবি। আমি একদিন বোঝালাম। আর বোঝাব না। আমি তোকে বেবি সিটিং করতে বসে নেই জানবি।”
তার পর থেকে কবি বীরেন্দ্রর সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। কতটা পারে কে জানে!
গাড়িটা খুব একটা জোরে চালাচ্ছে না কবি। কোনও তাড়া নেই ওর। লালু গাড়িতে উঠেই আবার বকবক করতে শুরু করেছিল। কিন্তু একটা ফোন আসায় সেটা কানে লাগিয়ে নিচু স্বরে কথা বলছে এখন।
কার ফোন কে জানে! তবে দরকারি ফোন সেটা বুঝতে পারছে। কবি ওই দিকে পাত্তা দিল না একদম। ওর কী প্রয়োজন এ সবে! ও এক মনে গাড়ি চালাতে লাগল। এই গাড়িটার স্টিয়ারিংয়ে সামান্য সমস্যা আছে। বাড়ির মাল বহনের কাজে এটাকে ব্যবহার করা হয়।
রাসবিহারী মোড়ে খুব জ্যাম থাকে।। সিগনালটা একবার লাল হয়ে গেলে, খোলে না সহজে। আশপাশে অটোর লাইন। বাস আর ট্রামেরও বিশাল জট। গাড়িতে বসে কবির মনে হল কলকাতা যেন ভিড় আর শব্দ নিয়ে বোমার মতো ফেটে পড়ছে এখানে! ওদের ছোট্ট গ্রাম থেকে এসে প্রথম প্রথম কেমন যেন দিশাহারা লাগত কবির। শব্দে মাথা ঝিমঝিম করত। রাস্তা পার হতে পারত না। কিন্তু এখন অভ্যেস হয়ে গিয়েছে।
ওই সিগনাল খুলল। কবি দেখল আশপাশের গাড়িগুলো হেলেদুলে স্টার্ট নিল এবার। তার পর এগোতে লাগল। কবিও গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে এগোল।
ফোনটা কেটে পকেটে ঢুকিয়ে এবার লালু যেন সামান্য ঘুরে বসল ওর দিকে। তার পর বলল, “জানিস তো, যাদের মধ্যে শুধু সেক্সের সম্পর্ক তাদের সব ঠিক থাকে। কিন্তু যে-কোনও ছেলেমেয়ের সম্পর্কে শালা প্রেম এসে ঢুকলে না, সব ঘেঁটে যায়! এই আমি যার কাছে যাই, মানে অঞ্জনা। সে ফোন করেছিল। ওর একটা মেয়ে আছে। ছুটি। ছোট্ট মেয়ে। ও কেমন আছে জানাতেই ফোন করেছিল। ছুটির একটা কঠিন রোগ ধরা পড়েছে। পাঁচ লাখ লাগবে আপাতত। পরে আরও লাগবে। সব মিলিয়ে বোধহয় দশ-বারো মতো। পনেরোও লাগতে পারে। এই নিয়ে ভেবে ভেবে মাথাফাথা পুরো খারাপ হয়ে আছে আমার। আমি যে কোথাই পাই এত টাকা! এদিকে জোগাড় না করে দিতে পারলেও মরমে মরে যাব রে! ওইটুকু বাচ্চা। আমি গেলেই আমার কোল ঘেঁষে বসে। আমার মাথার চুলে ক্লিপ লাগায়। রাবার ব্যান্ড লাগায়। টিপ পরিয়ে সাজায়। পকেটে দেখে কিছু চকোলেট নিয়ে গিয়েছি কি না। এমন ভালবাসা আমি আগে পাইনি জানিস! শালা, মাঝে মাঝে মনে হয় ভগবান-ফগবান বলে কি কিছু নেই! আচ্ছা, তোর কি মনে হয়, পাবলিককে ভুলিয়ে রাখার জন্য কি এ সব ছড়ানো হয়েছে? কারণ, ভগবান থাকলে জীবনের একটা ন্যায়বিচার তো থাকত! তুই বল জীবনের ন্যায়বিচার থাকলে গরিবকে কেউ এমন রোগ দেয়! তাও অমন একটা শিশুকে!”
“স্যরকে বললে হয় না? উনি ইচ্ছে করলে তো…”
কিন্তু কবিকে কথা শেষ করতে দিল না লালু। বলল, “খেপেছিস? অঞ্জনা কোন পাড়ার মেয়ে জানিস তো! খবরের কাগজের ভাষায় যাকে বলে নিষিদ্ধ পল্লি! সেখানকার মেয়ের সঙ্গে আমার কী করে আলাপ সেটা জানতে চাইবে সাহেব। তার পর আমার পেছনে লাথি মেরে বের করে দেবে। সাহেব এ সব একদম পছন্দ করে না। নিজের বৌ এদিকে বাইরে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেই দিকে নজর নেই! আর কাজের লোকদের ওপর হেভি রেস্ট্রিকশন! আগেই বলে নেওয়া হয়েছিল যেন এ সবে না। জড়াই। ভাই রে, আমার এই চাকরিটা দরকার। তবে নিরুপায় হয়ে গেলে ম্যাডামকে বলে দেখব।”
কবি আর কী বলবে! ও নিজের মনে মাথা নাড়ল। সত্যি অবাক পৃথিবী!
কবি হাজরা মোড় থেকে বাঁ দিকে নিল। একটা বাচ্চার শরীর খারাপ। এত টাকা লাগবে! শুনেও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ও কী করতে পারে? এত টাকা তো ওর নেই। ক’মাস কাজ করে সামান্য হাজার পাঁচেক টাকা আছে ওর কাছে। সেটা ও দিয়ে দিতেই পারে। কিন্তু তাতে কি কিছু হবে?
মানুষের অসহায়তা দেখে কষ্ট লাগে কবির। কিন্তু কিছু করতে তো পারে না। যারা পারে, তারাও কি করে!
জাজেস কোর্টের সামনে থেকে ডান দিকে গাড়ি ঘোরাল কবি। এখান থেকে বাড়ি কাছেই।
লালু বলল, “জানিস, চিন থেকে একটা ভাইরাস এসেছে। করোনাভাইরাস, কোভিড নাইন্টিন। চারিদিকে তাণ্ডব শুরু করেছে। ইউরোপ, আমেরিকা তো ব্যাপক ঝাড় খেয়েছে। আমাদের এখানেও বোধহয় কিছু হয়েছে। কলকাতায় এলে কী হবে বল তো? আমাদের এখানে এত লোকজন! ছড়িয়ে সব ছ করবে দেখবি! ভাবলেই ভয়ে মাথায় উঠে যাচ্ছে সব!”
কবি তাকাল লালুর দিকে। বলল, “দেখা যাবে তখন। আগে থেকে ভেবে নিলে কি সব ঠিক হয়ে যাবে!”
লালু বলল, “এ সব জিনিস খুব ঝাড়ের। এই ভাইরাস শালারা রক্তবীজের জাত। হিস্ট্রি পড়লে দেখবি, এর আগেও মানুষ এমন নানান অসুখের পাল্লায় পড়ে কী সাংঘাতিক ভূগেছে! শালা, কলকাতায় যদি ঢোকে তবে ক্যান্টার হয়ে যাবে গুরু। কোটি কোটি নিয়ম না-মানা লোকজন। সব বোদ্ধা শালা। কেউ কারও কথা শোনে না। আমার ভাবলেই ভয় করছে।”
বাড়িতে ঢুকে গাড়ি থেকে গদিটা বের করে কাজের লোকেদের মাথায় তুলে দিয়ে লালু ভেতরের দিকে চলে গেল। গাড়িটা ঘুরিয়ে এবার গ্যারাজে রেখে দিল কবি। তার পর চাবিটা পকেটে নিয়ে বীরেন্দ্রর স্টাডির দিকে এগোল। বীরেন্দ্রর সঙ্গে ছাড়া একা একা বাইরে থেকে বেরিয়ে এলে, ওকে একবার করে হাজিরা দিতে হয়।
আচমকা সামান্য ঠান্ডা লাগছে কবির। শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে একটা। বেশ বড় জায়গা নিয়ে এই বাড়িটা। অনেক গাছপালা চারিদিকে। আলোও লাগানো আছে। কিন্তু সে সব বেশ নিভুনিভু। স্বপ্নের মতো একটা পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে।
কবি এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এল। উর্জার গাড়ি দেখেছে গ্যারাজে। মানে, ফিরে এসেছে অফিস থেকে। যদি ওপরের টেরাসটায় এসে দাঁড়ায়, তা হলে কবি দেখতে পাবে।
আসলে উর্জা সামনে এলে ওর দিকে তাকাতে পারে না কবি। আবার না তাকিয়েও থাকতে পারে না। এ এক অদ্ভুত দড়ি টানাটানি! এর মাঝে পড়ে ওর কেমন যেন করে মাথার ভেতরে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। চোয়ালের দুটো পাশ ব্যথা ব্যথা করে।
এমন কেন হয়! দেখলে কষ্ট! না দেখতে পেলেও কষ্ট! কী ঝামেলা রে বাবা! মাঝে মাঝে নিজের দাবিটা নিজেই বুঝতে পারে না কবি। সারাক্ষণ যে কেমন একটা অনুভূতি হয় কাউকে বলে বোঝাতে পারে না। যেন চামড়ার তলায় একটা নাম-না-জানা অস্বস্তি। আশপাশে কেমন যেন অক্সিজেন কম। যেন হাত-পা বেঁধে কেউ ওর শরীরে ইঁদুর আর আরশোলা ছেড়ে দিয়েছে!
জ্বর সামান্য। তাই বীরেন্দ্র শুয়ে নেই। স্টাডিতে বসে ল্যাপটপ খুলে কিছু একটা কাজ করছে। এসি বন্ধ। ফ্যান চলছে। বড় ঘরটার একদিকের আলো বন্ধ। এর ফলে কেমন যেন আলো-আঁধারি তৈরি হয়েছে।
বড় কাঠের টেবিলের একপাশে কালো সিল্কের লুঙ্গি আর কালো সিল্কের শার্ট পরে নিজের চেয়ারে বসে আছে বীরেন্দ্র। বাইরে লোকটা সারাক্ষণ সাদা বা লেবু-হলুদ বা গোলাপি রঙের জামাকাপড় পরে। কিন্তু বাড়িতে আবার সারাক্ষণ কালো রঙের পোশাক পরে। কেন কে জানে!
“স্যর,” কবি গিয়ে চাবিটা স্টাডির একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখল।
বীরেন্দ্র ল্যাপটপ থেকে মুখটা তুলে তাকাল ওর দিকে। তার পর গম্ভীর কিন্তু নিচু গলায় বলল, “এসেছিস! শোন, তোকে একটা কাজ দেব। করতে পারবি?”
প্রশ্নটা যে আদেশ, কবি সেটা বুঝল। কিন্তু কাজ? আবার কী কাজ! ভয়ে কেঁপে উঠল কবির বুকটা। কী করতে হবে ওকে? আবার সে সব কিছু নাকি!
বীরেন্দ্র বলল, “কাল থেকে কয়েক দিন আমি থাকব না। দিল্লি যাব। তুই উর্জাকে নজরে রাখবি। কোথায় যায়, কী করে। কার সঙ্গে দেখা করে। সবটা দেখবি। আড়াল থেকে অবশ্যই। কেউ যেন জানতে না পারে। কাউকে বলবিও না। আমি এলে আমায় সব রিপোর্ট করবি। কিছু বাদ দিবি না। এই নে, এই খামে দশ হাজার আছে। এক্সপেনসেস। সঙ্গে একটা স্কুটি নিবি। গ্যারাজে বলা আছে আমার। কবি, মনে থাকে যেন, নিজেকে এক্সপোজ করবি না। কেউ যেন জানতে না পারে। আর আমায় সবটা বলবি। স-ব-টা। কিছু কিন্তু লুকোবি না। বুঝেছিস?”
কবি দেখল বীরেন্দ্র ওর দিকে একটা ব্রাউন রঙের খাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
