১. বিশ্বনাথ
ছোট্ট দুটো প্রজাপতি উড়ছে। আর উড়তে উড়তে একে-অপরকে গোল করে ঘুরছে তারা। পথের পাশে ফুটে রয়েছে নাম না-জানা সব ফুল ।
হাওয়ায় আলতো করে দুলছে তাদের মাথা। পাপড়িঘেরা ছোট্ট মুখগুলো তাকিয়ে রয়েছে আলোর দিকে। আর রঙের আঙুল দিয়ে তারা যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে এই সকালের শীতের বাতাস। পাতা আর কুঁড়ি দিয়ে যেন আহরণ করছে এই রোদ্দুর। তাদের জীবন ৷
আর, এই সব ফুলের ওপরেই উড়ছে ওই দুটো প্রজাপতি। তাদের ছোট্ট বাসন্তী রঙের পাখনায় নীলের ফোঁটা। ধারে ধারে হেম সেলাইয়ের মতো বাদামি দাগ। সেই পাখনা নাড়িয়ে তারা কী সুন্দর ভেসে আছে সকালের বাতাসে। দু’জনে দু’জনকে ঘিরে গোল করে ঘুরছে। যেন নাচছে দু’জনে। কোনও এক অশ্রুত সুর যেন ভেসে আসছে এই আলোয়, আলোয়, এই হাওয়ায়। আর, তার তালে ওরা দুলছে, উড়ছে, একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে, ভেসে থাকছে।
এই অদৃশ্য বন্ধনই আসল বন্ধন। এর টানই কাটাতে পারে না কেউ । এই চরাচর, প্রকৃতি, দৃশ্য জাগতিকতা ও অদৃশ্য জীবন, সবাই মিলেমিশে কী করে যে এই বন্ধন রচনা করে তা কেউ জানে না। যে ভাবে কেউ জানে না, ঠিক কখন প্রথম শিশির ফোঁটা ভাস্বর হয়ে ওঠে ঘাসের ডগায়। জানে না, ঠিক কোন মুহূর্তে ফুটে ওঠে ফুল। পাখির ছানা তার ছোট্ট বাসায় প্রথম চোখ মেলে কখন! জানে না কখন একজন মানুষের মনে ফুটে ওঠে অন্য আর-একজন মানুষ! ঠিক সে ভাবেই সবার অলক্ষ্যে এই বন্ধন রচিত হয়। এর ব্যাখ্যা নেই। স্পষ্ট কারণ নেই । নেই কোনও সঠিক পদ্ধতি। শুধু জ্বলে ওঠা তারা আর হারিয়ে, মিলিয়ে যাওয়া তারার আলোর মাঝে ভারী অদ্ভুত ভাবে গড়ে ওঠে এই বন্ধন। এই সমগ্র জগৎ এই বন্ধনেই চালিত হচ্ছে। গ্রহ-নক্ষত্র থেকে শুরু করে সামান্য এই দুই প্রজাপতির নাচের বন্ধন ক্রিয়াশীল। ক্রিয়াশীল একই মধ্যেকার অণু-পরমাণুতে শুধু এই একই টান। ঘুমন্ত শিশুর হাত বাড়িয়ে তার হারিয়ে যাওয়া মাকে খোঁজার মতো টান ৷
বিশু যত দেখে তত অবাক হয়। আকাশে, বাতাসে, গাছপালায়, নদীতে, পাহাড়ে, এই বিস্তৃত জীবজ- গতে মানুষের মনের মধ্যে শুধু এই টান-ই দেখতে পায় ও। দেখতে পায় এই আশ্চর্য বন্ধন ।
কী ভাবে সম্ভব হয় এরকম! কী রহস্য লুকিয়ে আছে এর মধ্যে! কিসের টানে ছোট্ট ঘাসফুলের চূড়ায় এ ভাবে দু’টি প্রজাপতি একে-অপরকে ঘিরে আবর্তিত হয়!
আজও বিশু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। পৃথিবীকে রোজ নতুন লাগে ওর। ঘুম থেকে উঠে ও যখন ঘরের বাইরে এসে ওদের ছোট্ট দাওয়ায় দাঁড়ায়, তখন রোজই নতুন কিছু না- কিছু দেখতে পায়। মানে রোদটা যেন রোজ আলাদা ভাবে পড়েছে। গাছের পাতার ছায়াগুলোর রং কোনও দিন যেন নীল, কোনও দিন গাঢ় সবুজ আবার কোনও দিন যেন ঘন মেরুন রঙের। দূরের ওই লম্বা অশোক গাছটাও যেন এক-একদিন খুশি থাকে, মাথা নাড়ায়, হাসে। আবার অন্য দিন কেমন যেন চুপচাপ, মনমরা অন্যমনস্ক। আবার ওই বোসবাবুদের বড় চারটে তালগাছের মাথার ওপরে প্ৰকাণ্ড পাথর-বাঁধানো যে নীল আকাশ, সেটাতেও যেন রোজ রোজ মেঘেদের মনমেজাজ পাল্টায়। সব হাঁ করে তাকিয়ে দেখে বিশু। সব কিছুর মধ্যেই কেমন যেন প্রাণ দেখতে পায় ও। দেখতে পায় সেই বন্ধন। মনে হয় এই প্রকৃতি আর তার জীবজগৎ কোনও এক অদৃশ্য সুতোয় যেন গাঁথা। ওর কেবলই মনে হয়, কে গাঁথল এই সব কিছু? কে এই সব কিছুর মধ্যে বুনে দিল এত ভালবাসা?
“কী রে পাগলা, কী দেখছিস?”
পাশ থেকে ডাক পেয়ে মুখ তুলে তাকাল বিশু। দেখল, জগন্নাথ হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে।
জগন্নাথ ওর ভায়রা হারু ঘোষের ভাই। থাকে পাশের গ্রাম মুড়াপোঁতায়। পার্টি করে। বেশ নাম করেছে উঠতি নেতা হিসেবে। গরিব মানুষের হকের কথা বলে জগন্নাথ । সবাই বেশ সমঝে চলে ওকে । বিশু অবাক হয়ে দেখে লোকটাকে। শালকাঠের মতো ঘন রং। উজ্জ্বল চোখ। সারা শরীর দিয়ে যেন আত্মবিশ্বাসের ছটা বেরোচ্ছে! ওর চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট হয়েও জগন্নাথ ওকে তুই-তোকারি করে, পাগলা বলে। তাও ওর খারাপ লাগে না। মনে হয়, ওকে নিয়ে মজা করা ঘন ছায়ার মতো দেখতে এই জগন্নাথের ভেতরে আর-একটা জগন্নাথ আছে। আলো দিয়ে তৈরি একটা জগন্নাথ। যে খুব ভাল লোক। মানুষের কষ্ট বোঝে। যে অন্যের জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে।
বিশুও হাসল। জগন্নাথ সাইকেলে বসে আছে।! কাঁধে ব্যাগ। ঠোঁটের কোণে বিড়ি। তার থেকে বেরোনো সরু ধোঁয়ার রেখা সাদা শিরা- উপশিরায় ভাগ হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়।
জগন্নাথকে দেখে খুব আশা-ভরসা হয় বিশুর। মনে হয় এমন সব মানুষ থাকলে অসহায় লোকজনের সুবিধে হবে একটু ।
যদিও নানান লোকে নানান খারাপ কথা বলে। বলে জগন্নাথ খুব সেয়ানা। ঝামেলাবাজ। নিজের ধান্দার জন্য সব পারে। ক্ষমতার দিকে খুব লোভ। ওপর ওপর মানুষের জন্য কাজ করে দেখালেও মনে মনে একটা সামন্তপ্রভু!
কিন্তু এ সব কথা বিশু মাথায় গাঁথে না। আসলে আজকাল কোনও খারাপ কথাই ওর মনে ছাপ ফেলে না খুব একটা। চারিদিকের সব কিছুর মধ্যেই ও একটা খুশি আর আনন্দ দেখতে পায়। ওর বুকের মধ্যেটা খুশিতে, বিস্ময়ে ফুলে ওঠে। কেমন যেন লাগে মাথাটা। কেবলই মনে হয় এই সব কিছু যদি ও কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারত!
কিন্তু কার সঙ্গে ভাগ করবে বিশু! কাকে চিনিয়ে যাবে এই সব গাছপালা, মেঘ, নদী আর আলো- ছায়ার গল্প! বিশু ভাবে, যদি ওর একটা সন্তান থাকত! তা হলে তার ছোট্ট হাতটা নিজের মুঠোয় ধরে তাকে চিনিয়ে দিত এই জগতের অস্ফুট সব গল্প।
কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। বিশু আর শিউলির এখনও কোনও সন্তান আসেনি। আর কোনও দিন আসবেও না। এমনটাই বলেছে হাওয়াদাদু । বিশুকে নাকি বাবা হওয়ার মতো করে তৈরি করেনি প্রকৃতি। তার শরীর বীজশূন্য। তার গাছে ফুল নেই। তার মেঘে বৃষ্টি নেই। হয়তো হবেও-বা। হাওয়াদাদু তো আর ভুল কথা বলার মানুষ নয় ৷ কিন্তু সন্তানের জন্য ভেতরে ভেতরে কী যে এক তীব্র টান অনুভব করে বিশু। কেন এই টান! কিসের এই টান! কেন যে ছোট্ট প্রজাপতিরা একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরে যায় এমন!
“কী রে পাগলা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? দোকান খুলবি না?” আবার প্রশ্নটা করে জগন্নাথ হাসল।
“খুলব,” বিশু বলল, “আসলে হাওয়াদাদুর কাছে যাব একবার। আমায় ডেকেছে আজ।”
“অ,” জগন্নাথ পাত্তা দিল না কথাটাকে। বলল, “ভালই আছিস! তা এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস বললি না তো?”
“ওই মানে দেখছিলাম, প্রজাপতিদের,” বিশু আমতা আমতা করে বলল ।
“ও, তুই তো আবার কবি!” হাসল বিশু, “তা কবিতা লিখলি কিছু?”
“লিখব,” বিশু টালুমালু চোখে তাকাল। বলল, “দশ দিন লেখা আসেনি। আজ আসবে হয়তো। মাথার মধ্যে একটা লাইন উড়ছে…” “প্রজাপতির মতো না মশার মতো?” শব্দ করে হাসল জগন্নাথ । জিজ্ঞেস করল, “শিউলি কেমন আছে রে?”
বিশু বলল, “ভালই আছে।”
“তোর পাল্লায় পড়েছে, আর ভাল!” জগন্নাথ মাথা নাড়ল নিজের মনে, “কাজে যা। সকাল সকাল প্রজাপতি দেখছে। যেন এতে পেট ভরবে। গাধা একটা! শিউলি নাকি ভাল আছে! হুঃ!’
জগন্নাথ সাইকেল দাপিয়ে চলে গেল ।
ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল বিশু। জগন্নাথের বলে যাওয়া কথাগুলো কানের মধ্যে বাজছে। শিউলি কেমন আছে! খারাপ আছে! কষ্টে আছে! ও তো জানে না। তা হলে জগন্নাথ এমন বলল কেন? ও জানল কী করে?
বিশু জানে ওর বোধবুদ্ধি সবার মতো অতটা প্রখর নয়। বরং বলা যায় মাথাটা সব সময় ঠিকমতো কাজ করে না ওর। সঙ্গে শরীরটাও যে খুব ভাল যায় তাও নয়। জন্ম থেকেই হৃদ্যন্ত্রের দোষ রয়েছে ওর। সঙ্গে আরও নানান সমস্যা আছে। তার ওপর রোজগারপাতি কম। এতটাই কম যে, শিউলিকে একটু দূরের গেস্ট হাউসে রান্নার কাজ করতে যেতে হয়। বিশুর খারাপ লাগে। কিন্তু উপায়ও তো নেই। বিশুর মতো এমন একটা ছেলের সঙ্গে শিউলির মতো মেয়ের বিয়ে হওয়াটা সত্যি ঠিক হয়নি। কিন্তু এখন উপায়টাই-বা কী!
আসলে বাবা-মা না থাকলে মুখচোরা লাজুক মানুষের খুবই দুর্ভোগ। শিউলিরও এই কারণেই দুর্ভোগটা হয়েছে। বিশু বোঝে এ সব। বোঝে শিউলির মতো মেয়ের সঙ্গে ওর মতো মানুষের বিয়ে হওয়াটা অনুচিত খুব। কিন্তু তাও কী ভাবে এই অনুচিত ব্যাপারটাকে পাল্টে দেবে, সেটা বুঝতে পারে না।
এই কারণে বিশুর মনে একটা আবছা পাপবোধ কাজ করে। সেটা ঢাকতেই কী না কে জানে, শিউলিকে খুব ভালবাসে ও। কষ্ট দেয় না একটুও ।
শিউলিও খুব ভাল মেয়ে । চুপচাপ। নিজের মনে থাকে। বাড়ির সামনের একটু জায়গায় বাগান করেছে ও।
নিজের কাজ শেষ হওয়ার পরে, সেই নিয়েই থাকে। এর সঙ্গে ওদের বাড়ির দাওয়ায় উড়ে আসা নানারকম
পাখিদের যত্ন করে খাওয়ায়। সেই কারণেই ওদের বাড়িতে কতরকমের যে পাখি আসে!
এ সবের মাঝে শিউলি নিজের মনে গুনগুন করে গান গায়। কখনও বিশুকে কোনও কিছু নিয়ে অভিযোগ করে না। বিশু বোঝে, শিউলি নিজের এই ভাগ্যকে বা স্পষ্ট করে বললে দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে। শিউলির দিদি মানে লীলার বিয়ে হয়েছে হারু ঘোষের সঙ্গে। নিজের দিদির হারু ঘোষের মতো অত বড়লোকের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পাশাপাশি বিশুর মতো হতদরিদ্র মানুষের সঙ্গে নিজের বিয়েটাকে মেনে নেওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়! কিন্তু শিউলি সেটা মেনে নিয়েছে! ভাল মানুষজন এমনই হয়। অনেকটা যেন পৃথিবীর মতো। সব মেনে নেয়। সহ্য করে নেয় ৷
আজও সকালে শিউলি চলে গিয়েছে রান্নার কাজে। শুধু যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে বিশু যেন হাওয়াদাদুর সঙ্গে একবার দেখা করে। খুবই জরুরি দরকার।
হাওয়াদাদু মানে বিমল মুস্তাফি। ষাটের কাছাকাছি বয়স। অকৃতদার মানুষ ৷ গ্রামের মধ্যে বড় একটা বাড়িতে থাকে। আর সেই বাড়ির নীচের তলায় ডিসপেনসরি খুলে চিকিৎসা করে। গরিবদের কাছ থেকে টাকাপয়সা নেয় না বিশেষ ।
বিশুকে ছোট থেকেই খুব ভালবাসে হাওয়াদাদু। শিউলিকেও দেখে নিজের সন্তানের মতোই। অন্যান্য সাহায্যের পাশাপাশি ওদের টাকাপয়সা দিয়েও সাহায্য করতে চায় হাওয়াদাদু। কিন্তু এই টাকাপয়সার সাহায্যটা শিউলি নেয় না কিছুতেই।
তাই যাতে ওদের আর্থিক দিক থেকে কিছুটা সুরাহা হয়, সেই কারণে হয়, হাওয়াদাদু সামান্য দূরের ওই গেস্ট হাউসে রান্নার কাজটা দেখে দিয়েছে শিউলিকে ।
হাওয়াদাদু খুব লম্বা মানুষ। সঙ্গে তেমন চওড়াও। মাথায় বড় টাক। আর গালে বেশ লম্বা দাড়ি। সেই ছোট থেকেই বিশুরা দেখত, হাওয়ায় দাদুর দাড়ি উড়ছে। সেই থেকেই ওরা নাম দিয়েছিল হাওয়াদাদু ।
আজ কেন হাওয়াদাদু সকাল সকাল ডেকে পাঠিয়েছে বিশুকে কে জানে! কিন্তু ডেকেছে যখন যেতে তো হবেই।
আর যাচ্ছিলও তো বিশু। কিন্তু ওই যে দুটো প্রজাপতি! বাসন্তীর ওপর নীল ফোঁটা, ডানার ধারে বাদামি হেম সেলাইয়ের মতো দাগ, তারাই তো আটকে দিল পথ!
আকাশের দিকে তাকাল বিশু। ডিসেম্বরের সকাল ফুটে উঠছে শত- দলের মতো। রোদ্দুর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডার ভাব কমে এসেছে কিছুটা। বেলা বাড়ছে। গাছের ছায়া ছোট হচ্ছে। নাঃ, আর দাঁড়িয়ে থাকলে দোকান খুলতে দেরি হয়ে যাবে। বিশু হাঁটা লাগাল। দেখা যাক হাওয়াদাদু কী বলে ।
হাওয়াদাদুর বাড়িটা বিশাল বড়। সামনে উঁচু পাঁচিল। তার মাঝে বড় লোহার দরজা। সেই দরজার পেটে আবার ছোট্টমতো আর-একটা দরজা। সেটা এখন খোলা ।
বিশু দেখল, সেই ছোট দরজাটার সামনে কাঠের টুলে বসে আছে রহম- তদা। এই মানুষটা হাওয়াদাদুর কাছেই থাকে। সব কিছু দেখাশোনো করে।
রহমতদা এখন গোবিন্দ বাউলের গান শুনছে। হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে সুর। মনটা আরও ভাল হয়ে গেল বিশুর। ও ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়াল গোবিন্দর পাশে । পাশে। শুনল গোবিন্দ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে, “আমি তার মুখের কথা শুনব ব’লে গেলাম কোথা,/ শোনা হল না, হল না— আজ ফিরে এসে নিজের দেশে এই-যে শুনি/ শুনি তাহার বাণী আপন গানে৷/ আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই হেরি তায় সকল খানে৷”
গানের শেষের দিকে এসে রহমতদা নিজেও গলা মেলাল। বিশু দেখল দু’জনেই বিভোর। চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছে।
গান শেষ করে এবার বিশুকে দেখতে পেল রহমতদা। বলল, “আরে, তুই এসে গিয়েছিস? যা ভেতরে। কত্তা অপেক্ষা করছেন। যা তাড়াতাড়ি।’
বিশু হাসল। পকেট থেকে একটা এক টাকার কয়েন বের করে গোবিন্দর হাতে দিয়ে বলল, “আমার দোকানে এসে একদিন গান শুনিয়ে যাবে?”
গোবিন্দ টাকাটা পকেটে রেখে বলল, “যাব গো বিশ্বনাথ। তোমার কাছে ছাড়া আর কার কাছে যাব! তুমি যে সব গো! তুমিই তো ভারসাম্য রাখো। এই প্রকৃতিতে তুমিই তো আসল কাজ করো। তুমিই তে দেবাদিদেব। যাব তোমার কাছে। যেতে যে হবেই ।”
বিশু রহমতের পাশ দিয়ে, ছোট দরজার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকল ।
চারিদিক যেন রঙে ঝলমল করছে! নানান রঙের গাঁদা, ডালিয়া আর কত নাম না-জানা ফুলে ভরে আছে চারিদিক। বিশুর মনে হল কোনও এক শিশু যেন এক বাক্স মোমরং দিয়ে এলোমেলো ভাবে যেমন খুশি তেমন রং করে দিয়েছে চারিদিকটা!
আর এই এত রঙের মধ্যেই হাওয়াদাদুকে দেখতে পেল বিশু। লম্বা মানুষটা আজও সটান। দস্তানা পরা হাতে ছোট্ট একটা স্প্রেয়ারের বোতল নিয়ে ঘুরছে গাছেদের সামনে। রোদের মধ্যে ঝিলিক দিচ্ছে চোখের সোনার চশমাটা ।
ওকে দেখে থমকে গেল হাওয়াদাদু। যেন হাসল সামান্য। তার পর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ওর দিকে ।
বড় গাছের দিকে যে ভাবে শিশুরা মাথা তুলে তাকায়, সে ভাবে বিশু মাথা তুলে তাকাল হাওয়াদাদুর দিকে।
হাওয়াদাদু কোনও রকম ভনিতা না করে সরাসরি বলল, “বিশু, তোকে আমি ডেকেছি একটা দরকারি কথা বলার জন্য!”
“দরকারি!” বিশু তাকাল মানুষটার দিকে। হ্যাঁ, দরকারি কথা যে আছে সেটা তো জানতই। শিউলি বলেছে ওকে। কিন্তু অন্য দিন হাওয়াদাদু আগে নানান কথা বলে তার পর কাজের কথায় আসে। কিন্তু আজ এমন সরাসরি ভাবে বলল! কী এমন দরকারি কথা! বিশুর মনে হল আজ হাওয়াদাদুকে যেন অন্যরকম লাগছে ।
“হ্যাঁ রে,” হাওয়াদাদু ওর পিঠে হাত রেখে আস্তে আস্তে বাগানের মধ্যে হাঁটতে লাগল, “বিশু, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। উত্তর দে। জীবনবৃক্ষ বলতে কী বুঝিস তুই?” “জীবনবৃক্ষ!” বিশু কী বলবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল ।
হাওয়াদাদু বলল, “হ্যাঁ, জীবনবৃক্ষ। সেই বৃক্ষ, তার ফল, তার বীজ। সেখান থেকে জন্ম নেওয়া আরও নতুন সব বৃক্ষ। মানুষের জীবনও যে এমন, তা বুঝিস? বুঝিস এক গাছ থেকে কেমন করে জন্ম নেয় আরও অনেক অনেক গাছ! তাদের আপাত ভাবে আলাদা লাগলেও আসলে তারা কিন্তু আলাদা নয়। একে অপরের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকলেও, তারা কিন্তু এক। আমরা সবাই কিন্তু আসলে এক । একই বৃক্ষ থেকে জন্ম নিয়েছি। জানিস তো?”
বিশু তাকাল হাওয়াদাদুর দিকে। তার পর বলল, “তাই, না? আমরা সবাই এক!”
“হ্যাঁ রে। আমার-তোমার ভাগটা সঙ্কীর্ণ মানুষজনেরা করে। জানবি আসলে সব এক। জানবি এই জীবন আমাদের কাছে প্রসাদস্বরূপ। একই বৃক্ষের ফল। তাই এই জীবন যা দেয় হাত পেতে নিতে হয়। কারণ, এ ঈশ্বরের দান। তোকেও নিতে হবে, বুঝলি?”
“আমায়?” বিশু অবাক হয়ে তাকাল হাওয়াদাদুর দিকে। আজ হাওয়াদাদু যে কী বলছে কিছুই বুঝতে পারছে না ও।
“হ্যাঁ, তোকে,” হাওয়াদাদু হাসল সামান্য। তার পর জিজ্ঞেস করল, “তুই নিতে প্রস্তুত তো?”
বিশু তাকাল হাওয়াদাদুর দিকে। পাশেই ফুলগাছ। সেখানে কোথা থেকে আবার ফিরে এসেছে দুটো প্রজাপতি। এরা ভিন্ন। কমলা-কালোয় রাঙানো, গির্জার রঙিন কাচের মতো এদের ডানা। এরাও একে-অপরকে কেন্দ্র করে উড়ছে । গোল্লা কাটছে। সেই দিকে তাকিয়ে বিশু হাসল নিজের মনে। তার পর আবছা গলায় বলল, “জীবনের এই টান কিসের থেকে আসে হাওয়াদাদু? আমরা সবাই এক বলেই কি এই টান? এ টান কি আসলে নিজের প্রতি নিজের আকর্ষণ?”
হাওয়াদাদু কিছু না বলে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
বিশু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পর বলল, “আমি প্রস্তুত । তুমি বলো।’
হাওয়াদাদু চোখ থেকে চশমাটা খুলে বুক-পকেটে রাখল। তার পর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল ।
