সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.৬
৫.৬
বৃষ্টির মরশুম শুরু হতে বেশি দেরি নেই। ছেলের দল বনের শুকনো তালপাতা জড়ো করে ছাউনি মেরামত করছে, ঘাটের দিক থেকে এসে উপস্থিত হলো একটি বেঁটেখাটো চেহারার লোক। দেখে বয়স বোঝা যায় না, কিন্তু জাতিতে ব্রাহ্মণ। মুন্ডিত মস্তক, কপালে চন্দনের তিলক, মাথার টিকিতে সাদা ধুতরো ফুল বাঁধা। গোলগাল রোমহীন চেহারার সঙ্গে মানানসই সামান্য মেয়েলি কন্ঠস্বর। হাতে গেরুয়া কাপড়ে জড়ানো বস্তুটি দেখে মনে হয় যেন অদ্বৈত সন্ন্যাসীর একাদন্ডম। বুনোরাম পণ্ডিতের সামনে হাজির হয়ে ভূমিতে গড় হয়ে প্রণাম করল সে, বলল—‘মুই গোবর্ধন মহাপাত্র, জাজপুর থেকে আসিচি।’
আশ্রমে বিদ্যার্থী হবার বয়স কিংবা বাসনা কোনোটাই নেই গোবর্ধনের, সুদূর কলিঙ্গভূমি থেকে সে এখানে এসেছে অর্থোপার্জনের আশায়। হাতে গেরুয়া কাপড়ে জড়ানো বস্তুটি খুলতে বেরিয়ে এল লম্বা হাতল-অলা খুস্তি হাতা ও সাঞ্চা। গড় গড় করে সে আউড়ে গেল কঠোর সাত্ত্বিক শুদ্ধাচারে কী কী পদ রান্না করতে পারে, সম্পূর্ণ দেশজ উপকরণ ও সুপ্রাচীন রন্ধনবিধি অনুসারে, যেভাবে তারা বংশপরম্পরায় পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ রান্না করে এসেছে। ছেলের দল ওর মৌখিক পরীক্ষা নেবার পর গোবর্ধনকে আশ্রমের পাচকরূপে বহাল করা হলো কয়েকটি শর্তে এক, সে কোনোরূপ বেতন পাবে না; দুই, তার বদলে সে দুবেলা আহার পাবে; তিন, আশ্রমিকেরা যা কিছু খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবে তাই দিয়েই চালাতে হবে; চার, জ্বালানি কাঠ জল ইত্যাদি রান্নার অন্যান্য সামগ্রী তাকেই যোগাড় করতে হবে। সেদিন বিকেলেই গোবর্ধন কয়েকটি পাথরখন্ড কুড়িয়ে এনে মাটি লেপে পাকাপোক্ত উনুন তৈরি করে ফেলল, ডালপাতা দিয়ে একটি ছাউনিও করল।
.
পরদিন থেকে বনের মধ্যে নানা প্রকারের শাকপাতা সংগ্রহ করে এনে সুস্বাদু পদ তৈরি করতে লাগল। গোবর্ধনকে পেয়ে ছেলের দল খুশি। প্রতিদিন কাঠ কেটে জল তুলে এনে পালা করে রান্না করার ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি মিলল। সেই সময়টা তারা খেলাধুলো করে, বনের মধ্যে স্বাধীন ঘুরে বেড়িয়ে, নদীতে সাঁতার কেটে ব্যয় করতে পারবে, বিশেষ করে গুরুদেব যে দিনগুলোয় আশ্রমে থাকেন না।
মাঝেসাঝেই বুনোরাম দু-এক দিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যান। আদিরামবাটিতেও যান না। কোথায় যে যান কেউ তার হদিশ জানে না। কারোর কারোর মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় সেই গুজব যা সাতগাঁয় কান পাতলে শোনা যায়। গুরুদেব কি সত্যিই গোপনে তন্ত্রসাধনা করেন?
গোবর্ধন কেবল পাকা রাঁধুনিই নয়, ভালো কথকও বটে। সেটা দিন কয়েকের মধ্যেই দেখা গেল। সকালে বিকেলে ছেলেরা যে কাব্যের চরণ আবৃত্তি করে, তার কিছু কিছু কথা ও অনুষঙ্গ নিয়ে নিজের দেশের গ্রাম্য সুরে বেঁধে অভিনয় করে দেখায় সে–এক ডোমনির প্রেমের বিরহবেদনার আকুতি, ঠাঁট ঠমক, অভিসারে হাঁটার ছন্দ, ব্রীড়া ও ছলাকলা। তার এই বিশেষ প্রতিভার উৎসও কিছুদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করল ছেলেরা: ঠোঁটের নীচে গুলিপাকানো গঞ্জিকার পাতা, যা সে বনের মধ্যে থেকে সংগ্রহ করে।
.
আশ্রমিকের সংখ্যা আর বাড়েনি, কিন্তু কিছুদিন ধরে সাপ্তাহিক সিধের চালে টান পড়ছিল। একদিন ভোরবেলায় গোবর্ধন ছেলেদের জানালো, চাল চুরি হচ্ছে। তার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। আগের দিন গভীর রাতে সে নাকি দেখেছে বিচিত্রদর্শন দুটি প্রাণী ছাউনির একপাশে বস্তা থেকে চাল কোঁচড়ে ভরে নিয়ে যাচ্ছে।
‘কীরকম বিচিত্রদর্শন?’ নুটু জিজ্ঞেস করে।
‘মানুষ আর হনুমানের মাঝামাঝি গো!’ গোবর্ধন বলে।
এই আষাঢ়ে গল্প শুনে ছেলেরা হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না। এই বিজন বনে কেউ নিয়ম করে রোজ রাত্রিবেলা কয়েকমুঠো চাল চুরি করতে আসবে? তাও আবার মানুষ নয়, কোনো মনুষ্যেতর প্রাণী? তাদের নাকি আবার কোঁচড়ও রয়েছে? এ কেবল গোবর্ধনের গঞ্জিকা-সিঞ্জিত কল্পনাই নয়, তারও অধিক কিছু। গোবর্ধন কি চোর?
সর্দারপোড়ো নুটু বলে— ‘তুই পৈতে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর, যা বলছিস সব সত্যি!’
গোবর্ধনের আতঙ্কবিহ্বল মুখে অপমানের রেখা ফোটে। পৈতেটা তর্জনিতে জড়িয়ে নিয়ে আহত স্বরে বলে— ‘সত্যি সত্যি সত্যি! আমি কি মিছা কইছি?’
গোবর্ধনের নাট্যপ্রতিভা ছেলেরা দেখেছে, তার কথা সত্যি না মিথ্যা সে বিচারে কেউ গেল না। কিন্তু চালের বস্তাটা ওরা নিজেদের ছাউনিতে এনে রাখল। পরদিন ভোরে উঠে ছেলেরা দেখল গোবর্ধন ওর কাপড়ের পুঁটুলি বাঁধছে, চোখেমুখ ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছে। জিজ্ঞেস করতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল—‘মুই আর ইখানে থাকবুনি গো, মুই চলি যাবু।’
জানা গেল, এদিনও ভোরের আলো ফোটার আগে ওরা এসেছিল। এবার দুজন নয়, তিনজন। এবং ওরা মনুষ্যেতর কোনো প্রাণী নয়, প্রেত। পাকশালের ছাউনিতে কোনো খাদ্যদ্রব্য না পেয়ে ওরা মাটি শুঁকে শুঁকে যেখানে ভাতের ফ্যান ও রান্নার উচ্ছিষ্ট ফেলা হয় সেখানে যায়, তারপর উবু হয়ে বসে দুহাতে তুলে নিয়ে খেতে থাকে। মাছখোর মেছোপেতনি, এঁটোপেতনি, খড়ি মড়ির কথা সবাই জানে। কিন্তু এরা কোনো নতুন প্রেত-পেতনি।
ওর কথার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে পাঁশতলায় গর্তর ধারে। চারদিকে ছড়ানো ফ্যান আনাজের খোসার মাঝে শীর্ণ লম্বাটে মানুষের মতো পায়ের ছাপ। গোবর্ধনের মুখে এক রা— ‘মুই আর ইখানে থাকবুনি গো, বনের মধ্যে ইটপাথরের পাঁজায় ভূতপেতনি আছে!’
বুনোরাম আশ্রমে ফিরে সব শুনে ছেলেদের তিরস্কার করলেন। প্রতিদিনের উচ্ছিষ্ট ভাতের ফ্যান, তরকারির খোসা ইত্যাদি গর্তে ফেলে ভালো করে মাটি চাপা দেবার কথা অনেকবার বলেছেন তিনি, কিন্তু ছেলেরা সেটা কখনোই ঠিকমতো পালন করে না। গাজির বাগানে নানান ধরনের বন্যজন্তু আছে, উচ্ছিষ্টের লোভে তাদের আসা কিছুই বিচিত্র নয়।
বুনোরামের আশ্বাস পেয়ে গোবর্ধন চলে যাবার সিদ্ধান্ত বদলাল। ঠিক হলো দুজন আশ্রমিক পালা করে রাত পাহারা দেবে।
সেদিন রাতে নুটু আর ডোঙা বসল পাহারায়। দুজনেরই হাতে লোহার ফলা বসানো লাঠি, এছাড়াও নুটুর হাতের মুঠোয় সীসের জালকাঠি। বলা তো যায় না, যদি সত্যিই ভূতপ্রেত হয়?
রাত গভীর হলো, বনে নানান পোকাদের ধ্বনি তীব্রতর হলো, শেষ রাতে পাতার আড়াল থেকে পলকা চাদের আলো ফুটল। ঝিমুনিতে দুজনের চোখের পাতা লেগে এসেছিল, হাওয়ায় শুকনো পাতা সরার মতো একটা শব্দে জেগে উঠে ওরা দেখল দুটি ছায়ামূর্তি— অনেকটা যেন ভাল্লুকের মতো সামনে ঝুঁকে এসেছে, কিন্তু শীর্ণকায়, মাটিতে সামনের পা না ছুঁইয়ে আশ্রমের আশেপাশে ইতিউতি খুঁজছে।
পাঁশতলায় গর্তটা ভালো করে বোঁজানো হয়েছিল, বুনোরামের নির্দেশে সেদিনের সব উচ্ছিষ্ট নদীতে ফেলা হয়েছিল। দুই মূর্তি কিছু না পেয়ে ছাউনির সামনে ঘাসজমিতে এসে দাঁড়ালো, চাঁদের আলোয় মাটিতে ছায়া পড়ল। ওরা মানুষই, তবে প্রায় জীবন্ত নরকঙ্কাল! পুরুষ নাকি নারী বোঝা যায় না, পরনে নামমাত্র ত্যানা, দুজনেরই মাথার পাতলা কয়েকগাছি চুল কাঁধ অব্দি নেমেছে, দেহদুটি কোমর থেকে সামনের দিকে বেঁকে এসেছে।
সারা দেহ ঘামে জবজবে হয়ে ভিজে উঠেছে, টের পেল ডোঙা। পাশেই ঝিঁঝিপোকার মতো কিটকিট-কিটকিট শব্দে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নুটুর দাঁতে দাঁতে শব্দ হচ্ছে। আর্দ্র ঘাড়ে নিশ্বাস পড়তেই চমকে উঠে ডোঙা দেখে, গোবর্ধন কখন নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে ওদের ঠিক পেছনে এসে পড়েছে। ওর বিস্ফারিত চোখদুটো ছাউনির ভেতরে চাঁদের ক্ষীণ প্রভায় চিকচিক করছে। ইতিমধ্যে বনের ভেতর দিকে ফিরে যেতে শুরু করেছে দুই প্রাণী।
‘চলো, ঠাকুর!’ গোবর্ধন ফিসফিসিয়ে বলে।
নুটু ও ডোঙা দুজনেই চলচ্ছক্তি হারিয়েছিল। কিন্তু গোবর্ধনের কথায় বাধ্য হয়ে উঠে সড়কি বাগিয়ে ধরে ওদের পিছু নিল। গোবর্ধনের চোখেমুখে দপদপ করছে অদ্ভুত কৌতূহল, আগের সেই ভয়বিহ্বলতার লেশমাত্র নেই।
অন্ধকার বনের মধ্যে গাছের আড়ালে কখনো হারিয়ে যায় দুই মূর্তি, কখনো দূরে ফুটে ওঠে। চাঁদের আলোয় মনে হয় যেন ছায়া জমিয়ে তৈরি। নুটুর এলোমেলো পায়ের নীচে শুকনো ডাল ভাঙে, সেই শব্দে নিস্তব্ধ বনভূমি জেগে ওঠে। ডোঙা পায়ের খড়ম খুলে হাতে নেয়। ছায়ামূর্তিরা পেছনে ফিরে তাকায় না। ওদের অনুসরণ করে ক্রমশ বনের মধ্যে এক অজানা অঞ্চলে এসে পড়ে গোবর্ধন, ডোঙা আর নুটু।
এক স্থানে ভূমি পিরিচের মতো ঢালু হয়েছে, অনেকটা এলাকা নিয়ে প্রাচীন বট মোটা মোটা ঝুরি নামিয়েছে। তার নীচে ছোটো ছোটো তিনটি আগুন ঘিরে চোদ্দ-পনেরোটি কঙ্কালসার মানুষ, কয়েকটি শিশুও রয়েছে বাদুড়ের মতো, করোটিতে বিস্ফারিত চোখ, পাঁজরে ঝুলন্ত চামড়া চিবোচ্ছে দেখে বোঝা যায় নারী। উবু হয়ে পাছা পেতে বসে আছে ওরা, হাঁটুর ওপরে রাখা বিশীর্ণ হাত। কেউ কেউ পাতার স্তূপে পাশ ফিরে কুন্ডলী পাকিয়ে ঝিমোচ্ছে। এতগুলো মানুষ, কিন্তু জায়গাটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ। আগুনে ডালপাতা পোড়ার শব্দও শোনা যাচ্ছে দূর থেকে।
দুই ছায়ামূর্তি এসে দলে যোগ দিতে যেন বাতাসে মর্মরধ্বনি বয়ে গেল। কয়েকজন মাটি ছেড়ে উঠে অতীব ধীর গতিতে হাত পা নেড়ে, বুঝি দেহের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে, এগিয়ে গিয়ে ওদের ঘিরে ধরল, হাত বাড়িয়ে ওদের ছুঁতে লাগল। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না, শিশুরাও কেউ কেঁদে উঠল না।
ডোঙা শরীরে এক বিচিত্র কাপুনি অনুভব করে। ভয় নয়, এক বিচিত্ৰ লজ্জা আর গ্লানি। অদৃশ্যপূর্ব যা কিছু প্রত্যক্ষ করার অনুভব, এক অভিশাপ যা নির্দিষ্টভাবে মনুষ্যজাতির, যা ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকে কঙ্কালসার দেহগুলোয়, যা বুকের পাঁজরে বিশুষ্ক চামড়ার থলি থেকে চুঁইয়ে পড়ে শিশুর ঠোঁটে, যে অভিশাপের বীজ পোঁতা হয় ছাইচাপা চুল্লির মতো জরায়ুর ভেতর।
গোবর্ধন কেবল অস্ফুটে বলে ওঠে— ‘হায় প্রভু জগন্নাথ! ওরা এখানেও আসিচি!’
*
‘এ এক এমন বিচিত্র দেশ, যেখানে প্রতি বিশ মাইল গেলে মানুষের মুখের ভাষা বদলে যায়। তারই মধ্যে এক অস্পষ্ট সেতুর মতো এই ভাষা। এই কাব্যের নন্দনতত্ত্ব আমার পূর্বে পঠিত ধ্রুপদী প্রাচ্য সাহিত্যের থেকে এতটাই আলাদা যে অভাবনীয়। সংস্কৃত কিংবা ফারসি কাব্যের মতো এ কোনো সূক্ষ্ম চর্চিত অলঙ্কার নয়, যা মানুষের মুখের ভাষা থেকে সচেতনভাবে বিচ্ছিন্ন, শত শত বছর ধরে যা অপরিবর্তিত, যেন ধাতুর ওপরে খোদাই করা বসন্ত বাগিচায় মৃদুমন্দ সমীর, আতর সুগন্ধী, সুরার বর্ণচ্ছটা, রাজপুরুষ নারী ও গজনিতম্বিনী অপ্সরা কিন্নরীর কাব্য নয়। এখানে ফুটেছে চলিষ্ণু জীবনের চিত্রকল্পমালা। জেলে মাঝি শিকারী শরকাটুনি শুঁড়ি রমণী – সাধারণ মানুষ। এবং তাদের নিত্যকর্মের কাজের ছন্দ ডোঙা বেয়ে শালুক বয়ে আনছে, বেতের ঝুড়ি বুনছে, ভাত আর সজিনা পাতা রান্না করছে, হরিণের পিছু পিছু চলেছে তীরধনুক হাতে, বন্য হাতি বশ মানাচ্ছে, ধুনুরি তুলো ধুনছে। এছাড়া নৌকা। কত যে গড়নের আকারের নৌকা, পাল তুলে দাঁড় বেয়ে ভেসে চলেছে জলে, যে জলের কত শত নাম— নদী খাল বিল হাওড় কাঁদর সোঁতা। এসবই ফুটেছে এমন এক ভাষায় যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার মতোই শুধু নয়, যেন জলের ভাষার মতোও। এই ভাষায় হুগলি নদীর জল কথা বলে পাড়ের সঙ্গে, দাঁড়ের সঙ্গে— যখন দিনের শেষে বজরা চেপে কলকাতায় ফিরি, আর অস্তগামী সূর্যের অনির্বচনীয় আলোয় ভরে ওঠে জল আকাশ, যে আলোয় কাতর কাব্যের লঘু চরণে গুঙিয়ে ওঠে নৌকার কাঠের জোড়, দড়িদড়া। সেই আলোয় বিধৌত ওরিয়েন্টাল সিনারি কাগজে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার সাধ্য কই আমার দেশের কোনো ওয়াটারকালারিস্টের?’
ঢোলা কুর্তাপাজামা পরেও হাঁটু ভাঁজ করে ভূমির ওপর বসা যত কঠিন, মনের ভাবনাগুলো গুছিয়ে অপ্রতুল বাংলায় পণ্ডিতের কাছে ব্যক্ত করা তার চেয়ে ঢের কঠিন। আক্সফার্দি তাই স্বদেশে তাঁর স্ত্রী আনা মারিয়াকে লেখা চিঠির কিছু কিছু অংশ তর্জমা করে শোনান।
তার অর্ধস্ফুট অর্থ ধৈর্যধরে বুঝতে চেষ্টা করেন বুনোরাম।
‘দেখ সায়েব, এই যে নৌকায় চড়ার কথা তুমি বলছ, আর এই কাব্যের যে নৌকা, সে দুটি কিন্তু আলাদা। সে এক গভীর সারাৎসার। এই চিত্রগুলোর অভিমুখ এক ধর্মবিশ্বাস, যা আমাদের সমাজে বয়ে চলেছে ফল্গুধারার মতো। এককালে সেটি ভূমির ওপর দিয়ে বইত, কিন্তু ভিন ধর্মের শাসক এসে পড়ায় সেটি ভূমিতে প্রবিষ্ট হলো।’
‘পণ্ডিত, তুমি কি তুরকানদের কথা বলছ?’
‘আমি দাক্ষিণাত্যর সেন রাজাদের কথা বলছি।’
‘তাই হবে। তবে এই কাব্য যতটুকু আমি তোমার কণ্ঠে শুনেছি, যা আনার টেনেছে, তা হলো সাধারণ মানুষের মুখের কথা, তাদের আবেগ কামনা, নিত্যকার জীবন পেশা সংস্কৃতি। তুমি কি জান, আমাদের দেশে ইদানীং উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ নামে কাম্বিয়া অঞ্চলের এক কবি এভাবে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় কাব্য রচনা করার কথা বলছে? কাব্যকে এলিট ড্রয়িংরুমের আদবকায়দা থেকে মুক্ত করে মাঠে ঘাটে উপত্যকায় খুঁজে বেড়ানোর কথা বলছে?’
আবার একদিন তিনি পুথিগুলো দেখতে চাইলেন।
‘কোন লিপিতে এগুলি রচিত, সেটা দেখতে আমার কৌতূহল সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে।’ আক্সফার্দি কাতর কন্ঠে বলেন। ‘একবারও চোখের দেখা দেখতে পারি না?’
এবারেও প্রথম দিনের মতোই হেসে ওঠেন বুনোরাম।–‘এর আগে এ দেশে যত শাসক এসেছে, কেউ মুখের কথায় বিশ্বাস করেনি। সকলেই লেখ্য রূপ দেখতে চায়, তোমার মতো। অথচ সত্যের কী পরিহাস দেখ সাহেব, লেখ্য রূপ অনিবার্যভাবেই নশ্বর। সে কেবল সত্যের অকিঞ্চিৎকর উপমান বই কিছু নয়। অথচ যা কিছু সত্য, শাশ্বত তা হলো বাক, ধ্বনি।’
বুনোরাম নিজের জিহ্বা প্রসারিত করে তর্জনি দিয়ে ইঙ্গিত করেন।—‘তার নিবাস এইখানে!’
বিচলিত হলেন ইউনুস আক্সফার্দি। মস্তক কিংবা বক্ষ নয়, পণ্ডিত এমন এক অঙ্গ নির্দেশ করলেন যা তাঁর দেশের সংস্কৃতিতে স্বাদ তথা ঔদরিকতার সঙ্গে যুক্ত।
‘তাছাড়া পুথিগুলি দেবনাগরীতে রচিত নয়, যে লিপি তুমি জানো, বুনোরাম বলেন। ‘এগুলি চাষানাগরীতে লেখা।’
বললেন বটে, কিন্তু পরদিন সকালের আহ্নিক সেরে আদিরামবাটিতে গেলেন। বহুকাল বাদে পুরোনো পাড়ায়— সেই চেনা গলিপথ, আমবন। পথের কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এসে গন্ধ শুঁকে চুপ করে গেল, ছেলের দল হা-ডু-ডু খেলা থামিয়ে দেখতে লাগল। পরনে আধময়লা কোরা ধুতির খুঁটটা কাঁধের ওপর ফেলা, এক মুখ ঘন চুলদাড়ি, দাড়িতে অল্প পাক ধরেছে, পায়ে অমসৃণ খড়ম, টান টান মেদহীন চেহারা। চিনতে পেরে জ্ঞাতিবাড়ির মেয়েরা গলবস্ত্র হয়ে এসে পদধূলি নিতে চাইল। বুনোরাম থামলেন না, কোনোদিকে দৃকপাত করলেন না। সোজা চলে এলেন আদিরামের মন্দিরে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘণ্টা বাজিয়ে ফুলচন্দনের গন্ধে ছায়াচ্ছন্ন বিগ্রহকে প্রণাম করলেন, তারপর সোজা চলে গেলেন টোলের বাড়ি। কোনোরকম ভূমিকা না করে রাজারামকে বললেন, ঘুঘুডাঙার সেই এগারোটি পুথি তিনি এবার নিয়ে যেতে এসেছেন।
‘পুথিশালার পশ্চিমের দেয়ালে ওপর থেকে তৃতীয় তাকে ওগুলি রেখে গিয়েছিলাম। যদি না কেউ ইতিমধ্যে সরিয়ে থাকে ওখানেই আছে।’
রামদেব গৃহত্যাগী হবার পর থেকে টোলের অবস্থা ভালো নয়। ছাত্র কমছে, এদিকে ইংরেজ সরকারের অনুদান নিতে শুরু করার পর থেকে সাতগাঁর নৈয়ায়িক সমাজে আড়াআড়ি বিভাজন ঘটেছে। ইতিমধ্যে রামদেবের আশ্রম সম্পর্কে নানান গুজব রাজারামের কানেও এসেছে। বহুদিন পর অনুজকে এই বেশভূষায় দেখে, তার এবাড়িতে আসার উদ্দেশ্য শুনে আচমকা রুষ্ট হলেন।
‘গাজির বাগানে তুমি কি আজকাল তবে রাখালবৃত্তি ধরেছ?’
‘এ কথা কেন?’ বুনোরামের ভ্রূ কুঞ্চিত হয়।
‘পুথি তো রাখালের পাচনবাড়ি! যে পণ্ডিত পুথির পাত না খুলে মুখ খুলতে পারে না তারই এসবে প্রয়োজন,’ রাজারাম ব্যঙ্গের সুরে বলেন। ‘তাছাড়া তুমিই না বলেছিলে সব তোমার স্মৃতিতে আছে? এবার কি তবে স্মৃতিবিভ্রম শুরু হলো?’
‘পুথিগুলি আমি একজনকে দেখাতে চাই।’
‘কে সেই ব্যক্তি? জানতে পারি?’
‘সে এক ফিরিঙ্গি সাহেব।’
‘মন্দিরের বিগ্রহের মতোই পুথি পবিত্র, বিধর্মীর স্পর্শে অশুদ্ধ হয়। আশাকরি একথা তোমায় বলে দিতে হবে না, রামদেব।’
বুনোরাম হাসেন। মুখমন্ডল দাড়িতে ঢেকে যাবার পর আজকাল তিনি হাসলে এক রহস্যময় অভিব্যক্তি ফোটে, তাতে বিশুদ্ধ আমোদ আর শ্লেষের অনুপাতটা ঠিক বোঝা যায় না।
‘ওগুলির প্রকৃত মূল্য ওই ভঙ্গুর তালের পাতে নেই, ওতে যা উৎকীর্ণ তাতে রয়েছে।’ বুনোরাম বলেন। ‘বীজের গোলায় শস্যদানার মতো বিততিতেই তার মূল্য বাড়ে। আর বিধর্মীর কথাই যদি হয়, শত শত বছর ধরে আদিরামবাটির যা কিছু যশ প্রতিপত্তি সেটা সম্ভব হয়েছে কারণ এই বংশের এক পুরুষ একজন তুর্কী শাসকের কাছে পবিত্র পুথি নিয়ে গিয়েছিলেন।’
তর্কে পরাজিত রাজারাম এবার নিষ্ঠুর হয়ে উঠলেন।— ‘অন্ন থেকে শুরু করে পুথিপত্র, সব কিছুর জন্যেই যদি এবাড়ির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় তাহলে বনের মধ্যে আশ্রম সাজিয়ে নাটক করার কী দরকার? ফিরে এলেই তো হয়!’
‘ওই এগারোটি পুথি আমার বিবাহের যৌতুক হিসেবে এই বাড়িতে এসেছে। আদরিণীর সঙ্গে তিনটে বছর ওগুলি সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল, আমার কাছে সেই স্মৃতির মূল্য রয়েছে। কথা দিলাম, এর পর আর এই বাড়ি থেকে কোনো কিছু নেব না। একটি শস্যদানাও না!’
পুথিগুলো ধুতির খুঁটে জড়িয়ে দুহাতে নিয়ে বেরিয়ে আসছেন, দেখেন গামছা আর জলের ঘড়া হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভুবনেশ্বরী। তাঁর পেছনে অন্যান্য কুলনারীরা।
কিন্তু শত অনুনয়েও ওঁকে এক পলের জন্যেও আটকানো গেল না, এমনকি জল স্পর্শও করানো গেল না। চোখের জলের ভেতর দিয়ে ঠাকুরপোর অপস্রিয়মাণ মূর্তি শেষবারের মতো দেখলেন ভুবনেশ্বরী।
.
মৎস্যভূমির উর্বর কৃষিজমি বেশিরভাগ ব্রহ্মোত্তর হওয়ায় নীল ও আফিমের ইংরেজ কুঠিয়ালেরা সেগুলি কব্জা করতে পারেনি। সাতগাঁ মন্বন্তরের করাল ছায়া থেকে মুক্ত ছিল বলা যায়। কিন্তু নদীর উজান পথে দুঃসংবাদ ভেসে আসছিল, আর ভেসে আসছিল মনুষ্য শবদেহ। আকাশে শকুন আর ভূমিতে শেয়ালের পাল দ্রুত বংশবিস্তার করল। ভেসে আসা মৃতদেহের টানে মধ্যরাতে তারা হুগলি থেকে সরস্বতীর পাড়ে যাওয়া-আসা করে গেরস্তবাড়ির বাগান উঠোনের ওপর দিয়ে। জনহীন পরিত্যক্ত বাড়িগুলো হয়ে ওঠে ওদের ডেরা। হেমন্তে ভাল ফসল উঠল সেবার, নদীগুলো আগেকার স্বচ্ছ অনাবিল রূপে ফিরল, তাতে ফের ভাসল নৌকা। আশ্রমিকেরা নদীপাড়ে ফিরল আহ্নিকে, অধ্যয়নে
রামনবমীর মেলা থেকে চাঞ্চল্যকর সংবাদ বয়ে নিয়ে নুটু সন্ধ্যার আগে আশ্রমে ফিরল: গোবর্ধন ব্রাহ্মণ নয়! এক ওড়িয়া জলের ভারী তাকে জানিয়েছে। সেদিন বুনোরাম টোলে ছিলেন না। সর্দারপোড়ো হিসেবে নুটু নিজেই বিচারের ভার নিল। প্রথমে হারীত আর গণশার সাহায্যে ওকে পাকড়াও করে আশ্রমের সামনে ঘাসজমিতে যজ্ঞিডুমুর গাছটার গায়ে ওরই একটি ধুতি দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল।
‘যদি বামুনপো হোস তবে এখনই গায়ত্রী মন্ত্র বল!’ নুটু আদেশ করল।
ভয়কম্পিত জড়ানো গলায় গোবর্ধনের উচ্চারণ ও প্রস্বর থেকে বোঝা গেল এই মন্ত্র সে কৈশোরে নয়, বয়সকালে কানে শুনে শিখেছে।
‘এই মন্ত্র তোকে কেউ দেয়নি, তুই চুরি করেছিস! ঠগ কোথাকার!’ চিৎকার করে উঠে নুটু পায়ের খড়ম খুলে গাছে বাঁধা অসহায় মানুষটিকে বেধড়ক মারতে শুরু করল। ইতিমধ্যে হারীত উনুনের পাশ থেকে বঁটি এনে গোবর্ধনের মাথাটা গাছের কান্ডে চেপে ধরেছে, আতঙ্কে পশুর মতো মরীয়া আর্তনাদ শুরু করেছে গোবর্ধন। ছেলের দল একই সঙ্গে উল্লসিত ও আতঙ্কিত হলো। হারীতের হাত থেকে বঁটিটা ছিনিয়ে নিয়ে গোবর্ধনের মাথার পেছনে পুরুষ্টু শিখাটি কেটে দুই আঙুলে দোলাতে দোলাতে নুটু বলল–
‘তোমরা এবার বলো, এই প্রতারক নরকের কীটকে আমরা কী শাস্তি দেব?’
‘যে জিভে ও গায়ত্রী মন্ত্র কলুষিত করেছে সেই জিভটা কেটে ফেলা হোক গণেশ বলল।
‘তার আগে যে হাতে আমাদের ভাত রেঁধে খাইয়ে জাত নষ্ট করেছে সেই হাতদুটো কেটে নেওয়া হোক!’ হারীত বলল।
আতঙ্কে মূহ্যমান গোবর্ধনের কোমরে ধুতির কসি আলগা হয়ে লুটোচ্ছিল, ওর রোমহীন সুগোল রমণীসুলভ উরু বেরিয়ে পড়েছিলে। সেদিকে তাকিয়ে নুটুর চোখে বিচিত্র ঝিলিক খেলে গেল, বলল
‘ওসব না করে চলো আমরা ওকে দেগে দিই, যেভাবে ক্রীতদাসদের দাগানো হয়!’
নুটুর মুখ থেকে কথাগুলো খসেছে কি খসেনি, হারীত ছুটে গিয়ে চকমকি ঠুকে উনুনে কাঠ জ্বালল, গোবর্ধনেরই লম্বা লোহার সাঞ্চাটা তাতিয়ে লাল করে নিয়ে এল। নুটু গাছের কান্ডে ধুতির ফাঁসে বাঁধা গোবর্ধনের কোমরটা দুহাতে খামচে ধরে ওকে সপাটে ঘুরিয়ে দিয়ে ওর কসির কাপড়টা টান মেরে খুলে দিতেই যজ্ঞিডুমুরের ঘন ছায়ায় ফুটে উঠল পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুগোল মসৃণ পশ্চাদ্দেশ। শিখা-কাটা মাথাটা ওপর দিকে তুলে গোবর্ধন তীব্র আর্তনাদ করে উঠতে ধ্বংসস্তূপের দিক থেকে বাদুড় উড়ল ঘনায়মান সন্ধ্যার আকাশে।
হাতে গামছা জড়িয়ে নিয়ে তপ্ত সাঞ্চার হাতলটা ধরেছে নুটু, ওর সামনে এসে গোবর্ধনকে আড়াল করে দাঁড়াল ডোঙা শর্মা।
‘এই তামাশা বন্ধ কর! গুরুদেব ফিরুন, তিনিই ঠিক করবেন ওর কি শাস্তিবিধান হবে!’
তপ্ত সাঞ্চা হাতে নুটুর বন্য চোখদুটো দপদপ করছে নিষ্ঠুর রিরংসায়। হিসিয়ে উঠল সে–
‘সরে যা, ব্যাটা দোনো! এই পাপিষ্ঠের জন্য আমাদের কী ক্ষতি হলো তুই তার কী বুঝবি? সরে যা, নয়তো তোকেও দেগে দেব!’
‘অব্রাহ্মণকে শিক্ষা দিতে গিয়ে তুই ব্রাহ্মণের গায়ে হাত তুলবি?’ ডোঙা পরনের ধুতিটা মালকোঁচা মেরে বেঁধে নেয়। ‘সাহস থাকে তো করে দেখা দিকি?’ নুটু থমকে গিয়ে ডোঙার চোখের দিকে তাকায়, ওর পেশল দাঁড়-টানা বাহুর দিকে তাকায়। উত্তপ্ত পরিস্থিতি অনিশ্চয়তায় দুলতে থাকে তাপবাস্পের মতো। আশ্রমিকেরা বিভ্রান্ত, চঞ্চল। এরই মধ্যে সবচেয়ে মুখচোরা আর শান্ত স্বভাবের মনু বলে ওঠে–
‘গুরুদেব শিখিয়েছেন সব দিক বিচার না করে কোনো কর্মে না ঝাপ দিতে। তিনি এও বলেন, বনের ভেতর কোনো প্রাণীর অনিষ্ট না করতে।’
‘তুই তো নাকে ত্যানা ঝোলানো নেড়েগুলোর মতো কথা কইছিস!’ নুটু বলে উঠল। তারপর কোমর বাঁকিয়ে মনুর কন্ঠস্বর নকল করে রঙ্গ করল— ‘পিপীলিকা মহোদয়, আপুনি এই দূর্বাদল হইতে গাত্রোত্থান করিলে আমি এই স্থলে বিষ্ঠাত্যাগ করিয়া বাধিত হই!’
নুটুর রঙ্গ দেখে কেউ হাসল না। গণেশ বলল—‘দোষীকে দোষ স্বীকারের সুযোগ দিতে হয়, শাস্ত্রে বিধান আছে। গোবর্ধনের কী বলার আছে সেটা বরং শোনা যাক আগে।’
অন্যেরা এই প্রস্তাবে সায় দিল। গোবর্ধনের মরীয়া আর্তনাদটা ফুঁপিয়ে কান্নার হিক্কায় ঝিমিয়ে আসার মধ্যবর্তী অবসরে ছেলের দল ডুমুর গাছের নীচে ঘনায়মান অন্ধকারে ঘাসের ওপর বসল।
কান্না থামলে বাহুতে চোখ মুছে ধরা গলায় গোবর্ধন বলতে শুরু করল ওর জীবনকাহিনি। তার আগে ওর মসৃণ উরু বেয়ে নামল মূত্রের ধারা।
.
মি’লেডি, জাতিতে হালুয়াই গোবর্ধন জলেশ্বরের এক মিঠাই বিক্রেতার পঞ্চম সন্তান। ছানাপোড়া, মালপুয়া, বালুসাই ইত্যাদি তৈরি করে বিক্রি করাই ওদের বংশানুক্রমিক পেশা। জমিজমা কিছু নেই। জলেশ্বরে ওদের কোনো স্থায়ী দোকান ছিল না। বিভিন্ন পার্বণে মেলায় ওর বাপঠাকুর্দারা অস্থায়ী খড়ের দোকান দিত। কলকাতায় কোম্পানির শাসন শুরু হবার পর ওদের এলাকা প্রেসিডেন্সির আওতাভুক্ত হলো, পুরোনো জমিদারের নায়েব চলে গিয়ে নতুন খাজনাদার এল, সোম্বচ্ছর মিঠাই বেচে প্রাণধারণ কঠিন হয়ে পড়ল। আগে কটক থেকে যে সস্তা লাল চিনি আসত তার আমদানি বন্ধ হলো, কলের চিনিতে চড়া শুল্ক চাপল। তার চেয়ে বড়ো কথা, সাধারণ মানুষের পক্ষে দুবেলা অন্ন যোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ল। মিঠাই খাবে কি? চাষির ঘরে অন্নের দানা নেই। ইংরেজ কোম্পানি নতুন মোরামের রাস্তা বানিয়ে সারি সারি গাড়ি বোঝাই করে শস্য নিয়ে যাচ্ছে পল্টনের জন্য।
ফাল্গুনের গোড়ায় হিমের দাপট কমতে গোবর্ধন ঘর ছাড়ল, শস্যবোঝাই গরুর গাড়িগুলো যে পথে গিয়েছিল সেই পথ ধরে চলল। সে শুনেছে, দেশের সব চাল চলেছে কলকাতার গড়ে, বিরাট যুদ্ধের জন্যে গোরা পল্টন সাজছে। এও শুনেছিল, ওই আজব শহরে কেউ খালি পেটে থাকে না। বালেশ্বর ছাড়িয়ে যাবার পরেই বাংলার তীর্থযাত্রীদের পুরীধামে যাবার প্রাচীন পথটা পেয়ে গেল গোবর্ধন। কিছুদূর অন্তর রাতে থাকার চটি রয়েছে, সে সবই বন্ধ। পথের ধারে সারি দিয়ে পিপুল অশ্বত্থ গাছগুলি নিষ্পত্র, ছায়াহীন, মাঝে মাঝে দুপাশে রুক্ষ বন। এগারো দিন ধরে চলার পর ক্রমশ আগাছায় ভরা উনো ফসলের ক্ষেত আর জনহীন গ্রাম দেখা যেতে লাগল। এক সন্ধ্যার আগে একটি শিবমন্দিরের চাতালে আশ্রয় নিতে গ্রামের একমাত্র বাসিন্দা এক বৃদ্ধ জানালেন, দেশে অনাবৃষ্টি লেগেছে, আকাশ থেকে বালি বৃষ্টি হচ্ছে, নদীর জল গন্ধকে হলুদ হয়েছে, মাটি তেতে উঠে ফলের গাছ মরে যাচ্ছে।
আরও পাঁচদিন ধরে পরিত্যক্ত শিয়াল-ডাকা জনপদ পেরিয়ে, কদাচিৎ প্রান্য মানুষের দয়ার ভিক্ষা দুমুঠি খই মুড়ি খেয়ে, বনের কুল খেয়ে, জ্বরে উদরপীড়ার কাঁপতে কাঁপতে গোবর্ধন নদীর ধারে এসে পড়ল। এককালে কলিঙ্গ রাজ্যের পূর্ব সীমানা নদী দিয়ে ঘেরা ছিল, সে পিতামহের মুখে শুনেছে। এক মাঝি নদীটির নাম বলল গঙ্গা। বাঁকা চাঁদের মতো তার পাড় জুড়ে এক আশ্চর্য শহর–প্রশস্ত বীধি, গির্জা, ঘড়িঘর, নাবিক বণিকদের আমোদপ্রমোদের সরাইখানা, সুরম্য প্রাসাদ কলের বাগানে ঘেরা। বিশাল পাথরের গড় জলের ওপর ভেঙে পড়েছে।
‘কলকাতা! কলকাতা!’ গোবর্ধন বার কয়েক নামটা আওড়ালো। চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছে তার। পথে পথে ঘুরে বেড়ালো সে, স্বজাতির লোক খুঁজতে লাগল, যাতে এই আশ্চর্য শহরে টিকে থাকার সুলুক জানা যায়। কোমরে তরোয়াল গোঁজা নীল উর্দিপরা পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে রাজপথ ছেড়ে গলির ভেতরে ঢুকে পড়ল। ফিরিঙ্গিদের ছিমছাম এলাকা ছাড়িয়ে গরিবগুর্বো নেটিভদের খড়-টালির চালে ছাওয়া পাড়ায় এসে পড়ল। সেখানে পথের মোড়ে একদল ভিখারি গোছের পুরুষনারী, সকলেরই হাতে বাটি সরা, দুই ফিরিঙ্গি রমণীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ফিরিঙ্গিদের একজন বয়স্কা, অন্যজন তরুণী। দুজনেরই পরনে সাদা ঢোলা পোশাক, মাথায় নীল ঘোমটার মতো, গলায় পেতলের ক্রুশ চিকচিক করছে। ওদের সামনে একটি নীল-সাদা তিনচাকার গাড়ি, এনামেলের বালতিতে সাদা ঝোলের মতো পদার্থ থেকে ধোঁয়া উঠছে। তরুণীটি ভিখারিগুলোকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে আর বয়স্কা ফিরিঙ্গিনী ঢাকাগাড়ির ভেতর থেকে চৌকোনা রুটি আর বালতি থেকে হাতায় ভরে সেই ঝোল একে একে সবার বাটিতে ঢেলে দিচ্ছেন। নেবার আগে সব্বাইকে ডানহাত কপালে আর বুকে ছুঁইয়ে বলতে হচ্ছে—‘আইমে! আইমে!’ তারপরে বাটির ঝোলে রুটি ডুবিয়ে চিবোতে শুরু করছে তারা।
গোবর্ধন দৌড়ে গিয়ে নর্দমার ধারে কচুঝোপ থেকে পাতা ছিঁড়ে ভাঁজ করে ঠোঙা বানিয়ে ফিরিঙ্গিনীর সামনে এগিয়ে গিয়ে কপালে বুকে হাত ছুঁইয়ে বলল–‘আইমে! আইমে!’
এমন বিচিত্র স্বাদের ঝোল আগে কখনো খায়নি সে। ঝোলের মধ্যে কমলা সবুজ সব্জির টুকরোগুলোও অচেনা। তবু পেটে যেতে অনেকদিন পর খিদের আগুন প্রশমিত হলো।
গৃহহারা কুকুরের মতো শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ায় গোবর্ধন, নেটিভদের পাড়ায় গিয়ে স্বজাতির মানুষ খোঁজে, বিচিত্র পেশার মানুষজনকে দেখে, দিনে দুবার নির্দিষ্ট সময়ে— ‘আইমে’ ফিরিঙ্গিনীদের নীল-সাদা গাড়ির সামনে হত্যে দিয়ে সকালে খিচুড়ি বিকেলে রুটি-ঝোলের মহাপ্রসাদ খায়, রাত্রিবেলা নদীর ধারে ঘাটের সিঁড়িতে শুয়ে ঘুমোয়। রাতে নদীর বুকে স্নিগ্ধ হাওয়া দেয়, মাছধরাদের ডিঙি থেকে গান ভেসে আসে।
একদিন মাঝরাতে জ্যোৎস্নায় ঘুম ভেঙে উঠে দেখল একটি জাহাজ চলেছে। ওপরে বিশাল খাঁচায় গাদাগাদি মানুষ— সকলেরই দড়িতে পা বাঁধা, খাঁচার বাইরে চাবুক হাতে পাহারা দিচ্ছে টুপি পরা ফিরিঙ্গিরা। ডেকে মশাল জ্বলছে, আকাশে ফটফটে চাঁদের আলো, মানুষগুলোকে প্রেতের মতো দেখা যায়। এতই অদ্ভুত সেই দৃশ্য যে ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গোবর্ধন মনে করতে পারে না সত্যি নাকি স্বপ্ন। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে লাঠি দিয়ে পাছায় খোঁচা মারছে দুজন পুরুষ, খালি- গা। দুজনেরই কাঁধে একটি করে চতুষ্পদের মুন্ডহীন স্ফীত ধড়, একজনের মুখে গোঁজা নিমের দাঁতন।
‘ইটো কী জীবো রে, বাণেশ্বর?’ নিমর্দাতন থুতু ফেলে শুধোয়।
বাণেশ্বর ওর রোমহীন দেহটা লক্ষ করে বলে— ‘শড়া শুশুক অছি!’
ওরা গোবর্ধনের ভাষায় কথা বলছে, স্বজাতি, তিনদিন ধরে গোটা শহর তন্ন তন্ন করেও যাদের সে খুঁজে পায়নি! জানতে পারে, এই শহরে ওরা অসংখ্য আছে— বালেশ্বর জলেশ্বর খুরদা কটকের মানুষ; জানতে পারে, ওদের কাঁধে মুন্ডহীন চারপেয়ের ধড়গুলো জলে ভরা চামড়ার ভিস্তি; ওরা দুজন ভিস্তিওয়ালা, রোজ সকালে ফিরিঙ্গি শহরে রাস্তা ধোয়ার কাজ করে; জানতে পারে, শহরটা ইংরেজদের কলকাতা নয়, এ হলো ফরাসিদের শহর, একটাই শহর কিন্তু আসলে দুটো শহর— ফিরিঙ্গিদের কোয়ার্সভিল আর নেটিভদের চাঁদেরডাঙা।
কলকাতা শহরটা নদীর অন্য পাড়ে, আরও পঁচিশ মাইল ভাটির পথে। এই পাড়ে পরপর ফিরিঙ্গিডাঙায় নানান দেশের ফিরিঙ্গিরা থাকে। তারা একে অপরকে সহ্য করতে পারে না, বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে, কিন্তু আবার একই দেবতা পুজো করে আর কাটুনিডাঙায় একই মাগীর ঘরে যায়। সুদূর জলেশ্বর থেকে কলকাতা যাবে বলে বেরিয়ে বেঠিক শহরে এসে পড়েছে গোবর্ধন, ওরা জানায়, কিন্তু আবার বেঠিকও নয়। তার কারণ এই শহরেও কেউ পেটে খিদে নিয়ে ঘুমোতে যায় না। তবে তার জন্য খাটতে হয় খচ্চরের মতো, বলদের মতো। নচেৎ জরিমানা, বেত্রাঘাত, এমনকি ওলন্দাজ জাহাজে গরু ছাগলের মতো খাঁচাবন্দি হয়ে বাটাভিয়ার খামারে দ্বীপান্তর।
জ্যোৎস্না রাতে নদীর ওপর সেই জাহাজটা তাহলে স্বপ্ন নয়? গোবর্ধন ভাবে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। এবং দুই ভিস্তিওয়ালার পরামর্শ মতো নদীর পাড় বরাবর রাস্তা ধরে দিনেমার আর্মানি ওলন্দাজদের এলাকা ছাড়িয়ে আরও উত্তরে সাতগাঁয়ে যায়। সেখানে ওর স্বজাতি আরেকটি বড়ো গোষ্ঠী আছে।
কলিঙ্গর রাজা নরসিংহদেব যেবার সাতগাঁ আক্রমণ করেন— বাংলায় সুলতানি আমল শুরু হবারও আগে তাঁর সঙ্গে যে বিপুল সৈন্যবাহিনি লোকলস্কর এসেছিল তারা অনেকেই এখানে থেকে যায়। ব্রাহ্মণেরা পাচকের বৃত্তি ধারণ করে, অন্যেরা জলবাহকের কাজ নেয়। ফিরিঙ্গিরা এসে জলের নল বসানোর পর তাদের পরের প্রজন্ম দক্ষ জলকলের মিস্ত্রি হলো। কিন্তু এতকাল বাংলায় থেকেও তারা শিকড়-বিচ্ছিন্ন হয়নি, বিয়ে করে ওড়িশায় তাদের দেশগ্রামে স্বজাতির মধ্যেই। সেখানেই স্ত্রী পরিবার রেখে আসে, বর্ষায় হেমন্তে ফসল রোয়া আর তোলার কাজে দেশে ফেরে।
সাতগাঁয় তারা বাঁশের বাঁকে বড়ো বড়ো তামার ঘড়া ঝুলিয়ে নদী থেকে দিনভর গঙ্গাজল টানে ব্রাহ্মণপাড়ায়। ব্রাহ্মণেরা হেগো পোঁদ ধোয়া ছাড়া সব কাজ গঙ্গাজলেই সারে। কিন্তু সে কাজ ফিরিঙ্গিডাঙার চেয়ে কিছু কম খাটুনির নয়, কাজে ফাঁকি পড়লে ফিরিঙ্গি চাবুকের বদলে আছে কাঁঠাল কাঠের ভারি খড়মের প্রহার। গোবর্ধন সাতগাঁ ছেড়ে আরও উত্তরে যায়, যেখানে গঙ্গা দুটি ধারায় ভাগ হয়েছে। ঘন বনের মধ্যে প্রাচীন গাছগাছালির ছায়ায় গাঁজার ঝোপ চিনতে ভুল হয় না তার। সেই আশ্চর্য চিরল পাতা ছিঁড়ে চিবোলে খিদেতেষ্টা লহমায় মিলিয়ে যায়, দেহ পালকের মতো হয়ে ওঠে, পা স্থির থাকে কিন্তু পথ চলতে থাকে, বনের ভেতর সরু পায়ে-চলা পথ ওকে বয়ে নিয়ে যায় যেখানে ভাঙা ছাতহীন মসজিদের চাতালে বসে সাদা জোব্বা পরা ধবধবে চুলদাড়িময় ফকির হাঁটু মুড়ে বসে প্ৰাৰ্থনা করছে, গাছে গাছে রক্তকণ্ঠী পায়রার ঝাঁক বকবকম করছে, বনতলে এক খাবলা কমলা সূর্যালোকের বিছানায় ছেয়ে এসেছে অসংখ্য সোনালি প্রজাপতি, নিয়ে যায় নদীর পাড়ে, যেখানে এক সন্ন্যাসী ও একদল বালক সুর করে মন্ত্রোচ্চারণ করছে। এ এক আশ্চর্য সজীব পুরাণকথার বন।
কিন্তু গোবর্ধন ক্রমশ বুঝতে পারে এসবই চিত্তবিভ্রম, চিরল পাতার কেরামতি। ধীরে ধীরে আচ্ছন্নতা গিয়ে পেটের মধ্যে খিদের আগুন ফিরে আসে দ্বিগুণ তেজে। এক পানসির মাঝিকে গাঁজার পাতা একদলা উপহার দিয়ে নদীর সঙ্গম পার হয়ে সে চলে যায় ত্রিবেণীতে।
ত্রিবেণীর সুপ্রাচীন মহাশ্মশানে দূরদূরান্ত থেকে মৃতদেহ আসে। শ্মশানে যাবার পথের দুধারে নানান ধরনের দশকর্ম সামগ্রী ও খাবারের দোকান। নিজের হালুয়াই জাতি পরিচয় দিয়ে মহাপাত্র নামের এক কটকি ব্রাহ্মণের খাবারের দোকানে কাজ পেয়ে যায় গোবর্ধন। কাঠ কাটা, উনুন ধরানো, ময়দার তাল মাখা, বাসন ধোয়ার কাজ, যা সে বাড়িতে থাকতে করেছে। মহাপাত্র লোক ভালো, জীবনে প্রথম তিনবেলা পেট পুরে খেতে পায় গোবর্ধন। উপরি পাওনা— দোকানে বসেই দুনিয়া দেখার সুযোগ। তীর্থস্থান হবার সুবাদে নিত্যদিন দুনিয়ার মানুষ এখানে আসে যায়। মহাশ্মশান হবার সুবাদেও আসে, ফিরে যায় না।
দেড় বছর এভাবেই চলল গোবর্ধনের দুনিয়া দেখা। একদিন ঘুমের মধ্যে মহাপাত্রর বুকের ধুকপুস্কি থেমে গেল। ওর জ্ঞাতিভাইরা দল বেঁধে এসে সৎকার করল, ঘাটে ক্ষৌরকর্ম করল। গোবর্ধনও ওদের দলে ভিড়ে গিয়ে মাথা কামালো, নাপিতকে বলল টিকির স্থানে চুলটা রেখে দিতে। সেটা দেখতে পেয়ে এক তুতো ভাই, যার কাছে কোনো সময়ে নাকি মহাপাত্র টাকা ধার করেছিল, গায়ে জল শুকোনোর আগেই সকলকে সাক্ষী রেখে নিজেকে দোকানের মালিক বলে ঘোষণা করল, গোবর্ধনকে বরখাস্ত করল, অশৌচ মিটলে ফের দোকান খুলবে বলে জানালো। সেই রাতে গোবর্ধন বন্ধ দোকানের চালের টালি সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখল ইতিমধ্যে মূল্যবান জিনিসপত্র সব সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টাকার বাক্সের ভেতর শুধু পড়ে আছে একগাছি পৈতে, পাথরের বাটিতে চন্দন, কয়েকটি সিঁদুর মাখা কড়ি। ভাড়ারে গিয়ে দেখল, ময়দা ঘি চিনির বস্তাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এক কোণে পড়ে আছে খুন্তি, ডাবু হাতা আর সাঞ্চা। গেরুয়া ছোপানো মহাপাত্রর একটা পুরোনো লুঙ্গিতে খন্ডা সাঞ্চা জড়িয়ে নিয়ে কপালে বোষ্টুমদের মতো চন্দনের রসকলি এঁকে পৈতেটা গলায় পরে নিল গোবর্ধন। রাতের অন্ধকারে ত্রিবেণী ছাড়ল।
