সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.৬
১২.৬
কাশীর হরিশচন্দ্র ঘাটে শাকম্ভরী দেবীর অন্ত্যেষ্টির সময় পরিবারের কেউ ছিল না। টেলিগ্রামে মৃত্যুর খবর আসার পর রামপ্রাণ গয়ায় গিয়ে তাঁর আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদানের সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই আর সেটা হয়ে ওঠেনি। ইতিমধ্যে তাঁর নিকটতম আরও দুই নারী প্রয়াত হয়েছে। গয়া হয়ে কাশী যাবার পরিকল্পনা করলেন; সেইমতো ব্রেক জার্নির টিকিট কাটা হলো, শুধু যাবার টিকিট।
সংসারে রামপ্রাণের সর্বশেষ কর্তব্য ছিল ছোটো ছেলে হেমন্তকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। কিন্তু ক্রমশই সেটি অসম্ভব হয়ে উঠল। পার্টি ছেড়ে আসার পর প্রথম দিকে হেমন্ত যখন ফোটোগ্রাফি নিয়ে মেতে উঠেছে, তখন একবার তিনি সরোজাকে বলেছিলেন, ডকবাজারে দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ওকে একটা ছবি তোলার স্টুডিও করে দেবেন।
‘তাহলে তোমায় রেডিও সারাইয়ের দোকানও নিতে হবে,’ সরোজা উত্তরে বলেছিলেন। ‘ঘড়ি সারাইয়ের দোকান, পাখা সারাইয়ের দোকানও নিতে হবে।’
কিন্তু বিকল যন্ত্রের কলকব্জা খুলে সেগুলি ফের আগের সংস্থানে বসানোর দক্ষতাই ভুলে গেল হেমন্ত, এক অলীক প্রযুক্তির মরীচিকার সন্ধানে যাত্রা শুরু করল। মস্কোর রাদুগা প্রেস থেকে জ্যোৎস্নাময়ের পাঠানো কল্পবিজ্ঞানের বইদুটো সাতগাঁয়ে এসে পৌঁছতে যতদিন লাগল, ততদিনে সে গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে আদিরামবাটির আশেপাশে তাকে উদভ্রান্তের মতো বিচরণ করতে দেখা যায়। একমুখ চুলদাড়ি, পরনে মলিন ধুতির কাছা লুটোচ্ছে, গলায় পৈতেয় বাঁধা হার্মাদি সিন্দুকের চাবি।
ওকে ওভাবে দেখে বিশুর মনে পড়ে যায় চিন্তামণির কথা। গামা হারিয়ে যাবার পর জ্যোৎস্না রাতে ইটবাঁধানো উঠোনে ওর খুরের শব্দ শোনা যেত বাড়িময়। হেমন্ত যখন আকাশের দিকে মুখ তুলে বিড়বিড় করে আর দাড়ি চুলকোয়, মনে পড়ে যায় শেষ বয়সে গঙ্গারামের কথাও। নির্জন দুপুরে আমপাকা রোদে বাড়ির পেছনে শিয়ালকাঁটার ঝোপে ওকে দেখা যায়, মাটিতে নীচু হয়ে কী যেন খুঁজছে।
সাতগাঁ ছেড়ে যাবার আগে রামপ্রাণ ৮৫৩টি কেস হিস্ট্রির খাতা নিজে হাতে পুড়িয়ে দিয়ে গেলেন। আরও কয়েকশো পুরোনো খাতা একটি চটের বস্তার মধ্যে পড়েছিল ফার্মেসিতে আলমারির মাথায়, ধুলো-পড়া ল্যাবরেটরির ফর্দ আর রসিদের স্তূপের নীচে চাপা পড়েছিল। কেস হিস্ট্রিগুলো সবই বহুকাল আগে মৃত মানুষদের। ওই খাতাগুলোর কথা রামপ্রাণের মনে ছিল না; কিংবা হয়তো ওগুলো আর নষ্ট করার প্রয়োজন বোধ করেননি। সেই খাতাগুলো উদ্ধার করেছে হেমন্ত। বহু বছর আগে মারা গিয়েছে যে মানুষেরা, তাদের অনুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করে তার ডেটাবেস ভরে তুলেছে জটিল সূক্ষ্ম অবিশ্বাস্য কলে, যাতে ধরা পড়বে সেইসব মৃতের আত্মাদের আত্মার বিকীরণ, যা নাকি এক বিশেষ তরঙ্গমাত্রায় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করছে দিবারাত্র। এজন্য বিশেষ কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ সম্প্রচার শুরু করেছে। রাধানগরের মনুখুড়ো যে বিচিত্র শঙ্কুর আকারের পাথরটা এনেছিল, যেটি শিয়ালকাঁটার ঝোপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সরোজা, সেই পাথরটা ওখানেই কোথাও পড়েছিল। ঝোপের ভেতর থেকে নিজস্ব কম্পাঙ্ক সৃষ্টি করে হেমন্তর সম্প্রচারে বাধা সৃষ্টি করছে এমন একটা সন্দেহের বশেই দুপুরবেলায় ঝোপঝাড়ে আঁতিপাতি করে খুঁজে চলে সে।
কোনো-কোনোদিন বিকেলবেলা খুঁজতে খুঁজতে সে চলে যায় ডকবাজারে।
‘পরাণ ডাক্তারের ছোটো ছেলেটা না?’ ওকে চিনতে পেরে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে ব্যাপারিরা।
রাস্তার পাশে চায়ের দোকান দিয়েছে নিবারণ। হেমন্তকে ডেকে এনে বেঞ্চিতে বসায়, ওর হাতে দেয় এক গ্লাস চা আর একটি কোয়ার্টার পাউন্ড পাঁউরুটি।
হেমন্ত প্রত্যাখান করে না। দেখলে মনে হবে, যে মানুষটা চায়ে পাউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছে আর যে মানুষটা অস্থির বিষণ্ণ চোখে কী যেন খুঁজে চলেছে, দুই ভিন্ন মানুষ। খেতে খেতে হাতের পাঁউরুটি শেষ হবার আগেই গেলাসের চা ফুরিয়ে যায়। এবং যেন এক বিস্ময়কর অতিলৌকিক কান্ড ঘটে গেছে, এভাবে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আধখাওয়া পাঁউরুটির দিকে তাকিয়ে হেমন্ত বলে ওঠে—
‘যাহ! কী হবে এবার? চা যে ফুরিয়ে গেল!’
নিবারণ বিষণ্ণ হেসে গেলাসে চা ঢেলে দেয় আবার, বারবার।
.
গয়ায় গিয়ে তাঁর জীবনে চারজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করলেন রামপ্রাণ। এক পুরুষ ও তিন নারী। সেখান থেকে গেলেন কাশীতে। কাশী থেকে বিশুকে চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি বাপ্পাকে পড়ে শোনালো ওর বিশুকা।
যে বয়সে মানুষ ইহজগতের মায়া কাটাইয়া পরলোকে যায়, সেই বয়সে আমি জীবনে প্রথমবার সাতগাঁর মৎস্যভূমি হইতে বাহির হইয়াছি। রেলগাড়িতে উত্তর ভারতের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেখিতে দেখিতে আসিলাম, পৌরাণিককালে এই অঞ্চল দিয়াই আদিরামবাটি বংশের আদি ব্রাহ্মণেরা সাতগাঁয়ে আসিয়াছিলেন, এ কথা ভাবিয়া রোমাঞ্চিত হইয়াছি। ইতিমধ্যে গত সপ্তাহে কনৌজে আমাদের আদিভূমিতেও ঘুরিয়া আসিলাম। সেখানে সুগন্ধীর কারখানায় দেখিলাম কীভাবে বিশাল বিশাল মাটির ভাঁটিতে দিবারাত্র কাঠের আগুনে আতর প্রস্তুত হয়। এই পদ্ধতি অনেকটা হোমিওপ্যাথি ওষুধ প্রস্তুত করার মতোই, কিন্তু আরও সূক্ষ্ম। কল্পনা করিতে ইচ্ছা হয়, ভবিষ্যতে হয়তো এমন উচ্চশক্তির ঔষুধ প্রস্তুত করা সম্ভব হইবে যাহা সেবনের বদলে আতরের মতো কেবল শুঁকিলেই তাহা মানব দেহে কার্যকর হইবে।
কাশীর বর্ণনা আর কী দিব? তুমি পূর্বে আসিয়াছ, তুমি জানো। কাশী শব্দের অর্থ যে দীপ্যমান আলোক নগরী, তাহা এখানে আসিবার পরদিন প্রত্যুষে উত্তরবাহিনী গঙ্গার বুক হইতে জলে প্রতিফলিত সূর্যরশ্মিতে উদ্ভাসিত লাল পাথরের ঘাট ও সৌধরাজি দেখিয়া প্রথম হৃদয়ঙ্গম করিলাম। কিন্তু শৈশবকালে টোলে মশাইয়ের কাছে কাশীপুরাণের বর্ণনা শুনিয়া কল্পনায় যে ছবিটি আঁকা হইয়াছিল, সেই নগরীর ছায়া খুঁজিয়া পাইলাম না। রামাচার্য যেকালে কাশীতে আসেন বিদ্যালাভের জন্য, সেই কালের পুকুর ও জলাশয়গুলি সবই বিলুপ্ত হইয়াছে। যে গোদাবরী দশাশ্বমেধ ঘাটের নিকট গঙ্গায় মিশিত, সেটি বর্তমানে গোধুলিয়া নামে রাস্তা হইয়াছে। তেমনই মন্দাকিনীর বর্তমান নাম ময়দাগিন। ইহারা কর্মব্যস্ত বাজার চৌক বই কিছু নহে। কাশী নগরীও ধ্বংস ও পুর্ননির্মাণ হইয়াছে, শহরের দুই প্রান্তে বরুণা ও অসি নদীদ্বয় শীর্ণকায় নৰ্দমামাত্ৰ। রামাচার্যের কালের আশ্রমকুঞ্জবহুকাল ধরেই সরু অলিগলির গোলকধাঁধায় পর্যবসিত হয়েছে।
কাশীতে আরও এক পক্ষকাল থাকিব, তারপর হরিদ্বার যাইব। সেই কবে হইতে হিমালয় আমায় ডাকিতেছে।
‘দাদু কি আর কখনো সাতগাঁয়ে ফিরবে না?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘ফিরবে, ফিরতেই হবে। এই জন্মে না হোক পরের কোনো জন্মে। এই মাটির টান ছেড়ে কোথায় যাবে? তাহলে শোন…’
সাতগাঁর হাওয়াতাতি বিশুকা গল্প বলে, সাতশো বছর আগের এক মানুষের গল্প।
সে অনেক কাল আগের কথা, দরপ খান তখনও এই মুলুকে আসেনি। সুদূর তুর্কিস্তানে জন্মেছিলেন সেই মানুষটি। কোনিয়া শহরে বিখ্যাত মুয়ালেম আহমদ ওয়াসাবির কাছে শাস্ত্রশিক্ষা নিলেন। যেদিন শিক্ষা সম্পূর্ণ হলো, ওয়াসাবি সাহেব তাকে উটের দুধ থেকে তৈরি ফিরিন সুলাচ নামে কোনিয়ার বিখ্যাত মিঠাই একদলা দিয়ে বললেন–
‘খাও! রোজ যেদিকে সূর্য ওঠে সেই দিক ধরে যাও। এতদিনে যা শিখলে সেই কথা মানুষের মাঝে প্রচার করতে করতে এগিয়ে যাও, যতদিন না এমন স্থানে এসে পৌঁছবে যেখানে মাটি মিষ্টি আর মোলায়েম, ঠিক এই ফিরিনের মতো।’
মুর্শিদের নির্দেশমতো একুশ মাস একুশ দিন একুশ প্রহর ধরে মধ্য এশিয়ার অগণন মরুভূমি গিরিপথ নদী অরণ্য পেরিয়ে, অনেক নগর সরাই বাজারে নানান গোত্রের মানুষের মাঝে কাটিয়ে অবশেষে সেই পুবের দেশে এসে পৌঁছলেন দরবেশ। দেশটার নাম বাংলা। এ এক আশ্চর্য দেশ। এখানে বাতাস বয় ঘুমন্ত শিশুর শ্বাসের মতো, চারদিকে যতদূর দেখা যায় মাইল মাইল সবুজ নদীবিধৌত তৃণভূমি। সেই তৃণভূমিতে হাঁটু মুড়ে বসে কিবলার দিকে মুখ করে প্রার্থনা সারলেন যুবক, ভূমি চুম্বন করলেন। কী আশ্চর্য, ঠোঁটে লাগা মাটির স্বাদ ফিরিনের মতো ঘন আর মিঠে। এখানেই আস্তানার খুঁটি গাড়লেন যুবক দরবেশ।
বাপ্পার মনে পড়ে যায় এই গল্পটা সে দমদমের বাসায় খোকাজেঠুর কাছে শুনেছে। সেই দরবেশের নাম ছিল হজরত শাহ জালাল, আর জায়গাটার নাম ছিল সিলেট। একই গল্প, জলে-জলে গল্পের নদী।
‘এই গল্প তুমি কার কাছে শুনেছ, বিশুকা?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘আলিসাহেব। এই দেশের মাটির টানে, বাতাসের টানে আলিসাহেব হিমালয় থেকে বারবার ফিরে আসে। তোর দাদুও ঠিক ফিরে আসবে।’
সন্ধ্যাবেলা আদিরাম মন্দিরের সিঁড়িতে বিশুকার পাশে বসে বাপ্পা গল্প শোনে। ছোটোবেলায় ঠিক এভাবেই বিশুকার দুপাশে বসতো সে আর তিতলি, দুজনের মাথা পেতে দিত বিশুকার দুই হাঁটুর ওপর। হঠাৎ কী মনে করে বাপ্পা নীচু হয়ে বিশুকার হাঁটুতে মাথা পেতে দেয় আগের মতো। সেই চেনা সরষের তেল আর ফুল-বেলপাতা মেশা গন্ধটা পায়। বাপ্পার চুলে বিলি কেটে দেয় বিশুকা।
সকালে মন্দিরে গিয়ে কুলদেবতা আদিরামকে প্রণাম করে দিন শুরু হয় বিশুর। চাতালে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে তিনবার মন্দির প্রদক্ষিণ করে, দেয়ালে কপাল ছোঁয়ায়। বছরের পর বছর প্রতিদিন নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে কপাল ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে পোড়ামাটির প্যানেলে সেই জায়গাগুলো মসৃণ আর তৈলাক্ত হয়ে গিয়েছে। শিশু বয়সে তিতলি বিশুকার কোলে চড়ে মন্দির পরিক্রমার সময়ে এক হাতে ওর চোখ চেপে ধরে হাতের কব্জি ধরে দেয়ালে চেপে ধরত। বিশুকা অন্ধের মতো তর্জনি বুলিয়ে বলে দিত—
‘আচ্ছা, এটা হলো মকরমুখী নৌকো, বহর সাজিয়ে বণিকের দল সাগরে যাচ্ছে… এই হলেন রাবণ, সন্নিসি বেশে সীতার পাতার কুটিরে এয়েছেন… এই যে আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজিয়ে ডোমের দল যুদ্ধ করতে যাচ্ছে…’
এরপর বিশুকা তার পুষ্যি দেবদেবীর জন্য ভোগ রাঁধবে, পুজোর উপাচার সাজাবে–ভদ্রকালীর রক্তজবা, নারায়ণ শিলার তুলসীপাতা চন্দনবাটা, বালগোপালের জন্য শিমুল তুলোর বিছানা, বৈশাখে শিবলিঙ্গের মাথায় তেকাঠিতে হাঁড়ি বেঁধে জল-ফোটা, আষাঢ়ে জগন্নাথের সর্দিজ্বরের পথ্য, সেরে উঠলে নতুন জামা পরিয়ে রথে চড়িয়ে মামাবাড়ি ঘুরিয়ে আনা। দিবানিদ্রার পর তাঁদের জাগিয়ে সন্ধ্যারতি দেয় বিশুকা। ডান হাতে প্রদীপ, চামরের ব্যাজন, বাঁ হাতে ঘন্টা ধরে নাড়ে। সেইসঙ্গে কব্জিতে দড়ি বেঁধে দেয়ালে ঝোলানো ডুগডুগিতে টান দিতে বেজে ওঠে। পিতল ঘন্টার টুনুনান্টাং ধ্বনি আর ডুগডুগির শব্দে বিগ্রহরা প্রীত হন শুধু তাই নয়, ধ্বনি তরঙ্গে বাতাসে রোগজীবাণু মরে–বিশুকা বলে–বাতাস নির্মল বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে।
একাদশীর সন্ধ্যাবেলা পুজো সেরে বাপ্পা আর কানাইকে ডেকে নকুলদানা দিচ্ছে, বাপ্পা বলল–
‘তোমার বা হাতটা নড়ছে কেন?’
সত্যিই বিশুকার বাঁ হাত যান্ত্রিক নড়ে যাচ্ছে সন্ধ্যারতির ঘন্টা নাড়ার মতো। স্থির হয়ে থামাতে চেষ্টা করে, পারে না। ডান হাত দিয়ে চেপে ধরলে থেমে যায়, কিন্তু হাতে একটা চাপ টের পায়। মনে হয় যেন হাতটার একটা স্বাধীন স্বয়ংক্রিয় সত্তা রয়েছে। ছেড়ে দিলে আবার নড়ে চলে, থামে না। মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখে নড়েই চলেছে হাতটা।
‘হায় আদিরাম, এ কোন পাপে হলো!’ অন্ধকারে ডুকরে ওঠে বিশু।
অষ্টধাতুর বালগোপালের নীচে পাওয়া সেই সুলতানি মোহরগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। দেবেন স্যাকরার কাছে বিক্রি করতে নিয়ে গিয়েছিল। তবে কি ভগবান পরীক্ষা করছিলেন? বাঁ হাতের এই বিচিত্র ব্যাধির বর্ণনা দিয়ে রামপ্রাণকে চিঠি লিখল বিশু। শেষ চিঠিটি তিনি ঋষিকেশের যে আশ্রম থেকে লিখেছিলেন, সেই ঠিকানায়।
সাতগাঁয় আমের মরশুম। প্রবাসীরা সন্তানাদি নিয়ে বাড়ি আসছে। তাদেরই সঙ্গে এল ছোঁয়াচে চোখের রোগ কনজাঙ্কটিভাইটিস, তার নাম নাকি— ‘জয় বাংলা’। জানা গেল, সীমান্ত অঞ্চলে শরণার্থী শিবির থেকে ছড়িয়েছে। এবার শরণার্থীরাও শিগগিরই হুগলি পেরিয়ে এপারে চলে আসবে—সবাই বলাবলি করতে লাগল —সাতগাঁর পোড়ো পরিত্যক্ত বাড়িগুলো দখল করবে। হেমন্তর ক্রিস্টাল রেডিওয় চুঁইয়ে আসে খবর, সীমান্তের ওপারে মুক্তিবাহিনির সঙ্গে খানসেনাদের প্রবল যুদ্ধ চলেছে। মাঝে মাঝে শোনা যায় এক পুরুষ নেতার বাঙাল উচ্চারণে বক্তৃতা। ডকবাজারের দেয়ালে আলকাতরার পোঁচড়ে কারা যেন লিখে গেছে–
‘আমারে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না!’
‘জয় বাংলা’ এল আদিরামবাটিতেও, কানাইয়ের চোখ রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠল। ছুটিতে সাতগাঁয়ে আসা জ্ঞাতিবাড়ির কচিকাচারা মন্দিরের আশেপাশে ছুটোছুটি করে খেলা করে। কানাইকে এমনিতেও ওরা খেলায় নেয় না,— ‘জয় বাংলা’ হবার পর ওকে অদ্ভুত বানিয়ে দিল। সন্ধ্যাবেলা বারান্দায় হোমটাস্ক করতে বসে কানাইয়ের যাবতীয় হতাশা আর ক্ষোভের নিশানা হয়ে ওঠে বাপ্পা। তুচ্ছ কারণে ঝগড়া করে, মুখ ভেংচায়, ছড়া কাটে–
দিনে মশা রেতে মাছি
এই নিয়ে কলকেতায় আছি!
বাপ্পাও নিরাপদ দূরত্ব থেকে গলার শির ফুলিয়ে, বাবার কাছে শেখা জ্ঞান ফলিয়ে তর্ক করে: কলকাতা শহরে দিনে মশা রাতে মাছি, বাড়ির থেকে কবরখানা বেশি, রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টে হাড়গিলেরা ওৎ পেতে থাকে পথচারীদের চোখ খুবলে নেবার জন্য, আকাশ থেকে পাখির গুয়ের মতো জাপানি বোমা পড়ে– এমনটাই বলে বটে সাতগাঁর লোকেরা। কিন্তু সেটা ভুল। কলকাতায় দিনের বেলাতেও মশা ওড়ে, কারণ শহরটা বাদাবন কেটে তৈরি হয়েছে, কিন্তু জাপানি বোমা পড়েছিল কেবলমাত্র যুদ্ধের সময়ে, আর তাতে কেউ মরেনি, আর হাড়গিলেরা সেই কবে হারিয়ে গিয়েছে শহর থেকে, আর ওরা শান্ত জমাদার পাখি হিসেবেই ছিল, কোনোদিন জ্যান্ত কোনো কিছু খেত না, আর মানুষের চোখ খুবলে খেত এটা ডাহা মিথ্যে কথা।
অত কথা শোনার ধৈর্য কানাইয়ের নেই। বিচিত্র উচ্চারণে নতুন ছড়া কাটে সে–
বাবু তো বাবু বাপ্পাবাবু কলকেতায় বাড়ি
বেগুনপোড়ায় নুন দেয় না যে বেটা সে হাড়ি!
এইসব ছড়া যে কানাই নতুনবউয়ের কাছে শুনে শিখেছে সেটা বোঝার মতো বয়স বাপ্পার হয়েছে। ওর সন্দেহ হয় এসবের সঙ্গে যোগ রয়েছে সেই দিনটার, যেদিন দাদু ওকে আর মাকে নিয়ে গিয়েছিল বড়ো বড়ো থামওয়ালা সেই বাড়িটায়। সেই দিনটার কথা আবছা মনে পড়ে; সেখানে অনেক মানুষের ব্যস্ততা, গাছের নীচে টাইপরাইটারের খটাখট শব্দ, আকাশি রঙের শার্ট আর ঢোলা পাজামা পরা একটা লোক ফোকলা দাঁতে বিচিত্র বাংলায় একটা টাইপ করা কাগজ থেকে লেখা পড়ে শুনিয়েছিল। দাদু আর মায়ের দেখাদেখি বাপ্পাও পাঁচ আঙুলে কালি লাগিয়ে ছাপ দিয়েছিল, তারপর মাথার চুলে ঘষে কালি মুছে নিয়েছিল।
সেই ঘটনার সঙ্গে মায়ের অন্ত্যেষ্টির ছাই ওষধিবাগানে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেবার কোনো সম্পর্ক আছে কী? সেটা কাউকে জিজ্ঞেস করেনি বাপ্পা। রামপ্রাণ সাতগাঁ ছেড়ে যাবার পর ওষধিবাগানে আগাছা বাড়ছে, নাগকেশরের ফল বেদির ওপর পড়ে ফেটে ছড়িয়ে আছে। শেষবার এসে আলিসাহেব যে গাছটা পুঁতেছিলেন সেটায় ফুল আসেনি এখনও। তবু বাগানে ঢুকে বেদির ওপর চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে। নাগকেশরের ডালে ঘুঘু ডাকে, জড়িবুটির ঝোপ থেকে তাজা গন্ধ আসে। মনটা হালকা হয়ে আসে, মনে হয় যেন মায়ের খুব কাছে চলে এসেছে।
বাগানের গেটের চাবি ভাঁড়ারের দরজার চৌকাঠের হুকে ঝোলানো থাকে, সেদিন দেখল নেই।
‘ওষধিবাগানের গেটের চাবিটা কোথায় গেল রে? তুই দেখেছিস?’ কানাইকে জিজ্ঞেস করল বাপ্পা।
‘কেন?’
‘আমি বাগানে ঢুকতে গিয়ে খুঁজে পেলাম না।’
‘বাগানটা তোর নিজের নাকি?’ হঠাৎ ঝাঝিয়ে ওঠে কানাই।
বাপ্পা রুখে ওঠে। —- ‘আমার না তো কি তোর?’
কানাই ওর দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকায়, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। তীক্ষ্ণ গলায় বলে–
‘এই বাড়িটা তোর বাপের জমিদারি নাকি!’
‘তুই আমার বাপ তুললি?’ নিজের কান দুটো তেতে উঠেছে টের পায় বাপ্পা।
‘বেশ করেছি।’ কানাই থুতু ছিটিয়ে বলে। ‘তোর বাবা তো পোস্টোকার্ডের জমিদার!’
বাপ্পা এক পা এগিয়ে এসে ওর বুকে সজোরে ধাক্কা দিতেই ছিটকে পড়ে যায় কানাই। উঠে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে নালিশ করতে ছোটে।
বাপ্পার মনে পড়ে, কিছুদিন আগে লুডো খেলতে গিয়ে বার বার ঘুঁটি কাটা যেতে অস্থির হয়ে গিয়ে লুডোর বোর্ড উলটে দিয়ে কানাই বলেছিল— ‘বাঙালের পো’। কিন্তু— ‘পোস্টকার্ডের জমিদার’ কথাটা ও জানল কীভাবে?
*
হাঁটতে হাঁটতে পর্তুগিজ গেট ছাড়িয়ে চলে যায় বাপ্পা। পথের ধারে শিমুল গাছগুলোয় তুলো ফুটেছিল কিছুকাল আগে, তার কিছু কিছু এখনও গাছে লেগে রয়েছে। বর্গিব্যাটারির বারুদঘরের পেছন দিকটা ভেঙে পড়েছে নদীতে। দুপুরবেলা ঘাটে লোকজন নেই, সকলে স্নান সেরে বাড়ি ফিরে গিয়েছে।
গরম বাড়তে সরস্বতীর শীর্ণ খাত জলে ভরেছে। সেদিন বিশুকা বলছিল, এবার যা গরম পড়েছে হিমালয়ের বরফ গলে নামছে। অনেক বছর আগে ঘাটের যে সিঁড়িতে শাকম্ভরী দেবীর অন্তর্জলীযাত্রা দেখেছিল, সেই সিঁড়ি ডুবিয়ে বইছে জল। খাতের বুকে জেগে-থাকা চরগুলো বেশিরভাগ ডুবে গেছে।
বাপ্পা শেষ সিঁড়িতে এসে বসে দুটো পা হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে দেয় জলে। শীতল অনুভূতি, নদীর অতল থেকে উঠে আসছে।
বিশ হাত দূরে একজন একটা কালো গোলাকার ভেলার মতো জিনিসের ওপর চিৎ হয়ে ভেসে আছে। তার মুখ আকাশে তোলা, চোখ বন্ধ, মাঝে মাঝে হাত দুটো জলের ওপর নাড়ছে মন্থর ডানার মতো। সূর্যের রশ্মি জলের ওপর চুর চুর হয়ে যেন লক্ষ লক্ষ হীরের প্রজাপতি দপদপ করছে ওকে ঘিরে।
আচমকা কাধের ঝটকায় দেহটা ঘুরে গিয়ে স্রোত কাটাতে থাকে, কালো গোলাকার জিনিসটা ভেসে আসে ঘাটের দিকে।
‘এই ধর ওটা!’ চিৎকার করে ওঠে মানুষটা।
একটি মোটরগাড়ির চাকার টিউব, তার গায়ে অসংখ্য তাপ্পি মারা; ঘাটের কোল ঘেঁষে ভেসে চলে যাবার আগেই ফের চিৎকার ভেসে আসে —- ‘ধর! ধর ওটা!’
বাপ্পা কিছু না ভেবেই গায়ের জামাটা খুলে ছুঁড়ে দেয় ঘাটের রানায়, জলে নেমে পড়ে দুহাত বাড়িয়ে টিউবটা টেনে ধরে।
দিদা মারা যাবার অনেকদিন পরে আবার অবগাহনের অনুভূতি। দেহের প্রতিটি কোষে ফিরে আসছে সেই স্মৃতি। টিউবটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে ভাটার টানে ঘাট ছেড়ে দশ-বারো হাত এগিয়ে যায়। পা দুটো ছুঁড়ে জল কাটে। স্রোতের হাতে আত্মসমর্পণ করতে শরীরটা হালকা হয়ে ভেসে ওঠে। এবারে টিউবটা বাম বগলের নীচে চেপে ধরে ডান হাতে স্রোত কাটায় বাপ্পা।
ইতিমধ্যে সাঁতরে এগিয়ে এসেছে সে, টিউবটা উলটো দিক থেকে ধরে ফেলে। জলের ওপর মুখ তোলে–
‘তুই তো দেখি ভালোই সাঁতার জানিস রে!’
সেই ছেলেটা! নীল চোখ, পাকা খড়ের মতো চুল, পাতলা ঠোঁট। ডান ভুরুর ওপর কাটা দাগ রয়েছে। মুখমন্ডলে জলের ফোঁটায় রোদ ঝলকাচ্ছে।
