সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.৬
১৩.৬
কানাই যেদিন কসবার বাসায় দেখা করতে এল, প্রথমেই যে জিনিসটি বাপ্পার চোখ টানল সেটি হলো ওর গাড়ি। লাল রঙের সুইফট ডিজায়ার। ঠিক এইরকম দেখতে একটি খেলনা গাড়ি ও খুব ছোটোবেলায় দেয়ালে ছুঁড়ত, যখন তিতলি আর বাপ্পা ভেতরবাড়ির বারান্দায় মাদুর পেতে বসে লেখাপড়া করত। সেই স্মৃতি আচমকা এত তীব্রভাবে ফিরে এল, বাপ্পার মনে হলো যেন সন্ধ্যাবেলার ঘুঁটে আর ধুনো পোড়ানোর গন্ধ নাকে ভেসে এল, পশ্চিমের খিড়কিতে কুয়োয় ব্যাঙের ডাক শুনতে পেল।
কানাইয়ের গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে স্টিকার—Hugli-Saraswati Heritage Initiative। কানাইয়ের পরনে ফ্যাব ইন্ডিয়ার কুর্তা, পোড়ামাটির লাল, দুই হাতের আঙুলে ছটি পাথর-বসানো আংটি, কাঁধে ডেমিলো চামড়ার ব্যাগ। আগে চুলে কালো রং করত, এখন সোনালি-বাদামি।
‘বেশিক্ষণ বসতে পারব না রে বাপ্পাদাদা।’ কুর্তার হাতা সরিয়ে সোনালি র্যাডো রিস্টওয়াচে তাকিয়ে বলল কানাই।–‘পাঁচটায় ফ্রেঞ্চ কনসাল জেনারেলের সঙ্গে মিটিং। কলকাতার ট্রাফিক সিস্টেমটা উচ্ছন্নে গেছে, সাতগাঁ থেকে আসতে পাক্কা তিনঘন্টা লেগে গেল।’
যে ন্যালবেলে অপ্রতিভ কানাইকে ছোটোবেলা থেকে বাপ্পা চিনত, সোফায় মুখোমুখি বসা প্রত্যয়ী, মোটাসোটা লোকটা সেই কানাইকে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এক জীবনেও মানুষের পুনর্জন্ম হয়। ভালোই হয়েছে। উজ্জ্বল মেধাবী সহোদরা থাকার ভার কানাই বয়েছে সেই ছেলেবেলা থেকে। তাছাড়া বাপ্পাকে যেমন বয়সের তুলনায় বড়ো দেখাতো, যে কারণে বারো বছর হবার আগেই টিকিট চেকার অভয়চরণ ফুল টিকিট দেখতে চাইত, কানাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল উলটো। বয়ঃসন্ধির কালে ওর গলা ভাঙেনি, দাড়িগোঁফ ওঠেনি। সেটা এক প্রকার লাঞ্ছনার পর্যায়ে পৌঁছত যখন নদীর ঘাটে, যৌথ পরিবারের আচার অনুষ্ঠানে এসে জ্ঞাতিবাড়ির মেয়েবউরা ওর সামনেই পোশাক বদলাতো।
ভেবেছিল নস্টালজিয়ার ফাঁদে পা দেবে না, কিন্তু ভেতরে উষ্ণ অনুভূতির ক্ষরণ এড়াতে পারে না বাপ্পা।
‘এক কাপ চাও খাবি না? আমার বাসায় তুই এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এলি।’
‘ওকে। কিন্তু শুধু চা।’
বাপ্পা নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের সরঞ্জাম আনছে দেখে কানাই সামান্য অবাক হলো, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। ফ্লাস্কে গরম জল রাখাই থাকে, একটি ছোটো কারাফে ঢালল বাপ্পা, কৌটো খুলে আড়াই চামচ গোপালধারা ফার্স্ট ফ্লাশ মেশাল। একটি প্লেটে ছটি জিরা কুকি সাজালো, সিঙ্কের ওপর থেকে দুটি কাপ তুলে সবকিছু ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে এল।
একটা কুকি তুলে নিয়ে দু হাতে ভাঙে কানাই।
‘তুই এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছিস বল তো?’
বাপ্পা সংক্ষেপে পরপর বলে যায়: ভোটার লিস্টে নামের পাশে D, ট্রাইবুনাল থেকে রেজিস্টার্ড ডাকে আসা চিঠি, ওর নামে নির্দিষ্ট অভিযোগের ফাইল। পোস্টকার্ডের কথাটা বলে না।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কানাই মন দিয়ে শোনে। তারপর বাঁ হাতে পাথর-বসানো আঙটি ডান হাতের আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে–
‘শোন বাপ্পাদাদা, নামের পাশে D থাকাটা কোনো ব্যাপার না। তারপরেও তুই ভোট দিতে পারবি। ব্যাপারটা বোঝ একটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নাগরিকত্ব বিভাগ, আরেকটা রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর। দুটোই ভারত সরকারের অধীনে কিন্তু আলাদা। এবং যে খুব তালমিল করে কাজ করে এমনও নয়। এই রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিস থেকেই ন্যাশানাল রেজিস্টার ফর সিটিজেন্স তৈরি হয়। যারা ডিলিস্টেড হয়, যাদের নাম এই তালিকায় থাকে না, এনআরসি সেক্রেটারিয়েট থেকে তাদের একটা করে রিজেকশান স্লিপ দেওয়া হয়। তালিকা তৈরির কাজ শেষ হলে স্বরাষ্ট্র দপ্তর রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নোটিফিকেশান বের করতে বলে। যতদিন না সেই নোটিফিকেশান বের হচ্ছে এই তালিকার কোনো আইনি বৈধতা নেই। তার আগে সেক্রেটারিয়েট ডি-লিস্টেড কাউকে রিজেকশান স্লিপ ইস্যু করতে পারেই না। তাছাড়া কেন কারোর নাম তালিকায় নেই রিজেকশান স্লিপে তার কারণ লেখা থাকে। সেটা হাতে পাবার পর যে কেউ ট্রাইবুনালে গিয়ে তার স্টেটাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানতে চাইতে পারে। তারপর কোর্টেও যেতে পারে।’
বাপ্পা ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে রাষ্টব্যবস্থার এই জটিল কলকব্জা বোঝার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়। এ ব্যাপারে কানাইয়ের জ্ঞান দেখে বিস্মিত হতে থাকে। মুখ ফুটে বলেও ফেলে সে কথা।
কানাই হাসে।–‘তুই ভুলে যাচ্ছিস বাপ্পাদাদা, আমি একটা ইলেকশান লড়েছি। শয়ে শয়ে এরকম কেস দেখেছি, বিভিন্ন টাইপের। সাধ্যমতো সাহায্যও করেছি।’ পরক্ষণেই গলায় উষ্মা ফুটিয়ে যোগ করে— ‘সবাইকে নয়, যে কেসগুলো জেনুইন শুধু সেগুলো। নথি জাল করে যারা দেশে ঢুকে সম্পদ ধ্বংস করছে তাদের প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি নেই। আমরা তাদের চাই না!’
এই উষ্মাকে পুঁজি করে ভোটে লড়েছিল কানাই; জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ‘আমার জিত নিশ্চিত ছিল, জানিস।’ বাপ্পার মুখ দেখে মনের কথা পড়ে নিয়ে কানাই বলে।— ‘প্রচার ঠিক পথেই চলছিল, জেলার দুই কুঁদুলে নেতা পিঠে ছুরিটা মারল।’
এই কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। কানাই টিকিট পেয়েছিল ভূমিপুত্র হিসেবে, সাতগাঁর আদি পাশ্চাত্য বৈদিক বংশের শেষ প্রতিভূ হবার সুবাদে। কিন্তু ভোটব্যাঙ্কে আড়াআড়ি বিভাজন আনার মতো যথেষ্ট পূর্ববঙ্গীয় ভোটার সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে নেই।
‘জিততে পারলে সাতগাঁর অতীত জৌলুস ফিরিয়ে আনতাম।’ দুই হাতের দশ আঙুল পরস্পরে ছুঁইয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে কানাই।
হাসি পায় বাপ্পার। মনে পড়ে যায় কীভাবে আর্কিওলজিকাল সার্ভের মন্দির অধিগ্রহণ আটকেছিল, সাংসদ তহবিলের টাকায় দেয়ালগুলো গ্র্যানাইট টালি দিয়ে মুড়ে দিয়েছিল। তিতলির কাছে, বাপ্পার নিজের কাছেও, সেটা ছিল আত্মীয়বিয়োগের মতো দুঃসংবাদ। আটকাতে পারেনি, দূর থেকে হাহুতাশ করেছে কেবল।
‘সাতগাঁর অতীত জৌলুস ফিরিয়ে আনতে গেলে প্রথমেই একটা মৃত নদীকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে, কানাই।’ বাপ্পা বলে।
‘এ তুই অধ্যাপকের মতো অ্যাকাডেমিক লাইনে কথা বলছিস!’ কানাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে শ্রাগ করে। ‘মধ্যযুগ ফিরিয়ে আনা কি আর সম্ভব? তবে আমার কিছু নির্দিষ্ট প্ল্যান ছিল।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে— ‘এখনও আছে, আর আমি সেই নিয়ে কাজ করে চলেছি।’
বিষয়ের পরিবর্তন কানাইকে উজ্জীবিত করে। সাতগাঁ নিয়ে ওর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলতে শুরু করে। মূলত ঐতিহ্যের সংরক্ষণ। হুগলি-সরস্বতী হেরিটেজ ইনিশিয়েটিভ নামে সংস্থা গড়ে ওঠার পর কানাই চারটি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে একটা মাস্টার প্ল্যান বানিয়েছে। ডেমিলো ব্যাগের ফ্ল্যাপ খুলে একগোছা ছাপানো কাগজ ব্রশিওর ইত্যাদি বের করে টেবিলের ওপর রাখে। কয়েকটি মানচিত্র, তাতে আঁকা দুটি নদী, ফোটোগ্রাফের কোলাজ। তার মধ্যে কয়েকটি প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ চিনতে পারে বাপ্পা। ডকবাজার, নদী, ম্যাওবেড়ালের গির্জা, ঘড়িঘর, পর্তুগিজ গেটের ছবি, ভিন্টেজ ফোটোগ্রাফের কোণে ছাপা Dufay’s Daguerreotype Studio। মার্টিন কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি গাঢ় উজ্জ্বল রঙে আঁকা, এক রূপকথার ভূমির ওপর দিয়ে তার যাত্রাপথের রেখাচিত্র।
‘কোনো জিনিসকে যতক্ষণ না সাসটেইনেবল করে তোলা হচ্ছে সে জিনিস টেঁকে না,’ কানাই বলে। ‘সাতগাঁ অঞ্চলটার এত কিছু রয়েছে। এত ইতিহাস, এত ভূগোল, এত রকমের সম্ভাবনা। তুই তো জানিস, বিশ কিলোমিটার লম্বা আর সাত আট কিলোমিটার চওড়া একটা অঞ্চলে পাঁচ-পাঁচটা ইউরোপিয়ান দেশের ট্রেডিং পোস্ট, আরও প্রায় চার পাঁচটা দেশের মানুষের ঘরবাড়ি ঘাট ভিলা গির্জা ব্যারাক কবরখানা। সারা পৃথিবীতে কোথাও এমন আর একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে? তুই বল?’
কানাইয়ের কন্ঠস্বরে কখনো রাজনীতিবিদ কখনো আবার সেলসম্যানের সুর ফোটে। ছাপানো কাগজগুলোয় এক বিশদ পর্যটন পরিকল্পনার রূপরেখা: হুগলির ধারে ইউরোপিয়ানদের পুরোনো ভিলাগুলো সারিয়ে হেরিটেজ হোটেল, হোমস্টে, আশেপাশের গ্রাম পরিদর্শন নৌকার মিস্ত্রি, মদ প্রস্তুতকারক শুঁড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পীদের গ্রাম, যারা শত শত বছর ধরে দুই নদীর মধ্যবর্তী এই অঞ্চলে এসে এক বিরল বিশিষ্ট বাণিজ্য বন্দর গড়ে তুলেছিল, সাতগাঁর সেই সবচেয়ে মহার্ঘ্য্য বস্তুটি যারা তৈরি করত মসলিন।
‘মাত্র একটি করে ইউরোপীয় দেশের শহর হয়ে গোয়া কিংবা পন্ডিচেরি যদি পর্যটনের এত বড়ো ব্যবসা করতে পারে, তাহলে এতগুলো দেশের চিহ্ন নিয়ে সাতগাঁ কেন পারবে না? ওদের মতো সীবিচ নেই মানছি, কিন্তু হুগলি নদীটা তো আছে। কলকাতা থেকে মোটরবোটে চেপে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আসা যায়। পিসাইরা এসে শুধুমুদু মাটির নীচে খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল। সাতগাঁর আসল সম্পদ মাটির নীচে নয়, মাটির ওপরে আছে।’
গ্রানাইট টালিতে মোড়া মন্দিরের ছবিটা বাপ্পার মনে বার বার ভেসে ওঠে। আর উলটোনো জাহাজের মতো নয়, ছবিতে পালক ছাড়ানো পাখির মতো দেখাচ্ছিল। রিক্ত, বোবা। প্যানেলে খোদাই কাহিনিগুলো ঢেকে গিয়েছে চিরকালের মতো। ওই কাহিনিগুলোর মধ্যে যে জড়িয়ে আছে আমাদের ফেলে আসা সাতগাঁ –বাপ্পা মনে মনে বলে–ওগুলো না থাকলে কোথায় ফিরব, কানাই? শাকম্ভরী দেবীর স্বপ্ন দেখা বন্ধ হবার পর রামাচার্যের বংশের কোনো পুরুষ যে আর ফিরতে পারেনি।
‘ইতিহাসের মরা খোলসের মতো একটা অঞ্চল, সেটাকে মিউজিয়াম বানাতে চাইছিস!’ মুখে বলে। ‘সেখানে আমার কি কোনো জায়গা আছে রে?’
‘অলওয়েজ!’ কানাই বলে। ‘ওটা তোরও বাড়ি।’
গাড়িতে ওঠার আগে চকিতে পেছনে ফিরে বলে–‘কিন্তু আসলে তুই তো হাফ ইমিগ্রেন্ট, তাই না? অর্ধেক অভিবাসী।’
‘অর্ধেক অভিবাসী?’
‘পিসাই ছিল পুরো অভিবাসী। তুই এপারে তোর মায়ের দিকের কাগজ দেখাতে পারছিস না। তার মানে তুই অর্ধেক অভিবাসী হলি কী না বল?’
কানাই উচ্চৈঃস্বরে হেসে কাঁধে হাত রাখে। বাপ্পার কাঁধটা অচেতনেই শক্ত হয়ে ওঠে, মনে পড়ে যায় কতকাল আগে ওর মুখে শোনা সেই কথাটা— ‘তোর বাবা তো পোস্টকার্ডের জমিদার!’
এতক্ষণে পোস্টকার্ডের কথাটা পাড়ে বাপ্পা। পুরোটা নয়, শুধু এমন একটা পোস্টকার্ডের যে অস্তিত্ব ছিল সেই কথা বলে। বাবা-মায়ের বিয়ের ঠিক আগে এসেছিল, বাপ্পা যতদূর সম্ভব নিস্পৃহ গলায় বলে। সম্ভবত সাতগাঁতেই পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে কোথাও রয়ে গিয়েছে। বলতে বলতে কানাইয়ের চোখের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায়।
কানাইয়ের মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটে না। কয়েক মুহূর্ত শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে কানাই বলে—
‘বাবা মারা যাবার পর পুরোনো কাগজপত্র হারিয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে। কিছু আছে হিমুকাকুর ঘরে হার্মাদি সিন্দুকে। কিন্তু ওর ঘরের যা অবস্থা ভেতরে ঢোকা যায় না। মাঝে একবার সিন্দুকটা খোলার চেষ্টা করেছিলাম, হিমুকাকু চাবি হারিয়ে ফেলেছে।’
ওরা পন্ডিচেরিতে থাকাকালীনই টোলের বাড়ি আর পুথিশালা দখল করেছিল পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজ, সেখানে বাড়ির পুরোনো কাগজপত্র দলিল দস্তাবেজ রয়েছে। অনেক পুরোনো মূল্যবান পুথি আর পুরোনো নথিপত্র ছাত ফুটো হয়ে জল পড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখনও কানাই ওদের জিম্মা থেকে বের করে আনতে পারেনি।
‘শুধু যে পারিবারিক ক্ষতি তা তো নয়, এ হলো জাতীয় ক্ষতি,’ কানাই বলে। ‘তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমার আর কী আছে বল? পরের প্রজন্মের জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছি–তোর ছেলে, দিদির মেয়ে। কিন্তু তারা কি এসবের কোনো মূল্য দেবে?’
কানাই চলে যাবার পর বাপ্পার মাথায় ওর কথাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। শহরে সন্ধ্যা নামছে, ফাল্গুনের সন্ধ্যা। গঙ্গা আর ধুলোকে প্যাকেটের খাবার দিয়ে টিভি চালায়। ওর জন্য রাতের খাবার বানাতে আসে অচলা। টিভির খবরে মনঃসংযোগ করতে পারে না। বার বার মনে পড়ে কানাই এখন কলকাতা থেকে সাতগাঁয় নিঝুম আদিরামবাটিতে ফিরছে, কোয়ার্সভিল ওলন্দাজডাঙা পেরিয়ে হুগলির ধারের রাস্তা দিয়ে, ছোটো রেলের পরিত্যক্ত লেভেল ক্রসিংটা ছাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে পর্তুগিজ গেটের আগে ডান হাতে পড়বে কেরেস্তান গোরস্তান। অন্ধকারে ঝিঁঝি ডাকছে, দূরে সাত সাহেবের বিবির কবরের দিক থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে।
খুব ছোটোবেলায় দিদা গল্প বলত, কানাই বুঝতে পারত না। বাপ্পা-তিতলিদের মতো, ওই বয়সের যেকোনো শিশুর মতো, গল্প শুনিয়ে বশ করা যেত না ওকে। পরে বাপ্পার মনে হয়েছে, হয়তো কানাইয়ের মনের গঠনে এমন একটা কিছুর অভাব ছিল যা গল্পের বিশিষ্ট তরঙ্গ ধরতে পারত না। এমনকি রামকথা চলার সময় সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তেও কানাই হয় চটের ওপর ঘুমিয়ে পড়ত, নয়তো ছটফট করে অস্থির করে তুলত। ওকে বাড়িতে রেখে আসতে হতো।
সেই জন্যেই কি মন্দিরের গায়ে ছবিগুলো ঢেকে দিল?
লালচে গ্র্যানাইট টালিতে মোড়া আদিরাম মন্দিরের ছবিটা তিতলি পাঠিয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপে, ওকে কেউ পাঠিয়েছিল সাতগাঁ থেকে। সেদিন স্কাইপ কলে মুখোমুখি হতে কেঁদে ফেলেছিল তিতলি। সেটাই ছিল ওর সঙ্গে বাপ্পার শেষ সরাসরি কথা। ততদিনে ওর চোখের চারপাশে কালচে গোলাপি ছোপ সারা মুখে ছড়িয়ে গিয়েছে। চামড়া গুটিয়ে আসায় চোখদুটো অস্বাভাবিক বড়ো লাগছিল। মাথাটা ঢাকা ছিল নীল রঙের স্কার্ফে, পেছনে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল আলো।
কয়েক মিনিট কথা বলে হাঁফিয়ে উঠেছিল। শেষের দিকে হাসার চেষ্টা করল। গলায় লকেটটা তুলে দেখাল, সুলতানি আমলের একটা মুদ্রা।
‘এই দ্যাখ! কাশীতে আমায় রেখে আসার সময় বিশুকা দিয়েছিল। এতদিনে একবারও কাছ ছাড়া করিনি।’
‘আমাকেও দিয়েছিল।’ বাপ্পা বলে। ‘আমার কাছেও আছে।’
‘চল আমরা সাতগাঁয় ফিরে যাই, বাপ্পাদাদা। আবার থাকতে শুরু করি, সেই আগের মতো!’
‘হ্যাঁ, চল! আগের মতো! এবার শীতেই চলে আয়। শুধু আসার টিকিট কেটেই আয়!’
বলতে গিয়ে বাপ্পার গলা বুজে এসেছিল, চোখ করকর করে স্ক্রিনটা ঝাপসা হয়ে এসেছিল। বাপ্পা জানত, তিতলি জানত, বাপ্পা যে জানে সেটাও তিতলি জানত, এটা সেই কপালে গামছা ঘষে তৃতীয় নয়ন ফোটানোর মতোই। বাপ্পা জানত, তিতলিও জানত, ওর এই সাতগাঁয়ে ফেরার ইচ্ছেটা পাগলরাম চক্রবর্তীর এল- ডোরাডোর মতোই।
.
এতক্ষণে কানাইয়ের গাড়িটা ডকবাজার ছাড়িয়ে ব্রাহ্মণপাড়ার ভেতর ঢুকে পড়েছে। দুপাশ থেকে ভেসে আসছে শাঁখের ধ্বনি, মন্দিরে ঘন্টার ধ্বনি, ক্রমপ্রসারমান নৈঃশব্দ্য কানাইয়ের জন্যে দুঃখ হয়। পরক্ষণেই হিংসে হয়। কানাই ফিরে যাচ্ছে যে জল মাটি দিয়ে গড়া জগতে, এতো বছরেও কল্পনায় সেটা বদলায়নি, ক্ষয়ে এসেছে কেবল। এই জগৎ থেকে কেউ কোনোদিন কানাইকে উৎখাত করতে পারবে না।
*
আজকাল প্রায়ই সেই আধো-অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো প্যাসেজটার স্বপ্ন দেখে বাপ্পা। টাইপরাইটারের শব্দ থেমে গেছে, অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, বেরোবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কখনো স্বপ্নের ভেতরে সেই প্যাসেজটা হয়ে যায় অনন্ত সিঁড়ি, এক গভীর স্টেপ ওয়েল, ত্রিকোণাকৃতি। সিঁড়ির ধাপগুলো অনেক নীচে জলের দিকে নেমে গিয়েছে, আবার উঠে এসেছে। জল দেখে খুব তেষ্টা পেয়ে যায়, অসম্ভব তেষ্টা, মৃত্যুর আগে মাদুরে শুয়ে আদরিণীর যেমন তেষ্টা পেয়েছিল সেইরকম। বাপ্পা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নীচের দিকে নামতে থাকে, নীচে স্বচ্ছ কাকচক্ষু জল, তার ভেতরে শেকড়ের মতো নেমে গিয়েছে সিঁড়ি। পরক্ষণেই টের পায় ওটা আসলে ওপরের সিঁড়ির প্রতিবিম্ব, সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে বাঁক ঘুরে ফের ওপরে উঠে আসছে, প্রতিবার পদক্ষেপে জল চলে যাচ্ছে নীচে। আচমকা টের পায় এই স্টেপ ওয়েলের গঠনটা অসম্ভব ত্রিভূজের আকারের, পেনরোজ ত্রিভূজ, মান্দাসীর উরুতে উল্কির ছাপের মতো। এতগুলো ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামার পর ফের আগের জায়গায় উঠে এসেছে। ফোন বেজে চলেছে।
অন্যপ্রান্তে কানাইয়ের গলা। হেমন্তমামা আর নেই।
.
বন্দর হুগলি থেকে সেই ছোটো রেল আর নেই, গণপরিবহনে চড়ে যাবার মতো শরীর মনের অবস্থাও নেই; কার রেন্টাল এজেন্সি থেকে গাড়ি ভাড়া করল বাপ্পা।
আদিরামবাটিতে আস্ত এক জীবনের শ্রম দান করে তিল তিল করে যা কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছিল বামুনদিদা, তাই নিয়ে সম্পূর্ণ অথর্ব হয়ে পড়ার আগে কাশীর মুক্তি আশ্রমে চলে গিয়েছে। যতদিন সে এবাড়িতে ছিল হেমন্তর খেয়াল রাখত, ভাত ডাল সব্জি ভালো করে সিদ্ধ করে চটকে মেখে দিত। ওর সবকটি দাঁত পড়ে গিয়েছিল, মুখভর্তি দাড়ির জঙ্গলে বোঝা যেত না। বামুনদি চলে যাবার পর ঠিকে রাঁধুনি পেতলের শানকিতে ভাত তরকারি বেড়ে দক্ষিণের ঘরের বাইরে জলচৌকিতে চাপা দিয়ে রেখে আসত। দিনে কেবল একবার বাড়িতে খেত হেমন্ত। সূর্য ডোবার আগে যখন আকাশে চামচিকে আর চটক পাখি বের হয়, রোজ সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত। হাঁটতে হাঁটতে কখনো গাজির বাগানের দিকে, কখনো পরিত্যক্ত চিনিকলের দিকটায় চলে যেত। সন্ধ্যায় ডকবাজারে নিবারণের দোকানে এসে বসতো। চায়ের গ্লাসে কোয়ার্টার পাউন্ড লোফ ডুবিয়ে খেতে খেতে— ‘যাহ চা যে ফুরিয়ে গেল!’ বিস্ময়াবিষ্ট গলায় বলে ওঠার আগেই নিবারণ ফের গ্লাসে চা ঢেলে দিত। প্রতিদিনই আদিরামবাটিতে ফিরত কিছু না কিছু অদ্ভুত আবর্জনা কুড়িয়ে নিয়ে; মরচে ধরা যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে পোর্সেলিন কিংবা ধাতুর টুকরো। বাজারের পেছনে লোহালক্কড়ের ছাউনিতে উবু হয়ে বসে কী যে খুঁজত কেউ বুঝত না। ওর গালভর্তি দাড়ি, মাথায় চকচকে টাক, পরনে মলিন অবিশ্রস্ত ধুতি দেখে পথচারীরা সরে যেত, আড়তদারেরা জানত কোন বাড়ির ছেলে। হেমন্ত কোনো ভাঙা যন্ত্রাংশ, ধাতুর টুকরো কিংবা খবরের কাগজ নিতে চাইলে বিনামূল্যে দিয়ে দিত।
প্রথম দিকে সবকিছু হার্মাদি সিন্দুকটার ভেতরে রাখত, তালা দিয়ে চাবিটা পৈতেয় বেঁধে রাখত; ক্রমশ সিন্দুকটা বোঝাই হয়ে ঘরটাই ভরে উঠল বিবিধ বিচিত্র জঞ্জালের স্তূপে, তার আড়ালে সিন্দুকটাই হারিয়ে যেতে বসল; মহাজাগতিক কন্ঠস্বর ধরার যন্ত্রটা ওই স্তূপের ভেতর ঠিক কোথায় যে আছে জানার উপায় ছিল না; শেষ দুবছর বাড়ির কারোর সঙ্গে একটিও কথা বলেনি সে।
বিকেলবেলা বাপ্পা যখন এসে পৌঁছল, ততক্ষণে হেমন্তমামার দেহটা দক্ষিণের ঘর থেকে বের করে ভেতর উঠোনে কুয়োর পাশে শোয়ানো হয়েছে। দোতলায় শোবার ঘরের জানলায় দুহাতে গরাদ ধরে বিপুল মেদভারা দেহের ভার রেখে নীচে উঠোনে তাকিয়ে আছে নতুনবউ, চোখমুখ শোকে কান্নায় স্ফীত, কাঁধের দুপাশে কাঁচাপাকা চুলের শীর্ণ গুছি। দুচারজন বয়স্ক জ্ঞাতি এসে বসেছেন বারান্দায়, বাপ্পা তাদের চিনতে পারে না। কানাইয়ের নির্দেশে চার-পাঁচজন তরুণ দেখে মনে হয় কোনো দল কিংবা ক্লাবের ছেলে, সকলেরই কব্জিতে একই রকম সবুজ প্লাস্টিকের রিস্টব্যান্ড অন্ত্যেষ্টির যোগাড় করছে।
‘কাল দুপুরবেলায় জলচৌকিতে ভাতের শানকি রেখে এসেছিল কাজলদি। বিকেলবেলা ঝি এঁটো বাসন আনতে গিয়ে দেখে ঢাকা ভাত তরকারি যেমন কে তেমন পড়ে আছে।’ কানাই জানালো।
খালি গা, কোমরে মলিন ধুতি লুঙ্গির মতো করে জড়ানো, শীর্ণ দেহটার দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায় অপুষ্টির ছাপ। ফ্যাকাশে সাদা চামড়া কুঁচকে গিয়ে ক্রেপ কাগজের মতো হয়েছে। স্থানে স্থানে সবজেটে ছোপ, ময়লা নাকি চর্মরোগ বোঝার উপায় নেই। চোখ কোটরাগত, দাড়িগোঁফের জঙ্গলে মুখ ঢেকেছে। তবু কী আশ্চর্য, চোয়ালে এ বাড়ির সব পুরুষদের মতো বিশিষ্ট চৌকোনা আদল ফুটে আছে যা বাপ্পা এর আগে কখনো খেয়াল করেনি। দেহটা এতই হালকা হয়ে গিয়েছে যে চার যুবক বাঁশের চালিতে চাপিয়ে একবারও কাঁধ না বদলে শ্মশানঘাটে নিয়ে গেল।
পর্তুগিজ গেট পেরিয়ে নদীর দিকে বেঁকে গিয়েছে যে রাস্তাটা, এতকালে তার ওপরে পিচ পড়েছে। পথের ধারে শিমুলগাছ কিছু কিছু কাটা পড়েছে। এখনও হরিধ্বনি দিয়ে যাবার সময়ে রাস্তায় ছড়ানো খই খেতে আসে দাঁড়কাক।
সরস্বতী নদীটাকে নর্দমা ছাড়া অন্য কিছু কল্পনা করা অসম্ভব। একধারে স্তূপাকার মৃতের খাট, বালিশ তোষক, ফুল, হাঁড়িকুড়ি ও অন্যান্য অন্ত্যেষ্টির আবর্জনা। শ্মশানযাত্রীদের ইটের ছাউনিটা আর নেই। সেখানে নীলশাদা ইলেকট্রিক চুল্লির বাড়ি।
হেমন্তমামার দেহটা পুড়ে ছাই হয়ে যেতে মিনিট চল্লিশের বেশি লাগল না। বাপ্পা ভাবতে লাগল সেই বাদুড়গুলোর কথা, বুড়িদিদার কথা।
‘এখানেই থাকবে একা একা?’
‘একা কেন? কেউ কেউ থাকবে।’
‘কী খাবে?’
‘কিছু খাবে না।’
‘শুধু গঙ্গাজল?’
‘ছাই নিতে বাড়ির লোক কেউ আসেন।’–ধোঁয়ানীল শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরা চুল্লির কর্মচারী বলল।
‘তুই যা বাপ্পাদাদা,’ কানাই বলে।
‘আমি?’ বাপ্পা ইতস্তত করে।
শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে এক অচেনা প্রবীণ জ্ঞাতি সোৎসাহে বলে ওঠেন— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার তো মাতুল। তোমার যাওয়াটাই প্রশস্ত।’
কানাই কিছু বলে না। মায়ের অন্ত্যেষ্টির পর ছাই নিয়ে সাতগাঁয়ে এসেছিল বাপ্পা। কানাই কি ভেবেছে ও এই কাজে অভিজ্ঞ?
‘শুধু হাওয়া?’
‘হ্যাঁ, আর জল। আর মাটি।’
‘ভয় পাবে না?’
‘না, ভয় পাবার কী আছে।’
চুল্লির পেছন দিকে লোহার সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে তাপের হলকা মুখে লাগে। একটা সোঁ সোঁ শব্দ বারো মাইল পথ আসার পর মার্টিন্স রেলের সেই ইঞ্জিনের মতো। তার পেটের নীচ থেকে ধূমায়িত কালো ট্রে টেনে বের করে খুঁচিয়ে অস্থিভস্ম বাপ্পার বাম হাতে মাটির সরায় ভিজে মাটির দলার ওপর রাখেন এক দৈত্যাকার পুরুষ। ডেল্টা ক্লাস লোকো ইঞ্জিনের ড্রাইভারের মতোই তাঁরও মাথায় নীল কাপড়ের ফেট্টি, তার প্রান্তটা সামনে টেনে নাকেমুখে জড়ানো। কশেরুকার কালো টুকরোর পাশে একটা চকচকে বস্তু দেখিয়ে চোখের ইশারায় ইঙ্গিত করেন। একটা চাবি।
অস্থি আর পোড়া নাভিরজ্জু কালো জলে ছুঁড়ে দিয়ে বাপ্পা ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসে। এই জলে কি এখনও মাছ আছে? তারা কি পোড়া নাভিরজ্জু খায়? কুর্তার পকেটটা গরম হয়ে আছে অনুভব করে। সরু চাবিটা জাহাজি সিন্দুকের, ছাইয়ের মধ্যে দেখামাত্র চিনেছে। মহালয়ার পর বিশুকা ওই চাবি দিয়ে তোলাঘরের ভেতর সিন্দুক খুলত।
