সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৩
৩.৩
নসা সেনোরা দো সান্তো রোসারিওর নামে নিবেদিত গির্জা, যেটি পরে ম্যাওবেড়ালের গির্জা নামে লোকমুখে পরিচিত হবে, এ দেশে প্রথম শুধু নয়, সবচেয়ে উঁচু তার চুড়ো। এতদঞ্চলে উচ্চতম ধর্মতলার আদিম বটগাছটার থেকেও সেটি উঁচু। বহুদুর থেকে, এমনকি গাজির বাগান ছাড়িয়ে ত্রিবেণী থেকেও সেটি দেখা যায়, গির্জার ঘন্টার ধ্বনি দুই নদীর ওপার থেকে শোনা যায়। সুউচ্চ খিলানময় প্রার্থনাকক্ষ, বারোটি থামযুক্ত ক্রশের আকারের মধ্যভাগ, গির্জার পোশাক ও তৈজস রাখার কক্ষ, এবং একটি আতুরশালা ও যাজকাবাস নিয়ে গির্জাটি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দশ বিঘা জমির ওপর। রয়েছে বাগান এবং গোর দেবার জন্য নির্দিষ্ট স্থান। বাদশাহী সনদের পর লিসবন থেকে অর্থ এসেছে, এবং নির্মাণ সম্পূর্ণ হবার পর আনুষ্ঠানিক উৎসর্গের সময়ে গোয়া থেকে নৌকাযোগে অগস্টিনীয় শাখার এক বিশপের নেতৃত্বে কুড়িজন যাজক ভ্রাতা এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ন’জন থেকে গেলেন। এই সবুজ সজল ভূমির মলয় বাতাস আর চোখের পাতায় শিশিরের মতো নেমে আসা তন্দ্রার আবুলি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বহু পুরুষকে বেঁধেছে এই বাংলায়, তাদেরও বেঁধে নিল।
প্রথম থেকেই গির্জার নিত্যকার কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত রুয়ানো। কিন্তু ততদিনে তিনি উপলব্ধি করেছেন তাঁর জীবনের প্রধান বৃত্তি মানুষের আত্মার শুশ্রূষা ততটা নয় যতটা তার ধারক দেহটির রোগমুক্তি। প্রার্থনাকক্ষের থেকেও আতুরশালাতেই বেশি সময় কাটে। বাগানের ধারে একটি হোগলাপাতার কটেজ বানিয়ে থাকেন। তার একদিকে তাঁর পরীক্ষাগার, যেখানে স্থানীয় গাছগাছড়ার ওষধি গুণাগুণ নির্ণয় করেন। পাশেই খোলা দাওয়ায় ডিসপেনসারি। সেখানে তিনি বহিরাগত রোগীদের চিকিৎসা করেন। সার্জেন- পাদরি ইনফান্টের ডিসপেনসারিতে শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ, নবদীক্ষিত ও বিধর্মীর মধ্যে কোনোরকম ভেদাভেদ নেই।
পোর্তো পেক্যেনোয় জীবন বয়ে চলে ধীর নদীর ছন্দে। ইতিমধ্যে হোগলাপাতার ঝুপড়ি বসতিটা আমূল বদলে গিয়েছে। পোড়া ইট আর চুনসুরকির কেল্লা উঠেছে, নদীপাড়ে সারিসারি সুরম্য ভিলা, চওড়া জ্যামিতিক পথে মোরাম বিছানো। ছায়াঘেরা বীথি আর বাগান গড়ে উঠছে চারদিকে। খাদ্যও এখানে সুলভ। চরভূমির সবুজ তৃণভোজী গরুর স্বাদু দুধের মাখন চিজ, জলায় অঢেল মাছ আর শীতকালে পাখি, এছাড়া ভেড়ার বিকল্প হিসেবে কুচকুচে কালো ছাগের মাংস, যাকে স্থানীয়রা বলে কারা বেঙ্গালা। রুয়ানো বাগানে খানিকটা জমিতে সব্জির চাষ করেছেন, আলু, টোম্যাটো, গাজর ও কড়াইশুঁটির বীজ দেশ থেকে আনিয়ে এই বাংলার উর্বর পলিমাটির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটিয়েছেন। ফলনও হচ্ছে ভালোই। এছাড়া দক্ষিণের মশলাদ্বীপ, এমনকি চীনসাগরের দিক থেকে আসা জাহাজিদের মারফৎ ওষধি গাছের বীজ চারা আনানোর ব্যবস্থা করেছেন, সাতগাঁর ব্রাহ্মণ কবিরাজদের সঙ্গে সেইসব জড়িবুটি ও তার জ্ঞান আদানপ্রদান করেন। মানব দেহতন্ত্রের রহস্য থেকে রুয়ানো ডে ইনফান্টের অনুসন্ধিৎসা ক্রমশ ঘুরে গিয়েছে এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদজগতে।
পাকাপোক্ত জাহাজঘাটা, জাহাজ সারাইয়ের সুখাঘাটা আর সারা বছর ব্যবহারের উপযোগী বড়ো বড়ো ফ্যাক্টরি ছাউনি নিয়ে পোর্তো পেকোনো ক্রমশই ব্যস্ত বিকিকিনির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তাকে আর কোনোমতেই ক্ষুদে বন্দর বলা চলে না। হোগলার অস্থায়ী বসতির স্মৃতিটা কেবল রয়ে গিয়েছে তার নামে। এই অঞ্চলের ব্যাপারীরা এখনও তাকে বন্দর-হুগলি বলেই ডাকে, ফিরিঙ্গিরা বলে বন্দর- উগোলিম। বেশ কিছুকাল ধরেই পাঁচশো টন ও তদুর্ধ্ব জাহাজ শীর্ণ হয়ে আসা সরস্বতীর ধারে সাতগাঁয় না ভিড়ে সোজা চলে আসে এখানে। তবে গঙ্গার এই শাখাটিরও যাকে লোকে বন্দরের নামে মিলিয়ে ডাকে হুগলি বা উগোলিম
নাব্যতা হ্রাস পায় শীতে, যখন হিমালয়ের বরফগলা জল কমে আসে। তখন সেই নীচের দিকে বেতোরে মাল খালাস করে ছোটো নৌকায় তুলে টানতে হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত এমনই চলে। এইসময় বন্দর-হুগলির জাহাজঘাটায় জাহাজ থাকে না প্রায়, নদীর ধারে সরাইগুলো নির্জন হয়ে পড়ে। সার্জেন-পাদরির ডিসপেনসারিতেও রোগী কমে আসে।
এই সময়ে রুয়ানো ডে ইনফান্টে ভ্রমণে বের হন। শীতে আবহাওয়া মনোরম, পথঘাট শুষ্ক। পাল্কিতে চেপে দূর গ্রামের মাঠেঘাটে বনেবাদাড়ে ঘুরে ওষধি লতাপাতা সংগ্রহ চলে। মাঝে মাঝে নৌকা নিয়ে উজানে নদীর মুক্তবেণীর মুখে ঘন বনের মাঝে মসজিদের চারপাশে খুঁজে বেড়ান, কখনো উজিয়ে আরও ওপরের দিকে গঙ্গার মূল খাতে চলে যান। ছাগচর্মের মুশিলা ভর্তি করে অজানা চারা পাতা ফুল বীজ মূল পরীক্ষাগারে এনে শুকিয়ে নিয়ে অনুপুঙ্খ রেখাচিত্র আঁকেন। তাদের চেহারা চরিত্র সম্পর্কে নোটসহ সেইসব ড্রয়িং পাঠিয়ে দেন গোয়ায়, গার্সিয়া ডি’ওটা নামে এক চিকিৎসকের ঠিকানায়।
ডি’ওটা যদিও জাতিতে ইহুদি, ক্রান্তদেশীয় গাছগাছড়া সম্পর্কে তার প্রবল আগ্রহ দূর বাংলায় এই দেশোয়ালি যাজকের সঙ্গে প্রগাঢ় পত্রমিতালি ঘটিয়েছে। নিয়মিত চিঠি আদানপ্রদান চলে। তবে ব্যাপারীদের ঢাও কিংবা সাম্পানে উপমহাদেশের দীর্ঘ উপকূল ঘুরে চিঠি আসতে যেতে অনেকটা সময় লাগে। রুয়ানো কোনো বিশেষ প্রজাতির বীজ চেয়ে পাঠালে সেই বার্তা যখন ডি’ওর্টার কাছে গিয়ে পৌঁছয়, ততদিনে হয়তো মালাবারে বর্ষা এসে গিয়েছে, কিংবা ওই প্রজাতিটি শীতঘুমে চলে গিয়েছে। একটি বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়। তবু এই বিচিত্র বিলম্বিত সংলাপ চলতেই থাকে বছরের পর বছর, তাতে ছেদ পড়ে না। দুজনে মিলে ভারতবর্ষ নামে এই বিশাল দেশটার দুই প্রান্তের উদ্ভিদ নিয়ে যৌথভাবে একটি মহাগ্রন্থ লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রুয়ানো ডে ইনফান্টের এই প্রকল্পে যুক্ত হবার পেছনে অন্য একটি কারণও আছে। লতাপাতা ফুল ফল বীজ শিকড় বাকল ছত্রাকের আশ্চর্য বৈচিত্র্যময় গঠনতন্ত্রের জগতে ডুব দিয়ে তিনি ভুলতে চান সেইসব আর্তনাদগুলো যা তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিবারাত্র, জেলিয়া নৌকার গারদের নীচে ঠাসাঠাসি নগ্ন দেহগুলো, সেইসব যন্ত্রণাক্লিষ্ট পশুর মতো মানুষের চোখগুলো, তাদের নিতম্বে দাগানো দগদগে ত্রিভুজের সিল, বিষ্ঠা আর চামড়াপোড়া গন্ধ, এত বছরেও যার তীব্রতা কমেনি, যা তাঁর স্মৃতিতে হানা দেয় বাদাবনের বাঘের মতো। শুধু ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের ভেতরে নয়, দিনের বিভিন্ন প্রহরে, অতর্কিতে, সন্ধ্যার আগে বাগানে ঝিঁঝিপোকাদের কলতানে, পাপস্বীকারের কুঠুরির জালের ওপাশে ফিসফিসে কন্ঠস্বরে।
যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, রুয়ানো গির্জার ডিঙি নৌকাটা নিয়ে একা দাঁড় টেনে নিয়ে চলে যান উজানে। জনপদ ছাড়িয়ে, পাড় বরাবর টানা ফসলের ক্ষেত কলার বন ছাড়িয়ে, গাজির বাগানের জনহীন বন মসজিদ ছাড়িয়ে, ভাঙা পাথরের ঘাট আর হেলে-পড়া মিরাদর ছাড়িয়ে – যেখানে একদা মুখোমুখি বসতেন এক পণ্ডিত ও এক তুর্কী শাসক ভেসে যান যেখানে গঙ্গার স্রোত খলবল করে অবিরাম পাক খুলে চলেছে ত্রিধারায়। ঘোলের মাঝামাঝি এসে দাড় উঠিয়ে নেন, নৌকাটা জলের ঘূর্ণিতে পাক খেতে থাকে কার্টুনির হাতের মাকুর মতো। ভাটির দেশের নদীর এই খামখেয়ালি স্বভাব, দিবারাত্র পাড়ের ভাঙাগড়া, ছটফটে কুলকুল ধ্বনি যা ভাটা ঘুরে জোয়ার লাগার সময় শান্ত ফিসফিস করে খালের মুখগুলোয়
সব মিলিয়ে এক জটিল জীবন্ত সত্তা, যা দিনের পর দিন দেখে দেখে ঘোর লেগে যায় রুয়ানোর। জলের ধারাগুলো শিরাউপশিরার মতো পলি বয়ে এনে বদ্বীপভূমির পেশি নির্মাণ করে চলেছে, ঠিক যেমনটা ঘটে চলে মানব দেহতন্ত্রে অলক্ষ হৃৎপিন্ড যেন ধুকপুক করে চলেছে জোয়ারভাটায়।
রুয়ানোর মনে পড়ে যায় জারগোজায় ফ্যাকুলতে দা মেদিসিনায় পড়া পিটার অ্যাবেলার্ডের তত্ত্ব। দার্শনিক অ্যাবেলার্ড ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কীভাবে এই মহাবিশ্ব আসলে অন্তহীন চক্রবৃদ্ধি হয়ে চলা এক প্রক্রিয়া, যেখানে একই গঠনতন্ত্র বার বার ফুটে উঠছে আপাত বিসদৃশে জিরাফ থেকে শুরু করে পাইনের বীজে। ভাবতে ভাবতে বৈঠাটা কোলের ওপর রেখে জলে ঝুঁকে পড়েন রুয়ানো, স্রোতের জঙ্গমে আঙুল ডুবিয়ে বিড়বিড় করে ওঠেন— ‘সিক এট নন! সিক এট নন!’
গাজির বাগানের উত্তরে নদীর মুক্তবেণীতে একটি গোটা ঋতুচক্র ধরে স্রোতের চরিত্র পর্যবেক্ষণ করলেন রুয়ানো, সরস্বতী হুগলি আর যমুনার খাতের মুখে সোলার টুকরো ভাসিয়ে তাদের গতিবিধি লক্ষ করলেন, জোয়ারভাটার বিভিন্ন পর্যায়ে দড়ি ডুবিয়ে আপেক্ষিক নাব্যতার পরিসংখ্যান নিলেন, এবং মাটি আর গাটা-পার্চা দিয়ে নদীর ত্রিমুখী খাতের একটি ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে শুরু করলেন।
এইসময়ে শুরু হয় তাঁর আপনমনে বিড়বিড় করে অনর্গল কথা বলার অভ্যাস। নিজেকে প্রশ্ন করা, নিজেই উত্তর দেওয়া, গার্সিয়া ডি’ওর্টার সঙ্গে এক অনন্ত কাল্পনিক সংলাপ যা উদ্ভিদজগত ছেড়ে বইতে থাকে অন্য খাতে, আক্ষরিক অর্থেই।
‘ভাদুরে রোদ পাদরিসায়েবের মাথায় উঠেচে গো! ঘিলুখান ভাজা ভাজা হয়ে গ্যাচে!’ মাঝিমাল্লারা আক্ষেপ করে।
সেপ্টেম্বর মাসের এক সোমবার রুয়ানো ডে ইনফান্টে নতুন কেল্লায় এলেন পেদ্রো আলভারেজের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর দুহাত ভর্তি একগুচ্ছ মানচিত্র, সারণী, আর নীল সবুজ হলুদ রঙে চিত্রিত গাটা-পার্চার রিলিফ ম্যাপটা। অনেকদিন পরে রুয়ানোকে দেখে বিস্মিত হলো পেত্রো। চামড়ায় রোদে পোড়া কালচে ছোপ, মুখে মেচেতার দাগ, পাটের ফেঁসোর মতো চুলদাড়ি, ফ্যাকাসে চোখের চারপাশে গভীর বলিরেখা। গল্পকথার ভবঘুরে ইহুদির মতো চেহারা হয়েছে। রুয়ানো যখন মানচিত্রগুলো টেবিলের ওপর মেলে ধরে কথা বলতে শুরু করলেন, পেদ্রোর বিস্ময় দানা বেঁধে উঠল ঘোর সন্দেহে।
‘তিনটি মৌসমচক্র ধরে আমি গঙ্গার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেছি,’ রুয়ানো হাঁফাতে হাঁফাতে দ্রুত লয়ে বলে চলেন। ‘মূল ধারা এবং তার শাখাগুলো, কীভাবে জল বয়ে আসে আর তিনটি শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে যায়, কেমন ভাবে নদীতলের গঠন বদলায়, কখন কোথায় পাড় ভাঙে আর চর জাগে। এইসব আমি খুঁটিয়ে দেখেছি, এখানে তার তথ্য পরিসংখ্যান রয়েছে। আমি একটি প্রকল্প নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। এটি যদি রূপায়ণ হয় তাহলে বন্দর-হুগলির জাহাজঘাটায় পাঁচশো টন বা তার থেকেও বেশি ওজনের জাহাজ বছরের যেকোনো সময় যাওয়া-আসা করতে পারবে।’
এরপর তিনি মানচিত্রের সাহায্যে এক বিচিত্র পরিকল্পনার রূপরেখা পেশ করলেন নদীর খাতে শল্যবিদ্যার প্রয়োগ! গঙ্গা যেখানে ত্রিধারা হয়েছে, তার দু লীগ নীচে একটি খাল শীতকালে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। সেই খালটি গভীর করে খুঁড়তে হবে, এবং জলের চাপ যেখানে এসে বেঁকে সরস্বতীর খাতে মেশে সেখানে পাড়ের বাঁক একশো মিটার কেটে নিয়ে কাদা আর বালি পূর্বদিকে যমুনার মুখে এনে ফেলতে হবে। এমনিতেও যমুনা অপেক্ষাকৃত রুগ্ন একটি ধারা, বর্ষার প্লাবনে অতিরিক্ত জল সুঁতি খাল দিয়ে বয়ে নিয়ে যায় বিদ্যাধরীর উজানে। ফলত প্লাবনের জল ঘুরে গিয়ে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যবর্তী গঙ্গার খাত আরও গভীর করে তুলবে।’
‘পুরো অপারেশানটা হবে দুটো বর্ষার মাঝে, রুয়ানো বলেন। ‘এই কাজে কতজন শ্রমিক লাগবে, কতগুলো নৌকা আর ভেলা লাগবে, কতগুলি কাঠের বল্লা লাগবে, কোন আকারের, কত পরিমাণ বাঁশ লাগবে পাড়ের সুরক্ষা দেয়াল বানাতে, এমনকি নদীর তল থেকে বালি সেঁচে তুলতে কতগুলি বেতের ঝুড়ি লাগবে, সেইসব হিসেব কষে এনেছি আমি। এই যে।’
রুয়ানো চামড়ার মুশিলা খুলে আরও এক তাড়া কাগজ বের করে টেবিলে রাখেন।
পেদ্রো আলভারেজ ব্যস্ত মানুষ, নতুন কেল্লায় আপিস খোলার পর ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। তবু ধৈর্য ধরে সার্জেন- পাদরির কথাগুলো শেষ পর্যন্ত শুনল।
‘এর চেয়ে উন্মাদ কোনো পরিকল্পনা আমি জীবনে শুনিনি!’ ঠাণ্ডা গলায় বলল পেদ্রো।
‘অবশ্যই তা নয়,’ রুয়ানো বললেন। ‘আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে নীল নদে বাঁধ দিয়ে মিশরীয়রা এর চেয়ে ঢের উন্মাদ কাণ্ড ঘটিয়েছিল।’
‘আর এ জন্য যে বিপুল অর্থ আর বিশাল শ্রমিকবাহিনী লাগবে? সেসব কোথা থেকে আসবে?’ পেদ্রো চোখ সরু করে তাকায়।
দেখা গেল রুয়ানো ডে ইনফান্টে এই বিষয়টাও কড়ায় গন্ডায় হিসেব কষে এসেছেন। নদীখাতে শল্যচিকিৎসার পরে যে বণিকেরা তাদের বড়ো বড়ো জাহাজ নিয়ে সটান বন্দর-হুগলি আসতে পারবে তাদের কাছে মুচলেকা বিক্রি করা যেতে পারে। তার মূল্য নির্ধারণ হবে বেতোরে নোঙর করে ছোটো নৌকায় মাল চাপিয়ে আনার সময় ও মূল্য হিসেব করে। তার কারণ তাদের সেই পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে। এছাড়া হুগলি নদী দিয়ে বছরভর যানচলাচল বেড়ে যাবে, এই অঞ্চলের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ নৌকায় চেপে ভাটির দিকে কালীক্ষেত্রে তীর্থ করতে যাবে, হাটবাজারের ব্যাপারিরা যাবে। তাদের কাছ থেকেও কর আদায় করা যাবে।
‘আর শ্রমিকবাহিনীর কথাই যদি ওঠে, এই কাজে এমন এক গোষ্ঠীকে কাজে লাগানো যায় যাদের ব্যাপারে আমার চেয়ে ভালো জানে এই শহরে এমন আর কেউ নেই!’ টেবিলে দুবার তর্জনি ঠুকে রুয়ানো ঘোষণা করলেন।
‘তারা কারা?’
‘ক্রীতদাস!’
.
রুয়ানো ডে ইনফান্টের হাতে লেখা খুঁটিনাটি নকশা, সারণী ও হিসেবের তালিকা সংবলিত একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পেদ্রোর সুপারিশ সহ পাঠানো হলো গোয়ায়। এছাড়া রুয়ানো নিজে নসা সেনোরা দো সাস্তো রোসারিওর প্রধান যাজক হিসেবে লিখলেন দেশের রাজাকে। হেনরি দ্য চেস্ট শুধু পর্তুগালের সাম্রাজ্যের সর্বময় শাসনকর্তাই তো নন, তিনি ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কার্ডিনালও বটে। কিন্তু কোনো উত্তর এল না না গোয়া থেকে, না লিসবন থেকে। এরই মধ্যে রুয়ানো জাহাজঘাটার ধারে সরাইগুলোয় ঘুরে ঘুরে বড়ো বণিক, মহাজন আর জাহাজীদের আবেদন নিবেদন শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনাটা এতই উদ্ভট, এবং ভবিষ্যৎ লাভের জন্য বাজি রেখে মুচলেকাপত্র কেনার ব্যাপারটা এতই অভূতপূর্ব যে কেউ কর্ণপাত করল না।
শেষকালে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল এমন এক গোষ্ঠীর মানুষ যাদের কথা রুয়ানোর মাথাতেই আসেনি। গোকুলচন্দ্র রায় হিন্দু ব্রাহ্মণ, সাতগাঁ বন্দরে দালালি করে প্রভূত অর্থ এবং প্রতিপত্তি অর্জন করেছেন। তিনি বন্দরের মুসলমান নাখোদাদের জনে জনে বুঝিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যেই দুশো স্বর্ণমুদ্রার একটি তহবিল তুলে দিলেন। এরপরেই বরফ গলল, সার্জেন- পাদরির প্রকল্প মান্যতা পেল, বন্দর- হুগলির জাহাজীদের গিল্ড অর্থসাহায্য করতে এগিয়ে এল।
সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে গোকুলচন্দ্র রায় কিংবদন্তি প্রতিম হয়ে উঠলেন। অনেককাল পরেও লোকে যখন জানতে চাইত কীভাবে তিনি এই অসাধ্য সাধন করলেন, অমায়িক ব্রাহ্মণ মুচকি হেসে বলতেন
‘এ আর কঠিন কী কাজ! ভগীরথ পথ কেটে মা গঙ্গাকে এনে সগর রাজার ষাট হাজার মৃত পুত্রের সদ্গতির ব্যবস্থা করেছিলেন। এই ইতিহাস তো সবারই জানা। কোনো নাখোদা সন্দেহ করলে বলতুম যাও বাপু, আমার কথা বিশ্বাস না হয় মকর সংক্রান্তির দিনে সাগরে গিয়ে তিরিশ লাখ স্নানার্থীকে জনে জনে জিজ্ঞেস করে এসো!’
