সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.১
১১.১
প্যারিসে সেন নদীর বুকে ইল সাঁ-লুই থেকে ডাকযোগে পার্সেল এল আদিরামবাটির ঠিকানায়। মঁসিয়ে পাগলরাম চক্রবর্তীকে পাঠিয়েছেন শার্ল লেবো-দুফে, একটি চিঠি ও একটি বই। দুটিই ফরাসী ভাষায় লেখা। বইয়ের নাম Une Fleur En Enfer, আর হাতে-লেখা চিঠির ওপরে পাগলরামের নাম নয়, লেখা আছে–A une Malabaraise। এটুকুই শুধু উদ্ধার করা গেল। যথারীতি পাগলরাম শরণাপন্ন হলো দাদা গঙ্গারামের। গঙ্গারাম শরণাপন্ন হলো তার বাল্যবন্ধু গুঁফো গোঁসাইয়ের। কিছুকাল হল অগস্টিন দুফের বেতনভূক কর্মচারী হয়েছে গুঁফো, সেই একমাত্র এই চিঠির মর্মোদ্ধার করে আনতে পারে।
তামার পাতে সিলভার আয়োডাইড মাখিয়ে সেটিকে পারদের বাষ্পের ওপর ধরলে তাতে অপস্রিয়মাণ আলোছায়ার বিন্যাস ধরে রাখা যায় লুই ডাগের নামে ফ্রান্সের এক থিয়েটারের মঞ্চ স্থপতির এই আশ্চর্য আবিস্কারে সাড়া পড়ে গেল। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র আকাদেমি দ্য সিয়ঁস— ‘উড়ন্ত আলো বন্দি করার’ এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তি সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে উন্মুক্ত করে দিল।
সমগ্র নয়, মি’লেডি, গ্রেট ব্রিটেন নয়। ইংরেজদের সঙ্গে তাদের পুরোনো শত্রুতা, তখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কলোনি দখলের রেষারেষি চলেছে। লুই ডাগেরের এই ডাগেরোটাইপ প্রযুক্তি ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে গেলে ফরাসি সরকারের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হলো। আর এই সুযোগের সদব্যবহার করল অগস্টিন দুফে, রু দ্য বেনারসের ধারে খোড়ো চালের লম্বাটে গুদামঘরে ডাগেরোটাইপ স্টুডিও খুলে ফেলল কলকাতার আগেই। তার্পিন তেলের বাষ্পের ভেতরে কর্মেট গাউন আর টুপি টেলকোট পরে বসে তাতানো চুনাপাথরের আলোয় ঘামতে ঘামতে একবারও চোখের পলক না ফেলে দশ ফ্রাঙ্কের বিনিময়ে যুগলে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল ফিরিঙ্গিপাড়ায় সাহেবমেমদের। বছর না ঘুরতেই চিনিকলে মন্দা পুষিয়ে নিতে শুরু করল দুফে।
একা কিংবা যুগলে কাগজে ছাপা অবিকল সাদাকালো প্রতিকৃতি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ম্যান্টলপিসের ওপর না রাখলে আজকাল আর বসার ঘরের অঙ্গসজ্জা সম্পূর্ণ হয় না। ছুটির দিনে কলকাতা থেকে বজরায় হাওয়া খেতে খেতে সুবেশ ইংরেজ সাহেব- মেমদেরও ঢল নামে। যৌন পর্যটন, সুরা পর্যটন কিংবা আখের ক্ষেতে সড়কি দিয়ে বুনো শুয়োর গেঁথে পিগ-স্টিকিং খেলার মতো কোয়ার্সভিলের মুক্ত প্রমোদের পরিবেশে অপস্রিয়মাণ সুখের মুহূর্ত আলোক রশ্মির সাহায্যে কাগজে গেঁথে রাখার এও এক অভিনব পর্যটন বই তো কী?
ঘোড়ার পিঠে চড়ে সড়কি হাতে বুনো শুয়োর তাড়া করার ছবি অবশ্য ধরা যায় না এতে। কিন্তু দুপুরের কড়া আলোয় বাইরে খোলা চত্বরে রাস্তায় তেপায়ায় ক্যামেরা বসিয়ে দীর্ঘ এক্সপোজারে তোলা যায় কোয়ার্সভিল ও আশেপাশের ইমারতের ছবি: ঘড়িঘর, সিস্টার্স অফ ক্লুনি কনভেন্ট, হুগলি পাড়ের প্রমোড, ম্যাওবেড়ালের গির্জা ছাড়াও ধর্মতলার প্রাচীন বটবৃক্ষ, বর্গিব্যাটারির মিনার, গড়ের ধ্বংসাবশেষ, আদিরামের মন্দির, গাজির বাগানে দরপ খাঁর মসজিদ, ইত্যাদি। অনেক কাল ধরেই ইংরেজ খুড়ো-ভাইপো টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল, উইলিয়াম হজেস ও অন্যান্যদের আঁকা নিসর্গচিত্র জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু সেই মহার্ঘ্য অ্যাকোয়াটিন্ট ঘরের দেয়ালে ঝোলানোর মতো ট্যাকের জোর আছে কি আর রাইটার-ফ্যাক্টরদের? দুফের তোলা বিখ্যাত স্থাপত্যচিত্র পোস্টকার্ডের আকারে এক সিকিতে বিকোয় কলকাতার চিৎপুরে বটতলার বাজারে। কারবার ফুলে ফেঁপে উঠতে চাঁদেরডাঙার ইংরেজি-জানা বাঙালি যুবক মথুরচন্দ্র রায়কে এজেন্ট করে রেখেছে দুফে। মথুর হল কিংবদন্তীপ্রতিম বানিয়ান বাবু গোকুলচন্দ্র রায়ের বংশধর। এছাড়া স্টুডিওয় কলকব্জা রক্ষণাবেক্ষণ আর সাহেব ছবি তুলতে বেরোলে ক্যামেরা আর তেপায়া ঘাড়ে নিয়ে যাওয়ার সহকারী হিসেবে রেখেছে গুঁফো গোঁসাইকে।
গুঁফোর হাতে শার্লের লেখা চিঠি দেখে অগস্টিন দুফের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা গেল কেন শার্ল চিঠিটি মামাকে না পাঠিয়ে পাগলরামকে পাঠিয়েছে। দিদিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এদেশে ভাগ্নের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখেনি দুফে। খালের ধারে পছন্দের ঠান্ডা বাংলোটা ছেড়ে দিয়েছে, নিজের শখের ক্যালেশটিও ছেড়ে দিয়েছে, স্বর্ণমুদ্রা খসিয়ে ওর মনোহরা রমণী তুলে এনে দিয়েছে গোরস্থান থেকে। মনে আশা ছিল, এই বিধর্মীর দেশে মামার কবরে প্রথম মাটিটা ফেলবে শার্ল। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে কিছুকাল অলস আফিমখোরের মতো দিনযাপন করল, তারপর আচমকা একদিন কলকাতায় পালিয়ে জাহাজে চড়ে বসল।
গভীর বিরক্তি নিয়েই টানা জড়ানো হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিটি পড়ে গুঁফোকে তার তর্জমা শোনালো দুফে। ঠিক চিঠি নয়, ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটি লাইন, গির্জায় পাপস্বীকারের খুপরিতে যেমন লোকে বলে। এবং লেখা হয়েছে এক মালাবারের কন্যার উদ্দেশে, পাগলরামকে নয়। সাতগাঁয়ে ওর ঠিকানায় খামটা এসেছে এই মাত্র। সঙ্গের বইটি কবিতার সংকলন–নরকে এক ফুল।
সাহেবের ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে অপ্রতুল ভাষার ভেতর দিয়ে গুঁফো গোঁসাইয়ের মনে ফুটে উঠল আধোচেনা দৃশ্যকল্প। মনে পড়ল ডোঙা শর্মার কন্ঠে শোনা বহু যুগ আগের সেই আদি বাংলার রহস্যগীতি, বর্গিব্যাটারির সিঁড়িতে বসে শোনা, মনে পড়ল সেইসব কমলা রঙের কাঁচকলাইয়ের গন্ধে ভরা বিকেল, ছলাৎছল জলের শব্দ, ভাঙা ঘাটলায় বাঁধা গুরুদেবের তালডোঙার মৃদু উথালপাথাল বাঘিনীর হৃদয়ের মতো, এক শিঙেল হরিণের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছিল যে।
সাহেবের বাংলোয় আসা যাওয়ার মাঝে গুঁফো বার কয়েক মেয়েটিকে দেখেছে– বেতের ধামায় ফল কিনে আনছে তার মনিবের জন্য, কুয়ো থেকে জল তুলছে, চান সেরে রোদে বসে একমাথা ভিজে চুল শুকোচ্ছে। দাসদাসীদের কোনো নাম থাকে না, সে জানে। বাংলোর আসবাবপত্রের মতোই ওদের কেনাবেচা হয়, এমনকি ভাড়ায় পাওয়া যায়। কোনো কোনো রসিক সাহেব বিছানার দাসীকে স্বদেশে ছেড়ে-আসা স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার নাম দিয়ে ডাকে। কেউ কেউ আবার দেশ থেকে সদ্য আগত বন্ধুবান্ধব কিংবা কোম্পানির কর্তাকে ধারও দেয়। দাসপ্রথা বেআইনি হয়েছে, তবে স্থানীয় প্রশাসকেরা এসব দেখেও দেখে না। পন্ডিচেরিতে গভর্নরের নজরদারির বৃত্ত থেকে অনেক দূরে কোয়ার্সভিলের এই ছায়ানগর
‘চিঠিটা পাগলরামকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়নি বটে, কিন্তু আদিরামবাটির ঠিকানায় তো এসেছে।’ গঙ্গারাম সব শুনে বলল। ‘এখন আমাদের দায়িত্ব এটি সেই দাসীর কাছে পৌঁছে দেবার।’
কিন্তু শার্ল দেশে ফিরে যাবার পর সেই ঝি কোন চুলোয় গেল কেউ তার হদিশ রাখেনি? কোয়ার্সভিলে দিন কয়েক ঘোরাঘুরি করে গুঁফো জানালো
‘মাগীর নাম গাঙী। ক্লুনির নানেদের মঠে ওর দিদিমা থাকে। কিন্তু সেই ঝি ওই দিদিমাবুড়ির কাছেও ফিরে যায়নি।’
‘জলে ঘেরা ফিরিঙ্গিডাঙা ছেড়ে কোথায় আর যাবে? ওর খোঁজ ঠিকই মিলবে।’ গঙ্গারাম বলল।
কিন্তু এক সামান্য ক্রীতদাসীকে কীভাবে খুঁজে বের করা যাবে? কীভাবেই বা তার কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে এই বার্তা যে তার প্রাক্তন মনিব তাকে ভোলেনি? গরু হারিয়ে গেল খুঁজে পাওয়া বরং এ তল্লাটে সহজ। গুঁফো গোঁসাই অবশ্য হাল ছাড়বার পাত্র নয়। তার তৎপরতায় ক্রমশই স্পষ্ট হতে লাগল শার্ল লেবোর সেই গাঙী গিয়ে ঠেকেছে সেই ঠিকানায়, যেখানে পরিত্যক্ত ক্রীতদাসী থেকে শুরু করে আস্তাকুঁড়ে-ছুঁড়ে-ফেলা, মৎস্যভূমির জোয়ারে ভেসে যাওয়া, উরুর ধারণক্ষমতা হারিয়ে যায়নি এমন সকল নারীই শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে, যেখানে সব কিসিমের সব জাতের সব গোত্রের জন্য সুনির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে, এবং ক্লুনির সন্ন্যাসিনীদের মঠের মতো যার দরজা কখনোই বন্ধ হয় না; কাটুনিডাঙা।
.
এই রকম স্থানে এলে গুঁফো গোঁসাইয়ের মনোবল যে খুব বেড়ে যায় সেটা অনেককাল আগে ধর্মতলায় গাজন পুর্ণিমার মেলায় চাক্ষুষ করেছে গঙ্গারাম। এখন ওরা আর নবীন কিশোর নয়। কবিরাজ হিসেবে গঙ্গারামের নামডাক হচ্ছে, সাতগাঁর বাইরের লোক তাকে দেখে চিনতে পারে। বুকের মধ্যে সেই চেনা হাতুড়ির ঘা টের পায় সে, ডিঙি বেয়ে মিশন হাউসে যাবার সময়ে যেমন হতো। জলের ওপর বাঁশ-দর্মার বস্তিটা দ্রুত পার হয়ে যাবার সময়ে আড় চোখে তাকালে দেখা যেত ওদের মাচায় নগ্ন পা ঝুলিয়ে বসে হাওয়া খাচ্ছে, হাত আয়নায় রূপচর্চা করছে, একে অপরের মাথার উকুন বাছছে, বেসুরো গলায় গান গাইছে, হাসিঠাট্টা চুলোচুলি করছে।
সকালের আলোয় কাছ থেকে রংবিহীন মুখগুলো ক্লান্ত, ভাঙাচোরা দেখায়। রাতজাগা চোখে কাজল লেপে গিয়েছে, সদ্য ঘুম থেকে ওঠা ঠোঁটের কোণে শুকনো কষ। জলের ধারে উবু হয়ে বসে আলুথালু পোশাকে মুখ ধুচ্ছে কেউ, কেউ কাপড় কাচছে, ঘরের বাইরে তোলা উনুনে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে কষে চুনো মাছ রান্না করছে একজন। ঘরের নীচেই খলবলে জলে, মশারির জাল পেতে ধরেছে মাছ। একদল সদ্য ঘুম থেকে উঠে বসেছে চৌকাঠে, পরনের ঘাগরা উরুর ওপরে তুলে নদীর হাওয়ায় খোঁয়াড়ি ভাঙছে। গুঁফো ও গঙ্গারামকে দেখে একজন মুখের থেকে নিমের দাঁতন বের করে পিচ করে থুতু ফেলে বলে
‘এ যে দেখি জোড়া বাঁউনঠাকুর এয়েচেন গো!’
পাশের ঝুপড়ি থেকে অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বলে ওঠে–‘বলিস কী লা? সক্কাল সক্কাল? কীসে এত গরম খেলে গা?’
‘তার আমি কী জানি বাপু?’ প্রথম জন ঠোঁট উলটে মুখে ফের নিমের দাঁতন গোঁজে।
‘তোর কাচে এয়েচেন তুই নে না রে মুক্তো, সকালবেলা বামুনসেবা করলে দিনটা পয়া যাবে!
মাছ রান্নার বাষ্পের ওধারে একটি দরমার জানলা সশব্দে খুলে যায়। একটি মুখ, তখনও রাতের প্রসাধনের চিহ্ন লেগে আছে, বলে ওঠে–
‘আমার কাচে এসো গো পোঙিমহায়, জোড়ায় এসো, কানে পৈতে জড়িয়েই এসো! দু সিকে দিও কিন্তু!’
সেই আহ্বান শুনে খিলখিল করে হেসে ওঠে প্রথম দুজন।
গুঁফোর মুখে এখানে এই সাতসকালে আসার উদ্দেশ্য জেনে ঘাগরা-পরা মেয়েটি বলে ওঠে
‘শোনো গো! চিঠি দিতে এয়েচেন এঁয়ারা!’
আরেক প্রস্থ হাসির ফোয়ারা ছোটে। জানলার মেয়েটি বলে,— ‘এখানে সব গোমুখ্যুর ঝাড়! কার বাস্কে ফেলবে গো চিটি? কোন বাস্কো তোমার মনে ধরেছে? ও পোঙিৎ বল না! কত লম্বা গো তোমার চিটি?’
দ্বিতীয়জন এক বয়স্কাকে ডেকে নিয়ে আসে। রূপোর নাকছাবি কানপাশায় সজ্জিত তার মুখে বর্মী ছাপ স্পষ্ট, দশাসই চেহারা। নীল সায়া বিপুল দুই বুকের ওপর তুলে গিঁট বেঁধে কাঁধে হলুদ বিষ্ণুপুরী গামছা জড়িয়েছে। গুঁফোর মুখে গাভীর বর্ণনা শুনে সেই প্রবীণা ওদের নিয়ে আসে কোণের দিকে ঝুপড়িতে। বাঁশের দরজা বন্ধ, শিকল নামিয়ে দরজা খুলে অন্ধকার গর্ভ থেকে বের করে আনে একজোড়া জুতো কালো পেটেন্ট চামড়ার, গোড়ালি-তোলা, পেতলের বকলশ আঁটা, জুতোর ভেতরে সিঁদুর মাখানো কড়ি আর চামড়ায় ছুরির অসংখ্য দাগ। এই জুতোজোড়া যে একদা শার্লের ছিল সেটা আর বলে দিতে হয় না।
‘আর গাঙী?’
বর্মী নারী বুকের গামছা টেনে মুখমন্ডল মুছে জলের দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলে–
‘সে নেইকো। সে গ্যাছে। যে মুড়ো থেকে এয়েছিল সেই মুড়োতেই গ্যাছে।’
.
তিনকড়ির ঘাটে গাঙীর ফুসফুস-ছেঁড়া ডাক শুনতে পায়নি শার্ল, কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই অশ্ৰুত ডাক তাকে তাড়া করে ফিরবে। সেই আর্ত ডাকের সঙ্গে তার স্মৃতিতে মিশবে আখের ক্ষেতে সড়কিবিদ্ধ গর্ভবর্তী শুকরীর আর্তনাদ, ভোজের টেবিলে যার ঝলসানো পেট থেকে বেরিয়েছিল নটি সুসিদ্ধ শাবক, সুবেশা মাদামদের চোখে ঠোঁটে লালাসিক্ত উল্লাস, বীভৎস নারকীয়তায় মেশা এক বিচিত্র কামরস যা আবুলির মতো ভারি হয়ে বসে চেতনায়। এইসব স্মৃতির অনুভূতিমালা দিয়ে সে সাজিয়ে তুলবে যেভাবে কলোনি-ফেরত স্বদেশবাসীরা সালোঁর দেয়াল ম্যান্টেলপিসের তাক সাজায় এক আশ্চর্য কাব্যভাষার ছিটমহল। একই সময়ে দুইটি স্থানে ও সময়কালে বাঁচার যে বোধে সে বিদ্ধ হয়েছিল কোয়ার্সভিলে এসে, প্যারিসে ফিরে গিয়েও সেটা রয়ে যাবে। মৎস্যভূমির মদালস আবুলি মমার্তের গলিতে পড়ে পাওয়া নারীদের উরুর মাঝে কবরস্থ করবে, বার কয়েক আত্মহত্যার চেষ্টাও করবে। পথেঘাটে সেন নদীর সেতুর নীচে শত শত গাঙীকে হেমন্তে ঝরা মেপল পাতার মতো উড়ে বেড়াতে দেখবে। প্রাচ্যদেশের ক্রীতদাসী, জাহাজে চাপিয়ে দেশে এনে ছেড়ে দিয়েছে, পথকুকুরীর চেয়েও অধম তাদের জীবন। ভিড়ে ঠাসা কামুক মহানগরের অলিতে-গলিতে সরাইখানার পেছনে নাবিক মাতাল ভবঘুরেদের জটলায় খুঁজে বেড়াবে, হাড়কাঁপানো শিলাবৃষ্টি আর তুষারপাতের ভেতর দেখবে একলা মেয়ে গাঙীকে গায়ে তার ফিনফিনে মসলিন, রোগা দুবলা দেহ, হিমকুঞ্চিত ত্বক, নিষ্ঠুর বক্ষবন্ধনী এঁটে বসেছে, অসহায় পথভ্রষ্ট মাথা কুটে মরছে সৌধের পাথরে, উচ্ছিষ্ট খাবার খুঁটে খাচ্ছে, আবিল কুয়াশায় ওর দুখিনী চোখ দুটো, আশ্চর্য বড়ো চোখ দুটো, ঘুমোলেও যার পাতা বন্ধ হয় না, নিষ্ফল খুঁজে মরছে নিস্তরঙ্গ নারকেল বীথির মরীচিকা।
একদিন মমার্তের এক কৃষ্ণাঙ্গ নর্তকীর ভেতরে সে খুঁজে পাবে গাঙীর ছায়া।
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.২
১১.২
হাকিম সাহেবের আট দাঁড়ির বজরাটা জনহীন ঘাটের ধারে এসে ভেড়ার আগে পাগলরাম টের পায়নি ওরা কোথায় চলেছে। ভাঙাচোরা সিঁড়ির ওপর ভাঁট আর বুনো কুলের বন, ঘাটের মাথায় ভাঙা মিরাদরের থাম হেলে পড়েছে। দাঁড়িরা জলের ওপর জেগে থাকা রানা ঘেঁষে গলুই রাখতেই দুজন পেয়াদা লাফ দিয়ে নামল, লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড় ঠেলে সরিয়ে পথ করে দিল। চাটুজ্যে ও পাগলরাম লম্বা পাটাতন বেয়ে উঠে এল পাড়ে।
বিগত একশো বছরে হুগলির পাড় বরাবর যে পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে তার কোনো ছাপ এখানে পড়েনি। বনাঞ্চল আরও ঘন হয়েছে। মহীরুহগুলো গগনচুম্বী, বিসর্পিল। তাদের গায়ে জাহাজের মাস্তুলে দড়িদড়ার মতো বুনো লতা, দিনের বেলাতেও অন্ধকার বনতল। পাতার আড়ালে কোথাও জালালি কবুতর ডাকছে। কিছুটা এগোলে চোখে পড়ে প্রাচীন স্থাপত্যের ভগ্নস্তূপ। আলোছায়ার ভেতর ফুটে ওঠে নীচু লম্বাটে উপাসনাগৃহ। ছটির মধ্যে তিনটি গোলাকৃতি গম্বুজ ধসে গিয়ে ভেতরে সবুজাভ আলো প্রবেশ করেছে। একপাশে আরেকটি সৌধ, সম্পূর্ণ ছাদহীন। তার ভেতরে-বাইরে উঁচু উঁচু কবরের ঢিপির ওপর ঘন ফার্নের আচ্ছাদন।
গাজির বাগানে পা রাখার পর থেকেই চাটুজ্যেকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। উজ্জ্বল চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, মাঝে মাঝে দুই হাতের তালু ঘষে বিড়বিড় করছিল তারকব্রহ্মা মন্ত্ৰ
‘হরে মুরারে মধুকৈটভারে!’
.
এদিকে পাগলরামের পা সরে না। এই সেই বন! এখানেই খুল্লতাত রামদেব সংসার পরিত্যাগ করে এসে আশ্রম গড়েন, অস্পৃশ্য নারীর সঙ্গে বসবাস করেন, শেষে গুটিবসন্তের মহামারীতে মারা যান। মৃতদেহ সৎকার হয়নি। এ এক বিস্মৃতিভূমি, অভিশপ্ত, অপবিত্র, পরিবারে কেউ কখনো পা রাখে না। ওলন্দাজডাঙার ঘাট থেকে বজরায় ওঠার আগে গন্তব্য সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও জানলে সে কোনোমতেই আসত না।
এতক্ষণে ওর মুখের অভিব্যক্তি ঠাওর করে চাটুজ্যে। কাঁধে হাত রেখে বলে— ‘কী হলো সখা? তুমি কি ভূতপ্রেতের ভয় পাচ্ছ? ভয় নেই, এই দেখ পিশাচতাড়ন যষ্টি!’
হাতের রুপো-বাঁধানো শৌখিন ছড়িটা তুলে দেখায়, তারপর অট্টহাস্য করে উঠে পাগলরাম কিছু বলার আগেই ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ভাঙা মসজিদটার দিকে। এদিকটায় অনেকগুলো কারুকার্যমন্ডিত ব্যাসাল্ট পাথর, অনেকটা দূর্গের মতো বেষ্টনি রচনা করেছে। ছড়ির আঘাতে কী একটা লম্বা মতো বস্তু সশব্দে গড়িয়ে আসতে পাগলরাম শিউরে ওঠে। হঠাৎ মনে হয় মানব কঙ্কালের উরুর হাড়! নীচু হয়ে তুলে নেয় চাটুজ্যে, হাতে নিলে বোঝা যায় ইস্পাতে তৈরি নলের অংশ।
‘হরে মুরারে মধুকৈটভারে
গোপাল গোবিন্দ মুকুন্দ শৌরে!’
রাজমোহন চাটুজ্যের উদাত্ত কণ্ঠস্বর নিঝুম বনতলে প্রতিধ্বনি হয়, মাথার ওপর গাছের ডাল থেকে দুটি নীলচে কবুতর ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে যায়। পাগলরাম বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে ওর মুখের দিকে তাকায়, পেয়াদা দুজনও পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। হাকিম সাহেবকে কি জংলি ভূতে পেল? যাঁকে দেখলে কাছারিবাড়ির উঁচু উঁচু থামগুলোও তটস্থ হয়ে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁকে এমন প্রগলভ অবস্থায় ওরা এর আগে কখনো দেখেনি।
ইস্পাতের নলটি হাতে নিয়ে ঝাঁকিয়ে ভেতরে জমে থাকা মাটি হাতের তালুতে নিয়ে পাগলরামের দিকে বাড়িয়ে ধরে চাটুজ্যে।
‘এই দেখ সখা, এ হলো পবিত্র রক্তে ভেজা মাটি! পলাশীর মাটিও বাঙালির রক্তে ভিজেছিল, ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল নবাবের লসকরেরা। কিন্তু সে ছিল পরাজয়ের ইতিহাস। এই মাটিতে মিশে আছে প্রতিরোধের রক্ত। সেই প্রথম, কিন্তু শেষ নয়। সেই আত্মবলিদানের ইতিহাসটা আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি!’
‘তুমি কি কো-কোম্পানির সেপাইদের কথা বলছে?’ পাগলরাম জিজ্ঞেস করে।
‘আমি কামান শাহ আর ঘামন্ডি গিরির কথা বলছি! উফফ্, কী লড়াইটাই না দিয়েছিল দুজনে, ভাবো দিকি একবার!
*
এক শনিবার ওলন্দাজডাঙার কাছারির হাকিম রাজমোহন চাটুজ্যে যখন আদিরামবাটির ছাপাখানা দেখতে এল, কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে তার সঙ্গে পাগলরামের এমন প্রগাঢ় সখ্য গড়ে উঠবে। পাগলরাম নিজেও কি পেরেছিল? রাজমোহন চাটুজ্যের যে আরেকটি পরিচয় আছে সেটা তার জানাই ছিল না। সেদিন সন্ধ্যার পর স্ত্রী হিরণ্ময়ী জিজ্ঞেস করল
‘ইনি কি সেই নবেল লেখক রাজমোহন চাটুজ্যে?’
‘নবেল লেখক?’ পাগলরাম ভুরু কুঁচকেছিল।
‘হ্যাঁ গো, ওই নামে একজন নবেল লেখক আছেন।’
ধর্মতলা বার্তা-র প্রকাশক হয়ে দুনিয়ার খবর ছাপে পাগলরাম, অথচ সেই কী না এই খবরটা জানে না। জানে কে? হিরণ্ময়ী, যে কখনো বাড়ির উঠোনের বাইরে পা রাখেনা।
নিজে উদ্যোগ নিয়ে পালটি ঘরে সাক্ষর মেয়ে দেখে ছোটো ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছে গঙ্গারাম। হিরণ্ময়ী বই পড়তে চিঠি লিখতে জানে, শুভঙ্করী আর্যা জানে।
‘তুমি কী করে জানলে? তুমি কি ওনার লেখা নবেল পড়েছ?’
‘আমি কী করে পড়ব? আমি শুনেছি গঙ্গাজল আন্নাকালীর কাছে।’
‘আন্নাকালী নবেল পড়ে?’
‘আন্নাকালী তো ক-অক্ষর গোমাংস, ও কী করে পড়বে?’ হিরণ্ময়ী ঠোঁট উল্টে বলে। ‘ওর বর ভোলা ঠাকুর নুকিয়ে বাড়িতে এনে ওকে পড়ে শোনান। উনি বটঠাকুরের টোলে পড়েন।’
‘বাব্বা! ন-নবেলের এত মা-মাহাত্ম্য তা তো জানা ছিল না!’
পাগলরাম বলেন। প্রকাশ্যে নবেল পাঠ সাতগাঁর ভদ্র পরিবারে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এদিকে অন্দরমহলবাসিনীদের প্রবল আকর্ষণ চাটুজ্যের লেখা নবেলের প্রতি। রক্ষণশীল পরিবারে গুরুজনদের কড়া নজরদারি এড়িয়ে তরুণ স্বামীরা বাইরে থেকে বইয়ের একটি-দুটি করে ফর্মা ছিঁড়ে উড়নির আড়ালে এনে রাত্রিবেলা পালঙ্কশয্যায় প্রদীপের আলোয় পাতা উলটে তাদের বুকের ওপর উদগ্রীব নিরক্ষর স্ত্রীর কানে কানে ফিসফিস করে পড়ে শোনায়।
কলকাতায় বটতলায় ছাপা কেচ্ছাকাহিনির বইয়ের বাজার ভালো, পাগলরাম জানে। ধর্মতলা বার্তা-র সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিকোয় রসের বই, গ্রামের হাটে ফেরিওয়ালারা ঝাঁকায় করে নিয়ে গিয়ে বেচে। তরুণ পোড়োরা চাঁদা তুলে কিনে নদীর ধারে ক্ষেতের আলে নির্জনে বসে পালা করে জোরে জোরে পড়ে, শোনে। রাজমোহন চাটুজ্যের মতো শিক্ষিত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী যে বাংলায় ওই গোত্রের বই লিখতে পারে সেটা জেনে বিস্ময় জাগে বৈকি।
এসব সত্ত্বেও ছাপাখানা দেখতে আসার সময় তার সহজ অনাড়ম্বর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে একটি সৌজন্যমূলক চিঠি লিখেছিল পাগলরাম, নবেল লেখক হিসেবে তার খ্যাতির ব্যাপারে অজ্ঞতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছিল। তিন দিন পরে লাল কোমরবন্ধ আঁটা উর্দিধারী আর্দালির হাতে চিঠির উত্তর এল, সেইসঙ্গে রাজমোহন চ্যাটার্জির স্বাক্ষরিত দুটি নবেল। সেই রাতে প্রদীপের সলতে উসকে তুলে শায়িত পাগলরামের বুকের ওপর বই রেখে ওকেই পড়ে শোনালো হিরণ্ময়ী। পর পর পাঁচ রাত ধরে দুটি বই শেষ করার পর পাগলরাম উপলব্ধি করল: নবেল নামক এই নব্যকাহিনি নিয়ে সমাজের রক্ষণশীল মহলে যে কারণে এত আপত্তি, ঠিক সেই কারণেই নতুন প্রজন্মের অন্দরমহলবাসিনীদের এত আগ্রহ। নবেলে যে নারীচরিত্ররা থাকে, তারা পুরুষের ভোগ্যবস্তু কিংবা জড় পদার্থ নয়; তারা চলাফেরা করে, কথা বলে। সবচেয়ে বড়ো কথা, নবেলে খুব খোলাখুলিভাবে বিশদে যা নিয়ে লেখা থাকে তা হলো নারীর সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে অশ্লীল, সবচেয়ে বিস্ফোরক অঙ্গ তার মন। সেই মনে লুকোনো আবেগ, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন।
*
হুগলির ওপারে কাঁটালপাড়ায় রাজমোহনের পৈতৃক বসতবাটি। ওলন্দাজডাঙার ঘাট থেকে নদী পেরিয়ে মুক্তারপুরের খাল দিয়ে বাড়ির লাগোয়া ঘাটে গিয়ে ওঠা যায়। সম্প্রতি কলকাতায় মেডিকেল কলেজের কাছে একটি বাড়িও কিনেছে রাজমোহন তার লেখা নবেলের কাটতি বাড়ার পর কলকাতায় প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ছাড়াও বিদ্বৎসমাজে যাওয়া-আসা বেড়েছে। তাছাড়া অফিসের কাজে মাঝেমধ্যেই হেডকোয়ার্টারে যেতে হয়। ওলন্দাজডাঙায় কাছারির কাজ মিটতে মিটতে প্রায়ই সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। তারপর ভরা নদী পেরিয়ে বাড়িতে ফেরার ঝক্কি, এছাড়া যৌথ পরিবারে নিরিবিলিতে লেখালিখির অবকাশ সামান্যই। সেজন্য পোর্তোহাটায় নদীর ধারে একটি ছিমছাম একতলা বাসা ভাড়া নিয়েছে রাজমোহন। এক সন্ধ্যায় সেখানে পাগলরামকে চায়ের আমন্ত্রণ জানালো।
ছাপাখানা পরিদর্শনে গিয়ে আদিরামবাটিতে মন্দির, টোল, ঠাকুরবাড়ি দেখেছে রাজমোহন। সেই বাড়ির ছেলে চা বিস্কুট ছোঁবে কি না সে ব্যাপারে মনে খটকা ছিল। ফল-মিষ্টির ব্যবস্থাও রেখেছিল। কিন্তু যখন জানল দিনেমারডাঙায় ক্রিশ্চান পাদরির বাড়িতে এমনকি হট চকোলেটও পান করেছে পাগলরাম, খুশিতে দুই হাতে তালি মেরে বলে উঠল–
‘ব্রাভো! হরে মুরারে!’
বাবুর্চির আনা চায়ের সরঞ্জাম থেকে নিজেই পেয়ালায় চা ঢেলে দুধ চিনি মিশিয়ে পাগলরামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল–
‘সেদিন আপনাদের বাড়ি ছাপাখানা দেখতে যাওয়ার নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন?’
‘তা একটু হয়েছিলাম বৈকি, পাগলরাম হাসে। ‘একটু বিচলিতও হয়েছিলাম। ভাবলাম না জেনে আবার কোন আইন ভেঙেছি যে খোদ হাকিম সাহেব আসছেন!’
রাজমোহন উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠে। বাক্স খুলে সিগার বের করে তার মুখটা রুপোর কাঁচি দিয়ে কাটতে কাটতে বলে
‘হাকিমিটা আমার পেশা, নেশা নয়। কিছুকাল ইংরেজিতে লিখেছিলাম, এখন বাংলায় লিখছি। বাংলায় এভাবে নবেল লেখার চেষ্টা এর আগে কেউ করেনি। আমার বই লোকজন পড়ছে।’
‘সে তো ব-বটেই, বিশেষ করে মেয়েমহলে। পাগলরাম বলে। ‘সে আমি আমার গি-গিন্নির মা-আ-রফৎ জেনেছি।
‘বই বিকোচ্ছে, কিন্তু প্রকাশক রয়্যালটি দিচ্ছে না। তাই ঠিক করেছি নিজের বই নিজেই ছাপব, কাটালপাড়ার বাড়িতে একটি ছাপাখানা বসাবো।’
‘এ তো অতি উত্তম ভাবনা! এ ব্যাপারে আমি যদি কো-কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি তাহলে কৃ-ই-তার্থ হব।’
‘বেশ কথা!’ সিগারে তৃপ্তির টান দেয় রাজমোহন। ‘বিদ্যাসাগর মশাই কলকাতায় বসে নিজের বই নিজে ছাপিয়ে যথেষ্ট টাকা করেছেন, সেটা জানেন তো? আচ্ছা বলুন তো, উনি পারলে আমি কেন পারব না?’
‘আলবাৎ পারবেন! আপনি কো-ও-মর বেঁধে নৃ-নেমে পড়ুন।’
‘হ্যাঁ, আর এই কাজটা যদি সফলভাবে করতে পারি তাহলে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি লেখায় মন দেব। ইংরেজদের গোলামি আর করব না। বাংলার মানুষ এখনও অন্ধকারে ডুবে আছে। এতকাল ধরে বিদেশী শাসকের পায়ের নীচে থেকে স্বাধীন চিন্তার শক্তি হারিয়েছে। নিজের অতীত গৌরবের ইতিহাস ভুলেছে। যদি ছাপাখানাটা করতে পারি তাহলে নিজের বই ছাপানোর পাশাপাশি একটি মাসিক পত্রিকাও বের করব ভেবেছি। অনেকটা আপনার ধর্মতলা বার্তা-র মতো, তবে তাতে জ্যোতিষ গণনা কিংবা রেলের টাইম টেবিল থাকবে না।’
দ্বিতীয় দিন ওর বাসায় যেতে রাজমোহন পাগলরামকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল-
‘আপনি তো টোলে সংস্কৃত শিক্ষা করেছেন। আমার কেতাবের বাংলা ভাষা পড়ে কী মনে হলো?’
‘এ খু-উ-উ-ব নতুন ধরনের বাংলা ভাষা, হাকিম সাহেব,’ পাগলরাম বলল।–‘এরকম বাংলা আমি আগে কখনো প-পড়িনি।’
‘কোনোরূপ ব্যাকরণগত ত্রুটি গোচরে এল কি, চক্কোত্তি মশাই?’
রাজমোহনের নবেলে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিয়ে সাতগাঁর পণ্ডিতদের আপত্তির বিষয়টা পাগলরাম জানত। কেউ কেউ টোলের পড়ুয়াদের পাততাড়ির নীচে লুকোনো রাজমোহনের নবেল আবিষ্কার করে কৌতূহলবশে কয়েক পাতা উলটে দেখেছে, কেউ চোখেও দেখেনি। কিন্তু সকলেরই বদ্ধমূল বিশ্বাস যে কথ্য বাংলার সঙ্গে ধ্রুপদী সংস্কৃত শব্দবন্ধ মিশিয়ে আজগুবি কাহিনি ফেঁদে রাজমোহন যে কেবল তরুণ প্রজন্মকে উচ্ছন্নে পাঠানোর বন্দোবস্ত করছে তাই নয়, বাংলা ও সংস্কৃত দুটি ভাষারই সর্বনাশ করছে। তারা বাংলা ভাষার এই বিচিত্র লেখ্য রূপের নাম দিয়েছে— ‘ক্যালকাটা বাংলা’। এই নিয়ে সম্মিলিতভাবে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় প্রতিবাদপত্র লেখার একটা পরিকল্পনা শেষপর্যন্ত অবশ্য দানা বেঁধে ওঠেনি। হাজার হোক রাজমোহন চাটুজ্যে ইংরেজ সরকারের হাকিম, তার একটি কলমের খোঁচায় টোলে সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
‘ভাষাগত চ্যুতি কিছু কিছু জায়গায় আমার গো-গোচরে এসেছে বটে,’ পাগলরাম বলে, তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে মাথা নেড়ে জানায়— ‘কিন্তু হাকিম সাহেব, অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? সেই চ্যুতির অংশগুলিই আমার সবচেয়ে ম-ম- মধুর লেগেছে!’
‘হরে মুরারে!’
রাজমোহনের মুখে যেন দপ করে ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠে। তার লেখা নিয়ে এমন অভিনব প্রতিক্রিয়া এর আগে কখনো সে পায়নি।
‘আসুন একটা শর্ত করি।’ রাজমোহন বলে,— ‘আপনি আমায় হাকিম সাহেব বলে ডাকা বন্ধ করুন, আমিও আর আপনাকে চক্কোত্তি মশাই বলে সম্বোধন করব না। আমরা পরস্পরকে সখা বলে ডাকি বরং?’
‘তা বেশ, তবে এই ভাষা সম্পর্কে আমার আরেকটি প-পর্যবেক্ষণ আছে। আপনি যে ভাষায় কেতাব লিখছেন তা কেবল শি-ই-ক্ষিত পাঠকের বোধগম্য হবে। কিন্তু তার বা-বাইরে অগণিত মানুষ আপনার কাহিনির রস থেকে ব-বঞ্চিত হচ্ছে।’ কিন্তু তারা কি কেতাব পড়তে পারে?’
‘তারা প-পড়তে পারে না, কিন্তু শু-উ-নতে তো পারে!’
এরপর পাগলরাম জানায় কীভাবে ধর্মতলা বার্তা বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, কীভাবে বাড়ির কোনো সাক্ষর পুরুষ উঠোনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে পড়ে শোনায় এবং বাড়ির অন্যেরা, বিশেষত আচার নিষ্ঠা মেনে চলা বউ ঝিরা কান পেতে শোনে। সে দেখেছে, বটতলায় ছাপা বই গঞ্জের হাটে গাছতলায় কিংবা ময়রার দোকানের সামনে জোরে জোরে পড়ে শোনাচ্ছে কেউ, আর অনেক মানুষ গোল হয়ে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে।
‘এভাবেও তো হয়!’ পাগলরাম বলে। ‘এইসব মানুষজন আপনার লেখনির রস থেকে ব-বঞ্চিতই থেকে যাবে?’
রাজমোহন উত্তর দেয় না। আরামকেদারার হাতলে রাখা দুটো হাত জড়ো করে তার ওপর চিবুক রেখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে টিপরের ওপর সেজবাতিটার দিকে। একটি ধূসর মথ অনেকক্ষণ ধরে সুদৃশ্য কাচের ঢাকাটার চারিদিকে উড়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। নদীর দিক থেকে উড়ে এসেছে পতঙ্গটা। পুবমুখো এই বারান্দা থেকে অন্ধকারে নদীটা দেখা যায় না, কিন্তু তার বিস্তার টের পাওয়া যায়। দূরে দূরে জেলে নৌকায় আলোর বিন্দু দুলছে। জোয়ার এসেছে হুগলিতে। মথটা বার কয়েক কাচের গায়ে ঠোক্কর খেয়ে চায়ের পেয়ালার ওপর এসে পড়ল। রাজমোহন— ‘কোই হ্যায়?’ হেঁকে ওঠার আগেই কোমরবন্ধ-আঁটা কোই-হ্যায় পেয়ালা সরিয়ে নিয়ে যায়।
*
হুগলি তীরবর্তী চাটুজ্যে ডেপুটির বাসায় আরেকটি সন্ধ্যা। বাগানের লাগোয়া বারান্দায় টিপয়ে চায়ের সরঞ্জাম সিগার সাজানো রয়েছে, এছাড়া চক্কোত্তি মশাইয়ের জন্য রয়েছে আলবোলার নল।
‘বটতলায় ছাপা সস্তা কেচ্ছাকাহিনির রমরমাটা জানতাম’, রাজমোহন বলে। ‘কিন্তু মন্দিরের চাতালে রামকথা শোনার মতো করে অশিক্ষিত লোকে যে ওই চটি বইগুলো থেকে ওভাবে রস নেয় সেটা সত্যিই জানা ছিল না।’
‘শুধু ব-বটতলার বই কেন?’ পাগলরাম বলে। ‘মেয়েমহলে রাজমোহন চাটুজ্যের নবেলের কদরও তো ওই কানে শুনেই। শ্রু-উ-তি!’
হো হো করে হেসে ওঠে রাজমোহন, পরক্ষণেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
‘বুঝলে সখা, কাঁটালপাড়ায় তোমার মতোই গোঁড়া বামুন পরিবারে বড়ো হয়েছি, তারপর কলকাতায় গিয়ে বিলিতি শিক্ষে পেয়েছি। দেশটাকে তো চিনিনি। এজলাসে হাকিমি করতে বসে রোজ রোজ মানুষের লোভ, শঠতা আর দুর্দশার গল্পগুলো শুনতে শুনতে চিনলাম। কিন্তু জমিজমা খুন জোচ্চুরি রাহাজানি থানা পুলিশ মামলা মকদ্দমা দলিল দস্তাবেজের ভেতর দিয়ে সমাজের যে ছবিটা ফুটে ওঠে, সে বড়ো খন্ডিত। তার বাইরেই থেকে যায় এই সমাজের বাকি অর্ধেক অংশ।’
‘তারা কারা?’ পাগলরাম বলে।
‘যাদের কাছে আমার লেখার কদর আছে অথচ লেখা পড়তে পারে না।’ রাজমোহন রহস্যময় হাসে। ‘তুমিই বলেছো।’
‘না-আ-রীসমাজ?’
‘হ্যাঁ, এজলাসের ভেতরে সেই সমাজটা ভাষাহীন, নীরব। কখনো-সখনো তাদের কাঠগড়ায় দেখা যায় বটে, কিন্তু একগলা ঘোমটায় নয়তো বোরখায় ঢাকা। তাদের মুখ দেখা যায় না, কথা শোনা যায় না, তাদের মনের হদিশ কিছু পাওয়া যায় না। অথচ দ্যাখ, আমার ঘরে আলমারি ভর্তি বিলিতি নবেল। এইসব বইয়ের পাতায় পাতায় নারীমনের যে গহীন জগতের সন্ধান পাই, তার ভেতরে ডুব দিলে নিজের ঘরের বউকেও কেমন অচেনা রহস্যময় মনে হয়। বিশ্বেস কর!’
সেজবাতির আলোয় পাগলরামের চোখ দুটি চকচক করে। নিভে যাওয়া সিগারে ফের অগ্নিসংযোগ করে রাজমোহন
‘এ যে কি বিচিত্র অতৃপ্তি আর অস্থিরতা সে আমি তোমায় বলে বোঝাতে পারব না, সখা। পুরাণ বলো, লোককাহিনি বলো, হালফিল বটতলার মেঠো রসের কিস্যাই বলো, যে নারী আমরা পাই তাদের কিন্তু মন নেই। দেহপিন্ডের বাইরে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই, ইতিহাসের বহতা স্রোতে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এদিকে তুমি স্টুয়ার্ট সাহেবের হিস্ট্রি অব বেঙ্গল পড়ো, গেজেটিয়ার আর স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্টগুলো পড়ো, সমাজ জীবনের একটা ইতিহাস পাবে বটে, কিন্তু সে শাসকের চোখ দিয়ে দেখা। প্রবহমাণ কালের হাড়গোড় আছে তাতে, কিন্তু প্রাণসঞ্চার করতে যে কল্পনা লাগে তা নেই। থাকার কথাও নয়। আমি তাই প্রথম দিকে গ্রামবাংলার আটপৌরে জীবনের কাহিনি লিখতে শুরু করেছিলাম, ইংরেজিতে। ইন্ডিয়ান ফিল্ড কাগজে ধারাবাহিক ছাপাও হচ্ছিল। কয়েক কিস্তি লিখে বন্ধ করে দিলাম।’
‘সে কি! কে-কেন?’
‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড পড়ে গুটিকয় ইংরেজ আর আমার মতো নেটিভ বাবুরা। তারা জাহাজে-আসা আর্মি নেভি স্টোরের টিনের সুখাদ্যের মতো ডিকেন্স থ্যাকারের নতুন নবেলের জন্য হেদিয়ে থাকে। আমি তাই বাংলায় লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু নারীরা পড়তে পারবে এমন ভাষায় লেখা? তুমি আমায় ভাবালে সখা!’
*
আশ্বিনের সন্ধ্যাবেলা কাছারি থেকে ফিরতে পাগলরামের লেখা চিরকুট দিয়ে গেল কোই-হ্যায়।
ছাপাখানায় বিভ্রাট। আগামীকল্য ধর্মতলা বার্তা প্রকাশিত হইবার দিন, এদিকে কল বিকল। কলিকাতা হইতে মেকানিক আসিয়াছে বৈকালের রেলে। অদ্য সন্ধ্যা দার্জিলিঙের পেয়ালা ও সখার ওষ্ঠসুধা বিনে নিষ্ফলই যাইবে তাহা বলাই বাহুল্য। আগামীকাল বাসায় থাকিলে অবশ্য যাইব।
ব্যক্তিগত ভৃত্য গণেশকে চায়ের সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে বলে বাথটবে ঈষদুষ্ণ জলে ভালো করে স্নান সারল রাজমোহন, গায়ে ঢালল গোয়াঁ কোম্পানির ওডিকোলন।
‘পুবের বারান্দায় বসবে কি বাবু? ওখানে টেবিল সাজাই?’ গণেশ বলল।
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ড্রেসিং গাউনের ফিতেটা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে বাইরে এল রাজমোহন। টিপয়ে সাজানো চায়ের ট্রে, সিগারের বাক্স আর টমাস স্মিথের দ্য ম্যাজিকাল হার্ট অফ হিন্দুস্থান। এই সাহেবটি ফার্সি জানে, আমীর খসরু অনুবাদ করেছে। সদ্যপ্রকাশিত বইটা এখানে স্টেশন ক্লাবের লাইব্রেরিতে এসেছে, কিন্তু সেখানে রাজমোহনের ঢোকার অনুমতি নেই। এই কপিটা কলকাতায় লালদিঘির ধারে অ্যান্ড্রুজ বুকশপ থেকে আনানো, এখনও পাতা কাটা হয়নি।
হঠাৎ খুব রাগ হয় রাজমোহনের, পরক্ষণেই হেসে ওঠে। না, স্টেশন ক্লাবের লাইব্রেরিতে কোনোদিন রাজমোহন চ্যাটার্জির লেখা বই থাকবে না। ওখানে বাংলা বই থাকে না।
‘পেপার কাটিং নাইফ লে আও!’ কোই-হ্যায়কে ডেকে বলে।
বাগানে অন্ধকার কিন্তু নদীর ওপারে পুব আকাশটা পাতলা হচ্ছে। বাতাসে কী একটা অচেনা ফুলের গন্ধ। এই গন্ধটা সেদিন গাজির বাগানে ঢুকে পেয়েছিল না? চোখ বন্ধ করে লাউঞ্জ চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয় রাজমোহন।
মনের চোখে ভেসে ওঠে গাজির বাগানে সেই ছাদবিহীন মসজিদ আর কবরের ঢিবি, সবজেটে আলোয় দেখা, বাসাল্ট পাথরের বেষ্টনির ভেতরে সেই হাতকামানের নলটা।
মাথার মধ্যে একটা কাহিনি দানা বেঁধে উঠছে। কামান শাহ আর ঘামন্ডি গিরিদের ঢের আগের কালের সে কথা।
.
টুকরো টুকরো খবরগুলো সুদূর বাংলা থেকে এসে পৌঁছচ্ছিল দিল্লিতে। রাজা নৃপতির কাঠের পোড়া প্রাসাদের স্থানে দরপ খান লখনৌতির স্থপতিদের দিয়ে পোড়া ইটের সুদৃশ্য আবাস নির্মাণ করেছেন। সাতগাঁর উত্তরের বন সাফ করে উপাসনাস্থল গড়েছেন, ঘাটের ধারে মিরাদর বানাচ্ছেন। দরপ খান যে আর কোনোদিন বাংলা থেকে ফিরবেন না, সেটা তিনি নিজে জানার আগেও জানতেন একজন। এবং দিল্লির সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে সে কথা বলার মতো বুকের পাটা তাঁর ছিল।
‘আল্লা মেহেরবান, কিন্তু ওর ফেরার অপেক্ষায় আর দুশ্চিন্তা করবেন না জাঁহাপনা!’ বলেছিলেন আবুল হাসান, ওরফে খসরু।
খসরু ও খান, একজন মসীচালক আরেকজন অসিচালক। দুজনের এক বিরল সখ্য গড়ে উঠেছিল হাউজ-খাসের বাগুলির ধারে, আগুনঝরা দিনের পর স্নিগ্ধ সন্ধ্যায়, যখন জলে সবুজ টিয়ায় মুখরিত আকাশের ছায়া চুরচুর করতে আসে তৃষ্ণার্ত হরিণেরা।
কিন্তু সুলতান খসরুর কথা বিশ্বাস করতে পারেননি।
‘কলম ছেড়ে আজকাল মেহেরৌলির গন্ধকদিঘীর ধারে পোষা বাঁদর নিয়ে বসে ভাগ্য গণনা করছেন নাকি?’
‘হুজুর দুনিয়ার মালিক। তাঁর অজ্ঞাতসারে বনে একটিও ফুল ফোটে না, আকাশে একটিও তারা খসে না! সেলাম ঠুকে খসরু বললেন। ‘কিন্তু এই দীন বান্দা যদি মনুষ্য হৃদয়ের গলিঘুঁজি কিছুমাত্র জানে, তাহলে কী কারণে এই কথা বললাম সেটা পেশ করতে পারি। কিন্তু সে কথা শোনার মতো অত সময় কি জঁহাপনার আছে?’
‘যার কথা শোনার জন্য বাগিচায় পক্ষীকুল চুপ করে যায়, এমনকি যমুনার স্রোত থেমে যায়, তার জন্য সময় নেই এত বড়ো আহাম্মক পৃথিবীতে কে আছে?’
‘কেয়া বাত! কেয়া বাত!’ খসরু ফের সেলাম ঠোকেন।
জালালুদ্দিন দিল্লীর মসনদে বসার আগে বলবন বংশের গিয়াসুদ্দিন হিন্দুস্থানে রাজত্ব করতেন। শুধু কবি হিসেবেই নয়, সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে থাকতে জানার বিরল প্রতিভার অধিকারী আবুল হাসান খসরু তখন তাঁর সভাসদ। সেইসময় বাংলার জায়গিরদার তুঘরল তুঘন খান বিদ্রোহ করল, দিল্লিতে খাজনা পাঠানো বন্ধ করে দিল। সম্রাট গিয়াসুদ্দিন তাকে উচিত শিক্ষা দিতে ছেলে নাসিরুদ্দিন বুগরা খানকে বাংলায় পাঠালেন।
‘তারপর…’ খসরু রহস্যময় হেসে ঘাড় কাত করে হাত দুটি শূন্যে প্রসারিত করেন।
‘তারপর কী?’ সুলতান কৌতুহলী হয়ে ওঠেন।
‘নাসিরুদ্দিন সফল ভাবেই তাঁর কর্তব্য পালন করলেন, তুঘরলের কাটা মাথা কাঠের বাক্সে ভরে দিল্লিতে পাঠালেন।
‘সে আর ফিরে এল না?’
‘শুধু যে ফিরে এল না তাই নয় জঁহাপনা, তুঘরলকে সমূলে উৎপাটিত করে বাংলার শাসক হয়ে বসার পর যখন তাঁর পিতৃদেব জন্নতে যাত্রা করেন, বুগরা খান দিল্লির মসনদ প্রত্যাখান করল।’
‘এও কি সম্ভব?’ সুৰ্যা-চর্চিত চোখ দুটো বিস্ফারিত করেন সুলতান। ‘এমন আজব তবকত কে কবে শুনেছে?’
‘না জাঁহাপনা, কেউ শোনেনি।’ খসরু মাথা নাড়েন। ‘একজন শাহজাদা মসনদের ন্যায্য সিংহাসনের অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করছেন, দুনিয়ার সবচেয়ে শানদার সাম্রাজ্য শাসনের সুযোগ প্রত্যাখান করছেন কেবলমাত্র একটি সুদূর প্রান্তিক প্রদেশে থেকে যাবেন বলে, এমন কথা সত্যিই কোনো কুর্সিনামায় লেখা নেই।’
‘একটি সুদূর প্রান্তিক প্রদেশে থেকে যেতে চান…’ সুলতান জালালুদ্দিন অস্ফুটে আওড়ান, নিজের অঙ্গুরিখচিত হাতের আঙুলগুলি নিরীক্ষণ করেন। ‘আপনি আমায় বলতে পারেন শায়ের, বাংলা নামে এই সুদূর প্রান্তিক দেশে খাস কী আছে? কোন মোহিনী জাদুগরনী বাস করে সেখানে?’
‘আমি ওই দেশে মাত্র একবার গেছি, জাঁহাপনা, নাসিরুদ্দিন বুগরা খানের অতিথি হয়ে। কিন্তু ওই মোহিনী জাদুগরনী সম্পর্কে যদি জিজ্ঞেস করেন আমি কিছু বলতে পারব না। আমি কেন ওর মায়া কাটিয়ে দিল্লি ফিরে আসতে পারলাম সেটুকুই শুধু আপনাকে বলতে পারি।’
সুলতান অপেক্ষা করেন, সভা ভর্তি আমীর ওমরাহরা অপেক্ষা করেন। আটষট্টি জোড়া চোখ খসরুর ঠোঁটে রহস্যময় বঙ্কিম ছাঁদে নিবদ্ধ।
‘তার কারণটা হলো আমার নাভিরজ্জুটা পোঁতা আছে এই শহরে, জঁহাপনা, আর সেখান থেকে একটি অদৃশ্য গাছ সৃষ্টি হয়েছে। সেই গাছের শিকড় চারিয়ে গিয়েছে দিল্লির মাটিতে, ডালপালা ছড়িয়ে গিয়েছে দিল্লির আকাশে। যেখানেই আমি যাই, যতদূরেই আমি যাই না কেন, সেই গাছটা আমার কানে কানে ফিস ফিস করে বলে চল খসরু ঘর আপনে! চল খসরু ঘর আপনে! যত বেশিদিন আমি দিল্লি ছেড়ে থাকি, তত তীব্র হয়ে ওঠে সেই ডাক। আমায় ফিরিয়ে আনে। যত দূরেই যাই না কেন, ঘোড়ায় ফের জিন পরাতে হয়।’
কোন সে জাদুগরনী, যে এই ইস্পাতকঠিন পুরুষদের বাংলার মায়ায় বেঁধে ফেলত? হৃদয়ে দাউ দাউ অভিযানের ক্ষুধা নিভে গিয়ে মধুর পাত্রে মাছির মতো স্থির অবিচল হয়ে উঠত তারা? এই ধাঁধা সমাধানের জন্য বাংলার শাসকের অতিথি হয়ে একটি ঋতু খসরুর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তবে দিল্লিতে একাধিক সুলতান বংশের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অলিন্দে কাটানোর পর তিনি যা জেনেছিলেন, সেটা সেদিন সভায় বলেননি সুলতানকে।
মামলুক থেকে তুঘলক অব্দি পরপর শাসকের আমলে তৈরি দিল্লিতে যেখানে যত লাল পাথরের সৌধরাজি ছিল, সেসবই হাউজ-খাসের জলে প্রতিফলিত অপরাহ্ণের আলোর মতোই অপস্রিয়মাণ, মরীচিকাবৎ। বিরামহীন খরা আর বালুঝড়ে ধ্বস্ত গাঁঘর ছেড়ে, মধ্য এশিয়ার রুক্ষ প্রস্তরাকীর্ণ প্রান্তর বেয়ে ঘোড়ার পিঠে কঠিন যাত্রায়, রোষকষায়িত সূর্য থেকে বাঁচতে রাতভর চলায়, চন্দ্রালোকিত অন্তহীন মরুভূমির ওপর দিয়ে, জিনের ওপর নিতম্ব আর উরু ক্রমাগত ঘর্ষণে ছালছাড়ানো দগদগে মাংসের মতো, উটের চামড়ার তাঁবুতে জীবন্ত কাবাবের মতো সেঁকা হতে হতে, তরবারির ঝলসানি আর উষ্ণ তাজা রক্তের ঝলকানির ভেতর দিয়ে পথ করে নিয়ে সিন্ধু নদের পূর্ব পাড়ে আসার এই অসহনীয় চ্যালেঞ্জ যারা সইত, সে শুধুমাত্র একটি স্বপ্নের জন্য, যা তারা ঝড়ের ভেতরে জ্বলন্ত প্রদীপের মতো আগলে রাখত বুকে। সেই স্বপ্ন প্রাচুর্যের, ছোটোবেলা থেকে শুনে আসা অসংখ্য পর্যটকের তবকাতে মোড়া, জাফরানে মশলায় সুগন্ধী, রেশমের চেকনাই আর মসলিনের স্বচ্ছতায় ছাওয়া। দীর্ঘ যাত্রার শেষে দিল্লিতে আসার পর, ক্ষমতা ও শৌর্যের জারানো আরক পান করার পর, অগণন যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার পর, কখন যে সেই স্বপ্ন ফাপা আর রংজ্বলা হয়ে ওঠে, ছেলেভোলানো বাতিল খেলনার মতো, এবং সেই সময় যদি দৈবযোগে তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলার মাটিতে এসে পা রাখে, নদীনালায় বিধৌত এই মাটিতে, বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা তাজা স্নিগ্ধ বাতাসে শ্বাস নেয়, উর্বর এই মাটির বুকে চোখের দুইটি পলকের মাঝে বীজের অঙ্কুরিত হয়ে ওঠা চাক্ষুষ করে, সেই স্বপ্নের নিভু নিভু প্রদীপটা ফের দপ করে জ্বলে ওঠে বুকের ভেতর। একটু সুস্থির প্রশাস্তির জন্য আকুল হয়ে ওঠে প্রাণ, এক জটিল মিঠে ক্লান্তির মতো অনুভূতি বাংলায় যার নাম আবুলি তাদের ঘিরে নেয় ঘুমন্ত নদীর শ্বাসপ্রশ্বাসে উদগত কুয়াশার মতো, যে কুয়াশার তন্তু চরকায় জড়িয়ে মসলিনের সুতো বোনে কাটুনি মেয়েরা। এবং এভাবেই ধার্মিক পুরুষেরা, ইস্পাতকঠোর এবং বিশুদ্ধ হৃদয়ের বান্দারা, আপন সত্তাকে ঘিরে রেশমকীটের মতো এক অদৃশ্য গুটি নির্মাণ করে, বিশ্বাস আর প্রশান্তিতে বোনা এক নিবিড় জীবন, যাতে তারা একদিন প্রজাপতি হয়ে উঠতে পারে সেই পবিত্র পৃথিবীতে যেখানে একমেবাদ্বিতীয়ম্ ঈশ্বর ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং হজরত মোহম্মদ তাঁর প্রেরিত রসুল, জঁহাপনা।
.
বন্ধ চোখের পাতায় আলোর দীপ্তিতে চোখ খুলে রাজমোহন দেখে নির্মেঘ পুব আকাশে থালার মতো চাঁদ উঠছে। আজ পুর্ণিমা। সকাল থেকে যে থমথমে গুমোট ভাবটা ছিল, সেটা কেটে গিয়েছে। হুগলির বুকে স্নিগ্ধ হাওয়া বইছে। শরতের ফিরতি বাণিজ্যবায়ু।
বারান্দা থেকে সিঁড়ি নেমেছে বাগানে। একফালি ঘাস জমি পেরোলেই ঘাট, বজরাটা বাঁধা আছে। ঘাটের ধারে কামিনী গাছে ফুল এসেছে ঝেপে, চাঁদের আলোয় সাদা ফুলগুলো ঝিকমিক করছে, বাতাসে সৌরভ অডিকোলনের সুগন্ধ ছাপিয়ে উঠছে। খালি পায়ে রাজমোহন ঘাসের ওপর নেমে আসতেই নিঃশব্দ ছায়ার মতো কোই-হ্যায় চটিজোড়া নিয়ে আসে। হাত তুলে ওকে বিরত করে।
সদ্য স্নাত পায়ের নীচে সজীব ঘাসের স্পর্শ, বর্ষার পর চারদিক সতেজ, জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। নদীটা কিছু দূরে তরোয়ালের মতো বাঁক নিয়েছে কোয়ার্সভিলে। ওপারে তীরভূমি গাছগাছালিতে ঝাপসা হয়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে মিটমিট করে জ্বলছে জনপদের আলো। ওই আলোর মধ্যেই কোথাও রয়েছে তার বাস্তুভিটে, সেখানে স্ত্রী ও শিশু কন্যা রয়েছে। এই সময়ে সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়ের প্রশান্ত ঘুমন্ত মুখটা কল্পনা করতে গিয়েও পারে না রাজমোহন। আজ চিত্ত অস্থির, শূন্য। স্নান করে গায়ে গ্যেয়ল কোম্পানির দামি ওডিকোলন মাখার পরেও যেন চিটচিট করছে কী একটা গ্লানি, সারাদিনের অসংখ্য তুচ্ছ অবজ্ঞা আর হীনমন্যতার ক্লেদ। উদীয়মান পূর্ণ শশীর আলোয় ওপারের মিটমিটে আলোগুলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। ঘাটের সিঁড়িতে এক-পা দু-পা করে একেবারে জলের ধারে নেমে আসে রাজমোহন। সামনে রুপোলি প্রবাহ, সেই অচেনা ফুলের গন্ধ, পায়ের নীচে ছলাৎছল জল, বহমান পলির অণু পরমাণু। এই পলি দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এই ভূমি, সজল সুফল উর্বর, এই সবুজ তৃণ, এই নদী, এই স্নিগ্ধ শুশ্রূষার হাওয়া। ক্রমশ সে অনুভব করে, পায়ের পাতার নীচে জোয়ার ঠেলে উঠছে, দুর্বোধ্য আধো আধো স্বরে কথা বলছে যেন তার ছোট্ট মেয়ে। তার হাতের স্নিগ্ধ স্পর্শ পেতেই রাজমোহনের আচমকা মনে পড়ে যায় প্রয়াত মায়ের মুখ, জলের শত আঙুল পায়ের পাতা জড়িয়ে নিতে থাকে। একটা রাতজাগা পাখি টি টি করে ডেকে গেল। কী আশ্চর্য পুলকিত এই যামিনী। এমন কত শত যামিনী তার জন্মের কতকাল আগে কত ভিনদেশি মানুষকে বেঁধেছে এই ভূমিতে, যারা আর ফিরে যায়নি, যাদের মায়ের আঁচলের মতো জড়িয়েছে এই মাটি, এই হাওয়া, এই জল, যার কথা কোনো পোড়ামাটির গায়ে, পাথরে নথিতে, গেজেটিয়ারের পাতায় লেখা নেই। কত যুগ আগে এমনই এক যামিনীর শেষে পায়ের নীচে সজীব স্ফুরিত জলের স্পর্শ পেয়েছিল এক লসকর-ই-তুরকান।
‘বন্দে মাতরম্!’
কিছু না ভেবেই অস্ফুটে উচ্চারণ করে ওঠে। কী আশ্চর্য দুটি শব্দের শক্তি বন্দে মাতরম্! হে মাতা, তোমাকে বন্দনা করি! মাথার মধ্যে ঘোড়ার খুরধ্বনি শুনতে পায় রাজমোহন। একটি ছবি: বনকন্টকিত পাথুরে প্রান্তরের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে এক যুবক, তার মাথার ওপর কালো মেঘের ডানায় বিদ্যুতের শিরাউপশিরা। সে বহুকাল আগে, এদেশে ইংরেজরা আসারও ঢের আগে, যখন এই সুজলাং সুফলাং ভূমি তার নিজের কেন্দ্রে স্থিত ছিল, সুদূরের কোনো দ্বীপভূমির অধীন মহাল হয়ে নয়।
