সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.৪
১০.৪
বাড়িভর্তি লোকজন, শোকের ছায়া, বাপ্পার জীবনে অনিশ্চয়তার মেঘ। এসবের মাঝেই বসন্তরা পন্ডিচেরি ফিরে গেল। বাপ্পা তিতলিকে একলা পেল না, ওকে মায়ের অসুখের কথা জানানোর সুযোগ পেল না।
শিউলির অসুস্থতা, রথীনের ঘন ঘন বদলি, স্কুল পালটানোর মধ্যে দিয়ে ঠাঁইনাড়া হতে হতে আলোছায়ার ভেতর, অর্ধসত্যের ভেতর, দেহে মনে পরিবর্তনগুলোর ভেতর দিয়ে ভিন্ন ধরনের নিঃসঙ্গতার অনুভূতিটা এক নতুন অচেনা শহরে বাস করতে আসার মতো যেমনটা ঘটেছিল রথীনের জীবনে, তরুণ বয়সে গৌহাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসার পর। নিজের ভেতরে এক অচেনা ছমছমে কলকাতাকে আবিষ্কার করতে শুরু করেছে বাপ্পা দাঙ্গাবিধ্বস্ত, মন্বন্তরপীড়িত, কল্লোলিনী। সাতগাঁয় কেবলমাত্র বিশুকার কাছে গিয়ে বসলে একটা স্থির আশ্রয়ের অনুভূতি হয়। হেমন্তমামার ঘরে গিয়েও সেটা হয়।
অশৌচ শেষ হবার পরেও আর চুলদাড়ি কামায়নি হেমন্ত, গালভর্তি দাড়িতে মুখ ঢেকেছে। এদিকে দক্ষিণের ঘরটা নানান ধরনের পুরোনো, বাতিল, সারাতে- দেওয়া, নিতে-না-আসা যন্ত্রপাতিতে ভরে উঠেছে। এই ঘরে সারাটা দিন কাটায় সে, বাইরে বেরোয় না, কাউকে এমনকি ঘর পরিষ্কারের জন্যও ঢুকতে দেয় না।
সরোজা যখন ছিল, হেমন্তর প্রতিরোধ উপেক্ষা করে দু-তিনদিন অন্তর ঘরে ঢুকে সব জানলা দরজা খুলে বাইরের আলো হাওয়া ঢুকতে দিত; মেঝেয় টেবিলে ডাই হয়ে থাকা ঘড়ি রেডিও, বৈদ্যুতিক মোটর ইত্যাদির কলকব্জা গুছিয়ে রাখত। এরপর শিউলি বার কয়েক চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে।
‘কোথায় কোন জিনিসটা আছে সেসব আমার মাথায় থাকে। এলোমেলো করে দিলে আমি কোনো কাজ করতে পারব না,’ হেমন্ত বলেছে।
সরোজার পারলৌকিক কাজ মিটে যাবার পরে, কলকাতায় নতুন চিকিৎসা শুরু হবার আগে শিউলিরা কিছুদিন সাতগাঁয়ে থেকে গেল। মালদায় অফিসের কাজকর্ম গুটিয়ে এনে রথীন কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিংস-এ আসার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
রামপ্রাণ বাইরে থেকে অটুট আছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে মৃত্যু তাঁর বিশ্বস্ত শত্রু। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছিলেন সেই নারীর অভাবে, যিনি জীবনের এতগুলো বছর তাঁর পাশে থেকেছেন, বিয়ের পর একদিনের জন্যেও বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকেননি, যাঁর সঙ্গে একটিবার মাত্র তাঁর গুরুতর মনান্তর ঘটেছে, এবং যাঁকে তিনি— ‘ওগো শুনছ’ ছাড়া আর অন্য কোনো নামে ডাকেননি। শিউলি এসে থাকায় শোকের কিছুটা উপশম হলো। গামা নেই, নিবারণকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ডকবাজারে চায়ের দোকান দিয়েছে নিবারণ। রামপ্রাণ মেয়ের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন।
ইদানীং তিনি আলিসাহেবের পরামর্শে পাঁচ রকমের মরশুমি সব্জি ভাপিয়ে তাতে মধু, লেবুর রস, হিমালয়ের গোলাপি লবণ ও দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জয়িত্রী আর গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে প্রাতরাশ করেন। সারাদিনে ওটাই তাঁর একমাত্র খাদ্য। পাঁচ রকমের গরম মশলা একসঙ্গে নয়, একেক দিনে একেকটি, সুনির্দিষ্ট ক্ৰমে পাঁচদিন পর পর ঘুরে চলে। সপ্তাহে যেহেতু সাতটি দিন, তাই কোনো এক বারের মশলা পরের বারে গিয়ে বদলে যায়। সরোজা এই জটিল চক্র মনে রাখতেন, একদিনও ভুল হয়নি। শিউলি ক্যালেন্ডারে লিখে চালিয়ে যেতে লাগল। শারীরিক উপসর্গ নিয়ে আগের মতো না হলেও যতটা পারে ফার্মেসির কাজে সাহায্য করতে লাগল।
এই ক’বছরে শ্রীশ লাহিড়ির চোখের দৃষ্টি আরও কমেছে, ওষুধ চিনতে ভুল হয়। ঠোঁটের কোণে শ্বেতীর দাগ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বাঙ্গে। রামপ্রাণের ওষুধেকাজ হয়নি। ওঁকে সাহায্য করার জন্য শিবু চক্রবর্তীর এক শ্যালককে রাখা হয়েছিল, কয়েকদিন কাজ করার পর সে আর আসেনি। দুপুর পড়ে এলে সরোজার মতোই কুয়োতলায় বেসিনের পাশে গামছা, সাবান আর পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট মেশানো জলের গামলা নিয়ে এসে দাঁড়ায় শিউলি। খুচরো পয়সা আর কড়ি জীবানুমুক্ত করে তুলে গুনে একটি লাল রঙের খেরোর খাতায় প্রতিদিনের আয়ের হিসেব রাখে। এই কাজে বাপ্পা মাকে সাহায্য করে। ইতিমধ্যে পাটিগণিত আর বীজগণিত অনেকটা আয়ত্ত হয়েছে তার।
পয়সার স্তূপে মাঝেমধ্যেই অচল কড়ি, ইংরেজ আমলের ফুটো পয়সা, সিকি, আনা, এছাড়া ফিরিঙ্গিডাঙার বিভিন্ন দেশের মুদ্রা—কোনোটি যিশু খ্রিস্টের মুখ আঁকা, কোনোটিতে রাজমুকুট ও ঈগল পাখি, সস্ত, যোদ্ধা, ডানাওয়ালা ঘোড়া, এমনকি সুলতানি আমলের তামার মুদ্রাও থাকে। শিউলি সেসব একটি কাপড়ের বটুয়ায় তুলে রাখে। কখনো অদ্ভুতদর্শন মুদ্রা দেখলে বাপ্পা রথীনকে দেখানোর জন্য রেখে দিতে চায়। ওর বাবা সব জানে, হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে ঠিক বলে দিতে পারবে কোনটি মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলের সিক্কা, কোনটি ভেনিসিয় ড্যুকাট, কোনটি হিস্পানি ডলার, আর কোনটাই বা মলাক্কার মিয়াম। কিন্তু বাবা কাছে নেই, বাপ্পা তাই নিয়ে যায় বিশুকার কাছে। বিশুকা মুদ্রার সনাক্তকরণ করতে পারে না, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাতগাঁ বাণিজ্যনগরীর কাহিনি শোনায়।
.
এরই মধ্যে একদিন বিশুকা বাপ্পাকে ঠাকুরবাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল-
‘তোকে একটা জিনিস দেখাব। কাউকে বলবি না তো?’
বাপ্পা অভ্যাসবশে বলে— ‘দিব্যি কাটছি কাউকে বলব না!’
বিশুকা লক্ষ্মীনারায়ণের মূর্তির সামনে রাখা একটি ছোট্ট ঘাসের ঝাঁপির ভেতর কড়ির মধ্যে থেকে বের করে আনে একটি নীলাভ মুদ্রা, যার দুদিকেই হিজিবিজি লেখা, কোনো ছবি নেই।
‘কী এটা?’
‘মোহর!’ বিশুকা রহস্যময় হাসি হাসে।
আজন্ম বিশুকার নানা ধরনের হাসি দেখেছে বাপ্পা। কিন্তু এই হাসিটা কেমন যেন অচেনা। ঠোঁটে হাসি থাকলেও চোখের চাউনি উদাস আর বিষণ্ণ। বাপ্পা হঠাৎ ভয় পেয়ে যায়।
*
মৃত্যুর আগে মশাই বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা যে গোপন সত্যটি বলে গিয়েছিলেন, সেটি জানার পর অনেক রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি বিশু। বহু বছর আগে ভোরবেলায় ক্লুনির মঠের সন্ন্যাসিনীরা ব্রেড বাস্কেটে ভরে যাকে এনেছিল, মশাই যাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, এই পৃথিবীতে সে বিশুর সবচেয়ে আপন। তার মায়ের পেটের দিদি বনলতার ছেলে। বাপ-মা হারা শিশুটির এই পৃথিবীতে নিজের বলতে আছে কেবল সে। সেই কোনকালে ছোটোবেলায়, মনে হয় যেন গতজন্মে, খুড়দাদু গঙ্গারাম দুই ভাইবোনকে চরম দারিদ্র্য আর ক্ষুধা থেকে উদ্ধার করে এই আদিরামবাটিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে সেটা আর ঘটল না, আদিরামবাটির দরজা বন্ধ হলো।
মামামশাইয়ের অন্ত্যেষ্টির পরদিন বিশু পায়ে হেঁটে গিয়েছিল কোয়ার্সভিলে হুগলির পাড়ে সিস্টার্স দ্য ক্লুনি কনভেন্টে, মঠের লোহার গজাল আঁটা দরজায় কড়া নেড়েছিল। অনেকক্ষণ পরে দরজার পেটে একটা ছোট্ট খুপরি দরজা খুলে গেল। এক প্রবীণা সন্ন্যাসিনী, কৃষ্ণকায়া মালয়ালী, বিশুর আসার হেতু জেনে বললেন-
‘সে অনেক কাল আগের কথা, শ্বেতাঙ্গ সন্ন্যাসিনীরা কেউ আর এই মঠে নেই। রেফারেন্ডামের পর সবাই দেশে ফিরে গিয়েছে। সেই অনাথ আশ্রমটিও উঠে গিয়েছে অনেক বছর হলো। সেখানকার শিশুরা এতদিনে বড়ো হয়ে গিয়েছে। কে কোথায় ছড়িয়ে গিয়েছে তার কোনো হদিশ কনভেন্টের নথিতে নেই।’
মৃত্যুর আগে বনলতা ছেলের নাম রেখেছিল অভিমন্যু। এতদিনে সে বড়ো হয়েছে, এই বিশাল পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে কোথায় সে হারিয়ে গিয়েছে কে বলতে পারে? সে কি জানে তার অতীত? তার শিরায় বইছে বনলতার রক্ত। যুদ্ধের সময়ে সে সদ্য তরুণ, হয়তো ব্রিটিশ ভারতের সৈন্যদলে নাম লিখিয়েছে, কিংবা হয়তো নেতাজী সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধে নেমেছে। লাল কেল্লায় বিচারাধীন ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল আর্মির বন্দিদের দলে অভিমন্য নামে কি কেউ ছিল?
বিশু ঠাকুর মনে করতে পারে না। তার কল্পনায় স্থির দীপশিখার মতো জ্বলে এক শিশু, ব্রেড বাস্কেটে চেপে এসেছিল, ফিরিঙ্গি সন্ন্যাসিনীর গলায় রুপোর ক্রশ ছোট্ট মুঠিতে ধরার চেষ্টা করছিল। বিশুর মনের উঠোনে সেই শিশুটি আজও হামাগুড়ি দিয়ে খেলা করে। বিশু মনে মনে তাকে পায়ের মল গড়িয়ে পরিয়ে দেয়, কপালে রক্তচন্দনের টিপ এঁকে দেয়। সারারাত ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে বাড়িময় খেলে বেড়ায় সে। উনত্রিশ বিগ্রহের মাঝে হামাগুড়ির ভঙ্গিতে অষ্টধাতুর বালগোপাল মূর্তির মধ্যে তাকে খুঁজে পেল বিশু।
শ্রাবণ মাসের বৃহস্পতিবার বালগোপালের নিত্যপুজোয় গঙ্গাজলে স্নান করানোর সময়ে বিশু তার সিংহাসনে একটি রৌপ্যমুদ্রা পেল। নীলাভ রঙ দেখে সেটি বহু প্রাচীন বলে আন্দাজ হয়, এবং এতকালে যে চোখে পড়েনি ভেবে আশ্চর্যই হয়। সন্ধ্যাবেলা দেবেন স্যাকরার কাছে নিয়ে গেল।
ডকবাজারে পেছনের গলিতে দেবেন স্যাকরার দোকান এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো। যেকালে জাহাজে রূপোর বাঁট আসত বন্দরে, সেইসময় থেকে ওরা আছে। বহুকাল আগে এখানে সুবর্ণ বণিক, গন্ধবণিক ও শঙ্খবণিকদের রমরমা কারবার ছিল, দাক্ষিণাত্যের সেনারা বাংলার রাজা হবার পর তারা উৎখাত হয়। যে দু-এক ঘর থেকে যায় তাদের মধ্যে একটি দেবেন স্যাকরাদের বংশ। এককালে সাতগাঁয় বিভিন্ন বাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রতিমাকে সোনার গয়না দেবার রীতি ছিল। সেসব আজ অতীত। ফিরিঙ্গিডাঙা থেকে সাহেবরা চলে যাবার পর মেমসাহেবদের শখ মেটাতে বিলিতি ডিজাইনে গয়নার বরাতও আর জোটে না।
মলিন নোনা-খসা দেয়াল কবেকার দেবদেবীর ক্যালেন্ডারে ঢাকা, কড়িকাঠ থেকে ঝুলন্ত বালবের আলোয় মুদ্রাটা নেড়েচেড়ে দেখে প্রবীণ দেবেন স্যাকরার কপালে সন্দেহের রেখা ফুটল। চোখে ঠুলি লাগিয়ে উলটেপালটে দেখতে লাগলেন, কাচের বাক্সের ভেতর সরু দাড়িপাল্লায় ওজন করলেন, কষ্টিপাথরে বাজিয়ে তার ধ্বনি পরখ করলেন, অবশেষে বললেন—
‘এ হলো সুলতানি বিলন মোহর। আরবি তো আর পড়তে জানিনা, তবে দেখে মনে হচ্ছে সাতগাঁর তুঘলকি টাকশালের ছাপ রয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন আমলের সেটা আমি বলতে পারব না।
তাঁর পেশার মান্য রীতি অনুযায়ী মোহরটি কীভাবে বিশুর হাতে এল সে ব্যাপারে কোনোরূপ আগ্রহ প্রকাশ করলেন না দেবেন স্যাকরা।
‘আমি যদি এটা বিক্রি করতে চাই কত দাম পাওয়া যাবে?’
‘এতে রুপোর ভাগ অতি অল্পই আছে ভায়া,’ দেবেন স্যাকরা বললেন। ‘এক আনায় পাঁচ রতিও হবে না। তার আর কতই বা দাম? মজুরি পোষাবে না।’
‘আর এর ঐতিহাসিক মূল্য?’
‘আমি তো ইতিহাস নিয়ে কারবার করি না,’ দেবেন স্যাকরা হাসেন, ওপরের পাটিতে সোনার গজদাঁত চিকচিক করে ওঠে। ‘আমি সোনারুপোর কারবারি।’
আট দিন পরে শনিবার আবার বালগোপালের সিংহাসনে দুটি একই রকমের মোহর পেল বিশু। তার ঠিক তিন দিন পরে বুধবার আবার একটি। প্রথম মোহর প্রাপ্তির দিনটি ছিল দ্বিতীয়া তিথি, পরের বার ছিল একাদশী, তৃতীয় দিন ছিল পূর্ণিমা। প্রথম দিনে একটি মোহর, দ্বিতীয় দিনে দুটি, তৃতীয় দিনে আবার একটি। বিশু তার সর্বক্ষণের সঙ্গী জ্যোতিষী শিবুকেও কিছু জানালো না, নিজেই আদিরাম প্রেসের পাঁজি খুলে দেখল। কিন্তু অযাচিত প্রাপ্তির কোনোরকম গ্রহযোগ খুঁজে পেল না। কৌতূহলের বশে রাধাকৃষ্ণ, জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা, মদনমোহন, হংসেশ্বরী থেকে শুরু করে একে একে প্রতিটি বিগ্রহ তুলে দেখল, কিন্তু সাক্ষীগোপালের ছয় ইঞ্চি কাঁসার মূর্তির নীচে ফাঁপা অংশে একটি ভাঁজ করা কাগজ ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না। কাগজটি বহু প্রাচীন, তার ওপর হরীতকীর কালিতে লেখা ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, পড়া যায় না।
আদিরামবাটিতে দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে গেল। সাতগাঁয় আদি পাশ্চাত্য বৈদিকদের জনসংখ্যা কমে আসছে। নতুন প্রজন্ম কাজেকর্মে কলকাতায় কিংবা রাজ্যের বাইরে অন্যত্র থিতু হচ্ছে। আগের প্রজন্ম পরপারে কিংবা কাশীবাসী না হলে তাদের পিছু পিছু চলে যাচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির নিত্যকাজে অর্থের টান পড়েছে। দূরে থেকেও যারা পারিবারিক কুলদেবতার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানি অর্ডারে টাকা পাঠায়, তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তিন রাত্রি, পাঁচ রাত্রি, সাত রাত্রির জ্ঞাতি পরলোকগত হলে পোস্টকার্ডে মৃত্যুসংবাদ আসে। পোস্টকার্ড এসে পৌঁছতে যে সময়টা লাগে, সেই কটা দিন অশৌচ পালনে ছেদ পড়ে। সাধারণত যত দূরের জ্ঞাতি, মৃত্যু সংবাদ আসতে ততটাই সময় লাগে, এবং এর ফলে কখনো অশৌচের নির্ধারিত কাল পার হয়ে যায়। কিন্তু অজ্ঞাতবশত আচার পালনে বিঘ্ন ঘটলে পাপ নেই, বিশু সেটা মামামশাইয়ের কাছে জেনেছে। পরের প্রজন্ম, যারা আর কোনোদিন সাতগাঁয়ে ফিরবে না, একটা পোস্টকার্ড লিখে মৃত্যুসংবাদ জানানোর পরিশ্রমটুকুও করে না। এবং এভাবেই, শত শত বছর ধরে বংশবৃক্ষের অরণ্যে অন্তর্লীন শিকড়ে শিকড়ে বাঁধা সম্পর্কের ফাঙ্গাস-জালিকা ছিন্ন হতে থাকে। ধীরে ধীরে ভেতর থেকে শুকিয়ে আসতে থাকে জটিল আচাররীতির ওপর গড়ে ওঠা একটি বর্ণ সমাজ।
