সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.৫
১৩.৫
পরদিন সকাল সাতটায়, আটলান্টায় রাত সাড়ে নটায়, সিধুকে ফোন করে আপডেট দিল বাপ্পাদিত্য।
শেষবার ফোন করার সময়ে ওর কন্ঠস্বরে একটা অন্যরকম উৎকণ্ঠা ছিল, ঘন আর তীক্ষ্ণ, বাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠার থেকে ভিন্ন রকমের। এবারে সেটা খোলসা করল।
‘তাহলে ইন্ডিয়াতে আমার স্টেটাসটা ঠিক কী, বাবা? দেশে গেলে কি আমায় ও.সি.আই. হিসেবে ট্রিট করা হবে? তোমার ছেলে হয়ে আমি ঠিক কী ধরনের ফ্যাসাদে পড়ব?’
বাপ্পা চুপ করে থাকে। মনে হয় যেন এক শুকনো কুয়োর ভেতর পড়ে গেছে ওপর থেকে সিধুর কথা ভেসে আসছে।
‘তোমাকে তো আগেই বলেছি বৃন্দা জুলাইয়ের শেষে বিয়েটা করে নিতে চাইছে। এই ফল্-এ ও ফ্লোরিডায় একটা কোর্সে জয়েন করবে। তার আগে আমাদের বিয়েটা সেরে নিতে হবে।’
‘তুই চিন্তা করিস না, সিধু। তোর তো ঠিকঠাক বার্থ সার্টিফিকেট আছেই, তাতে বাবা মা দুজনেরই নাম রয়েছে। তোর মায়ের তো কোনো সমস্যা নেই, ওর বার্থ রেকর্ড একদম ক্লিন।’
‘কিন্তু ও.সি.আই. পাসপোর্ট নিয়ে ঢোকার সময়ে যদি আমায় মার্ক করে? তারপর যদি ডেকে পাঠিয়ে লম্বা ইন্টারোগেশান প্রসেস চলে? আমার হাতে মাত্র দিন দশেকের উইন্ডো থাকবে। স্টুপিড ইন্ডিয়ান ব্যুরোক্রেসিকে খাইয়ে দেবার মতো সময় তো আমার হাতে থাকবে না!
বাপ্পা টের পায়, ভেতরে একটা বিরক্তি ক্রমশ চড়ছে।
‘তুই কি বৃন্দাকে ওখানে চলে যেতে বলতে পারিস না?’ যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক স্বরে বলে। ‘বিয়েটা তো ওদেশেই সেরে নিতে পারিস। পারিস না?’
‘ইমপসিবল!’ ফোনের ওপাশে সিধুর গলা চড়ে। ‘ওর ফ্যামিলি সেটা কখনোই হতে দেবে না। তাছাড়া সেটা করলে ওর পক্ষে ওয়ার্ক ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করাটা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।’
‘তুই চিন্তা করিস না সিধু। কিছু একটা পথ নিশ্চয়ই বেরোবে। আমার কেসটা তো জেনুইন, সত্যি। জলজ্যান্ত সত্যি। সেটা তো আমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না।’
‘কিন্তু সত্যিটা যে যথেষ্ট নয়, বাবা! এভিডেন্স লাগবে, রিয়েল হার্ড এভিডেন্স!’
বাপ্পার নৈঃশব্দ্যে সিধু বোধহয় একটু বিচলিত হয়, গলার স্বর নরম হয়।
‘তোমাকে একটু দেখি, বাবা। অনেকদিন দেখিনি। ভিডিওটা অন করো না প্লীজ।’
সামান্য ইতস্তত করে বাপ্পা চশমাটা চোখে গলায়। ফোনের পর্দায় সিধুর মুখ, দাড়ি রাখছে। একটু যেন ফোলা ফোলা লাগছে। ফোনটা থুতনির কাছে ধরার জন্য কি?
‘তুমি ঠিক আছ, বাবা?’
আমি কি ঠিক আছি? আমি সত্যিই জানি না, বাপ্পা ভাবে। চিরচেনা ভূমির ওপর দিয়ে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মনে হয় যেন কোনো ছায়া পড়ছে না। ছায়াটা চুরি হয়ে গেছে। এখন সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
‘ইউ লুক ফাইন, বাবা! চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বাপ্পা হাসে, ফোনের দিকে হাতটা বাড়িয়ে ধরে।
বিগত কোনো এক শতাব্দীতে মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি যাবার সময়ে গলির মুখ থেকে ট্রামে চড়ত এক সদ্যবালক, ট্রামের পাদানিতে তুলে দিয়ে তার মাথার চুলে হাত দিয়ে বুলিয়ে দিত ওর বাবা। হাতের ভঙ্গিতে তেমনই কিছু ফুটে উঠল কি? সিধু কী ভাবল বিদায়, নাকি আশীর্বাদ?
*
সিধুকে ফোন করার আধ ঘন্টার মধ্যে ধুলো আর গঙ্গার লিটার ট্রে সাফ করে সকালের চা-টা বানিয়ে নিয়ে দি টেলিগ্রাফ-এর তৃতীয় পাতায় পৌঁছনোর আগেই–কানাইয়ের ফোন এল। জমি নথিকরণের অফিসে যাবার খবরটা জেনে গিয়েছে। অনেকদিন পরে কানাইয়ের গলা শুনছে বাপ্পা, কেমন যেন বালির দানা গলায়। কিন্তু ও খবর পেল কী করে?
‘সব জায়গায় আমার লোক আছে রে!’ কানাই বলে, তারপর কন্ঠস্বরে সামান্য অভিমান মিশিয়ে— ‘সেই এলি, কিন্তু একবার তোর নিজের বাড়িতে এসে আমরা কেমন আছি দেখার প্রয়োজন মনে করলি না?’
নিজের বাড়ি! বাপ্পা প্রসঙ্গ বদলে নতুনবউয়ের খবর নেয়, হেমন্তমামার খবর নেয়। আর কারোর কথা জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। কে যে বেঁচে আছে আর কে যে নেই, নিশ্চিত নয় সে।
কানাই দায়সারাভাবে খবরাখবর দিয়ে আসল প্রসঙ্গে আসে। ‘এসব কি শুনছি বাপ্পাদাদা? এসব কি সত্যি? সত্যিই তুই পুরোনো জমির রেকর্ড খুঁজে বেড়াচ্ছিস?’
এই জন্যে ফোন? প্রথমেই বোঝা উচিৎ ছিল। সব জায়গায় কানাইয়ের লোক রয়েছে, জমি নথিকরণের অফিসেও। সন্টু দাস কি কানাইয়ের লোক? গায়ত্রীর কথাগুলো মনে পড়ে যায় বাপ্পার। কানাইকে সবটা খুলে বলাই ভালো, সে গায়ত্রীর সন্দেহ সত্যি হোক বা না।
পোস্টকার্ডের কথাটা ছাড়া বাকিটা সংক্ষেপে বলার পর কানাইয়ের গলা শুনে মনে হলো না অবাক হয়েছে।
‘কীভাবে ম্যানেজ করবি ভাবছিস? তোর কাছে সব ডকুমেন্ট আছে নিশ্চয়ই?’
‘মোটামুটি আছে। তবে মায়ের সঙ্গে আমার লিঙ্কেজ ক্লেইম করার জন্য আরও দুয়েকটা ডকুমেন্ট দরকার।’ বাপ্পা বলে। পোস্টকার্ডের কথাটা বলতে গিয়েও আর বলে না।
কানাইয়ের গলায় উদ্বেগ ফোটে, সাহায্য করতে চায়। স্থাবর সম্পত্তির বিষয়ে কানাইয়ের বিপুল জ্ঞান, বাপ্পা জানে। এও জানে, কানাই হলো সেই শেষ ব্যক্তি যার কাছে সে সাহায্য চাইবে।
‘তোর সাহায্য আমার অবশ্যই লাগবে, কানাই। কদিন ধরে ভাবছিলাম তোকে ফোন করব।’
‘হুম।’ বাপ্পার অসত্যবচন উপেক্ষা করে কানাই বলে— ‘কিন্তু সবার আগে তোর কাছ থেকে পুরো বিষয়টা ডিটেলে জানতে হবে। তুই কি কোনো উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিস?’
এখনও করেনি, বাপ্পা জানায়। ওরা শিগগিরই একদিন দেখা করবে ঠিক করে।
*
ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঠিক একই সময়ে আবার গায়ত্রীর ফোন। ‘কেস’-এর অগ্রগতি জানতে চায়।
‘হাউ ইজ ইট মুভিং?’
‘মুভিং?’ শোনামাত্র বাপ্পার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিতে বাঁধা সবুজ ফাইল, ES/276/3943, তার পেটের ভেতরে পোস্টকার্ডটা। সে যেন দেখতে পায় ফাইলটা দুদিকে ফ্ল্যাপের ডানা ঝাপটে আধো অন্ধকার পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরা প্যাসেজের ভেতর ঘুরে মরছে, স্কাইলাইট গলে আসা মরা আলোর দিকে যেতে গিয়ে দেয়ালে মাথা কুটছে, ভেতর থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে কাগজ। সিলিং ফ্যানের ঘুরন্ত ব্লেডে কাটা পড়বে? মাটিতে পড়ার আগেই হলুদ-কালো বেড়ালটা লাফ দিয়ে উঠে ধরবে? গায়ত্রীকে বলবে নাকি ছবিটা?— ‘কাট দিস ননসেন্স, বাপ্পা!’ ও শোনামাত্র বলবে।
জমি নথিকরণ দপ্তরে অভিযানের কথা জানায় বাপ্পা। কানাই যে সেটা জেনেছে, সেটাও জানায়।
‘আমি বলিনি তোমায়?’ গায়ত্রীর কণ্ঠস্বরে বিজয়ীর উল্লাস। ‘সবটার পেছনে কানাই আছে, আমি শুরু থেকেই জানি!
কতকালের চেনা এই স্বর! বাপ্পার প্রায় নৈয়ায়িক যুক্তির জালে ধরা পড়ে না এমন অনেক কিছু চিরকাল ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে শুঁকে ধরে ফেলতে পারে গায়ত্রী। ছোটোবেলা থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি আগাথা ক্রিস্টি আর পি ডি জেমস নভেল পড়ার ফল।
‘আশা করি তুমি কানাইকে সবকিছু বলে বসোনি, সব খুঁটিনাটি ওকে জানাওনি?’
জানাতে হয়নি, ও সব জানে। কানাই এই পুরো প্রক্রিয়াটা ঢের গভীরভাবে জানে, তার কারণ ও কিছুকাল রাজনীতি করেছে। গায়ত্রীকে সেটা ব্যাখ্যা করে বলতে খারাপ লাগে বাপ্পার। চিরকালই লেগে এসেছে। সেটা গায়ত্রী যখন কারোর গোপন অভিপ্ৰায় সঠিক ধরে ফেলেছে তখনই শুধু নয়, এতে যে বাপ্পার অহংবোধে আঘাত লেগেছে সেজন্যও নয়, যেমনটা ও দাবী করত। খারাপ লাগে এই জন্যে যে এইভাবে মানুষকে পরিস্থিতিকে বিচার করার প্রবণতাটা বাপ্পার খুব যান্ত্রিক লাগে।
হয়তো সেই খারাপ লাগাটা কন্ঠস্বরে ফুটে উঠেছিল। মুখোমুখি কথাবার্তার তুলনায় ফোনে কথাবার্তা সব সময় সঠিক শব্দ চয়নের ওপর নির্ভর করে, অনেক সময় শব্দের থেকেও মধ্যবর্তী নৈঃশব্দ্যের ওপর নির্ভর করে। কেটে দেবার পর বাপ্পার মনে হলো যেন হঠাৎ করেই শেষ হলো, আরও কিছুক্ষণ চলতে পারত। অল্প অল্প বিবেকদংশন হতে লাগল। গায়ত্রী চাইলে ওর এই পরিস্থিতি নিয়ে মাথা না ঘামাতেই পারত, কোনো বাধ্যবাধকতা তো ছিল না। সিধুর কাছে কোনোরকম জবাবদিহি করারও ছিল না। কিন্তু তবুও ও আগ বাড়িয়ে যোগাযোগ করেছে, সাহায্য করতে চেয়েছে। অবশ্য ভেতরে ভেতরে বাপ্পা জানে, ওর এই বুঝভুম্বুল দশাটা চিরকাল উপভোগ করেছে গায়ত্রী। চিরকাল ওকে বেসামাল, ভাঙাচোরা অবস্থায় হেফাজতে নিয়ে এক বিচিত্র আনন্দ পেয়েছে ঠিক যেমন হেমন্তমামা কোনো যন্ত্র বা খেলনা ভাঙা বিকল অবস্থায় পেলে বেশি খুশি হতো। আস্ত হাতে পেলে নিজেই খুলে ভেঙে ফেলত। কখনো তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারত, কখনো পারত না। কিন্তু ভেঙে খুলে না গেলে তার ওপর ওর পুরোপুরি অধিকার জন্মাতো না।
মি’লেডি, গায়ত্রী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে কোনো মানুষের আসল জিনিসটা তার ভেতরে কোথাও আছে। ও সেটার নাগাল পেতে চায়। তার বদলে নিজের সযত্নে লালিত যাবতীয় গোপন বিনিময় করতে চায়। গায়ত্রী যা জানে না, তা হলো কিছু মানুষের আসল জিনিসটা ওভাবে কখনোই নাগাল পাওয়া যায় না, ভেতর থেকে টেনে বের করা যায় না মাছের নাড়িভুঁড়িতে জড়ানো পিত্তথলির মতো। বিশেষ করে আমাদের এই কাহিনির নায়ক বাপ্পাদিত্যের মতো যাদের দুটো ভিন্ন পৃথিবীতে দ্বিনাগরিকত্ব রয়েছে সাতগাঁয়ে, কলকাতায়। এগারোটা বছর একই ছাতের নীচে কাটানোর পরেও যেটা বাপ্পা ওকে কোনোদিন বোঝাতে পারেনি, তা হলো কিছু কিছু জিনিস কথা সাজিয়ে কাহিনির আকারে বলা যায় না। এদিকে গায়ত্রী সব সময়ে কাহিনি চেয়েছে, মি’লেডি — কথা, কথা, কথা। বাপ্পাদিত্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। গায়ত্রীও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ওদের পথ বদলায়।
গায়ত্রী এখন যার সঙ্গে থাকে তাঁর স্ত্রী সাত বছর আগে মারা গিয়েছেন। ভদ্রলোক ওর কলেজের সহপাঠী। ওঁর এক মেয়ের সঙ্গে একত্রে ওরা দিল্লিতে থাকে। সিধু যখন দেশে আসে— দুবছরে একবার—তখন ও কলকাতাতেই বেশি সময়টা কাটায়। কখনো গায়ত্রীকে নিয়ে শাস্তিনিকেতনে যায়। সেখানে গায়ত্রীদের পৈত্রিক বাড়িতে ওর নবতি মা ও এক মাসী থাকেন।
কানাইয়ের গলায় উদ্বেগ ফোটে, সাহায্য করতে চায়। স্থাবর সম্পত্তির বিষয়ে কানাইয়ের বিপুল জ্ঞান, বাপ্পা জানে। এও জানে, কানাই হলো সেই শেষ ব্যক্তি যার কাছে সে সাহায্য চাইবে।
‘তোর সাহায্য আমার অবশ্যই লাগবে, কানাই। কদিন ধরে ভাবছিলাম তোকে ফোন করব।’
‘হুম।’ বাপ্পার অসত্যবচন উপেক্ষা করে কানাই বলে— ‘কিন্তু সবার আগে তোর কাছ থেকে পুরো বিষয়টা ডিটেলে জানতে হবে। তুই কি কোনো উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিস?’
এখনও করেনি, বাপ্পা জানায়। ওরা শিগগিরই একদিন দেখা করবে ঠিক করে।
*
ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঠিক একই সময়ে আবার গায়ত্রীর ফোন। ‘কেস’-এর অগ্রগতি জানতে চায়।
‘হাউ ইজ ইট মুভিং?’
‘মুভিং?’ শোনামাত্র বাপ্পার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিতে-বাঁধা সবুজ ফাইল, ES/276/3943, তার পেটের ভেতরে পোস্টকার্ডটা। সে যেন দেখতে পায় ফাইলটা দুদিকে ফ্ল্যাপের ডানা ঝাপটে আধো অন্ধকার পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরা প্যাসেজের ভেতর ঘুরে মরছে, স্কাইলাইট গলে আসা মরা আলোর দিকে যেতে গিয়ে দেয়ালে মাথা কুটছে, ভেতর থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে কাগজ। সিলিং ফ্যানের ঘুরন্ত ব্লেডে কাটা পড়বে? মাটিতে পড়ার আগেই হলুদ-কালো বেড়ালটা লাফ দিয়ে উঠে ধরবে? গায়ত্রীকে বলবে নাকি ছবিটা?— ‘কাট দিস ননসেন্স, বাপ্পা!’ ও শোনামাত্র বলবে।
জমি নথিকরণ দপ্তরে অভিযানের কথা জানায় বাপ্পা। কানাই যে সেটা জেনেছে, সেটাও জানায়।
‘আমি বলিনি তোমায়?’ গায়ত্রীর কন্ঠস্বরে বিজয়ীর উল্লাস। ‘সবটার পেছনে কানাই আছে, আমি শুরু থেকেই জানি!’
কতকালের চেনা এই স্বর! বাপ্পার প্রায় নৈয়ায়িক যুক্তির জালে ধরা পড়ে না এমন অনেক কিছু চিরকাল ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে শুঁকে ধরে ফেলতে পারে গায়ত্ৰী। ছোটোবেলা থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি আগাথা ক্রিস্টি আর পি ডি জেমস নভেল পড়ার ফল।
‘আশা করি তুমি কানাইকে সবকিছু বলে বসোনি, সব খুঁটিনাটি ওকে জানাওনি?’
জানাতে হয়নি, ও সব জানে। কানাই এই পুরো প্রক্রিয়াটা ঢের গভীরভাবে জানে, তার কারণ ও কিছুকাল রাজনীতি করেছে। গায়ত্রীকে সেটা ব্যাখ্যা করে বলতে খারাপ লাগে বাপ্পার। চিরকালই লেগে এসেছে। সেটা গায়ত্রী যখন কারোর গোপন অভিপ্ৰায় সঠিক ধরে ফেলেছে তখনই শুধু নয়, এতে যে বাপ্পার অহংবোধে আঘাত লেগেছে সেজন্যও নয়, যেমনটা ও দাবী করত। খারাপ লাগে এই জন্যে যে এইভাবে মানুষকে পরিস্থিতিকে বিচার করার প্রবণতাটা বাপ্পার খুব যান্ত্রিক লাগে।
হয়তো সেই খারাপ লাগাটা কন্ঠস্বরে ফুটে উঠেছিল। মুখোমুখি কথাবার্তার তুলনায় ফোনে কথাবার্তা সব সময় সঠিক শব্দ চয়নের ওপর নির্ভর করে, অনেক সময় শব্দের থেকেও মধ্যবর্তী নৈঃশব্দ্যের ওপর নির্ভর করে। কেটে দেবার পর বাপ্পার মনে হলো যেন হঠাৎ করেই শেষ হলো, আরও কিছুক্ষণ চলতে পারত। অল্প অল্প বিবেকদংশন হতে লাগল। গায়ত্রী চাইলে ওর এই পরিস্থিতি নিয়ে মাথা না ঘামাতেই পারত, কোনো বাধ্যবাধকতা তো ছিল না। সিধুর কাছে কোনোরকম জবাবদিহি করারও ছিল না। কিন্তু তবুও ও আগ বাড়িয়ে যোগাযোগ করেছে, সাহায্য করতে চেয়েছে। অবশ্য ভেতরে ভেতরে বাপ্পা জানে, ওর এই বুঝভুম্বুল দশাটা চিরকাল উপভোগ করেছে গায়ত্রী। চিরকাল ওকে বেসামাল, ভাঙাচোরা অবস্থায় হেফাজতে নিয়ে এক বিচিত্র আনন্দ পেয়েছে ঠিক যেমন হেমন্তমামা কোনো যন্ত্র বা খেলনা ভাঙা বিকল অবস্থায় পেলে বেশি খুশি হতো। আস্ত হাতে পেলে নিজেই খুলে ভেঙে ফেলত। কখনো তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারত, কখনো পারত না। কিন্তু ভেঙে খুলে না গেলে তার ওপর ওর পুরোপুরি অধিকার জন্মাতো না।
মি’লেডি, গায়ত্রী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে কোনো মানুষের আসল জিনিসটা তার ভেতরে কোথাও আছে। ও সেটার নাগাল পেতে চায়। তার বদলে নিজের সযত্নে লালিত যাবতীয় গোপন বিনিময় করতে চায়। গায়ত্রী যা জানে না, তা হলো কিছু মানুষের আসল জিনিসটা ওভাবে কখনোই নাগাল পাওয়া যায় না, ভেতর থেকে টেনে বের করা যায় না মাছের নাড়িভুঁড়িতে জড়ানো পিত্তথলির মতো। বিশেষ করে আমাদের এই কাহিনির নায়ক বাপ্পাদিত্যের মতো যাদের দুটো ভিন্ন পৃথিবীতে দ্বিনাগরিকত্ব রয়েছে সাতগাঁয়ে, কলকাতায়। এগারোটা বছর একই ছাতের নীচে কাটানোর পরেও যেটা বাপ্পা ওকে কোনোদিন বোঝাতে পারেনি, তা হলো কিছু কিছু জিনিস কথা সাজিয়ে কাহিনির আকারে বলা যায় না। এদিকে গায়ত্রী সব সময়ে কাহিনি চেয়েছে, মি’লেডি— কথা, কথা, কথা। বাপ্পাদিত্য ক্লাস্ত হয়ে পড়েছিল। গায়ত্রীও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ওদের পথ বদলায়।
গায়ত্রী এখন যার সঙ্গে থাকে তাঁর স্ত্রী সাত বছর আগে মারা গিয়েছেন। ভদ্রলোক ওর কলেজের সহপাঠী। ওঁর এক মেয়ের সঙ্গে একত্রে ওরা দিল্লিতে থাকে। সিধু যখন দেশে আসে— দুবছরে একবার—তখন ও কলকাতাতেই বেশি সময়টা কাটায়। কখনো গায়ত্রীকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে যায়। সেখানে গায়ত্রীদের পৈত্রিক বাড়িতে ওর নবতি মা ও এক মাসী থাকেন।
