সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৮
২.৮
বাপ্পার জন্মের দু বছর তিন মাস আট দিন পরে বসন্তর মেয়ে তিতলি পৃথিবীতে এল। এক রবিবার দুপুরে বাপ্পা বাবামায়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে কোয়ার্সভিল এল। সিস্টার্স দ্য ক্লুনি হাসপাতালটা গীর্জার ঠিক পেছনেই। সেই প্রথম বাপ্পার হাসপাতালে যাওয়া। আকাশি রঙের বিশাল হলঘরে সাদা স্কার্ট-মোজা পরা নার্সদের মাথায় সারসের ডানার মতো সাদা টুপি, তোয়ালে জড়ানো শিশু নিয়ে পাম্পজুতোয় খুট খুট শব্দ করে হেঁটে আসছে মায়েদের খাটের পাশে ছোট্ট চাকালাগানো খাটগুলোয়। রথীন ওকে শূন্যে তুলে ধরল, বাপ্পা দেখল খাটের মধ্যে গোলাপি মাংসের দলা, চোখ কুঁচকে বন্ধ, ছোট্ট ছোট্ট হাতের তালুর ভাঁজে ময়লা, আর সারা গায়ে সূক্ষ্ম রোম। ওকে দেখে বাপ্পা নাকি আধো আধো স্বরে বলে উঠেছিল
‘এটার গায়ে এত্ত কাঁটা! এটা একটা শোঁপোকা!’
পরে সে জেনেছে, ওর সেই মন্তব্যে ওয়ার্ড ভর্তি সব্বাই হো হো করে হেসে উঠেছিল–নার্সরা মাথার সারসডানা ঝাপটে হাসে, প্রসূতিরাও হাসে বেলুনের মতো পেট চেপে ধরে। এবং বাপ্পা নাকি ওই ঘুমন্ত রোমশ মাংসপিণ্ডকে নাকি ছিল ওর একটা নতুন বোন ছেড়ে ওর ছোট্ট চাকালাগানো খাটটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ওটা ঠেলে গাড়ি-গাড়ি খেলতে চাইছিল। সেসব অবশ্য বাপ্পার আর মনে নেই, ওর কেবল মনে আছে ওই শুঁয়োপোকার ছবিটা মনে গেঁথে গিয়েছিল। বড়ো হবার পরেও আজীবন একান্ত মুহূর্তে বাপ্পা তিতলিকে শুয়োপোকা বলে ডেকে এসেছে।
ছোট্ট খাটের পাশে বড়ো খাটটায় শুয়েছিল তিতলির মা, সিজারিয়ানের পর ফ্যাকাসে আর দুর্বল, যাকে সবাই, এমনকি তিতলিও, নতুনবউ বলে ডেকে এসেছে আজীবন। লোকে যেভাবে পোস্টাপিসে যায় চিঠি পার্সেল আনতে, সেভাবেই হাসপাতালে যায় শিশু আনতে, এমনটাই বাপ্পাকে বলা হয়েছিল। কিছু কিছু চিঠি বাড়িতে আসে, যেমন সে নিজে এসেছিল। কোনো কোনো শিশু বের করা হয় মায়ের পেট কেটে, পুরীর কাঠের পুতুলের পেটে পুতুলের মতো, যেমন ভাবে বের করা হয়েছিল তিতলিকে।
.
তিতলির ভালো নাম জ্যোতিকণা। নামটা ওর জন্মের আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন ওর মাতামহ। এবং ও যে কোয়ার্সভিলের সিস্টার্স দ্য ক্লুনি হাসপাতালেই ভূমিষ্ঠ হবে সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল ওর বাবা, বাপ্পার বসন্তমামা। তিতলির ফরাসী নাগরিক হওয়াটা কেবল ফসকে যায়, কয়েক বছর দেরি করে এসেছিল সে।
কোয়ার্সভিলের সাদা শহর (ভ্যিল ব্লশ) এবং সংলগ্ন কালো শহর (ভ্যিল নুয়া) চাঁদেরডাঙা ফ্রান্স রাষ্ট্রেরই থাকবে নাকি নতুন স্বাধীন ভারতবর্ষের অংশ হয়ে উঠবে এই নিয়ে যখন ভোটাভুটি হয় বসন্ত তখন সদ্যযুবক। ‘গোয়া যদি পর্তুগালের কলোনি হয়ে থাকতে পারে, তাহলে চাঁদেরডাঙা কী দোষ করল?’ এই ধুয়ো তুলে সে ভোটের আগে ফ্রান্সের হয়ে প্রচার চালায়। এমনকি ওলন্দাজডাঙা দিনেমারডাঙা পোর্তোহাটা নিয়ে পুরো মৎস্যভূমিকেই ফরাসী দেশের হাতে তুলে দেওয়া হোক, এমন একটা দাবীও ওঠে তখন। তাতে ইংরেজবিদ্বেষী সাতগাঁইয়াদের সমর্থন থাকলেও দাবীটি ছিল অবাস্তব। রেফারেন্ডামের ফল বেরোলে যখন দেখা গেল স্থানীয় মানুষ সেটি গ্রহণ করেনি, বসন্ত শিশুর মতো কেঁদেছিল। ঘড়িঘরের মাথায় ভারতীয় তেরঙ্গা উড়ছে কানে আসতে কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে মাটিতে পা আছড়ে চিৎকার করেছিল সে— ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়! ম্যেৰ্দ!’
সেই শুনে বারান্দায় দাঁড়ে অ্যান্টনি ডেকে উঠেছিল–‘ম্যার্দা! পুতা ম্যার্দা!’
বসন্তের গভীর ফরাসিপ্রীতি বিদায়ী প্রশাসকদের নজরে পড়েছিল, কোয়ার্সভিলের ইন্সতিত্যুত দ্য ফস-এ একটি চাকরি জুটে যায়। চাকরির শর্ত অনুসারে তাকে প্যারিসের ইকোল দ্য লাং ফঁসে-তে একটি ছয় মাসের ডিপ্লোমা কোর্স করতে পাঠানো হয়। আদিরামবাটির বংশে বসন্ত প্রথম ব্যক্তি যে কালাপানি পেরোল, এবং যথারীতি সাতগাঁর ব্রাহ্মণ্য সমাজে নিন্দার ঝড় উঠল। তার কিছুদিন আগে থেকে পরাণ ডাক্তার ভাবছিলেন বড়ো ছেলে এবার ফার্মেসিতে এসে বসবে। ওকে একটি হোমিওপ্যাথির করেসপন্ডেন্স কোর্সে ভর্তি করে দেবার কথাও ভেবে রেখেছিলেন। ভেষজ জগতের দেবভাষা ছেড়ে কেন যে লোকে আরেকটি মনুষ্যভাষা শিখতে চায়, এটা তাঁর মাথায় ঢোকেনি। কিন্তু প্যারিস থেকে ফিরে বসন্ত যখন মশাইয়ের বিধান মেনে সমুদ্রলঙ্ঘন প্রায়শ্চিত্ত করতে অস্বীকার করল, ছেলের হয়ে কাকার সঙ্গে সওয়াল করেছিলেন রামপ্রাণ
‘আমি বৌধায়নের ধর্মসূত্রে কালাপানির বিধান মানি না। আমি হ্যানিম্যান সাহেবের মেটেরিয়া মেডিকা মানি। পবিত্র গঙ্গার জল যদি সাগরে গিয়ে মেশে, তাহলে হোমিওপ্যাথির সূত্র অনুসারে ক্রমাগত ঘুর্ণন আর দ্রবণের ফলে কালাপানি গঙ্গোদকের চেয়েও পবিত্র!’
মশাই শিখা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন – আদিরামের আবাসে এই অনাচার দেখে শুধু নয়, অনেককাল আগে অর্বাচীন ভাইপো রামপ্রাণকে ন্যায়শাস্ত্রের পাঠ দিয়েছিলেন বলে অনুশোচনা থেকেও। প্যারিস থেকে ফিরে বিবাহের পর বসন্ত নববধুকে নিয়ে প্রণাম করতে এলে তিনি নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন, কিন্তু পা ছুঁয়ে প্রণাম নিতে অস্বীকার করেন।
সৌভাগ্যলক্ষ্মী ছিল কৃষ্ণনগরের রাঢ়ী ব্রাহ্মণ বংশজাত। বিয়েটা বসন্ত দেশে ফিরে করলেও সম্বন্ধ হয় প্যারিসে। ছ’মাসের ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ না করে সে সাড়ে চার মাসের মাথায় সাতগাঁয় ফিরে আসে। ওদেশের আর্দ্র ঠান্ডা আবহাওয়া আর খাদ্যে মাংসের আধিক্যে তার জন্মগত কোষ্ঠবদ্ধতা বেড়ে যায়, কোলাইটিসের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে সেই স্বল্পসময় প্যারিস বাস কালে তার পরিচয় হয় অলোক ব্যানার্জি নামে কৃষ্ণনগরের এক বাসিন্দার সঙ্গে। অলোক ছিল ইকোল দ্য লাং-এ বাংলা ভাষার শিক্ষক, পিগ্যাল অঞ্চলে পরিবার নিয়ে থাকত। এক রবিবার অলোক
বসন্তকে ওর বাসায় নেমন্তন্ন করে খাওয়া, এবং তারপর থেকে বসন্ত অলোকের স্ত্রীর হাতে বিশুদ্ধ ঘটিবাড়ির রান্নার ভক্ত হয়ে পড়ে। সরোজার মতো মটর ডালের বড়া দিয়ে চাপর ঘন্ট আর মুচমুচে পোস্তর বড়া রাঁধত অলোকের স্ত্রী নমিতা। অলোকও দারুণ রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে পারত, ফরাসীদের বিদঘুটে আদবকায়দা নকল করে তার সঙ্গে বাঙালদের মিল খুঁজে বের করতে ওস্তাদ ছিল। স্যাঁতস্যাতে প্যারিসে বসন্তর রবিবারগুলো জমে উঠত সুখাদ্যে আর আড্ডায়। মাঝেসাঝেই অলোক বলত কৃষ্ণনগরে ওর পরিবারের কথা। এককালে ওরা ছিল রাজার দেওয়ান। চকের মোড়ে ওদের বিশাল পৈতৃক বাড়ি, বাবা মা আর ছোটো বোন থাকে। নমিতার চেয়েও ভালো রাঁধুনি ওর বোন বুড়ি, ভালো নাম সৌভাগ্যলক্ষ্মী, যার হাতের পোস্তর বড়া নাকি অবিস্মরণীয় বাইরেটা মুচমুচে, ভেতরে নরম, এক্কেবারে পারফেক্ট–যাকে বলে, ‘ল্য গ্লু পাহফ্যে!’ তাছাড়া সে কৃষ্ণনগরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। শহরের বিখ্যাত মৃৎশিল্পীরা ওর মুখের ছাঁচে প্রতিমা গড়েন।
শিউলির সঙ্গে রথীনের বিয়ের পরের শ্রাবণে বসন্ত বিয়ে করে সৌভাগ্যলক্ষ্মীকে। কৃষ্ণনগরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী না হলেও তাকে বেশ মিষ্টি পুতুল-পুতুল দেখতে: টুকটুকে ফর্সা রঙ, বেঁটেখাটো, সামান্য গোলগাল চেহারা। এবং ছোটোবেলা থেকে পুতুলের প্রতি তার অদম্য আকর্ষণ বড়ো হয়েও কাটেনি। তার ঘরভর্তি কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মাটির পুতুল তো ছিলই, এছাড়াও অলোক প্রতি শীতে বাড়ি আসার সময়ে বোনের জন্য নিয়ে আসত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পুতুল। বুড়ি যখন খুব ছোটো, তখন একবার অলোক বলেছিল ওর জন্যে বিস্কিট পোর্সিলিন দিয়ে তৈরি ফরাসী বিস্ক পুতুলের মতো সুদর্শন বর খুঁজে আনবে। সেই প্রতিশ্রুতি ওর কচি হৃদয়ে পল্লবিত হয়, যতদিন না সে বুঝতে পারে সেটা অবাস্তব। কাঠের পাটায় গাঁথা রক্তমাখা ঈশ্বর পুজো করে যারা, যারা প্রায় রক্তাক্ত গোমাংস ভাজা খায়, আর কনকনে ঠান্ডায় মাসের পর মাস চান করে না, এবং প্রাতঃকৃত্যের পর কাগজে পেছন মোছে, তেমন কারোর সঙ্গে তার বিবাহ অসম্ভব। বদলে তার দাদা এনে দিলে এমন এক পাত্র যে তার হৃদয়ের পুরুষের খুব কাছাকাছি এক ব্রাহ্মণ যে ফরাসী বলে কিন্তু কদাপি গোমাংস ছোঁয় না, ফরাসী সরকারের কোষাগার থেকে তার বেতন হয় কিন্তু কৃষ্ণনগর থেকে মাত্র দু ঘন্টার দূরত্বে থাকে।
সৌভাগ্যলক্ষ্মী তার অনুচ্চারণীয় নাম আর ৩৫৩টি বিভিন্ন আকারের ও জাতের পুতুল নিয়ে আদিরামবাটিতে এল। ঠাকুরবাড়িতে লক্ষ্মীদেবী থাকায় ওই নামে তাকে ডাকার উপায় ছিল না। এদিকে নববধুকে তার ডাকনাম বুড়ি বলে ডাকাটাও অশোভন। এই দোলাচলের মধ্যে নতুনবউ নামটাই টিকে গেল শেষ পর্যন্ত।
নতুনবউ ও তার তিনটি ট্রাঙ্ক ভর্তি পুতুল দেখে কারোর কারোর স্মৃতিতে ভেসে উঠেছিল বহুকাল আগে আরেকজন নববধুর কথা। সেও খেলার পুতুল নিয়ে এসেছিল। সে এ বাড়ির প্রবীণদের জন্মেরও ঢের আগে। তার অস্পষ্ট ছবি সঞ্চিত রয়েছে পারিবারিক গল্পকথায়, ছাই আর নৈঃশব্দ্য দিয়ে ঘেরা, আর ফ্লেমিশ চিত্রশিল্পী ফ্রান্স বালথাজার সলভিন্সের সই করা একটি লিথোগ্রাফে, যার শিরোনাম The Inflammable Oriental Woman
তার কথা এখন থাক, মি’লেডি।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বসন্ত মনস্থির করতে পারেনি প্যারিসের সেই রবিবারগুলোয় ঠিক কোন জিনিসটি তাকে পেড়ে ফেলেছিল: স্ত্রীর রূপের বর্ণনা, নাকি তার হাতের পোস্তর বড়ার বর্ণনা। প্রতি বছর শীতে দেশে এলে অলোক তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভগ্নীপতির পিঠে চাপড় মেরে জিজ্ঞেস করত— ‘কেমন চলছে, ব্রাদার?’
বসন্ত তৎক্ষণাৎ জবাব দিত— ‘ল্য গ্লু পাহফ্যে! বাইরেটা মুচমুচে, ভেতরে নরম!’
স্মরণাতীত কাল থেকে এবাড়ির বাসিন্দাদের দৈনন্দিনের চাকা ঘোরে মন্দিরে গৃহদেবতা আদিরাম এবং ঠাকুরবাড়িতে উনত্রিশ জন আশ্রিত দেবদেবীর নিত্যপূজার নির্ঘন্ট ও বিভিন্ন তিথি অনুসারে। এছাড়াও গঙ্গারাম ও পরবর্তীকালে রামপ্রাণের রোগী দেখার সময়কাল ও কিছুটা ছোটোদের ইস্কুল অনুযায়ী আহারনিদ্রার সময় নিয়ন্ত্রিত হতো। বসন্তের আগে আদিরামবাটিতে কেউ কখনো চাকরি করেনি। নতুনবউ এসে স্বামীর রুটিনের সঙ্গে তাল রেখে, এবং বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের দৈনন্দিনের সঙ্গে বেতালে, চলতে লাগল। বেলা করে ঘুম থেকে উঠে তার দিন শুরু হয় স্বামীর জন্য এক বড়ো গ্লাস লিকার চা বানিয়ে, যেটি না পান করলে বসন্তের কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় না। তারপর আপিসের টিফিন বানিয়ে দিয়ে সদর দরজায় এসে স্বামীকে হাত নেড়ে টা টা করে নতুনবউ উঠে যায় দোতলায় নিজের ঘরে। সেখানে সারাটা সকাল ধরে শোকেস থেকে তার ৩৫৩টি পুতুল বের করে তাদের ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার করে, আর বিয়েতে যৌতুক পাওয়া রেডিওয় বাজে গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু আজ স্বপ্ন ছড়াতে চায়, কিংবা এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্নমধুর মোহে, কখনো বা নীড় ছোটো ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়ো, অথবা শুধু একটুখানি চাওয়া আর একটুখানি পাওয়া, এমনকি নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে চুপিচুপি বাঁশি বাজে বাতাসে। এরপর চানঘরে ঢুকে ঘন্টা খানেকের ওপর প্রসাধন স্নানে নতুন বউয়ের কন্ঠে উঠোনের পশ্চিম কোণ থেকেও শোনা যায় সেইসব গানের কলি। নিঝুম দুপুরে যখন নিমগাছে একটাও পাতা নড়ছে না, কার্নিশে নিশ্চল কাক, জালালি কবুতরের বকবকম, ফার্মেসিতে শেষ গুটিকয় রোগী বেঞ্চিতে বসে ঝিমোচ্ছে, তখনও দোতলার জানলা দিয়ে ভেসে আসা রেডিওর ধ্বনিতে ঠাকুরবাড়িতে বিশু ঠাকুর ভোগ সাজিয়ে ঘন্টা নেড়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে গিয়ে ভুল করে, আর বারান্দায় অ্যান্টনি বেসুরো ডেকে চলে— ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ গানে মোর নীড় ছোটো…’
তিতলি হবার কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল ৩৫৩টি পুতুল রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা মানবশিশু প্রতিপালনের জন্য যথেষ্ট নয়। তাছাড়া অপারেশানের পর নতুনবউয়ের স্বাস্থ্য ভেঙেছিল, একাধিক বাস্তব ও কাল্পনিক উপসর্গ দেখা দিয়েছিল যা তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠবে। ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে উঠল কারণ শ্বশুরমশাইয়ের চিকিৎসাপদ্ধতিতে একেবারেই ভরসা ছিল না তার, অথচ বাবাকে অস্বীকার করে অন্য ডাক্তার দেখানোর সাহস বসন্তর ছিল না। এদিকে শিউলি বিয়ে হয়ে চলে যাবার পর একা হতে সংসারের দায়দায়িত্ব সামলে ছোটো বাচ্চার পরিচর্যা কঠিন হয়ে পড়ছিল সরোজার পক্ষে। শিশুকন্যাকে নিয়ে কিছুকাল বাপের বাড়িতে গিয়ে যে থাকবে, সে উপায় নেই। কৃষ্ণনগরে নতুনবউয়ের বাবা মা দুজনেই অশীতিপর, পুরোনো বাড়ি আঁকড়ে পড়ে আছেন। তাছাড়া এ বাড়ির পক্ষে সেটা শোভনও নয়। নবজাতক সহ সদ্যপ্রসূতিকে বাপের বাড়িতে রেখে আসা হলে গেরস্ত সমাজে নানারকম কানাঘুষো অপপ্রচার হয়।
এইসময় একদিন–তখন অম্বুবাচি চলছে–সকালে ঘাটে স্নানে গিয়ে সরোজা একটি কলার ভেলা দেখলেন। তখন সরস্বতী বর্ষার জলে ভরস্ত, গেরিমাটি লাল, রজস্বলা হয়েছে। সেদিন ভোরের জোয়ার থিতিয়েছে কিন্তু ভাটা নামেনি তখনও, স্রোতহীন জলে দুলছে পুকুর-ভাসা কচুরিপানা। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, মেয়েদের স্নানের ঘাটের সিঁড়ি ভিজে পিছল। অন্যান্য দিন সকালে স্নানের সখী গঙ্গাজলেরা থাকেন, কিন্তু সেদিন বাড়িতে একা হাতে অম্বুবাচির পুজোর যোগাড় দিতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছিল সরোজার। জনহীন ঘাটে শেষ সিঁড়িতে নেমে তিনি অভ্যাস মতো গামছাটা পেঁচিয়ে কলসির ওপরে রাখলেন, তারপর আঙুলে জল ছুঁইয়ে মাথায় ছিটিয়ে নেমে গিয়ে ডুব দিলেন। ভরা নদীতে খলবল করছে মানুষের কণ্ঠস্বর। সরোজা দুহাত প্রসারিত করে জল ঠেলে সরিয়ে দ্বিতীয়বার ডুব দিয়েও রাধানগরের কোনো চেনা পড়শির কন্ঠ খুঁজে পেলেন না। দূরদূরান্তে নদীর ধারে শ্বশুরঘর মেয়েঝিয়েরা বাপের ভিটের মা-কাকীমাদের সঙ্গে বার্তাবিনিময় করছে, টের পেলেন। তৃতীয়বার ডুব সেরে উঠে সরোজা বুকজলে দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম করলেন। ঠিক সেইসময় শুনতে পেলেন একটি ক্ষীণ কণ্ঠস্বর যা ঠিক জলের ভেতর থেকে আসছে না। চোখ খুলে এদিক-ওদিক চাইতে চোখে পড়ল ঘাটের ধারে আধডোবা ভ্যারেন্ডার ঝোপে ভেসে এসে আটকে আছে একটি কলার ভেলা, ওপরে আড়াআড়ি বাঁশের বাতায় মশারি টাঙানো।
এক ঝলক দেখেই সরোজা বুঝলেন জিনিসটি কী। বছরের এই সময়ে গ্রামেগঞ্জে সাপে-কাটার প্রকোপ বাড়ে, মাঝেসাঝেই নদীতে এমন ভেলা ভেসে যেতে দেখা যায়। কখনো-সখনো দূর থেকে পচাগলা শবের গন্ধও পাওয়া যায়। কিন্তু এর আগে তিনি কখনো কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শোনেননি। বুক দিয়ে জল ঠেলে, দঁক কাদায় গোড়ালি গিঁথে গিঁথে ভেলাটার কাছে চলে এলেন সরোজা। মশারির ভেতরে আবছা দেখা যাচ্ছে মাটির পাত্র, এক মুঠো চাল আর কালো হয়ে আসা এক জোড়া কলা, কিছু শেকড়বাকড়, কাদার তালে গাঁথা ধূপকাঠি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এবং ঘাসের মাদুরে শোয়ানো একটি মনুষ্যদেহ। অস্পষ্ট মনে হয় একটি মেয়ে।
সরোজা চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে মশারি সরালেন। হ্যাঁ, একটি মেয়েই! তার অচৈতন্য ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ গোঙানির শব্দটা আসছে। প্রথমেই মনে পড়ল গত কিছুদিন ধরে শাকম্ভরী দেবী একটি জাহাজ আসার কথা বলছিলেন, তিন মাস্তুলের বড়ো জাহাজ যার অনেকগুলো পাল আর মাস্তুলের মাথায় সবজে-সোনালি পতাকা। মেটেঘরের দাওয়ায় বসে দইমাখা কণকচুর খই মাড়ি দিয়ে পাগলে খেতে খেতে পর পর ক’দিন বলেছিলেন সেই জাহাজটার কথা। সরোজা বুঝেছিল এটি স্বপ্ন। অন্তর্জলী থেকে ফিরে আসার পর ইদানীং শাকম্ভরী স্বপ্ন আর বাস্তবের ভেদ গুলিয়ে ফেলছিলেন। আগের দিন প্রাতরাশ দিতে যাবার সময়েও বৃদ্ধা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দাওয়ার খুঁটির দিকে ফিরে বলেছিলেন
‘পরাণবউকে জিজ্ঞেস কর তো নদীতে আজ চানে গিয়ে জাহাজটা দেখেছে কি না? দেখা গ্যাছে নাকি কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে?’
সরোজা ধৈর্য রাখতে পারেননি, দাওয়ার খুঁটিকে বলেছিলেন–
‘পিসিমাকে বলে দে সরস্বতীতে আর জাহাজ আসে না। আর এখন বর্ষাকাল চলছে, এখন কুয়াশা হয় না।’
সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সরোজা দেখলেন মেয়েটার দেহ থেকে থেকে নড়ে উঠছে, স্থির জলে কেঁপে কেঁপে উঠছে ভেলাটা।
