সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.২
১২.২
কলুটোলা লেনে এক রবিবারে জমায়েতের মাঝে শিউলি কাউকে কিছু না জানিয়ে দুম করে হঠাৎ বাপ্পাকে নিয়ে সাতগাঁয়ে চলে গেল। তার আগে একদিন– সেদিনই কি?
রান্নাঘরে চকিতে মা আর চিনিকাকার ধ্বস্তাধ্বস্তির দৃশ্য দেখেছে বাপ্পা। সেই ঘটনার পরেও কলুটোলা লেনের বাসায় রবিবারের আড্ডা বসেছে। কিন্তু সেগুলো যেন আর আগের মতো উচ্ছল ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়নি। সেজন্য মায়ের মনে কোনোরকম অনুশোচনা কিংবা অভাববোধ দেখেনি বাপ্পা। বরং উলটোটাই। কোনো একভাবে যেন কলকাতার জীবনটাকে, ঘিঞ্জি গলির ভেতর ছোট্ট দেশলাই বাক্সের মতো বাসাটাকে, তার জীবনে দুই প্রিয় মানুষকে নিজের মতো করে ফিরে পেয়েছে শিউলি। বাসাটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। রথীন অফিসে বেরিয়ে যাবার পর দুপুরবেলায় বাপ্পাকে নিয়ে ট্রামে চেপে ধর্মতলায় গিয়েছে, হগ মার্কেটের পেছন দিকে অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে দরদাম করে নানান শৌখিন চীনেমাটির বাসন, বাসের মাথায় সাহেব-মেম লবণ-মরিচদানি (‘লুকোচুরি’ সিনেমায় যেমন দেখা যায়), কেক তৈরির রকমারি ছাঁচ কিনেছে, কাশ্মিরী মুসলমানের দোকান থেকে কুরুশের কাজ করা টেবিলঢাকা, সোফার জন্য পশমি আসন, ডোকরার ঘর সাজানোর জিনিস কিনেছে। কলকাতায় ওদের শেষবার বিবাহবার্ষিকীতে রথীনের কাছে আবদার করে অ্যাংলো সুইস ওয়াচ কোং থেকে কুকু ক্লক কিনেছে। বসার ঘরের দেয়ালে সেই ঘড়িতে প্রতি ঘন্টায় একটি ছোট্ট বাদামী কোকিল বেরিয়ে এসে ডাকত।
অনেককাল পরে মায়ের সঙ্গে হগমার্কেটে যাবার সেইসব দুপুরগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাপ্পার মনে হবে, যেভাবে এল-ডোরাডো সাজিয়েছিলেন পাগলরাম, যেভাবে আওয়াধের শেষ নবাব মেটিয়াবুরুজে গড়েছিলেন ছোটা লখনউ, সেই একই আকুতিতে কলুটোলা লেনের বাসা সাজিয়ে মা অপেক্ষা করত সপ্তাহান্তে কর্মস্থল থেকে বাবার ফেরার জন্য। মা কি জেনে গিয়েছিল সেই সাজানো সংসার পদ্মপাতায় শিশিরের মতোই উদ্বায়ু? সেই কুকু ক্লকটার মতো তখন নিজের ভেতরে টিক টিক করে বেজে চলেছে মৃত্যুঘড়ি, শুনতে পেয়েছিল কি?
শিউলি মারা যাবার পর বাবা-ছেলে দুজনের পক্ষেই ২৩/৩ কলুটোলা লেনে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠল। বাসার সর্বত্র অসহনীয় স্মৃতির ভার। কিছুদিনের জন্য ওরা এসে উঠল দমদমে খোকাদের বাসায়। সেখান থেকে অফিস করতে লাগল রথীন। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাপ্পার কাছে— ‘বাবা’ শব্দটার মানে ছিল এক আবছা দূরের মানুষ যে মানুষটা ছুটির দিন সকালে সোফায় বসে স্টেটসম্যান কাগজ দিয়ে দুর্গ বানায়, দুর্গের মাথায় দেখা যায় নীল ধোঁয়া, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, কোনো কোনো সন্ধ্যাবেলা শোবার ঘরে একা হুইস্কির গ্লাস হাতে নিয়ে, পুরোনো ট্রাঞ্জিস্টার রেডিওটায় দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে, টেলিফোন তুলে অফিসের কোনো অধস্তন কর্মচারীকে ধমক লাগায়; যে মানুষটা রোজ সকালে কাটায় কাঁটায় নটায় ব্রেকফাস্ট সেরে কালো চামড়ার ব্রিফকেসটা নিয়ে অফিসে যায়, যার ব্রিলক্রিমে পরিপাটি উজ্জ্বল কালো চুল, সেভেন ও’ ক্লক ব্লেডে নিখুঁত কামানো চিবুক, সকালে মসৃণ আর বিকেলের পর ঈষৎ সবজেটে, ওল্ড স্পাইস আফটার শেভ লোশনের সুগন্ধ ভাসে দূরাগত সমুদ্রবায়ুর মতো। মায়ের মৃত্যুর পর বাপ্পা লক্ষ করল বাবার অযত্নে কামানো চিবুকে দাড়ির চিহ্ন, জামার কলারে শুকনো ঘামের দাগ।
বাইরে থেকে দেখে অবশ্য কিছু বোঝার উপায় নেই। মানুষটা দমদমের বাসা থেকে অফিসের পুল কারে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ যায়, সন্ধ্যাবেলা ফিরে আসে, বাপ্পাকে নিয়ম করে হোমটাস্ক দেয়, ছুটির দিনে পড়া বুঝে নেয় সবই যেন রোবটের মতো।
আপাতত দক্ষিণ সিঁথি ঋষি অরবিন্দ বিদ্যানিকেতনে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছে বাপ্পা। ইস্কুলটা খোকাদের বাসার কাছেই, হেঁটে যাওয়া যায়। হিন্দু স্কুলের মতো এই স্কুলটিও রাজ্য সেকেন্ডারি বোর্ডের আওতাভুক্ত, সেবার কলেজ স্ট্রিটে কেনা বইগুলো কাজে লাগছে। তবে জেলার স্কুলগুলোয় যেমন পদস্থ অফিসারের ছেলে হিসেবে বাপ্পার বিশেষ খাতির ছিল, এখানে তেমন কিছু নেই। বিয়াল্লিশ জন ছাত্রের ক্লাসে অনেকের মধ্যে আরও একজন হবার মধ্যে একটা স্বস্তি আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ইস্কুলটা ভালো লাগে না বাপ্পার। ইস্কুল বাড়িটা ছোটো, ব্যস্ত রাস্তার ধারে, খেলার মাঠ নেই। ক্লাসঘরে সারাক্ষণ বাইরে থেকে গাড়ির হর্ন আর বাজারের কোলাহল ভেসে আসে, ছায়াচ্ছন্ন ঘরগুলোয় দিনের বেলাতেও টিউবলাইট জ্বলে। সহপাঠিরাও রঘুনাথপুর কিংবা শিউড়ির তুলনায় অনেক বেশি দুরন্ত আর রুক্ষ ধরনের। তারা ক্লাসে শিক্ষক থাকলেও গোলমাল করে, খুনসুটি করে, কাগজের গোলা পাকিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করে, টিফিনবেলায় মারামারি করে। স্কুল ছুটির পর অধিকাংশের সাদা জামায় লেগে থাকে কালির ছিটে, বোতাম ছেঁড়া, হাঁটুতে কনুইয়ে ছড়ে যাবার দাগ। শিক্ষকেরা কেউ গোবেচারা, কেউ উদাসীন, কেউ আবার মারকুটে। এবং দিনের পর দিন ইস্কুল কামাই করলেও কোনো শাস্তি নেই।
দমদমের এই ইস্কুলে যাওয়াটা একটা অস্থায়ী বন্দোবস্ত, সেটা বাপ্পাকে বলেছে রথীন। শিউলির অসুখের কারণে সে কলকাতায় এসেছে অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি পদে। স্থায়ী পদে ফিরলে কলকাতায় হোক বা জেলায় কোনো ভালো সরকারী স্কুলে ভর্তি করা হবে বাপ্পাকে। সেজন্য মাঝেসাঝেই ইস্কুলে না যেতে চাইলে মোমবুচানের প্রশ্রয়ে রথীন কিছু আর বলে না। বাবার কাছে অঙ্ক, খোকা জেঠুর কাছে ইতিহাস ভূগোল আর মোমবুচানের কাছে বাংলা পড়ে বাপ্পা
মোমবুচানের পড়ানোর মধ্যে একটা পুজো-পুজো ভাব আছে। নিষ্ঠাভরে একই মন্ত্র জপ করার মতো করে বাপ্পা হাতের লেখা অভ্যাস করে। লাইন-টানা খাতার পাতা জুড়ে একই লাইন বার বার লেখে–
দিনমণি অস্তাচলগমনোদ্যোগী দেখিয়া অশ্বারোহী দ্রুতবেগে অশ্ব সঞ্চালন করিতে লাগিলেন।
দিনমণি অস্তাচলগমনোদ্যোগী দেখিয়া অশ্বারোহী দ্রুতবেগে অশ্ব সঞ্চালন করিতে লাগিলেন।
দিনমণি অস্তাচলগমনোদ্যোগী দেখিয়া অশ্বারোহী দ্রুতবেগে…
কোনোদিন র্যাপিড রিডার থেকে রিডিং পড়ে শোনায়।
তুষের আগুন যেমন প্রথমে ধিকি ধিকি শেষে হঠাৎ ধু ধু করে জ্বলে ওঠে তেমনই কীভাবে গোহের পর থেকে রাজপুতদের ওপর ভীলদের রাগ ক্রমে ক্রমে, অল্পে অল্পে, বাড়তে বাড়তে একদিন দাউ দাউ করে পাহাড়ে পাহাড়ে, বনে বনে দাবানলের মতো জ্বলে উঠল, হাজার হাজার কালো বাঘের মতো ভীল ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে রাজপুতের রক্তে পাহাড় রাঙা করে তুলল, আর তখন রাজমহিষী রাজকুমার বাপ্পাকে কোলে নিয়ে হাওয়া খেতে কেল্লার ছাতে উঠেছিলেন, ঘুমন্ত বাপ্পাকে ওড়নার আড়ালে ঢেকে তাড়াতাড়ি নেমে এলেন। তখন, দুপুরবেলায়, নিজঝুম পাড়ায় গলির ওপাশে গাঙ্গুলিদের বাগানে ঘুঘু ডাকে, ধুনুরিওয়ালা কাসারিওয়ালা— ‘কুয়োর বালতি-তোলাবে’-ওয়ালা হেঁকে যায়। আর যখন সেই ভয়ানক রাত্রে অসুরের মতো দেখতে ভীল সর্দারের কপালে ভারি সোনার চাবির গোছা ছুঁড়ে মেরে ছোট্ট বাপ্পাকে কোলে নিয়ে রাজমহিষী বীরনগরে পৌঁছে ব্রাহ্মণী কমলাবতীর দরজায় ঘা দেন, তখন সবে ভোর হচ্ছে কিন্তু পাখিরা জাগেনি, বরফের মতো ঠান্ডা হাওয়া বইছে, মোমবুচানের মৃদু নাকডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে, স্ফীত গোলাপি চিবুকে বালিশ-ঢাকার এমব্রয়ডারির দাগ, উঠোনে টাইমকলে জল আসার শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পল্টুর মা বাসন মাজতে আসবে। কেরোসিন স্টোভ ধরানোর গন্ধে, কেটলিতে চায়ের জল ফোটার শোঁ শোঁ শব্দে ভরে উঠবে বিকেলের পলকা বায়ু।
.
মা মারা যাবার পর ন্যাড়া হয়েছিল বাপ্পা। তারপর চুল বেড়ে স্বাভাবিক হয়েছে সেটা স্পষ্ট হলো যেদিন ওর মাথার পেছনে চুলে চুইংগাম লাগিয়ে দিল লাস্ট বেঞ্চির কেউ, যাদের তপন স্যার বলেন—‘ব্যাকবেঞ্চার গ্যাং’। বাড়িতে ফেরার পর নারকেল তেল দিয়ে মোমবুচানের শত চেষ্টাতেও আঠা ছাড়ানো গেল না, কাঁচি দিয়ে চুলের গুছি কেটে দিতে হলো। ততদিনে বাপ্পা জেনেছে: তপন স্যারের ভূগোল ক্লাসে নিশ্চিন্তে খাতায় কাটাকুটি খেলা যায়, আর স্যার যখন বোর্ডের দিকে ফিরে ম্যাপ পয়েন্টিং করেন তখন এমনকি কাগজের গোলা পাকিয়ে লোফালুফিও খেলা যায়; জেনেছে, কলম খুলে নিবটা সামনের বেঞ্চির কারোর সাদা জামায় ছুঁইয়ে ধরে থাকলে কালির বৃত্ত ক্রমশ বাড়তে থাকে; জেনেছে, ইতিহাসের আশু স্যার পড়াতে গিয়ে থুতু ছেটান, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বলার সময় থুতুর মাত্রা বাড়ে, এবং সামনের বেঞ্চে ছেলেদের মাথার চুল ভিজে ওঠে শিশিরের মতো; জেনেছে, ভোলানাথ স্যার ধুতির নীচে অন্তর্বাস পরেন না, তিনি সবাইকে র্যাপিড রিডারের পাতা খুলে উচ্চারণ করে পড়তে বলেন, একেকজন একেকটি করে লাইন। তারপর তাঁর ধুতি-পাম্পশু পরা পা দুটো টেবিলের ওপরে তুলে দিয়ে চোখ বোঁজেন। বেঞ্চে পর পর ছেলেরা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে–
–‘সেই বনের একধারে আজ ঝুলন-পূর্ণিমার আনন্দের দিনে, শোলাঙ্কি বংশের রাজার মেয়ে সখীদের নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন।’
–‘রাজকুমারী বললেন— ‘শুনেছিস ভাই, বনের ভিতর রাখাল-রাজা বাঁশি বাজাচ্ছে!’
–‘সখীরা বলে–‘আয় ভাই, সকলে মিলে চাঁপাগাছে দোলা খাটিয়ে ঝুল্নো-খেলা খেলি আয়’
–‘কিন্তু দোলা খাটাবার দড়ি নেই যে!’
–‘সেই বৃন্দাবনের মতো গহন বন, সেই বাদলা দিনের গুরু গর্জন…’
টেবিলের ওপাশ থেকে নাসিকা গর্জন শোনা যেতেই ক্লাসঘরের বদ্ধ বাতাসে ঘামের গন্ধ ছাপিয়ে উৎকট দুর্গন্ধে ভরে ওঠে। ভোলানাথ স্যার জেগে উঠে নাক কুঁচকে বার দুই শ্বাস নিয়ে পকেট থেকে ধুতির কোছাটা টেনে নাকে চেপে খেঁকিয়ে ওঠেন—
‘ভাগাড়ের পচা মাংস খেয়ে এসেছে কোন কুষ্মান্ড রে!’
গোটা ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ে। ভোলানাথ স্যার টেবিলে ডাস্টার ঠুকে চিৎকার করেন— ‘সাইলেন্স! সাইলেন্স!’
আবার শুরু হয় র্যাপিড রিডারের পাঠ–
–‘সেই দুরে বনে রাখাল-রাজের মধুর বাঁশি, সেই সখীদের মাঝে শ্রীরাধার সমান রূপবতী রাজনন্দিনী, সবই আজ যুগযুগান্তরের আগেকার বৃন্দাবনে কৃষ্ণরাধার প্রথম ঝুলনের মতো!’
ব্যাকবেঞ্চার গ্যাঙের নেতা পীযূষ, দুবার ফেল করে একই ক্লাসে আছে। কপালের ওপর চুল ফুলিয়ে লক্কা পায়রার মতো টেরি কাটে, পকেটে ছোটো চিরুনি রাখে। সেই ক্লাসে লুকিয়ে গাঁদাল পাতা আনে, দুহাতে ডললে দুর্গন্ধে ঘর ভরে ওঠে।
–‘এমন দিন কি ঝুল্না বাঁধার একগাছি দড়ির অভাবে বৃথা যাবে?’
ক্লাসঘরে নৈঃশব্দ্যের ভেতর আবার খুকখুক খিক খিক হাসির রোল, জলের ওপর তরঙ্গের মতো ক্রমশ ছড়িয়ে যেতে ভোলানাথ স্যার ফের চটকা ভেঙে চোখ খোলেন। দেখেন সামনের দিকে ছেলের দল মাথা নীচু করে টেবিলের নীচে চেয়ে ঠোঁট চেপে হাসছে, হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে।
‘শকুন! শকুন!’ ভোলানাথ স্যার রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলেন। ‘শকুনের চোখ ভাগাড়ের দিকে!’
আবার হাসির বিস্ফোরণ, আবার টেবিলে ডাস্টার ঠোকার শব্দ।
টিফিনবেলায় শুরু হয় পীযূষের ক্লাস। বাপ্পাকে ধরে পড়া ধরে–
‘ভোলানাথ স্যারের ওইটা কিন্তু ভাগাড় নয়। স্যার ভুল বলল। স্যারের ওইটাকে কী বলে বল দিকি?’
বাপ্পা মাথা নাড়ে, জানে না।
‘স্যারের ওটার নাম হল পোতা!’ পীযূষ বলে।
বাপ্পা শেখে, তিন থেকে নব্বই বছর পর্যন্ত বয়ঃক্রম অনুসারে পুরুষের গোপনাঙ্গের বিভিন্ন নাম রয়েছে। পাখি-পড়া করে ওকে দেহের বীজগণিত শেখায় পীযূষ পুকু< পুনু< নুঙ্কু< নুনু< ধোন< ল্যাওড়া< বাঁড়া< শেউ< হোল- পোতা< তবিল< ঝোলা। এছাড়াও টিফিনবেলার ক্লাসে বাপ্পা শেখে
ক – কোন্ কোন্ ক্রিয়াপদের আগে কী কী বিশেষণ যোগ করে কত রকমের অভিনব গালি নির্মাণ করা যায়
খ — এক ফোটা বীর্য = ৮০ ফোঁটা রক্ত
গ – শিশুর জন্ম মলদ্বার নয়, প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে হয়
ঘ – নারীর ওই দ্বারটি তালার ছিদ্রের আকারের, তবে সেটি উলটানো।
নিজেই নিজের দেহের সঙ্গে কী কী করা যায় সেসবও শেখে, যা ইতিমধ্যেই অস্পষ্টভাবে জানত বাপ্পা।
.
‘তুই ওদের সঙ্গে কথা বলিস কেন?’ ইস্কুল ছুটির পর বাপ্পাকে একদিন সুস্নাত বলল। ‘ওরা খারাপ ছেলে।’
সুস্নাত লাহিড়ি— ‘গুড বয়’, কিন্তু ফার্স্ট বেঞ্চে বসে না। ওর অসম্ভব রোগা চেহারা আর হেঁড়ে মাথার জন্য আশু স্যার ওকে বলেন খ্যাংরা-কাঠি-আলুর দম’, পীযূষরা ডাকে— ‘কাতলা’ ও— ‘ললিপপ’ বলে। সুস্নাতকে দেখে মনে হয় সদ্য কঠিন অসুখ থেকে উঠেছে। টিফিনবেলায় বাড়ি থেকে আনা খাবার খায় না, গেটের বাইরে ঘুগনি, চুড়মুড় কিংবা বুনো কুল কিনেও খায় না। সুস্নাতর ইস্কুলে পরার একটাই সাদা জামা, উপর্যুপরি নীলে চুবিয়ে আকাশি হয়েছে, কলারের কাছে ফেঁসো উঠছে। ক্লাসে কিছুদিন সুস্নাতর পাশে বসতে শুরু করল বাপ্পা, তৃতীয় বেঞ্চির মাঝখানে। ওখানে বসলে শিক্ষকের নজরে পড়তে হয় না, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা দেখা যায়, আবার ব্যাকবেঞ্চার গ্যাং-এর নাগালের বাইরেও থাকা যায়।
বাপ্পার মতোই সুস্নাতরা পূর্ববঙ্গীয়। বাপ্পার মা নেই, সুস্নাতর বাবা নেই। এক শনিবার হাফছুটির পর নেতাজি কলোনিতে সুস্নাতদের বাড়ি গেল বাপ্পা। কালো ময়লা বাগজোলা খালের ধারে ছিটেবেড়া আর দর্মাটালির সারি সারি কুঁড়ে ঘরের একটিতে ওরা থাকে। কাঁচা গলির মাঝখান দিয়ে নর্দমা, একপাল শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাড়ির উঠোনে বসে ছেঁড়া টায়ার থেকে সুতো ছাড়াচ্ছে মেয়েবউরা। কলকাতা শহরের পেটের মধ্যে এই কলকাতাটা আগে এত কাছে থেকে দেখেনি বাপ্পা।
বাঁশের বেড়ার ধারে উবু হয়ে বসে কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে মাটি মিশিয়ে গুল দিচ্ছিলেন এক নারী। পরনে ডুরে শাড়ি, মাথার চুল উস্কোখুস্কো। ওঁকে দেখেই সুস্নাত বাপ্পার জামা টেনে ধরে।
‘ছোট্!’
একচিলতে মেটে উঠোন, একটি মরকুটে কুলগাছের ছায়ায় শ্যাওলায় সবুজ হয়ে আছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে পাতা ইটের ওপর দিয়ে দ্রুতপায়ে যেতে যেতে শোনা যায় মহিলার কাংস্য কন্ঠস্বর–
‘হারামজাদা! কাল কহন থিক্যা কইসি র্যাশনে পাঞ্জাব গম আইসে তুইল্যা আন। এহনো সময় অইল না পুঙ্গির পুতের! ফুরায়ে গ্যালে খাইবি কী র্যা? তুর হাগা?’
সুস্নাতদের ঘরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার, চালের নীচে ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো এসে ঢুকছে। কেমন একটা গুমসানো গন্ধ। শোবার ঘরে বেশিরভাগ জায়গা নিয়ে রয়েছে কাঠের চৌকি, তার চারটি পায়ায় ইট সাজিয়ে উঁচু করা। নীচে খেজুরপাতার চাটাই পেতে সুস্নাতর পড়ার জায়গা জলচৌকির ওপর খাতা বই দোয়াত কলম পরিপাটি করে সাজানো। পাশের ঘরটা ওর কাকার। উনি সারাদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে গৃহশিক্ষকতা করেন। উঁকি দিয়ে বাপ্পা দেখে, প্রায় আসবাবহীন ঘরের এক কোণে দড়িতে জামা কাপড় ঝুলছে, দরমায় গাঁথা কাঠের তক্তায় এক সারি বই, একটি ক্রাচ হেলান দিয়ে রাখা। তার ঠিক ওপরে সাদা দাড়িওয়ালা ও টাকমাথা দুই পুরুষের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি: রবীন্দ্রনাথ ও লেনিন।
‘ক্রাচটা কার রে?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘ওটা কাকার বাড়ির ক্রাচ। কাকার ডান পায়ে পোলিও, সেই ছোটোবেলা থেকে,’ সুস্নাত বলে। ‘কিন্তু কাকার মতো ইংরেজি আর ইতিহাস কেউ জানে না, ইস্কুলে স্যারেরাও না।
‘ছাওয়ালডা কে র্যা? তর বন্ধু বুঝি?’
চমকে পেছন ফিরে বাপ্পা দেখে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন সেই নারী, সুস্নাতর মা। গুল-দেওয়া হাত ধুয়েছেন, চুলে আলগা গিঁট বেঁধেছেন। কন্ঠস্বর আগের মতোই কর্কশ কিন্তু মুখে কোমল হাসি।
‘পান্তা খাবা তো নাকি? তর বন্ধু খাবা?’ বলে সুস্নাতর মা উত্তরের অপেক্ষা না করে দর্মার পার্টিশানের আড়ালে সরে যান। ওপাশ থেকে বাসন- কোসনের শব্দ আসে, তারপর চৌকির নীচে সুস্নাতর আস্তানায় এগিয়ে আসে দুটি শীর্ণ হাত, নোয়া-পরা, হাতে ধরা দুটি হিন্ডালিয়ামের সানকিতে ফুলে-ওঠা ভাত, ওপরে খোসা ছাড়ানো গোটা পেঁয়াজ, পোড়া লঙ্কা আর জারক লেবুর আচার।
‘ধর গো! নাম কী বন্ধুর?’
‘বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়।’
দুহাত বাড়িয়ে শানকিটা হাতে নেয় বাপ্পা। চৌকির নীচ থেকে ওঁর মুখ দেখা যায় না, পা দুটো দেখা যায় কেবল। শুকনো ফাটা পায়ের পাতা, আঙুলের ফাকে হাজা।
‘খা? তুই পান্তা খাস তো?’ ভাতে পোড়া-লঙ্কা ডলতে ডলতে সুস্নাত বলে। ‘আমরাও কিন্তু বামুন। খা?’
কোনোদিন পাস্তা চোখেই দেখেনি বাপ্পা। কেমন একটা টক-টক ঝিমধরা স্বাদ। চিবোতে গিয়ে কেন কে জানে বাপ্পার চোখে জল চলে আসে। সুস্নাত দেখতে পাবার আগেই লঙ্কায় কামড় দেয় সে।
*
সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে গা ধুয়ে সরষের তেল মাখা মুড়ি আর চা খেতে খেতে বাপ্পাকে ইতিহাস পড়ায় খোকাজেঠু। সিন্ধুসভ্যতা আবিষ্কারের কথা পড়াতে গিয়ে চলে যায় রথীনের প্রথম জীবনে আর্কিওলজিকাল সার্ভের দিনগুলোর কথায়, সেখান থেকে তাদের ছেড়ে আসা দেশের ইতিহাসে। খুব ছোটোবেলায় একবার বাপ্পাকে কোলে বসিয়ে চিনিকাকা সিদলভর্তা ভাতে মেখে খাওয়াতে খাওয়াতে নদীনালায় কাটাকুটি বিলে-ছাওয়া সবুজ দেশটার গল্প বলেছিল। খোকাজেঠুর গলাতেও তেমনই এক আবেশ ফোটে। কিন্তু এই ইতিহাসটা জটিল, বেশিটাই বাপ্পা বুঝতে পারে না। এ যে কাঁচা সিদল মজে ওঠার রূপকথা নয়, সেটা অন্তত সে বুঝতে পারে। এও বুঝতে পারে, চিনিকাকার মতোই জেঠুও যে কথাগুলো তাকে বলছে সেগুলো আসলে নিজেকেও বলছে। নিজের কন্ঠস্বর শুনছে, নিজেকে মনে করাচ্ছে।
‘বাপ্পা, তুই মনে কর এট্টা নৌকা!’ — খোকাজেঠু বলে– ‘মনে কর নৌকাডা জলে খাড়ায় আছে আর ঘাটগুলা আগায়ে আগায়ে আসতেছে। একখান করে ঘাটে ভিড়ছে নৌকাডা, ফের হাছুমাছু করে সরে যাচ্ছে। মনে কর, জলডা অইল হিস্ট্রি, নৌকাডা অইল শ্রীহট্ট। কেউ কয় সিলেট, কেউ কয় সিলোট, আসল কথাডা অইল শ্রীহট্ট। আছুদা ইংরাজগুলার জিহ্বায় শ্রীহট্ট ফুটত না, অরা কইত সিলেট। কিন্তু শ্রীহট্ট মানে অইল সোন্দরের দেশ।
মি’লেডি, শ্রীহট্ট জেলাটা ছিল আসাম উপত্যকার ধারে। পলাশী যুদ্ধের সত্তর বছর পর ইংরেজরা বর্মার সঙ্গে লড়াই করে আসামকে ছিনিয়ে নিল, তাকে জুড়ে দিল বেঙ্গল প্রভিন্সের সঙ্গে। তারও প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে আসামের লাগোয়া অঞ্চল নিয়ে তৈরি হলো নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি। সিলেট আর সেই সঙ্গে কাছাড় আর গোয়ালপাড়া জেলাকে জুড়ে দেওয়া হলো।
‘হুনচিস? সিলেটের নৌকা ভিড়ল অহমের ঘাটে!’
তার বছর পঁচিশ পরে লর্ড কার্জন বাংলা কেটে দুভাগ করল, আসামকে জুড়ে দিল পুব বাংলার সঙ্গে। তার নাম দিল ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম, রাজধানী ঢাকা। সিলেটের নৌকার দিকে ফের এগিয়ে এল বাংলার তীর, সিলেট বাংলায় ফিরল। কিন্তু কার্জনের বাংলা ভাগ নিয়ে শুরু হলো প্রবল বিক্ষোভ। চাপে পড়ে ইংরেজরা দুই বাংলা জুড়ে দিল, কিন্তু আসামকে ফের কেটে নিয়ে আলাদা একটা প্রভিন্স গড়ল। সেই প্রভিন্সে ঢুকে গেল সিলেট। সেইসঙ্গে গোয়ালপাড়া আর কাছাড়ও।
আবার নৌকা ঘাট বদলালো, মি’লেডি।
সিলেটের এই নৌকার যাত্রীদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই ছিল। সিলেটি ভাষা আর সংস্কৃতির কাছিতে বেঁধে-বেঁধে ছিল তারা। আসামের ঘাটে নৌকা ভিড়লেও মনে মনে যাত্রীরা আসামকে কোনোদিন নিজের বলে ভাবেনি। ওরা মনে করেছে আসাম হলো পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। এদিকে ঘাটের মানুষ, অর্থাৎ অসমিয়ারাও মনে করেছে সিলেটিরা উদ্ধত আর চতুর, উড়ে এসে জুড়ে বসে চাকরিবাকরি ব্যবসাপাতি সব দখল করেছে। নৌকার যাত্রীদের একাংশ সিলেটকে পুব বাংলার ঘাটে ভেড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল প্রাণপণে। কিন্তু ওদিকে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন যত দানা বেঁধে উঠছে, শাসকও ডিভাইড-অ্যান্ড-রুল নীতিতে বিভেদের রাজনীতিতে উস্কানি দিচ্ছে। এক নৌকার যাত্রী সিলেটিদের মধ্যে ভাষাসংস্কৃতির বন্ধন ছাপিয়ে ক্রমশ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ধর্ম। এসবেরই মধ্যে দেশভাগ হলো, তার কিছুদিন আগে সিলেটের তরী কোন তীরে ভিড়বে সেই নিয়ে রেফারেন্ডাম হলো। ভোটাভুটির ফলে পূর্ব বাংলায় (তখনও সরকারিভাবে পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ হয়নি) ভেসে এল সিলেট।
‘এইডা অইল সিলেটের নৌকার গপ্পো, খোকাজেঠু বলে। ‘এবারে তুই ভাব নৌকার প্যাটের ভেতর এট্টা নৌকা, আমাদিগের বংশের নৌকা!’
মি’লেডি, সদরপাড়ায় চাটুজ্যে বংশের নৌকাটা সিলেটের নৌকার ভেতরে ছিল অনেক পুরুষ ধরে। তার অনেক বছর আগে সুদূর তুর্কিস্তানের কোনিয়া থেকে ধর্মপ্রচার করতে এই বাংলায় এসেছিলেন সুফি সন্ত হজরত শাহ জালাল। সিলেটের আকাশে তিনি উড়িয়ে দিলেন গোলাপি কন্ঠহার-আঁকা কবুতর, কাগজের পাতে ছড়িয়ে দিলেন এক বিশেষ লিপি। সেই লিপিতে লেখা হতে লাগল সিলেটের বুলি, নাম হলো সিলোটি-নাগরি। চাটুজ্জ্যে বংশের পুরুষেরা ছিল রাজার মন্ত্রী পুরোহিত, তুলোট কাগজে সিলোটি নাগরি লিপিতে পুথিপত্র দস্তাবেজ লিখে রাজানুগ্রহে অনেক জমিজমা সম্পত্তির অধিকারী হয় তারা।
কিন্তু মি’লেডি, দেশভাগের আগে সিলেটের নৌকার পেটে চাটুজ্জ্যেদের এজমালি নৌকাটা দুলতে লাগল, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল জল। ছোটো নৌকাটায় চিড় ধরে ভাঙতে লাগল। নোয়াখালির দাঙ্গার পর খোকাজেঠুর বাবা, রথীনের কাকা, বাস উঠিয়ে আসামের ব্যবসাকেন্দ্র গৌহাটিতে চলে গেলেন। ইতিমধ্যেই এক জাতি পরিবার বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জে বাড়ি করেছিলেন। এককালে করিমগঞ্জ সিলেটেরই একটি মহকুমা ছিল, কিন্তু দেশভাগের সময় ইতিহাসের বিচিত্র ধারায় সেটি ভারতে রয়ে যায়। এখন রথীনের আরেক কাকা তার পরিবার নিয়ে করিমগঞ্জে আত্মীয়ের আশ্রয়ে গেল। এবং তারপর তাঁরা সকলে মিলে সিলেট শিলং হাইওয়ে ধরে চলে গেল শিলঙে, আসামের রাজধানীতে।
প্রবীণদের মধ্যে কেউ কেউ সিলেটে ভিটে আঁকড়ে রয়ে গেলেন কুলদেবতার পুজো দিয়ে ঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য, শেষবার চোখ বোজার আগে বাগানে গাছের ফাঁক দিয়ে আসা আলো দেখার জন্য। পরিবারের খন্ডিত ছায়া-নৌকা ভেসে ভেসে এল আসামে, করিমগঞ্জে, গৌহাটিতে। শিলঙে।
যারা চলে গেল তারা স্বাগত ছিল না, যারা রয়ে গেল তারাও নয়। এই দ্বৈরথ থেকে মুক্তি পেতে কলকাতায় প্রথমে চলে এল রথীন। তারপর একে একে সকলে।
‘এইডা অইল আমাগো হিস্ট্রি, বাপ্পা!’ খোকাজেঠু বলে। ‘এই হিট্রিটা বিয়াক্কল দ্যাশের মানুষ জানে না। তুমায় জানতে অইব।’
দেশটা হারিয়ে এসে এত বছর পরিবারের সকলেরই ভাগ্য ফিরেছে, সদরপাড়ার চাটুজ্জ্যে বংশের সকলেই চাকরি বাকরি পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাহলে সুস্নাতদের ভাগ্য ফিরল না কেন? বাপ্পা ভাবে। বাবাকে জিজ্ঞেস করবে?
মোমবুচানের মুখে পরিবারের টুকরো টুকরো গল্পে জানতে পারে: শিলঙে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও চিনিকাকা পড়তে পারেনি অর্থের অভাবে; দেশভাগের দাঙ্গার সময়ে মিঠুপিসির এক দিদি হারিয়ে যায়; তার তরুণ বাবা একদিন হঠাৎ গৌহাটি ছেড়ে ২৩/৩ কলুটোলা লেনের ঠিকানা লেখা একটি মানি অর্ডারের রিসিট নিয়ে একা চলে আসে কলকাতা শহরে।
অতীত দিনের কথা, প্রায় পুরাণকথার মতোই, সিলেট থেকে আসা সেই পোস্টকার্ডের মতো অদেখা। রথীন কোনোদিন বাপ্পাকে বলেনি। প্রথম জীবনে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় যেভাবে সে শিখেছিল কীভাবে মাটির নীচে থেকে অতীতের ভঙ্গুর সামগ্রী খুঁড়ে বের করতে হয়, সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়েই সে ভাঙা, চিড়-ধরা, পোড়া, অসম্পূর্ণ স্মৃতিগুলো নিজের ভেতরে পুঁতে রেখেছে এতকাল।
অফিস থেকে ফিরে রোজ রোজ বাপ্পার হোমটাস্ক দেখার আর শক্তি থাকে না রথীনের। ছুটির দিন বাবা ওকে অঙ্ক শেখায়, জ্যামিতি বক্সের সরঞ্জাম ব্যবহার করে ত্রিভুজ, বৃত্ত, রম্বস আর প্যারাবোলা আঁকা শেখায়; সেই যেমন শ্মশানে পাটকাঠি দিয়ে ছাইয়ের ওপর আঁকছিল। বাবার গালে সেই তরতাজা সুগন্ধটা–ছোটোবেলায় অস্পষ্ট উৎকণ্ঠার মুহূর্তে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে যা খুঁজে নিয়ে স্বস্তি পেতে চাইত বাপ্পা আর পাওয়া যায় না। অকারণে বাবার গলা জড়িয়ে ধরার মতো বয়সও আর নেই। তাছাড়া এতদিনে বাপ্পা জেনেছে ওই বিশিষ্ট গন্ধটা ওল্ড স্পাইস আফটার শেভ লোশনের।
ওল্ড স্পাইস আফটার শেভ লোশনের বোতলের গায়ে আঁকা একটি পালতোলা নৌকা, হাতির দাঁতের মতো শাদা, বারগান্ডি রঙের জলে ভাসছে। নৌকার পেটে নৌকা, ইতিহাসের বিক্ষুব্ধ সাগরে ভাসমান। একটি জেলার নৌকার পেটে ভাসমান একটি পরিবারের নৌকা। সাতগাঁয় ঝুলন সাজানোর সময়ে হেমন্তমামা রামনবমীর মেলায় কেনা টিনের পটপটি স্টিমার ভাসিয়ে দিত কানাইয়ের চানের নীল প্লাস্টিকের গামলায়। পটপট পটপট করে পটপটি স্টিমার পিচবোর্ডের বাড়ি, পোর্সেলিনের গির্জা আর অচল রিস্টওয়াচের ডায়ালের ঘড়িঘরের পাশ দিয়ে, দেশলাই বাক্সের রেলগাড়ির ঝাঁটার কাঠির রেললাইনের কোল ঘেঁষে চক্রাকারে ঘুরে চলত।
আচ্ছা, যদি স্টিমার সমেত সেই জলভর্তি গামলাটিকে সরস্বতীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া যায়? বাপ্পা ভাবে। নৌকার পেটের ভেতরে নৌকা, বাইরে স্রোতের ঢেউয়ে দুলছে ভেতরের জল, সেই ঢেউয়ে দুলে দুলে ঘুরে চলেছে ছোট্ট টিনের নৌকা জন্মদিনে মোমবুচানের উপহার দেওয়া ক্রেয়ন রং দিয়ে নৌকা আঁকল বাপ্পা, ওল্ড স্পাইস আফটার শেভের বোতলের জাহাজের মতো তার পাল আর মকরমুখী গলুই আদিরাম মন্দিরের গায়ে প্যানেলের মতো। ছবিটা খামে ভরে ওপরে লিখল
To,
Miss Jyotikana Chakraborty, Class VI
Daffodil House Hostel
Sisters of Cluny Convent School
3 Strand Road
Croissantville, West Bengal
ইস্কুলে যাবার পথে পূর্ব সিঁথি সাব পোস্ট অফিসে গিয়ে স্ট্যাম্প কিনে খামের ওপরে সেঁটে ডাকবাক্সে ফেলে এল।
*
দমদমের বাসায় থাকতে শুরু করার পর থেকে খোকাজেঠু আর মোমবুচানের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের এক বিশেষ রসায়ন টের পেতে শুরু করেছে বাপ্পা। ইস্কুলফেরত তিতলির আবদারে বসন্তমামা কিনে দিত স্ট্রবেরি টার্ট, খোকাজেঠুও রোজ অফিসফেরত মোমবুচানের জন্য নিয়ে আসে গরম চপ ফুলুরি কুলফি মালাই, নিদেন পক্ষে পাড়ার মুদিখানার দোকান থেকে চানাচুর, ঝাল লজেন্স। মোমবুচান সবার কাছে খোকাজেঠুর কীর্তিকলাপ নিয়ে অভিযোগ করে যেন সে তার দুরস্ত ছেলে। ছুটির দিনে জেঠুর চুলে কলপ করে দেয়, পিঠে সাবান ঘষে ময়লা তুলে দেয়। নিয়ম করে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় দুজনে সেজেগুজে রূপশ্রী সিনেমা হল-এ নতুন বাংলা ছায়াছবি দেখতে যায়। বাপ্পাকেও মাঝে মাঝে সঙ্গে নিয়ে যায়। সাদাকালো পারিবারিক ছবি, পৌরাণিক, দেশপ্রেম, ঐতিহাসিক এমনকি উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত রোম্যান্টিক ছবি ও লোভ, শঠতা, প্রেম, অভিমান, আত্মত্যাগ, দারিদ্র্য, মৃত্যু নিয়ে গল্প। বেদনার দৃশ্যে মোমবুচান ভ্যানিটিব্যাগ খুলে রুমাল বের করে চোখ মোছে, ইন্টারভ্যালের সময় খোকাজেঠু কাঠি আইসক্রিম কিনে আনে।
চলমান ছবি পর পর বুনে তৈরি গল্পের খেই হারিয়ে ফেলে বাপ্পা। বাড়িতে ফিরে মোমবুচান বুঝিয়ে দেয়। দু-তিনদিন ধরে মাথার ভেতরে চলতে থাকে দৃশ্যগুলো, গল্প বুনতে থাকে। ক্রমশ বাপ্পা বুঝতে পারে, সিনেমায় গল্পের অনেক কিছু ঘটে চলে পর্দার বাইরে, যা দেখানো হয় না। সময়কালও ঠিক বাস্তবের মতো প্রবাহিত হয় না। কখনো-সখনো একটি গানের মাঝেই কোনো চরিত্র বড়ো হয়ে যায়, বুড়ো হয়ে যায়, কোনো কোনো আগে ঘটে-যাওয়া দৃশ্যের ঝলক ফিরে আসে। অনেক কিছু ছবির ফ্রেমের বাইরে অদেখা থেকে যায়। এই সবকিছু বুঝে নিতে হয়।
ছায়াছবিতে না-দেখানো সেই দৃশ্যগুলো মাথার মধ্যে ঘোরে, গল্পের বই পড়তে গিয়ে ফিরে আসে। ইতিমধ্যে সে জেনেছে, বাবা ওর নামটা বেছেছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা রাজকাহিনি থেকে, যা ওদের ক্লাসে র্যাপিড রিডার। নিজেকে সে কল্পনা করে গোহের রাজপুত্র, রাজপুত চাষির মেয়ের সঙ্গে চলেছে গহীন বনে। সেই মেয়ের পরনে পীলা ওড়নি আর নীল আঙ্গিয়া। বনের মধ্যে ঝিঁঝির ঝিনি ঝিনি, পাতার ঝুরুঝুরু, চারদিক কালো বাঘের মতো অন্ধকার। আচমকা সড় সড় শব্দে একটি বিরাট বুনো বরাহ ছুটে আসে, বাপ্পাদিত্য একটা জনারের শীষ ছুঁড়ে দেয়। তীরের মতো সেই শীষ দাঁতাল বরাহটার ঘাড় ভেদ করে তাকে মাটিতে গিঁথে ফেলল।
গল্পের ফাঁকে ফাঁকে না-লেখা ঘটনাবলী, রাজকাহিনিতে লেখা নেই। হোমটাস্কের খাতায় লিখে এনে টিফিনবেলায় সুস্নাতকে দেখাল।
‘তুই কি কখনো বুনো বরাহ দেখেছিস?’ সুস্নাত ভুরু কুঁচকে বলে। বাপ্পার বুকের ভেতরটা চুপসে যায়। ‘তাতে কী? রাজকাহিনিতে আছে তো’
‘এসব বানানো গল্পকথা, মিথ্যে কথা। এইসব গল্প বলে চিরকাল বড়োলোকরা গরীবদের ঠকিয়ে এসেছে!’ সুস্নাত বলে। ‘এসব এলেবেলে বই পড়ে কী হবে? তার চে’ বরং অঙ্ক আর বিজ্ঞানের বই পড়। আর যদি লিখতেই হয় তাহলে চারপাশে যা দেখছিস, যা শুনছিস সেসব কথা লেখ।’
*
মার্চের এক মধ্যরাতে কোচবিহার জেলার শীতলখুঁচিতে ভারতীয় সীমা সুরক্ষা বলের ৭৮ নম্বর ব্যাটালিয়ানের বর্ডার আউটপোস্টে এসে হাজির হলো একদল নারী পুরুষ শিশু। নিরস্ত্র, সম্বলহীন, চোখে মুখে দগদগ করছে ভয়। তারা আশ্রয়প্রার্থী, সীমান্তের ওপার থেকে এসেছে। আউটপোস্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডেন্ট ফোন করল হেডকোয়ার্টারে তার ঊর্ধ্বতন ডেপুটি কমান্ড্যান্টকে।
‘কী করব স্যার? একশোরও বেশি মানুষ, ঘরবাড়ি ছেড়ে এক কাপড়ে পালিয়ে এসেছে। কিছুতেই ওদের ওপারে ফেরানো যাচ্ছে না।’
‘এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার!’ ডেপুটি কম্যান্ডান্ট বললেন। ‘ওদের এভাবে আশ্রয় দেবার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আমি কাল সকালে ওপর মহলে ব্যাপারটা জানাবো। ইতিমধ্যে ওরা কোনোভাবেই যাতে ইন্ডিয়ার সীমান্তের ভেতরে না ঢোকে সেটা নিশ্চিত করো।’
অ্যাসিট্যন্ট কমান্ড্যান্ট সেই বার্তা ঘোষণা করতেই ব্যাকুল মানুষগুলো সমস্বরে হাহাকার করে উঠল
‘হয় আমাদের আশ্রয় দাও, নয়তো গুলি করে মেরে ফেলো!’
ইতিমধ্যে হেডকোয়ার্টারে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করেছে বিভিন্ন আউটপোস্ট থেকে। দলে দলে অসহায় ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে আল-ভাঙা জলের মতো। দিন কয়েকের মধ্যেই সেটি প্লাবনের আকার নিল।
সেই প্লাবনের ঢেউয়ে ভেসে এল মিঠুর দিদি ছবি।
*
কলুটোলা লেনে রবিবারের পারিবারিক আড্ডায় মিঠুপিসির দিদি ছবির নামটা কখনো-সখনো উচ্চারিত হতে শুনেছে বাপ্পা। সেই নামটা ঘিরে থাকত এক অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ্য, পরস্পরে চোখ চাওয়াচাওয়ি, নীচু স্বরে বলা কোনো বার্তা। ক্রমশ সে জেনেছিল, তাকে জানানো হয়েছিল, ওর বাবারা সিলেট ছাড়ার তিনদিন আগে এক রাত্রিবেলা অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল মিঠুপিসির দিদি ছবিপিসি। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সকলে চলে যাবার অনেকদিন পরে সে পরিত্যক্ত বাড়িটায় ফিরে আসে, সেখানেই থাকতে শুরু করে।
খুব ছোটোবেলায় শিউলি যখন বাপ্পাকে গল্প বলে ভুলিয়ে ভাত খাওয়াতো, ভাতের সঙ্গে তেতো করলা নিমপাতা চটকে মেখে দলা পাকিয়ে মুখে পুরে দিয়ে গল্প বলত রামায়ণের গল্প, আলিসাহেবের গল্প, অ্যান্টনি কাকাতুয়ার গল্প, গামার সঙ্গে বাঘের লড়াইয়ের গল্প, হেমন্তমামার সেই মেথরমিছিলের গল্প। তখন মাঝেমধ্যেই মিঠুপিসির হারিয়ে যাওয়া দিদি ছবিপিসির গল্পটা শোনার জন্য বায়না করত বাপ্পা। প্রায় প্রতিবারই সেই গল্পটা আসত শেষে, ততক্ষণে থালার ভাত প্রায় ফুরিয়ে আসত, অন্ধকারে ছবিপিসির হারিয়ে যাওয়ার পর আর গল্প এগোতো না। রাত্রিবেলা সাতগাঁয়ে খিড়কির পেছনে পায়খানায় যেতে গিয়ে আমবনের ভেতর যেরকম কালো ঝুপসি অন্ধকার, একটাও জোনাকি জ্বলে না, সেইরকম একটা অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল ছবিপিসি। এরপর যখন বাপ্পা রাজকাহিনির গল্পে পড়ল— ‘কালো বাঘের মতো অন্ধকার’, যেরকম অন্ধকারে পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল ভীল সর্দার, সেই রকম অন্ধকার ওৎ পেতে ছিল ছবিপিসির জন্য। লাফ দিয়ে কামড়ে পিঠে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
এতদিন পরে সেই ছবিপিসি যখন খোকাজেঠুদের দমদমের বাসায় এসে উঠল, নিজের কল্পনার সেই ছবিপিসির সঙ্গে মানুষটাকে মেলাতে পারে না বাপ্পা। মোমবুচানের থেকেও বড়ো, প্রায় প্রৌঢ়া এক নারী, কপালের একদিক থেকে একগাছি পাকা চুল যেন মাথাটাকে দুভাগ করেছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, শাড়ি পরার ধরনটাও কেমন যেন অন্যরকম। যে— ‘কালো বাঘের মতো অন্ধকার’ তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, গায়ে কোনো আঁচড় কামড়ের দাগ রেখে যায়নি। অন্তত দেহের অনাবৃত অংশে দেখা যায় না। গামার পায়ের বুড়ো আঙুলটা খোয়া গিয়েছিল বাঘের কামড়ে। ছবিপিসির জিভ খোয়া গিয়েছে কি? এ বাড়িতে আসার পর থেকে কারোর সঙ্গেই প্রায় কথা বলে না সে। সারাদিন কোলের ওপর হাত রেখে দেয়ালের দিকে চেয়ে বসে থাকে, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়–‘জ্জী!’ ‘জ্জী!’
ছবিপিসি আসার পর প্রায় প্রতিদিনই মিঠুপিসি এবং কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সিলেটি আত্মীয়রা দেখা করতে আসছে। কিন্তু কলুটোলা লেনের সেই আড্ডাগুলোর মতো আবেগ উচ্ছ্বাস নেই, মুখগুলো উৎকণ্ঠায় দীর্ণ। ওরা ছবিপিসিকে ঘিরে বসে নীচু স্বরে কথা বলে, ছবিপিসির হাত ধরে থাকে, মিঠুপিসি দিদির কাঁধ জড়িয়ে বসে থাকে। সেই সময় বাপ্পা পাশের ঘরে চলে যায়, বই খুলে পড়ার ভান করে। মাঝে মাঝে ছবিপিসির গুমরানো কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে, মাঝেমাঝেই একটা নাম কানে আসে–‘তনভীর।’
খোকাজেঠুদের ছোটো দুই কামরার বাসা। শোবার ঘরে খাট আর বসার ঘরে বেতের সোফা আর ডিভান রয়েছে। রথীনরা এসে থাকতে শুরু করার পর বাপ্পা জেঠু আর মোমবুচানের সঙ্গে শুতো, ওর বাবাকে বসার ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ছবিপিসি এসে পড়ার পর রাতে বাপ্পার ঠাঁইবদল হলো বাবার পাশে, ডিভানে। হঠাৎ বাসাটাকে কেমন ছোটো মনে হতে লাগল। মনে হলো ছবিপিসি এসে বাসাটার সব বাতাস শুষে নিয়েছে, সারাক্ষণ একটা দমবন্ধ-করা অনুভূতি।
সন্ধ্যাবেলা বাবা আর খোকাজেঠু অফিস থেকে ফিরে বসার ঘরের লাগোয়া একচিলতে বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়, নীচু স্বরে কথা বলে। অনেক রাত্তিরে বাবা ডিভানে শুয়ে ট্রাঞ্জিস্টার রেডিওটা কানের কাছে নিয়ে নীচু ভলিউমে নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন সেন্টারের ইংরেজি বাংলা খবর শোনে। অস্পষ্ট ঘুমের মধ্যে ক্ষীণ ছেঁড়া ছেঁড়া কন্ঠস্বর কানে আসে বাপ্পার
‘আওয়ামী লীগের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে আজ ঢাকায়… সূত্রের খবর, সিংহলে নির্বাচিত সরকার বামপন্থী গেরিলাদের নিঃশর্তে আত্মসমর্পণের জন্য আবেদন জানিয়েছে…করাচীর কারাগারে মুজিবের বন্দিত্বের একশো দিন… ইটালির ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট এটনায় ফের অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছে… এদিকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন… সোভিয়েত রাশিয়া বৈকানুর থেকে স্যালিউট ১ মহাকাশযান সফল উৎক্ষেপণ হয়েছে…’
সিগারেট ধরাতে উঠে রথীন দেখে অন্ধকারে বাপ্পার চোখ খোলা।
‘তুই ঘুমোসনি এখনও?’
‘ছবিপিসির কী হয়েছে বাবা?’
‘ওরা ছবিপিসির বরকে তুলে নিয়ে গেছে।’
‘কেন?’
‘ছবিপিসির বর সাংবাদিক, কাগজে লিখেছিল।’
‘কী লিখেছিল?’
‘সে পরে বলব তোকে। এখন অনেক রাত হয়েছে, ঘুমো।’
‘ছবিপিসির বরের নাম কি তনভীর?’
‘হ্যাঁ। ঘুমোও এখন।’
*
মি’লেডি, তুষের আগুন যেমন প্রথমে ধিকিধিকি, শেষে হঠাৎ ধু-ধু করে জ্বলে ওঠে, পূর্ব পাকিস্তানে তেমনই মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ইতিমধ্যে জেলায় জেলায় গড়ে উঠেছে মুক্তিবাহিনি, সাধারণ কৃষক ছাত্র যুবা পুরুষ নারীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে। হিংসালীলায় বিধ্বস্ত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে এদিকে চলে আসছে, উত্তরবঙ্গে ভিটেমাটি স্বজনহারা মানুষের ঢল নেমেছে।
এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। বাস্তুহারাদের আশ্রয় দেবার বন্দোবস্ত করতে দিশাহারা রাজ্যের প্রশাসন। এমতাবস্থায় সীমান্ত অঞ্চলের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অফিসারদের তড়িঘড়ি বিপর্যয় মোকাবিলায় পাঠানো হলো। তাদের মধ্যে রথীন চ্যাটার্জিও ছিল। স্ত্রীর গুরুতর অসুখে চিকিৎসার জন্য আবেদন করে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ এসেছিল, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রাতারাতি তাকে বদলি করা হলো কোচবিহার জেলার দিনহাটায়, যেখানে অনেক বছর আগে সে তার কর্মজীবন শুরু করেছিল ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে। শিঙিমারী নদীর দুপাশে কামতাপুরের ওই অঞ্চলটাকে সে হাতের তালুর মতো চেনে।
বাপ্পার ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গিয়েছে। সাতগাঁয় বাগানে আম পাকতে শুরু হয়েছে, খবর পাঠিয়েছে বিশুকা। আগে প্রতিবার আমের মরশুমে রামপ্রাণ চিঠি লিখে নিমন্ত্রণ করতেন। কিন্তু স্ত্রী ও কন্যাবিয়োগের পর তাঁর মন ভালো নেই, আজকাল ফার্মেসিতেও বেশিক্ষণ বসেন না। কাশীতে তীর্থে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন, বিশুকা জানিয়েছে।
দাদু কাশী চলে যাবে, বসন্তমামারা চলে এসেছে, গরমের ছুটিতে তিতলি হস্টেল থেকে আদিরামবাটিতে এসে থাকবে। বাপ্পা আবদার জুড়ল–‘বাবা, আমি সাতগাঁয়ে যাব!’
‘কেন?’ রথীন বলে। ‘দিনহাটায় তো আমার বেশিদিনের কাজ নয়। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে কলকাতায় আসব।’
‘আমার এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।’
‘আর লেখাপড়া?’
‘তুমি সপ্তায় সপ্তায় এসে হোমটাস্ক দেবে, এখন যেমন দাও। আমি করে রাখব।’
.
উত্তরবঙ্গ যাবার পথে বন্দর-হুগলিতে বাপ্পাকে নামিয়ে দিল রথীন। বিশুকা নিতে এল যথারীতি। এর আগে শেষবার যখন মার্টিন্স রেলে চড়েছে, তখনও বিশুকা সঙ্গে ছিল। ছাইভর্তি মাটির ঘটটা নতুন লাল গামছায় জড়িয়ে নিয়ে দুহাতে আগলে বসেছিল। এবার বিশুকার হাত দুটো ফাঁকা, কোলের কাছে জড়ো করে জানলার বাইরে চেয়ে আছে। ইতিমধ্যে অনেকটাই বদলে গিয়েছে বাপ্পার জীবন। তবুও লাল-কালো ইঞ্জিনটা যখন হুইশিল দিল আর বোতল-সবুজ কামরা তিনটে ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল, সেই চিরচেনা উত্তেজনায় বুকটা ধড়ফড় করে উঠল বাপ্পার। জানলার বাইরে ছায়াছবির মতো সরে যাচ্ছে আদিগন্ত মাঠ, নয়ানজুলির ধারে হলুদ বনফুলের সমারোহ, সবুজ পানাপুকুরে মাছরাঙার বিদ্যুৎরেখা। পাদরিবাগানের অর্কিডে-ছাওয়া রোমশ দৈত্যের মতো আমগাছের বনে এসে রেলের চাকায় বেজে উঠল কেরেস্তান-গোরস্তান কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি। পর পর সরে যাচ্ছে শ্যাওলাকীর্ণ গম্বুজ আর সেনোটাফগুলো, যেখানে সে দেখেছিল দুঃখী সাহেবের ভূত, মাথায় তিনকোণা টুপি আর ভেলভেটের টিউনিকে পাখির গু শুকিয়ে আছে। সেই দৃশ্যটা মনে পড়তে অকারণেই বাপ্পার দু চোখ জলে ভরে ওঠে, স্বচ্ছ টলটলে জলের ভেতর দিয়ে দূরে দেখতে পায় ম্যাওবেড়ালের গির্জার চুড়ো।
এ.সি. ঘোষাল টি.সি.-র ভুরুর চুল পেকে গিয়েছে। বিশুকা টিকিট দেখাতে যেতেই বাপ্পার দিকে একবারও না তাকিয়ে হাত নেড়ে চলে যেতে বলে।
আদিরামবাটিতে পৌঁছনোর আগেই বাপ্পার মনটা চুপসে গিয়েছে। বিশুকা জানিয়েছে তিতলি দার্জিলিঙে গিয়েছে। ওখানে সিস্টার্স অফ ক্লুনি কনভেন্টের একটি শাখা রয়েছে, সেখানে প্রতিবছর কোয়ার্সভিল থেকে কয়েকটি মেয়েকে গরমের ছুটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এবারে তিতলি গিয়েছে।
বাপ্পার মতো ছোটোবেলা থেকেই বাবামায়ের সঙ্গে একালঘেঁড়ে জীবন কাটায়নি তিতলি, যৌথ পরিবারে অনেক লোকজনের স্নেহচ্ছায়ায় বড়ো হয়েছে। সেই মেয়ের কী করে যে বাড়ি ছেড়ে হস্টেলে মন বসল!
শিউলির মৃত্যুর পর মানুষজনকে খুঁটিয়ে লক্ষ করার এক নতুন অভ্যাস হয়েছে বাপ্পার। এমনভাবে দেখে, মনে হবে যেন জীবনে শেষবারের মতো কাউকে দেখছে। খুব দ্রুত এতকিছু ওর জীবনে ঘটছে, জীবনে যা-কিছু তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর থেকে শুরু করে যা মহার্ঘ, স্মরণীয়, রাস্তায় হঠাৎ দেখা কোনো মানুষের মুখের অভিব্যক্তি থেকে শুরু করে আকাশের রঙের মতো যা ক্ষণস্থায়ী, সেইসব স্মৃতিতে অবিকৃত ধরে রাখার একটা আকুতি থেকে সবকিছু আজকাল চোখ মেলে দেখে বাপ্পা। আদিরামবাটিতে পা রেখেই লক্ষ করল পন্ডিচেরি থেকে ফিরে বসন্তমামা, নতুনবউ আর কানাই তিনজনেই কেমন যেন বদলে গিয়েছে।
যে পেটুক আমুদে মানুষটার ভুঁড়ি জড়িয়ে হার্লের পেছনে বসে তিতলিকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে যেত সে, যে হার্লের গান ব্র্যাকেটে দুলত পুষ্পিত শালুকের আঁটি, গ্লাভবক্স থেকে বেরোত উষ্ণ ফ্রেঞ্চ লোফ আর শনিবার শালপাতায় জড়ানো মাংস, রোজ সকালবেলায় কোমরে গামছা কানে পৈতে জড়িয়ে কুয়োর চারদিকে পাক খেতে খেতে তলপেটে হাত বুলোতে বুলোতে দাদুকে কোষ্ঠর ধারাবিবরণী দিত যে মানুষটা, অ্যান্টনির খাঁচায় নাক ঠেকিয়ে ঝগড়া করত ফিরিঙ্গি ভাষায়, কেরেস্তান গোরস্তানে ভূত দেখার পর ওই জায়গাটা পার হবার সময়ে তারস্বরে হর্ন দিতে দিতে— ‘আদিরাম-আদিরাম-আদিরাম-আদিরাম’ বিড়বিড় করত, সেই মানুষটা হারিয়ে গিয়েছে। কারোর সঙ্গেই বিশেষ কথা বলে না, উদাসীন গা-ছাড়া ভাব। চোখের নীচে চর্বির থলি, ভুঁড়িটা আরও স্ফীত হয়েছে।
ইতিমধ্যে হার্লে ডেভিডসন দেহ রেখেছে। গোয়ালঘরে মরচে ধরে খড়ের বাছুরের মতো পড়েছিল, বাপ্পা আসার কয়েকদিন পরে ডকবাজারে বাতিল লোহালক্কড়ের দোকান থেকে তিনটে কম বয়সী ছেলে এসে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেল। তাদের মধ্যে একটি ছেলের নীলচে চোখ, সোনালি চুল, নোংরা তেলকালি-মাখা পোশাকেও অদ্ভুত দেখতে।
পন্ডিচেরি থেকে ফিরে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনটা ঘটেছে কানাইয়ের মধ্যে। মায়ের ফর্সা রং পেয়েছে তিতলি, কিন্তু কানাই জন্ম থেকেই কালো। সেই কারণে শাস্ত্রীমশাই বংশের রীতি মেনে ওর নামকরণ করেছিলেন রামকানাই। কানাই, কানু, কৃষ্ণ, অর্থাৎ কি না কালো। নামটা নতুনবউয়ের পছন্দ হয়নি, কিন্তু অন্য উপায় ছিল না। মৃত্যুর আগে তার বাবা অনাগত দৌহিত্র কিংবা দৌহিত্রর উদ্দেশ্যে একটিই নাম রেখে গিয়েছিলেন— ‘জ্যোতি’। একটি— ‘কণা’ যোগ করে তিতলির নামকরণে সেটি খরচ হয়ে যায়।
করমন্ডল উপকূলের নোনা আবহাওয়ায় আবলুশ কালো হয়ে ফিরেছে কানাই, বাপ্পা দেখল। জন্মের পর থেকেই ওর দুটি সমস্যা ছিল: এক, কানাই কথা বলতে শিখেছে স্বাভাবিক বয়সের থেকে কিছু পরে। আর দুই, ঘুমের মধ্যে বিছানায় প্রস্রাবের রোগ ছিল ওর।
দুটির কোনোটির ক্ষেত্রেই রামপ্রাণের ওষুধ কাজে আসেনি। রাধানগরের দাইবুড়ির থেকে জলে-জলে পাওয়া সরোজার টোটকাতেও সারেনি। পন্ডিচেরিতে ইস্কুলে যেতে শুরু করার পরেও বিছানা ভেজাতো কানাই। রোগ তাড়ানোর মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে ওর মনে চরম লজ্জা আর আত্মগ্লানির শাস্তি দেওয়ার ভাবনা বসন্তর মাথায় আসে। যেদিনই রাতে সে অপকর্ম করত, পরদিন সকালে ইস্কুল শুরুর আগে বসন্ত প্রস্রাবে ভেজা চাদরটা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় কর্পোরশনের কলে নিয়ে গিয়ে কাচাতো। সেইসময় কানাইয়ের সহপাঠীরা ইউনিফর্ম পরে টিপটপ হয়ে ব্যাগ পিঠে নিয়ে ইস্কুলে যাচ্ছে। বসন্ত ওদের হাত নেড়ে ডেকে ডেকে বলত
‘ডু ইউ নো দিস বয়? ইজ হি ইয়োর ক্লাসমেট? আস্ক হিম হোয়াট হি ডিড ইন স্লিপ! গো, আস্ক হিম!’
ছেলেদের দল ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে ছুটে পালাত।
পরদিন ক্লাসের মাঝে খুক খুক খিক খিক হাসিগুলো বেজে চলত, টিফিনের ঘন্টায় হররা হয়ে ছুটত, বেঞ্চির ওপর স্কেল পেটানোর তালে তালে কোরাসে বাজত—
সিরুনীর সিরুভন!
সিরুনীর সিরুভন!
মুতের খোকন! মুতের খোকন!– দুঃস্বপ্নের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে ফের মধ্যরাতে কানাইয়ের উরু ভেজাতো।
সাতগাঁ আদর্শ বিদ্যানিকেতনে ভর্তি হবার পর কানাই এই আর্দ্র দুঃস্বপ্নের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু রোগটা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। ওর বিছানার চাদরের নীচে অয়েলক্লথ বিছিয়ে রাখতে হয় নতুনবউকে। ইতিমধ্যে কানাইয়ের মুখে কথা ফুটেছে, কিন্তু ওর বাংলা উচ্চারণে এক বিচিত্র টান লক্ষ করল বাপ্পা। ওকে দেখে সুর করে ছড়া কাটে কানাই; প্রচলিত ছড়ার প্রথম লাইনটা সামান্য বদলে নিয়ে কাটে–
দিনে মশা রেতে মাছি
এই নিয়ে কলকেতায় আছি!
