সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৮
৯.৮
সাতগাঁর পণ্ডিতেরা সূর্যসিদ্ধান্ত মেনে যে তিথি নক্ষত্র গণনা করতেন, সেগুলি ছিল অদৃকসিদ্ধ। তাতে বাস্তবে অনেক সময়েই সময়ের তারতম্য ঘটত, তার কারণ সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। সেটা টের পাওয়া যেত সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের কালে, পঞ্জিকায় ঘোষিত সময়ের সঙ্গে বাস্তবে হেরফের ঘটত। পাগলরাম ধর্মতলা বার্তা-য় চন্দ্রসূর্যের উদয়াস্তের সারণি বিলেত থেকে আসানটিক্যাল অ্যালমানাক অনুসারে ছাপতে লাগল। জোয়ার-ভাটার সময়কালও কলকাতার জাহাজঘাটায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশান কোম্পানির সারণির সঙ্গে মিলিয়ে যোগ বিয়োগ করে গণনা করতে লাগল। প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সাজানো হলো সহজ ও বর্ণানুক্রমিক ডাইরেক্টারির আকারে।
এইসব কারণে ধর্মতলা বার্তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠল। সাধারণ নিরক্ষর চাষাভুষো কিংবা হেটো ব্যাপারিরা, যারা ডকবাজারের আশেপাশে ঘাটিয়া গণৎকারদের কড়ি দিয়ে শুভাশুভ দিনক্ষণ গণনা করাতো, তারাও শিক্ষিত পাঠক ধরে বার্তা পড়িয়ে নিতে লাগল। এমনকি পোর্তোহাটার দোআঁশলারা, বিবাহবহির্ভূত বর্ণশঙ্কর ইউরেশীয়দের পরবর্তী প্রজন্ম, সরকারিভাবে ক্রিশ্চান হলেও যাদের মধ্যে বিভিন্ন হিন্দু লোকাচার টিকে ছিল, তাদের সমাজেও প্রচার পেল আদিরামবাটি থেকে প্রকাশিত ধর্মতলা বার্তা।
কোম্পানির শাসন শেষ হবার সময়ে ফিরিঙ্গিডাঙার মূলনিবাসী পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার বংশজাতরা বেশিরভাগই স্বদেশে ফিরে গিয়েছে। কতিপয় গ্রীকরা চলে গিয়েছে তার আগেই। আর্মেনিয়রা পাটকলের রমরমা শুরু হবার পর কলকাতায় গিয়ে ডেরা বেঁধেছে, হোটেল বানিয়েছে। জানুয়ারিতে ক্রিসমাস উৎসব করতে তাদের কেউ কেউ স্মৃতির টানে আর্মানিডাঙার গির্জায় আসে। রু দ্য সওদাদ থেকে শুরু করে কোয়ার্সভিলের স্ট্র্যান্ড পর্যন্ত নদীর ধারে সুরম্য ভিলাগুলো কিনে নিয়েছে কতিপয় মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ী ও তাদের বাঙালি আড়তদারেরা। এছাড়া কলকাতার বাদাবন-জাত বিষবাষ্প থেকে বাঁচতে একাধিক ইংরেজ রাজপুরুষ বাগানবাড়ি বানিয়ে রেখেছে। ডেঙ্গু ম্যালেরিয়ার সময়ে তারা দল বেঁধে এসে থাকে হুগলির এই পশ্চিম পাড়ে।
নেহাতই খেলাচ্ছলে পাগলরাম যে বুলেটিন ছাপাতে শুরু করেছিল, সেটি যে এমন গায়ে গতরে বৃদ্ধি পাবে, এত শত শত কপি ছাপা হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হবে, এমনকি খাস কলকাতা শহরেও, সেটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এখন আদিরামের মন্দিরে ঘন্টাধ্বনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিবারাত্র ধ্বনিত হয় ছাপাখানার ঘটাংঘট ধ্বনি। দূর থেকে শুনলে মনে পড়ে সাতগাঁর মসলিন তাঁতিদের কথা, তাদের হাতে বোনা বত হাওয়া আর বত শবনম জাহাজ বোঝাই হয়ে চলে যেত দূরের দেশে। মুদ্রিত কাগজের পাঁজা গরুর গাড়িতে যায় জাহাজঘাটায়, সেখান থেকে নৌকা বোঝাই হয়ে ছড়িয়ে যায়। রামানুজ একে গণিকাবৃত্তি বলুন আর যাই বলুন, মি’লেডি, এ এক অলীক ভাবনাপুঞ্জের অনর্গল ছায়া, অখন্ড আত্মার মতোই অবিনশ্বর, কয়েকটি কপি বাজেয়াপ্ত করে কিংবা পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেও যাকে শেষ করা যায় না, বীজের মতো সঞ্চিত থেকে যায় কালের গর্ভে, এবং পুনরুজ্জীবন ঘটানো যায়। এই নিয়ে পাগলরামের বিস্ময় যেন কাটে না।
এমন এক শক্তিশালী কল যে বিদেশি শাসকের চোখে সন্দেহের বস্তু হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী? এক বুধবার আদিরামবাটিতে চিঠি নিয়ে এল ওলন্দাজডাঙার কাছারির পেয়াদা, শনিবার বিকেলে ডেপুটি হাকিম সাহেব ছাপাখানা পরিদর্শনে আসবেন।
পাগলরাম চিঠিটি দাদাকে দেখাতে ভাঁজ পড়ল গঙ্গারামের কপালে।
‘দু-দুশ্চিন্তা করছ কেন, ই-ইংরেজদের বিরুদ্ধে কিইইছু তো ছাপিনা।’
‘চিন্তা হচ্ছে রে,’ গঙ্গারাম বলে। ‘পুরোনো অ্যালবিয়ন কলটা বিল সাহেবের দান। সেই সংক্রান্ত কোনো নথি তো আমাদের কাছে নেই। যদি কাগজ দেখতে চায়? আর তাছাড়া…’
‘তাছাড়া?’
‘তুই যে নিয়মিত সমাচার বুলেটিন ছাপিয়ে বিক্রি করছিস। এজন্য কোনোরকম লাইসেন্স লাগে কি না, সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয় কি না সেসবও তো কিছু জানা নেই।
হাকিম এসে কি তবে ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করবে? পাগলরামকে গারদে পুরবে? দুশ্চিন্তার মেঘ জমল আদিরামবাটিতে।
শনিবার বিকেল ঠিক সাড়ে চারটেয় হাকিমের জুড়িগাড়ি এসে আদিরামবাটির সদর দরজায় থামল। সঙ্গে পুলিশবাহিনি নেই, কোনো অধস্তন কর্মচারীর দল নেই, শুধু একজন উর্দি-আঁটা ফুটম্যান। দরজা খুলে নামলেন না, কোনো লালমুখো ইংরেজ নয় ধুসর কোট-প্যান্টালুন পরা এক নেটিভ সাহেব। সাহেবের নাতিদীর্ঘ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, ঈষৎ স্ফীত মধ্যপ্রদেশ, পাতলা ঠোঁট, বিরলকেশ উদার কপালের নীচে উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ।
সদর দরজায় এসে মাথার টুপিটি খুলে হাতজোড় করে স্পষ্ট বাংলায় বললেন-
‘নমস্কার, আমার নাম রাজমোহন চাটুজ্যে।’
‘আসতে আজ্ঞা হোক, হুজুর!’ পাগলরাম শশব্যস্ত হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল। ‘কী সৌভাগ্য যে আপনি…’
‘গোড়াতেই একটা কথা বলে নিই,’ হাকিম সাহেব মিষ্টি হেসে বললেন। ‘আমি কিন্তু আজ এখানে সরকারি পদাধিকারবলে আসিনি, নিতান্তই ব্যক্তিগত আগ্রহের বশে এসেছি। আপনারা যদি অনুগ্রহ করেন, ছাপাখানাটি কি একবার দেখতে পারি?’
‘বিলক্ষণ! বিলক্ষণ!’ পাগলরাম রাজমোহন চ্যাটার্জিকে অভ্যর্থনা করে বারবাড়িতে ছাপাকলের ঘরে নিয়ে আসে।
ইতিমধ্যে ধর্মতলা বার্তা-র কাটতি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দানপ্রাপ্ত অ্যালবিয়ন যন্ত্রের পাশে একটি আধুনিক কলম্বিয়ান ট্রেডল মেশিন বসানো হয়েছে। একজন মেশিনম্যান ও দুজন কম্পোজিটার ছাড়াও একজন এফ-এ পাশ ছোকরা প্রুফ দেখার কাজ করে। পাতা ভরানো, সাজানো ও সম্পাদনার কাজ পাগলরাম নিজেই করে। ছোট্ট খেলনা ও ঘড়ি থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের কলকব্জার প্রতি তার যে গভীর অনুরক্তি, সেই আবেগ নিয়ে সে সব কিছু বোঝাতে শুরু করে।
মোট ১৬৯ টি খোপকাটা কাঠের বাক্সে সাজানো ৪৮৮টি সিসের টাইপ, ১৬টি স্বরবর্ণ, ৩৪টি ব্যাঞ্জন বর্ণ, আটটি স্বরবর্ণ চিহ্ন, ৩৭৪টি ফলা, ২৯টি যুক্তবর্ণ, ১০টি রাশি, ১৫টি পাটিগণিত চিহ্ন এবং চারটি যতি চিহ্ন। কীভাবে সেগুলি কম্পোজিং ট্রেতে গেঁথে মেকাপ দেওয়া হয়, কীভাবে লিভার টেনে উল্লম্ব স্ক্রুর প্যাঁচ ঘুরিয়ে কাঠের প্লেটেন কাগজে চেপে ছাপ তোলা হয়, ক্যারেজ, টিস্প্যান ও ফ্রিস্কেটের কার্যকারিতা কী, কীভাবে গ্যালি প্রুফ নেওয়া হয়, সেসবই বোঝায় পাগলরাম।
দীর্ঘক্ষণ ধরে গভীর আগ্রহভরে মুদ্রণের প্রতিটি ধাপ খুঁটিয়ে দেখে, নানান প্রশ্ন করে পুরো প্রক্রিয়াটা বুঝে নিয়ে ডেপুটি চাটুজ্যে যে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছেন সেটা তাঁর মুখ দেখেই বোঝা গেল। শ্বেতপাথরের গেলাস ভর্তি তালশাঁসের রস এক চুমুকে পান করে কোলনে সিঞ্চিত ধবধবে রুমালে পাতলা গোলাপি ঠোঁট মুছলেন। হাকিম সাহেবের জুড়িগাড়ি খপখপ করে আদিরামবাটির সীমানা ছাড়িয়ে গেলে পাগলরাম হেসে দাদাকে বলল –
‘কী? এবারে দুশ্চিন্তামুক্ত তো?’
‘মনের মধ্যে কী এক কাঁটা খচখচ করছে রে,’ গঙ্গারাম বলে। ‘ক্লাইভের ছোঁড়া কামানের গোলা আদিরামের মন্দিরে লাগার পর থেকে ইংরেজদের সঙ্গে কোনোরকম সংস্পর্শ শেষ পর্যন্ত সুখকর হয়নি।
‘ইংরেজ আবার কো-কোথায় দেখলে?’ পাগলরাম আশ্বাসের স্বরে বলে। ‘ভদ্রলোক নিজের প-পরিচয় দিলেন তো, শোনোনি? খাঁটি রাঢ়ী কু-কুলীন বংশ, হুগলির পূর্বপাড়ে কাঁটালপাড়ায় বাস।’
‘তা হোক,’ গঙ্গারাম বলে। ‘ইংরেজ রাজকর্মচারী তো বটে।’
