সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.৪
১১.৪
দাদার সঙ্গে মনান্তর ঘটিয়ে সাতগাঁ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসার সময় কুলদেবতার নামটি ছাড়া পাগলরাম আর কিছুই নেননি। নতুন ছাপাখানার নাম দিলেন আদিরাম প্রেস। ধর্মতলা বার্তা ইতিমধ্যেই বাংলায় জনপ্রিয় ছিল, কলকাতা থেকে আদিরাম প্রেস পঞ্জিকা নামে তার আত্মপ্রকাশ ঘটল। পঞ্জিকা ছাড়াও রাজমোহন চাটুজ্জ্যের নতুন নবেল ছাপতে লাগলেন পাগলরাম, এবং রাজমোহনের সহায়তায় হিন্দু কলেজের বিপরীতে অ্যালবার্ট হলের নীচে একটি দোকানঘর ভাড়া নিলেন। কিছুকালের মধ্যেই গোলদিঘির দক্ষিণে গলির ভেতরে একটি পুরোনো দোতলা কোঠাবাড়ি কিনলেন। তার ওপরতলায় বাস ও একতলায় ছাপাখানা, সেখানে আধুনিক ভ্যান্ডারকুক সিলিন্ডার প্রেস যন্ত্র বসলো। বিলিতি ডাক্তারিশাস্ত্রের বই আনিয়ে বিক্রি করতে লাগলেন।
পাগলরামের বৈষয়িক সমৃদ্ধি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার খবর বাতাসে ভেসে সাতগাঁয় এসে পৌঁছয়, ভিটে কামড়ে ক্ষয়িষ্ণু জীবনধারা আঁকড়ে পড়ে থাকা জ্ঞাতিকুলের হৃদয়ে জ্বালা ধরায়, কখনো ছিছিক্কারের ঢেউ ওঠে। বিষয়টা গুরুতর রূপ নিল যেদিন রামানুজের মৃত্যুর তের দিন পর নিয়মভঙ্গের জ্ঞাতি ভোজে ঘনশ্যাম ন্যায়চঞ্চুর নেতৃত্বে পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজের কার্যকর্তারা পাগলরামের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসে আহার করতে অস্বীকার করলেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে, তাকে অপাংক্তেয় ঘোষণা করলেন।
অভিযোগের তালিকাটি দীর্ঘ :
১ – বড়ো ভাইয়ের মৃত্যুর পর দশদিন অশৌচের কাল সাতগাঁয়ে না কাটিয়ে পাগলরাম কলকাতায় ফিরে গিয়েছে
২ – এই সময়কালে সে ফিরিঙ্গি-চালিত রেলের আগুনগাড়িতে চেপে দেহ অশুচি করেছে
৩ – কলকাতার ব্রাহ্ম কেরেস্তান সমাজের লোকজনের সঙ্গে তার নিয়মিত সংস্রব রয়েছে
৪ – ব্রাহ্মণের ব্রত ছেড়ে সে ছাপাকলের দাস হয়েছে, বৈশ্যের বৃত্তি অবলম্বন করেছে
৫ – কলকাতায় সে
ক – গোচর্মের ভিস্তিতে টানা জল পান করে
খ – বেকারির পাউরুটি ভক্ষণ করে
গ – বিলিতি চিনি ব্যবহার করে
৬ – তার বাটিতে মুসলমান বাবুর্চি রান্না করে
৭ – তার স্ত্রী ফিরিঙ্গি গৃহশিক্ষিকার কাছে লেখাপড়া করে।
রামানুজের দুই পুত্র রামশশাঙ্ক ও রামরামের অনেক অনুনয়েও গোষ্ঠীপতিরা নরম হলেন না। পাগলরাম পংক্তিভোজন ছেড়ে কলকাতায় ফিরে গেলেন। গঙ্গারাম কোনো পক্ষই নিলেন না। নীরবে গোটা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলেন, এবং ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হলেন।
.
অভিযোগের তালিকাটি আংশিক সত্য। দিশি কিংবা বিলিতি, কোনো প্রকার চিনিই পাগলরাম ভক্ষণ করতেন না, কারণ ইতিমধ্যে তাঁর রক্তে শর্করার আধিক্য ধরা পড়েছে। বাড়িতে গোচর্মের ভিস্তিতে টানা জল পান করতেন এটাও সত্যি নয়। কিছুকাল আগেও কলকাতায় চাঁদপাল ঘাটে বাষ্পচালিত পাম্পের সাহায্যে হাইড্র্যান্ট মারফৎ লালদিঘি, গোলদিঘি ও বিভিন্ন কৃত্রিম পুকুরে সেই জল সঞ্চিত করে পান ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিশেষ করে রাস্তা ধোয়ার কাজে ব্যবহার হতো ঠিকই, কিন্তু ততদিনে টালায় জলের ট্যাঙ্ক হয়েছে, সীসের নল বাহিত জল বাড়ি বাড়ি সরবরাহ হচ্ছে।
টালার পাম্পিং স্টেশনে কাজ করে নীচু জাতের শ্রমিকেরা। তাদের ছোঁয়া জল পান করলে জাত যাবার আশঙ্কায় শোরগোল করেছিল কলকাতার সনাতন ধর্ম রক্ষিণী সভা। কিন্তু ধোপে টেকেনি।
*
ভিস্তিতে টানা জল কিংবা বউয়ের জন্য বাড়িতে মেমসাহেব টিউটর রাখার থেকেও গুরুতর হলো বাড়িতে মুসলমান খানসামা রাখার অভিযোগ। এবং সেটিও আংশিক সত্য। রাজমোহন চাটুজ্জ্যের সঙ্গে সখ্যের সুবাদে কলকাতার বিদ্বৎসমাজে পাগলরামের যাতায়াত বেড়েছে, বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের সময় বিশেষ শৌখিন পদ রান্নার জন্য মেটিয়াবুরুজের এক পাচককে ডেকে পাঠানো হয়। বাড়ির নিত্যকার রান্না হিরণ্ময়ী নিজেই করেন, এক ব্রাহ্মণী তাঁকে সাহায্য করেন।
মেটিয়াবুরুজের খানসামা ফরিদ আয়াজ দস্তরখান লখনউয়ের নির্বাসিত নবাবের বাবুর্চিখানায় বহুদিন কাজ করেছেন। কিছুকাল আগে নবাবের ইন্তেকাল হতে মেটিয়াবুরুজে তাঁর সাধের ছোটা লখনউ খেলাঘরের মতো ভেঙে পড়ে। খানসামা থেকে শুরু করে গায়ক, বাজিকর, দর্জি ও বিভিন্ন দক্ষ শিল্পীরা পেটের টানে কলকাতার সম্ভ্রান্ত সমাজে বায়না বা ফুরনের ভিত্তিতে কাজ ধরে।
রাজমোহন চাটুজ্জ্যে ইংরেজ সরকারের কাছে রায়বাহাদুর খেতাব পাবার পর তাঁর সম্মানে ভোজের আয়োজন করলেন পাগলরাম, ফরিদকে আয়াজ দস্তরখানকে বাড়িতে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন
‘কী কী মোগলাই খানা বানাতে পারো মিয়াসাহেব?’
দুই কানের লতি স্পর্শ করে খয়ের রঞ্জিত জিভ কেটে মাথা নেড়েছিলেন ফরিদ আয়াজ।
‘ছি ছি ছিঃ! কী বলছেন হুজুর? মোগলাই খানা! মোগলদের আবার কোনো খানা আছে নাকি? চালচুলোহীন সুন্নির দল, ওরা তো এই সেদিন ঘোড়ার পিঠে হিন্দুস্থানে এল। রেগিস্তানের তাঁবুতে খিদে মেটাতে উটের গোবরের ঘুঁটে জ্বালিয়ে যেসব মামুলি চিজ বানাতো তাকেই আজকাল দেখি লোকে বলে মোগলাই খানা। ওরা কী জানে দস্তরখানের আদব? আমার বাপদাদারা আওয়াধেরন বাবদের আশপাজখানে রকবদার ছিলেন সেই বুরহান উল মুল্ক সাদাত আলি খানের আমল থেকে। তাঁরা ছিলেন ইরানের বিখ্যাত সৈয়দ বংশ, সেই কোনকালে আওয়াধে এসে শিয়াদের নবাবি পত্তন করেছেন। সেই রকবদারি খানদান চলে এসেছে আমার মালিকের সময় পর্যন্ত।’
ফরিদ আয়াজ দস্তরখানের রন্ধনপটুত্বের থেকে তাঁর বাকপটুত্ব যে কম নয় সেটা কিছুদিনের মধ্যেই টের পাওয়া গেল। এবং তাঁর হাতের কাবাব নিহারি বিরিয়ানির মতোই তাঁর মুখে মেটিয়াবুরুজে নবাবের আড়ম্বরপূর্ণ জীবন, শখ শৌখিনতা, গজল ঠুঙরির আসর, ঘুড়ির লড়াই, কবুতরবাজি ও অন্দরমহলের রসালো কিস্যা পাগলরামের অতিথিদের মনোরঞ্জন করতে লাগল।
এই শহরেরই বুকে স্মৃতির মরীচিকা বানিয়ে নিয়ে তিরিশটি বছর কাটিয়েছেন উত্তর ভারতের শেষ স্বাধীন নৃপতি। অথচ তাঁর সম্পর্কে কলকাতার বাঙালি সমাজের উচ্চ মহলের ধারণা যে কত সংকীর্ণ, ইংরেজ শাসকের সংস্কারে রাঙানো, সেটা ক্রমশই স্পষ্ট হলো। একদিন বাবু কেবলচাঁদ হাতে আলবোলার নল ঘুরিয়ে ফরিদকে আয়াজকে বললেন–
‘কী হে মিয়া, তোমার নবাব তো শুনেছি সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে মেয়েছেলে যাকেই দেখতেন তাকেই ধরে বিবি বানিয়ে নিতেন? মেথরানি জমাদারনি কাউকেই বাদ রাখেননি! তা হারেমে কতগুলো বিবি ছিল গো তেনার?’
ফরিদ আয়াজ দস্তরখান আগের মতোই মাথা নেড়ে কানের লতিতে আঙুল ছুঁইয়ে জিভ কাটলেন, চোখ বন্ধ করলেন। যেন এসব কথা শোনা, এমনকি উচ্চারিত হতে দেখাও গুনাহ্।
‘বাবু, আমার মালিকের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষ পৃথিবীতে আর জন্মাননি। তাঁর ধর্মাচরণে না-মাহরম, অর্থাৎ কী না নিজের বিবাহিতা স্ত্রী নয় এমন কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত নিষিদ্ধ। হাভেলিতে দৈনন্দিন কাজেকর্মে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য তিনি যেসব নারীরা খিদমত করত, তাদের শরীয়ত মতে মুতা বেগম বানিয়ে নিতেন। এভাবেই তাঁর পেশ-খিদমত বেগম, মহলদার বেগম, যারা ছিল তাঁর ফৌজ, মুঘলানি বেগম, যারা দর্জি, ভিস্তান বেগম ভিস্তিওয়ালি থেকে শুরু করে জমাদারনি বেগম, পিঠ-চুলকানি বেগম, পাঙ্খাওয়ালি বেগম, ওজু বেগম… সব মিলিয়ে এই মাত্র ২২১ জন বেগম ছিল। তার মধ্যে মাত্র দুজন ছিল নিকাহি বেগম, অর্থাৎ বেগম মহল। বাকিরা বছরে দুবার করে ঘাঘরা-চোলি, হারেমে তিনবার খানাপিনা আর আটটি করে টাকা জলপানি পেত।’
পাগলরামের ডাক্তারি শাস্ত্রের বইপত্রের কারবার দেখে একদিন ফরিদ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই জানালেন নবাবের এক গোপন ব্যাধি ও তার অত্যাশ্চর্য চিকিৎসা পদ্ধতির কথা। ওঁর মুখে ওষুধের বর্ণনা শুনে পাগলরাম বুঝতে পারলেন সেটি হোমিওপ্যাথি।
কিছুকাল আগে শহরে কলেরার প্রকোপ চলছিল যখন, জন মার্টিন হানিগবার্গার নামে এক হোমিওপ্যাথের চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল। ‘কলেরার ডাক্তার’ নামে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি, যদিও তার আগেই বিখ্যাত হয়েছেন পাঞ্জাবের মহারাজার জটিল রোগ সারিয়ে। জিহ্বায় বিচিত্র পক্ষাঘাত হয়ে বাক্শক্তি হারিয়েছিলেন রাজা, চিনির গুলিতে এক ফোঁটা ডালকামারা ৩x প্রয়োগ করে রাজার মুখে ফের কথা ফোটান মার্টিন সাহেব।
তবে আওয়াধের নবাব যে গোপন অসুখে ভুগছিলেন সেটি বাকযন্ত্র সংক্রান্ত নয়, ফরিদ মিয়া জানালেন। কথা তাঁর ওষ্ঠ থেকে নিঃসৃত হতো অনর্গল, প্রায়শই ছন্দোবদ্ধ শায়েরির রূপে। অনায়াসে যা হতো না তা হলো মল।
মি’লেডি, বালক বয়স থেকেই ভগন্দরের পীড়ায় ভুগেছেন আওয়াধের শেষ নবাব। মধ্যবয়সে অপরিমিত মশলাদার আহার ও অস্বাভাবিক স্থূলতা জনিত কারণে রোগটা পাকিয়ে ওঠে। হাকিমি ইউনানি থেকে শুরু করে সব ধরনের পদ্ধতি প্ৰয়োগ করে কোনো ফল হয়নি। চিকিৎসকেরা শল্য চিকিৎসার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আগ্রার পাদশাহের মতো নিজের অঙ্গে ছুরি চালাতে দেবার সাহস ছিল না তাঁর। রোগটাও গোপন রাখা যায়নি। খোদ বড়োলাট লর্ড ডালহৌসির নির্দেশে জেনারেল আউট্রাম লখনউয়ের প্রাসাদে চর নিয়োগ করে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির নিয়মিত সুরতহাল নেবার জন্য। পল্টন পাঠিয়ে নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে, নাকি সেপ্টিসিমিয়ায় মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে সেটা ঠিক করতে কোম্পানির কর্তারা রীতিমত মিটিঙে বসে লাটভবনে।
অপেক্ষায় ফল হলো না, আওয়াধের নবাব তাঁর পরিবার নিয়ে, সভাসদ মোসায়েব সোয়া তিনশো বেগম নিয়ে, গায়ক বাজনদার রকবদার পেশখিদমতদার নিয়ে, ম্যাকাক ম্যাকাও চিতা জিরাফ হাতি উট ও আঠের হাজার কবুতর নিয়ে ফায়ারবোটে চেপে কলকাতায় চলে এলেন। সেখান থেকে তাঁর মা ও ভাই গেলেন লন্ডনে রাণীর কাছে দরবার করতে, অসুস্থ নবাব রয়ে গেলেন কলকাতায়।
এইসময়ে তিনি বাবু ভূপেন্দ্রলাল সরকার নামে এক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। মার্টিন সাহেবের দেখানো পথে কলেরা ম্যালেরিয়া জাতীয় রোগের সুলভ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে ইতিমধ্যেই সুনাম অর্জন করেছেন ডক্টর সরকার। মুখশুদ্ধির মতো মিষ্টি স্বাদহীন ওষুধের গুলি জিভের নীচে রেখে চুষে খেতেও সমস্যা ছিল না নবাবের। কিন্তু বাধ সাধল বাঙালি চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া খাদ্যতালিকা। সেই তালিকায় প্রথমেই বাদ গেল যে-কোনো ধরনের মাংসের পদ। এদিকে নবাবের নৈশভোজে একটি ছোটো হাঁড়ি দমপোক্ত বিরিয়ানি চাইই চাই, এবং তাতে একটি করে স্বর্ণমোহরের ভষ্ম মেশানো থাকে।
আকাশ ভেঙে পড়ল নবাবের মাথায়। তাঁর মুখ চোখের অবস্থা দেখে মনে হবে বুঝি আবার নতুন করে রাজ্যপাট হারিয়েছেন।
‘বিরিয়ানি কি মাংস বিনে হয় না?’ জানতে চাইলেন মৎস্যভোজী ভূপেন্দ্রলাল। ‘শুনেছি কাবুলি বিরিয়ানিতে নাকি মাংস থাকে না?’
নবাবের মনে পড়ল দিল্লির নিরামিষাশী বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের প্রিয় বিরিয়ানির কথা, যাতে মাংসের বদলে কাবুলি চানা, খোবানি, কাঠবাদাম ইত্যাদি থাকত।
‘ওসব ঘোড়ার খাদ্য!’ নবাব শিউরে উঠে বললেন। ‘ওদের বাপদাদারা ঘোড়ার পিঠে অর্ধেক জীবন কাটিয়েছে, ওরা ওসব খেতে পারে। তাই বলে আমি বিরিয়ানি ছাড়া বাঁচতে পারব না। তার চেয়ে বরং আমায় বিব দাও, ডাক্তার!’
‘কী বলছেন নবাব সাহেব? এমন কথা শোনাও যে পাপ!’ ভূপেন্দ্রলাল বললেন। ‘তাছাড়া আমি তো আপনাকে বিরিয়ানি ছাড়তে বলিনি। কেবল মাংসটা বাদ দিতে বলেছি!’
এরপর তিনি যতদূর সম্ভব সহজবোধ্য করে নবাবকে বোঝালেন কীভাবে মাংসের তন্তু পাকযন্ত্রে গিয়ে ক্রিয়া করে, মলকে কঠিন করে তোলে, এবং বৃহদান্ত্রে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে ভগন্দরের নালি ঘায়ের প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে।
‘বুঝলাম, কিন্তু… বিন মাংসের বিরিয়ানি?’ নবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
‘কেন নয়?’ ভূপেন্দ্রলাল বললেন। ‘আপনি অনুমতি করেন তো আমি আপনার রসুইয়ের প্রধান পাচকের সঙ্গে কথা বলতে পারি।’
মেটিয়াবুরুজে নবাবের রসুইখানার প্রধান পাচক মুন্না পারভেজ দস্তরখান সম্পর্কে ফরিদ মিয়ার মামা। বাঙালি ডাক্তারবাবুর প্রস্তাব শুনে তিনিও নবাবের কথার প্রতিধ্বনি করলেন— ‘বিন মাংসের দমপোক্ত বিরিয়ানি? তাও কি সম্ভব?’
‘কেন নয় মিয়াসাহেব? কলকাতার বুকে যদি একটা ছোটা লখনউ গড়ে উঠতে পারে, যদি হুগলি নদী গোমতীর বিকল্প হতে পারে, তাহলে মাংসের বিকল্প কিছু দিয়ে কেন বিরিয়ানি হবে না?’
এরপর, ফরিদ মিয়ার দাবী অনুযায়ী তিন দিন তিন রাত ধরে একটানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর, তাঁর মামাজান মাংসের এক নির্দোষ বিকল্প খুঁজে বের করলেন
একটি কন্দ, যা প্রথম রুয়ানো ডে ইনফান্টে রোপন করেছিলেন বাংলার মাটিতে, যা সুদূর মেক্সিকো থেকে ইউরোপে নিয়ে এসেছেন তাঁরই দেশের যাজকেরা, যাকে পর্তুগীজরা বলত বাটাটা, এবং যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল এই বাংলায়: আলু!
ঘি জাফরান মেশানো সুগন্ধী বিরিয়ানির ভেতর রেওয়াজি চর্বিযুক্ত মাংসখণ্ডের বদলে একটি সুবৃহৎ সুসিদ্ধ মশলায় ভরপুর আলুতে প্রথম কামড় দিয়ে নবাবের মনের অবস্থা কী হয়েছিল?
ফরিদ আয়াজ দস্তরস্থানের ভাষ্য অনুযায়ী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ মুখে মুখে একটি শায়েরি রচনা করেন–
মোরা সাঁইয়া বুলাওয়ে
আধি রাত
নদীয়াঁ বয়ের পারি
বিষণ্ণ নবাব তাঁর প্রিয় মাংসখন্ডকে সাঁইয়া বলতে চেয়েছিলেন, নাকি ভগন্দরের নালি ঘাকে বাধা সৃষ্টিকারী নদীর প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, সেটা অবশ্য ফরিদ মিয়া স্পষ্ট করেননি। তবে বিরিয়ানিতে মাংস দেবার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প হিসেবে তাঁর রসুইখানায় আলু ব্যবহার হতো, সে ব্যাপারে যে মিথ্যা প্রচার হয়েছিল সে সম্পর্কে বলেছিলেন
‘যে নবাবের ইন্তেকালের দিনেও হাভেলিতে চারবেলা সাতশো লোকের পাত পড়ত, চিড়িয়াখানার সব জানোয়ারেরা খাবার পেত, সেই নবাবের বিরিয়ানিতে একখন্ড মাংস দেবার পয়সা নেই! এর থেকে ঝুট্ বাত আর কী হতে পারে বাবু?’
না, সাঁইয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদ স্থায়ী হয়নি। চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিছুকালের মধ্যেই নবাবের বিরিয়ানির হাঁড়িতে মাংসখন্ড ফিরে আসে, কিন্তু সেইসঙ্গে আলুও থেকে যায়। ভূপেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রোগের কিছুটা উপশম হচ্ছিল, কিন্তু মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে তাঁর রাজ্যপাট ফিরে পাবার আর্জি খারিজ হয়ে যায়। এদিকে মা ও ভাই দুজনেই মারা যান ইউরোপে, লখনউ ফিরে যাবার আশা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। নির্বাসিত নবাব তাঁর বেদনার্ত হৃদয় খুঁড়ে কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে হুগলি নদীর ধারে স্মৃতির মরীচিকা বানিয়ে তোলেন, তার আকাশ ভরিয়ে তোলেন রঙবেরঙের ঘুড়িতে আর পায়রায়, বাতাস ভরে তোলেন জুঁইয়ের গন্ধে আর পোষা কোকিলের ডাকে, সন্ধ্যাগুলো ভরে তোলেন চিকন কন্ঠের ঠুমরিতে আর নুপুর নিক্কনে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেপ্টিসিমিয়ায় মারা যাননি, যেমনটা ইংরেজরা আশা করেছিল। নির্বাসিত নবাব মারা যান অসহনীয় স্মৃতির ভারে দম বন্ধ হয়ে, তাঁর প্রাণপ্রিয় শহরের স্মৃতি, যার আকুতি তিনি ধরেছিলেন কাব্যের আখরে— ‘যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী কহেঁ হাল কে হাম পর কেয়া গুজরি….
*
কলকাতার মানুষ নির্বাসিত নবাবকে মনে রাখেনি, কিন্তু মেটিয়াবুরুজে তাঁর রসুইখানায় আবিষ্কৃত আলুযুক্ত মাংসের বিরিয়ানি আত্মপ্রকাশ করল ক্যালকাটা বিরিয়ানি নামে। ইতিমধ্যে শহরে হোমিওপ্যাথি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এই চিকিৎসাপদ্ধতি শিক্ষা ও প্রয়োগের জন্য হাসপাতাল খোলা হয়েছে কলকাতায় বিশ্বে প্রথম এমন একটি প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশে অগণিত গরীব মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সুলভ ও অনায়াস কোনো পদ্ধতি খুব জরুরি, সেটা পাগলরাম আদিরামবাটিতে বাগানের ঘরে ঘড়ি সারাইয়ের কাজ করার সময়ে দর্নার পার্টিশানের ওধারে গঙ্গারামের সঙ্গে রোগীদের কথোপকথন শুনে উপলব্ধি করেছিল। হোমিওপ্যাথি নতুন শাস্ত্র, তার ওষুধ সুলভ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। কিন্তু একে ঘিরে নানান মিথ এবং বুজরুকি জেঁকে বসেছে। ফরিদ আয়াজ দস্তরখানের কাছে নবাবী চিকিৎসার কিস্যা শোনার পর পাগলরাম বুঝতে পারলেন এই মিথ-মিথ্যা-বুজরুকির একটি প্রধান কারণ হোমিওপ্যাথির বইগুলি জটিল। এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা।
ডাক্তার ভূপেন্দ্রলাল সরকারের পরামর্শে কিছুকালের মধ্যেই তর্জনাকার লাগিয়ে অর্গ্যানন ও মেটেরিয়া মেডিকা প্যুরার মূল ভাব্য ও টিকা বাংলার তর্জমা করে প্রকাশ করতে লাগলেন। তার কিছু কিছু সূত্র ও অংশবিশেষ আদিরাম প্রেস পঞ্জিকার পাতায় প্রকাশ করতে অভূতপূর্ব সাড়া মিলল। ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল পাগলরামের ব্যবসা।
সাচ্চা হোক বা ঝুটো, ভাবাদর্শ হোক কিংবা কোনো দ্রব্য, যেকোনো ধরনের অভিনবত্বেরই তখন কলকাতা শহরে বিস্তৃত বাজার হয়েছে। বাতাসে টাকা উড়ছে, টাকা ধরতে গ্রাম ছেড়ে দলে দলে লোকে শহরে আসছে। নতুন কিছুকে গ্রহণ করার জন্য তাদের মন যেমন সদাসর্বদা প্রস্তুত, তেমনই ছেড়ে আসা গাঁঘরের টানও রয়েছে। এই দ্বিমুখী রুচির জঙ্গমে এসে ননী মুখে মুখে গান বেঁধে, কবির লড়াইয়ে যোগ দিয়ে তার প্রতিভার স্বীকৃতি পেল। সেইসঙ্গে গোবর্ধন ময়রার আবিষ্কার চিনির রসে ফোটানো ছানার রসগোল্লা তৈরির কারগরি আমদানি করল কলকাতায়।
প্রতিদিন নিত্যনতুন ঘটনা ঘটছে, পূবে উত্তরে দক্ষিণে নোনা খাল জলা বুজিয়ে, হেঁতাল ক্যাওড়ার বাদাবন কেটে নগরীর এলাকা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, নিওক্ল্যাসিকাল গথিক পালাডিয়ান স্থাপত্যশৈলীর হর্ম্যরাজি জেগে উঠে প্রাসাদ নগরী হয়ে উঠছে ফিরিঙ্গিদের হোয়াইট টাউন, জমিদার বানিয়ানদের পাড়া, ব্ল্যাকটাউনেও খাপরা টালির চালে-চালে বসতি সরিয়ে সচ্ছল মধ্যবিত্তের কোঠাবাড়ি জাগছে। এদিকে শহরের আকাশে বাতাসে মশা মাছি কলেরা কালাজ্বরের রোগজীবাণু, তারা ব্ল্যাক টাউন হোয়াইট টাউনের সীমারেখা মানে না। ইউনুস আক্সফার্দির গড়ে তোলা এশিয়াটিক সোসাইটির বাড়ির পাশ দিয়ে কফিনবাহী গাড়ি বিষণ্ণ ক্যাঁচক্যাঁচ ধ্বনি তুলে দিবারাত্র গোরস্থানের দিকে চলে যায়, নিমতলায় ক্যাওড়াতলায় চিতা জ্বলে অবিরাম।
কালাজ্বরে ভুগে হিরণ্ময়ী যখন চিতায় উঠল, কোলের কন্যা সন্তান রেখে গঙ্গারাম ভাবলেন ভাইটা এবার সাতগাঁয় ফিরবে। জ্ঞাতিসমাজ ভাবল ফিরুক না ফিরুক, নির্ঘাৎ আবার একটি বিবাহ করবে নিজের জন্যে না হোক, অন্তত পুত্রলাভের আশায়। কিন্তু সেসব কিছুই করলেন না পাগলরাম। আয়া রেখে, ইংরেজ গভর্নেস রেখে কন্যা প্রতিপালন করতে লাগলেন। এদিকে আরও বেশি করে ব্যবসা আর সমাজকল্যাণমূলক কাজেকর্মে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন।
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.৫
১১.৫
ইউরোপীয় ছিটমহলগুলো বাদ দিলে হুগলি ও সরস্বতীর মধ্যবর্তী এলাকা যার মধ্যে সাতগাঁও রয়েছে খাতায় কলমে ইংরেজশাসিত। কিন্তু পর্তুগিজদের আমল থেকেই ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত দেবোত্তর সাতগাঁর সার্বভৌমত্ব অটুট থেকেছে। কোম্পানির তহশিলদারেরা এখানে খাজনা আদায় করতে পারেনি। ওলন্দাজডাঙার জমি জরিপ করতে যেবার কলকাতা থেকে আমীনের দল এল শিকল ফিতে নিয়ে, তারাও পর্তুগিজ ফটক পেরিয়ে সাতগাঁর ভেতরে ঢুকতে গিয়ে বাধা পায়। তার কিছুকাল পরে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার একদল লোক এসে সুলতানি টাঁকশালের আশেপাশে ধ্বংসস্তূপে তাঁবু ফেলে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করল। ডকবাজারের কাছে পোস্টাপিস আর পুলিশ চৌকি বসল, বন্দর-হুগলি থেকে সাতগাঁ ছোটো ফিডার রেলের লাইন পাততে শুরু করল লন্ডনের মার্টিন্স লাইট রেলওয়ে কোম্পানি। এরপরে আর ওলন্দাজডাঙার পৌর এলাকায় সাতগাঁর অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো যায়নি।
পৌর বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধি স্থানীয় কাছারির ম্যাজিস্ট্রেট রাজমোহন চাটুজ্জ্যে। তাঁর উৎসাহে পাগলরাম চক্রবর্তীকে বোর্ডের কার্যকরী সমিতিতে সাতগাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার প্রস্তাব এল। পাগলরাম সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। যে জ্ঞাতিসমাজের মাথারা তাঁকে অপাংক্তেয় করেছিল, তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে সেই অপমানের শোধ নেবার এই সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না।
বড়দা রামানুজের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান থেকে সেই যে অভুক্ত বেরিয়ে গিয়েছিলেন পাগলরাম, তারপর আর আদিরামবাটিতে পা রাখেননি। গঙ্গারামের সঙ্গে আর মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়নি। দুই ভাইয়ের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অভিমানের দুর্লঙ্ঘ্য পাঁচিল। কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে ওলন্দাজডাঙায় পৌর বোর্ডের মিটিঙে যোগ দিতে এসে সেখান থেকেই ফের ট্রেনে চেপে ফিরে যেতেন। তাঁর উদ্যোগে সাতগাঁর কাঁচা নর্দমা পাকা করার জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়, কাঁচা মাটির রাস্তাগুলোয় ইট পেতে পাকা করা হয়। কলকাতার মতো ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী বসানো যায়নি, তবে খাটা পায়খানার মল মেথরানিদের মাথায় বয়ে নিয়ে যাবার বিকল্প হিসেবে তাদের জন্য ঠেলাগাড়ির ব্যবস্থা হয়। সাতগাঁর অপরিবর্তনীয় জীবনধারায় সেটাও একটা পরিবর্তন তো বটেই। অনেককাল পরে এক ভাদ্রের গুমোট দুর্গন্ধময় সকালে ইট-বাঁধানো রাস্তায় শূন্য ঠেলাগাড়ির শব্দ ত্রাস সৃষ্টি করবে সাতগেঁয়েদের বুকে
ভাইয়ের উদ্যোগে এই আধুনিক নগরোন্নয়নের ছবি গঙ্গারামের মনে অব্যক্ত গর্বের সঙ্গে ফিরিয়ে আনল এক বিবর্ণ ইতিহাসগাথা, যখন বাংলার সুলতানি আমলের গৌরবময় প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বন্দর শহর, ইবন বতুতা থেকে শুরু করে র্যালফ ফিচ পর্যন্ত অসংখ্য ভিনদেশি পর্যটকেরা যার প্রশস্তি লিখেছে।
*
একদিন রাজমোহন চ্যাটার্জির লেখা চিঠি নিয়ে গঙ্গারামের সঙ্গে দেখা করতে এলেন ধুতি-চাদর পরিহিত এক মাঝবয়সী পুরুষ।
‘পত্রবাহক প্রসাদ শাস্ত্রী আমার বিশেষ স্নেহভাজন’, রাজমোহন লিখেছেন,— ‘কাটালপাড়ায় আমার বসতবাটির সন্নিকটে তাঁর ভিটে। কলিকাতার সংস্কৃত কলেজ থেকে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রথাগত শিক্ষা সম্পূর্ণ করে জ্ঞানচর্চায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছেন। বর্তমানে প্রাচীন পুথিপত্রে গবেষণামূলক অনুসন্ধানে নিয়োজিত আছেন। উনি একটি বিশেষ অনুসন্ধিৎসা থেকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, যা উনি আপনাকে নিজ মুখেই বলবেন।
ছাপানো ইংরেজি লেটারহেডে বাংলায় লেখা চিঠি, নীচে স্বাক্ষর দেখে আচমকা ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন গঙ্গারাম। এই লোকটার উসকানিতেই পাগলরাম সাতগাঁর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে কলকাতায় বাস করতে গিয়েছে। তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাই, ছোটোবেলা থেকে তিনি বুক দিয়ে আগলে মানুষ করেছেন, রেভারেন্ড বিলের থেকে উপহার পাওয়া ছাপার কল বাড়িতে বসিয়ে তার জীবিকার বন্দোবস্ত করেছেন, সুপাত্রী দেখে বিবাহ দিয়েছেন পিতার যা কাজ সেসবই তিনি বড়ো ভাই হয়ে করেছেন। বড়দা রামানুজ এসব ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামাননি, নিজের কাজকর্ম আর সংসারধর্ম নিয়েই থেকেছেন। সেই পাগলরাম চাটুজ্জ্যে ডেপুটির প্ররোচনায় কলকাতায় চলে গেল।
গঙ্গারামের মনে সন্দেহ দানা বেঁধে ওঠে।
‘আমার ভাই পাগলরাম চক্রবর্তী কি চ্যাটার্জিকে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে? আপনি পুথিগুলোর কথা জানলেন কীভাবে?’
প্রসাদ শাস্ত্রী, যাকে লোকে আড়ালে ক্যালকাটা শাস্ত্রী বলে ডাকে, মুচকি হাসেন। ‘ওই পুথিগুলোর কথা কলকাতার সারস্বত সমাজে কে না জানে? আমি প্রথম জানতে পারি এশিয়াটিক সোসাইটির কাগজপত্রে, স্যার উইলিয়াম জোনস-এর লেখা পড়ে। দুঃখের বিষয়, ঝড়ে নৌকডুবি হয়ে সেগুলি হারিয়ে যায়। একটি ডায়েরিতে লেখা কিছু নোট ছিল, যেখানে উনি পুথির ভাষা সম্পর্কে ওঁর কিছু ভাবনা লিখে রেখেছিলেন।’
‘কীরকম ভাবনা?’
‘সেটা খুব স্পষ্ট নয়। তবে এমন কিছু ছিল যা স্যার জোনসকে উৎসাহিত করে। খুব সম্ভব চলিত বাংলা ভাষার আদিরূপের একটি আভাস খুঁজে পাচ্ছিলেন। ওঁর এই নোট্স একশো বছরেরও বেশি আগের। এতদিনে অবশ্য বাংলা ভাষা অনেক বদলেছে, বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষা চালু হবার পর।
‘হ্যাঁ, ক্যালকাটা বাংলা!’ গঙ্গারাম তীর্যক হাসেন।–‘যে ভাষায় আপনাদের চাটুজ্যে মশাই কেতাব লেখেন।’
ব্যঙ্গটা গায়ে মাখেন না ক্যালকাটা শাস্ত্রী। না শোনার ভান করে বলে চলেন —
‘জোনস সাহেবের নোট্স থেকে অনুমান হয় ওই পুথিগুলি হাজার বছরের পুরোনো। আমি হিসেব করে দেখেছি, সেসময়ে বাংলায় বৌদ্ধ শাসন ছিল। পুথিগুলি দেখতে পেলে তার মধ্যে থেকে বাংলা ভাষার প্রাচীন আদি রূপের একটা সন্ধান হয়তো পাওয়া যেতে পারে, যে রূপটা বহুকাল আগে গোটা বাংলায় চালু ছিল বলে অনুমান হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষের ভাষার সংমিশ্রণে সেটি অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কয়েক বছর ধরে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ ঘুরে আমি ইতিমধ্যে প্রায় চার শতাধিক প্রাচীন পুথি সংগ্রহ করেছি, কিন্তু তার মধ্যে কোনোটিই জোনস সাহেবের ডায়েরির সেই পুথিগুলোর মতো অত প্রাচীন নয়।’
ক্যালকাটা শাস্ত্রীর কথাগুলো শুনতে শুনতে গঙ্গারামের মনে পড়ে যায় পিতামহ রামাই পণ্ডিতের কথা, পুথি উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। আরেকজন সাহেবের কথাও ছেলেবেলায় শুনেছেন। তিনিও ওই এগারোটি হারানো পুথির সন্ধানে এসেছিলেন।
‘আমি জানি, আরুন্ডেল সাহেব!’ ক্যালকাটা শাস্ত্রী বলেন। ‘স্যার জোনসের পর তিনি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হন।’
‘না, আরেকজন সাহেব ওঁর পরেও এসেছিলেন,’ গঙ্গারাম বলেন। ‘যতদূর শুনেছি তিনি লোকলস্কর নিয়ে বজরা হাঁকিয়ে আসেননি। কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে এসেছিলেন। ‘
তাঁর পরনে ছিল একটা মোটা নীল উর্দি আর পাতলুন। রোগা কঙ্কালসার চেহারা, কোটরাগত চোখ যেন দুর্ভিক্ষ-পীড়িতের মতো। ততোধিক শান্ত আর গোবেচারা ধরনের। এমন ফিরিঙ্গি সাতগাঁয় কোনোকালে কেউ দেখেনি, মানুষটিকে সবার মনে ধরে যায়। আরুন্ডেল সাহেবের জন্য বাগানের ধারে যে দরমার ঘরটা পরিত্যক্ত পড়েছিল, সেখানেই তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়। দিনের পর দিন তিনি ওই ছোট্ট ঘরের মধ্যে দিবারাত্র পুথি পাঠ করে যেতেন। সকালে একবার নদীর ধারে গিয়ে স্নান প্রাতকৃত্য সেরে আসতেন, আর বেরোতেন না। দিনে একবার একটি হাতলওয়ালা টিনের পাত্রে আতপ চাল ও সামান্য কিছু সব্জি, যা ওঁকে রোজ সিধের মতো করে বেড়ে দেওয়া হতো, সেদ্ধ করে খেতেন। কোনোদিকে তাকাতেন না, এমনকি আদিরামের মন্দির একবার ঘুরেও দেখেননি। টানা বারো দিন এভাবে কাটানোর পর ঠিক যেমন করুণ দুঃখী মুখ নিয়ে সাতগাঁয় এসেছিলেন, সেভাবেই আবার পদব্রজে কলকাতায় ফিরে যান। যে পুথির সন্ধানে এসেছিলেন সেটি খুঁজে পাননি। আরুন্ডেল সাহেবের মতো কোনো উপহার সঙ্গে আনেননি তিনি, কিন্তু পরিবারের স্মৃতিতে স্থায়ী ছাপ রেখে যান এই ঋষিপ্রতিম ফিরিঙ্গি।
গঙ্গারামের কাছে বর্ণনা শুনে মাথা নাড়েন ক্যালকাটা শাস্ত্রী।
‘চিনতে পেরেছি মনে হচ্ছে! খুব সম্ভব উনি স্যান্ডর কোরোসি চোনা, সোসাইটির লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। উনি কিন্তু ইংরেজ নন, হাঙ্গেরিয়ান। স্বজাতির শেকড়ের সন্ধানে ভারতে আসেন, কিন্তু কিছু খুঁজে পাননি। আমার ধারণা জোনস সাহেবের নোটসে ওই প্রাচীন পুথিগুলির কথা জেনে ওঁর মনে হয়েছিল পথের হদিশ মিলবে। পরে অন্যান্য নথি ঘেঁটে ওঁর ধারণা হয় পূর্বপুরুষের সেই আদিভূমি রয়েছে হিমালয়ের ওপারে। মরীচিকার টানে তিব্বত যাবার পথে দার্জিলিঙে গিয়ে অজানা জ্বরে মারা যান।’
‘উনি স্বজাতির শেকড়ের খোঁজে সাতগাঁয় এসে পুথি ঘেঁটে কিছু খুঁজে পাননি। আর আপনি বাংলা ভাষার শেকড়ের সন্ধান করতে এসেছেন।’ এই প্রথম নরম আন্তরিক স্বরে বলেন গঙ্গারাম। ‘কিন্তু সেই পুথিগুলো এবাড়ির পুথিশালায় নেই। হয়তো এও এক মরীচিকা!’
ক্যালকাটা শাস্ত্রী কিছু বলেন না, শান্ত প্রত্যয়ের হাসি হাসেন।
ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বিক্রমপুর থেকে শুরু করে পুব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ হবার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। এই সুজলা সুফলা দুর্ভাগা মেধাচর্চার বদ্বীপভূমিতে বানে ভেসে-যাওয়া খড়কুটোর মতো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছে শত সহস্র মানুষ ও তাদের রাশি রাশি পুথিপত্র। সংস্কৃতের কঠিন পাললিক স্তরের নীচে অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষা উপভাষার পাতাল স্রোতের মধ্যে থেকে এক নতুন সজীব বাংলা ভাষার জন্ম হচ্ছে–এমন একটা অস্পষ্ট ছবি ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছেন তিনি কিছুকাল হলো। এখন শুধু প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু সূত্রের, যা চাবির মতো, সেতুর মতো, প্রচলিত বাংলা ভাষার সেই উষালগ্নের অনুমানকে সুস্পষ্ট বৈধতা দেবে এবং, ঈশ্বরের কৃপায়, তাঁর পা দুটি এখনও সেই চাবির সন্ধানে দূরদূরান্তে ভ্রমণে সক্ষম, এবং হাত দুটি যদি সেটি খুঁজে পায়, তাহলে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও চিনতে সক্ষম, যদি না সেসব লুঠেরা আগুনে কিংবা উইপোকার গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়ে থাকে।
*
পাগলরামের স্বাস্থ্যহানির খবর পাচ্ছিলেন গঙ্গারাম। ইংরেজ রাজপুরুষদের মতো হোম, কিংবা হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম শিমলা দার্জিলিং না যেতে পারুক কলকাতার নব্য বাবু ভদ্রলোকেরা ছোটোনাগপুরের শুষ্ক জলহাওয়ায় ভিলা বানিয়ে হাওয়া বদল করতে যাচ্ছে। কেউ কেউ কলকাতা ছাড়িয়ে উত্তরে হুগলির পাড়ে বাগানবাড়িতে, কিংবা রাজমোহনের মতো কাঁটালপাড়ায় দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছে। পারিবারিক চিকিৎসক বিন্দুমাধব মল্লিকের পরামর্শে এই শেষ বিকল্পটা পাগলরামের মনে ধরল। আদিরামবাটি সংলগ্ন পারিবারিক জমিতে আধুনিক ডিজাইনের দোতলা কোঠাবাড়ি নির্মাণ করার বরাত দিলেন রাজেন মুখুজ্জ্যের ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থাকে, যাদের নকশায় গোটা কলকাতায় আর্ট ডেকো স্টাইলের সুদৃশ্য ভিলাগুলো গড়ে উঠছে সেইসময়।
নিওক্ল্যাসিকাল ও ভূমধ্যসাগরীয় স্থাপত্য শৈলীর মিশেলে বৎসরাধিক কাল ধরে ওষধিবাগানের পেছনে ভোজবাজির মতো জেগে উঠতে লাগল সেই সৌধ কলকাতা থেকে আনা বেলজিয়ান কাচের শার্সি, বার্মাসেগুনের ঝিল্লি দেওয়া বড়ো বড়ো জানলা, মেঝেয় মার্বেল পাথর, পেটাই লোহার কারুকার্যময় রেলিঙে সজ্জিত হয়ে কোয়ার্সভিলে ধনী ফিরিঙ্গিদের ভিলাগুলোকে যা অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে। নবনির্মিত ভবনে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সাতগাঁয় নতুন তার মধ্যে একটি হল খাটা পায়খানার বদলে বাড়ির পিছনের জমিতে মল-নিকাশী সোক পিট, দ্বিতীয়টি ছাতের ওপর ধাতব শলাকা। গেটের পাশে পাথরের ফলকে বাড়ির নাম লেখা হলো— ‘এল-ডোরাডো’।
সাতগাঁয়ে সর্বাঙ্গীণ অবক্ষয়ের মাঝে এই আধুনিক স্থাপত্যের জৌলুস স্বাভাবিকভাবেই সমাজের চক্ষুশূল হলো, বিশেষত যখন জানা গেল এল-ডোরাডো মানে হলো সোনার শহর। আদিরাম মন্দিরের পাশেই মন্দিরের থেকেও উঁচু একটি ইমারত ওঠায় আপত্তি ঘনীভূত হলো। শুধু তাই নয়, মন্দিরের দোচালার শিখরে যেমন ত্রিশূল রয়েছে, ঠিক তেমনই এল-ডোরাডোর ছাতেও একটি ধাতব ত্রিশূলাকার দন্ড আকাশে খাড়া দেখে মনে হয় যেন আদিরামের শিখর ত্রিশূলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে
গঙ্গারামকে অনুযোগ করে লাভ নেই, ক্রমশই তিনি সংসারের সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছেন। জ্ঞাতি সমাজের উস্কানিতে সাড়া দিল না রামানুজের বড়ো ছেলে রামশশাঙ্ক। পিতৃদেবের টোলে পড়ানোর মতো বিদ্যা অর্জন করেনি সে; বেশিরভাগ সময় শিষ্যবাড়ি ঘুরে ঘুরে যজমানি করেই কাটায়। অগত্যা ছোটো ছেলে রামরাম যে সদ্য কাশীর বিদ্যাপীঠ থেকে শাস্ত্রী উপাধি নিয়ে ফিরেছে, যার খড়্গ নাসা, পুরু শিখা আর কঠোর চাহনি দেখে গোষ্ঠীপ্রবীণদের মনে পড়ে যায় রামাই পণ্ডিতের কথা চিঠি লিখল খুল্লতাতকে: সাতগাঁর গৌরব আদিরামের মন্দির, তার চৌহদ্দির মধ্যে শিখর ত্রিশূলের থেকেও উঁচু কোনো ধ্বজাদণ্ড থাকা দেবতাকে তাচ্ছিল্য করার শামিল। পাগলরাম যেন তাঁর নবনির্মিত ভবনের ছাত থেকে ত্রিশূলটি পত্রপাঠ সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করেন।
উত্তরে পাগলরাম লিখলেন
‘এল-ডোরাডোর ছাতে ওই বিশেষ বস্তুটি কোনো শিখর ত্রিশূল নয়। ওটি হলো বাজকাঠি, ইংরেজিতে বলে lightening arrester। লক্ষ করলে দেখবে তামা ও ইস্পাত মিশ্রিত ওই শলাকা দেয়াল বরাবর নীচে নেমে মাটির গভীরে প্রোথিত রয়েছে। মন্দির সংলগ্ন এলাকাটি উন্মুক্ত। আদিরাম না করুন, কিন্তু যদি কখনো ওই স্থানে বজ্রপাত ঘটে তাহলে ওই বাজকাঠি মন্দিরকে রক্ষা করবে। তবুও তোমাদের যদি আপত্তি থাকে, আমি ওটি অবিলম্বে খুলে ফেলার নির্দেশ দেব।’
*
ক্যালকাটা শাস্ত্রীর লেখা চিঠি এল গঙ্গারামের কাছে, ডকবাজারে নতুন পোস্টাপিসের পিওন এসে দিয়ে গেল। চিঠির সঙ্গে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের একটি সংখ্যা। সুসংবাদ: সেই এগারোটি পুথির সমসাময়িক একটি দুর্লভ পুথি অবশেষে পাওয়া গিয়েছে। এবং সেটি পাওয়া গিয়েছে সেই হাঙ্গেরিয় কোরসি চোমার অসমাপ্ত পথ ধরে, হিমালয়ের বুকে।
যদিও সেটা তিব্বতে নয়, নেপালে। খোদ রাজার গ্রন্থাগারে রয়েছে সেই অভীষ্ট পুথি। তবে এগারোটি নয়, মাত্র একটি, প্রাচীন বাংলা কিংবা নেওয়ারি লিপিতে রচিত, যার কয়েকটি পাতা হারিয়ে গিয়েছে।
মি’লেডি, ক্যালকাটা শাস্ত্রীর এই আবিষ্কার বাংলা ভাষাকে মিশ্র অর্বাচীন বুলি হিসেবে যা চিরকাল সংস্কৃত পণ্ডিতদের অবজ্ঞার শিকার হয়েছে, রাজারামের মতো কট্টর নৈয়ায়িকেরা এমনকি দৈনন্দিন কাজেকর্মেও যে ভাষাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন
কয়েক শতাব্দী প্রাচীন অতীতের কোলে স্থাপন করল। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহেঞ্জোদড়ো আবিষ্কার যেমন ভারতীয় সভ্যতার কয়েক হাজার বছরের প্রাচীনত্ব চিহ্নিত করেছিল, এটিও তেমনই এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।
কিন্তু চিঠিটি পড়ে, জার্নালে ক্যালকাটা শাস্ত্রীর লেখা নিবন্ধের পাতা উলটে অনেক চেষ্টা করেও গঙ্গারাম কোনোরকম উত্তেজনা অনুভব করতে পারলেন না। কিছুকাল ধরে এক বিচিত্র নৈরাশ্য গ্রাস করেছে তাঁকে। চারপাশটা বদলে যাচ্ছে, সেই বদলটা নিজের ভেতরে অনুভব করছেন। কী যেন একটা শুকিয়ে আসছে, পুড়ে যাচ্ছে।
চারদিকে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের আগুন জ্বলছে। সেই কবে শরতের এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় হুগলির তীরে দাঁড়িয়ে– পায়ের পাতায় ছলাৎছল রুপোলি জল, সিক্ত মাতৃ আঁচলের মতো হাওয়া–পরাধীন দেশের নেটিভ হাকিম রাজমোহনের বুকে যে বিচিত্র ভাবের উল্লাস ফুটেছিল, যা সে মন্ত্রের আকারে ধ্বনিতে গেঁথে নিয়েছিল, সেই একটি মন্ত্র যেন স্বতোৎসারিত ডানা মেলে লক্ষ লক্ষ তরুণ হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে। কোনোকালে যারা রাজমোহনের লেখা পড়েনি তারাও জানবে এই মন্ত্রের শক্তি, দেশমাতৃকার বন্দনা মন্ত্রকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করবে তারা।
ছেলেবেলা থেকে গঙ্গারামের সুখদুঃখের সাথি গুঁফো গোঁসাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জেলে গিয়েছে। একটি প্রোজেক্টার যন্ত্রের হাতল ঘুরিয়ে চলমান ওরিয়েন্টাল সিনারি দেখিয়ে ফিরিঙ্গি ক্লাবে মেম্বারদের মনোরঞ্জন করত অগস্টিন দুফে। তার মৃত্যুর পর সেটি গুঁফোর হস্তগত হয়। গ্রাম্য মেলায় ঘুরে ঘুরে ছবি দেখিয়ে অন্ন সংস্থান করছিল। ছবির রিলে ফরাসী চিত্রগ্রাহকের তোলা কলকাতার রাজপথে মিছিলে সাদা উর্দিধারী ইংরেজ পুলিশের নির্মমতার দৃশ্য ছিল। এদিকে গ্রামে গ্রামে পুলিশের চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। গুঁফোর কয়েদ হলো। নিঃসঙ্গতার বোধ আরও তীব্র হল গঙ্গারামের।
তবু বাগানের ধারে পাগলরামের ভিলাটা যখন গড়ে উঠছে– এই গোটা সময়ে একবারের জন্যেও দেখতে আসেননি তিনি — গঙ্গারামের মনের কোণে
একটু আশা জমেছিল। কিন্তু তিনি জানতেন না, পাগলরাম নিজেও জানতেন না, অনেক অর্থ ব্যয় করে কলকাতার সেরা স্থপতি দিয়ে যে আবাসটি তিনি বানিয়ে তুলছিলেন, এল-ডোরাডোর মতোই সে এক স্বপ্নের মরীচিকা মাত্র। সেখানে কোনোদিন বাস করা যায় না। এও এক স্মারক সৌধ – ঠিক যেমন মৃত্যুর আগে রু দ্য বেনারসের ধারে স্মারক সৌধ বানিয়ে গিয়েছিলেন সাত সাহেবের বিবি সুজানা, যেমন আওয়াধের শেষ নবাব কলকাতার গায়ে গড়ে তুলেছিলেন স্মৃতির লখনউ নগরী। এবং সেই স্বরচিত নস্টালজিয়ার ভারে দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
কিন্তু এল-ডোরাডোর মরীচিকায় পাগলরামের মরাও হলো না। কলকাতার মাটিতে প্রথম পা রেখে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বাতাসে লক্ষণার এসেন্স-পমেটমের বাক্সের মতো যে গন্ধটা পেয়েছিলেন পাগলরাম, সেটা যে আসলে অনির্ব্বাপ্য মৃত্যুর গন্ধ ছিল সেটা বুঝতে পারেননি। গঙ্গারামের কাছে সংবাদটা এল বজ্রপাতের মতো। তারপর রাধারাণী সাতগাঁয় এল পিতার অস্থিকলস নিয়ে। সরস্বতীর ঘাটে বাপ-মা হারা ভাইঝিকে দেখলেন গঙ্গারাম খালি পা, চুল খোলা, দুহাতে ধরা পোড়ামাটির কলস।
স্মৃতিতে ঝলসে বসে যায় ছবিটা। বারে বারে ফিরে আসে, মনে হয় কলসের ভেতর ধিকিধিকি আগুন বুঝি জ্বলে যাচ্ছে। জ্বলছে তাঁর বুকের ভেতরেই। ভেতরটা পুড়ে অস্থি কলস হয়ে গেছে। এ এক বিচিত্র জ্বলনের অনুভূতি, কোনো টোটকাতেই যার নিরাময় নেই। ক্রমশ শয়নে জাগরণে গঙ্গারামের সঙ্গী হয়ে উঠল।
জ্বালাটা বুকের নীচ থেকে শুরু হয়ে উদরের দিকে নেমে ক্রমশ পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কাঁকড়ার ধারালো দাঁড়া দিয়ে যেন আঁচড় কাটতে থাকে, স্নায়ুতন্তুজাল ছিন্নভিন্ন করে তুলছে অনুভব হয়। আজীবন মানব দেহযন্ত্র অধ্যয়ন করে আসা মানুষটি ক্রমশ টের পেতে থাকেন এক বৈরি স্বজ্ঞা তাঁর ভেতরে বাসা বেঁধেছে। শেষ না করে মুক্তি দেবে না। রাতের পর রাত প্রদাহের জ্বালায় বিনিদ্র, একদিন ভোরের আগে রাত্রির সজীব ধ্বনির ভেতর গঙ্গারাম শুনলেন এক যুবকের কণ্ঠস্বর, বহু দূর থেকে তরঙ্গায়িত হয়ে আসছে
‘নিষ্কাম কর্ম কী? …
ফলের ধারণা বিনা কর্ম কীভাবে চালিত হবে?…
তৃষ্ণা নিবারণের বাসনা বিনা বায়স কীভাবে জলপাত্রে উপল ফেলবে? …
পাত্রের ধারণা বিনা কুম্ভকার কীভাবে কাদার মন্ডকে রূপ দেবে?…’
এক রাতে গোপনে গঙ্গারামের সঙ্গে দেখা করতে এল সেই যুবক–শ্যামবর্ণ ছিপছিপে চেহারা, নিজের খণ্ডিত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিচিত্র বিদ্রোহে নেমেছে। আরেকদিন এলেন আলি সাহেব, সাদা চুলে দাড়িতে জোব্বার হিমালয়ের বাতাস। একটি অচেনা গাছের ডাল দিলেন।
ছত্রাকচূর্ণ দিয়ে ডোঙা শর্মার ব্যথার উপশম ঘটিয়েছিলেন আলি সাহেব, ভিনদেশি সাপের বিষ নামাতে পারেননি। গঙ্গারামকে তিনি প্রবল প্রদাহের মুহূর্তে গাছের ডাল দাঁতে কামড়ে ধরতে নির্দেশ দিলেন। ছত্রাকের প্রভাবে অস্তিম প্রহরের আগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন ডোঙা শর্মা, গঙ্গারামের বোধ হলো যেন দাউ দাউ জ্বলতে জ্বলতে ভেসে চলেছে এই দেহের ডোঙা, জলে প্রতিফলিত আগুনের শিখার শিকড়।
কই, বায়ুর্নিলমমৃতমথেদং ভষ্মান্তাং তো নয়, যেমন গুরুদেব উচ্চারণ করেছিলেন মৃত্যুর অব্যবহিত আগে? ক্রতো স্মর কৃতং স্মরোও নয়। গঙ্গারামের স্মৃতিতে ফিরে আসে তারও ঢের আগে কাঁচকলাইয়ের গন্ধে ভরা এক কমলা বিকেলে ডোঙা শর্মার কন্ঠে শোনা চরণ
সোনে ভরলী করুণা নাবী
রূপা থোই নহিকে ঠাবী…
সোনায় ভরেছে এই করুণার নাও, রুপা রাখি কোন ঠাঁই?
তাহলে?
বাহ তু গঙ্গা গঅন উবেসে?
ওরে গঙ্গা গগনে ভাসিয়ে দে তোর নাও…
তবু কেন বিগত কোন জন্মের কথা মনে ভেসে ভেসে আসে? ক্রতো স্মরো কৃতং স্মরো নয়
গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ …
গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ…
আহ, সামনে বইছে সরস্বতী, সর্বাঙ্গে ভিজে পলিমাটি লেপা, তবু দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে সবকিছু! আলি সাহেবের দেওয়া গাছের ডালে কামড় দিতে মুখ ভরে ওঠে নোনা রসে নিজেরই রক্ত, পিঠে আগুনের তাপ, চিতা জ্বলছে, জীবন্ত পুড়ছে লক্ষণা, এদিকে পাগলরামের বুকের ওপর হাঁটু চেপে, দুই তর্জনীতে ওর কর্ণকুহর চেপে, নারকেল গাছের মাথা থেকে ভেসে আসা ধারাবিবরণী চেপে, পক্ষীমাতার মতো ওর ওপরে ঝুঁকে পড়ে, পিঠে জ্বলন্ত চিতার তাপ নিতে নিতে গঙ্গা টের পায় কব্জি কামড়ে ধরেছে পাগলরাম, রক্ত ঝরছে, কব্জি, গাছের ডাল, পাগলরাম লক্ষণা আগুন, আগুন
খুন্টি উপাড়ি মেলিলি কাচ্ছী
খুন্টি উপাড়ি মেলিলি কাচ্ছী…
খুঁটি উপড়ে কাছি তুলে নিয়ে চলল করুণার নাও। কাদার ভেতর থেকে গঙ্গারামকে তুলে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে চলে গেল ইংরেজ পুলিশের জাহাজ। তারপর যেভাবে ঘাটে পড়ে থাকা হরিণচর্ম আর গন্ডার খড়গের কোষা বাড়ি নিয়ে গেল গুঁফো গোঁসাইয়ের ছেলে বাঁটুল, সেভাবেই সাতগাঁয় ফিরে আসার অব্যবহিত পরে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর বাসাংসি জীর্ণানিবৎ দেহ বায়ুনিলমমৃতমথেদং ভস্মীভূত হলো।
