সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.৪
১২.৪
মি’লেডি, ব্যক্তির জীবনে বিপর্যয় যতই অতর্কিত সাইক্লোনের মতো এসে আছড়ে পড়ে সবকিছু তছনছ করে দিক, যখন সেটি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, প্রিয়জন হারাবার শোক যখন শত শত আতঙ্কিত ভিটেহারা মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র বাস্তবের সামনে এসে পড়ে, তখন কীভাবে যেন ব্যক্তিগত শোকের বোঝা বয়ে নিয়ে চলার শক্তি খুঁজে পায় মানুষ।
আপৎকালীন ডিউটিতে রথীনের কাজ আর শেষ হয় না। চোখের সামনে যেন আঠের বছর বয়সে দেখা সেই সময়টার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। মার্চের গভীর রাতে আন্তর্জাতিক সীমান্তে একদল ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের অভূতপূর্ব অনুপ্রবেশ দিয়ে যা শুরু হলো, তিন মাস পরেও তা অব্যাহত। মানুষের রক্তে ভিজে উঠছে বাংলার ফুটি-ফাটা মাটি। দেশভাগের সময়ে সপরিবারে ভিটেমাটি ছাড়ার সময়ে যে দৃশ্য সে দেখেছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি শোচনীয় এই মানুষগুলোর দশা। প্রায় সকলেই সমাজের নীচের তলার, অন্ত্যজ, এক টুকরো জমি আর দুটো হাত ছাড়া আর কোনো পুঁজি নেই। তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে নেমে পড়ল রথীন। প্রশাসনে তার কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি কোনোদিনই সে পায়নি, বারে বারে বদলি হয়েছে। পুরুলিয়ায় সেই প্রভাবশালী পাথর মাফিয়ার সঙ্গে সংঘাতের পরে নিজের দপ্তরে একপ্রকার ব্রাত্যই হয়ে উঠেছে। তার ফল ভুগতে হয়েছে তার পরিবারকে। সেসব ভুলে গিয়ে ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল রথীন। দিনের পর দিন শয়ে শয়ে শরণার্থীর দুর্দশা লাঘব করার এ এক অসম্ভব প্রকল্প, প্রাণপাত করে কাজ করতে গিয়ে প্রথম যৌবনের অ্যাসিড রিফ্লাক্স ফিরে এল।
কোচবিহারের সীমান্তে দুর্গম, নদী বনাঞ্চল আর চা-বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেবার মতো পরিকাঠামো রাজ্যের সরকারের নেই। কিছু কিছু জায়গায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পরিত্যক্ত সেনাছাউনিগুলো ছিল, দেশভাগের সময়ে ভিটেহারাদের অস্থায়ী ডেরা হয়েছিল। সেই কুপার্স ক্যাম্প আর নিসেন হাটগুলো আবার ভরে উঠল। অনেকেই রাতের অন্ধকারে ঘরবাড়ি গবাদি পশু ছেড়ে আক্ষরিক অর্থেই যাকে বলে এক-কাপড়ে পালিয়ে এসেছে। এত মানুষের খাদ্য, জামাকাপড় ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক জিনিসের ব্যবস্থা করাই শুধু নয়, সরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিটি শরণার্থী শিবিরে মেডিকেল ক্যাম্প বসাতে হচ্ছে। অসংখ্য মেয়ে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছে, শিবিরগুলোয় বিভিন্ন বয়সের গর্ভবতী নারীরা এসেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গর্ভপাত করানোর মতো অবস্থায় আর নেই। বিশেষ ধরনের চিকিৎসা ও প্রসূতি পরিষেবার পরিকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।
এত বড়ো একটা বিপর্যয় রাজ্যের সরকারের পক্ষে একা সামলানো অসম্ভব। প্রথম দিকে কিছুটা গড়িমসির পর দিল্লির সরকার নড়েচড়ে বসল। ত্রাণের কাজ পরিদর্শন করতে উত্তরবঙ্গে এলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁকে বিভিন্ন ক্যাম্পগুলোয় ঘুরিয়ে দেখায় রথীন। মন্ত্রীমশাই পাঞ্জাবি, নিজেও একদা সরকারি আমলা ছিলেন। রথীনের মতো নিবেদিতপ্রাণ রাজ্য ক্যাডারের অফিসারের দক্ষতা আর পরিশ্রম দেখে যতটা সন্তুষ্ট হলেন, প্রায় ততটাই মুগ্ধ হলেন তার মিতবাক নিরভিমান ব্যবহারে। রাজ্যের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যে পরিমাণ অনুদান চাওয়া হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটাই মঞ্জুর করলেন। সন্ধ্যাবেলা মন্ত্রীমশাই সার্কিট হাউসে ফিরে একান্তে তাঁর সান্ধ্য বরাদ্দ সিঙ্গল মল্টের গ্লাস হাতে রথীনের সঙ্গে আলাপচারিতা করলেন, ওর ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে চাইলেন। দ্বিতীয় গ্লাসের পর স্মৃতিচারী হয়ে পড়লেন মন্ত্রীমশাই।
‘মিস্টার চ্যাটারজি, আমিও তোমার মতোই রিফিউজি। আমার বাবার গারমেন্টের বিজনেস ছিল ওপারে। বানোয়ারিলাল ক্লথ স্টোর্স ছিল লাহোরে আনারকলি বাজারে সবচেয়ে বড়ো দোকান। সাতচল্লিশে এপারে চলে এলাম, বাবা দোকানের সাইনবোর্ড খুলে নিয়ে এসে কনট প্লেসে ঘর নিয়ে একই কাজ করতে লাগলেন। কিন্তু উনি চেয়েছিলেন আমি আর আমার দাদা স্যুটেড-বুটেড পেশায় আসি। এলামও। দাদা উকিল হলেন, আমি তোমার মতো ব্যুরোক্র্যাট। সরকারি আমলা হয়ে আমাদের কাজ কী? মানুষের সেবা। যেটা এখন তুমি করছ। কিন্তু বাইশ বছর নর্থ ব্লকে কলম ঘষে আমি বুঝলাম সত্যিকারের সেবা করতে হলে পলিটিক্সে আসতে হবে। চলে এলাম। এখন সেবাই আমার পেশা।’
মন্ত্রীমশাই বলেন, রথীন শোনে। ওর হাতে ঠান্ডা চায়ের কাপে সর জমে। এদিকে দ্বিতীয় গ্লাস শেষ করে তৃতীয় গ্লাস হাতে নিয়ে ঈষৎ রক্তিম চোখ ওর দিকে ফিরিয়ে মন্ত্রীমশাই বলেন—
‘রথীনজী, তুমিও এবার চাকরি ছেড়ে পলিটিক্সে জয়েন কর। কমিউনিস্ট পার্টি নয়, কংগ্রেস পার্টি। তোমার মতো ডেডিকেটেড ইয়াং ম্যান পার্টিতে খুব প্রয়োজন। এখন বেঙ্গল লবির যারা আছে তারা সবাই জোতদার জমিদার শ্রেণির, লেখাপড়া জানে না।’
রথীন চুপ করে থাকে।
‘কী, রথীনজী? সাইলেন্ট থাকলে হবে? কিছু তো বলো!’
‘ইয়েস স্যার! সরি স্যার!’ রথীন বলে। ‘আসলে স্যার, আমরাও রিফিউজি কিন্তু আমাদের এদিককার গল্পটা একটু আলাদা। আপনার পরিবারের মতো আমরা কিছু আনতে পারিনি। নো সাইনবোর্ড, নাথিং। পাঞ্জাবের মতো বাংলায় প্রপার্টি ট্রান্সফার হয়নি। লেখাপড়া করে চাকরি জুটিয়ে মোটামুটি ভদ্রভাবে বাঁচার মতো সংস্থান করতে আমাদের একটা জেনারেশান লেগে গেল। পলিটিক্সে নামতে গেলে ফ্যামিলি ক্যাপিটাল লাগে, আপনি জানেন মিনিস্টার স্যার। সেজন্যে এখানে জোতদার শ্রেণিই কংগ্রেস করে।’
মন্ত্রী চুপ করে থাকেন কয়েক মুহূর্ত। আইসবক্স খুলে নিজেই গ্লাসে দু-টুকরো বরফ ফেলে দেন।
‘আচ্ছা চ্যাটারজি, একটা জিনিস আমায় বলো তো?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন। ‘এই যারা বর্ডার ক্রস করে এসেছে, এরা সবাই তো হিন্দু নাকি?’
‘সবাই নয়, তবে বেশিরভাগই হিন্দু।’
‘সেই মানুষগুলো তখন চলে আসেনি কেন?’
‘চলে আসতে গেলে তো কোনো একটা পুঁজি লাগে স্যার–অর্থ, শিক্ষা।
কিংবা সোশ্যাল ক্যাপিটাল, এপারে কনট্যাক্টস। এই মানুষগুলোর সেই কোনোটাই নেই। আর তাছাড়া…’
‘তাছাড়া?…’
রথীন চুপ করে যায়। ছবির মুখটা মনে ভেসে ওঠে -যে প্রবীণ, আতঙ্কদী মুখটা নিয়ে কিছুদিন আগে সে কলকাতায় এসেছে সেই মুখটা নয়, সিলেটে যুবতী ছবির যে মুখটা তার স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে সেই মুখটা।
‘রথীনজি, আই হ্যাভ নেভার সিন সাচ আ সাইলেন্ট চ্যাটারজি!’ হাতের গ্লাসটা ঘোরাতে ঘোরাতে আচমকা হেসে ওঠেন মন্ত্রীমশাই। ‘হোয়াট অ্যান অক্সিমোরন! হা হা হা হা! সাইলেন্ট চ্যাটারজি!’
