সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৫
৯.৫
দুফের চিনিকলে মন্দা চলেছে। ছাড়িগঙ্গার ওপারে উর্বর জমিগুলোয় ইংরেজ কোম্পানির চাপে আফিমের চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে চাষিরা, আখের জোগানে টান পড়ছে। এদিকে কিছুকাল হলো ক্যারিবিয়ান থেকে জাহাজ বোঝাই করে চিনি আসছে কলকাতায়, মিহি সাদা দানার আকারের সত্যিই— ‘সফেদ তুষার’ যা গলে যায় না। প্রতিযোগিতার বাজারে এঁটে উঠতে পারছে না দুফের কলে প্রস্তুত ছাঁচে-ফেলা চিনি, এদিকে নতুন কলকব্জা বসিয়ে আধুনিকীকরণেরও কোনো উদ্যোগ নেই। ক্রমশ ক্ষয়ের ছবি ফুটে উঠছে চিনিকলে, চারপাশের জমিতে ঝোপজঙ্গল বাড়ছে, টিনের চালে মরচে আর দেওয়ালে শ্যাওলার ছোপ, যা একশো বছরেরও বেশি পরে বাপ্পা মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়িতে চেপে সাতগাঁ যাবার সময়ে দেখবে।
ব্র্যোগের পকেট ঘড়িটা বন্ধ হবার পর যে বিচিত্র সময়হীনতার অনুভূতি হয়েছিল শার্লের, ঘড়ি সচল হবার পরেও, ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনঘন্টা পিছিয়ে দেবার পরেও, সেটা কাটল না। এদিকে বেশ কয়েকটি গ্রীষ্ম কোয়ার্সভিলে কেটে গেল। মার্চের দুপুরে দাবদাহের সময় শ্বেতাঙ্গ পাড়ার বাসিন্দারা বাংলোর দরজা জানলা এঁটে ভেতরে সেঁধিয়ে থাকে। পথঘাট মধ্যরাতের মতো শুনশান, রাত্রিগুলো সজীব মুখর, অচেনা ফুলের গন্ধে বিস্ফারিত। ছকে-বাঁধা জীবন কাটে শার্লের। সকালে বাংলোয় প্রাতরাশের পর কলের অফিসে গিয়ে ঘন্টা দুই জমাখরচের হিসেব নিকেশ, কলকাতায় পাইকারি এজেন্টদের চিঠি লেখার কাজ, দুপুরে বাংলোয় ফিরে লাঞ্চের পর নিয়মমাফিক সিয়েস্তার প্রহরটা সে কাটায় ট্যাভার্নে। তিন মাসের বাসি লা প্রেস কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ে, সংবাদে বিজ্ঞাপনে ছেড়ে আসা প্রিয় শহরটাকে খোঁজে। ওই শহরে জীবনের একুশটা বছর ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে ভোররাতের স্বপ্নের মতো। তিন ট্রাঙ্ক ভর্তি কবিতা আর গদ্যসাহিত্যের বইগুলো অচেনা অপাঠ্য হয়ে ওঠে, এমনকি মারকুইস দে সাদ-এর সোডোমের ১২০ দিন-ও বিস্বাদ লাগে। এখন সে কেবল ট্যাভার্নের লাইব্রেরিতে সস্তা কাহিনিকারের লেখা জীর্ণ বহুপঠিত রগরগে বইয়ের ভাষা সইতে পারে।
ফিরিঙ্গিডাঙার জীবন ব্যাকুল লালসাময়,অবসাদগ্রস্ত, ইন্দ্রিয়পরায়ণ। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে মৃত্যু— মৃত্যুর শ্বাস, মৃত্যুর গন্ধ, মৃত্যুর ধ্বনি। দিনের বিভিন্ন প্রহরে গির্জার ঘন্টা বাজে, কফিনবাহক ঘোড়ার গাড়ি ক্যাচক্যাচ শব্দ করে গোরস্তানের দিকে চলে যায় শার্লের বাংলোর পাশের রাস্তা দিয়ে। কেরেস্তান গোরস্তানের সীমানা বেড়ে চলে। ক্যাথলিক চার্চের ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন জমি অধিগ্রহণ চলে। ‘এখানে মাটির ওপরে যত সাদা চামড়ার মানুষ থাকে, মাটির নীচে শায়িত মানুষের সংখ্যা তার থেকে কম করেও আট গুণ বেশি।’ মসিয়ে লাহুস বলেছেন। গোরস্তানের জন্য অধিকৃত জমি বাড়তে বাড়তে সাতগাঁ বন্দরের প্রাচীন এলাকায় ছড়িয়ে গিয়েছে। কবরের মাটি খুঁড়তে গিয়ে উঠে আসে চীনা পোর্সেলিনের টুকরো, কড়ি, সুলতানি আমলের মুদ্রা, সরু ইটের স্থাপত্যচিহ্ন। এক ইতিহাসের প্রবাহ আরও গভীর ইতিহাসের প্রবাহে মেশে।
এক দুপুরে ট্যাভার্নে না গিয়ে শার্ল হাঁটতে হাঁটতে চলে এল কেরেস্তান গোরস্তানের দিকে। ছায়াঘন ঝাঁকড়া আমের গাছ, তালবীথির ছায়ায় শ্যাওলায় আকীর্ণ প্রাচীন গম্বুজের আকারের সৌধগুলো খাড়া। সবই বিগত শতাব্দীর, পাথরের ফলকে লেখা নাম আর এপিটাফগুলো লাইকেনে ঢেকে অস্পষ্ট হয়েছে। যেটুকু যা পড়া যায় প্রায় সকলেই পুরুষ, এবং প্রায় সকলেই অতি তরুণ। এদিকে কেউ ফুল দিতে আসে না, চারিদিকে অযত্নের ঝোপঝাড়। শিয়ালের দল ছানাপোনা নিয়ে থাকে। দিনের আলো ফুরিয়ে এলে প্রহরে প্রহরে ডাকে, শার্লের রাতের ঘুম ফর্দাফাই করে। ইউরোপীয় শাসনাধীন নির্দিষ্ট এলাকার সীমানা অগ্রাহ্য করে শিয়ালেরা রাতভর যাতায়াত করে সরস্বতীর পাড় থেকে হুগলির পাড়ে।
ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে সুঁড়িপথ কিছুদূর গিয়ে ঢাল বেয়ে উঠেছে রু দ্য বেনারসে, খানিকটা যেতেই ডান দিকে একটি নজর-কাড়া কবরের সৌধ। অনেকটা হিন্দু মন্দিরের আদলের, উঁচু বেদির ওপর দুই স্তরে থামে ঘেরা, ওপরে নব্য ধ্রুপদী নকশায় গম্বুজ। পাথরের ফলকে লেখা রয়েছে নাম Susanna Anna Marial নামটা চেনা লাগে, মনে পড়ে যায় এদেশে আসার পর প্রথম বার ট্যাভার্নে গিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে আলাপের পর সে বলেছিল— ‘এই শহরে দেখার মতো কিছুই নেই, কেবল দুটো ঐতিহাসিক সৌধ আছে। একটি পাথরের আরেকটি রক্তমাংসের। পাথরেরটি দু পা হাঁটলেই দেখতে পাবে রু দ্য বেনারসের ধারে, সাত সাহেবের বিবির কবর। রক্তমাংসেরটি দেখার জন্য কোথাও যেতে হবে না, এখানেই তিনি এসে পড়বেন একটু পরেই। তিনি মঁসিয়ে পিয়ের লাহুস, লিজ-দ্য-নর।’
ধনী ওলন্দাজ বিধবা সুজানা আনা মারিয়ার নাকি প্রেমিক ছিলেন পিয়ের লাহুস, এবং তিনিই একমাত্র সেই মোহিনীর আলিঙ্গনের নাগপাশ থেকে বেঁচে ফিরে আসেন। তার আগে দুই স্বামী ও পাঁচজন প্রেমিকের কেউই বাঁচেনি। প্রচুর ধনসম্পত্তি রেখে মারা যান সুজানা, মৃত্যুর অনেক আগেই ভেনিস থেকে স্থপতি আনিয়ে কবরের সৌধের নক্শা তৈরি করান। লোকমুখে সাত সাহেবের বিবির কবর। এদিকটায় কেউ মাড়ায় না, কারণ এখনও নাকি সুজানার অতৃপ্ত আত্মা গোরস্তানের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। একাকী পুরুষ দেখলে তাকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে মারে। শার্ল কোয়ার্সভিলে আসার দুবছর আগে এক তরুণ ফ্যাক্টরের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল ওই সৌধের দোতলায়।
এসবই শার্ল জেনেছে ক্ল্যারেটের আবেশে আকীর্ণ ট্যাভার্নে বসে। কিন্তু বিকেলের পড়ন্ত আলোয় প্রাচীন বট পিপুলের ছায়ায় জায়গাটা নিজের চোখে দেখে কেমন স্নিগ্ধ মায়াময় মনে হয়। এখানে দু-দুটি প্রজন্মের পুরুষেরা শায়িত আছে মাটির নীচে। তাদের চিহ্ন মুছে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরেও মাটি থেকে উঠে আসে হিম, যেন মৃতদের স্মৃতিলোপী হিমবাহ শ্বাস। ঝাপসা এপিটাফগুলো পড়ার চেষ্টা করে সে, টুকরো টুকরো তথ্য আর স্থান কালের উল্লেখ সাজিয়ে মনে মনে মৃতদের কাহিনিগুলো বোনে, কখনো কল্পনা করে এরই মাঝে তার নিজের কবর— এই সবুজ ছায়া, এই আর্দ্র মাটির শ্বাস, পাথরের গায়ে লাইকেন ছেয়ে আসা সময়ের গাঢ় চিত্ররূপ।
একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ কানে আসে, প্রথমে মনে হয় বাংলোর চালে মৌচাকের মতো। ঝুপসি কাঁঠালগাছের ওপাশ থেকে আসছে শব্দটা, ঢেউয়ের মতো উঠছে নামছে, যেন কুলকুল ঝোরার ধ্বনি, কিংবা কুলোয় শস্য ঝাড়া হচ্ছে। আকন্দের ঝোপ ঠেলে ঢালু দিয়ে নেমে কাঁঠালগাছের ওদিকটায় যেতেই চোখে পড়ে খোঁড়া কবরের মাটি, নুড়িপাথরের ওপর পড়ে আছে এক নারীর শব, গলস্ত, শূন্যে উদাসীন দুটি পা তোলা, উদর ফেঁড়ে নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছে। বিকট বাষ্পে ভরে আছে জায়গাটা, শ্বাস নিতে মাথা ঘুরে যায়। খোলা আকাশের নীচে অস্তগামী সূর্যের তেরছা লাল আলোয় দেহটা পড়ে আছে নারকীয় ফুলের মতো ঝাঁকে-ঝাঁকে মাছি পচে ওঠা গলা জঠর ছেয়ে আছে, কালো স্রোতে সপ্রাণ ঢেউয়ের মতো কৃমির সৈন্যদল, সব মিলিয়ে আশ্চর্য জীবন্ত হয়ে আছে।
ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে একটা কুকুরী রুষ্ট চোখে শার্লকে দেখে, অপেক্ষা করে। কেরেস্তান গোরস্তানের ভেতর দিয়ে ফিরে যাবার সঁড়িপথ ধরে সে।
খানিকটা পথ যাবার পর শুকনো পাতার মচমচ্ শব্দে ঘাড় ফেরাতে দেখে একটি কৃষ্ণবর্ণ মেয়ে। এক টুকরো সাদা কাপড় তার কোমরে জড়ানো, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, হেঁতাল পাতার ঝাঁটা হাতে সৌধের চারিধারে ঝরা পাতা ডাঁই করছে। শার্ল চেয়ে থাকে ওর দিকে, চোখাচোখি হয় একবার। কালো মুখে শান্ত সাদা একজোড়া চোখ, নিস্পৃহ অথচ সতর্ক। খুব ধীরে ধীরে, মাটির নীচে মানুষগুলোর সম্মিলিত সময়ের ভারে যেন বা শ্লথগতি, মেয়েটি ঝরা পাতা গর্তের ধারে এনে জমা করে, অগ্নিসংযোগ করে। এক হাতে চোখ ঢেকে ধোঁয়া থেকে আড়াল করে, অন্য হাতে লম্বা লাঠি নিয়ে লকলকে আগুনের শিখায় পাতার স্তূপ উলটে দিতে থাকে।
আলো কমে আসছে, তাপবাষ্পে দুলছে মেয়েটির মরীচিকাবৎ দেহ। গোধুলির পীতাভ আলোয় তার মাথার ওপর মশার ঝাঁক লম্বা মুকুট সৃষ্টি করেছে। একটি দুটি চামচিকে উড়ে উড়ে এসে তাদের শিকার করছে।
যেন মৃত্যুর দেবী সে।
.
দিন কয়েক কেরেস্তান গোরস্তানে যাতায়াত করে শার্ল সাত সাহেবের বিবির সৌধের পেছন দিকে পাকুড় গাছের আড়ালে তালপাতার এক অদ্ভুতাকৃতি গোলাকার কুঁড়ে দেখতে পেল। এই রকম কুঁড়ে এই অঞ্চলে দেখা যায় না। সামনে নিকানো উঠোন, বেঁটে কাঠালগাছে বাঁধা একটি ছাগী, পোড়ামাটির পাড় দেওয়া কুয়ো।
একদিন পড়ন্ত বিকেলের আলোয় শার্ল ভালো করে দেখল ওকে: সাদা বস্ত্রখন্ড কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত নেমেছে, লম্বা চুল একটি মাত্র বিনুনিতে বাঁধা, গোড়ালিতে মোটা ধাতুর মল, ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। প্রতিদিন সে ঝাঁট দিয়ে শুকনো ডালপাতায় আগুন ধরায়, মাথার ওপর মশার মিশরীয় মুকুট, টানা চোখ অপাঙ্গে দেখে, মুখের আদলে ফোটে পিরামিডে আঁকা নারীর মুখের প্রোফাইল।
কখনো আরেকজন নারীকে দেখা যায়। এক বৃদ্ধা, মুখভর্তি বসন্তের দাগ। দেখে মনে হয় মেয়েটির দিদিমা। দিন ফুরিয়ে আসার পর নীলাভ আলোয় ডেরার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে শার্ল দেখে, কুয়োর ধারে পা ছড়িয়ে বসেছে সে, আর বৃদ্ধা বালতিতে জল তুলে ওর মাথায় ঢালছে। বিস্ফারিত রাত্রির ভেতর গলে মিশে যাচ্ছে মেয়েটি, রাতে-ফোটা ফুলের প্রস্ফুটনের ধীর সময়ে, পাথরের সৌধের গায়ে দেবদূতের দল অন্ধ, শ্যাওলাকীর্ণ চোখ মেলে রয়েছে।
*
ভাগনে এদেশে আসার পর এতগুলো বসন্ত কাটল কিন্তু এখনও সে কার্টুনিডাঙায় পা রাখেনি, চিনিকলে যুবতী কামিনদের গায়ে হাত দেয়নি। একটু চিন্তিতই ছিল অগস্টিন দুফে। এতদিনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, জুলি ডিলিমাকে ডেকে পাঠাল।
জুলির অজ্ঞাতসারে ফিরিঙ্গিডাঙার কোনো গাছের একটি ফুলও খসে না, একটি মেয়েও কুমারীত্ব হারায় না। তার নিজের যৌবন অস্তাচলে যাওয়ার সঙ্গে তাল রেখে প্রতিপত্তি বেড়েছে। জুলি ডিলিমার দুই হাতের আঙুলে আশ্চর্য জাদু, দেহের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে সব রকমের ফিক ব্যথা, মচকানো ব্যথা, গেঁটে বাতের ব্যথা, প্রবাসে নির্বাসনের ধুকধুকে ব্যথা, ঈর্ষার চিনচিনে ব্যথা, পরনারীর জন্য টনটনে ব্যথার নিরাময় জানে সে। কোয়ার্সভিলের বাংলোয় ভিলায় ঘন ঘন ডাক পড়ে তার।
দিন সাতেকের মধ্যে খবর বয়ে আনল জুলি। লাউঞ্জ চেয়ারে এলানো দুফের পেছনে দাঁড়িয়ে সাহেবের ঘাড়ে মাথায় চরকি-চম্পি মালিশ দিতে দিতে বললো-
‘কেরেস্তান গোরস্তানের ওই বুড়িটা বোবা, নাম উমাপেনু। ক্লুনির মঠের খাতায় তাই লেখা আছে। মেয়েটি ওই বুড়ির নাতনি। দাস ব্যবসা লাটে ওঠার সময় মঠের নানরা যে দলটাকে নিয়ে আসে, ওরা ছিল তার মধ্যে। তার আগে এখান থেকে স্লেভারে চেপে মালাবারে গিয়েছিল বুড়ি। তখন ভরা যুবতী, পেটে নাকি বাচ্চা ছিল। নিজেই আগ বাড়িয়ে গিয়েছিল, কেউ ধরে নিয়ে যায়নি। সাতগাঁ তখন গুটি বসন্তে উজাড় হচ্ছে। তার ছোবল থেকে রক্ষে পায়নি, কিন্তু প্রাণেও মরেনি। কফি খামারে গিয়ে মেয়ে বিয়োয়। এরপর যা হয়, মা মেয়ে দুজনেই খামারে ওভারসিয়ারদের বিছানায় বিছানায় ঘুরতে থাকে। সেই মেয়ের পেট ফুলল, বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে ম’ল। এই হলো সেই কফিখামারের মেয়ে, বাপের ঠিক নেই।’
‘ম্যানিফ্যিক্! তুই একটি রত্ন রে জুলি!’ দুফে বলে। চরকি-চম্পির আরামে তার চোখদুটো বুজে এসেছে, চিবুকের থলি ঝুলে পড়েছে বুকের ওপর। ডান হাতে তর্জনি আর বুড়ো আঙুলের মাঝে চিকচিক করে একটি রুপোর মুদ্রা, বাঁ হাতটা জুলির স্কার্টে-ঢাকা শিথিল নিতম্বে মাথা কোটে।
‘আমায় তো তুমি জলে ফেলেছ ম্যসিয়ে, এখন আর সোহাগ দেখিয়ে কী হবে?’ রুপোর টাকাটা ছিনিয়ে নিয়ে ঝটিতি সরে যায় জুলি, কপট রাগে ঠোঁট উলটোয়। ‘কিন্তু জলে পড়েও এই জুলি ডিলিমা ডুবে মরেনি। অনেক ঘাটের জল খেয়ে ভেসে রয়েছে!’
দুফে ফের চোখ বুজে ঝিমুনির ভান করে। অনাবৃত ঘাড়ে চর্বির পরতে জুলি ডিলিমার আঙুল চলে, জিভ চলে সেই সঙ্গে—
‘দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলো, যে যে এলাকা থেকে ক্রীতদাসীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ক্লুনির মঠের নানরা তাদের সেসব জায়গায় ফিরিয়ে দিল। কিন্তু উমাপে তার পুরোনো বসতিতে ফিরতে চাইল না। গুটি বসন্তে সব উজাড় হয়েছে, কোথায় যাবে? থাকলেই বা কে ওদের ঘরে তুলবে? দুজনকে তাই দীক্ষা দিয়ে মঠে নেওয়া হলো বটে, কিন্তু মালাবারের সেই কফিখামারের পুরোনো অভ্যাস ছাড়ানো গেল না। বুক খোলা রেখে কোমরে কাপড় ঝোলায়, গাছপাথরের দেবতা পুজো করে। রবিবার চাল-ডাল-আলু নিতে মঠে যায় কিন্তু প্রার্থনা করে না। শহরের বাইরে কবরখানায় ওদের কাজ দিয়ে রাখা হয়েছে। হাফ-ফিরিঙ্গি আত্মহত্যা আর বিবাহবহির্ভূত জাতকদের শব গোর দেওয়া হয় ওদিকে। অনেকে গরীবগুর্বো, গোরের ওপর পাথর বসানোর টাকা জোগাড় করতে পারে না সহজে। ততদিন ওই বুড়ি আর তার নাতনি বাঁশ-কাঁটার বেড়া দিয়ে শেয়ালের থেকে বাঁচিয়ে রাখে।’
বাংলোর বারান্দায় জুলির মুখোমুখি পড়ে যায় শার্ল। মামার প্রাক্তন রক্ষিতা ভাগ্নের ওপর অধিকার বশে তার থুতনি ছুঁয়ে উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দেয়।
‘তুমি চিন্তা কোরো না বাছা। যে ফুল তোমার মনে ধরেছে আমি ঠিক তুলে এনে দেব। সেজন্য আমার হাতে একটু আধটু কাঁটা ফুটলেই বা কি!
কোনো এককালে আকর্ষণীয়া ছিল জুলি, সময় আর ভাগ্য তার সর্বাঙ্গে থাবা বসিয়েছে। চড়া প্রসাধন সত্ত্বেও ওকে দেখলে, ওর কথা শুনলে শার্লের মনে পড়ে যায় জন কীটস নামে এক ইংরেজ কবির দ্য ইভ অফ সেন্ট অ্যাগনেস কবিতাটিতে সেই বুড়ি দাসীর কথা, যে প্রেমিক পরফিরোকে ম্যাডেলিনের শোবার ঘরে আলমারির ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল, যাতে ওরা মিলিত হতে পারে। শীতরাত্রে কামজর্জর পরফিরোর মতোই দশা হলো কি তারও?
.
বনফুল তুলে আনতে মোটেই বেগ পেতে হলো না জুলি ডিলিমার; হাতেও কাঁটা ফুটল না। চিনির ব্যবসায় লাভের মুখ দেখার পর বিভিন্ন দাতব্য প্রকল্পে দানধ্যান করে দয়াবান ক্রিশ্চান হিসেবে সমাজে নাম কিনেছে দুফে। জুলিরও মঠের ব্যবস্থাপকদের ঘরে এককালে যাওয়া-আসা ছিল, তার কথা ফেলতে পারে না কেউ। সেই সুতো ধরে এক রবিবার উমাপেনুকে পাকড়াও করল। সপ্তাহের বরাদ্দ রেশন নিতে এসেছিল সে, নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে। শহরে ঢোকার আগে বুকের ওপর গির্জার দান চেককাটা র্যাপার জড়িয়েছে।
‘শোনো বুড়ি, তোমার জন্য সুখবর আছে,’ জুলি বলল। ‘গোরস্তানে পড়ে থেকে আর কবর পাহারা দিতে হবে না। তোমার বয়স হচ্ছে, এখন থেকে এই মঠের চার দেয়ালের ভেতর আরামে থাকবে। তবে বুক ঢেকে রাখতে হবে কিন্তু। বিলেত থেকে কাপড় ধোবার কল এসেছে, সেই কল চালিয়ে নানদিদিদের কাপড় কাচবে। গতর না নাড়িয়ে দিব্যি তিন বেলা খাবার পাবে।
মূক উমাপেনু অবাক বিভ্রান্ত চোখে চেয়ে থাকে, জুলির কথা শোনে। ওর মুখে দেখে বোঝা যায় না এই সংবাদে সে খুশি না হতাশ। হাত বাড়িয়ে নাতনিটাকে টেনে নেয়।
‘ওই তোমার বুঝি নাতনি? জুলি এমনভাবে তাকায় মনে হয় যেন মেয়েটির অস্তিত্ব তার এই প্রথম গোচরে এল। ‘এখনই মঠের ভেতরে ওর জন্যে কোনো কাজ নেই বাপু। পরে হবে। আপাতত কিছুদিন কাছেই এক সাহেবের বাংলোয় কাজ করতে হবে। হালকা ফাইফরমাশ খাটার কাজ, কবরখানার মতো খাটনির কাজ নয়। আর সাহেবও খুব ভালো মানুষ, সচ্চরিত্র আর ধর্মভীরু প্রায় যাজকই বলা যায়। ও রোজ এসে তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে, তুমিও ইচ্ছে হলেই বাংলোয় যেতে পারবে।’
‘যাজক’ কথাটা উচ্চারণ করার পর ঠোঁট কামড়ে ধরে জুলি। জীবনে যত রকমের যাজক সে দেখেছে, বেদিতে এবং বিছানায়, তাদের কথা মনে পড়তেই পেটের মধ্যে থেকে ভুসভুসে হাসি উঠে আসে।
উমাপেনুর সেটা চোখে পড়ে না। জীবনের সায়াহ্নে এসে কোনোরকম বিভ্রম নেই তার। স্বেচ্ছায় দাসত্ব গ্রহণ করেছিল সে কোনকালে, মনে হয় যেন গতজন্মে। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হবার পর কিছুদিন সে ছিল জোয়ালমুক্ত ঘানির বলদের মতো বিহ্বল, সম্বলহীন। সুদূর মালাবারের কফি খামার থেকে বাংলায় ফিরে এল, মঠের বদান্যতায় লোকসমাজের বাইরে গোরস্তানে কাজ পেল। সে জানে জীবন অনিত্য, পূর্বনির্ধারিত কিছু নেই; জানে, যৌনসঙ্গমের কালে পুরুষ সর্বত্রই একই রকমের অন্ধ আর নির্বোধ; এবং শেষ পর্যন্ত জানে, তার জীবনের একমাত্র দায় নাতনি গাঙীর ভবিষ্যৎ সিস্টার্স দ্য ক্লুনি মঠের সাদা গাউন-পরা সন্ন্যাসিনীদের হাতে আছে। পূর্ণিমা অমাবস্যায় পিপুল গাছে লাল সুতো-জড়ানো দেবতার কাছে, রবিবার মঠের চ্যাপেলে কাঠের পাটায় গাঁথা ফিরিঙ্গি দেবতার কাছে নিরুচ্চারে প্রার্থনা করে উমাপেনু – গাঙীর জীবন যেন ওর চেয়ে অন্যরকম হয়, ভালো আর সুস্থির হয়। যদিও সেই ভালোটা যে ঠিক কী সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই।
এপ্রিলের এক সকালে গাঙীকে নিয়ে বাংলোয় এল জুলি ডিলিমা। গাঙীর পরনে গোলাপি শাড়ির ওপর মঠের দেওয়া নতুন চেককাটা শেমিজ, চোখে ত্রস্ত চাহনি।
ভালো করে গোঁফ ওঠার আগেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহরের সবকটি গণিকালয়ে পায়ের ধুলো পড়েছে ভাগ্নে-রত্নটির, সে খবর সাত সমুদ্র দূরে মামার কানে এসে পৌঁছেছে। এই রোগা আড়ষ্ট ক্রীতদাসীর মেয়ের মধ্যে ঠিক কী খুঁজে পেল, ভেবে তল পেল না অগস্টিন দুফে। নীচু স্বরে জুলিকে জিজ্ঞেস করে
‘এই তো? তুই ঠিক মাল এনেছিস?’
সোনার মোহর কামড়ে পরখ করে উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠে জুলি ডিলিমা।
‘সেটা তোমার ভাগ্নেটিকেই জিজ্ঞেস কর না? কেমন ফাঁদে-পড়া পাখির মতো মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে দেখছ না? তুমি তো কোনোকালে আমার দিকে অমন করে তাকাওনি, সাহেব।’
সশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুলি।
