সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৮.২
৮.২
গ্রীষ্মের ছুটির পর ইস্কুল খুললে রঘুনাথপুরে ফিরে বাপ্পা আবিষ্কার করল, বাবার বাঁ হাতের রঙ ডান হাতের তুলনায় ঘোর কালো, মনে হবে যেন দুটি ভিন্ন মানুষের। প্রবল তাপপ্রবাহের মধ্যে একটি জলপাই-সবুজ মাহিন্দ্রা জিপে চড়ে সারাদিন ব্লকে ব্লকে ঘুরে বেড়িয়েছে মানুষটা; চালকের পাশে বসে সারাক্ষণ বাঁ হাতে দরজার মাথায় হাতল ধরে থাকার পরিণাম। তাছাড়া সেই চেনা ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশনের গন্ধটাও আর পাওয়া যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুরুলিয়ার খনিজ মিশ্রিত ভৌম জলে রথীনের স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছিল, প্রথম যৌবন থেকে পোষ্য অ্যাসিড রিফ্লাক্স, যা তার ও শিউলির বিবাহ যোগ ঘটিয়েছিল, প্রায় সেরে গিয়েছিল।
সাতগাঁয়ে যাবার আগে যেসব গাছের চারা বসানো হয়েছিল, সেসবই শুকিয়ে ঝলসে গিয়েছে। বাংলোর পেছনদিকটায় বেশ অনেকটা জমি। সেখানে কয়েকটি পলাশ, বাবলা ও একটি কাঠাল গাছ ছাড়া আগের কোনো বাসিন্দার লাগানো গোলাপ বুনো ঝাড় হয়ে আছে। বর্ষার জল পেয়ে মাটি সরস হতেই শিউলি সহজাত উদ্যমে পুরুলিয়া শহরে সরকারি নার্সারি থেকে গাছের চারা আনিয়ে লাগাতে শুরু করল। তার সবুজ আঙুলের ছোঁয়ায় বিশুষ্ক ঘুমন্ত বীজ অঙ্কুরিত হয়, মাটি ফুঁড়ে ওঠে, পাতা বেরোয়, ফুল আসে, এমনকি প্রজাপতি মৌমাছি উড়ে এসে পরাগসঞ্চার ঘটায়। কিন্তু এই রুক্ষ প্রবল জলহাওয়া আর কাকরে মাটিতে ফুল অথবা সব্জির গাছ তেমন হয় না, তাই সে পেয়ারা আতা ও অন্যান্য ফল গাছের চারা লাগায়। এ অনেকটা গীতার— ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’ মন্ত্র মেনে চলার মতো, তার কারণ গাছে ফল আসা তো দূর, গাছগুলো বড়ো হয়ে ওঠার আগেই যে রথীন ফব অন্যত্র বদলি হবে, শিউলি সেটা ভালো করেই জানে। তবু মাটি হাতে নিয়ে গঘাঁটি করা, আঙুলে আর্দ্র শিকড়ের অনুভূতি আর খুঁড়ে-তোলা মাটির গন্ধের নেই এসব করে সে।
বাংলোর বসার ঘরের দেয়ালে ব্রিটিশ আমলের সাহেব অফিসার ও তার মেমসাহেবের কয়েকটি সাদাকালো ছবি রয়েছে। ঝাপসা, কালচে ছোপ ধরা, যেন বহুকালের ছায়া ছুপিয়ে দিয়েছে। একটি ছবিতে এক বিশাল বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে সাহেব দম্পতি, দুজনেরই পরনে খাকি শার্ট-ট্রাউজার্স, হাটু অব্দি জুতো, মাথায় সোলার টুপি। মেমসাহেবের গলায় একটি সাদা স্কার্ফ, সাহেবের হাতে একটি রাইফেল। তাদের পায়ের সামনে একটি বিশাল মৃত বাঘ।
এ-এস-আইতে সার্ভেয়ারের কাজ করার সময়ে রথীনের ঠিক ওইরকম একটি সোলার টুপি ছিল, বাপ্পা ছোটোবেলায় কলুটোলা লেনের বাসায় দেখেছে। শিকারের ওই ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে চেষ্টা করে ওই সাহেব মেমের জায়গায় যদি ওর বাবা আর মা থাকত? তাদের পরনে ঠিক অমন ঘোড়ায় চড়ার পোশাক, ঠিক ওইরকম আত্মবিশ্বাসের ভঙ্গিতে ক্যামেরার দিকে তাকাতো যদি?
কিন্তু অনেক কষ্ট করেও কিছুতেই সে ছবিটা কল্পনা করতে পারে না। বুকটা কেমন ভারি হয়ে আসে। ছবির ওই পুরোনো সাদাকালো সময়টা যে চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পেরে কেমন একটা কষ্ট হয়। এই জায়গাটা আর ওইরকম বন্য, উত্তেজক, গল্পের বইয়ের জগতের মতো নেই—কেমন যেন শুষ্ক, আটপৌরে, ম্রিয়মাণ।
যেকোনো পুরোনো সরকারি বাংলোর মতো এখানেও বিভিন্ন সময়ে বাসিন্দাদের রুচি ও অভ্যাসের ছাপ পড়েছে। বেডরুমের লাগোয়া লিকার ক্যাবিনেট বদলে পুজোর কুলুঙ্গি হয়েছে, সব্জির বাগান খুঁড়ে ব্যাডমিন্টন কোর্ট, যা ফের ওর মায়ের আঙুলের ছোঁয়ায় ক্রমশ অন্যরকম সবুজ হয়ে উঠছে। এক দুপুরে বাপ্পা বাথরুমে ফ্লাশ টানার উঁচু ধাতব জলপাত্রটার পেছনে আবিষ্কার করল এক গোছা বিলিতি পত্রিকা। তাদের পাতায় পাতায় নগ্ন অর্ধনগ্ন নারীদের রঙীন ছবি, তাদের কারোর গায়ে উল্কি, কারোর স্তনের বোঁটায় দুল, মাথায় ও পায়ের ফাকে লাল সোনালি চুল। বাপ্পা টের পাচ্ছিল এগুলো ঘোর নিষিদ্ধ বস্তু, কিন্তু মলাটে আর ভেতরেও ওর নিজের ছবির বইয়ের মতো খরগোশ আঁকা, আর গোটা হরফে লেখা PLAYBOY। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই শিউলি এসে ছোঁ মেরে ওগুলো কেড়ে নিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা রথীন অফিস থেকে ফেরার পর বাপ্পা ভেজানো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দুরু দুরু বুকে শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু রথীনের গলায় কয়েকবার— ‘প্লেবয়’ শব্দটা শুনল কেবল, আর অট্টহাসি। শাস্তি হলো না।
অফিস থেকে সন্ধ্যাবেলা ফিরে রথীন শোবার ঘরে একা হুইস্কির গ্লাস হাতে নিয়ে বসে, দরজা ভেজানো থাকে। এই সময় ওই ঘরে বাপ্পার প্রবেশাধিকার নেই, বাবার গায়ে পুরোনো ফাইলের গন্ধের আড়ালে চাপা পড়া সকালের ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশনের গন্ধের রেশ খুঁজে নেবার কোনো উপায় নেই। হুইস্কির বোতল যে ঠিক কোথায় রাখা থাকে, বাপ্পা জানতে পারে না (ঠিক যেমন জানতে পারেনি বাবার সার্ভিস রিভলভারটা কোথায় রাখা থাকত)। শোবার ঘরে মৃদু আলোয় রথীনের একা থাকার এই সময়টায় রেডিও বাজে। সুচিত্রা মিত্র আর দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেজানো দরজা চুঁইয়ে বাপ্পার পড়ার টেবিলে ভেসে ভেসে এসে বহু যুগের ওপার হতে প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে গোধূলি গগনে মেঘে আকাশ ভরা সূর্য তারা, এবং কোলাহল তো বারণ হলেও, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসলেও, খাবার টেবিলে বসে রথীন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, শান্ত ও দায়িত্ববান। বাপ্পার লেখাপড়ার ব্যাপারে খোঁজ নেয়, শিউলি ঠিক মতো ওষুধ খেয়েছে কি না খোঁজ নেয়।
এই সময়েই শিউলির অসুখটা শুরু হয়েছে, প্রথম দিকে যার লক্ষণগুলো ছিল অম্লশূলের মতো।
অনেক বছর পরে বাপ্পা সেই অতীত সময়ের দিকে ফিরে তাকাবে। ভাবার চেষ্টা করবে, স্রোতের বিপরীতে মাথা তুলে সাঁতার কাটার মতো একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে রথীনের শক্তির উৎস ঠিক কী ছিল? সে কি ওই দেবব্রত সুচিত্রার কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওই লাইনগুলোর মধ্যে কোথাও ছিল? দেশভাগের খোলামকুচি হয়ে কলকাতায় গড়িয়ে আসা, নিজের পরিশ্রমে মেধায় প্রতিষ্ঠিত এক যুবকের মধ্যে একদা রামপ্রাণ যে হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রের পরিভাষায় কার্বোনিক ধাতের প্রাবল্য লক্ষ করেছিলেন পরিণত মস্তিষ্ক, মজবুত শিরদাঁড়া, যথাস্থানে হৃৎপিন্ড (কিংবা হৃদয়)–সেই ধাতের জন্য চাকুরিস্থলে রথীনকে গুনাগার দিতে হচ্ছিল। তার স্ত্রী পুত্রের জীবনও বিপর্যস্ত হচ্ছিল।
একই ক্যাডারের অন্যান্য অফিসারেরা যখন এক জায়গায় অনেকদিন থিতু হয়ে থাকে, তখন রথীনের ঘন ঘন বদলি এবং ঠাঁই বদলের ঝক্কি পোয়াতে হয় শিউলিকেই। বারবার জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা, স্থানান্তরণ, নতুন জায়গায় গিয়ে গুছিয়ে বসতে-না-বসতেই, সেখানে চাকর পিওন ঠিকে কাজের লোকের চালচলন বুঝে ওঠার আগেই আবার ঠিকানা বদল যাকে চিনি ঠাট্টা করে বলে— ‘লিভিং আউট অফ দ্য স্যুটকেস’ সর্বদাই চারিদিকে প্যাকিং বাক্স, এবং প্রয়োজনের জিনিসটি কোন বাক্সে আছে খুঁজে না-পাওয়া। এসব নিয়ে শিউলি অনুযোগ করলে রথীন উদাসীন ভঙ্গিতে বলে—
‘ব্রিটিশ আমলে আইসিএস-রা যখন বদলি হতো, এমনকি যখন ট্যুরেও বেরোতো, আসবাবপত্র, বাসনকোশন, এমনকি সাহেবের গড়গড়া, মেমসাহেবের বাথরুম স্লিপারটি পর্যন্ত ঠিক একই রকম দুই জোড়া করে থাকত। এক হল্ট থেকে অফিসার বারো মাইল দূরে পরের হল্টে পৌঁছানোর আগেই লোকলস্কর গিয়ে তাঁবু সাজিয়ে ফেলত। সাহেব-মেম ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে দেখত অবিকল একই রকম তাঁবু, একই রকম ক্যাম্প টেবিলে সাজানো কাটলারি আর ধূমায়িত স্যুপ, এমনকি খাটের পাশে ছোটো বুক শেলফে একই বইয়ের কপি। কিন্তু আমি তো আর সেই আমলের হেভেন-বর্ন অফিসার নই। কী আর করবে বলো?’
এই ঘন ঘন ঠাঁই বদলের ক্ষেত্রে বাপ্পার সবচেয়ে বড়ো আতঙ্ক হলো মাঝরাতে প্রস্রাব পেলে অন্ধকারে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমের দরজা খুঁজে পাওয়া। ঘুমোতে যাবার আগে একটা ভয় তাড়া করে, যদি খুঁজে না পায়? যদি ঘরেই কিংবা এমনকি যদি বিছানাতেই হয়ে যায়? রামকানাই ইস্কুলে যেতে শুরু করেছে, কিন্তু সে নিয়মিত বিছানা ভেজায়। রামপ্রাণের ওষুধে কাজ হয়নি, রাধানগরের সেই ওঝানির নদীবাহিত টোটকা প্রয়োগ করেও সরোজা রোগ সারাতে পারেনি।
আর যে ব্যাপারটা বাপ্পাকে বিচলিত করে, তা হলো নতুন ইস্কুলে গিয়ে ক্লাসঘরে সম্পূর্ণ অচেনা ছেলেমেয়েদের মাঝে গিয়ে বসা, একেবারে সামনের বেঞ্চিতে বসা, শিক্ষকদের ওকে— ‘তুমি’ করে সম্বোধন, এবং সহপাঠীদের মধ্যে থেকে নতুন বন্ধু খুঁজে পাওয়ার পরে-পরেই ইস্কুল ছেড়ে যাওয়া।
আর এসবের মাঝে সাতগাঁ হলো বাপ্পার জীবনের সেই কেন্দ্র যেখানে সে ফিরে যেতে পারে, যা বাবা-কাকাদের ছেড়ে আসা সিলেটের মতো স্মৃতির অলীক স্বদেশভূমি নয়। মানচিত্রে নির্দিষ্ট একটি স্থান যেখানে থাকে তিতলি, যেখানে থাকে দিদা, বিশুকা, হেমন্তমামা, বসন্তমামার হার্লে, চিন্তামণি …
যেখানে থাকে আরেকটা বাপ্পা, যে জন্মজন্মান্তরে কখনোই সাতগাঁ ছেড়ে যায় না, এবং এই পরিযায়ী ঠাঁই-নাড়া বাপ্পা বড়ো হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে বুকে গলায় নীলচে জন্মদাগটার মতোই।
*
রঘুনাথপুরের এসডিও সাহেব ঘুষ নেন না, এই খবরটা যেমন দ্রুত ছড়িয়েছিল, ততোটাই ছড়িয়েছিল রুক্ষ্ম পাথুরে মাটিতে সাহেবের স্ত্রীর বাগান করার শখ। পাথর খাদানের এক ঠিকাদার শিউলির জন্য দুষ্প্রাপ্য গাছগাছড়ার চারা যোগাড় করে পাঠায়। লোকটি সুবিধার নয়, ওর বিরুদ্ধে নানারকমের দুর্নীতি আর আইনভঙ্গের অভিযোগ আছে। কিন্তু এই চারা পাঠানোর ব্যাপারে রথীন বাধাও দিতে পারে না। বনে জঙ্গলে ঘুরে খুঁজে-আনা উদ্ভিদকে আর যাই হোক উৎকোচ বলা যায় না। বিশেষ করে যখন পুরুলিয়ার উষর জমিতে সবুজায়নের সরকারি প্রকল্প চলেছে রথীনেরই উদ্যোগে। তাছাড়া গাছগাছড়ার ব্যাপারে শিউলির প্রবল আগ্রহ, আদিরামবাটির ওষধিবাগানের প্রতি টান সে নিজে চোখে দেখেছে।
একদিন রথীন অফিসে বেরিয়ে যাবার পর সেই ঠিকাদার স্বয়ং বাড়িতে এল, হাতে একটি বড়ো শোলায় মোড়া বাক্স। বাক্স খুলে বেরোলো একটি তিন কিলো সাইজের ইলিশ। তার চওড়া পেট বরাবর লাল দাগ, গা থেকে বরফের ভাপ উঠছে। জানালো, রাতের এক্সপ্রেস ট্রেনে আইসবক্সে সরাসরি কলকাতা থেকে এসেছে।
উদ্ভিদের প্রতি শিউলির দুর্বলতা রটেছিল। কিন্তু এই আরেকটি দুর্বলতার খবর কী করে যে জানাজানি হল সে এক রহস্য। রঘুনাথপুরে তো বটেই, পুরুলিয়া সদর বাজারেও টাটকা ইলিশ মেলে না। এই নিয়ে শিউলির আক্ষেপ ছিল। এখানে ছিটেফোটা বর্ষার মরশুমে খাবার টেবিলে প্রায়ই সে গল্প করে এই সময় আদিরামবাটিতে দুবেলা ঝালে-ঝোলে-অম্বলে অঢেল ইলিশের কথা, সরস্বতীতে মেছো নৌকার গল্প যা প্রায় পয়ারের মতো, যা বাপ্পা শৈশবকাল থেকে কতবার যে শুনেছে:
ও কত্তা, আছে নাকি?
না গিন্নি, নেই!
সেদিন বিশাল আকারের ইলিশে প্রতিফলিত আলোয় মায়ের চোখ চিকচিক করে উঠতে দেখল বাপ্পা। আরেকবার শুনল সেই রসিক জেলে আর ইস্কুল বালিকার চাপান-উতোর। সন্ধ্যাবেলা রথীন অফিস থেকে ফিরল যখন, বাংলোর বাতাস ইলিশের গন্ধে ম ম করছে। পোশাক বদলে সে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা ভেজাতে প্রৌঢ় বাংলো পিওন অজিতদা সাহেবের জন্য নিয়মমাফিক হুইস্কির বোতল, সোডা, গ্লাস আর বাদাম ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকল। তার পিছু পিছু ঢুকল শিউলি, হাতের প্লেটে দুটি সোনালি করে ভাজা ইলিশের পেটি, মুখে বিচিত্র উদ্ভাস। পাশের ঘরে ভেজানো দরজার ওপাশ থেকে বাপ্পা শুনতে পাচ্ছিল মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠে সেই আশ্চর্য রকমের বড়ো ইলিশের বর্ণনা, শুনতে পাচ্ছিল কন্ঠস্বর ক্রমশ উচ্চগ্রাম থেকে খাদে নামছে, নামতে নামতে একসময় থেমে গেল।
শ্রোতার মুখের অভিব্যক্তি ক্রমশ বদলে যেতে দেখে নীরব হয়ে পড়ল শিউলি। রথীন হুইস্কির গ্লাস নামিয়ে রাখল, তারপর উঠে করিডোরে গিয়ে সেই ঠিকাদারকে টেলিফোন করে বরফের মতো ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল—অবিলম্বে–‘ইসি ওয়াক্ত পর’–সে যেন কাউকে পাঠিয়ে তার দেওয়া বস্তুটি নিয়ে যায়।
এরপর শিউলির দিকে ফিরে ছুরির মতো স্বরে কেটে কেটে বলল—‘ক্রিশ্চান ধর্মে নোলা একটা পাপ! জানো নিশ্চয়ই? হিন্দু ধর্ম কী বলে? তোমাদের শাস্ত্রীমশাইকে একবার জিজ্ঞেস করো তো?’
ঠিকাদার যে রথীনের জ্ঞাতসারেই ইলিশ মাছটা পাঠিয়েছে বলে সে জেনেছিল, এই কথাটা শিউলি বলে উঠতে পারার আগেই রথীন দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গেল। সেখানে সম্পূর্ণ মাছটা কাটা ও নুন-হলুদ মাখানো রয়েছে সাদা এনামেলের গামলায়, কয়েকটি ইতিমধ্যেই ভাজা হয়ে সাজানো রয়েছে থালায়।
‘এগুলো সব এখনই প্যাক কর! এক্ষুণি!’ রথীন আদেশ দিল।
শিউলি নাকের চারপাশে লালচে আভা, বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটেছে–কাঁপা কাঁপা হাতে টুকরোগুলো বাক্সের ভেতর রাখার চেষ্টা করছে। রথীন দাঁড়িয়ে দেখল কয়েক মুহূর্ত। বাক্সটা আর মাছগুলো ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল, এবং বহু বছর আগে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগে আয়াসলব্ধ বিদ্যা প্রয়োগ করল। হলুদ-মাখানো এবং ভাজা প্রতিটি টুকরো স্বস্থানে গিয়ে বসে নিখুঁত ও বিচিত্র সোনালি-বাদামি ডোরাকাটা ইলিশ মাছের আকার ধারণ করল। কেবল পেটের কাছে দুটি টুকরোর স্থান শূন্য; ও দুটি বাপ্পার পেটে চলে গিয়েছে।
শিউলির প্রতি এই অন্যায্য উষ্মার ক্ষতিপুরণ দিল রথীন। পাঁচদিন পরে সদর বাজারের এক মাছের আড়তদারের মারফৎ কলকাতা থেকে এল চারটি মাঝারি আকারের ইলিশ। এবং এরপর তিন দিন ধরে এবেলা ওবেলা ইলিশ ভাপা, সর্ষে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, ইলিশের মাথা দিয়ে ছ্যাঁচড়া ছাড়াও বিকেলে চায়ের সঙ্গে ইলিশ ভাজা চলল। বাংলোর পিওন, মালি, গাড়ির চালকও সেই মাছের ভাগ পেল। ইলিশে অরুচি ধরে গেল সকলের।
কেবল শিউলি ছাড়া। এক টুকরো মাছও মুখে তুলল না সে। এবং এই ঘটনার পর যে কয়েক বছর বেঁচে ছিল, কোনোদিন আর ইলিশ দাঁতে কাটেনি।
রথীন অবশ্য সেটা লক্ষ করেনি। করার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই বাংলোয় এক অনিশ্চিত উৎকণ্ঠার ছায়া নেমে এল। কালভার্ট নির্মাণে নিকৃষ্ট বালি-পাথর সরবরাহের জন্য সেই ঠিকাদারের মোটা অঙ্কের বিল আটকে দিয়েছিল রথীন, আগের অফিসারের করা চুক্তি বাতিল করেছিল। নানা ভাবে তাকে বাগে আনার চেষ্টা বাতিল হওয়ায় মরীয়া ঠিকাদারের স্বরূপ প্রকাশ পেল, সন্ধ্যার পর ফোন আসতে লাগল বাংলোয়।
বাড়িতে থাকলে সবসময়েই ফোন ধরত রথীন। একদিন সে মেজাজ হারিয়ে স্বভাববিরুদ্ধ চড়া গলায় চেঁচামেচি করতে লাগল। এরপর রথীন না থাকলে বাপ্পার ফোন ধরা নিষিদ্ধ হল, বাংলো পিওন অজিতজেঠুর সঙ্গে হেঁটে ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো, অফিস থেকে গাড়ি পাঠানো হতে লাগল। ঠিক কী ঘটছে সে বুঝতে পারছিল না, কিন্তু বাড়িতে সর্বক্ষণ একটা অস্বস্তিকর দমচাপা পরিবেশ। অফিস থেকে ফিরে রথীনের মদ্যপানের সময়কাল বাড়ছিল, একা খাবার টেবিলে বাপ্পা বাবাকে ইস্কুলের কথা, পড়াশোনার কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিল না। একদিন বাড়ি ফিরে রথীন শোবার ঘরে গিয়ে দেখল শিউলি বিছানায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, পাশে খোলা একটি শাড়ির প্যাকেট একটি শাদা থান আর একজোড়া লোহার নোয়া, বিধবার সাজ। দুপুরবেলায় অজ্ঞাতপরিচয় কোনো ব্যক্তি এসে বারান্দায় রেখে গেছে। পরদিন সকালে বাপ্পা দেখল বাবার অ্যাম্বাসাডারের চালকের পাশে একজন সাদা পোশাকের দেহরক্ষী, তার কোমরে চামড়ার খাপে সার্ভিস রিভলভার।
সেবার দুর্গাপুজোর আগেই রথীনের বদলির অর্ডার এল। এবার উত্তরবঙ্গে ভুটান সীমান্তে। জঙ্গল, চা বাগান, রাভা জনজাতির বাস, বন্য হাতি ও চিতাবাঘের আনাগোনা সেখানে।
.
অনেকদিন বাদে সেবার তিনজনে একসঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনী শোনা হলো না। মহালয়ার ঠিক দুদিন আগে লালবাতি লাগানো অ্যাম্বাসাডারে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় ফিরে এল বাপ্পা। এরপর অনেকদিন . সত্যি বলতে, প্রায় কোনোদিনই আর— ওরা তিনজনে একটানা একই ছাতের নীচে থাকতে পারবে না। বাপ্পার ইস্কুলের পড়াশোনায় ছেদ পড়বে, আগামী তিন বছরের মধ্যে রথীনের ন’বার বদলি হবে, এবং এই ধারা তার গোটা কর্মজীবন ধরেই চলবে।
এবং এসবই তার সেই বিশিষ্ট ধাতের জন্য, যা বহুকাল আগে রামপ্রাণ ডাক্তার নির্ণয় করেছিলেন: কার্বোনিক কন্সটিট্যুশন, অনমনীয় মেরুদন্ড ও সঠিক স্থানে সঠিক মাপের হৃৎপিন্ড। অথবা হৃদয়।
