সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.১
৭.১
বৈশাখের শুরুতে কোনো কোনো দিন সকালের পর থেকেই ছাড়িগঙ্গার বিল থেকে জলীয় বাষ্প উঠে আকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে, ভর দুপুরে সন্ধ্যার মতো ছায়া ঘনায়। চারদিক থমথমে, গাছের একটি পাতাও নড়ে না, একটি পাখিও ডেকে ওঠে না। গভীর অন্যায় সংঘটিত হয়েছে মানুষের দেশে, তারই অভিঘাতে মুহ্যমান প্রকৃতি। তার তাপিত হৃদয় হতে ঝড় ওঠে, আকাশ ভেঙে নামে বজ্রবিদ্যুৎগর্ভ কালবৈশাখী, মরশুমের প্রথম। বিশুষ্ক মাটি ভিজে ওঠে, আমবনে ঝরে সবুজ গুটির আম। এই ঘোর অনাচারের মাঝেও প্রকৃতি অকৃপণ, গাছে গাছে ঝেঁপে এসেছে আম। ভিজে ধুলোর গন্ধ, কচি আমের গন্ধ, সবুজ স্নিগ্ধ আলোয় ভরে ওঠে চারদিক। ছোটোরা আমের বনে আসে, কচি ঝরে-পড়া আমে কোঁচড় ভর্তি করে নেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওরা আসছে।
বনপথে বিছিয়ে আছে ভিজে পাতা, গাছের আড়ালে একটা কোকিল ডাকছে, ঘোড়ার গাড়ির চাকার শব্দ সামনে এসে পড়ার আগে শোনা যায় না। তিন বালক চকিতে মুখ তুলে দেখে নিঃশব্দে প্রেতের মতো এসে দাঁড়িয়েছে একটি করুণ এক্কাগাড়ি। ক্ষয়াটে কাঠবাদাম-রঙা ঘোড়াটির লেজ কাটা, ক্যানভাসের ছই ছেঁড়া, কাদা গোবর মাখানো। গাড়ি থেকে মুখ বের করেন এক ফিরিঙ্গি। আমবনে সবুজ আলোয় তাঁর মার্বেল পাথরের মতো ফ্যাকাসে চামড়া, পরনে সাদা জোব্বা, গলায় রুপোর ক্রুশ— একজন পাদরি।
তিন বালকের মধ্যে দুজনের মুন্ডিত মস্তক। হাত নেড়ে মোলায়েম স্বরে ডাকেন-
‘এদিকপানে এস দিকি বালকেরা, আমাকে একটি ঘটনার বিষয়ে আলোকপ্রাপ্ত কর।’
সাহেবের উচ্চারণ স্পষ্ট, ততোধিক শিষ্ট তাঁর বাংলা। ওঁকে দেখে দুই ন্যাড়ামাথার মধ্যে ছোটোজন, যার নাম পাগলরাম, আমগাছের আড়ালে গিয়ে লুকোয়। বড়োজন, গঙ্গারাম, এক্কাগাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। পাদরিসাহেব ওকে ভালো করে নিরীক্ষণ করেন।
‘তুমি কি পণ্ডিত রাজারাম সার্বভৌমের পুত্র?’
গঙ্গারাম সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। সাহেব গাছের আড়ালে পাগলরামের দিকে তর্জনি নির্দেশ করেন।
‘আর উনি? তোমার ভাই?’
গঙ্গারাম আবার মাথা নাড়তে সাহেব কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করেন, ঘোড়ার লাগামটা এক্কাগাড়ির ডাঁশায় জড়ান। কিন্তু গাড়ি থেকে তিনি নামেন না।
‘আমি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তোমাদের পিতা তাঁর সাধনোচিত স্থানে গমন করুন, সেই স্থান যেমনই হউক। আমি ইহাও প্রার্থনা করি, তুমি ও তোমার ভাই এই শোক বহন করিবার শক্তি লাভ কর।’
এই পর্যন্ত বলে পাদরি জোব্বার লম্বা পকেট থেকে হলুদ কাগজে জড়ানো একটি লম্বাটে বস্তু বের করে গঙ্গারামের দিকে বাড়িয়ে ধরেন।
‘এই নাও, মিঠাই।’
গঙ্গারাম হাত বাড়িয়ে সেটি গ্রহণ করতে যাবার আগেই তৃতীয় বালক, যার নাম গুঁফো, চেঁচিয়ে উঠে সতর্ক করে।–‘কালাশৌচ চলছে কিন্তু গঙ্গা, সাহেবের হাত থেকে ম্লেচ্ছ খাবার নিসনি!’
গঙ্গারাম ইতিমধ্যে বস্তুটি গ্রহণ করেছে। আঙুলে টিপে পরীক্ষা করে সে বলে,— ‘এ তো গুড়, নিলে দোষ কী?’
‘ইহা গুড় নয়,’ সাহেব মুচকি হাসেন। ‘ইহা সুমিষ্ট ডাচ কোকো।’
সন্দেহ নিরসন করতে তিনি জোব্বা থেকে আরেকটি বের করে কাগজের মোড়ক খুলে গুড়ের মতোই দেখতে বাদামি বস্তু খানিকটা ভেঙে নিজের মুখে পুরে চুষতে থাকেন। তারপর বলেন—
‘আমায় বল দিকি, তোমার পিতার মৃত্যুর পর শুধু কি তাঁরই দাহ হয়েছে? নাকি দ্বিতীয় কেউ ছিল?’
গঙ্গারাম উত্তর দেয় না, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘দ্বিতীয়জন ছিল। তাই না?’ সাহেব নীচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলেন। ‘তোমাদের মা?’
গঙ্গারাম প্রস্তরবৎ। আমের বনে আলো কমে আসছে, কোকিলের ডাকটা থেমে গিয়েছে আগেই।
‘উনি কি তোমাদের সত্মা ছিলেন?’
ক্ষয়াটে ঘোড়ার পেছনের পায়ের ফাঁকে একটি ডুমো মাছি ভন্ ভন্ করছে। লেজের গোড়াটা থরথর করে কাঁপে, কিন্তু লেজটা কাটা থাকায় তাড়াতে পারে না। গঙ্গারামের পায়ের পাতা থেকে তিন আঙুল দূরে একদল লাল পিঁপড়ে একটি গুবরে পোকার শব টেনে নিয়ে চলেছে।
‘তিনিও কি মারা গিয়েছিলেন?’ পাদরি এক্কা থেকে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ এনে বলেন। ‘মারা যাননি, তাই না? বলো আমায়, বালক, সবকিছু বলো, যা তুমি দেখেছ। বলো। তোমার মনের জ্বালা জুড়াবে। তুমি শান্তি পাইবে।’
গঙ্গারামের চিবুক বেয়ে জল গড়াতে থাকে। স্ফীত ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপে, মুখমন্ডল কুঁকড়ে আসে। যাজক এক্কা থেকে ঝুঁকে বাঁ হাতটা গঙ্গারামের কাধে রাখেন, মোড়ক খোলা অর্ধেক ডাচ কোকো এগিয়ে দেন।
‘এটি মুখে দাও, আরাম পাইবে।’
বুকের মধ্যে যেন ফাঁস এঁটে বসেছে, সাহেবের জোব্বা থেকে ধূপ আর কর্পূর মেশা একটা গন্ধ নাকে এসে লাগে। বাদামি চটচটে পদার্থটি জিভে নিয়ে গঙ্গারামের প্রথম থু-থু করে ফেলে দেবার অনুভূতি হয়। কিন্তু ততক্ষণে মুখের তাপে সেটি গলতে শুরু করেছে, মুখ ভরে উঠেছে এক বিচিত্র অচেনা স্বাদে। বুকের চাপটা কমে না, কিন্তু কেমন যেন সহনীয় হয়ে ওঠে। মূর্ধার কাছে জিভটা এনে যত সে চুষতে শুরু করে এক অস্পষ্ট সুভগ অনুভূতির প্রবাহ বইতে শুরু হয় যেন।
একটি স্মৃতি, যা কিছুকাল ধরে তাকে শয়নে জাগরণে তাড়িয়ে মারছে, মনে হয় যেন অনেক দূরের। সেই বসন্ত শেষের দগদগে সকাল, সেই সরস্বতীর বুকে ধোঁয়ায় জড়ানো পাতলা কুয়াশা মনে হয় যেন স্বপ্ন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গঙ্গারাম টের পায় সে পাদরি সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে সাড়া দিচ্ছে, বিবরণ দিচ্ছে সেই দৃশ্যের, যা সে ঘটনাস্থল থেকে তিন রশি দূরে থেকে চোখে দেখেনি কিন্তু কানে শুনেছে, যা প্রত্যক্ষ করেছে তাদের বড়ো ভাই রামানুজ। পিতার মুখাগ্নি করেছে সে-ই।
তার আগে সে আর পাগলরাম, টোলের বাড়িতে বন্দি, ঘুলঘুলির ফোকর দিয়ে মন্দির চত্বরে দেখেছে নববধুর সাজে লক্ষ্মণাকে। পরনে সোনালি জরি বসানো পাকা তেলাকুচো রঙের শাড়ি, কপালে টকটকে সিঁদুর ধেবড়ে গিয়েছে। চোখেমুখে আচ্ছন্ন ভাব, এক গা গয়নায় মুড়ে বুঝি চলেছে বাপের বাড়িতে। দুই সধবা নারী, যাদের গঙ্গারাম আগে কখনো দেখেনি, দুদিক থেকে লক্ষণার বাহুতে হাতের বেড় দিয়ে ধরে আছে। মনে হয় যেন তুলে ধরে আছে, পাশাপাশি হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা ছয় ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল আদিরাম মন্দিরের দরজায়, আদিরামবাটি ছেড়ে কোথাও যাবার আগে যেভাবে সকলে যায়। এবং সকলের মতোই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। দুপাশে দুজন হাতের বেড় খুলে দিতে যেন দারু প্রতিমার মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল লক্ষণা। দরজার চৌকাঠে মাথা ঠুকে ঠুকে প্রণাম করছে—- হাতুড়ির মতো মাথা ঠুকেই চলেছে, ঠুকেই চলেছে, যতক্ষণ না ওদের মধ্যে একজন পেছন থেকে কোমরটা ধরে টেনে তুলল। সিঁথিতে লাল সিঁদুরে জড়ানো থকথকে রক্ত ঢেকে দেওয়া হলো ঘোমটায়, নারীদের সমবেত হাঁ হাঁ ধ্বনি ঢেকে গেল ঘন্টাধ্বনিতে। এবং কারোর সাহায্য ছাড়াই সে হেঁটে গিয়ে পাল্কিতে উঠল। সেই আচ্ছন্ন ভাবটা আর নেই, চোখ দুটো ধক্ধক্ করছে। হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন দেহটা চলছে, মানুষটা গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে কবেই।
দুদিক থেকে পাড়াপড়শি জ্ঞাতিবউদের দল এসে তার পায়ে পড়ে প্রণাম করতে লাগল, সাদা চুলের বয়স্কারাও। তার চলার পথের ধুলো মুঠি করে তুলে মাথায় মাখতে লাগল, কোলে কাঁখে শিশুদের মাথায় মাখাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে গঙ্গারাম টের পেল, যে বাপের বাড়িতে লক্ষণা চলে যাচ্ছে বলে তার মনে হয়েছিল, সেই বাপের বাড়ির কোনো অস্তিত্বই আসলে নেই।
খোল কর্তাল বাজিয়ে দলটা যখন ঘাটের দিকে চলে গেছে, গঙ্গারাম আবিষ্কার করল পাগলরাম নেই। টোলের বাড়ির উঠোনে বেলগাছ বেয়ে উঠে পাঁচিল টপকে পালিয়েছে। ছোটো ভাইয়ের পথ ধরল গঙ্গারাম। পথঘাট শুনশান, নিস্তব্ধ। একটিও মানুষ দেখা যায় না। হাওয়ায় মৌচাকের গুঞ্জনের মতো ধ্বনি ভেসে আসছে দূর থেকে।
ভাইটা কোনদিকে গিয়েছে সে জানত। ঘাটের গলি ধরে ছুটতে শুরু করল গঙ্গারাম।
*
মি’লেডি, এই অ্যাকোয়াটিন্ট প্রিন্টটা দেখুন। প্রথমেই যেটা নজর কাড়ে, তা হলো দাহ্য কুয়াশা নদীর বুক থেকে উঠে আসা কুয়াশার পিন্ড যেন দাউ দাউ চিতার আগুনে জ্বলছে। শিল্পী এখানে যে বিশেষ শৈলী প্রয়োগ করেছেন সেটি পরবর্তীকালে বেঙ্গল স্কুলের শিল্পীরা, বিশেষত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলবেন। বীভৎস, প্রায় নারকীয় দৃশ্য এখানে পিকচারেস্ক, বলা যেতে পারে রোম্যান্টিক হয়ে উঠেছে। কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী নীল এশীয় আকাশে উঠছে, ডান দিকের কোণে এক ঝাক গাঙশালিখের উড়ান। বাঁদিকে নীচে একদল কৃষ্ণবর্ণ স্বাস্থ্যবান ব্রাহ্মণ, পরনে কৌপিন, মুন্ডিত মস্তকে পুরুষ্ট শিখা। তাদের চোখে চিতার প্রতিফলিত আলোয় শ্বাপদের দীপ্তি। অন্যদিকে বাজনদারদের দল—মাথায় পাগড়ি, হাতে খোল কর্তাল। ছবির মধ্যভাগে চিতার ওপর দন্ডায়মান এক যুবতী, লাল পাড় সাদা শাড়ি জড়ানো, ভিজে কালো চুলে সিঁথির কাছে টুকটুকে লাল সিঁদুর (অথবা / এবং রক্ত)। তাঁর চোখ নিমীলিত, হাতদুটো বুকের কাছে জড়ো করা―যেন জবাফুলের পরাগকেশর, রক্তলাল পাপড়ির মতো আগুনের শিখার আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নিষ্কম্প্র। দুদিক থেকে দুই দীর্ঘকায় পুরুষ, তাদের বাবরি চুল কানে মাকড়ি, লম্বা দুটি বাঁশ দিয়ে আড়াআড়ি কাধের ওপর দিয়ে চেপে তাঁকে স্থির রেখেছে চিতার ঠিক ওপর, যার একদিকে জ্বলন্ত অঙ্গারের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় এক শায়িত মানুষের দুটি পা।
The Inflammable Oriental Woman: A Sati Burning by the river Saraswati নীচে ডান কোণে ফ্রান্স বালথাজার সলভিন্স-এর সই রয়েছে। কিন্তু সাতগাঁয় শেষ সতীদাহ হবার অন্ততপক্ষে অর্ধ শতক আগে সলভিন্স এই দেশ ছেড়ে চলে যান। ফলে স্বাক্ষরটি ভুয়ো হওয়া কিছু অস্বাভাবিক নয়। সেই সময় কলকাতায় বটতলার ছাপাখানায় বীভৎস পিকচারেস্ক জলরঙ লিথোগ্রাফের রমরমা ব্যবসা শুরু হয়েছে, সলভিন্স-এর নাম ব্যবহার করে ছবি ছাপা হয়ে চলেছে।
*
পাগলরামের বয়স যখন তিনবছর, ভুবনেশ্বরী ভেদবমিতে মারা গেলেন। রাজারাম আবার বিবাহ করলেন। যদিও সেটা ঠিক সন্তান প্রতিপালনের উদ্দেশ্যে নয়। তখন মন্বন্তরে ধস্ত জনগোষ্ঠীর ওপর দিয়ে এশিয়াটিক কলেরার মড়কের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছে। লক্ষণার বয়স যখন বারো, রাজপুরে ওর পরিবারের সবাই তিন রাতের মধ্যে মারা গেল। রাজারাম তাঁর বড়ো ছেলে রামানুজের বয়সি অনাথ বালিকাকে অকহতব্য দুর্ভাগ্য থেকে উদ্ধার করতে, এবং পাশ্চাত্য বৈদিক স্বজাতির আত্মার স্বর্গলাভের পথ সুগম করতে, ব্রাহ্মণের কর্তব্য পালন করলেন।
লক্ষণা তার কর্তব্য পালন করেনি। সে গর্ভে রাজারামের সন্তান ধারণ করেনি। প্রয়াত ভুবনেশ্বরীর সর্বময় ব্যক্তিত্বের নখের যুগ্যি হয়ে ওঠার চেষ্টাও করেনি। জ্ঞাতিনারীরা তার নাম দিয়েছিল পাষাণগর্ভা। মুখে কুলুপ আঁটা আড়ষ্ট স্বভাবের জন্য পাষাণহৃদয়ও বলত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আদিরামবাটিতে পা রাখার পর থেকেই লক্ষণা পাগলরামের ওপর অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করল। শিশুটির চোখে সে না ছিল নতুন ছোটোমা, না ছিল বড়ো দিদি। ফাল্গুনের এক সন্ধ্যায় পাকা তেলাকুচো-লাল শাড়ি আর জড়োয়া গয়না পরে নববধুর সাজে এসেছিল যে, মশালের আলোয় পাগলরাম তাকে দেখেছিল পালকি থেকে নেমে আসছে, হাতে বেতের ঝাঁপিতে সদ্য-শেষ-হওয়া বালিকাবেলার কাঠের পুতুল আর কড়ি। সদ্য-মা-হারা পাগলরামের তখনও মেয়েমহলেই দিন কাটে। অবাক বিস্ময়ে সে দেখত, লক্ষণার সম্পন্ন বাপের বাড়ি থেকে আনা পেতলের বাক্সের ভেতর নানান রঙের কাচের চুড়ি, ফিতে, হাতির দাঁতের চিরুণি, আলতা, বিলিতি এসেন্স, পাউডার, পমেটম… এমন সব জিনিস যা আদিরামবাটির বউঝিরা কোনোকালে চোখে দেখেনি।
মনোহারি দ্রব্য আর খেলনা পুতুলে আকর্ষণ ছিলই। আরেকটি জিনিসের জন্য পাগলরাম ও তার নতুন সৎমায়ের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠল। সেটি হলো অন্ধকারভীতি: গভীর চিকন বিলিতি ভেলভেটের মতো অন্ধকার, যা ঘন গাছপালায় ছাওয়া সাতগাঁয় সেকালে ছেয়ে আসত সূর্য ডোবার সাথে সাথে। রেড়ির তেলের প্রদীপ আর ক্বচিৎ মশালের সাধ্যি ছিল না ঘোচানোর, যতদিন না কেরোসিনের লন্ঠন এসে সেই অন্ধকারের অবলুপ্তি ঘটাল।
লক্ষণাকে বিবাহের কালে রাজারাম সার্বভৌম সাতগাঁর অগ্রগণ্য নৈয়ায়িক। তার আগে অনুজ বুনোরাম পণ্ডিতের কারণে বংশের গায়ে যে কলঙ্কের দাগ পড়েছিল, রাজারামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেটি মুছে ফেলা হয়েছে। বুনোরামের নাম উচ্চারণ আদিরামবাটির ত্রিসীমানায় নিষিদ্ধ ছিল। এক কঠোর নৈঃশব্দ্য, যার গর্ভ থেকে জন্ম নেয় বিস্মৃতি। এদিকে কলকাতায় তখন ইংরেজরা নিত্য নতুন আইন সনদ তৈরি করছে, সনাতন হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি শিক্ষা পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করছে। যে ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করা নিয়ে যুবক বয়সে অনুজের সঙ্গে তীব্র মনান্তর হয়েছিল, রামদেব (তখনও বুনোরাম হয়নি) গৃহত্যাগ করেছিল, গুটিকয় বাস্তুত্যাগী কলকাতাবাসী বাঙালির উসকানিতে সেই ইংরেজদের এই সনাতন ধর্মের প্রতি অনিষ্টকারী ভূমিকা দেখে মোহভঙ্গ ঘটেছিল রাজারামের। কিছুটা অনুশোচনা থেকেই তিনি বিশ্বাসঘাতক ইংরেজদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ধর্মসভা সংগঠিত করলেন। নবদ্বীপের পণ্ডিতদের সঙ্গে নিয়ে, মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির পর কলকাতা ছেড়ে হুগলির পশ্চিমপাড়ে বাস উঠিয়ে চলে আসা ব্রাহ্মণদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক বৃহত্তর আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
কিশোরী লক্ষণাকে বিবাহের পরেও রাজারামের দৈনন্দিন জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। দূরদূরান্তে সভা করে বেড়াতেন, বাড়িতে থাকলেও দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন টোলের বাড়িতে। বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে ইংরেজ শাসকদের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে কথাবার্তা প্রধানত সংস্কৃতেই বলতেন। এর ফলে স্ত্রীর সঙ্গে, বাড়ির কোনো নারীর সঙ্গেই, ভাববিনিময়ের কোনো পরিসর ছিল না।
.
চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন ভোররাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটল, অকালে সন্ন্যাস রোগে মারা গেলেন রাজারাম সার্বভৌম। মৃত্যুর আকস্মিকতা কাটিয়ে ওঠার পর যখন তাঁর অন্ত্যেষ্টির আয়োজন হচ্ছে, তখনই অন্দরমহল থেকে বার্তা চুঁইয়ে এল–লক্ষণা পতিদেবের সঙ্গে ভবনদীর পরপারে যাত্রার জন্য প্রস্তুত!
শুধু গঙ্গারাম কিংবা পাগলরামই নয়, এই সংবাদ খুব নিকট আত্মীয় ও দশ-রাত্রির জ্ঞাতি ছাড়া প্রায় সকলের কাছেই গোপন রাখা হলো। তার কিছুকাল আগেই ইংরেজ সরকার সতীদাহ বিরোধী আইন পাশ করেছে, তাতে ওই কলকাতায় ডেরা-বাঁধা সাবর্ণ আর নব-খ্রিস্টান বিধর্মীদের সক্রিয় প্রশ্রয় ছিল। ক্রমশ লক্ষণার সিদ্ধাস্ত চাউর হতে সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজ দুহাত তুলে স্বাগত জানালো। কুলপতি রাখালদাস ন্যায়চুড়ামণি ঘোষণা করলেন
‘স্বামীর সঙ্গে সজ্ঞানে স্বর্গারোহণ অতি পবিত্র সংকল্প। ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন এই নারী। এ যুদ্ধ তো ফিরিঙ্গি কলকাতার বিরুদ্ধে সাতগাঁর শুধু নয়, আপামর হিন্দু সমাজের!
নারীমহলেও লক্ষণা সম্পর্কে চালু মনোভাবের রাতারাতি পরিবর্তন ঘটল। তার মুখচোরা স্বভাব, তার পাষাণগর্ভ আর পাষাণহৃদয়কে ব্যাখ্যা করা হতে লাগল দাউ দাউ চিতায় সজ্ঞানে হেঁটে ওঠার প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে: যা রক্তমাংসের নারী থেকে পাথরের দেবীতে উন্নীত হতে পারার সংকল্প। সরস্বতীর ধারে এই কিংবদন্তীপ্রতিম অন্ত্যেষ্টির বিশেষ প্রস্তুতিপর্ব শেষ হবার আগেই তরঙ্গের আকারে খবরটা গোটা সাতগাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে পুরুষ নারী গিয়ে জড়ো হতে লাগল নদীপাড়ে।
আর সেই জন্যেই টোলের বাড়ির পাঁচিল টপকে গলি দিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পাগলরামের সন্ধানের বেরিয়ে পথে একটিও মানুষ দেখতে পায়নি গঙ্গারাম। রহস্যময় মারী এসে শহরটাকে জনশূন্য করে দিয়ে গেছে বুঝি। দূর থেকে একটা ধ্বনি বাতাসে ভেসে আসছিল মৌচাকের গুঞ্জনের মতো।
*
কালবৈশাখীর ভিজে বিকেলে আমবাগানে সাহেব পাদরির কাছে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিতে পারল না গঙ্গারাম। সে কিছু চোখে দেখেনি, কানে শুনেছে কেবল নারকেল গাছের মাথায় চড়ে একটা লোক কী দেখছে চিৎকার করে ধারাবিবরণী দিচ্ছিল নীচে জনতার উদ্দেশ্যে। কানফাটানো খোলকর্তাল আর জয়ধ্বনির ভেতর দিয়ে শোনা যাচ্ছিল তার কথাগুলো। চিতাস্থল থেকে তিন রশি দূরে ওদের ঠেকিয়ে রেখেছিল একদল অচেনা স্বেচ্ছাসেবক। তাদের মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, হাতে লম্বা লাঠি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে সিঁদুরের তিলক। এদিকে উন্মাদ বন্য পশুকে যেভাবে ধরে, সেভাবে পাগলরামকে মাটিতে উপুড় করে ফেলে চেপে ধরেছিল গঙ্গারাম, যাতে সে ছিটকে ওদিকে না যেতে পারে। পাড়ের মিহি ধুলোয় তীব্র ধস্তাধস্তি করতে করতে গঙ্গারামের নাকে ভেসে আসছিল ঘি চন্দন আর জীবন্ত মাংসপোড়া গন্ধ, এদিকে কব্জিতে পাগলরামের কামড়ে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা। সেসব সয়েও সে ভাইয়ের দুই কাঁধে হাঁটু চেপে ওর দুই কানে হাত চাপা দিয়েছিল, যাতে খোলকর্তালের ধ্বনি ছাপিয়ে নারকেল গাছের মাথায় সেই প্রত্যক্ষদর্শীর ধারাবিবরণী শুনতে না পায় পাগলরাম।
চোখদুটো বন্ধ করে সেই স্মৃতি উদ্ধার করতে গিয়ে গঙ্গারামের মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল যে ছবি, সেটি তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিদ্ধ করবে, অন্ত্রাশয়ে আগুন হয়ে জ্বলবে। শত জড়িবুটি গঙ্গামাটির লেপেও নিরাময় হবে না। চোখ খুলতে দেখল, দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা সকাল নয়— সেই ভিজে আমবাগান, এক্কাগাড়ি, করুণ ঘোড়াটি নিশ্চল। চোখে রুপোলি ফ্রেমের চশমা এঁটে সাহেব খেরোর খাতায় খাগের কলম দিয়ে খসখস করে লিখে চলেছেন।
গঙ্গারাম নিশ্চুপ হয়ে যেতে তিনি ধীরে ধীরে চশমাটি খুলে চামড়ার বটুয়ার ভেতরে রাখলেন, গভীর বিষণ্ন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত, বিড়বিড় করে বললেন—
‘থ্যাঙ্কিউ, মাই বয়! গড ব্লেস ইউ। প্রভু যিশু তোমাদের ওপর করুণা বর্ষণ করুন।’
ফের জোব্বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো হলুদ কাগজে মোড়া সেই মিঠাই গঙ্গারামের হাতে ধরে দিলেন।
‘তোমার ভাইয়ের জন্য, তোমাদের বন্ধুটির জন্য। যদি কখনো আমার বাটিতে আইস, ঢের পাবে। আমার দুই পুত্র আছে, তাহাদের বয়স তোমাদের সমান। খেলা করিতে পারবে। আমি দিনেমারডাঙায় থাকি, মিশন হাউস বলিলে সকলে দেখিয়ে দিবে।’
এক্কাটা নিঃশব্দে চলে গেল। ভিজে মাটিতে চাকার দাগ না থাকলে মনে হতো বুঝি দিবাস্বপ্ন। আর ওই ডাচ কোকোর পুরিয়াগুলো। অশৌচ ঘুচে গেলেও কালাশৌচ চলেছে, এসময়ে বাইরের কারোর হাত থেকে খাদ্য গ্রহণ নিষিদ্ধ। ফিরিঙ্গি সাহেবের হাত থেকে তো নেবার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু গঙ্গারাম যদি নিষিদ্ধ কাজ করে থাকে তাহলে পাগলরামও করেছে। গুফো গোঁসাই তার সাক্ষী। ওরা তিনজনেই ঘটনাটি গোপন রাখবে।
