সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.৫
৭.৫
কালবৈশাখীর আমবাগানে ডাচ কোকোর অনির্বচনীয় স্বাদের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল যে নতুন জগতের হাতছানি, ক্রমশই তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে গঙ্গারাম। মাঝে মাঝে পাগলরামকেও নিয়ে যায়, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে সে একাই যায়। পিটার ও জনের সঙ্গে বাগানে র্যাকেট খেলা, কিংবা পাঁড়েজির বানিয়ে দেওয়া গরম কোকো শরবতের থেকেও বেশি টানে ছাপাকলের ঘরটা। সেখানে কলের চাকায় কটু তেলসাবানের গন্ধের মাঝে বসে বিল সাহেব কাজ করেন, কখনো একা, কখনো নানান লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তার ফাঁকে। গঙ্গারাম নিবিষ্ট হয়ে ছাপাখানার কাজ দেখে। একটি একটি করে সীসের টাইপগুলো কীভাবে গাঁথা হয় পেতলের ফ্রেমে, কীভাবে ছাপ তোলা হয় দেখে, সাহেবের সঙ্গে অতিথিদের আলাপ কান পেতে শোনে। বিল সাহেব কখনো নিরস্ত করেন না, উল্টে গঙ্গারামকে ছোটোখাট কাজ দিয়ে উৎসাহ যোগান। পাগলরামও ধীরে ধীরে পিটার-জনের খেলনা ছেড়ে নীচের ঘরে এসে চুপ করে বসে থাকতে শুরু করেছে।
লক্ষণা সতী হবার পর অনেককাল কেটে গিয়েছে, পাগলরাম অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এখন। রামানুজ সংসার ও চতুষ্পাঠির দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, গঙ্গারাম ছোটো ভাইকে আগলে রাখে।
পনের বছর পূর্ণ হবার আগেই গঙ্গারামের বেদ পাঠ সম্পূর্ণ হয়েছে, আয়ুৰ্বেদ ও গন্ধর্ববেদ সহ। এছাড়া ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, তন্ত্রের কিছু সূত্র, বেদান্তের নির্যাস, অর্থশাস্ত্রের কয়েকটি অধ্যায় ও ধ্রুপদ সাহিত্য পাঠ করেছে সে। বিদ্যাচর্চায় যে বিভাগটি তার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে, সেটি হলো কাব্য। না, সংস্কৃতে রচিত ধ্রুপদী কাব্য নয়। বহুকাল আগে, মৎস্যভূমিতে দরপ খান গাজী আসারও আগে, বিভিন্ন ভাষার মিশ্র বেণীসঙ্গম থেকে যখন আলোআঁধারি বাংলা ভাষা জন্ম নিচ্ছে, এই কাব্য সেই কালে রচিত।
একমাত্র পণ্ডিত যিনি এর পাঠদান করতে পারেন, যাঁর স্মৃতিতে গচ্ছিত আছে এই কাব্যমালা, তিনি সাতগাঁর অধ্যাপক সম্প্রদায়ের নন। তিনি বহিরাগত ব্রাহ্মণ, যাঁর প্রকৃত নাম কেউ আর জানে না। তাঁর বাহন একটি তালের ডোঙা, সবাই তাকে ডোঙা শর্মা নামে চেনে।
বহুকাল আগে ডোঙা শর্মা দক্ষিণে ভাটির দেশ থেকে ডোঙা চালিয়ে এসেছিলেন যে স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে, এত বছরেও তা তিলেক বৃদ্ধি পায়নি – দুটি ধুতি, একটি সুতির র্যাপার, একটি গামছা ও একটি কাঁসার ঘটি। যা তিনি অর্জন করেছেন তা অলীক। সহস্র বছর আগে রচিত এক কাব্যভাষা, যা ঘোলা কর্দমাক্ত বুলির ত্রিবেণী স্রোতের মধ্যে থেকে ক্রমশ স্বচ্ছ ভাষা রূপে জন্মলাভ করছে। তাঁর কাছে কাব্য পাঠের জন্য এসে জোটে সাতগাঁর গুটিকয় তরুণ। সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিকেরা এই— ‘দোনো’ পণ্ডিতকে ঘোর সন্দেহ করে, কারণ তাঁর কাছে লিখিত কোনো পুথি নেই, সকলই স্মৃতিতে রক্ষিত। যে পদাবলী আবৃত্তি করেন তার মধ্যে নেড়া নেড়িদের ধর্মের উপাদান প্রকট।
বর্গিব্যাটারির বারুদঘরে ডোঙা শর্মার বাস। তাঁর সবল সমর্থ চেহারা দেখে বয়স আন্দাজ করা যায় না, তবে মাথায় শিখাটি ধূসর হয়েছে। নিয়মিত ডোঙার দাঁড় চালনায় কাঁধ ও হাত যথেষ্ট পেশল, প্রায় কুস্তিগীরের মতো। দিনে একবার তিনি ধর্মতলার এক ভক্তের দেওয়া আতপান্ন, কাঁচকলা কিংবা সজিনা শাক ফুটিয়ে আহার করেন।
এই বিচিত্র লোকটির কাছে অসংস্কৃত, হেঁয়ালি-ভরা কাব্য শিক্ষা করতে গঙ্গারাম যায় সেটা রামানুজের ঘোর অপছন্দ। টোলের আচার্য হয়ে বসে সে রামাই পণ্ডিতের আমল থেকে গ্রামেগঞ্জে ছড়ানো শিষ্যবাড়ির সঙ্গে ফের যোগাযোগ স্থাপন করেছে, দীক্ষাদান করছে, এদিকে তারই অনুজ এক চালচুলোহীন দোনোর কাছে বিদ্যালাভ করে— এ অত্যন্ত অসমীচীন।
‘শোনো গঙ্গারাম, কাব্য হলো সুধা,’ রামানুজ বলে। ‘সুধা পান করতে হলে সঠিক পাত্র নির্বাচন করতে হয়।’
‘প্রকৃত কাব্য হলো বহতা গঙ্গাজল,’ গঙ্গারাম উত্তর দেয়। ‘যা কিছু অশুচি তাকে পবিত্র করে, যা কিছু অস্বচ্ছ কর্দমময় তাকে কাকচক্ষু করে তোলে।’
‘কিন্তু ওই ডোঙা-ঠেলা দোনোর কাছে কী আছে, যা সাতগাঁর কোনো টোল চতুষ্পাঠিতে পাওয়া যায় না? আমায় বোঝাতে পার?’
‘উনি কাব্যের পাঠদান করেন,’ গঙ্গারাম বলে। ‘এমন এক কাব্য যা সনাতন শাস্ত্রের থেকে কম সত্য বা সুন্দর নয়। এ কাব্য গণিত বা ন্যায়শাস্ত্রের মতো চোখে দ্যুতি কিংবা চোয়ালে দার্ঢ্য আনে না, কিন্তু চোখে জল আনে। এখানে অপ্সরা কিন্নরীর ধ্রুপদী সৌন্দর্য নেই, রাজারাজড়ার শিকারের কাহিনি নেই, অতি সাধারণ মানুষের তুচ্ছ দৈনন্দিনের কথা আছে। তাদের অসন ব্যসন, খাদ্যের বারমাস্যা, তাদের দীন বসতির চারপাশে মুক্ত বন্যজীবন, নারী পুরুষের সহজ গ্রাম্য জীবিকার কথা আছে, ডিঙিতে ডোঙায় নদীযাত্রার কথা, বহতা জলে বাঁশের সাঁকোর ছায়া, নৌকার ছাঁদ, শুঁড়ির কুঁড়েয় নিশাদলের মাতানো গন্ধ, হেমন্তের স্থির অপরাহ্ণে ধুনুরির তুলো ধোনার টঙ্কার, তাঁতের মাকুর ধ্বনি, কুনকি হাতির ছলাকলার কথা আছে, পোষা কুকুর নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে হরিণ শিকার, পাটনি মেয়ের পরনে নীল শাড়ি, নৌকার গলুই থেকে জল ছেঁচে তুলছে কুমড়োর খোলে…
বলতে বলতে আবেগে গঙ্গারামের গলা ধরে আসে, চোখের কোণ চিকচিক করে।
‘কোন গ্রন্থ, জানতে পারি?’ রামানুজের চোখে সন্দেহ, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ ব্যাঙ্গের হাসি।
‘কোনো গ্রন্থ নেই, উনি সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে পাঠদান করেন।’
রামানুজ হা হা করে হেসে ওঠে। ‘গ্রন্থ নেই যার, সে আবার কী পাঠ? জ্ঞানচর্চায় তার কী মূল্য?’
গঙ্গারাম কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দেয়। সেই এক উত্তর, যা বহুকাল আগে তার এক পূর্বপুরুষ দিয়েছিল এক তুর্কী শাসককে
‘আমাদের পূর্বজরা আর্যাবর্ত থেকে যে বেদজ্ঞান নিয়ে এই পুবের দেশে এসেছিলেন, সেসব কোনো গ্রন্থে লিখিত ছিল কি? সেই জ্ঞানের ধারাই তো প্রবাহিত হয়েছে বংশপরম্পরায়। তার মাধ্যম ছিল বাক্, অর্থবহ ধ্বনির বয়ন, যা বক্তা থেকে শ্রোতায় সঞ্চারিত হয়। সেই বাক্কে সন্দেহ থেকেই না যত অজ্ঞান আর বিভ্রান্তির শুরু।’
‘কিন্তু এই ধ্বনির ভাষা কী? জানতে পারি?’ রামানুজের গলায় শ্লেষ ফোটে। ‘দেবভাষা নিশ্চয়ই?’
‘না, এই পদাবলীর ভাষা বাংলা ভাষার খুবই নিকটাত্মীয়। কিন্তু এ যেন ঠিক বাংলা নয়। খানিক প্রতীয়মান, খানিক অস্পষ্ট হেঁয়ালি ভরা, অনেকটা যেন স্বপ্নের ভাষা।’
‘কাব্য? বাংলা ভাষায়?’ রামানুজ ফের কর্কশ হাসে। ‘আমার বমনোদ্রেক হচ্ছে, গঙ্গারাম। কথ্য বাংলাভাষা শাস্ত্রীয় দেবভাষার এক বিকৃত অসংস্কৃত রূপ ছাড়া আর কী? আমাদের গোষ্ঠীর সকল পণ্ডিত সংস্কৃতে জ্ঞানচর্চা করতেন, আমাদের স্বর্গবাসী পিতৃদেব বয়সকালে আমাদের সঙ্গে সংস্কৃতে ভিন্ন বাক্যালাপ করতেন না। সে কথা নিশ্চয়ই তোমার স্মরণে আছে?’
‘স্মরণে আছে!’ গঙ্গারাম বলে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে–‘অথচ সহমরণে তিনি যাঁকে নিয়ে স্বর্গবাসী হয়েছেন তিনি বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষা জানেন না।’
রামানুজ এমনভাবে গঙ্গারামের মুখের দিকে তাকায় যেন এক বিশাল ইমারত চোখের সামনে ধূলিসাৎ হচ্ছে। মেঝেয় খড়মের সশব্দ আঘাত করে চিৎকার করে ওঠে— ‘গঙ্গারাম!’
*
‘এই পদাবলী কখনো লিপিবদ্ধ ছিল না এমনটা কিন্তু নয়,’ ডোঙা শর্মা একদিন গঙ্গারামকে বললেন। ‘তোমার খুল্লতাত, আমার গুরুদেবের কাছে এগারোটি পুথি ছিল।’
ছেলেবেলা থেকে এই এক রহস্যময় কাকার কথা সামান্যই শুনেছে গঙ্গারাম। এটুকু শুধু জেনেছে তাঁর আসল নাম ছিল রামদেব, এবং তিনি আদিরামবাটির ধারা অগ্রাহ্য করে গাজির বাগানে টোল খোলেন। পরদিন সে বর্গিব্যাটারিতে এসে বলল
‘আমি টোলের বাড়ির পুথিশালায় তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। সেই পুথিগুলি এখন কোথায় আছে?’
ডোঙা শর্মা এই প্রশ্নের কোনো সরাসরি জবাব দেন না। কখনো নীরবে হাসেন, কখনো বলেন, আমি জানি না। একদিন বললেন— ‘ওগুলি আমি একবারই চাক্ষুষ করেছি, অতীব প্রাচীন আর ভঙ্গুর। তাছাড়া পুথির লিপিও প্রচলিত বাংলার মতো নয়। পশ্চিমে মহানদী, পুবে ব্রহ্মপুত্র, মাঝে গঙ্গা পদ্মার বিপুল অববাহিকা, ভার উত্তরে বেষ্টিত হিমালয়। এই বিপুল ভূখন্ডে কত রকমের প্রাকৃত ভাষা যে প্রচলিত ছিল তার কতটুকুই বা লেখাজোকা আছে? দেখ গঙ্গারাম, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে ভাষায় কথা বলতেন তার আদি উৎস শুধুমাত্র সংস্কৃত কখনোই নয়। সে কোনো বিশুদ্ধ ভাষা নয়। তাতে মিশেছিল নানান ভাষা উপভাষার খাল খাঁড়ি নদী। ধ্বনি ও অর্থের এ এক নদীসঙ্গম। প্রচ্ছায়াময়, কিন্তু সে প্রচ্ছায়া সন্ধ্যার নয়। সে প্রচ্ছায়া হলো ভোরের, যখন পৃথিবী নতুন রূপে জেগে ওঠে এই পদাবলীর ভেতর, চেনা আধোচেনার ভেতর।’
গুরুদেবের কথাগুলো শুনতে শুনতে গঙ্গারামের চিত্তের অন্ধকার আকাশে ব্যঞ্জনার তারামন্ডল চিকচিক করে, মন ধেয়ে যায় এক গভীর অতীতে, যখন এই সাতগাঁয়ে স্রোতোচ্ছল সরস্বতীর ধারে ভোরের আর্দ্র ভাপে সুতো কাটত কাটুনি মেয়ের দল, তাদের ঝিমধরা গলায় গান আর চরকার ধ্বনি বয়ে নিয়ে নাবিকেরা সাগর পেরিয়ে চলে যেত দূরদূরান্তের দেশে।
‘তোদের গুরু গুপ্ত নেড়ে, সেটা জানিস?’ সাতগাঁর টোলের পোড়োরা গঙ্গারামকে সাবধান করে। ‘রাতবিরেতে ধর্মতলায় যায়!’
*
গুজব হলো এই ডোঙা শর্মা কাটুনিডাঙাতেও যান। এমনিতে সেটা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। এখানকার অনেক বড়োবড়ো পণ্ডিতই ওখানে যান, কেউ আড়ালে কেউ বা প্রকাশ্যে। সাতগাঁর বিশিষ্ট পণ্ডিত শতঞ্জীব শর্মা, যিনি বিলহনের চৌরপঞ্চাশিকার টীকাকার, তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি মুখে মুখে ফেরে— ‘কাব্যের অভীষ্ট হলো বাপু সৌন্দর্য। তা সে সৌন্দর্য নধর লতাতেই থাক, ছাগেই থাক কিংবা যুবতীতেই থাক। এবং পঙ্কজ তো পঙ্কেই জন্মায়!’
প্রতি শুক্লা দ্বাদশীর রাতে কাটুনিডাঙার বাঁশের খোঁটায় দোখনো পণ্ডিতের ডোঙা বাঁধা রয়েছে দেখা যায়। সারা রাত ওভাবে বাঁধা থাকে, ঢেউয়ে দোল খায়। শুক্লপক্ষে ডোঙার দেহে বিষ জমে, এক নাগিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সেই বিষ নাকি স্খালন করে আসেন। কাটুনিডাঙায় অমন নারী আছেন, চাঁদের বিভিন্ন দশায় তারা নাগিনী, শুকরী, ঘোটকীর রূপ ধারণ করেন।
