সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.২
১৩.২
সিস্টার্স দ্য ক্লুনি কনভেন্টের হস্টেলে চুরি করে আনা ঠাস বুনোট গদ্যে লেখা নিষিদ্ধ ফরাসি বই মরীয়া অভিধানের সাহায্য নিয়ে পড়তে পড়তে তিতলির এক অযাচিত লাভ হয়, ফরাসি ভাষাটা অত্যন্ত ভালো শিখে যায় সে। ইস্কুলে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতে থাকে, যদিও অন্যান্য বিষয়ে তার দখল ছিল মাঝারি মানের, এমনকি তারও নীচে। বসন্ত চিরকালই চেয়েছিল তিতলি পারী যাবে, যেমন সে নিজে গিয়েছে, এবং সোর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, যা সে নিজে পারেনি। তিতলির ইন্টারমিডিয়েট শেষ হবার আগেই অলোককে এবং প্যারিসে ১২ নং অ্যারন্ডাইসমেন্টে যে পেনশনে নিজে থেকেছে সেখানকার কর্ত্রীকে চিঠি লিখতে শুরু করে দেয়। যদিও তার নয়নের মণি মেয়েকে তার নিজের আরাধ্য দেশে পাঠানোর সুদীর্ঘ প্রস্তুতি বসন্ত মনে মনে শুরু করেছিল তার ঢের আগে, তিতলিকে যেদিন কোয়ার্সভিলে সিস্টার্স অফ ক্লুনি স্কুলে ভর্তি করল সেদিন থেকেই। এবং সেটা চলতেই থাকে। যখনই ওর ইন্সটিটিউটে কনস্যুলেটের কোনো আধিকারিক পরিদর্শনে আসতেন, মেয়েকে স্কুল ছুটির পর আনিয়ে কখনো ফরাসী কবিতা আবৃত্তি, কখনো আবার গান গাওয়াতো বসন্ত, যা তিতলিকে শেখাতেন কোয়ার্সভিলে খাঁটি ফরাসি বাসিন্দাদের শেষ প্রতিনিধি মাদাম নেলিন। বৃদ্ধার স্মৃতি ক্রমশ লোপ পাচ্ছিল, গানের সুর ভুল শেখাতেন তিনি, এবং সেটাই দূতাবাসের অতিথিদের কাছে তিতলির উপস্থাপনা আরও উপভোগ্য করে তুলত।
বসন্ত জীবনে সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটা খেল যখন তিতলি ইন্টারমিডিয়েটের পর বেনারসে যাবে স্থির করল, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগে ভর্তি হবে মনস্থ করল। মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল, ওকে কোনোরকম আর্থিক সাহায্য করাও বন্ধ করে দিল। ইতিমধ্যে তিতলির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিশুকা। রজস্বলা হবার পর মামামশাই বনলতাকে টোলের চৌহদ্দি মাড়াতে দেননি, সংস্কৃত পড়তে দেননি। দিলে তার জীবনকাহিনি অন্যরকম হতো। এতদিনে বুঝি ইতিহাসের সেই ধারা খন্ডন করতে চলেছে তিতলি। বনলতার বিবাহের জন্য সোনার গয়না গড়িয়ে রেখেছিলেন রাধারানী; নিজের মেয়ের মতো করে প্রতিপালন করেছেন যাকে, শখ ছিল তার বিবাহ দেবেন ধুমধাম করে। বনলতার জীবনের ভয়ঙ্কর পরিসমাপ্তির অনেক বছর পরে, সরোজা কলকাতার বাড়িতে যাবার পরে রাধারানী যেবার প্রথম এবাড়িতে পা দিলেন, বিশুর হাতে সেই গয়না তুলে দিয়েছিলেন তিনি। কলকাতার মাসিকে জীবনে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেনি বিশু, কিন্তু সরোজার কথায় সোনার গয়নাগুলো নিয়েছিল। এত অনটনের মধ্যেও সেই গয়নায় কোনোদিন হাত দেয়নি। মনে আশা ছিল, বনলতার ছেলে অভিমন্যু একদিন ঠিক ফিরে আসবে। কিন্তু সে আর রক্তমাংসে ফিরল না, ফিরে এল অষ্টধাতুর গোপাল রূপে।
তিতলি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে ঠিক হবার পর, এবং বসন্ত মেয়ের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেবার পর, দেবেন স্যাকরার কাছে গিয়ে গয়নাগুলো বিক্রি করে দিল বিশু। তিতলি ভর্তি হতে যাবার সময়ে ওর সঙ্গে গেল। শাকম্ভরী দেবীকে নিয়ে শেষবার কাশী গিয়েছিল, এবার গিয়ে আদিরামবাটির তিন প্রজন্ম পরের এক কন্যাকে বাঙালিটোলায় পূর্বপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিল। ইতিমধ্যে রামপ্রাণও কিছুকাল কাশীবাস করেছেন, কেদার ঘাটের কাছে সাতগাঁয়ের এক পাঁচ-রাত্তিরের জ্ঞাতির বাসায় উঠেছিলেন। সেখানেই আপাতত থাকার ব্যবস্থা হলো তিতলির। বাঙালিটোলার প্রাচীন ছায়াচ্ছন্ন কোঠাবাড়িতে মোক্ষলাভের জন্য অপেক্ষমাণ প্রবীণারা পাশ্চাত্য বৈদিক স্বজাতির এক মেয়ের স্থানীয় অভিভাবক হতে পেরে বিশেষ আমোদ পেলেন। এমন এক মেয়ে যে কি না বছর খানেকের মধ্যেই দেখা গেল ব্যাকপ্যাকার ফিরিঙ্গি মেয়েদের মতো জংলাছাপা সুতির পোশাক পরে, গলায় ঝোলায় মুসলমানি মুদ্রার লকেট, কাশীর অলিগলিতে পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে টো টো করে ঘুরে বেড়ায়, বিড়ি ফোঁকে, আবার কেদারনাথ মন্দিরের পুরুতঠাকুরের থেকেও ভালো সংস্কৃত উচ্চারণ করে।
ওকে গ্রহণ করতে তাঁদের কোনো অসুবিধা হলো না। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে, যেভাবে অভিসারিকারা গোপন প্রেমিকের আসার জন্য অপেক্ষা করতে করতে নৈশ প্রকৃতির সঙ্গে, পাতার ফিসফাস ঝোরার কুলু কুলু ধ্বনির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে, তেমনই এক বোধের বিস্তার ঘটেছিল তাঁদের হৃদয়ে। সংকীর্ণ শুচিবায়ু উবে গিয়েছিল। ওঁদেরই একজন তিতলিকে মুক্তি আশ্রমে নিয়ে গিয়ে সেই ঘরটি দেখালেন, যেখানে ওর খুল্লপ্রপিতামহী মুক্তিলাভ করেন। তিতলির মনে পড়ল বহুকাল আগের সেই দিনটা। সেদিন সকাল থেকে শুরু হয়েছিল দুর্যোগ, আকাশ কালো করে বৃষ্টি। দিদা স্নানের ঘাট থেকে আকাশের মতো মুখ নিয়ে এসে দুঃসংবাদটা দিল। পরদিন সারাবাড়ির দেয়ালে ফুটে উঠল শাকম্ভরী দেবীর হাতের ছাপ। টেলিগ্রাম আসে তার পরে।
কেউ পাঁচ-রাত্তিরের জ্ঞাতি, কেউ বা সাত-রাত্তিরের, কাশীর এই বুড়িঠাকুমাদের সঙ্গে এক বিরল সখ্য গড়ে ওঠে তিতলির। তার মনে পড়ে দিদার কথা, দিদার স্নানের সখী গঙ্গাজলেদের কথা। আজীবন সংসারের দৈনন্দিন খুঁটিনাটিতে জড়িয়ে কাটানোর পর যাবতীয় মায়া কাটিয়ে কাশীতে এসে অপেক্ষা করছেন জীবনচক্র থেকে মুক্তিলাভের জন্য। যেভাবে ছোটো ছোটো মেয়েরা সাতগাঁয় রামনবমীর মেলায় নাগরদোলায় চড়ার জন্য লাইন দেয়, যেভাবে তারা চোখ গোল গোল করে মেলার হাজারো মজা দেখে চেটে নিতে চায়, অনেকটা সেভাবেই যেন এঁরা কাতর আবেগে সত্তার ক্ষুদ্র বিন্দুটি অনন্ত আত্মায় মিশে যাবার আগে কাশীর বিখ্যাত মালাইয়ের সোয়াদ থেকে শুরু করে কাঠের খেলনার অদ্ভুত উজ্জ্বল রঙগুলো শুষে নিতে ব্যাকুল। কাশীও প্রতিদিন নিজেকে মেলার মতোই সাজিয়ে মেলে ধরে। এক আজব শহর, যেখানে জীবন আর মৃত্যু সতত কোলাকুলি করে ঘাটে পথে গলিতে চবুতরায়, সেই আলিঙ্গন ঘিরে পায়রা ওড়ে ধোঁয়ার মতো, সেখানে ক্ষণস্থায়ী আর শাশ্বত অনর্গল স্থান বদল করে চলে।
এসবই তিতলি জানল তিন-তিনটে বছর ধরে, একদিনের জন্যেও কোনো মন্দিরে না ঢুকে, ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে জল স্পর্শ না করে। বাঙালিটোলা থেকে লঙ্কার রাস্তা ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে নিত্য পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায়, সরু অলিগলির ভেতর উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়িয়ে।
তিনটে বছর কাশীতে কাটিয়ে মাস্টার্স করতে তিতলি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। সেখান থেকে স্কলারশিপ নিয়ে গেল প্যারিসে, সোর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইন্ডোলজি নিয়ে দ্বিতীয় একটি মাস্টার্স করতে। খবরটা সাতগাঁয়ে পৌঁছতে বসন্ত আবেগে আত্মহারা হয়ে পড়ল। যদিও বাবা-মেয়ের সম্পর্ক আগের অবস্থায় আর ফেরেনি, কিন্তু ফের সংযোগ স্থাপন হলো।
লাতিন কোয়ার্টারে একটি পেনশনে থাকতে শুরু করল তিতলি, বাবাকে নিয়মিত তার প্রিয়তমা পারীর পিকচার পোস্টকার্ড পাঠাতো। বসন্তও দীর্ঘ চিঠি লিখে ওকে নির্দেশ দিত কোথায় কোথায় অবশ্যই যেতে হবে, কী কী অবশ্যই দেখতে হবে, ওর পেনশনের খুব কাছে হেমিংওয়ে যে বাড়িটায় থাকতেন সেটা যেন সে অবশ্যই একবার দেখে আসে, আর শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি দোকানটাও, এবং সন্ধ্যার পরে মমার্তে যেন একা না যায়, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যায়, আর সেখানে মুলা রুজে, কিংবা মুলা দ্য লাগালের আশেপাশে যেন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও না যায়।
বাবার লেখা চিঠিগুলো হাতে নিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে গিয়ে তিতলি আবিষ্কার করে কীভাবে একটি শহরে মাস কয়েক কাটানোর স্মৃতি একজন মানুষের ভেতরে মরীচিকার মতো ফুলতে ফুলতে একদিন গোটা মানুষটিই হারিয়ে যায় তার ভেতরে। মনে পড়ল কাশীর বাঙালিটোলার সেইসব বৃদ্ধাদের কথা, কীভাবে সাতগাঁয়ে তাঁদের দীর্ঘ জীবন কাটানোর স্মৃতিকে সঙ্কুচিত করে তুলতেন কখনো একটি বিশিষ্ট স্বাদের অথবা গন্ধের স্মৃতিতে, এদিকে কাশীবাসের কালে মোক্ষলাভের অপেক্ষা ক্রমশ প্রলম্বিত হয়ে চলত। বাবার দীর্ঘ স্বগতোক্তির মতো চিঠিগুলোর উত্তরে তিতলি পিকচার পোস্টকার্ডের পেছনে দুটি-তিনটি সংক্ষিপ্ত লাইন লিখে পাঠাতো। সেটা পূর্বের মনান্তরের তিক্ততার রেশ থেকে নয়, প্যারিসের আবহাওয়ায় তিতলির পুরোনো হাঁপানির অসুখটা আবার চাগাড় দিয়েছিল।
মেয়ের পাঠানো পিকচার পোস্টকার্ডগুলো সকলকে দেখিয়ে বেড়াতো বসন্ত, যদিও তখন আদিরামবাটিতে দেখানোর মতো বিশেষ কেউ আর নেই। বিশুকা পরলোকে, হেমন্ত ইহলোকে থেকেও নেই।
*
কানাই যে ওর দিদির মতো মেধাবী নয় সেটা ছোটোবেলাতেই বোঝা গিয়েছিল, স্কুলে যেতে শুরু করার পর স্পষ্ট হলো। পুত্রসন্তান হবার কারণে চাপটা স্বাভাবিকভাবেই কিছু বেশি ছিল। যখনই কোনো কিছুতে অকৃতকার্য হতো, বাড়িতে বাবা-মায়ের বাঁধা লজ ছিল— ‘তোর বয়সে তিতলি কত সহজে এটা করতে পারত, আর তুই ছেলে হয়েও পারিস না!’ পরে বাপ্পার মনে হয়েছে, হয়তো বড়ো হবার পরে ঘুমের মধ্যে মুত্রত্যাগের রোগটা সেই কারণেই আসে। পন্ডিচেরিতে ডন বস্কো স্কুলে পর পর দুবছর পরীক্ষায় ফেল করে কানাই, একটি তামিল মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা হয়। বিছানা ভেজানোর রোগটা চলতে থাকে, বসন্তর হিংস্র দাওয়াইও চলতে থাকে। ওর ইংরিজি উচ্চারণে বাংলা আর বাংলা উচ্চারণে তামিলের ছোঁয়া থাকায় ইস্কুলে সহপাঠী থেকে শুরু করে ছুটিছাটায় সাতগাঁয় এলে পরিবারে উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে। সাতগাঁয়ে পাকাপাকিভাবে ফিরে সাতগাঁর ইস্কুলে ভর্তি হবার পরেও কানাইয়ের দ্বারা লেখাপড়াটা আর ঠিকমতো হলো না। এজন্য বসন্তকেই দায়ী করে নতুনবউ। মেয়ের প্রতি অন্ধ স্নেহ আর প্রশ্রয়ই যে কানাইয়ের যাবতীয় অকৃতকার্যতার কারণ এমনটাই মনে করতে থাকে। তিতলি সংস্কৃত নিয়ে বেনারসে পড়তে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে যখন বাবার সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ হলো, ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছিল নতুনবউ। তারপরে তিতলি প্যারিসে গেল, ওখানেই বিবাহ করল এক ফরাসীকে। তার গায়ের রং বিস্কিট পোর্সিলিনের পুতুলের মতো কী না সেটা ওর ছবি দেখে বুঝতে পারেনি নতুনবউ। বর ইন্ডোলজির অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের পর ওরা একবারও ইন্ডিয়ায় আসেনি। উল্টে কিনা হাঁপানির অসুখটা ফিরে আসার পর মার্কিন দেশে পশ্চিম উপকূলে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় গিয়ে থিতু হল। আলো যে বছর জন্মালো, তার দেড় মাস আগে বসন্ত মারা যায়। স্বাভাবিকভাবেই ওই অবস্থায় অত দূর থেকে তিতলি আসতে পারেনি। ঠাকুরবাড়ির বিগ্রহরা ত্রিবেণীর ঘাটে স্থানান্তরের পরেও অনেকের নামে নামে মানি অর্ডার আসা বন্ধ হয়নি। গৃহদেবতাদের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত আমানতের সুদ থেকে আসা মাসোহারা আছে, এছাড়া আদিরামবাটিতে কয়েক ঘর ভাড়াটে বসিয়ে আয় করে কানাই। এছাড়া রয়েছে মন্দির ট্রাস্টের আয়।
অনেক বছর আগে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক— ‘পুকুর-কাটা বাবু’, এক পূর্ববঙ্গীয় ভূমিচ্যূত, আদিরামবাটিতে অনুপ্রবেশ করে। এরপর আর সরকারি এই দপ্তরকে এ বাড়ির ত্রিসীমানায় মাড়াতে দেয়নি কানাই। সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো পোড়ামাটির দোচালা মন্দির অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য বার বার চিঠি এসেছে, নানান কায়দা করে রুখে দিয়েছে। অনুগত জ্ঞাতিবাড়ির লোকজন জুটিয়ে নিয়ে ফ্যামিলি ট্রাস্ট তৈরি করে কানাই, পরবে পার্বণে জাঁকজমক করে অনুষ্ঠান শুরু করে দেয়। শুরু হয় ভক্তদের ভিড়, দানবাক্সে প্রণামী পড়তে থাকে। ইতিমধ্যে শুরু হয় কানাইয়ের রাজনৈতিক মহলে ঘোরাফেরা। স্থানীয় সাংসদের লোকাল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট স্কিমের তহবিল থেকে অনুদান বরাদ্দ করে মন্দির আধুনিকীকরণের কাজে হাত দেয় সে।
খবরটা তিতলির মারফৎ প্রথম জানতে পারে বাপ্পা। দু ফুট আকারের প্রাচীন স্টিয়াটাইটের বিগ্রহ নিয়ে সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো পোড়ামাটির কারুকার্য- মন্ডিত মন্দির। তার— ‘আধুনিকীকরণ’? শুনে নীরবে হেসেছিল। ইন্টারন্যাশানাল সাবস্ক্রাইবার ডায়ালিং-এ ফোন করেছিল তিতলি, তখনও এদেশে স্কাইপের চল হয়নি। বাপ্পার ঠোঁটে হাসিটা সে দেখতে পায়নি, বাপ্পাও তিতলির মুখ দেখতে পায়নি।
‘তুই এই খবরটা দিবি বলে আমায় ফোন করেছিস?’ বাপ্পা বলল। ‘যাক, তবু অনেকদিন বাদে তোর গলা শুনলাম।’
‘তুই কিছু কর বাপ্পাদাদা!’ তিতলির কন্ঠস্বরে আকুতি ফুটেছিল। ‘এটা হতে দেওয়া যায় না!’
‘আমি কী করব? আমি তো ট্রাস্টের কেউ নই। তুই মেম্বার। তুই তোর ভাইকে বল।’
‘আমার কথা ও শুনছে না! এত দূর থেকে কোনো লিগাল অ্যাকশানও নিতে পারব না। তাছাড়া ট্রাস্টে ও নিজের পছন্দের লোক ঢুকিয়েছে, তারা ওর কথায় চলে।’
‘আমার কথা শুনবে বলে মনে হয় তোর?’
‘চেষ্টা তো কর। এটা হতে দেওয়া যায় না, বাপ্পাদাদা!’
কানাইয়ের প্রতি মনের মধ্যে জমে থাকা তিক্ত অনুভূতিগুলো খুড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল বাপ্পা, খুঁজে পায়নি। সেই অনুভূতিগুলো মরে গিয়েছে। সাতগাঁর সেই— ‘আমি’-টাই যে মরে গিয়েছে! তবু তিতলির কথায় ফোন করে সনৎকে। শিবুদাদুর নাতি সনৎ মন্দির ট্রাস্টের মেম্বার। মন্দিরের বাইরেটা অন্তত অবিকৃত রাখার ব্যাপারে সনৎ নিজে থেকে কোনোরকম আশ্বাস দিতে পারেনি।
‘অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এমপি ল্যাডের টাকা পাওয়া গিয়েছে, সেই টাকা খরচ করতে হবে তো।’ সনৎ বলেছিল। ‘তবে ঠিক কী কী কাজ হবে আমি তার কিছু জানি না।’
সনৎ এড়িয়ে গিয়েছিল, বাপ্পার উৎকণ্ঠা যথাস্থানে পৌঁছেও দিয়েছিল। দুদিন পরেই কানাইয়ের ফোন এল।
‘তুই শেষ কবে আদিরামবাটিতে এসেছিস বাপ্পাদাদা?’
স্পষ্ট, প্রত্যয়ী কন্ঠস্বর কানাইয়ের, উচ্চারণে ছোটোবেলার সেই বিচিত্র টানটা রয়ে গিয়েছে। টেলিফোনের ওপাশ থেকে চাপা কলরোল আর থেকে থেকে ঘন্টাধ্বনি ভেসে আসছে।
শেষ কবে সাতগাঁ গিয়েছে বাপ্পাদিত্য মনে করতে পারে না, চুপ করে থাকে। কানাইয়ের পরের কথার জন্য অপেক্ষা করে।
‘তুই একবার আয়। নিজের চোখে একবার মন্দিরের অবস্থা দেখে যা। তারপর বলিস আমরা কোনো ভুল পদক্ষেপ করছি কী না।’
কানাইয়ের কন্ঠস্বরে শ্লেষের চিহ্ন খুঁজে পায় না বাপ্পাদিত্য। কানাই বলে চলে—
‘তুই তো এদিকে বহুকাল আসিসনি তাই জানিস না। ছাড়িগঙ্গার ধারে সেরামিক টালির কারখানা হয়েছে। সেখানে দিবারাত্র কী পোড়ায় কে জানে, তার অ্যাসিড ধোঁয়া বৃষ্টির জলে মিশে চুনের জোড় ক্ষইয়ে দেয়।’
‘দেয়ালের প্যানেলগুলো কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?’
‘এই মুহূর্তে সেটা খুব বড়ো কোনো ইস্যু নয়। তুই তো জানিস বাপ্পাদাদা, কামানের গোলা লেগে স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ হয়েছিল। কলিচুনের বাইন্ডিং দিয়ে বোঁজানো ফাটল দুশো বছর টিকে ছিল, এতদিনে সেটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এটা আমি নয়, শিবপুর বি-ই কলেজের প্রফেসাররা দেখে বলে গেছে। বড়ো রকমের সংস্কার করতে হবে।’
‘মন্দির ট্রাস্টের টাকায় হবে না?’ বাপ্পা বলে। ‘এমপি ল্যাডের টাকা লাগবে?’
‘মন্দির ট্রাস্টের কত টাকা আছে, বাপ্পাদাদা? ওই দানবাস্কে যা প্রণামী পড়ে। তাও আজকাল লোকে পুরোনো পোড়ো মন্দিরে আসে না। আজকাল ঠাকুরদেবতাদেরও ঝাঁ চকচকে বাড়িতে থাকতে হয় রে, না হলে ভক্তের ভক্তি আসে না। ইতিহাস ধুয়ে তো আর জল খাওয়া যায় না।’
‘তবু তো এখনও ঠাকুরবাড়িতে কুলদেবতাদের মাসোহারা আসে।’ বাপ্পাদিত্য বলে।
টেলিফোনের অন্য প্রান্তে অট্টহাস্য করে ওঠে কানাই। এতক্ষণে গলায় সামান্য শেষ ফোটে।
‘ঠিক বলেছিস, বাপ্পাদাদা। ত্রিবেণী ঘাটে চলে যাবার পরেও টাকা আসে এখনও। ষাট-সত্তর বছর আগে আমানত করে যাওয়া সুদের টাকা। কিছু কিছু মানি অর্ডার এখনও সাতগাঁ পোস্টাপিসে আসে বটে। কিন্তু সে এত টাকা যে পোস্টাপিসে আনতে যাবার রিক্সাভাড়াই ওঠে না। তুই একদিন আয় না, তোকে রিসিটগুলো দেখাবো।’
‘আমি দেখে কী করব?’ বাপ্পাদিত্য বলে। ‘তাছাড়া আমি তো ট্রাস্টেরও কেউ নই।’
‘ওভাবে কেন বলছিস? একদিন আয়। আসবি? বাড়িটা দেখলে তোর ভালো লাগবে না জানি, তবু আয়। আমি আছি, মা আছে, হিমুকাকুও এখনও আছে না থাকার মতোই। মা তোদের কথা খুব বলে। কতকাল হয়ে গেল তিতলি আসে না।’
‘হুম।’
‘আচ্ছা তিতলি তো তোকে মন্দিরের কথা বলেছে, ওর মেয়ে আলো এসেছিল সে কথা বলেছে কি?
বাপ্পাদিত্যর উত্তরের প্রত্যাশা না করে কানাই বলে চলে— ‘এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে এসেছিল, এক কাড়ি ছবি তোলার ইকুইপমেন্ট আর চার-পাঁচটা বাচ্চা বাচ্চা ফিরিঙ্গি ছেলেমেয়ে। তারা নাকি সব বিখ্যাত মার্কিন ফ্যাশান ম্যাগাজিনের ফোটোগ্রাফার। সারাদিন ধরে ডকবাজারের আশেপাশে ভাঙা পোড়ো হানাবাড়ি ঘুরে ঘুরে মডেল সাজিয়ে ছবি তুলল। ওরা আদিরামবাটিতেও এসেছিল, কিন্তু ল্যাট্রিন ব্যবহার করেনি। বাগানে তাঁবু টাঙিয়ে পেচ্ছাপ করেছে। ভাবতে পারিস? আমার নিজের ভাগ্নী! মায়ের হতশ্রী পোড়ো জন্মভিটে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে ল্যাংটো মডেলের ছবি বিলেতে বেচছে!
বাপ্পাদিত্য চুপ করে থাকে। ফোটোশ্যুট করতে আলো টিম নিয়ে সাতগাঁ গিয়েছিল সে কথা শুনেছে, কিন্তু বাগানে টয়লেট টেন্ট বানিয়েছিল কি না সেটা জানে না। সিধু আমেরিকায় যাবার পর আলোর সঙ্গে যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে সে কথা আর কানাইকে বলে না।
‘তুই একদিন আয় বাপ্পাদাদা, তোর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে চাই। আমি ঋষিকেশ থেকে ফিরব মাসের শেষে, তারপর একদিন আয়।’
‘ঋষিকেশ?’
‘হ্যাঁ। আমাদের সঙ্ঘের শাখা প্রচারকদের নিয়ে শিবির চলছে এখানে। বুধবার এসেছি,’ কানাই বলে। ‘তোকে একটা জিনিস বলা হয়নি বাপ্পাদাদা, শুনে তোর ইন্টারেস্টিং লাগবে। বিশুকার হাত-কাঁপার সেই রোগটা শুরু হবার পর দাদুকে ঋষিকেশের ঠিকানায় চিঠি লিখেছিল মনে আছে? তার উত্তরও এসেছিল, কবে কখন গঙ্গার জলে মেশানো ওষুধ খেতে হবে সে কথা জানিয়ে পোস্টকার্ড। অচেনা কারোর হাতে লেখা। তারপর থেকে সাতগাঁর অনেকেই দাদুকে অসুখের কথা জানিয়ে চিঠি লিখতে শুরু করে, সঙ্গে মানি অর্ডারে ওষুধের দাম। উত্তরও আসত। ঠিকানাটা আমার মনে ছিল। সেদিন জায়গাটা খুঁজে বের করলাম। রামঝুলার কাছে গলির ভেতর দোতলায় একটা ছোট্ট অফিস। শুধু সাতগাঁ নয়, ইউপি বিহার ঝাড়খন্ড থেকে হিন্দি বাংলা ভোজপুরি মৈথিলীতে লেখা চিঠি আর মানি অর্ডারে টাকা আসে। রমরমা ব্যবসা। অফিস চালায় যে লোকটা সে রামপ্রাণ চক্রবর্তীর নামই শোনেনি। সে মালিকও নয়, মালিক থাকে দিল্লিতে।’
