সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.৩
১৩.৩
ফোনে সিধু যখন ব্ল্যাকবক্সে খুঁজে দেখার কথা বলল, বাপ্পা ওর মুখ দেখতে পায়নি। কিন্তু ঠোঁটের কোনে একটা বাঁকা হাসি কল্পনা করতে পারছিল। তিনজনে যখন এক ছাতের নীচে থাকত, গায়ত্রী আর সিধু দুজনে মিলে যে জিনিসটা নিয়ে মাঝেসাঝেই বাপ্পার পেছনে লেগে মজা পেত সেটা হলো ওই ব্ল্যাকবক্স। তারপর গায়ত্রীও ফোনে ব্ল্যাকবক্সের প্রসঙ্গ তুলল। দুজনের কেউই এবার মজা করার জন্যে নয়, ওকে সাহায্য করার জন্যেই বলেছে। সেটা মনে হতে বাপ্পা অনেকদিন পরে শোবার ঘরে ওয়ার্ডরোবের ওপরে লটে মই লাগিয়ে কালো ব্রিফকেসটা পাড়ল।
মি’লেডি, ব্ল্যাকবক্স বিমানে থাকে। দুর্ঘটনায় বিমান ভেঙে পড়লে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ব্ল্যাকবক্সটি উদ্ধার করে তার মধ্যে রেকর্ড হয়ে-থাকা পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথন থেকে দুর্ঘটনার কারণ নিরূপণ করা হয়। বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের ব্ল্যাকবক্স একটি কালো চামড়ার ব্রিফকেস। তার ওপরের ফ্ল্যাপে হলুদ হয়ে আসা কার্ডে লেখা ঝাপসা হয়ে এসেছে, কিন্তু পড়া যায়:
Mr. Rathindra N. Chatterjee, WBCS [Ex.]
Block Development Officer, Dinhata
District–Coochbehar
West Bengal
কালো চামড়ার ব্রিফকেসের ভেতরে অজস্র হারানো দিনের কাগজ চিরকুট চিঠিপত্র ফোটোগ্রাফ টিকিট স্টিকার দেশলাইয়ের খোল থেকে শুরু করে এমন অজস্র জিনিস রয়েছে যা বাপ্পা বাল্যকাল থেকে যত্ন করে জমিয়ে চলেছে, কোনো সময়ে ব্যক্তিগত স্মারক হিসেবে যার মূল্য ছিল তার কাছে, যা বেশিরভাগ এতই পুরোনো যে তার খেই ধরে সে আর ফিরে যেতে পারে না সেইসব স্মৃতির কাছে। ব্রিফকেসটি যখন তার হস্তগত হয় ততদিনে সেটি দিনহাটা থেকে রঘুনাথপুর পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে জীর্ণ হয়ে এসেছে। এর মধ্যে বাপ্পার অ্যাবাকাস, রং পেন্সিল থেকে শুরু করে কমিক্সের বই, রাশিয়ান কল্পবিজ্ঞানের বই, বাবাকে লেখা চিঠি (ভুল বানানগুলো লাল পেন্সিলে দাগানো), Dear Caterpillar সম্বোধন করে তিতলিকে লেখা চিঠি (যা কোনোদিন পোস্ট করা হয়নি), আর একটি স্ক্র্যাপবুক আছে।
স্ক্র্যাপবুকটা বাপ্পা পেয়েছিল রঘুনাথপুরের বাংলোয়। আগের অফিসার বদলির সময়ে হাজারটা অপ্রয়োজনীয় জিনিসের সঙ্গে ছেড়ে রেখে যায়। তার প্রথম কয়েকটি পাতায় লেখা অফিস স্টেশনারি, তার দাম, পরিমাণ, কেনার তারিখ সারিবদ্ধভাবে–টাইপরাইটারের রিবন, কালির বোতল, গালার স্টিক, ডাস্টার, জেমস ক্লিপ ইত্যাদির সঙ্গে তুঁতে আর একটি ইঁদুর-ধরা কল কেনারও উল্লেখ রয়েছে। স্ক্র্যাপবুকে পাতায় সাঁটা মার্টিন্স রেলওয়ে কোম্পানির টিকিট, ফুল টিকিট আর হাফ টিকিট, পাঞ্চ করা তারিখ পড়া যায় না, হয়তো আঙুল বুলিয়ে ব্রেইলের মতো পড়তে জানলে হয়, এছাড়া ট্রামের টিকিট, সিনেমার টিকিট, শিবকাশীর দেশলাইয়ের লেবেল, লাল-হলুদ হরতন চিড়েতন, লেন্টিকিউলার স্টিকার, যাতে সবজে ব্যাঙ ও সোনালি চুলের রাজপুত্র একই সঙ্গে।
একটি খোপের ভেতর শিউলির রিস্ট ওয়াচ, যেটা সাতগাঁয়ে যাবার সময় পরত। কাঁটাগুলো স্থির, ডায়ালটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। রথীনের চশমা। সুলতানি মোহর, বিশুকার দেওয়া। একগুচ্ছ চিঠি দূরে চাকুরিস্থল থেকে স্বামী লিখছে স্ত্রীকে, শ্বশুরমশাই লিখছেন জামাইকে, দুর্গাপুজোয় স্ত্রীপুত্র নিয়ে আসার নিমন্ত্রণ, জামাইষষ্ঠীতে বাড়ির গাছের আম খেতে আসার নিমন্ত্রণ, ঋতু পরিবর্তনের কালে সুস্থ থাকার পথ্য…
শিশুর জন্মের বার্তা দিয়ে লেখা কোনো টেলিগ্রাম নেই। শিশুর নামকরণের টেলিগ্রাম নেই। স্ট্যাম্প পেপারে ওষধিবাগানের জমির দানপত্রও নেই। থাকার কথাও নয়।
কাপড়ের ফ্ল্যাপের ভেতর এক সদ্য তরুণীর সাদাকালো ছবি, পেছনে নিমগাছ আর দাঁড়ের ওপর কাকাতুয়া বসে আছে। সাতগাঁ ছেড়ে আসার দিন বিশুকা দিয়েছিল।
শিউলির বিয়ের অল্প কিছুকাল আগে ছবিটা তুলেছিল হেমন্ত। সেইসময় সে বসন্তর কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় প্রাকৃতিক আলোয় ছবি তোলার পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে, অনেক ছবিতেই বোনকে মডেল রূপে ব্যবহার করছে। মোমবাতির আলো থেকে শুরু করে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় শিউলির যে অসংখ্য ঝাপসা ছবি, বিজবিজে দানা-ওঠা ইমেজ আর সিল্যুয়েট তুলেছিল সে, তার মধ্যে শুধু এই একটিই রয়ে গিয়েছে। এই ছবিটা তোলা হয়েছিল বেলা-পড়ে-আসা কোনো এক শরতের অপরাহ্ণে, সূর্যাস্তের কিছু আগে, যখন আকাশে অদ্ভুত সব রঙ ফোটে। শিউলির পরনে ফুলহাতা কলার তোলা ব্লাউজ আর সাদা শাড়ি। শাড়ির পাড়ের রং ছবিতে কালো। কিন্তু বাপ্পা জানে ওটা আসলে নীল, স্কুলের পোশাক। বুকের ওপর ডান হাতটা আড়াআড়ি রেখে, হাতের মুঠোয় বাঁহাতের কনুইয়ের ভর রেখে তালুর ওপর চিবুক হেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোড়া বিনুনির বাঁদিকেরটা যথারীতি ঝুলে পড়েছে পেন্ডুলামের মতো। চোখে নির্লিপ্তি, ঠোঁটের রেখায় চেপে রাখা বিরক্তি খুব সম্ভব অনেকক্ষণ ধরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে দাদার মর্জিতে। ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাপ্পা টের পায় নিমের পাতাগুলো ঝিরঝিরি দুলছে। উঠোনে ইটের ফাঁকে আমরুলের পাতায় আলো মরে আসছে, আদিরাম মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘন্টা বাজছে। এই আলোছায়ার আয়োজনে সে পৃথিবীতে কোথাও নেই ভাবতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে।
