সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৩
২.৩
দিনের আলো ফুরিয়ে যাবার আগেই শাকম্ভরী দেবীকে জল থেকে তুলে আনা হলো। পলকা বিশীর্ণ দেহটি বিশু, বসন্ত আর শিবু ধরাধরি করে আনার সময় ওঁর মাথার লম্বা সাদা চুলের গুছি ঘাটের সিঁড়ি ছুঁয়ে গেল। কোমরের নীচ থেকে পা দুটো জলে থাকার জন্য কাগজের মতো সাদা আর কোঁচকানো। ছাউনির ভেতর এনে ঘাসের মাদুরে শোয়ানো হলো। মাথার চারদিকে জ্যোতির্বলয়ের মতো ছড়ানো চুল, চোখ বন্ধ, এক পাশে বাঁধানো গীতা রাখা হয়েছে। বিশুকা মাটির হাঁড়িতে গঙ্গাজলে আঙুল ডুবিয়ে কয়েক ফোঁটা ফেলে দিল বন্ধ ঠোঁটের ওপর। বাপ্পা দেখে, চিবুকের বলিরেখা বেয়ে ব্যাগাটেলির গুলির মতো গড়িয়ে পড়ছে জলবিন্দু। চারদিকে শ্মশানযাত্রীর দল গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামপ্রাণ ছোট্ট বাপ্পার হাত ধরে সেই বৃত্ত ভেদ করে নিয়ে এসেছেন ওঁর মাথার কাছে। বাপ্পার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে–চোখ বন্ধ করে কী করে বইটা পড়বে?
‘পিসিমা! ও পিসিমা! দেখ কে এয়েছে!’ রামপ্রাণ উবু হয়ে বসে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন।
দাদুর নির্দেশে বাপ্পা ঝুঁকে পড়েছে মুখের কাছে, দেখতে পাচ্ছে বন্ধ কোঁচকানো ঠোঁটের ওপর একটি জলের ফোঁটা টলটল করছে। সে ক্রমশ বুঝতে পারছে ওকে এখানে নিয়ে আসার আসল উদ্দেশ্য — বৃদ্ধাকে শেষবারের মতো দেখা নয়, দেখা দেওয়া।
‘চোখ মেলে দেখ তোমার কে এসেছে!’ রামপ্রাণ আরেকবার বললেন। এবং কয়েক মুহূর্ত পরে চোখের পাতাদুটো তিরতির করে কাঁপতে শুরু হলো, যেন গুটি কেটে বেরিয়ে আসছে মথ। এবং খুলে গেল। অস্বচ্ছ চোখের মণি ঘুরে এসে নিবদ্ধ হলো বাপ্পার মুখের ওপর। এবার ঠোঁটদুটো কাঁপতে লাগল, জলের বিন্দুটা সেই ফাকে ঢুকে গেল মুখের ভেতর। বলিরেখাময় মুখে ফুটে উঠল হাসির আভাস।
সে হাসি বাপ্পার জন্য নয়। শাকম্ভরী তাকিয়েছিলেন সুদূর অতীতে, এক শিশুর ভেতর দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করছিলেন পরলোকগত খুল্লতাত গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে।
.
বাপ্পার শৈশবের প্রথম স্মৃতি: খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে কারোর কোলে চড়ে ঘরদোর উঠোন বারান্দা পেরিয়ে চলেছে। লোকটি তার দাদু, কারণ সে নস্যির সঙ্গে মেশা ফার্মেসির ওষুধ-ওষুধ গন্ধটা পাচ্ছে। অনেক পথ যাবার পর ওরা একটা ছোটো ঘরে এসে পৌঁছোল। নীচু আলকাতরা-মাখানো কড়িবরগার ছাত, লাল মেঝে চৌচির ফুটিফাটা। সদ্য হাঁটতে শেখার পরে ওই রকম মেঝের ওপর হাঁটতে তার খুব ভয়, মনে হয় ওই সরু ফাটল গলে ভেতরে পড়ে যাবে, ঢুকে যাবে পিঁপড়েদের দেশে, যারা আকাশে মেঘ করলে বাদলা পোকা হয়ে বেরিয়ে এসে ওড়ে বাড়িময়। কিন্তু তখনও বাপ্পা হাঁটতে শেখেনি। দাদুর কোলের ওপর থেকে দেখছে কোমর থেকে ভাজ হয়ে সামনে ঝুঁকে আসা এক থুথুরে বুড়ি, তাঁর লোল চামড়া হাড়ের কঙ্কালে মেলে দেওয়া ভিজে কাপড়ের মতো ঝুলছে, টলমল করে হেঁটে এসে মাথা তুলে বাপ্পার দিকে চাইলেন। বলিরেখাময় মুখে ফুটল সেই হাসিটা। ঠান্ডা দড়ির মতো আঙুল দিয়ে বাপ্পার ডান পা ধরে বুড়ো আঙুল ডুবিয়ে দিলেন ছোট্ট তামার পাত্রে গঙ্গাজলে। তারপর এক চুমুকে সেটি গিলে নিয়ে ভিজে আঙুল মুছলেন নিজের মাথায়। বাপ্পা দেখতে পাচ্ছে, বুড়ির পাতলা চুলের ফাঁকে গোলাপি তুলতুলে মাথার চামড়া। এবার তিনি নিয়ে এলেন সেই বস্তুটি, যার অপেক্ষায় বাপ্পা এই বিচিত্র আচার লক্ষ্মীছেলে হয়ে সহ্য করেছে–কালো পাথরের খোরায় একটি সাদা শাঁখ সন্দেশ। সেটি ভেঙে ওর মুখে গুঁজে দিলেন, তারপর থুতনি নেড়ে চুমু খেলেন।
সেই ছোটোবেলাতেই বাপ্পা বুঝতে পারত, তাকে বোঝানো হয়েছিল, ওই চুমুটা তার জন্য, আর পায়ের বুড়ো আঙুল ধুয়ে জলপান এক পূর্বপুরুষের জন্য। বাপ্পার জন্মের প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে তিনি মারা যান, বাপ্পার ভেতরে তাঁর আত্মা ফিরে এসেছে। এই ফিরে আসার আগাম বার্তা বৃদ্ধা স্বপ্নে পান। সেই পূর্বপুরুষের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি বাপ্পা দেখেছে ফার্মেসির চেম্বারের দেয়ালে, এক দেবতা ও এক সাহেবের ছবির পাশে। সাতগাঁয় থাকলে প্রতিদিন সকালবেলায় নিয়ম করে বৃদ্ধাপ্রপিতামহীর কাছে নিয়ে যাবার এই অদ্ভুত আচারটি পালিত হতো, যার শেষে বাপ্পার বরাদ্দ ছিল একটি শাঁখ সন্দেশ। ব্যাপারটা বাড়ির বড়োরা কৌতুকমিশ্রিত প্রশ্রয়ের চোখে দেখত। এবং বাপ্পা বাঙালপুত্র হওয়া সত্ত্বেও এই নিয়ে কেউ ঠাট্টাতামাশা করেনি। এর আগেও একাধিক পিতৃপুরুষ মৃত্যুর পর এভাবে ফিরে এসেছেন, এই আদিরামবাটিতেই এসেছেন। তাঁদের আত্মা মোক্ষলাভ প্রত্যাখ্যান করে ফিরে এসেছেন পরিবারে কোনো-না-কোনো নারীর গর্ভে। কেবলমাত্র পুরুষেরাই এসেছেন, নারীরা নন।
‘এ হল রক্তের আঠা!’ শাকম্ভরী দেবী বলতেন। ‘যত গড়ায় তত গাঢ় হয়।’
বাপ্পার মতোই ওর হেমন্তমামার জন্মের ঠিক আগে ছোটোকাকা পাগলরাম চক্রবর্তীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন শাকম্ভরী। সাতগাঁর বাস উঠিয়ে কলকাতায় গিয়ে থিতু হয়েও তিনি আদিরামবাটিতে ভিলা বানিয়েছিলেন, সাধ করে নাম দিয়েছিলেন— ‘এল-ডোরাডো’। ইচ্ছে ছিল শেষ জীবনটা এখানে এসে কাটাবেন। সেটা আর সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর অনেককাল পরে তিনি ফিরে এলেন রামপ্রাণের স্ত্রী সরোজার গর্ভে।
.
শাকম্ভরীর নিজের গর্ভে ফিরতে চাওয়া আত্মারা বারে বারে নিস্ফল হয়েছে। গর্ভনালী কন্ঠে জড়ানো মৃত শিশু প্রসব হয়েছে। উনিশবারের পর গঙ্গারাম ফিরিয়ে আনতে চাইলে ওঁর শ্বশুরবাড়ির অসম্মতি ছিল।
‘বিকলগর্ভ মেয়ে গছিয়ে দিয়ে এখন সমাজে আমাদের মুখ পুড়িয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান?’ বলেছিলেন মথুরের পিতা রাজবল্লভ রায়। ‘ছেলের আবার বিয়ে দেব, তারপর কবে কখন ফেরত পাঠাবো সে আমরাই ঠিক করব!’
বড়ো মেয়ে কাত্যায়নীকে হতদরিদ্র পুরোহিতের ঘরে বিবাহ দেবার পর অনুশোচনা থেকে গঙ্গারামের দাদা রামানুজ প্রভূত যৌতুক দিয়ে শাকম্ভরীকে চাঁদেরডাঙার বিখ্যাত বানিয়ান গোকুলচন্দ্র রায়ের বংশের মথুরের হাতে পাত্রস্থ করেন। দুফে সাহেবের ডাগেরোটাইপ স্টুডিওর এজেন্ট হয়ে কলকাতায় গিয়ে ব্যবসা দেখত মথুর রায়। মহানগরে প্রমোদের পঙ্কিল চোরাগলিতে হারিয়ে যায়। মেয়ের এই দশা অবশ্য রামানুজকে দেখে যেতে হয়নি।
মথুরের ঘোলাটে চোখ, চামড়ায় লাল লাল ছোপ আর অনুজ্জ্বল চুল দেখে গঙ্গারামের প্রশিক্ষিত চোখ সমস্যাটা আন্দাজ করেছিল। তাই রাজবল্লভ তাঁর ভাইঝির গর্ভ নিয়ে খোঁটা দিতে তিনি সে ব্যাপারে ইঙ্গিত করেন। সেই শুনে মথুরের মা দরজার ওপাশ থেকে গায়ের গয়না ঝমঝমিয়ে ফুঁসে উঠলেন–
‘বেয়াইমশাই যে দেখি বড়ো কবিরাজি বিদ্যে ফলাতে এয়েছেন! ছেলে আমার সোনার আংটি, তার আবার সোজা আর ব্যাঁকা!’
‘তা বটে!’ গঙ্গারাম বলেছিলেন। ‘তবে কী না বীজ পোকাধরা হলে ফসলের আকাঙ্ক্ষা দুরাশা!’
তিনি আর কালাতিপাত করেননি। তার মাত্র দিনকয়েক আগেই ভাইপো রামশশাঙ্কের স্ত্রী প্রসবকালীন রক্তপাতে মারা যায়। সেই মৃত্যু গঙ্গারাম ঠেকাতে পারেননি। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাননি। বাড়িতে দুধের শিশুটি জীবিত ছিল। শাকম্ভরী আদিরামবাটিতে ফিরে এলেন বুকভরা দুধ আর স্খলিত জরায়ু নিয়ে।
