সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৮
৪.৮
শাকম্ভরী দেবী কাশীবাসী হবার পর সেবার প্রথম আলিপুরদুয়ার থেকে দূর্গাপুজো উপলক্ষ্যে সাতগাঁয় গিয়ে তিনটি পরিবর্তন লক্ষ করল বাপ্পা:
১ – মান্দাসী নেই।
২ – অ্যান্টনি রয়েছে বেতের খাঁচায়।
৩ – সারা বাড়ির দেয়ালে শাকম্ভরী দেবীর হাতের ছাপ নতুন চুনকামের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে।
বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করার অনুসন্ধিৎসা ছোটো বালকের মধ্যে থাকে না, বাপ্পারও ছিল না। এর মধ্যে শেষোক্তটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী কিছুও ছিল না। প্রতিবছর দুর্গাপুজোর আগে আদিরামবাটিতে নতুন রঙের পোঁচ পড়ত। তফাত শুধু এই, সেবার দেয়ালে নির্দিষ্ট উচ্চতায় আর তার ওপর নতুন করে হাতের ছাপ পড়ল না। অ্যান্টনি কেন বেতের খাঁচায় এ ব্যাপারে জানতে চাওয়ায় ঠিক কী উত্তর পেয়েছিল সেটা আর মনে পড়ে না। কিন্তু মান্দাসীকে না দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়েছিল, এবং বারে বারে ওর মায়ের কাছে দিদার কাছে জিজ্ঞেস করছিল। ওকে বলা হলো, মান্দাসীকে তার বাড়ির লোক এসে নিয়ে গেছে। তাতে বিষ্ময় কমেনি বরং বেড়ে গিয়েছিল, তার কারণ বাপ্পার মনে ছিল এর আগে একবার মান্দাসীকে সে জিজ্ঞেস করেছিল
‘সত্যিই তুই কলার ভেলায় ভেসে এসেছিস?’
মান্দাসী মাথা ওপর নীচে নেড়েছিল। তার মানে, হ্যাঁ।
‘কোথা থেকে এসেছিস?’ বাপ্পা জানতে চেয়েছিল।
মান্দাসী কাদা মাখা হাতে পুতুল গড়তে গড়তে মাটির পাহাড় ছাড়িয়ে, শিয়ালকাঁটার ঝোপ ছাড়িয়ে, আমের বন ছাড়িয়ে দূরে তর্জনী নির্দেশ করেছিল।
‘কতদিন ধরে ভেসে ভেসে এসেছিস?’
মান্দাসী হাতের পাঁচটা আঙুল প্রসারিত করেছিল। পাঁচ।
‘তুই পাঁচদিন কী খেয়ে ছিলিস?’
মান্দাসী ওর লম্বা জিভ বের করে ঠোঁটের ওপরটা চেটেছিল। ঘাম।
‘তোর ভয় করেনি?’
মান্দাসী মাথাটা দুদিকে নেড়েছিল। না।
‘তোর কেমন লাগছিল?’
মান্দাসী এবার মালসার জলে হাত দুটো ডুবিয়ে ধুয়ে নিয়ে আঙুল দিয়ে নিজের
দুটো চোখের পাতা উলটে দিয়ে ফুটিয়েছিল বড়ো বড়ো দুটো চোখ, পাতার উলটো পিঠে গোলাপী নীল শিরাউপশিরা, অবিকল যেন ঠাকুরবাড়িতে প্রভু জগন্নাথের গোল গোল চকা আঁখি।
সেই দেখে তিতলি ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। বাপ্পাও আর কোনোদিন এ ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করার সাহস করেনি। এমনকি মান্দাসীর উরুর ওপর দিকে ওই ত্রিভূজাকার দাগটা, যা উবু হয়ে বসলে ফ্রক সরে গিয়ে ইজেরের ঠিক নীচে ফুটে উঠত, আর কখনো দেখতে চায়নি সে। কিন্তু মান্দাসীর যে সত্যিই কোথাও বাড়ি ছিল, এবং সেই বাড়ি থেকে যে কেউ কোনোদিন এসে ওকে নিয়ে যেতে পারে, এটা কখনো বাপ্পার কল্পনাতেও আসেনি। দুর্গাপুজোয় আদিরামবাটিতে আসা অনেক লোকজনের মধ্যেও ওর অভাব অনুভব করছিল সে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, মান্দাসীর গায়ে ছায়ার মতো সারাক্ষণ সেঁটে থাকত যে তিতলি, তার মধ্যে
কোনোরকম হেলদোল দেখল না।
সেই সময় তিতলি দ্রুত বড়ো হচ্ছে, মাটির পুতুল আর খেলনা জীবজন্তু ছেড়ে ওর আগ্রহ সরে গিয়েছে সত্যিকারের জীবজগতের দিকে। শাকম্ভরী না থাকায় নির্জন মেটেঘরের দাওয়ায় পাল্কির কুঠুরিতে পাঁচটি ছানা হলো ধুলোর। তিতলির সমস্ত মনোযোগ গিয়ে পড়ল ওদের প্রতি, নিজের সদ্য-ছেড়ে আসা শৈশবে প্রতিপালিত হবার সমস্ত স্মৃতি সে উজাড় করে দিল ওই ক্ষুদে ছানাগুলোর ওপর —পেনের কালির ড্রপার দিয়ে দুধ খাওয়ানো, ন্যাকড়ার বিছানায় শুইয়ে ঘুম পাড়ানো, হুলোর নজর থেকে বাঁচাতে বেতের দোলনাটা উলটে দুর্গ তৈরি করা, এইসব। মান্দাসীর কথা ওর আর মনে রইল না।
মান্দাসীর কথা বাপ্পারও আর মনে রইল না।
সেই ঘটনার বহু বছর পরে কানাইয়ের কাছ থেকে বাপ্পা জানতে পারবে:
১ – মান্দাসীর পেটে বাচ্চা এসেছিল।
২ – বামুনদি প্রথম সেটা ধরতে পারে।
৩ – মান্দাসীকে গর্ভবতী করেছিল অ্যান্টনি কাকাতুয়া।
সরোজা ও বামুনদির বহু চেষ্টা সত্ত্বেও, আদিরামের পায়ের ফুল এনে দিব্যি কাটানোর পরেও মান্দাসী ওর অবিশ্বাস্য দাবী থেকে একচুল নড়েনি। বিষয়টা খুবই সংবেদনশীল, এবং বিস্ফোরক, তার কারণ যে তিনটি মৌসম মান্দাসী আদিরামবাটিতে ছিল, বাড়ির সদর দরজা থেকে একদিনের জন্যেও ওকে কেউ বাইরে পা রাখতে দেখেনি, ফার্মেসিতে বাইরের রোগীদের মাঝে যেতে দেখেনি, টোলের বাড়িতে ছাত্রাবাসেও কখনো একা যেতে দেখেনি। রাত্রিবেলা ভাঁড়ারঘরের মেঝেয় বামুনদির পাশেই মাদুর পেতে শুত সে। দীর্ঘ সময় বিভিন্নভাবে জেরা করার পরেও যখন ওর পেট থেকে অন্য কোনো কথা বের করা গেল না, তখন গোপনে নন্দর-মাকে ডেকে পাঠানো হলো। নন্দর-মা তামার ছোট্ট ঘটিতে জলপড়া এনে মান্দাসীর চোয়াল খামচে ধরে হাঁ করিয়ে মুখের ভেতর সেই জল ঢেলে দিয়ে বলল
‘দ্যাখ বিটি, সাচা কথা কইবি! নইলে কিন্তুক এই জলপড়া তোর পেটে গিয়ে কালকেউটের বিষ হবে!’
জলপড়া পেটে যেতে কিছুক্ষণের মধ্যে মান্দাসী একটু আচ্ছন্ন মতো হয়ে পড়ল। ঝিমধরা গলায় বলতে লাগল কীভাবে প্রতি রাতে বামুনদি ঘুমিয়ে পড়ার পর যখন নাক ডাকতে শুরু করত, দাড় থেকে নেমে ওর কাছে আসত অ্যান্টনি। তীব্র কৌতূহলে মরতে মরতে মান্দাসী শুধু দেখতে চেয়েছিল একটা পাখি কতদূর যেতে পারে, ছোটোবেলায় পাটক্ষেতে এক চরুয়া যুবক যতদূর পেরেছিল তার চেয়ে ঢের ধূর্ত দক্ষতায় আরও বেশিদূর যেতে পারে কি না জানল যখন, ততদিনে যা হবার হয়ে গিয়েছে।
এরপর সরোজা আর ওকে বাড়িতে একদিনও রাখেননি। এক অম্বুবাচীর দিন মান্দাসী সদর দরজা দিয়ে আদিরামবাটিতে এসেছিল, আরেক জ্যৈষ্ঠ মাসে চতুর্থীর দিন সে এ বাড়ি ছাড়ল পেছনের দরজা দিয়ে, দুপ্রস্থ পোশাক আর সামান্য যা কিছু অস্থাবর সম্পত্তি তার জমেছিল সেসবের পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে। আমবনের সরু পায়ে – চলা যে পথ দিয়ে মেথরানীরা আসত, যে পথ দিয়ে প্রসব করাতে আসত দাই, সেই পথ দিয়ে সে নন্দর-মায়ের সঙ্গে চলে গেল। যতটা রহস্যে ঘেরা ছিল ওর আসা, ততটাই ওর এভাবে চলে যাওয়া। এ ব্যাপারে কেউ জিজ্ঞেস করলে সরোজার বাঁধা উত্তর ছিল— ‘ওর বাড়ির লোক এসে নিয়ে গেছে।’ কোথা থেকে কবে এল, কীভাবে জানল, কীভাবেই বা গেল, এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো জবাব দিতেন না। জ্ঞাতিবউয়েরা কেউ কেউ বিশেষ কৌতূহল দেখালে, কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করলে বলে উঠতেন
‘রাখ দিদি, যে যার নিজের ভাগ্য মাথায় করে নিয়ে আসে। পাপপুণ্য যার যার তার তার!’
মান্দাসীর নাম এবাড়িতে আর কেউ উচ্চারণ করত না। শুধু বামুনদি কখনো সখনও চাল বাছতে বাছতে কিংবা কুটনো কুটতে কুটতে সরোজাকে বলত, মান্দাসী নাকি হঠাৎ হঠাৎ চোখের আড়ালে চলে যেত, ডাকলেও কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না, আবার হঠাৎ করে চোখের সামনেই উদয় হতো। রাত্রিবেলা বাগানে বিচিত্র শব্দে ঘুম ভেঙে দেখত মাদুরের ওপর মান্দাসী নেই, আবার একটুক্ষণ চোখ লেগে যাবার পর ফের উঠে দেখা যেত ঘুমিয়ে আছে।
বামুনদির এসব কথায় সরোজা কোনো সাড়া দিতেন না, তাঁর মনে পড়ত অম্বুবাচির দিন নির্জন ঘাটে সেই মশারি ঢাকা ভেলাটির কথা, তার দুদিন আগে শাকম্ভরী দেবীর স্বপ্নে দেখা কুয়াশার জাহাজের কথা, মান্দাসীর উরুর ওপর দিকে সেই ত্রিভূজাকার দাগটির কথা।
নন্দর-মা মান্দাসীকে নিয়ে চলে যাবার পরে-পরেই শাকম্ভরী দেবী পরাণের কাছে কাশীবাসী হবার বাসনা ব্যক্ত করলেন। এর আগেও একাধিকবার তিনি সেটা করেছেন, কিন্তু এবার তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে রামপ্রাণ আর না-করতে পারলেন না। বিশুকে সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন।
.
মায়ের সঙ্গে বাপ্পা সেবার ওঁকে শেষ বিদায় জানাতে হাওড়া স্টেশনে গেল। সেখান থেকে ওরা রনোর সঙ্গে বাগবাজারে শিউলির কলকাতার দিদার বাড়িতে যায়। তার কয়েকদিনের মধ্যেই রথীনের আলিপুরদুয়ারে অতিরিক্ত মহাকুমা শাসক হিসেবে বদলির অর্ডার এল। তখন পুজো আর বেশি দেরি নেই, যতদিন না ওখানে কোয়ার্টার পেয়ে গুছিয়ে বসে শিউলি ও বাপ্পাকে নিয়ে আসতে পারে, ততদিন ওরা সাতগাঁয়ে গিয়ে থাকবে স্থির হলো। শীতের শেষে গামা গাড়ি বোঝাই করে যে গঙ্গা-ছেঁচা মাটি এনে বাগানের ধারে ডাঁই করে, যার ওপর বৃষ্টি পড়ে ছেয়ে আসে অচেনা সবুজ লতা, বাপ্পা আর তিতলির দুর্গম খেলার পাহাড়, সেই পাহাড়টা কীভাবে প্রতিমা হয়ে যায় চাক্ষুষ করল সে সেবার প্রথম।
মি’লেডি, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন একটি ছোট্ট অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়। আগের বছর দশমীর সন্ধ্যায় যে কাঠামো গামা জল থেকে তুলে গাড়িতে চাপিয়ে দুর্গাদালানে এনে রেখেছিল, সারাবছর যেটা অনাদরে পড়ে থাকে, মাকড়শা জাল বোনে, ওইদিন সেটি গঙ্গাজলে ধুয়ে গায়ে তেলসিঁদুর হলুদ মাখিয়ে দা ছুঁইয়ে যায় পোটোদাদু ও তার কিশোর নাতি। বংশ পরম্পরায় আদিরামবাটিতে ওরা এই কাজ করে আসছে। কাঠামোর গায়ে প্রথমে জড়ানো হয় খড়, তারপর চাপে মাটি। পাটের ফেঁসো মেশানো মাটির পুলটিস দেওয়া হয় পরতের পর পরত। সিংহ, মহিষ ও অন্য জীবজন্তুদের ছাড়া মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের মুখগুলি গড়া হয় কাঠের ছাঁচে মায়ের জন্য বড়ো ছাঁচ আর লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিকের জন্য একটিই ছোটো ছাঁচ। কেবল গণেশ পায় খড়-মাটির হাতির মাথা। নরম ভিজে মাটি আশ্বিনের অমল আলোয় দো-মেটে তিন-মেটে হয়, ফাটলে জড়ানো হয় ন্যাকড়ার পটি, সোঁদা ভাপ ওঠে। কদম গাছের ফাঁক দিয়ে আসা তেরছা আলোয় মাটির ত্বকে হাত ছোঁয়ালে যে ওম, মান্দাসী নারকেল পাতার আগুনে তাপ দিত যখন, আর শুঁয়োপোকা আড়মোড়া ভেঙে উঠত, ওর ফর্সা ত্বকে মান্দাসীর হাতের তালুর জামরঙ উত্তাপ হয়ে চুঁইয়ে গড়াত, তেমনই ওমের মতো রঙ এই মাটির ধূসরে!
‘উই দ্যাখ দাদু, পিতিমের গা ছুঁচ্ছে!’ পোটোদাদুকে সতর্ক করে কিশোর নাতি। ‘ও কী করছ খোকা, কাঁচা প্রতিমার গায়ে হাত দিচ্ছ?’
রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে শিউলি বলে—
‘এখনও দেবীপক্ষ পড়েনি, পিতৃপক্ষ চলেছে। এখন পিতৃপুরুষের আত্মারা নীচে নেমে আসেন। এসময়ে কোনো খারাপ কাজ করতে নেই।’
‘আমি কি কোনো খারাপ কাজ করেছি?’
‘করেছ তো! তুমি দেবীপ্রতিমার গায়ে হাত দিয়েছ।’
‘পোটোদাদু যে হাত দেয়?’
‘পোটোদাদুর কথা আলাদা। যতদিন না চোখ আঁকা হয়, ততদিন পোটোদাদু মা দুর্গার ছেলে। ওর ওপর ঐশী শক্তি ভর করে।’
‘ঐশী শক্তি কী?’
‘ঈশ্বরের থেকে পাওয়া শক্তি। ঘুমোও এবার।’
‘আর কখনো করব না। বাবাকেও বলব না।’
‘আচ্ছা বেশ, ঘুমো এবার।’
কিন্তু বাপ্পার ঘুম আসে না, মাথায় প্রশ্ন ভীড় করে আসে। পোটোদাদুর ওপর সবসময়েই কি ঐশী শক্তি ভর করে আছে? যখন আসনপিড়ি হয়ে বসে ভাত খায়, গামার থেকেও বেশি ভাত খায়, রোগা শিরা-ওঠা হাতে তরকারিটা কলাপাতার ওপর এদিক থেকে ওদিকে সরিয়ে গড়ানো তেলমশলা ভাতে মেখে চটকে গোল্লা পাকিয়ে একমেটে দোমেটে তিনমেটে করে মুখে ভরে, তখনও কি ঐশী শক্তি ভর করে আছে? আর যখন অর্ধেক কাঁচা লঙ্কা দাঁতে কাটে, আর চশমাটা নাকের কাছে ঝুলে আসে, চোখ বুজে আসে, তখনও কি ঐশী শক্তি ভর করে আছে? আর যখন ওর পেতলের ঘটিটা মুখের ওপর উঁচু করে তুলে ধরে ঢকঢক করে জল খায়, কন্ঠার হাড়টা ওঠে নামে ছোটো রেলগাড়ির ইঞ্জিনের পিস্টনের মতো, তখন? ভাত খাওয়া সেরে চালচিত্রের সামনে মাদুর বিছিয়ে কাঁচা মাটির সোঁদা ছায়ায়, কদমের ঝিরিঝিরি আলোছায়ায় ঘুমোয় যখন, তখনও কি ঐশী শক্তি ভর করে?
পিতৃপক্ষে আত্মার দল নীচে নেমে আসে, দেবীপক্ষে সাতগাঁয়ে আসে আত্মীয়গুষ্টির দল। তখন আকাশ মটরশুঁটি ফুলের মতো নীল, তাতে ভাসে বুড়ির- চুল মিঠাই মেঘ, মার্টিন্স কোম্পানির রেললাইনের দু ধারে কাশফুলের রুপোলি নিশান–সাতগাঁয়ে ফেরার সুসময়। পোটোদাদু প্রতিমার মুখে চক্ষুদান করে, দুর্গাদালানে সম্পূর্ণ একা, মশাইয়ের নির্দেশমতো তিথি নক্ষত্র অনুসারে। তখনই মাটির প্রতিমায় প্রাণসঞ্চার ঘটে, মৃন্ময়ী চিন্ময়ী হয়ে ওঠে, সারা আদিরামবাটি জুড়ে ছড়িয়ে যায় উত্তেজনার বিদ্যুৎপ্রবাহ।
পঞ্চমীতে দেবীর বোধন, তার আগে মুখ ঢেকে রাখা হবে কাপড়ে। চোখের কালি শুকোনো আর কাপড়ে ঢাকার পড়ার মাঝে ওইটুকু সময়ে সকলে একবার করে এসে দেখে নেয় চকিতে। প্রতিবছর একই কাঠের ছাঁচ থেকে তৈরি হয় একই পানপাতা গড়নের মুখ, এবং প্রত্যেকের নির্দিষ্ট গায়ের রঙ –মা দুর্গা আর কার্তিকের কাঁচা হলুদ, সরস্বতীর সাদা, লক্ষ্মী ও গণেশের দুধে-আলতা। কিন্তু ভোররাতে পোটোদাদু নির্জন দালানে একা উঁচু টুলের ওপর উঠে বাঁ হাতে তেলের প্রদীপ ধরে ডান হাতে তুলির টানে মায়ের যে চোখ আঁকে তাতে একেক বছর মুখে ফুটে ওঠে একেকটি বিশেষ অভিব্যক্তি: দয়াময়ী, শাস্তিস্বরূপিণী, চঞ্চলা, দুঃখিনী, শঙ্কিতচিত্তা, রুদ্রচণ্ডী, অভয়দায়িনী… জ্ঞাতিবাড়ির মেয়েবউরা মুখের অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করে –যেভাবে তারা নবজাতকের মুখে পূর্বজর আদল খোঁজে— আগামী বছরটা কেমন যাবে তার আভাস ইঙ্গিত খুঁজতে থাকে।
সেবার শাকম্ভরী কাশীবাসী হলেন, সবাই বলল মা দুর্গার মুখে দুঃখিনী ভাব ফুটেছে।
‘এবারে মা দুর্গার দুঃখ?’ রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বাপ্পা জিজ্ঞেস করে মাকে।
‘হুঁ।’ শিউলি বলে।
‘লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ?—’
‘হুঁ, লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ।’
‘কাত্তিক ঠাকুরের দুঃখ?’
‘হুঁ, তাঁরও দুঃখ।’
‘হুঁ।’
‘সরস্বতীর?’
‘হুঁ।’
‘গণেশ ঠাকুরের?’
‘ময়ূর পেঁচা ইঁদুরেরও দুঃখ?’
‘হুম।’
‘সিংহের দুঃখ?’
‘সিংহের রাগ।’
‘মহিষের দুঃখ?’
‘মহিষ তো মরে গিয়েছে। মরলে কি আর দুঃখ হয়?’
প্রতিপদের দিন সকালে ঠাকুরবাড়িতে তোলাঘরের তালা খুলবে বিশুকা। আলিবাবার গুহার মতো প্রায়ান্ধকার সরু ঘরে কালো আলকাতরা মাখানো পেতলের কব্জা- আঁটা বিশাল বিশাল হার্মাদি সিন্দুক, যা নাকি একদা পর্তুগীজ জলদস্যুর জাহাজে থাকত। পুজোর বিভিন্ন সরঞ্জাম বাসনকোসন সব ওর মধ্যে থাকে। পুজোপার্বণ ছাড়া ঘরটা তালাবন্ধ পড়ে থাকে, ছাতের নীচে আলো ঢোকার ঘুলঘুলির ফোকরে খড়কুটো দিয়ে বাসা বানায় চটক পাখিরা। হার্মাদি সিন্দুকগুলো এত বড়ো যে বাপ্পা আর তিতলি দুজনেই একসঙ্গে ঢুকে লুকিয়ে থাকতে পারে অনায়াসে। আরশোলার গন্ধে ভারি তাদের অন্ধকার গর্ভ থেকে গামা টেনে বের করে আনে বড়ো বড়ো তামার থালা, সরা, হোমকুন্ড সবুজ পাতিনায় ঢাকা, কষ্টি পাথরের তৈজস, বড়ো বড়ো শাখ, চামর, কাঁসরঘন্টা, ডুগডুগি, জাহাজী লণ্ঠন ও আরও অনেক আশ্চর্য সব জিনিস। এসবই বহু শতাব্দী আগের, যখন আদিরামের মন্দিরটি ছিল খড়মাটির। তামার পাতে মোড়া মহিষের শিঙের লণ্ঠনটা কোনো এককালে নাকি বাঁধা থাকত পালতোলা জাহাজে মাস্তুলের মাথায়, দূর সমুদ্রে পাড়ি দিত। কিন্তু তার থেকেও যে দুটো জিনিস বাপ্পাকে প্রবল আকর্ষণ করে, তার একটি গন্ডারের খড়্গ থেকে তৈরি একটি কোষা, নৌকার আকারের, আর একটি হরিণের চামড়ার আসন। ততদিনে বাপ্পা কলকাতার চিড়িয়াখানায় জ্যান্ত গন্ডার দেখে ফেলেছে, তিতলি দেখেনি। তিতলি প্লাস্টিকের খেলনা গন্ডার দেখেছে কেবল। বিশুকা বলে, এই সাতগাঁর চারপাশে ছিল বাদাবন, গন্ডার ছিল, হরিণ ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে। সাহেবরা বন্দুক দিয়ে হরিণ শিকার করত। সেই গুলির দাগ রয়েছে হরিণের চামড়ার আসনে, গোল ফুটোর চারদিকে কালো কাজল পরা চোখের মতো। চিতল হরিণ তার বাদামি চামড়ায় গোছা গোছা সাদা আলোর চোখ, একটা কালো গুলির চোখ। বিশুকা বলে-
‘জানো তো, এই গন্ডার খড়্গের কোষা, এই হরিণচর্মের আসন নিয়ে রোজ আহ্নিক করতে যেত গঙ্গা পণ্ডিত।’
‘কোন গঙ্গা পণ্ডিত?’ তিতলি বলে। ‘বাপ্পাদাদা হয়ে যে ফিরে এসেছে?’
বিশুকা বলে— ‘হ্যাঁ সেই। স্বপ্ন দিয়ে এসেছে।’
তিতলি বলে,— ‘তোর আগের জন্মের পৈতের দাগটা দেখা বাপ্পাদাদা?’
বাপ্পা বলে,— ‘না!’
‘একবার দেখা না?’
‘না, দেখাবো না!’
তিতলি ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জামাটা টেনে তুলতে থাকে, দুধে দাঁত বের করে হি হি করে হাসে। বাপ্পার সামনের দুটো দাঁত ইঁদুরের গর্তে, এখনও নতুন বদলি দাঁত পায়নি সে। ঠোঁট চেপে থকে সে, তিতলির কব্জি খামচে ধরে, দুজনে তোলাঘরের মেঝের ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। বিশুকা বলে—
‘অমন করলে কিন্তু তোমাদের এঘরে আর কক্ষনও আনব না। এই দেখ চামর, চমরি গরুর লেজের চামর। আর এই যে ডুগডুগিটা, ওরই চামড়া দিয়ে তৈরি। কবে মরে ভুত হয়ে গিয়েছে কিন্তু এখনও লোম বেড়ে চলেছে, দেখ! আর এই শাঁখটা দেখেছ কত বড়ো? এটা কেউ আর বাজাতে পারে না।’
‘কেউ পারে না?’
‘না, কেউ পারে না।’
‘কেউ কোনোদিন বাজায়নি?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘শেষবার বাজিয়েছিল তোমাদের দাদুর ঠাকুর্দার বাবা। তাঁর নাম রাজারান সার্বভৌম। শাখটা এত জোরে বেজেছিল যে গড়ের পল্টন নেমে পড়েছিল, ভেবেছিল বুঝি বর্গিরা এসে পড়েছে।’
‘বর্গি কারা গো?’
‘বর্গি? বর্গি হল গিয়ে …’
বিশু ঠাকুর বলে, দুই শিশু চোখ বড়োবড়ো করে শোনে। ঘুলঘুলি দিয়ে শরতের বিকেলের আলোক রশ্মি এসে ঢোকে তোলাঘরের বদ্ধ বাতাসে, সেই আলোয় ওড়াউড়ি করে আনুবীক্ষণিক সাঁজালে মশা, উঠোনে কুয়োতলায় গামা তামার বাসন তেঁতুল-গঙ্গামাটি ঘষে ঘষে আগুনের মতো উজ্জ্বল করে তোলে, ডুগডুগির চামড়ায় লোম বেড়ে চলে।
কানাই পেটে আসার পর থেকে নতুনবউয়ের শরীর ভালো যাচ্ছে না, মেজাজ সারাক্ষণ সপ্তমে চড়ে থাকে। এই সময় তিতলি ওর মায়ের থেকে যতটা সম্ভব দূরে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। সেবার বাপ্পা আর শিউলি দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে চলে আসায় ওরা দুজনে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেল। ট্রেনে চেপে এসে আদিরামবাটিতে পা রাখা মাত্রই তিতলি ওর গলার কাছে পৈতের মতো জন্মদাগটা দেখে পরখ করে নিল এই বাপ্পাদাদাটাই সেই বাপ্পাদাদা কি না, তারপর বেড়ালের মতো ওর গায়ে কলকাতার গন্ধ শুঁকতে লাগল।
‘হার্লের মতো তেলপোড়া গন্ধ!’ খুশিতে নাক কুঁচকে বলে ওঠে তিতলি।
বাপ্পা ওর জুলপির নীচে পীচফলের রোঁয়ার মতো সূক্ষ্ম রোমে তর্জনি বুলিয়ে দেখে নিয়ে বলে— ‘শুঁয়োপোকা!’
বাড়ির লোকেদের পুজোর ব্যস্ততার মাঝে আগের থেকেও স্বাধীন আরও সাহসী ওর দুজনে ঘুরে বেড়ায় আদিরামবাটিময়। উঠোন পেরিয়ে ওষধিবাগান ছাড়িয়ে মন্দির ঠাকুরবাড়ি টোলের বাড়ি ছাড়িয়ে গলিতে নেমে ফার্মেসির দিক দিয়ে ঢুকে ফের ফিরে আসতে পারে, কিন্তু পেছনে শিয়ালকাঁটার জঙ্গলে আমবনের দিকে যেতে গেলে ভয় চেপে বসে দিনের বেলাতেও। গামা আর ওদের চিন্তামণির পিঠে চড়ায় না, কারণ ইতিমধ্যে চিন্তামণি আরও বুড়ো হয়েছে। বাপ্পা- তিতলিও বড়ো হয়েছে। কিন্তু আবার তত বড়ো হয়নি যে হার্লের পিঠে চাপতে পারে।
হার্লের মেজাজমর্জি যেন একটা প্রাণীর মতোই। শত লাথিতেও তার ইঞ্জিনের ঘুম ভাঙেনা, কিন্তু আবার একবার জেগে উঠলে তাকে বন্ধ করার ঝুঁকিও নেওয়া যায় না। সব মিলিয়ে চিন্তামণির থেকে ঢের বেশি জীবন্ত সে।
‘কবে বড়ো হব?’ অস্থির পা ছুঁড়ে তিতলি জিজ্ঞেস করে বসন্তকে— ‘বাবা, বল না কবে আমরা বড়ো হব আর তুমি আমাকে আর বাপ্পাদাদাকে হার্লে চড়াবে?’
‘যেদিন তোদের হাতগুলো আরও লম্বা হবে,’— বসন্ত বলে — ‘আর আমার কোমর জড়িয়ে ধরে সিটে বসতে পারবি!’
তিতলি ওর বাবার অতিকায় পেট দুহাতে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। বসন্ত হা হা করে হেসে উঠে বলে— ‘হলো না! হলো না!’ তখন বাপ্পা আর তিতলি দুজনে চার হাতে বেড় দিয়ে ধরে বসন্তর ঢোলের মতো ভুড়ি। বসন্ত হাত বাড়িয়ে দুদিক থেকে ওদের দুজনকে শূন্যে তুলে নেয়, ওদের কোমল গালে ঘষে দেয় ওর বুরুশের মতো দাড়ি। ফ্রেঞ্চকাট।
চিন্তামণি বুড়ো হয়েছে, অ্যান্টনিও বুড়ো হচ্ছে খাঁচার ভেতরে। কিন্তু বাপ্পা ওর খাঁচার ধারেকাছে যায় না। ওর কালো বাঁকানো টিকিট-পাঞ্চের মতো ঠোঁটদুটোকে তার বড়ো ভয়। তিতলি হাসে, দুয়ো দেয়।
‘জানিস কলকাতায় একরকম পাখি আছে হাড়গিলে?’ বাপ্পা চোখ গোলগোল করে বলে। ‘মানুষের চোখ উপড়ে খায়!’
‘অ্যান্টনি কিচ্ছুটি করে না। শুধু গালাগালি দেয়। দেখবি?’ তিতলি বামুনদিদার মতো গলা করে বলে–‘মুখপোড়া মিনসে!’
‘মিন্সে! মিলে!’ অ্যান্টনি বলে— ‘ফ্যদা! ফ্যদা-সি!’
‘আরেকটা মজার জিনিস দেখবি? দিদাকে বলে দিবি না তো?’
তিতলি বাপ্পার মায়ের মতো চোখ করে বলে। বাপ্পা ওর গা ছুঁয়ে দিব্যি কাটে, বলবে না।
তিতলি নিজের নাকের ভেতর থেকে শুকনো সর্দি বের করে দুই আঙুলে গুলি পাকিয়ে খাঁচার ভেতরে তর্জনির ডগায় ধরে, অ্যান্টনি টুপ করে খেয়ে নেয়।
.
অ্যান্টনি কাকাতুয়া চোখ উপড়ে খায় না, তিতলির নাকের পোঁটা খায়। তবুও ওকে বাপ্পার ভয়। আদিরামবাটিতে এলে কত কিছুতে যে তার ভয়। সবচেয়ে বেশি ভয় রাত্রিবেলা উঠোন পেরিয়ে ঝুপসি আমবনে যেতে, তার কারণ রোজ রাত্রে বাপ্পার পায়খানা চাপে। কলুটোলা লেনে, আলিপুরদুয়ারে কোয়ার্টারে ঘরের লাগোয়া পায়খানা-বাথরুম। কিন্তু আদিরামবাটিতে পাঁচিলে-ঘেরা উঠোনটা পার হয়ে পাছদুয়ার দিয়ে যেতে হয় বাইরে আমবাগানে। সেখানে দুটি পাশাপাশি পায়খানাঘর, মাটি থেকে ছয় ধাপ উঁচুতে, তার কয়েক হাত দূরে ছাড়া-ঘর আর কুয়ো। কুয়োর মাথায় কপিকল। সেবার সাতগাঁয়ে মেথর মিছিলের পর এবাড়িতে খাটা পায়খানা উঠে গিয়ে সোক পিট বসেছে, কিন্তু নলের জল আসেনি। কপিকলে দড়ি টেনে কুয়ো থেকে জল তুলে নিতে হয়। অর্কিডে ছাওয়া প্রাচীন দৈত্যের মতো আমগাছের ঘন ছায়ায় দিনের বেলাতেই জায়গাটা ছমছমে হয়ে থাকে। রাত্তিরে গাছের ডালে ঝোলে ঝুলকালিমাখা বাল্ব, ভেষজ অন্ধকারে তার দমবন্ধ হয়ে আসা ক্ষীণ আলো, স্যাঁতসেঁতে পচা আমপাতায় পিছল পথ, ফাঁসিকাঠের মতো কপিকলের দুঃস্বপ্ন।
এদিকে রোজ রাতেই বাপ্পাকে সেখানে যেতে হয়, জামাকাপড় ছেড়ে কোমরে গামছা জড়িয়ে খালি পায়ে যেতে হয়। নতুনবউ ঠোঁট উলটে বলে–‘এসব হলো ০গিয়ে কলকাত্তাইয়া বদভ্যাস!’ বিশুকা ছড়া কাটে–
সারাদিন গেল হালেফালে
রাত্তিরবেলা জোনাকির পোঁদে বাতি জ্বলে
ছড়াটা শুনে শুনে তিতলিরও মুখস্ত হয়ে গিয়েছে, বাপ্পারও। কলুটোলা লেনে কোনো রোববারের জমায়েতে আওড়াতেও পারে সবার সামনে। কিন্তু শিউলি বিশেষ রকম চোখ করে ওর দিকে তাকায়। সেই চাহনি, সেই দিব্যি, সেই দ্বিনাগরকিত্বের পাসপোর্ট। কিন্তু পাছদুয়ারের দরজাটা দিয়ে বাইরে যেতেই সাতগাঁয় বাপ্পার যে— ‘আমি’-টা থাকে, যে— ‘আমি’ এখানে এলে মিশে যায় কলকাতার— ‘আমি’-র সঙ্গে, সেই— ‘আমি’ ওকে ছেড়ে যায়। তখন বাপ্পার খুব একা লাগে, আর খুব গা ছমছম করে। শিউলিকে তাই এসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কুয়োর সামনে, আমগাছের তলায়। বাপ্পা পায়খানাঘরের দরজার ওপাশ থেকে অনর্গল কথা বলে চলে, শিউলিকে হুঁ হাঁ করে সাড়া দিয়ে যেতে হয় আছে যে সেটা জানাতে, এমনকি কথাও বলতে হয়, বাপ্পার কথায় কথা যোগ করতে হয় ইংরেজ কোম্পানির জাহাজ থেকে চাঁদেরডাঙায় কামান দাগার কথা, উড়ন্ত গোলা এসে আদিরামের মন্দিরে লাগার কথা, গোলাটা ওষধিবাগানে গড়িয়ে এসে গাছ হয়ে ওঠার কথা, মেথরদের নিয়ে হেমন্তমামার মিছিলের কথা, মিঠুপিসির দিদি ছবির কথা যে অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল, ছোটো রেলগাড়ির কথা, ইঞ্জিন ঘোরানোর কথা (কিন্তু কখনোই কেরেস্তান-গোরস্তানের কথা নয়), ম্যাওবেড়ালের গির্জার বেড়ালছানাদের কথা, মিস্ত্রিরা ওদের রেখে ইট গেঁথে চলে গিয়েছিল সেই কথা, ঝড়ের রাতে মা বিড়ালীর এসে ডাকাডাকির কথা, ছানাদের রেখে চলে যাওয়ার কথা…
বেড়ালী মা মানুষ নয়, তাই গির্জার ভেতর ছানা রেখে দিয়ে চলে যায়। মানুষ মা কখনো যায় না। সে ছাড়া ঘরের পাশে কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়, সাড়া দেয়, মশার কামড় খায়। জোনাকিরা তার মাথার ঘন চুলে এসে গাছ ভেবে জড়িয়ে যায়। শিয়ালকাঁটার ঝোপে ঝিঁঝি ডাকে ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ করে। কুয়োর ভেতর ব্যাঙ ডাকে কটকট-কটকট করে। পণ্ডিত-পোড়ো ব্যাঙের দল।
পায়খানাঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির ছটা ধাপ নেমে কুয়োতলায় এসে পরপর ঠিক ছটি জটিল কৃত্য সম্পন্ন করতে হয় :
১- কপিকলে তুলে রাখা জলের বালতি নিয়ে ছাড়া-ঘরে ঢোকা
২- গামছা খুলে রেখে ছুঁচোনো
৩- সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা
৪- গামছা কাচা
৫- ভিজে গামছা কোমরে জড়িয়ে বেরিয়ে আসা
৬- দ্বিতীয় একটি বালতির জলে গঙ্গামাটি দিয়ে হাতে সাবানের অশুচি (পশুর চর্বি) ধুয়ে ফেলা
এর কোনো একটি ধাপ বাদ পড়লে, কিংবা ক্রম এলোমেলো হয়ে গেলে, চুঁচুপেতনি শাপ দেয়। চুঁচুপেতনি হলো এঁটোপেতনির বিধবা পিসি। পেতনিদের মধ্যে সবচেয়ে বদরাগী সে— বিশুকা বলে— কপিকলে তার বাস। কুয়োর দড়ি- বালতিতে টান দিলে মরচে-ধরা কপিকলে চাকাটা যে গুঙিয়ে ওঠে, আসলে চুঁচুপেতনি বলছে— ‘নজর রাখছি! ভুলচুক করেছ কি মরেছ!’
চুঁচুপেতনির শাপে এ বাড়ির এক মস্ত পণ্ডিত ছাড়া ঘরের কুয়োর ব্যাঙ হয়ে গিয়েছেন। সে অনেক কাল আগের কথা। সেই পণ্ডিত একুশ হাজার পুথি মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। তাঁর মাথার খোল শ্লোকে এতটাই ঠাসাঠাসি হয়ে গিয়েছিল যে আর কোনোকিছু মনে রাখার মতো একটুও জায়গা ছিল না। একদিন তিনি কোমরের গামছাটা কাচতে ভুলে গেলেন। ব্যাস! পাছদুয়ার দিয়ে যেই ভেতরবাড়ি ঢুকতে গেছেন, অমনি চুঁচুপেত্নির শাপে ব্যাঙ হয়ে গেলেন! লাফাতে লাফাতে কুয়োয় গিয়ে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু তিনি নামজাদা পণ্ডিত ছিলেন, তাঁর টানে দূরদূরান্ত থেকে ছাত্ররা টোলের বাড়িতে এসে উঠত। গুরুমশাইয়ের এই করুণ পরিণতি জানতে পেরে ওরাও সকলে ইচ্ছে করে গামছা না কেচে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে গেল। অমর ব্যাঙ— বিশুকা বলে—- রাতের বেলা যে কটকট গ্যাঙরগ্যাঙ ডাক শোনো আসলে সেটা পণ্ডিত-পোড়োর দল মুগ্ধবোধ আওড়াচ্ছে। খুব বৃষ্টির দিনে কখনো কখনো ওরা উঠোনে চলে আসে, ধুলো এসে মেরে ফেলার আগেই খড়মের আওয়াজ করে ফিরিয়ে দিতে হয়। তখনই দেখা যায় ওদের কপালে চন্দনের ডোরা কাটা।
রাত্তিরবেলা সাতগাঁয় অন্ধকারগুলো অন্যরকমের ঘন সজীব, কলকাতার মতো জ্যালজেলে নয়। তার কারণ, বাপ্পা ক্রমশ জানতে পারছিল, সেই অন্ধকারে চুঁচুপেতনি এঁটোপেতনি ছাড়াও আরও অনেক তেনাদের গুষ্টি থাকেন। একানড়ে যেমন। তিনি একপেয়ে, তালগাছের মতো ঢ্যাঙা, চোখের পলকে তেপান্তরের মাঠঘাট পেরিয়ে যান। শাঁখচুন্নি, শাঁখাপরা সধবা পেতনি। গেছোপেতনি গাছে থাকেন, মেছোপেতনি মাছপোড়া খান। স্কন্ধকাটার মাথা নেই। মামদো হলেন মিয়া ভুত। এনাদের সবার পায়ের পাতা পেছনদিকে উলটোনো, ওই দেখেই চেনা যায়।
.
রাতে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে দিদার ঘরে বিছানায় গায়ে গা সাঁটিয়ে গল্প শোনে। দিদার একদিকে তিতলি আরেকদিকে বাপ্পা, দিদার শাড়িতে হলুদ আর আদা- জিরেবাটার গন্ধ, দিদার ভূতপেতনি-দত্যিদানোর গল্পে শিরশিরে মজা আর ভয়, মজার থেকে ভয়ের মাত্রাটা বেশি হয়ে গেলে দিদা এক গল্পের নদী থেকে অন্য গল্পের নদীতে নিয়ে চলে যায়। চাঁদ সদাগর আর ময়ূরপঙ্খী নাওয়ের গল্প, বেহুলা লখিন্দর আর সাবিত্রী সত্যবানের গল্প। সেইসব গল্পের নদীতে ভাসতে ভাসতে ঘুমিয়ে পড়ে বাপ্পা, সকালবেলা জেগে ওঠে মায়ের বিছানায়। তবে এইসব গায়ে- গায়ে জড়ানো গল্পের থেকেও যে ব্যাপারটা নিয়ে বাপ্পা- তিতলির বিস্ময় আর ঘোচে না, তা হলো:
—দিদা কীভাবে নদীতে ডুব দিয়ে দূরের মানুষের সঙ্গে জলে জলে কথা বলে?
—কীভাবেই বা অনেক কথার মাঝে চেনা মানুষের কথাটা ঠিক শোনা যায়?
—কীভাবে জলের মধ্যে ঠোঁট খোলা যায়, জিভ নাড়ানো যায়?
—গলায় জল ঢুকে দমবন্ধ হয়ে যায় না?
.
শাকম্ভরী দেবী কাশীবাসী হবার প্রায় সাত মাস পরে সকালের স্নানে গিয়ে ওঁর কণ্ঠস্বর শুনলেন সরোজা। তার কিছুদিন আগে থেকেই ভাঁড়ার ঘরে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছিল, কিন্তু পুরোনো কাঠের ইঁদুরকলটা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেদিন ভাটার সময় গলা জলে নেমে ডুব দিয়ে সরোজা অজস্র কথার কলকলানি খলবলানির ভেতর স্পষ্ট শুনলেন বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর। অন্তর্জলীযাত্রা থেকে বাড়ি ফিরে যেমন ক্ষীণ আর জড়ানো হয়ে গিয়েছিল তার থেকে ঢের স্পষ্ট, আগের মতো, সরাসরি সরোজাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন
‘ইঁদুরকলটা তো বিশে ঠাকুরবাড়ি নিয়ে গেছিল নৈবিদ্যির নাড়ু ইঁদুরে ঠুকরোচ্ছে বলে, সেই চোতমাসে। ওটা ভোগের ঘরেই পড়ে আছে।’
সেদিন থেকে শুরু হলো। এবং যে পরাণবউ কলকাতা থেকে ফেরার পর শাকম্ভরী দেবী তৃতীয় কোনো মানুষ সামনে না থাকলে দরজার চৌকাঠ, তুলসীমঞ্চ, কুয়ো বা নিদেনপক্ষে দেয়ালের মধ্যস্থতা ছাড়া বাক্যালাপ করতেন না, সেই তিনি নিয়মিত জলে-জলে পাঁচশো মাইল দূর থেকে বার্তাবিনিময় করতে লাগলেন, খুঁটিনাটি সাংসারিক বিষয়ে উপদেশ দিতে লাগলেন, কারোর অসুখবিসুখ করলে পথ্যের নির্দেশ দিতে লাগলেন, নতুনবউয়ের পেটের ছানার জন্য কাঁথা বোনার কথা, বয়ামে গ্রীষ্মের আমসত্ত্ব কাসুন্দি ভাদ্রের কড়া রোদ খাওয়ানোর কথা মনে করিয়ে দিতে লাগলেন। ঠিক সেই আগের মতোই। পিসিশাশুড়ির কাছে কিছু জানতে চাওয়ার থাকলে, কিংবা জানানোর থাকলে, সরোজা ভরা জোয়ারে গিয়ে বলে আসতেন। বিকেলের ভাটায় কিংবা পরদিন সকালে ঠিক জবাব আসত, শাকম্ভরী দেবী কেদারঘাটে গঙ্গাস্নানে না গেলেও আসত। বহুকাল আগে তাঁর যৌবনে শ্বশুরালয় থেকে চলে আসার পর মাঝরাতে পাঁচিলের ওপার থেকে নিউরোসিফিলিসে আক্রান্ত মথুরের কাতর যৌনমিলনের আকুতি তাঁর কানে চুঁইয়ে আসত যেভাবে, সেভাবেই মুক্তিভবনে পানিপাঁড়ের টানা গঙ্গাজলের ঘড়ায় তিনি শুনতে পেতেন পরাণবউয়ের গলা।
সরোজা তাঁর স্নানসঙ্গী গঙ্গাজলদের শিখিয়ে দেবার পর তারাও কেউ কেউ এভাবে দূরবর্তিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তালাপ করতেন। কোন বারে কী খেতে নেই, কোন রান্নায় কী ফোড়ন বিধেয়, কোন রোগের কোন টোটকা, বাড়ির বিবাহযোগ্যার রাজযোটক পাত্র কোথাকার কোন পালটি ঘরে আছে, এইসব নানান বিষয়ে তাঁরা শলাপরামর্শ করতেন। তাদেরও কারোর শাশুড়ি খুড়শাশুড়ি পিসশাশুড়ি কাশীবাসী হয়েছিলেন। বাংলার আদিরাম প্রেসের পাঁজির সঙ্গে কাশীর পঞ্চাঙ্গ পাঁজির নিত্যকর্ম বিধিনিষেধ যেমন মিলিয়ে নেওয়া হতো, তেমনই সাতগাঁর নিত্যকার সাংসারিক বচসা— যাকে বাড়ির পুরুষেরা বলে— ‘হাঁড়িকুড়ি ঠোকাঠুকির ঝনঝনাৎকার’ চলত জলে-জলে জোয়ারভাটায়, কখনো এমনকি সপ্তমেও চড়ত। কিন্তু মুখোমুখি ঝগড়ায় ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে বউরা যেমন মেঝেয় পা ঠুকে মল বাজিয়ে সোচ্চারে বা নিরুচ্চারে শাশুড়ির মৃত্যুকামনা করত— ‘মর বুড়ি! তুই মর! মরলে গা জুড়োয়!’
কাশীবাসীকে তো আর সেটা বলা চলে না, মি’লেডি। তার কারণ সেটা যে হয়ে উঠবে মোক্ষলাভের শুভেচ্ছা! তাই জলে ডুব দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলত
‘বুড়ি তুই আরও অনেককাল বেঁচে থাক! ঝাড়েবংশে মরে হেজে মজে যাক, তুই শুধু গাছপাথরের মতো দেখে যা!’
