সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৫
৪.৫
শ্রমিকদের সংগঠিত করতে পাটকলবস্তিতে গিয়ে কমরেড হেমন্ত চক্রবর্তী ক্রমশ বুঝতে পারল কমরেড সুনির্মল ওর মনে যে সরল ছবিটা এঁকে দিয়েছিল তার সবটা সত্যি নয়। পাটকলের মজদুরেরা তাদের সবকিছু ছেড়ে এসেছে এমনটা নয়। ইতিমধ্যে সেই প্রথমদিকের অভিবাসী শ্রমিকের দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় প্রজন্ম কারখানায় কাজ করছে। তারা মিলমালিকের বানিয়ে দেওয়া লাল ইটের সারি সারি অপরিসর লেবার লাইনে থাকে। কিন্তু দেশগাঁয়ে থাকতে যেভাবে বসবাস করত এখানেও ঠিক সেভাবেই লেবার লাইনের বিভিন্ন ব্লকে জাতপাতের সীমানায় বেষ্টিত হয়ে থাকে, এক কৌমগোষ্ঠীর জলের কল অন্য গোষ্ঠী ব্যবহার করে না, এক গোষ্ঠীর শৌচালয় অন্য গোষ্ঠী ব্যবহার করে না। প্রতিটি মহল্লাগলির একজন করে মুখিয়া প্রতিনিধি রয়েছে, মুখিয়াদের ওপরে রয়েছে কুলি সর্দার, যারা উঁচু ক্ষত্রিয় জাতের, মিলের হাজিরা বাবুদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা এক ধাক্কায় অনেকখানি কমে গিয়েছে, কারখানায় উৎপাদন কমেছে, ছাটাই লে-অফ লেগে আছে। লেবার লাইনে কারা কাজ পাবে, কারা পাবে না, সেসব ঠিক করে সর্দারেরা এবং তাদের অনুগামী মুখিয়ারা।
কিছুকাল ওখানে যাতায়াত করতে করতে হেমন্ত লক্ষ করল প্রায় সব পুরুষেরই স্ত্রী পরিবার ভিন রাজ্যে দেশগাঁয়ে থাকে। বিভিন্ন পরবে, সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা ফসল কাটার সময়ে ওরা দেশে যায়। মহল্লার প্রতিটি গলিতে বিভিন্ন জাতের নিজস্ব দেবতার থান, মন্দির, অশত্থ গাছের নীচে সিঁদুর-মাখানো পাথর রয়েছে। একদিন গিয়ে দেখে একটি গলির সব পুরুষের মাথা সদ্য কামানো। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্রামে কোনো বয়স্ক মানুষ মারা গিয়েছেন, খবর এসেছে। তিনি গলির সকলেরই সম্পর্কে জ্ঞাতি।
পার্টি কমিটির মিটিঙে এইসব শ্রমিকদের কমিউনিজমের মন্ত্রে দীক্ষিত করার সমস্যার কথা সবিস্তারে বলল কমরেড হেমন্ত।— ‘ধর্ম যদি হয় জনগণের আফিম, মার্কস যেমন বলে গিয়েছেন, তাহলে এরা সবাই আফিমখোর!’
‘অত অধৈর্য হলে চলবে না, কমরেড!’ সুনির্মল ধমকের স্বরে বলল। ‘এই মজদুর মহল্লার লেবারেরা মার্কস এঙ্গেলসের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসেনি। এরা হলো এশিয়ান প্রোলেতারিয়েত, এদের একটি পা ক্যাপিটালিজমে আরেকটি পা ফিউডালিজমে।
কিন্তু এদের কিছুতেই সংগঠিত করে ধর্মঘটের পথে চালিত করা গেল না। ক্রমশ বোঝা গেল, হেমন্তরা মজদুর মহল্লায় কয়েক বছর দেরিতে এসে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা নিম্নমুখী। অন্যদিকে দেশভাগ হয়ে পাটের ক্ষেতগুলো চলে গিয়েছে পূর্ব বাংলায়, কাঁচামালের যোগান না থাকায় উৎপাদনও কমেছে। শ্রমিকদের মাথার ওপর ঝুলছে ছাঁটাই আর লে-অফের খাঁড়া। এরই মধ্যে মিলকর্তৃপক্ষ চতুর সাঁড়াশি নীতি শানালো একদিকে ওদের মধ্যে ধর্মঘটের চক্রান্তকারী মুখিয়াদের আইনের জালে ফাঁসিয়ে জেলে পোরার হুমকি দিল, অন্যদিকে শ্রমিকদের ফেস্টিভাল বোনাসের দাবী যা ওরা বিভিন্ন দফা দাবীর তালিকায় রাখতে বাধ্য করেছিল নেতাদের— মেনে নিল।
খালপারে ক্যাওটপাড়ায় গিয়ে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখল হেমন্তরা।
এখানে বাস করে যে অচ্ছুত মেহতর সম্প্রদায়, তারা সব অর্থেই সাতগাঁর প্রাস্তজীবী। বিভিন্ন সময়ে অগস্টিনীয় যাজকেরা জামাকাপড় খাবারদাবারের উপঢৌকন দিয়ে ওদের মধ্যে ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা করেছে, কিন্তু পুরোপুরি সফল হয়নি। ওরা অনেকেই প্রাচীন কৌম রীতিনীতি মেনে চলে, ধর্মঠাকুরের থানে পুজো করে। সাতগাঁ থেকে শুরু করে চাঁদেরডাঙা পর্যন্ত পৌর এলাকার বসতিতে ঘুরে ঘুরে মল নিকাশের কাজ করে ওরা, কখনো মাথায় নিয়ে, কখনো ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে। এছাড়া রাস্তাঘাট ঝাঁট দেওয়া, জঞ্জাল সাফাই, নর্দমা পরিষ্কার ও মৃত পশুর সৎকার করে। সেই যবে রুয়ানো ডে ইনফান্টের সময়ে খাল কাটতে বাদাবন সাফ হলো, তারপর থেকেই ওরা এখানে উঠে এসে বাস করছে। খালপাড়ে সারি সারি বাঁশ আর শরের কুঁড়ে, পৌরসভায় ঠিকে কাজের পাশাপাশি শুয়োর প্রতিপালন আর চোলাই মদ তৈরির কারবার করে কেউ কেউ, বনের শর দিয়ে ঝুড়ি চাটাই কুলো ইত্যাদি বোনে।
এদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল মৎস্যভূমির যে বিস্তীর্ণ জনপদ, সেখানে বিগত কয়েক শতকে বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু ওদের দৈনন্দিন জীবন বদলায়নি। ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মাথায় অন্যের মলভর্তি পাত্র নিয়ে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে চলার মানবেতর শ্রম থেকে ওদের স্বাধীনতা আসেনি। ফলে ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ শ্লোগানটি চটপট মনে ধরল। এক দাড়িতালা ফিরিঙ্গি দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে আসা ভদ্র পাড়ার তরুণদের দলটাকে ওরা কৌতূহলভরে স্বাগত জানালো, ঠিক যেভাবে কয়েক প্রজন্ম আগে স্বাগত জানিয়েছিল এক জোব্বা-পরা পাদরিকে, যে কাঠের পাটায় পেরেক গাঁথা আরেক ফিরিঙ্গি দেবতার বাণী প্রচারে এসেছিল।
এক ভাদ্রের সকালে খাটা পায়খানায় উপচে ওঠা মলের দুর্গন্ধে কেঁপে উঠল সাতগাঁর জনজীবন। বেলা বাড়ার সঙ্গে এর সাথে যোগ হলো বড়ো ধূসর গুয়ে মাছির উপদ্রব। দূর থেকে শ্লোগানের ধ্বনি আর রাস্তায় ইটের খাদরির ওপর মলবাহী ঠেলাগাড়ির চাকার শব্দ ভেসে এল এরপর। এই শব্দটা শহরবাসীর চেনা, খুব ভোরবেলায় আচ্ছন্ন তন্দ্রার পাড় দিয়ে চলে যায় রোজ। কিন্তু পুরুষনারীর দলটা তেমন চেনা নয়। তাদের মিশকালো বলিষ্ঠ চেহারা, কারো দেহে উল্কি, মেয়েদের নাকে সস্তা কাচের নাকছাবি, পায়ে লোহার মল, ছেলেদের বাবরি চুল, কানে মাকড়ি। তারা লম্বা ঝাঁটা আর মলনিকাশী বেলচা আকাশে তুলে, তাতে লাল পতাকা বেঁধে শ্লোগান দিচ্ছে— ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়!’
এই কণ্ঠস্বরগুলোও চেনা নয়, কেউ কোনোকালে শোনেনি, রাস্তার ওপর এদের ছায়া পড়তে দেখেনি কেউ কখনো। সেই অস্পৃশ্য ছায়ার স্পর্শ থেকে বাঁচতে বাড়ির দরজা জানলা এঁটে গৃহবন্দি হয়ে পড়ল বামুন-বদ্যিদের পাড়া। কেউ খাবার দাঁতে কাটল না, জলস্পর্শ করল না। শ্লোগান দিতে দিতে মিছিলটা সাতগাঁর অলিগলি ঘুরে ফিরিঙ্গিডাঙার দিকে চলে যাবার পর কেউ কেউ রান্না করা খাবার, পানের জল ফেলে দিল— গ্রহণ লাগলে যেমন করে।
অকস্মাৎ অঘোষিত সূর্যগ্রহণের মতোই আতঙ্কের অভিঘাত সৃষ্টি করল ঘটনাটা। কেউ ভাবতেও পারেনি সেদিনের ছেলেছোকরাদের দলটা, যাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণবাড়ির কয়েকটি সুপুত্তুরও আছে যাদের চিবুকে কচি দাড়ি, ঠোঁটে রবিঠাকুরের গান, সিগারেট আর— ‘বুর্জোয়া’
‘প্রোলেতারিয়েত’ বুলির খই ফুটছে এমন একটা কান্ড ঘটিয়ে দিতে পারবে। সেই দলে হেমন্তকে দেখে আদিরামবাটির সবার চোখ কপালে উঠল। যে ছেলে কি না কস্মিনকালে গাছে চড়েনি, অন্যের বাগানের ফল চুরি করেনি, বৃষ্টির ভেতর কাদায় ভরা মাঠে বাতাবিলেবু দিয়ে ফুটবল খেলেনি, সরস্বতীর জলে ঝাঁপায়নি, গামছা দিয়ে মাছ ধরেনি, সারাদিন কেবল দক্ষিণের ঘরের কোনে বসে খেলনা যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট করেছে, আর তারপর এল-ডোরাডোয় গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা বইয়ে মুখ গুঁজে কাটিয়েছে, তার এই পরিবর্তনের জন্য সকলে ছিছিক্কার করতে লাগল।
মশাই রামপ্রাণকে দুষলেন। ‘বাবা মুনিঋষিদের আয়ুর্বেদশাস্ত্র জলাঞ্জলি দিয়ে এক গোমাংস ভক্ষণকারী জার্মান বদ্যির দাওয়াই বিলি করছে, ছেলেটা আরেক গোমাংস ভক্ষণকারী জার্মানের মন্ত্র কপচিয়ে আছস্তার ডেকে আনবে তাতে আর আশ্চৰ্য্য কী!’
তৃতীয় একজন গোমাংস ভক্ষণকারী জার্মান সাহেব যে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের মণিরত্নের সঙ্গে পাশ্চাত্যের পরিচয় ঘটিয়েছিলেন, সেই ম্যাক্সমুলার সাহেবের কথা আর মশাইয়ের স্মরণে ছিল না। এ বাড়ির সব ছোটোদের মতো হেমন্তকেও কিছুদিন টোলে ডেকে নিয়ে শব্দরূপ ধাতুরূপ শেখানোর সময় ওর স্মৃতিশক্তি দেখে মশাইয়ের মনে আশা জেগেছিল রামপ্রাণের ছোটো ছেলেটা অন্তত সংস্কৃত নিয়ে পড়বে, আদিরামবাটির বিদ্যাচর্চার মুমূর্ষু ধারা বহন করবে। যবে হেমন্ত বিপথগামী হলো, পুথিপাঠ ছেড়ে যন্ত্রপাতি আর পাগলরামের বিলিতি বইপত্রের নেশায় মজল, তাঁর সে আশা জলাঞ্জলি গেল।
হেমন্ত খালের ধারে অন্ত্যজদের পাড়ায় যায়, জানতে পেরে শাকম্ভরী দেবী তন্ন তন্ন করে স্মৃতি হাতড়াতে লাগলেন— হেমন্ত গর্ভে থাকাকালীন তাঁর স্বপ্নে দেখা পুরুষটি কি পাগলরামই ছিল নাকি অন্য কেউ? সে তার পিতামহ রাজারামের ভাই ত্যাজ্য বুনোরাম নয় তো? ত্যাজ্য বুনোরাম দেখতে কেমন ছিলেন তিনি জানেন না। আদিরামবাটির বংশলতিকা থেকে, কৌম স্মৃতি থেকেও, তাঁর নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু স্বপ্নে-দেখা সেই পুরুষ যে ত্যাজ্য বুনোরাম হতেও পারে সেটা মাথায় আসতেই শাকম্ভরী দেবীর শিরায় হিমেল স্রোত বয়ে গেল।
সেদিন ঠাকুরবাড়িতে দুপুরের ভোগের পর বিশ্রামের সময়ে উনত্রিশ দেবদেবীর ঘরে বিক্ষুব্ধ মৌচাকের মতো একটা গোঁ গোঁ ধ্বনি শুনতে পেল বিশু ঠাকুর। সন্ধ্যার পর হেমন্তকে কুয়ো থেকে জল তুলে স্নান করতে দেখে বিহ্বল কন্ঠে বলল
‘এসব কী আরম্ভ করেছিস তুই?’
হেমন্ত গায়ে সাবান ঘষতে ঘষতে জবাব দিল— ‘কিছুই আরম্ভ করিনি। তোমার দিদির অসমাপ্ত কাজ শেষ করছি!’
সম্পূর্ণ ঘটনা ক্রমশ প্রকাশ পেতে লাগল। সেদিন দুপুরে মেথরদের মিছিল জনহীন সাতগাঁর পথঘাট পরিক্রমা করে একে একে পোর্তোহাটা ওলন্দাজডাঙা ঘুরে কোয়ার্সভিলের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিলের গন্তব্য ছিল গভর্নরের দপ্তর, সেখানে গিয়ে ওরা ওদের ছয় দফা দাবীসনদ পেশ করতে চেয়েছিল। খবরটা আগেই পৌঁছে যায় এবং ফরাসী প্রশাসকেরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। কিছুকাল আগে পন্ডিচেরিতে এই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। সেখানে স্থানীয় বিশপের উসকানিতে পোঙ্গল উৎসব পালন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, প্রতিবাদে স্থানীয় জনগোষ্ঠী শহর ছেড়ে চলে যায়, শ্বেতাঙ্গদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তার পুনরাবৃত্তি এখানে যাতে না ঘটে সেজন্য কোয়ার্সভিলের প্রশাসন অতিসক্রিয় হয়ে উঠল। মেথরগোষ্ঠীর মধ্যে নেতা গোছের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্যে ওদের চাবুক মারার আয়োজন করল। ক্ষেপে উঠল মিছিলকারীরা, কমিউনিস্ট ছেলেদের থেকে বিক্ষোভের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নিল ওরা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খালপাড়ের থেকে মেয়ে-মরদেরা দলে দলে এসে গভর্নর হাউসের বাইরে রাস্তার ওপর শুয়ে পড়ে, চার্চের বাইরে, ক্লাব সরাইখানার বাইরে মলবহনের ঠেলাগাড়িগুলো টেনে এনে শহর অচল করে তোলে। পুলিশ নামাতে হয় নীল উর্দিধারী আধাসামরিক ঋনদার্ম। তারা রাইফেল উঁচিয়ে তাড়া করতেই বিক্ষোভকারীর দল ছত্রখান হয়ে শ্বেতাঙ্গ এনক্লেভ ছেড়ে ঢুকে পড়ে নেটিভ বানিয়াদের পাড়ায়, ঝনদার্মগুলোকে উস্কানি টিটকিরি দিয়ে টেনে আনে উঁচু উঁচু ইমারতের মাঝে সরু অলিগলির গোলকধাঁধায়, যা তারা নিজেরা হাতের তালুর মতো চেনে। তারপর দুই বাড়ির ফাঁক দিয়ে পেছনের খাটা পায়খানায় জমাদার যাবার অত্যন্ত সরু চোরাপথ থেকে উর্দিধারীদের দিকে তাক করে ছুঁড়তে শুরু করে এক অভিনব লোষ্ট্র, যা ইংরেজদের দিকে ছোঁড়া বিপ্লবীদের বোমার মতো প্রাণঘাতী না হলেও কম কার্যকর নয়: কচুপাতায় মোড়া টাটকা মনুষ্যবিষ্ঠা।
বলা বাহুল্য, বাহিনি সেদিন পিছু হটে, অচেনা গলির গোলকধাঁধায় পালাবার পথ খুঁজে পায় না। মেথরগোষ্ঠীর যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সন্ধ্যার আগেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ওদের ছয় দফা দাবী সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না এলেও আশ্বাস মেলে, মজুরিবৃদ্ধির দাবীটা পরবর্তী মিউনিসিপ্যাল বোর্ড মিটিঙে বিবেচনা করা হবে। বোঝা যায়, প্রশাসন ভয় পেয়েছে। তাছাড়া দিনদুপুরে ঝাঁটা বেলচা হাতে মলের গাড়ি ঠেলে সাতগাঁর পথে পথে মিছিল করতে পারাটাও এক ঐতিহাসিক জয়।
ক্যাওটপাড়ায় সেদিন সন্ধ্যায় বিজয় উৎসব, তাতে নিমন্ত্রিত হল কমিউনিস্ট দলের ছেলেরা।
পার্টির কাজে নামার আগে হেমন্ত ধর্মতলার বটগাছটার এপারে কখনো আসেনি, শহরের প্রান্তে এমন যে একটা অঞ্চল আছে কখনো জানতেও পারেনি। খালপাড় বরাবর তাল খেজুর বাঁশের ঝাড় আর বাদাবনের অবশিষ্ট কিছু হোগলা আর হেঁতালের মাঝে খোঁটার ওপর শরে-বোনা কুঁড়েঘরের জোট। মেহতার হাড়ি পোদ বাউরিদের চালে-চালে বসতি। কোটালের ভরা জোয়ারে নীচু এলাকাগুলোয় জল উঠে আসে, তাতে বয়ে আসে ফিরিঙ্গিডাঙার যত আবর্জনা। দূর থেকে বসতিগুলো দেখে মনে হয় যেন শীতের পাখিদের বাসা, কিন্তু বহুকাল ধরেই এরা এখানে বাস করছে।
কত কাল?
হেসুদাস নামে স্থানীয় এক বৃদ্ধ বললেন, কনৌজের সাত রাজপুত্র দুই নদীর মাঝে এই ডাঙার দেশে আসার ঢের আগে থেকেই ওরা এখানে আছে। তখন এই জায়গাটায় ছিল বিস্তীর্ণ হেঁতালের বন, বাঘের দেশ। রাজা ডাক দিলে আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজিয়ে, ঢোল-ডগর বাজিয়ে, সড়কি শানিয়ে যুদ্ধে যেত ওরা। বাকি সময়টা বনের পশু শিকার করে, নদীতে মাছ মেরে, মাটির হাঁড়িকুড়ি বানিয়ে, তাঁতে কাপড় বুনে, শরের ঝুড়ি কুলো বুনে জীবন নির্বাহ করত। ওদের আরাধ্য দেবতা ছিল নুড়িপাথরে, স্থির দুপুরে ক্যাওড়ার মগডালে একটি মাত্র কম্পমান পাতায়, শরতে সূর্যাস্তের ঠিক আগে পলকা সবজেটে আলোয়। ব্রাহ্মণরা এদেশে এসে ওদের অচ্ছুত বানালো। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনি। ওরা ওদের মতোই ছিল, সম্পূর্ণ স্বাধীন— হেঁতালবনে বুনো শুয়োর ছিল, নদীতে খাঁড়িতে মাছ ছিল, পাড়ের এঁটেল মাটিতে শর আর ফুটি কার্পাসের অভাব ছিল না। আর ছিল দুটো করে হাত, স্বাধীন— যা ইচ্ছে বানিয়ে নেওয়া যেত। দুটো করে পা, স্বাধীন যেদিকে ইচ্ছে যাওয়া যেত। তারপর ফিরিঙ্গিরা এল বন্দুক নিয়ে, ওদের নদীর পাড় থেকে তাড়িয়ে নিয়ে এল এই খালপাড়ে। ওরা জলজঙ্গল কেড়ে নিল, এমনকি দেবতাদেরও কেড়ে নিল। তার বদলে দিল কাঠের পাটায় গাঁথা রক্তমাখা প্রভু। ওরা ওর নামও কেড়ে নিল। নতুন নাম দিল হেসুদাস, প্রভু হেসুর দাস। ফুটি কার্পাসে যারা মসলিন বুনত, ফিরিঙ্গিরা তাদের বুড়ো আঙুলগুলো কেটে নিল, যাতে ওই হাতে শুধু মোটা মাছধরা জাল বোনা যায়। এখনও মাঝরাতে হাওয়া উঠলে বাঁশবনে তাঁতের খটাখট খটাখট শব্দ শোনা যায়, বাদলার রাতে জোলাদের কাটা বুড়ো আঙুলগুলো জলার ধারে ব্যাঙ হয়ে উঠে এসে ডাকে গ্যাঙর-গ্যাঙ গ্যাঙর-গ্যাঙ…
হেসুদাস সারাদিন ধরে নিজের দন্তহীন মাড়ি চিবোন আর অনর্গল কথা বলে চলেন পাখি পাথর কাঠবেড়ালির সঙ্গে। জিভ দিয়ে লালার সুতো নামে বুকের সাদা রোমের ওপর। বয়সের গাছপাথর কোথায় আছে কেউ জানেনা। সংসারে নিজের বলতে যারা ছিল সবাই মরে হেজে গিয়েছে। আশেপাশের তিনটে বসতির লোক ভালোবেসে যা দেয় তাই খান। সারাদিন গাছতলায় নয়তো খোলা আকাশের নীচে পড়ে থেকে থেকে বাজপড়া তালগাছের মতো চেহারা হয়েছে, চামড়ায় খড়ি উঠে মাছের আঁশের মতো, দু চোখে সাদা ছানির মোতি। কিন্তু হেমন্তকে দেখে কোন বাড়ির ছেলে সেটা ঠিক চিনে ফেললেন। ‘আপুনি আদিরামবাটির না?’
উৎসবের সন্ধ্যায় ক্যাওটপাড়ায় আগুন করা হয়, বসতিটা কেমন অচেনা অন্যরকম হয়ে ওঠে। বাঁশবনের মাথায় দপদপ করে জোনাকির ঝাঁক, ঝিঁঝিপোকা ডাকে, কটকটে ব্যাঙ কিংবা জোলাদের কাটা আঙুল ডাকে, মাতাল হাসি আর ঢোলের গুপ গুপ ধ্বনিতে কেঁপে কেঁপে ওঠে নিশাদলে গাঁজানো বাতাস। পুরুষেরা উবু হয়ে বসে দুহাতে মাটির ভাঁড় ধরে গলায় উপুড় করে ঢালে, কাঁচা পাতায় বিটনুনের ডেলা জিভে বোলায়। আগুনের কাঁপা কাঁপা আভায় হেমন্ত দেখে মেয়েরা ঘরকন্না করছে, শুকনো কাঠপাতা বয়ে আনছে, ভাটি থেকে সদ্যপোড়া হাড়ি তিজেল বয়ে আনছে, বাচ্চাকে স্তন্যপান করাচ্ছে। ধোঁয়ায় জড়ানো হাড়িয়ার গন্ধে ওর মাথা ঝিমঝিম করে, তাপবাষ্পে দোলে চারিপাশ, মনে হয় দিনের বেলার থেকেও যেন ঢের বেশি মানুষ চারিদিকে, উল্কি-আঁকা হাতে পেতলের বাজুবন্ধ আর সূর্যাটানা চোখের ভিড়ে মনে পড়ে যায় এল-ডোরাডোর সেই নারীকে, মজ্জার ভেতর সেই ঘুনপোকার অনুভূতি আবার ফিরে আসে অনেকদিন পরে।
হাতে হাতে ভাঁড়ের পানীয় আর কচুর পাতায় মাছপোড়া এগিয়ে আসে, ওর দিকে বাড়িয়ে দেয় কেউ।
‘চলবে নাকি?’
‘আলবাৎ! কেন নয়?’ হেমন্ত ভাঁড় আর মাছপোড়া হাতে তুলে নেয়। কড়া গাঁজানো গন্ধ, পোড়া মাছটা বিকট মুখব্যাদান করে আছে। আড় চোখে দেখে নেয় সকলের চোখ ওর দিকে নিবদ্ধ। ফের নিজেকে সাহস জোগানোর মতো গলায় বলে ওঠে
‘আলবাৎ! কেন নয়? এখানে আমরা সবাই তো কমরেড, তাই নয় কি?’
‘তা বটে, তবে কিনা তুমি হলে গিয়ে বেরান্তন!
আবছায়ার ভেতর হেমন্ত বক্তার মুখের অভিব্যক্তি দেখতে পায় না।
‘আমি ব্রাহ্মণ নই! আমি কমিউনিস্ট!’ হেমন্ত বলে, কিন্তু টের পায় কন্ঠস্বরে তেমন আত্মবিশ্বাস ফুটছে না। কচুপাতায় মাছপোড়া আর মাটির ভাঁড়টা হাতেই ধরা থাকে।
ইতিমধ্যে অগ্নিকুন্ডের ওপাশ থেকে হেসুদাস টলতে টলতে এসে উবু হয়ে বসেন হেমন্তর ঠিক সামনে, দুহাতে চেপে ধরেন নিজের হাঁটু দুটো। মাথায় পাগড়ির মতো করে জড়ানো গামছা, পরনে শুধুমাত্র একটা মলিন কৌপীন। ইতিমধ্যে একাধিক পাত্র পেটে পড়েছে বোঝা যায়।
‘তুমি … কামুনিশ?’ হেমন্তর দিকে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে হেসুদাস মিষ্টি করে হাসেন, ঠোঁট থেকে লালা ঝরে। ‘আমাদের ঘরে এসে হাড়িয়া খাচ্ছ তাই … তাই তুমি কামুনিশ?’ গোড়ালিতে ভর রেখে তাপবাষ্পের মতো হেসুদাস দোলেন। –‘তাইলে… সে ঢের আগের কালের কথা বটে… তোমার বংশের একজন ঢের বড়ো কামুনিশ ছিল গো।’
সকলে কথা থামিয়ে ঘুরে তাকায় এদিকে। হেসুদাসের কৌপীনের ফাঁক দিয়ে একটি অন্ডকোষ চলকে বেরিয়ে এসে আগুনের আভায় চকচক করছে। ডান হাতে খালি মাটির ভাঁড়, বাঁ হাতের কব্জি ঘুরিয়ে ঠোঁটের লালা মুছে বলেন— ‘সে যে আমাদের ঘরের মেয়ের সঙ্গে শুতো!’
