সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.৩
১১.৩
দেশটা ইংলন্ডেশ্বরীর পদানত হওয়ার পরেও কোয়ার্সভিলের স্বাধীন ছিটমহল টিকে আছে বটে কিন্তু তার সুদিন গত। বাইরে থেকে দেখে অবশ্য কিছু বোঝার উপায় নেই। যেন এক অন্তহীন মোচ্ছব চলেছে শহরে। ফ্যাক্টরেরা নিত্যনতুন আমোদপ্রমোদে মত্ত, জাঁকজমক করে ফিয়েস্তা হচ্ছে স্ট্র্যান্ডে, আলো আর হাউই বাজির রোশনাই, কাটুনিডাঙায় জলের ওপর বাঁশ-দরমার বসতিতে খটাখট তাঁত চলছে দিবারাত্র, কলকাতা থেকে বজরা বোঝাই ইংরেজ সাহেব-মেমদের আসার বিরাম নেই। কোয়ার্সভিল যেন ওদের বাথ নগরী।
এক ফিয়েস্তার রাতে দুফের ডাগেরোটাইপ স্টুডিওয় খড়ের চালে আগুন লাগল, সেলুলয়েডের রোল আর দাহ্য রাসায়নিক জ্বলে উঠল মুহূর্তের মধ্যে। সারা রাত ধরে আগুন নিভিয়ে ভোরবেলা দমকলকর্মীরা খুঁজে পেল অগস্টিন দুফের ভষ্মীভূত দেহ। রোজ গভীর রাত পর্যন্ত স্টুডিওয় একা কাজ করত সাহেব, কখনো-কখনো রাতে ওখানেই থেকে যেত। ধূমপান করতে গিয়ে অসতর্কতায়, নাকি, খড়ের চালে ফিয়েস্তার জ্বলন্ত হাউই উড়ে এসে দুর্ঘটনা ঘটেছে বোঝা গেল না। ইদানীং অস্বাভাবিক মোটা হয়ে দুফে প্রায় চলচ্ছক্তি হারিয়েছিল, দুই সেদান বাহকের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারত না। বেহারা দুজনকে মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া গেল চাঁদেরডাঙায়, তাদের থানায় ধরে আনা হলো। বাতাসে ভাসতে লাগল নানাবিধ গুজব।
সম্প্রতি ডাগেরোটাইপ প্রযুক্তি ইংরেজ শাসিত অঞ্চলে বাণিজ্যিক ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা উঠেছে, স্যামুয়েল বোর্ণ ও চার্লস শেফার্ড নামে দুই ইংরেজ কলকাতায় স্টুডিও খুলেছে। তারা অত্যাধুনিক কলোডিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের এক্সপোজারে ছবি তোলে। সেই ছবির মানুষদের অনেক জীবন্ত দেখায়, পাথরের মূর্তির মতো নয়। দুফের ছবি তোলার ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। মথুর রায়কে এজেন্ট করে ফিরিঙ্গিডাঙা আর আশেপাশের অঞ্চলের সৌধের ধ্বংসাবশেষের ফোটোগ্রাফিক প্রিন্ট কলকাতার বাজারে বিক্রি করেছে সে। কিন্তু তার ক্রেতা সীমিত, কলকাতার গুটিকয় রুচিসম্পন্ন শ্বেতাঙ্গদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দুফে প্যারিসে কয়েকজন শিল্পসংগ্রাহককে চিঠি লিখে অর্ডার ধরার চেষ্টা করেছে। মমার্তের প্রিন্টমেকার জাঁ মেত্যিয়ে (পরবর্তীকালে যিনি জাপানী শুঙ্গা ঘরানার যৌনউত্তেজক কাঠখোদাই ছবির সংগ্রাহক হিসেবে বিখ্যাত হবেন) দুফেকে চিঠি লিখলেন–
আলো বন্দি করার এই অত্যাশ্চর্য প্রযুক্তি আসার পর রোম্যান্টিক প্রাচীন ঐতিহাসিক সৌধ, নিসর্গদৃশ্য ও ধ্বংসাবশেষের থেকেও, এমনকি মৃত্যুর অব্যবহিত আগে মুমূর্ষুর মাথার ওপর ক্যামেরা তাক করে অপস্রিয়মাণ আত্মার ছবি তোলার থেকেও দৃশ্য শিল্পের বাজারে ঢের বেশি চাহিদা হলো প্রাচ্যদেশীয় তরুণীর নগ্ন দেহের ছবির। আফ্রিকায় আমাদের নতুন কলোনি থেকে নগ্ন কৃষ্ণাঙ্গ রমণীদের ফোটোগ্রাফের তুষারপাত হচ্ছে এখন মমার্তের মাথায়। ক্রীতদাসী পোষা আইনি হয়েছে। নিরাপদ কাউচের আরামে, রোগভোগের ভয় ছাড়া নারীদেহ করতলগত করার এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর কী আছে?
কিন্তু নেটিভদের ছবি তোলা বড়ো চ্যালেঞ্জ; এই তিনপেয়ে এক চক্ষু জন্তুটিকে তারা যমের চেয়েও বেশি ভয় করে। ক্যামেরা যে মানুষের প্রাণবায়ু শুষে নিয়ে তাকে ভূত বানিয়ে ছাড়ে, তার স্পষ্ট প্রমাণ তারা খুঁজে পায় গির্জা স্ট্র্যান্ড ঘড়িঘরের পিকচার পোস্টকার্ডে দীর্ঘ এক্সপোজারে তোলা ছবিতে চলমান মানুষগুলো অপস্রিয়মাণ প্রেতের ছায়ার মতো ফুটে থাকে। ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে দুফে আর তার সহকারী গুঁফো গোঁসাইকে আসতে দেখলে লোকজন ভূত দেখার মতো এলাকা শুনশান করে দিয়ে লুকিয়ে পড়ে।
মেত্যিয়ে সাহেবের উপদেশ শিরোধার্য করে প্রথম দিকে কার্টুনিডাঙায় ক্যামেরা বসিয়ে পতিতাদের যৌন দেহভঙ্গির জীবন্ত ছবি তুলতে শুরু করল দুফে। কিন্তু অর্থব্যায় ছাড়াও আলো সেখানে অপ্রতুল, তেপায়ার নীচে বাঁশের চালির ভূমি নড়বড়ে, ব্যস্ত প্রহরে নৌকার মতো দোলে। এই সময় চিনিকলের যুবতী কামিন মেয়েদের স্টুডিওয় এনে চাবুকের ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে নগ্ন করে ছবি তোলার ভাবনাটা মাথায় আসে। ফোটোগ্রাফে তাদের চোখে মুখে যত আতঙ্কের ছাপ ফুটে ওঠে, প্যারিসের বাজারে ততই মহার্ঘ্য হয় সেই ছবি। নগ্ন দেহ দড়ি দিয়ে বেঁধে ছবি তুললে রীতিমতো নীলামে ওঠে।
এবার অগস্টিন দুফের ভাগ্য ফিরল। কিছুকালের মধ্যেই খবরটা কানফেরতা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ক্লাবে, ট্যাভার্নে, স্ট্র্যান্ডে বায়ুসেবনের প্রহরে। কানাঘুষোয় শোনা যেতে লাগল, অগস্টিন দুফের স্টুডিওয় রাতের নির্জন প্রহরে ঢাকা পালকিতে ভিন্ন গোত্রের মডেলের আগমন ঘটে। তারা শ্বেতাঙ্গিনী, সম্ভ্রান্ত মার্চেন্ট, ফ্যাক্টর ও কোম্পানি অফিসারদের স্ত্রী। একঘেয়ে নির্বাসনের জীবনে হাঁফিয়ে উঠে বিচি উত্তেজনার লোভে সর্বাঙ্গে কালো রং মেখে পরচুলা পরে নেটিভ রমণী সেজে ছবি তোলাতে আসে। এমনই একজনের নগ্ন ছবি প্যারিস ঘুরে কোয়ার্সভিলে এসে তার স্বামীর হাতে গিয়ে পড়ল। গ্রীষ্মের নিশ্চল দুপুরে অফিস চেম্বারে একা গোপন দেরাজে সদ্য ডাকে-আসা এক গোছা ফোটোগ্রাফের মধ্যে সাহেব চিনতে পারল তার সহধর্মিণীকে, যার ছায়া সে খুঁজে এসেছে শত শত নগ্ন অর্ধনগ্ন দেহভঙ্গিতে, নাবিক সৈনিক রেসের জকি অভিনেতা ও মুখোশধারী লম্পটের বক্ষলগ্না।
অগস্টিন দুফের মৃত্যু দুর্ঘটনা হিসেবেই কেস ফাইল হলো, কেরেস্তান গোরস্তানে তাকে কবর দেওয়া হলো। স্বদেশভূমি থেকে দূরে তার কবরে প্রথম মাটি দেবে ভাগ্নে শার্ল, দুফের সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। হবার উপায়ও ছিল না। তার বছর কয়েক আগেই প্রচুর দেনা ও আশ্চর্য সাহিত্যকর্ম রেখে প্যারিসে মারা গিয়েছে শার্ল লেবো। কিন্তু অগস্টিন দুফের রহস্যময় ডাগেরোটাইপ স্টুডিও ও ততোধিক রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে জল্পনা ফল্গু ধারার মতোই বইতে লাগল ফিরিঙ্গি সমাজের তলে তলে। এবং হুগলি দিয়ে বয়ে পৌঁছে গেল স্বদেশে।
জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক মারী পোপ্যু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নুয়া নামে একটি উপন্যাস লিখবেন। সেখানে তাঁর সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা হারকিউল বেলক কোয়ার্সভিলে আসবেন মঁসিয়ে দুফের মৃত্যু রহস্যের কিনারা করতে। মারী পোপ্য নিজে কখনো ভারতে আসেননি। তাঁর উপন্যাসে জ্যোৎস্না রাতে বালির চড়ায় কুমিরেরা গান গায়, ফিরিঙ্গি মার্চেন্টরা চিত্রল হরিণে টানা গাড়িতে চেপে কোয়ার্সভিলের ধারে বনে গন্ডার শিকারে যায়।
*
রাজমোহন চাটুজ্যের সংস্পর্শে আসার পরই যে পাগলরামের মাথায় সাতগাঁ থেকে বাস উঠিয়ে কলকাতায় চলে যাবার ভাবনাটা আসে, এ ব্যাপারে কারোর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। কোম্পানির শাসন শেষ হয়ে বিস্তীর্ণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী হবার পর থেকেই কলকাতা এক আশ্চর্য শহর, সব ধরনের সুযোগসন্ধানীর ঠিকানা। চওড়া বাঁধানো পথঘাট, গ্যাসবাতি, দুধারে প্রাসাদোপম অট্টালিকা, ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি গড়গড়িয়ে চলছে, বাতাসে উড়ছে স্বপ্ন আর টাকা, রেসের মাঠে ঘোড়া ছুটছে, উদ্যমী বাঙালিরা দল বেঁধে চলে আসছে কলকাতায়। ইতিমধ্যে রেলপথ বসেছে, হাওড়া থেকে উত্তরে হুগলি নদীর পাড় বরাবর সমান্তরাল গিয়ে সাতগাঁর মৎস্যভূমির লেজ ছুঁয়ে বেঁকে গিয়েছে দামোদর অববাহিকার দিকে। একদা হুগলির বন্দর পোর্তো পেক্যেনো থেকে বারো মাইল দূরে নতুন স্টেশনের নাম হয়েছে বন্দর-হুগলি। ট্রেনে চেপে ঘন্টা দুয়েকে কলকাতায় পৌঁছে যাওয়া যায়। সেভাবেই পাগলরাম ছাপাখানার সরঞ্জাম কিনতে কলকাতায় গেল, আদিরামবাটিতে সেই প্রথম কেউ কলের রেলগাড়িতে চাপল।
সে খবর কানে যেতে ঘোর অসন্তোষ প্রকাশ করলেন বড়ো ভাই রামানুজ। সম্প্রতি বাতের প্রকোপে তিনি অথর্ব, টোলের বাড়িতে অধ্যাপনা ছাড়া আর কিছুই প্রায় পারেন না। পুজোআর্চা দেবসেবার কাজ করে তাঁর পুত্র রামশশাঙ্ক। বৃহৎ পরিবারের কর্তৃত্বভার গিয়ে পড়েছে গঙ্গারামের হাতে, এবং তার কবিরাজি থেকে আয়ের অর্থেই সংসারের নিত্যকার ব্যয়ভার নির্বাহ হয়। এছাড়া শিষ্যবাড়ি থেকে সোম্বচ্ছরের দানাশস্য ঘি গুড় ইত্যাদি গুরুগৃহে আসে।
‘কলের রেলগাড়ি চাপলে যতটা সময় বাঁচে ঠিক ততটা সময় আয়ুষ্কাল থেকে বাদ হয়ে যায়, এ কথা কি পাগলরাম জানে না?’ রামানুজ গঙ্গারামকে ডেকে বললেন। ‘তাছাড়া শুনেছি নাকি কয়লার আগুন আর জল দিয়ে গাড়ি চালায় দোআঁশলা ফিরিঙ্গিরা। সেই গাড়িতে চাপলে বেজাতের এঁটো স্পর্শের মতোই দেহ অশুচি। মোছলমানের হাতে রান্না খেয়ে পতিত পীর-আলি হয়েছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরেরা, আর এ তো কেরেস্তানের এঁটো।’
গঙ্গারাম চুপ করে থাকে, কিছু বলে না। রামানুজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়েন।
‘কিন্তু এসব কথা তোমায় বলা অরণ্যে রোদন বই তো কী? ছেলেবেলায় কেরেস্তান পুরুতের বাড়ি ওকে নিয়ে গিয়েছ তুমিই, সাহেবের উচ্ছিষ্ট ছাপার কল বাড়িতে এনে বসিয়েছ।’
স্বাভাবিকভাবেই অগ্রজের উষ্মা গঙ্গারাম অনুজকে জানায়নি, জানালেও তার মনে পৌঁছত কিনা সন্দেহ। রেলগাড়িতে চেপে কলকাতাযাত্রার আবেশে তার মনপ্রাণ তখন বিভোর।
ইঞ্জিনের ধোঁয়ার পর্দা দিয়ে দেখা প্রেতের মতো অলীক ছুটন্ত মাঠঘাট পুকুর মন্দির জনপদ পেরিয়ে হাওড়ায় এসে থামা, তারপর হুগলি নদী পার হবার সময়ে পূর্ব তীরে শহরের গগনচুম্বী হর্ম্যরাজি জলে প্রতিফলিত দেখা, কলকাতার মাটিতে প্রথম পা রেখে, কলকাতার বাতাসে বুক ভরে প্রথম শ্বাস নিয়ে সেই এক আশ্চর্য সুগন্ধ যা খুব ছোটোবেলায় পাগলরাম লক্ষণার বাপের বাড়ি থেকে আনা পেতলের সাজের বাক্সে কাচের চুড়ি, ফিতে, হাতির দাঁতের চিরুণি, আলতা, বিলিতি এসেন্স, পাউডার, পমেটমের মধ্যে পেয়েছিল।
কলকাতা তো শুধু শাসনকেন্দ্রই নয়, আধুনিক বাংলা ভাষারও রাজধানী হয়ে উঠছে। সাতগাঁর পণ্ডিতেরা সেই ভাষাকে ব্যাঙ্গ করে— ‘ক্যালকাটা বাংলা’ বলুক আর যাই বলুক, বাংলায় অসংখ্য বইপত্র সংবাদ পত্রিকা ছাপা হচ্ছে। অসংখ্য ইংরেজি শিক্ষিত পণ্ডিতকুল, ক্রমবর্ধমান পাঠকসমাজ। চিৎপুরে বটতলায় ছাপা বই ঝাঁকায় ভরে পাকা আমের মতো অলিতে গলিতে হেঁকে বিক্রি করছে ফেরিওয়ালার দল। পাগলরামের কানে বাজে রাজমোহন চাটুজ্জ্যের প্রত্যয়ী ঘোষণা
‘দ্যাখ সখা, সাতগাঁ হলো বাংলার অতীত, কলকাতাই ভবিষ্যৎ। এক নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে এই শহরে, যা বাঙালি জাতিকে একদিন সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ করে তুলবে!’
‘বলছ?’
‘মোস্ট সার্টেইনলি!’ রাজমোহন কেদারার হাতলে চাপড় মেরে বলে। ‘আজ না হোক কাল, এই বিদেশী শক্তিরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে। যেতেই হবে! পর্তুগীজ দিনেমার ওলন্দাজেরা কবেই গিয়েছে, ফরাসিরাও শিগগিরই যাবে। তারপর একদিন ইংরেজদেরও চলে যেতে হবে। তখন এই সুজলা সুফলা স্বাধীন বাংলার রাজধানী হয়ে উঠবে কলকাতা। ঠিক যেমন সাতগাঁ ছিল বহুকাল আগে, যেমন ছিল সোনারগাঁ, গৌড়, লখনৌতি।’
*
আয়ুর্বেদশাস্ত্রের সঙ্গে রুয়ানো ডে ইনফান্টের হর্টার্স বেঙ্গলেনসিস-এর জড়িবুটির জ্ঞান মিশিয়ে চিকিৎসা করে সুনাম হবার পর নানা দিক থেকে বিবাহের সম্বন্ধ এসেছিল গঙ্গারামের। কিন্তু সেসব সে প্রত্যাখ্যান করল। নিজে উদ্যোগ নিয়ে রাজপুরের লেখাপড়া-জানা মেয়ে হিরণ্ময়ীর সঙ্গে পাগলরামের বিয়ে দিল। ভেবেছিল শৈশবে মাতৃহীন ভাইটা এবার সংসারে থিতু হবে। সে আশায় জল ঢেলে কলকাতায় চলে যাবার বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তটা নিল পাগলরাম। গঙ্গারামের বুকে যেন হাতুড়ির ঘা পড়ল। কষ্টটা অসহনীয় হলো যখন সে জানতে পারল সকলেই ধরে নিয়েছে এর পেছনে অগ্রজের মদত রয়েছে।
সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজ রামানুজ পণ্ডিতকে ঘিরে গোল হয়ে বসে শোকজ্ঞাপন করতে লাগল। ইংরেজদের শহর কলকাতা। সেখানে ওরা ব্রাহ্মণ মহারাজা নন্দকুমারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। ব্রাহ্মণেরা দলে দলে সেই অভিশপ্ত ভূমি ত্যাগ করেছে। সেখানে গিয়ে কি না ডেরা বাঁধতে চলেছে রামাই পণ্ডিতের নাতি, রামাচার্যের বংশধর, ভাগীরথীর পশ্চিম কুল থেকে পুবে, যেদিকে রাঢ়ভূমি থেকে নেড়ানেড়িদের উৎখাত করে পাঠানো হয়েছিল!
‘নারীরা কলকাতায় যায় কুলত্যাগিনী মাগী হতে!’ কুলপতি ঘনশ্যাম ন্যায়চঞ্চু বললেন–‘আর পুরুষেরা যায় পতঙ্গের মতো অকালে মরতে!’
‘না মরুক, মারণ ব্যাধি বাঁধিয়ে ফেরে তো বটেই! স্মৃতিরত্নমশাই বলেন। ‘তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই বাড়িতেই আছে।’
‘কার কথা বলছ?’
‘চাঁদেরডাঙার মথুর রায় গো! খোদ রামানুজ পণ্ডিতের জামাই, শাকম্ভরীর স্বামী।’ স্মৃতিরত্ন ব্যাখ্যা করেন। ‘দুফে সাহেবের দালাল হয়ে সেই যে কলকাতায় যেতে শুরু করল, সেখানে প্রমোদের পাঁকে গা ভাসালো।’
‘ইংরেজরা তো শুনেছি কীসব নতুন আইন করেছে, তার গুঁতোয় কলকাতার বেশ্যাগুলো দল বেঁধে কাটুনিডাঙায় গিয়ে উঠেছে!’ ন্যায়চঞ্চু বলেন।
‘আহা, সব কটা কী আর এয়েছে। সরেসগুলো শুনেছি জাহাজঘাটার আশেপাশে আছে। তাছাড়া রেসের মাঠ আছে, মধুশালা আছে। রামানুজ পণ্ডিতের জামাইয়ের উচ্ছন্নে যাবার উপকরণের অভাব আছে নাকি কলকাতায়?’
বাস্তুভিটে ত্যাগ করে কলকাতায় গিয়ে জাত খোয়ানোর গল্প যে যা জানে বলতে শুরু করে।
কিন্তু পাগলরাম এমন একটা জিনিস করল যা এর আগে কেউ কখনো করেনি; স্ত্রী হিরণ্ময়ীকে সঙ্গে নিয়ে গেল সে।
‘বাপ রাজারাম পণ্ডিত কচি বউকে নিয়ে সহমরণে গিয়েছিলেন, ব্যাটাও তাই করলেন!’ পণ্ডিতেরা বললেন। ‘বউ নিয়ে বাবু চললেন কলকেতায়।’
কিন্তু পাগলরাম স্ত্রীর জন্য জ্বলন্ত চিতা নয়, মহানগরের খোলা আকাশ সাজিয়েছিল। ওর ইচ্ছে ছিল হিরণ্ময়ীকে বেথুন সাহেবের ইস্কুলে ভর্তি করবে। নতুন অজানা শহরে গিয়ে হিরণ্ময়ী অতটা করতে রাজি হলো না। অগত্যা বাড়িতে মেমসাহেব রেখে স্ত্রীর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করল পাগলরাম।
.
মাছ যেভাবে স্থির বদ্ধ জলা ছেড়ে সজীব স্রোতে ভেসে যেতে চায়, সেভাবেই সাতগাঁর মৎস্যভূমির বিভিন্ন স্তরের মানুষকে হাতছানি দিচ্ছিল কলকাতা। তার মধ্যে একজন হলো ননী। সেই যেবার হান্স অ্যঅ্যান্টনি হীরক স্ফটিকের মতো নার্কিন দেশের বরফ নিয়ে এল, সেদিন থেকেই কলকাতায় যাবার ইচ্ছে বাসা বেঁধেছিল ননীর মনে। গোবর্ধনের ঠেকে কলকাতা থেকে যে খদ্দেররা আসে তাদের প্রশ্ন করে উত্ত্যক্ত করে সে, শুনতে চায় কলকাতা শহরের কথা, রাস্তার ওপর পাতা লাইনে ঘোড়ায় টানা ট্রামগাড়ির কথা, সকালবেলায় ভিস্তিওয়ালারা এসে রাস্তাঘাট ধুয়ে দেবার কথা, প্রহরে প্রহরে গড়ে তোপ দাগার কথা, জেলেপাড়ার সঙের কথা, বড়লাটের কুঠির মাঠে কুচকাওয়াজের কথা
যেদিন কলকাতায় যাবার রেলের গাড়ি চালু হলো, ননীর কৌতূহল বাঁধ মানল না। নতুন বন্দর-হুগলি স্টেশনে রেলের গাড়ি আসা দেখতে গিয়ে একদিন দশ সের দুধ পোড়ালো। সেদিন উনুনের চ্যালা কাঠ দিয়ে ওকে উত্তমমধ্যম পিটুনি দিল গোবর্ধন।
বাবার হাতে চ্যালাকাঠের মার খেয়ে গুপ্তিপাড়ার গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল ননী। অভাবী ময়রার ঘরে নিয়মিত প্রহার আর নিমতেতো গঞ্জনা ছাড়া আর কিছু জুটত না। এখানে তা নয়। সেদিন রাত্রিবেলা ঝাপফেলা দোকানঘরের ভেতর কাঁথার বিছানায় শুয়ে ঘুমপাড়ানো উনুনের চেয়েও স্নেহতপ্ত গোবর্ধন ননীর কালসিটে-পড়া পিঠে পাছায় সরবাটা ঘি মাখিয়ে ওর সর্বাঙ্গে চুমু খেতে খেতে বলল –
‘সোনামাণিক আমার, এত যে রেলগাড়ি চেপে কলকাতায় যাবার শখ তোর, রেলগাড়ি চাপলে আয়ু কমে যায় সেটা জানিস?’
‘সে যায় যাক!’ ননী অভিমানী কন্ঠে বলে– ‘আয়ু কমলেই বা কি, কলকাতায় একদিন বাঁচা এখানে দশদিন বাঁচার সমান!
গোবর্ধন করুণ হেসে ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে নিজের শিথিল মসৃণ স্তন গুঁজে দেয় ঠোঁটের ফাঁকে।–‘এখন তোর হাতে অঢেল আয়ু তাই অমন করে ভাবতে পারছিস রে!’
কিন্তু কোনোরকম প্রলোভনেই ননীকে ধরে রাখা গেল না। ঠিক যেভাবে এক ভোর রাতে গাঙীর বাহুডোর থেকে পিছলে পালিয়েছিল শার্ল, সেভাবেই ঘুমন্ত গোবর্ধনের বিছানা থেকে পালিয়ে গেল ননী। যাবার আগে দোকানের পেছনে গাঁজার ঝাড়ের নীচে মাটি খুঁড়ে গোবর্ধনের সঞ্চিত টাকার কৌটোটাও নিয়ে গেল। কিন্তু বন্দর-হুগলি রেল স্টেশনে গিয়ে টিকিট কেটে রেলগাড়িতে চড়াটা আর সাহসে কুলোল না। গুপ্তিপাড়া থেকে যেভাবে সে ধর্মতলায় এসেছিল, সেভাবেই কলকাতায় গেল, বোটে। গোবর্ধনের বুক ভেঙে দিয়ে গেল।
এরপর মানুষটা আর বেশিদিন বাঁচেনি। একদিন সরস্বতীর ঘাটে নৌকায় আসা বাদাবনের জ্বালানি কাঠ বেছে কিনতে গিয়ে মৌমাছির কবলে পড়ল গোবর্ধন। এপিস ডোরসাটা প্রজাতির বড়ো হলদে ডুমো মৌমাছি, বসন্তের গোড়ায় ওরা তরাইয়ের অরণ্য থেকে দীর্ঘ পথ উড়ে এসে সুন্দরবনের জঙ্গলে চাক বাঁধে। একে কলকাতার বিস্তার ঘটছে, বাদাবন কাটা পড়ছে। জ্বালানি কাঠ নৌকা বোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছে বাজার গঞ্জের হাটে। আস্ত একটা মৌচাক যে ডালপালার আড়ালে রয়ে গিয়েছিল সেটা কেউ ঠাওর করেনি। গোবর্ধন অভ্যাস মতো নৌকায় উঠে সরেস কাঠ বেছে নিতে যেতেই মৌমাছিরা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করল।
মাঝিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা প্রবল রেলগাড়ির ইঞ্জিনের বাষ্পের মতো শব্দ, গোবর্ধনকে যেন ঘিরে ধরেছে একটা জীবন্ত মেঘ। প্রবল যন্ত্রণায় প্রাণের আকুতিতে পাড়ে লাফ দিয়ে নেমে উন্মাদ নৃত্য করতে লাগল। ওর আর্তনাদ চাপা পড়ে গেছে শত শত মৌমাছির ডানার ভোঁ ভোঁ শব্দে, দেহের প্রতি ইঞ্চি ত্বকে উপর্যুপরি হুল ফোটাছে, পাড়ে ছুটোছুটি করেও পরিত্রাণ নেই। ‘জলে পড়ো! জলে পড়ো!’ বলে নিরাপদ দূরত্ব থেকে চেঁচাতে লাগল সকলে। কিন্তু গোবর্ধনের দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য ছুটোছুটির ধরন দেখে বোঝা গেল ইতিমধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে সে। মাঝিরা বৈঠা দিয়ে জলে আঘাত করতে লাগল, সেই শব্দে নদীতে ঝাঁপিয়ে ডুব দিল বটে, কিন্তু জলের ওপরে ভোঁ ভোঁ করে পাক খায় মৌমাছির স্তম্ভ, শ্বাস নিতে মাথা তুললেই নেমে এসে আক্রমণ করছে। অনেকক্ষণ পর মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে লোকজন এসে মৌমাছি তাড়িয়ে যখন জল থেকে গোবর্ধনকে টেনে তুলল, ততক্ষণে সে সংজ্ঞাহীন, ফুসফুসে জল, অন্ধ চোখে গলন্ত আগুনের ঝলকানি, কানে বেজে চলেছে উচ্চকিত গুঞ্জন। বহুকাল আগে গাজির বাগানে যে দুর্ভিক্ষপীড়িত কঙ্কালসার মানুষগুলোকে সে দেখেছিল, যে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া থেকে নিজে পালিয়ে সে এই দূর বাংলায় এসেছিল, সেই হাজার হাজার মানুষের বিশুষ্ক ফ্যাসফেসে কন্ঠস্বর বুঝি এতদিনে তাকে খুঁজে পেল।
সন্ধ্যার আগেই মারা গেল গোবর্ধন হালুয়াই। বৈদ্যরাজ গঙ্গারাম চক্রবর্তী মধু ও মোমের দ্রবণে ঘৃতকুমারীর কাৎ মিশিয়ে প্রলেপের বন্দোবস্ত করেও তাকে বাঁচাতে পারলেন না।
