সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.৬
১০.৬
এরই মধ্যে বাপ্পার পৈতে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল শিউলি।
প্রথমে ঠিক হয়েছিল আদিরামবাটিতে উপনয়ন অনুষ্ঠান হবে, এই বাড়ির সব পুরুষের মতোই সরস্বতীর জলে সন্ন্যাসীর দন্ডি ভাসাবে বাপ্পা। ও বাড়িতে এক বছর ব্যাপী কালাশৌচ শেষ হবার আগেই শিবু ঠাকুর গণনা করে জানালেন কালাশৌচ অন্তের ঠিক পরে-পরেই সূর্য ধনু রাশিতে প্রবেশ করবে। শুরু হয়ে যাবে মলমাস, আর কোনো শুভকাজ করা যাবে না। ইতিমধ্যে শিউলির রেডিয়েশান নেওয়া শুরু হয়েছে। রাইটার্স বিল্ডিংস-এ নতুন পদে যোগ দিয়েছে রথীন। নিজে কোনোরকম ধর্মীয় আচারে, বিশেষত উপনয়নের মতো বর্ণবৈষম্যময় রীতিতে, বিশ্বাস না করলেও শেষ পর্যন্ত শিউলির এই একটি আকুল, জীবনের শেষ ইচ্ছার কাছে মাথা নোয়ালো সে, কলকাতাতেই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান সারা হলো।
অনেকদিন বাদে আবার রথীনের পরিবার মিলিত হলো কলুটোলা লেনে। কিন্তু অতীতের সেই রবিবারগুলোর মতো উচ্ছলতা নেই। বাপ্পার উপনয়ন, কিন্তু মনে হবে বুঝি গোটা অনুষ্ঠানটাই হচ্ছে শিউলিকে ঘিরে। ওর উজ্জ্বল গোল গোল চোখের নীচে যে কঠিন ছায়া জমেছে, সেই ছায়াই যেন ছেয়ে এসেছে বাসায়। তার ভেতরে মানুষগুলোকে কেমন ক্ষুদ্র আর ভারি দেখাচ্ছে, যেন জলের ভেতরে চলাফেরা করছে।
সাতগাঁ থেকে শিবু চক্রবর্তী এসে পৌরোহিত্য করলেন। রথীনের পরিবার যদিও শাক্ত, কিন্তু স্মার্ত মতে বাপ্পার দীক্ষা হলো সাবিত্রী মন্ত্রে। তামার ঘড়ায় সরস্বতীর জল নিয়ে বিশুকার আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর এল না। কলকাতার মাটিতে জীবনে কখনো পা না রাখার সিদ্ধান্তে অনড় রইল। দেবেন স্যাকরাকে দিয়ে বাপ্পার জন্য সোনার আঙটি গড়িয়ে পাঠালেন রামপ্রাণ। এছাড়া একটি বাঁধানো খাতায় গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লিখে পাঠালেন গায়ত্রী মন্ত্র ও দরপ গাজীর গঙ্গাস্তোত্র, যা উপনয়নের পর ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিকের কালে সাতগাঁর সকল ব্রাহ্মণ উচ্চারণ করে এসেছে বিগত ছশো বছর ধরে–
যদি তু গতিবিহীনং তারয়েঃ পাপিনং মাং
মাং তড়পি তব মহত্ত্বং তন্মহত্ত্বং মহত্ত্ব
কিন্তু কার পাপ? কোন পাপে জীবনটা এভাবে ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে? বাপ্পা জানে না। আর এই অজানা অন্যায়ের বোধ থেকেই কোনোদিন সে এইসব ধর্মাচরণে বিশ্বাস করবে না। কেবল মায়ের মুখ চেয়ে যতদিন শিউলি বেঁচে থাকবে, যান্ত্রিকভাবে কয়েকটি আচার পালন করে যাবে।
চিনিকাকা উপহার দিল HMT কোম্পানির ঘড়ি। পন্ডিচেরি থেকে বসন্তমামা উপহার কেনার টাকা পাঠালো মানি অর্ডারে। তিতলি পাঠালো হাতে-আঁকা কার্ড: সূর্যাস্তের আগুনঢালা নদীর পাড়ে ঝুঁকে পড়ে ঝুরি নামিয়েছে বটগাছ, নীচে দাঁড়িয়ে সন্ন্যাসীর বেশে কিশোর ব্রাহ্মণ। তার পরনে গেরুয়া বসন, হাতে দন্ডি, মুন্ডিত মস্তকে শিখা, গলায় উপবীতের সমান্তরালে স্পষ্ট সবুজ রঙের জন্মদাগ।
তিনদিন পর ভোরবেলায় প্রথম ট্রামে চেপে যে নদীতে গিয়ে দন্ডি ভাসালো বাপ্পা, সেই নদীটা তিতলির আঁকা নদীর মতো নয়। সেখানে ভাসছে বিশাল মহানগরের যত আবর্জনা, হাওড়া ব্রিজের নীচে ঘাটের সিঁড়ির ওপর তেল দলাই মলাই করছে একদল মানুষ। আবক্ষ জলে দাঁড়িয়ে ব্রিজের ওপর ট্রাম চলে যাবার যে ধ্বনিটা শোনা যায়, সেটা চলন্ত ট্রামের ভেতর বসে শোনা ধ্বনির থেকে ঢের আলাদা। দন্ডি ভাসিয়ে ডুব দিয়ে উঠে ভিজে পোশাকে ভিক্ষা-মা মোমবুচানের সামনে দাঁড়িয়ে বাপ্পা বলল
‘ভবতি ভিক্ষাং দেহি!’
মোমবুচান পেতলের সরা থেকে ভিক্ষার ঝুলিতে ফল ও আতপ চাল ঢেলে দেবার পর বলল–‘ওঁ স্বস্তি!’
গেরুয়া বসন ছেড়ে জলে ভাসিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবির রাজবেশে বাসায় ফিরল বাপ্পা। একটি জীবনের খোলস ছেড়ে আরেকটি জীবনে প্রবেশ করল।
না, উপনয়নের অনুষ্ঠানে সিলেট থেকে আসা বংশলতিকা-সংবলিত সেই পোস্টকার্ডটি দেখা যায়নি। পোস্টকার্ডের কথা কারোর আর মনে ছিল না।
*
ছোটোবেলায় মায়ের সঙ্গে বন্দর-হুগলি থেকে ছোটো রেলে চেপে সাতগাঁয়ে আসার সময়ে কখনো-সখনো সবুজ-রঙা দুটি যাত্রী কামরার পেছনে আরেকটি জানলাবিহীন মালের কামরা থাকত। ভেতরে সিটের বদলে লোহার তাক, মেঝে জলকাদায় ভিজে, বাতাসে একটা বিষণ্ণ, গুমসানো গন্ধ। কামরা বোঝাই হয়ে চিজের বান্ডিল ছাড়িগঙ্গার গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে যায়। সেই চিজের নাম বন্দর চিজ, লোকে বলে চিজের কামরা। তার দরজার পাশে ইংরেজি ও বাংলায় লেখা সতর্কবাণী বাপ্পা পড়তে পারত না, নীচে রেখাচিত্র নজর টানত– খাটে শোয়ানো মৃতদেহ, তার ওপর লাল কালিতে ক্রশ চিহ্ন আঁকা।
‘ওটা কীসের ছবি মা?’ বাপ্পা জানতে চাইত।
ট্রেন ধরার তাড়ায় শিউলি প্রতিবারই বলত,— ‘এখন সময় নেই, পরে বলব।’ কোনোদিনই বলার সময় হয়নি শিউলির। ইতিমধ্যে বাপ্পা নিজেই দরজার পাশে সতর্কবাণী পড়তে শিখেছে:
এই কামরায় মৃতদেহ বহন দন্ডনীয় অপরাধ
কঠোর শাস্তি ও জরিমানা হইবে
ত্রিবেণীতে মহাশ্মশান, সেখানে দাহ হলে কাশীর মতোই পুণ্যলাভ হয়— এমন একটি লোকবিশ্বাস বহুকাল ধরেই ছিল। দূরদূরান্ত থেকে মৃতদেহ সৎকারের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচাতে ছানার কামরায় চাপিয়ে নিয়ে যাবার একটা চল ছিল, সেটা বাপ্পা জানতে পারল অনেক পরে। তার আগে, অক্ষরজ্ঞানেরও আগে, সেই কফিনের মতো চিজের কামরা, সেই বিচিত্র গুমসানো গন্ধ, কামরার মেঝেয় আঠালো আর্দ্রতা কীভাবে যেন স্মৃতিতে অবিচ্ছেদ্য জড়িয়ে গেল মৃত্যুর সঙ্গে।
*
স্টেশনের গেটে টিকিট চেকার ঘোষাল বাপ্পার হাফ টিকিট দেখে সন্দেহে ভুরু কুঁচকেছিল একবার। আরেকবার বলেছিল— ‘পরের বার হয় ফুল টিকিট লাগবে, নয়তো জন্মতারিখের কোনো নথি দেখাতে লাগবে!’
শিউলির পরের বারটাই ছিল শেষ বার। এরপর সে সাতগাঁয় আসবে একটি পোড়া মাটির ঘটে।
আরেকদিন, রবিবার, কলুটোলা লেনে বাসাভর্তি লোকজন। শিউলি কাউকে কিছু না জানিয়ে বাপ্পাকে নিয়ে চলে এসেছিল সাতগাঁয়। সেবার আর ঘোষাল টিকিট দেখতে চায়নি, উৎকণ্ঠায় বিহ্বল চোখে চেয়ে ছিল শিউলির মুখে। পালকিতে আদিরামবাটি যাবার সময়ে হেলে পড়া নরম সূর্যের আলোয় মায়ের মুখে বাপ্পা প্রথম দেখেছে অসুখের গাঢ় ছায়া।
অনেক বছর পরে হিসেব করে দেখবে, ততদিনে মেটাস্টেসিস শুরু হয়েছে। মারণ ব্যাধি দেহের অভ্যন্তরে একের পর এক প্রধান অঙ্গগুলোকে গ্রাস করছে, যদিও তখনও কিছু ধরা পড়েনি। হঠাৎ হঠাৎ পেটে ব্যথা, বমি, হজমের গোলমালের জন্য বাবার চিকিৎসাধীন ছিল শিউলি। এবং যে পরাণ ডাক্তার নাকি রুগির দিকে একবার তাকিয়ে রোগ নির্ণয় করতে পারতেন বলে খ্যাতি ছিল, তিনিও কিছু বুঝতে পারেননি। ঘোষাল কি কিছু টের পেয়েছিল? বাপ্পার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করবে, অভয়চরণ ঘোষালের মতো ওই তীব্র নিবিড় দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে হয়তো কেউ কোনোদিন তাকায়নি।
প্রতিবার স্টেশনের লোহার গেটটা পার হবার সময় শিউলির মুখ যেভাবে সে দেখেছে, যেভাবে সে প্রতিবার সেই মুখচ্ছবি স্মৃতির মণিকোঠায় তুলে রেখেছে, তারপর অকৃতদার জীবনের রিক্ত নিঃসঙ্গ সন্ধ্যাগুলোয় মনে মনে পাতা উলটেছে ছবির অ্যালবামের মতো, শুনশান প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে তার ছোট্ট দু-কামরার কোয়ার্টারে বসে, আটটা পঁয়তাল্লিশের লাস্ট ট্রেন ছেড়ে যাবার পর, সিগন্যাল বাতির প্রদীপে তেল ফুরিয়ে এসে কয়েকবার দপ-দপ করে নিভে যাবার পর, তারার আলোয় চিকচিকে রেললাইনের ওপর শিয়ালছানার দল উঠে এসে খেলা করতে শুরু করার সেই প্রহরে। যে টিকিট চেকার ঘোষাল ছিল ছেলেবেলার মূর্তিমান হ্রাস, বহু বছর পরে প্রৌঢ় নিঃসঙ্গ জীবনের দোরগোড়ায় এসে ততদিনে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে অন্য পুরুষের কাছে, একমাত্র পুত্র প্রবাসে সেই মানুষটিকে এভাবে কল্পনা করে এক বিচিত্র উষ্ণ সমবেদনার প্রবাহে ভরে উঠবে বাপ্পার মন।
সেইসব স্মৃতির টুকরো জিগ-স পাজলের মতো জোড়া লাগাতে গিয়ে সে আবিষ্কার করবে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই। সেই সময়ের এক সুস্পষ্ট অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে পারবে না বাপ্পাদিত্য। ওই বয়সে মায়ের ওই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করার অভিঘাত যে শুধু বিস্মৃতি এনে মুছে দিয়েছিল তাই নয়, গোটা ছবিটা কোনোভাবেই স্পষ্ট ছিল না। তার কারণ বাপ্পাকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল এবং সেটা শুধু শিউলির অসুস্থতা শুরু হবার সময়েই নয়, তার ঢের আগে থেকেই রথীনের কর্মস্থলে জটিলতা, চিনিকাকাকে ঘিরে বাবা- মায়ের সংঘাত, শিউলি-বাপ্পার দীর্ঘকাল আদিরামবাটিতে থাকা নিয়ে অন্যদের মনোভাব, রথীনের অতীত সম্পর্কে আদিরামবাটির লোকজনদের মনোভাব… এসব কিছুর থেকে। তিতলি, সেইসময় তিতলির মতো আরও অনেকেই, বড়ো যৌথ পরিবারের অনেক লোকজনের মাঝে বড়ো হয়ে ওঠায় বড়োদের জগতের ক্লেদ জটিলতার নাগালের বাইরে থেকে যায়। তাদের মনে কোনোরকম প্রভাব পড়েনি। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই বাপ্পার বেড়ে ওঠার বেশিরভাগটাই কেটেছে কলকাতার ছোট্ট বাসায়, কিংবা জেলায় কোয়ার্টারে বাবা-মায়ের সঙ্গে, এমনকি শুধুমাত্র মায়ের সঙ্গে। ফলত বড়োদের জীবনে একভাবে জড়িয়ে থেকেও কী ঘটছে তার পুরো ছবিটা দেখতে না পাওয়া মনের মধ্যে একটা চাপা অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করল।
*
শিউলির অ্যাডিনোকার্সিনোমার চিকিৎসা শুরু হবার আগেই মালদার পাট চুকিয়ে চলে এসেছে রথীন। তার আগে একবার এসে বাপ্পাকে নিয়ে হিন্দু স্কুলে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসেছে। হিন্দু স্কুল সরাসরি সরকার পরিচালিত, সরকারি কর্মচারীর সন্তানের মাঝপথে ভর্তি হতে কোনো বাধা নেই। ঠিক হয়েছে নতুন সেশন শুরু হলে বাপ্পা ইস্কুলে যোগ দেবে। কলেজ স্ট্রিটে ওর জন্য বই কিনতে গিয়ে কফি হাউসে বসে প্রথম যেদিন শিউলির ব্যাধির স্বরূপ ছেলের কাছে প্রকাশ করল রথীন, সেদিন ওর জন্য এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ছবিও আঁকল। হিন্দু স্কুল শহরের অন্যতম প্রাচীন ও নামী স্কুল, অসংখ্য কৃতী মানুষজন পড়েছেন; রাস্তার উলটোদিকে আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজ, যেখানে এরপর হয়তো সে পড়বে; কয়েক পা দূরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, তারও দক্ষিণে মেডিকেল কলেজ… কফি হাউসের বড়ো জানলা দিয়ে যে রাস্তাটা দেখা যায় তার দুপাশে কত যে ইতিহাস।
অনেক পরে বাপ্পা ভেবে দেখেছে, নিজে ঠাঁইনাড়া হয়ে ইতিহাসের খড়কুটোর মতো ভেসে ভেসে এসে এই একটি স্থানে সঞ্চিত শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসের প্রতি একটা মোহ ছিল রথীনের। সেই মোহ গাঢ় হয় যখন সে পুরাতত্ত্ব বিভাগে যোগ দিল, একটি স্থানে স্তরে স্তরে সঞ্চিত সময়রেখায় পেশাদারি দৃষ্টি লাভ করল। কিন্তু সেদিন কফিহাউসে বাপ্পার মনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় পথ এঁকে দেবার মধ্যে পিতার অবচেতনে কাজ করছিল যে উৎকণ্ঠা, তা হলো শিউলির অসুস্থতার প্রকৃত ছবিটা ওর সামনে তুলে ধরা।
এসবের পরেও অবশ্য বাপ্পা মায়ের দ্রুত ঘনিয়ে আসা পরিণতি সম্পর্কে আঁচ পায়নি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে কাটা পাঁঠার মতো ছটফটানিটা চলছিল, সেই সঙ্গে বমি। অ্যালোপ্যাথি ওষুধে যন্ত্রণার উপশম হচ্ছিল না, শিউলি ফের বাবার পাঠানো ওষুধ খেতে শুরু করেছিল। রাত জেগে জেগে হোমিওপ্যাথির বই ঘেঁটে ওষুধ তৈরি করে পাঠাচ্ছিলেন রামপ্রাণ। কয়েকদিন পর পর শিউলিকে দক্ষিণ কলকাতায় বড়ো আর ব্যস্ত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে খোকা জেঠু থাকে, মাঝে মাঝে বাপ্পাও সঙ্গে যায়। অনেক পরে সে জানতে পারবে, সেটি চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতাল। আউটডোরে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় বাতাসে আয়োডিনের গন্ধ, দেয়ালে নীলচে ধূসর রং, দরজায় ঘন সবুজ পর্দা, রোগীদের মুখে আদিরাম মন্দিরে পোড়ামাটির গায়ে লাইকেনের মতো গাঢ় ছায়া… কোনটা যে ওকে বেশি বিচলিত করে সেটা অনেককাল পরে আর মনে পড়বে না। ট্রামে চড়ে যাওয়া হয়, কিন্তু ফেরার সময়ে ট্যাক্সি নেওয়া হয়। তার কারণ শিউলি অসম্ভব বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে এক-দুদিন লাগে।
কিছুদিন পরে অন্য এক ডাক্তারের বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির সন্ধান পেয়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল। সেই সময় প্রতিবার বাপ্পা সঙ্গে যায়। কলকাতা ছাড়িয়ে দক্ষিণে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে অনেকটা গিয়ে নতুন হাসপাতাল, গাছগাছালিতে ঘেরা মাঠের ওপর কয়েকটি টিনের শেড নিয়ে অনেকটা যেন আশ্রমের মতো। রথীনের সহকর্মীরা ও তাদের পরিবার ব্যক্তিগত কাজে, এমনকি নিউ মার্কেটে শপিং করতে গেলেও ON DUTY লেখা অফিসের সাদা অ্যাম্বাসাডার ব্যবহার করে, কিন্তু রথীন গাড়ি ভাড়া নেয়। শহরের ইটকাঠের জঙ্গল ছেড়ে দীর্ঘ পথ, ঝিমধরা মফস্সলের ফাঁকে ফাঁকে চাষের ক্ষেত, নয়ানজুলি, গ্রাম, আমবাগানের সুবাস। শত কষ্টের মধ্যেও আশ্চর্যজনকভাবে জেগে ওঠে শিউলি, ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয়ে ওঠে। বাপ্পা দেখে, মায়ের পান্ডুর যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে ফুটেছে এক অন্য রকমের আলো। ঠিক যেমনটা সে ছোটোবেলায় দেখেছে মার্টিন্স রেলে চড়ে সাতগাঁয় যাবার সময়ে, যখন দুজনে হাত ধরাধরি করে ছুটে রেলের লাইন পার হবার পর সোনালি ট্রিমিং দেওয়া সবুজ কামরায় উঠে পড়েছে, আর শিউলি হাঁফাতে হাঁফাতে বলেছে— ‘আমায় ছুঁয়ে দিব্যি কাট বাবাকে কখনো বলবি না!’ বাপ্পা, মায়ের শক্ত মুঠিতে ধরা, বলেছে— ‘দিব্যি কাটছি মা, কখনো বলব না!’ তখন অবিকল যে আলো ঝিকমিক করেছে শিউলির চোখে, সেইরকম একটা আলো ফুটে উঠতে দেখে বাপ্পা শহর ছাড়িয়ে ঠাকুরপুকুর যাবার পথে। গাড়ির কাচ নামিয়ে জানলা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসে, সেই হাওয়ায় নানান গাছপাতার গন্ধ পায় শিউলি, একদিন চোখে আবুলি লেগে আধোঘুমের ভেতরে জিজ্ঞেস করে বসল–
‘সাতগাঁ স্টেশন কি এল?’
.
কিন্তু সাতগাঁ আর এল না। বাপ্পার উপনয়ন মিটে যাবার পরেই দ্রুত অসুখের প্রকোপ বেড়ে গেল, মনে হয় যেন বাপ্পার দ্বিজত্বের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। চিকিৎসার দ্বিতীয় বৃত্ত সম্পূর্ণ হবার আগে মাথায় বিখ্যাত চুলের গোছা উঠে যেতে থাকে, বাসায় সর্বত্র উড়ে বেড়ায়। সারা শরীরে যন্ত্রণা আর লাল লাল ছোপ ফুটতে শুরু হয়। বাপ্পার মনে পড়ে যায়, রোগনির্ণয়ের জন্য কীভাবে দাদু রোগীদের বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রণার স্বরূপ জানতে চাইতেন, ঠিক কী ধরনের যন্ত্রণা হচ্ছে সেটার বর্ণনা দিতে বলতেন। মায়ের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে সে আবছা বুঝতে পারে, কী নিষ্ফল এভাবে যন্ত্রণার স্বরূপ বোঝার চেষ্টা।
এক বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো শিউলিকে, আলাদা কেবিনে ব্যবস্থা হলো। রথীন অফিসে ছুটি নিয়ে রাতে সেখানে থাকতে শুরু করল। খোকাজেঠু আর মোমবুচান কলুটোলা লেনের বাসায় এসে বাপ্পার সঙ্গে রইল। কলকাতায় রথীনের আত্মীয়দের আসা যাওয়া চলতে লাগল। সোমবার পর্যন্ত টানা তিনদিন অক্সিজেন চলার পর শিউলির শারীরিক অবস্থা একটু স্থিতিশীল হওয়ায় রথীনকে বিশ্রাম দিতে পঞ্চম রাতে বাপ্পা ওর মায়ের সঙ্গে কেবিনে রাত কাটাবে স্থির হলো।
কড়া মাত্রায় ট্রাঙ্কুইলাইজারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে শিউলি, মাঝে মাঝে ফিফিস্ করে জানায়, ভেতরে কোথাও একটা আগুন যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে।
সেই প্রদাহ, যার থেকে নিষ্কৃতি পেতে গঙ্গারাম তলপেটে সরস্বতীর ভিজে মাটির পুলটিশ লাগিয়ে থাকতেন, স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় উঠে যে জ্বলনের হাতে নিজেকে সমর্পণ করেছিল লক্ষণা, যা বালক বয়সে গঙ্গারাম চোখে দেখেননি কিন্তু ধারাবিবরণী শুনেছেন।
রক্তের ভেতরে বয়ে চলা জ্বলনের অনুভূতি প্রশমন করতে বাতানুকূল কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছে। সারা রাত এয়ারকন্ডিশনারের যান্ত্রিক গোঁ গোঁ ধ্বনি আর হিম ঠান্ডার ভেতরে বাপ্পা ঘুমোতে পারে না, হাত পা জমে যেতে যেতে নীলাভ নাইট ল্যাম্পের আলোয় দেখে সবুজ চাদরে বুক পর্যন্ত ঢাকা মায়ের মুখ পাণ্ডুবর্ণ, অনির্বচনীয় হাসির আভাস, অঘোর অচৈতন্যের ভেতর ঠোঁট দুটো সামান্য কাপছে। উঠে মায়ের কাছে গিয়ে খুব সন্তর্পণে অক্সিজেন স্যালাইনের নল বাঁচিয়ে ঠোঁটের ওপর কান পাতে।
গভীর অতল ইঁদারার ভেতর থেকে পাক খুলে উঠে আসছে মায়ের কন্ঠস্বর, ক্ষীণ একঘেয়ে স্বরে বলে চলেছে–
‘কর্তা আছে নাকি… কর্তা আছে নাকি…’
‘না গিন্নি, নেই!’ কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে বাপ্পা।
পরক্ষণেই ঘরের মৃদু নীলাভ আলোয় মনে হলো মায়ের বুকের ওপর সবুজ চাদরটা বুঝি হিম কুয়াশার নদী, যে নদী দিয়ে একদা বণিক যোদ্ধা পর্যটকেরা এসেছে। তারা আর ফিরে যায়নি। এক অদ্ভুত বিরল প্রশান্তি মায়ের মুখে, যা এতদিনে এই প্রথম সে দেখল। মনে হচ্ছে যেন শিশুর মতো দেয়ালা করছে মা, চুলের গোছা খসে গিয়ে ফর্সা মাথার চামড়া দেখা যাচ্ছে। বাপ্পার মনে পড়ে যাচ্ছে সাতগাঁয় দুর্গা ঠাকুর ভাসান দেবার ঠিক পরেই যতক্ষণ লাগত দেবীপ্রতিমা ধীরে ধীরে ডুবে যেতে, মাটির গা থেকে রং ছড়িয়ে জলটা গোলাপী হয়ে উঠতে, ততক্ষণে প্রতিমার মাথা থেকে চুলের গোছা খসে ভেসে গিয়ে দেখা যেত অনাবৃত মাথাটা।
প্রদীপের শিখা নিভে যাবার আগে যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে, কিছুটা সময় ধরে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকে, সেভাবেই সেই রাতের পর একটা গোটা দিন শিউলি খুব ভালো রইল। সেটা যে ক্ষণস্থায়ী, আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস, সেটা তখন বোঝা যায়নি। এমনকি ডাক্তাররাও আশান্বিত হলেন, নতুন একটি ওষুধ কার্যকর হয়েছে। অনেকদিন পরে শিউলি খুব তৃপ্তিসহকারে সব খাবার খেল, খাবারের স্বাদ মুখে পেল। রাতে ভালো ঘুম হলো। কোনোরকম ব্যথার অনুভূতি ছাড়াই সকলের সঙ্গে কথা বলল। বাপ্পার রনোমামা এসেছিল; সুস্থ হয়ে উঠলে সবাই মিলে আবার সাতগাঁ যাবার পরিকল্পনা হলো। সব মিলিয়ে এতটাই ভালো আছে মনে হলো যে পরদিন সকালে রথীন আটদিন পরে অফিস গেল জরুরি কয়েকটি কাজ সারতে। আর সেদিনই দুপুরবেলায় চলে গেল শিউলি।
পাঁচটি শ্বেত পাপড়ি আর কমলা বৃত্তের শিউলি বাংলার ফুল, রাতের শেষ প্রহরে ফোটে। ভোরের আগেই শরতের হিমের আঘাতে নিঃশব্দে টুপ করে খসে পড়ে। সংক্ষিপ্ত তার জীবন, ততোধিক অনুচ্চার ও সুস্পষ্ট তার সৌরভ। স্মৃতিতে রেশ রেখে যায়।
অনেক বছর পরে বাপ্পার মনে পড়বে ছোটোবেলায় মা একবার কথাচ্ছলে বলেছিল,— ‘আমি যেদিন মরব সেদিনও তোর বাবা অফিস করবে, দেখিস!’ সেই কথা সত্যি হলো। ততদিনে বাপ্পা জেনেছে, মৃত্যুর অব্যবহিত আগে দীর্ঘদিন রোগে ভোগা কোনো কোনো মানুষ স্বল্প সময়ের জন্য অদ্ভুত রকমের সজীব সচেতন হয়ে ওঠে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় একে বলে— ‘কোর্সিং’, এবং এর কোনো স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
.
বাপ্পার উপনয়নের দন্ডি সরস্বতীর জলে ভাসানো যায়নি। শিউলির অন্ত্যেষ্টিও সরস্বতীর ধারে করা গেল না। কলকাতায় হুগলি নদীর ধারে নিমতলার ঘাটে দাহ হলো। তিন দিন পর মাটির ঘটে অন্ত্যেষ্টির ছাই নিয়ে গিয়ে কিছুটা ভাসানো হলো সরস্বতীতে, বাকিটা ঘট সমেত পুঁতে দেওয়া হলো ওষধিবাগানে, যেমনটা নাকি সে চেয়েছিল।
তার কিছুকাল আগে উপনয়নের সময় মাথা কামানোর পর বাপ্পার মাথায় সদ্য চুল গজিয়েছিল। সেই চেহারায় কাছাধারী অবস্থায় তাকে দেখতে জ্ঞাতিদের দল এল আদিরামবাটিতে। কলকাতায় যে লোকে অকালে মরার জন্যেই যায় সেই সত্যটা আরেকবার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো। কেউ কেউ আড়ালে সেই পুরোনো ধুয়োটা আবার তুলল
‘পরান ডাক্তার মেয়ের বিয়েটা কলকাতার ছেলের সঙ্গে দিয়েই ভুল করেছিল, তাও আবার কী না বাঙাল!— ‘
জীবনে প্রথমবার কলকাতায় এল বিশুকা, নিমতলা ঘাটে সারাক্ষণ বাপ্পাকে আগলে বসে রইল। শিবু চক্রবর্তী দাঁড়িয়ে থেকে ক্রিয়াদি করালেন। ওরা দুজন ঘাটে রথীনকেও আগলে বসেছিল। বহু বছর আগে সাতগাঁয় তাবুতে এক নবাগত তরুণ সার্ভেয়ারকে ঘিরে বসে থাকত যে দীর্ঘ সন্ধ্যাগুলো, তার স্মৃতিচারণ করছিলেন শিবু ঠাকুর। রথীন চুপচাপ ওঁর কথা শুনছিল, ঠিক যেমনটা সে শুনত তাঁবুর সেইসব সন্ধ্যাগুলোয়। একটা পাটকাঠি হাতে নিয়ে আনমনে ঘাটের সিঁড়িতে উড়ে আসা ছাইয়ের ওপর আঁক কাটছিল বৃত্ত, বিন্দু, সমান্তরাল রেখা:
১ – রথীনের জন্য একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো
২ – শিউলির জন্য একটি সমাপ্তি বিন্দু, একটি যতিচিহ্ন
৩ – বাপ্পার জন্য দুটি সমান্তরাল সরলরেখা, একটি মিথের অপরটি ইতিহাসের। একটি শেষ, অপরটি শুরু।
আনমনা বালকের মতো মাটিতে পাটকাঠি দিয়ে আঁক কাটছে যে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, যে কর্মজীবনের শুরুতে মাটি আচ্ছাদিত ত্রিমাত্রিক স্থান এবং নৈঃশব্দ্য নিয়ে কাজ করেছে, সূক্ষ্ম বুরুশ বুলিয়ে সময়ের ধুলো সরিয়ে কীভাবে লুকোনো প্রত্নশিল্প খুঁড়ে তুলতে হয়, কীভাবে তাকে দিয়ে কথা বলাতে হয় তার পাঠ নিয়েছে, সেই পুরুষটি নিজের স্ত্রীর মনের অতলে নৈঃশব্দ্যের বীজবিন্দুর নাগাল পায়নি। সেটি হাতকয়েক দূরে চিতার আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
সন্ধ্যায় কলুটোলা লেনের বাসায় ফিরে বাপ্পার মনে পড়ল গামার কথা। দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের পর খড়মাটি ছাড়িয়ে ভারি সাবেক কাঠামোটা চিন্তামণির গাড়িতে চাপিয়ে শূন্য দুর্গামণ্ডপে এনে রাখত গামা। বুকে তেমনই এক অদৃশ্য কাঠামোর ভার। মোমবুচান কোথা থেকে মাটির প্রদীপ এনে বসার ঘরের কোণে জ্বালিয়ে রেখেছে। একদিন আগেও আলোর রোশনাই আর কলরোলে মুখর হয়ে ছিল যে দুর্গামণ্ডপ, সেখানেও বিসর্জনের পর এভাবে প্রদীপ জ্বালা হয়। বাপ্পার মনে পড়ে যায়, তিতলির সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখত সলতের কাপা কাপা আলোর ঘিরে আসা ছায়া আর নৈঃশব্দা, কাঠানোটার পা ভিজে, তাতে ছোট্ট কাকড়া, তখনও জীবন্ত। এরপর কাঠামোর জল শুকিয়ে যাবে, ভাতে ফুল জনবে, কাকড়া থেকে দেবী রূপান্তরিত হবেন নাকড়শাস্ত্র।
বাসায় বাপ্পা খোঁজে তেমনই মায়ের কোনো চিহ্ন। মেঝের ফাটলে পিঁপড়ের ভেতর, টিউবলাইটের আড়ালে টিকটিকির বাসার ভেতর কোনোভাবে ফিরে এল কি? মনে পড়ে যায় মায়ের একান্ত অন্তরঙ্গ স্পর্শগুলো, গন্ধগুলো–মায়ের উষ্ণ ঘাম-জবজবে হাত, হাতের মুঠোর ধরা, রেলস্টেশনের গেটে দাঁড়িয়ে ঘোষাল; রঘুনাথপুরে বাংলোয়, বাপ্পার শোবার ঘরে ততদিনে সে একলা শুতে শুরু করেছে উঁচু কড়িবরগা আর দেয়ালে কিম্ভুত আর্দ্রতার ছোপে অস্ফুট ভয়ে ঘুন আসে না, আর ওর আবদারে মা পাশে এসে শোয়, আর এই সময়ে মায়ের গা থেকে একটা অনারকম অচেনা গন্ধ বাপ্পার ভেতরে চারিয়ে যেতে থাকে একটা চাপা উৎকণ্ঠা হয়ে, ঘুমের ভেতরেও রাতের ফুলের মতো ফুটে থাকে, আর অন্ধকারে জেগে উঠে বাপ্পা দেখে মা বিছানায় নেই।
বহুদিন পরে ঠিক সেইরকম উৎকণ্ঠায় রাতে বাপ্পার ঘুম এল না। পাশের ঘরে বাবা একলা শুয়েছে প্রদীপের আলোয়, বারে বারে মনে পড়ে যায় হিমশীতল কেবিনের রাত, নীলাভ আলোয় মায়ের কেশবিহীন পান্ডুবর্ণ মাথা, যা দেখে করিডোরে বেরিয়ে এসে চিনিকাকা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাদছিল শিশুর মতো, বাবা পাথরের মতো মুখে ওর মাথায় চুলে হাত রেখেছিল, মনে পড়ে যায় সবুজ চাদরের নদী, অস্ফুট ঠোঁট নাড়া–
‘কর্তা, আছে নাকি?’
‘না গিন্নি, নেই!’
একটা হারিয়ে যাওয়া সবুজ নদীর বুকে দেবীপ্রতিমা গলছে, মাথার কেশরাশি ভেসে যাচ্ছে, গোলাপি সবুজ বাসন্তী রংগুলো জলে কুন্ডলি পাকিয়ে উঠছে।
‘মা দুর্গার দুঃখ?’
‘হুঁ।’
‘লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ?’
‘হুঁ, লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ।’
‘কাত্তিক ঠাকুরের দুঃখ?’
‘হুঁ, তাঁরও দুঃখ।’
‘সরস্বতীর?’
‘হুঁ।’
‘গণেশ ঠাকুরের?’
‘হুঁ।’
‘ময়ুর পেঁচা ইঁদুরেরও দুঃখ?’
‘হুম।’
‘সিংহের দুঃখ?’
‘সিংহের রাগ।’
‘মহিষের দুঃখ?’
‘মহিষ তো মরে গিয়েছে! মরলে কী আর দুঃখ হয়?’
