সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.২
১০.২
ফাল্গুনের শুরুতে একদিন ভরদুপুরে সরোজা শুনলেন সদর দরজার বাইরে অনেকক্ষণ ধরে কে যেন ডেকে চলেছে–
‘খুকি! ও খুকি! বাড়ি আছিস?’
খুব পরিচিত কোনো বৃদ্ধের গলা। বেরিয়ে এসে দরজা খুলতে দেখেন মনুখুড়োমশাই। রাধানগরে বাপের বাড়ির লোক, বাবার দুরসম্পর্কের জ্ঞাতিভাই। বহুকাল তাঁর দেখাসাক্ষাৎ নেই, কিন্তু ছোটোবেলায় মনুখুড়োকে ঠিক যেমনটি দেখেছিলেন সরোজা, একটুও বয়স বাড়েনি দেখে একটু অবাকই হলেন। অকৃতদার মানুষটি চিরকাল যজমানি করেছেন, বছরের সাত-আটমাস দূরে গ্রামেগঞ্জে শিষ্যদের বাড়ি ঘুরে ঘুরেই কাটাতেন। এদিনও তাঁর পরনে খেঁটো ধুতি, গায়ে নামাবলি, মাথায় ভিজে গামছা ভাঁজ করে রাখা, পায়ে খড়ম।
‘একি খুড়োমশাই যে? সরোজা গলায় আঁচল জড়িয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।— ‘আপনি খুকি খুকি বলে কাকে ডাকছেন?’
‘তোকেই ডাকছি রে মা!’
‘তা আপনি খুকি বলে ডাকছেন কেন? আমি কি আর খুকি আছি?’
‘বটেই তো, বটেই তো!’ মনুখুড়ো অসহায় হাসেন। ‘আসলে আমি তোর নামটাই ভুলে গিয়েছি রে!’
সরোজা আপ্যায়ন করে ওঁকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসে। কিন্তু শত অনুনয়েও মনুখুড়ো কিছুতেই ঘরের ভেতরে ঢুকবেন না; পরিবারের মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বলে কথা। ওষধিবাগানে নাগকেশরের নীচে বেদিতে বসে বলেন—
‘এই তো বেশ ভালো, কেমন সুন্দর ঠান্ডা জায়গাটা।’
কাঁধে উড়নির ঝোলা থেকে একটি বিচিত্র প্যাগোডার আকারে হলদে রঙের স্ফটিক বের করে সরোজার হাতে দেন।
‘তোর ছেলেমেয়েদের হাতে দিস, খেলা করবে। এবার আর কিছু আনতে পারিনি রে।’
সরোজা উপহারটি হাতে নিয়ে বলেন,— ‘তা বেশ। কিন্তু খুড়োমশাই, এসব নিয়ে খেলা করার মতো বয়স কী আর ওদের আছে? বড়ো ছেলে আর মেয়ে বিয়ে-ধা করে সংসারী হয়েছে। ছেলের দুটি, মেয়ের একটি সন্তানও আছে।’
‘বটেই তো, বটেই তো!’ মনুখুড়ো বাগানের গাছপালার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন উদাস হয়ে পড়েন, বলেন—‘এরপর যখন আসবো তোদের এই বাগানের জন্যে গাছগাছড়া নিয়ে আসব।’
সরোজা বালতিতে জল এনে ওঁর হাটু পর্যন্ত পুরু ধুলো ধুইয়ে গামছা দিয়ে ভালো করে মুছিয়ে দেয়, ফাটা-চটা পায়ের পাতায় সরষের তেল মালিশ করে দিতে দিতে রাধানগরের কথা জিজ্ঞেস করে। মনুখুড়ো যেসব সংবাদ দিতে থাকেন, দেখা যায় সেসবই সরোজার জানা। যেসব মানুষদের সাম্প্রতিক খবরাখবর বলতে থাকেন তারা কবেই মরে হেজে গিয়েছে। হয়তো বয়সের সঙ্গে স্মৃতি ক্ষয়ে গিয়েছে মনুখুড়োর সরোজা ভাবে যদিও চেহারা তিরিশ বছর আগে যেমনটি দেখেছিল ঠিক তেমনই আছে। কিংবা হয়তো রোদের মধ্যে পায়ে হেঁটে এতটা পথ এসে মতিভ্রম হচ্ছে। আহা রে! সরোজা ওঁর জন্য ফলারের ব্যবস্থা করে রেকাবিতে ফল মিষ্টি আর ডাবের জল এনে দেখে নাগকেশরের বেদির ওপর সুতোয় বোনা আসন আর হাতপাখাটি পড়ে আছে, মনুখুড়ো নেই। আসনের পাশে পড়ে আছে ওই অদ্ভুত শঙ্কু আকৃতির স্ফটিকটা।
এদিক-ওদিক লোক পাঠিয়েও বৃদ্ধের কোনোরকম খোঁজ পাওয়া যায় না, যেন দুপুরের তাপবাস্পে মিলিয়ে গিয়েছেন। হেমন্ত স্ফটিকটি নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে জানালো
‘এ কোনো প্রাকৃতিক স্ফটিক, এই সুষম আকার মানুষের হাতে তৈরি নয়। কোনো অচেনা পাথর কিংবা ধাতুর যৌগ, এমনকি হয়তো উল্কাও হতে পারে।’
ক্রিস্টাল সেটের গ্যালেনাখন্ড বের করে স্ফটিকটি বসিয়ে তামার সুচ ছুঁইয়ে কোনো চেনা বেতার তরঙ্গের আভাস পাওয়া যায় না; অতল মহাশূন্যের মতো একটা নৈঃশব্দ্য, আর তার ভেতর দিয়ে খুব ক্ষীণ একটা টিপটিপ-টিপটিপ শব্দ। সেটা তার নিজেরই শিরায় রক্তসঞ্চালনের শব্দ নাকি কোনো রহস্যময় বেতার স্পন্দন, পরীক্ষা করার আর সুযোগ পেল না হেমন্ত। পরদিন সকালে সরোজা গঙ্গাস্নান থেকে ফিরে ভিজে কাপড়ে সোজা দক্ষিণের ঘরে ঢুকে স্ফটিকটি নিয়ে বাড়ির পেছনে শিয়ালকাঁটায় ভরা গর্তের ভেতর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এলেন।
‘এ কী কাণ্ড!’ হেমন্ত হাঁ হাঁ করে উঠল। ‘স্ফটিকটা ফেলে দিলে? কেন?’
সরোজা কোনো উত্তর দিলেন না, কোনো কথাই বললেন না। চোখে বিহ্বল দৃষ্টি, তাতে আতঙ্কের ছিটে।
সন্ধ্যার পর জানা গেল, স্নানে গিয়ে সরোজা ডুব দিয়ে রাধানগরে সেই দাইবুড়ির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। ইতিমধ্যে দাইবুড়ির শ্রবণশক্তি ক্ষীণ হয়েছে, বার বার একই প্রশ্ন করে কথায় কথায় জানতে পারেন মনুখুড়ো সেই কবেই মারা গিয়েছেন। সরোজাদের শরিকী বাড়ির ধ্বংসস্তূপে বাস করতেন যে দূর সম্পর্কের বুড়ি পিসিমা, ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে কাঁথা সেলাই করে জীবন নির্বাহ করতেন, তিনিও মারা গিয়েছেন। একশো বছর আগে যে ম্যালেরিয়া এসে রাধানগর উজাড় করেছিল, তার ধিকিধিকি রেশ নিয়েছে শেষ ভিটে-আঁকড়ে-থাকা মানুষগুলোকেও। সরোজা র বুড়িপিসিমার কাঁথা নেবার লোক আর পড়ে নেই। দাইবুড়ির জড়িবুটি নেবার লোকও নেই। আর প্রসব তো সেই কোনকালেই শেষ হয়েছে।
এককালে রাধানগর ছিল সমৃদ্ধ নগরী, বংশপরম্পরায় সরোজার পরিবারের পুরুষেরা ছিলেন স্থানীয় রাজার পুরোহিত। দুশো বছরেরও বেশি আগে যখন বর্গি হানা শুরু হয়, রাধানগরের রাজার পাইক বরকন্দাজরা তাদের রুখে দিয়েছিল। সেই কারণে নানান পেশার মানুষ রাধানগরে এসে বাস করতে শুরু করে। কিন্তু দাক্ষিণাত্যের দুর্দম ঘোড়সওয়ারেরা যা পারেনি, তাই করে দেখালো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবেরা। এক বন্যার পর ভাগীরথী খাত বদল করল, রাধানগরের তিন দিকে ছেয়ে এল ছাড়িগঙ্গার বদ্ধ জলা। তার কিছুকালের মধ্যেই রেলপথ তৈরি হয়ে চারপাশের কৃষিজমির প্রাকৃতিক নাব্যতা ধ্বংস হলো, ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশায় ঘরকে-ঘর উজাড় হতে লাগল। বড়ো বড়ো প্রাসাদোপম বাড়িগুলো নির্জন পোড়ো হয়ে ঐতিহাসিক সাতগাঁর ধ্বংসস্তূপের আদল পেল। সেই কারণে বিয়ে হয়ে আদিরামবাটিতে আসার পর সরোজার মনে হয়েছিল বুঝি কোনো আধোচেনা স্বপ্নের শহরে এসেছেন। যখন শিউলি পেটে এল, ততদিনে পরিবারে নিকটাত্মীয় কেউ আর বেঁচে নেই।
মনুখুড়োর প্রেতাত্মা আসার এগারো দিন পরে সরোজা স্নানের ঘাট থেকে বাড়ি ফিরে কাপড় না বদলে সোজা চেম্বারে গিয়ে ঢুকলেন। রামপ্রাণ রোগী দেখছিলেন, বারান্দায় অপেক্ষমাণ লোকজন। স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। এত বছরে সরোজা শেষ কবে ফার্মেসিবাড়িতে পা রেখেছেন মনে পড়ে না, আর এইভাবে আসার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে রামপ্রাণ চেম্বারে রোগীটিকে বাইরে যেতে বলে জিজ্ঞেস করলেন—
‘কী হলো? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?’
‘এখনও হয়নি, হবে!’ সরোজা বললেন। ‘কিন্তু তার আগে তোমায় একটা কাজ করতে হবে গো। রথীনকে আজ এক্ষুণি চিঠি লেখ, ও যেন আমার মেয়েকে কলকাতায় এনে বড়ো ডাক্তার দেখায়।’
স্ত্রীকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় আগে কখনো দেখেননি রামপ্রাণ। চোখের দৃষ্টি লালচে ঝাপসা, দাঁতে কামড়ে ধরা নীচের ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে, ভিজে চুল থেকে জল চিবুক বেয়ে নামছে। তাতে চোখের জল মিশছে কি না বোঝার উপায় নেই।
‘তুমি ঘরে যাও, আমি আসছি,’ বলে রামপ্রাণ রোগী দেখা ফেলে ফার্মেসি থেকে দুটি সাইলেসিয়া ১০০-এর পুরিয়া বানিয়ে নিয়ে ভেতর বাড়িতে গিয়ে দেখেন সরোজা ভিজে শাড়িতে রোয়াকে দু পা ছড়িয়ে বসে নিষ্পলক চেয়ে আছেন কুয়োর ওপর কপিকলের দিকে। রামপ্রাণ চিঠি লেখার আশ্বাস দিতে শাড়ি বদলাতে গেলেন। কিন্তু সেদিন বিকেলের ডাকে পাঠানো সেই চিঠি মালদায় রথীনের হাতে আর পৌঁছল না। তার কারণ সেদিন রাতের ট্রেনেই সে শিউলি আর বাপ্পাকে নিয়ে কলকাতায় রওনা দিয়েছে।
.
ইতিমধ্যে শিউলিরা মালদায় গিয়ে থাকতে শুরু করেছে, মালদা টাউন স্কুলে ভর্তি হয়েছে বাপ্পা। অফিস বাংলো মেরামত হচ্ছে বলে কিছুদিন সরকারি ভাড়া নেওয়া একটি বাসায় ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়। বিশাল বাগানঘেরা আদ্যিকেলে বাড়িটা কোনো কালে নীলকর সাহেবের বাংলো ছিল। দোতলায় বৃদ্ধ অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মালিক ততোধিক বুদ্ধ একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর নিয়ে সম্পূর্ণ একা থাকেন। রাতে কুকুরটি গলায় শিকল বাঁধা অবস্থায় দোতলায় ছাড়া থাকে। সারারাত সে শেকল টেনে টেনে ফাঁকা ঘরগুলোয় ঘুরে বেড়ায়, মেঝের ওপর শেকলের ঘষটানির শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দের সঙ্গে বাথরুমের থেকে শিউলির চাপা ওয়াক তোলার শব্দ মেশে। বাপ্পার ঘুম ভেঙে যায়, আর ঘুম আসে না। টের পায় মা জেগে আছে। অন্ধকারে মায়ের চোখদুটো খোলা, মাঝে মাঝে লম্বা শ্বাস নিচ্ছে।
এই বাড়ির বাথরুমটা বিশাল, তার এক পাশে পোর্সেলিনের বড়ো বাথটাব। শিউলির পেটের ভেতর প্রদাহ যখন বেড়ে ওঠে, মাঝে মাঝে বাথটাবে জল ভর্তি করে সারা দুপুর সেখানে আধশোয়া হয়ে থাকে সে। রামপ্রাণের পাঠানো ওষুধেও জ্বালা প্রশমন হয় না, জেলা হাসপাতালের সরকারি ডাক্তার দেখানো হয়। এরই মধ্যে একদিন বমির সঙ্গে তাজা রক্ত উঠে এল। পরদিনই রথীন বিকেলের ট্রেনে শিউলি আর বাপ্পাকে নিয়ে কলকাতায় চলে এল।
*
এক অস্থির বিহ্বলতার ভেতর দিন কাটে বাপ্পার। ঠিক কী যে ঘটছে সে বুঝতে পারে না, পুরো ছবিটা দেখতে পায় না। চিনিকাকাকে কেন্দ্র করে সেই চাপা ঝগড়ার পর আর কোনোদিন বাবা-মায়ের মধ্যে কোনোরকম মনান্তরের আভাস পায়নি। কিন্তু কোনো কারণে বাবা যে খুব চিন্তিত, এবং অফিসের কারণে ঠিক নয়, সেটা আন্দাজ করতে পারছিল। রথীনের সিগারেট খাওয়া অত্যধিক বেড়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে শিউলির নানা রকমের পরীক্ষা হচ্ছে, একদিন নার্সিং হোমেও রাত কাটাতে হলো। বাপ্পাকে ওদের দমদমের বাসায় নিয়ে গিয়ে রাখল খোকাজেঠু আর মোমবুচান।
পরদিন কলুটোলা লেনে ফিরে বাপ্পা দেখে বেরিয়াম এক্স-রে প্লেটে মায়ের পৌষ্টিক তন্ত্রের ছবি। মনে পড়ল হেমন্তমামার ডার্করুমে দড়িতে টাঙানো মুখের নেগেটিভগুলো। গভীর বলিরেখার ছায়াগুলো নেগেটিভে যেমন আলো হয়ে ফুটে উঠে থাকে, ঠিক তেমনই এক্স-রে প্লেটে রুপোলি আলো হয়ে ফুটেছে খাদ্যনালির ভেতর দিয়ে বেরিয়ামের পথ। নতুন ইস্কুলে জীবনবিজ্ঞানের বইতে ব্যাঙের পৌষ্টিক তন্ত্রের ছবি আছে। মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্রের সঙ্গে তার খুব একটা তফাৎ আছে কি? ব্যাঙ তো উভচর প্রাণী, দীর্ঘ দুপুর বাথটবের ভেতর দেহ ডুবিয়ে থাকতে থাকতে মাও কি উভচর প্রাণী হয়ে উঠতে পারে? বাপ্পা ভাবার চেষ্টা করে। বেরিয়াম এক্স-রে প্লেটে যাত্রাপথের ছবিটা ভূগোল বইয়ে আঁকা নদীর মানচিত্রও হতে পারত। একদিন বাবার সঙ্গে ট্রামে চেপে কলেজ স্ট্রিটে নতুন ইস্কুলের বই কিনতে গিয়ে দোকানের দেয়ালে মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্রের ছবি দেখল সে। সরকারি ইস্কুলের দেওয়া তালিকা মিলিয়ে দু-তিনটি দোকানে ঘুরে ঘুরে বই কেনার পর রথীন ওকে নিয়ে গেল ইন্ডিয়ান কফি হাউসে। বিশাল প্রেক্ষাগৃহের মতো ঘর, অসংখ্য ছোটো ছোটো টেবিল ঘিরে বসে বিভিন্ন বয়সের পুরুষ, সকলেই পুরুষ। তারা একযোগে কথা বলছে, ধূমপান করছে। অতগুলো মানুষের কন্ঠস্বরে ঘরটা ভোঁ ভোঁ করছে ভীমরুলের চাকের মতো, উঁচু সিলিঙে জমছে নীলচে ধোঁয়ার মেঘ। মাথায় টুপি সাদা উর্দি আঁটা ওয়েটার এসে কফি দিয়ে গেল– বাপ্পার জন্য ফেনায়িত ঠান্ডা কফি আর রথীনের জন্য কালো ইনফিউশান।
পিতাপুত্র, দুই পুরুষ, অনেক পুরুষের মাঝে বসে কফি খায়। রথীন সিগারেট ধরায়। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ, কফির গন্ধের ভেতর থেকে বাপ্পা বাবার সেই চিরচেনা ওল্ড স্পাইস আফটার শেভ লোশনের গন্ধটাও খুঁজে পায়। মনে হয় যেন ওরা দুজনে ওল্ড স্পাইসের বোতলে আঁকা পালতোলা জাহাজে চেপে পাড়ি দিয়েছে। অচেনা বিক্ষুব্ধ সমুদ্র, তার ওপরে কেবল ওরা দুজন। আর কেউ কোথাও নেই। চারদিকে কেবল জল, নিঃসীম কালো জল। অচেনা দেশের হাতছানি।
কিছুক্ষণ আগেই রথীন ছেলেকে কলেজ স্ট্রিটের আশেপাশে রাস্তাগুলো আর বিখ্যাত বাড়িগুলো চিনিয়েছে। প্রেসিডেন্সি কলেজ গৌহাটি থেকে আসার পর যেখানে সে পড়তে পারেনি, কিন্তু বড়ো হয়ে বাপ্পা নিশ্চয়ই পড়বে। তার পাশেই হেয়ার স্কুল, উলটোদিকে হিন্দু স্কুল। সেখানে বাপ্পাকে ভর্তি করার প্রস্তুতি চলছে।
কলকাতায় আর দিন কয়েকের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে আসবে রথীন, উদ্বাস্ত পুনর্বাসন বিভাগে অফিসার-অন-স্পেশাল-ডিউটি পদে।
দেশভাগের পরে-পরেই তৈরি হয়েছিল এই বিশেষ বিভাগটি। তারপর কেটে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশি সময়। কিন্তু সেই বিভাগের কাজ এখনও শেষ হয়নি। কারণ এই রাজ্যে দেশভাগ কোনো ঘটনা নয়, মি’লেডি, একটি জায়মান পরিস্থিতি।
সীমান্ত লাগোয়া বিভিন্ন জেলায় প্রশাসনের নানান স্তরে কাজ করার সুবাদে রথীনের থেকে অভিজ্ঞ অফিসার খুব কমই আছে। ফলে শিউলির রোগ ধরা পড়ার পর চিকিৎসা চলাকালীন কলকাতায় বদলির জন্য আবেদন করলে সেটা মঞ্জুর হতে সময় লাগেনি।
কফি হাউসে জানলার দিকে একটি টেবিলে বসেছে ওরা। রাস্তার ওধারে সংস্কৃত কলেজ, নীচে ফুটপাত ধরে সারি সারি নতুন পুরোনো বইয়ের দোকান পার হলে বাঁদিকে গোলদিঘি, ডান দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু বাড়িটা।
‘এখান থেকে আমাদের বাসা কিন্তু খুব বেশি দূর নয়।’ কফির কাপে চুমুক দিয়ে রথীন বলে। ‘মনে কর তুই যদি হারিয়ে যাস, এখান থেকে বাড়ি চিনে ফিরে যেতে পারবি?’
বাপ্পা ঘাড় নাড়ে। ‘হ্যাঁ। এগারো নম্বর ট্রামে উঠে পড়ব, যে ট্রামগুলোর গায়ে শ্যামবাজার লেখা।’
‘আর যদি ট্রামে চড়ার পয়সা না থাকে? পায়ে হেঁটে রাস্তা চিনে যেতে পারবি না?’
বাপ্পা পথের মানচিত্রটা কল্পনা করার চেষ্টা করে।
‘কীভাবে কোন পথ দিয়ে বাড়ি যাবি সেটা আমায় বল দেখি?’
‘এখান থেকে নেমে কলেজ স্ট্রিট ধরে ওই দিকে যাব…’ বাপ্পা হাত তুলে দেখায়।
‘এইদিক ওইদিক বললে হবে না, স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বল,’ রথীন বলে। ‘মনে কর আমি এই শহরের পথঘাট কিছু চিনি না, আমাকে বোঝাচ্ছিস।’
‘ওই তো, প্রেসিডেন্সি কলেজটার পাশ দিয়ে …— ‘— ‘প্রেসিডেন্সি কলেজটা তোর কোন দিকে থাকবে?’
‘ডান দিকে, বাপ্পা ইতস্তত করে। ‘ না না, বাঁদিকে…’
‘তারপর?’
‘তারপর হ্যারিসন রোডে পৌঁছে ডান দিকে, যেদিকে শিয়ালদার ট্রামগুলো যায়…’
এইভাবে ক্রমশ পথের নাম, পথের দুপাশে বাড়িগুলোর নাম, দোকানের নাম, খুব ছোটোবেলায় ভোরবেলা মায়ের সঙ্গে ট্রামে চেপে শাকম্ভরী দেবীর অন্তর্জলী যাত্রায় যাবার সময় যে বন্ধ দোকানের ওপর সাইনবোর্ডে আঁকা ছবিগুলো দেখে মনে রাখত বাপ্পা, এখন যে লেখাগুলো সে পড়তে পারে–মহেন্দ্ৰ দত্ত অ্যান্ড কোং, দিলখুশা কেবিন, স্বাধীন ভারত স্টেশনার্স, ইম্পিরিয়াল ওয়াচ কোম্পানি, সীতারাম মঞ্জিল, স্ট্যান্ডার্ড বোর্ডিং হাউস… একের পর এক দোকানের নাম, বাড়ির নাম, রাস্তার নাম, গলির নাম আওড়াতে আওড়াতে এক বিচিত্র খেলায় মেতে ওঠে পিতাপুত্র।
মি’লেডি, অনেক কাল পরে স্মার্ট ফোন আর গুগল ম্যাপের যুগে বাপ্পাদিত্যর বিশেষ ভাবে মনে পড়বে সেই দিনটার কথা। জানলার বাইরে বিকেলের রোদ সংস্কৃত কলেজের সাদা চুনকাম করা বাড়িটা থেকে পিছলে কফিহাউসের ভেতরে একটা অদ্ভুত প্রভা এসে পড়েছে। রথীনের মাথার পেছনে সেই প্রভা, চশমাটা চিকচিক করছে, চোখদুটো দেখা যায় না। ভীমরুলের গুঞ্জনের মতো সমবেত কন্ঠস্বরের ধ্বনিটা কান-সওয়া হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। টেবিলের উলটোদিকে বসে রথীন অনুচ্চ স্বরে কথা বললেও প্রত্যেকটি শ্বাসঘাত স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে বাপ্পা। গুঞ্জনটা এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতার পর্দা সৃষ্টি করেছে যেন। এক বিচিত্র গোপনীয়তা, যা দুজনে নির্জন ঘরে বসে কখনোই সম্ভব নয়। চারিপাশে টেবিলে অসংখ্য অচেনা পুরুষের মাঝে ওরা দুজন, শুধু ওরা দুজন, বাবা আর ছেলে।
‘আমি যখন গৌহাটি থেকে প্রথম এলাম, তোর এখন যা বয়স তার থেকে কত আর, বছর দশেকের বড়ো ছিলাম। একা একা এই শহরের পথঘাট চিনতে শিখেছিলাম। ধরা যাক এমন তো হতেই পারে, তোকেও একা একা এই শহরে থাকতে হলো। পারবি না?’
বাপ্পা ঘাড় নাড়ে, রথীনের কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কথা বুঝতে চেষ্টা করে। রবিবারের আড্ডায় শোনা বাবার সেই প্রথম কলকাতায় আসার দিনগুলো সম্পর্কে কাকু পিসিদের টুকরো মন্তব্য থেকে একটা ছবি তৈরি করতে চেষ্টা করে: একাকী পুরুষ ও মহানগর।
‘কিন্তু আমি একা কেন থাকব বাবা? তোমরা তো থাকবে?’ বাপ্পা বলে।
‘ধর এমন তো হতেই পারে আমি নেই? হতে পারে না?’
‘তাহলে মা তো থাকবে?’
‘এমনও তো হতেই পারে মা নেই।’
‘হতেই পারে?’ বাপ্পা ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। আচমকা মনে হয় ঘরে একফোটাও বাতাস নেই, চারপাশের গুঞ্জন জাদুবলে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
‘হ্যাঁ, হতে পারে। খুবই হতে পারে।’ রথীন থেমে থেমে বলে। বাপ্পা বাবার চোখ দেখতে পায় না, মাথার পেছনে জানলার আলোকিত ফ্রেমে বাবার সিল্যুয়েট। চশমার ভেতর দিয়ে আলোক রশ্মির প্রতিসরণ হচ্ছে। ‘মা আমাদের মধ্যে খুব বেশিদিন আর নাও থাকতে পারে। তোমাকে তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে উঠতে হবে।
সেদিন বাপ্পাকে— ‘তুমি’ করে সম্বোধন করল রথীন। সেদিনই বাপ্পা জানল মায়ের অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়েছে। চিকিৎসা কঠিন এবং কষ্টকর। এবং আরোগ্যের সম্ভাবনা কম। কফি হাউসের সেই কোল্ড কফির স্বাদে জড়িয়ে গেল এক হিম আতঙ্ক আর বিষাদ, যা রয়ে যাবে সারাটা জীবন।
