সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.১
৯.১
ফুটন্ত দুধের কড়ায় নীল শিশির তরল ঢেলে ঐশ্বরিক মিরাকল দেখালেন পাদরিবাবা, অন্তিমকালের প্রলয়ের ঘূর্ণিপাকে শ্বেতশুভ্র পুণ্যাত্মার মতো থকথকে যে বস্তু উঠে এল গোবর্ধন সেটি ফেলে দেয়নি। ছোটো ছোটো গোলা পাকিয়ে এলাচ মেশানো ঘন মিষ্টি দুধে ঢিমে ঘুঁটের আঁচে ফুটিয়ে বটপাতার দোনায় পরিবেশন করেছে তার দোকানের খদ্দেরদের।
‘হ্যালেলুইয়া, গোবর্ধন!’ গোলায় কামড় দিয়ে বলে উঠেছে হান্স অ্যান্টনি।
‘হ্যালেলুইয়া! হ্যালেলুইয়া! ব্রাভো! ব্রাভো!’ সমস্বরে বলেছে ফিরিঙ্গি আফিমখোরেরা।
এ এক অনাস্বাদিতপূর্ব সুখাদ্য, যা নেশাতুর চোয়াল নাড়িয়ে চিবানো যায়। সিদ্ধিবাটা মেশানো ক্ষীরের নাড়ুর মতো চিটচিট করে না, দাঁতে জড়ায় না। পেটে গিয়েও ভার সৃষ্টি করে না। সাহেবদের কাছে সাবাশি পেয়ে গোবর্ধন বস্তুটিকে আরও উত্তমভাবে প্রস্তুত করতে চেষ্টা করে।
পাদরিবাবা যে নীল শিশির তরল দিয়ে গিয়েছিলেন সেটি ওয়াইন ভিনিগার। ফুটন্ত দুধে কয়েক ফোঁটা ফেললে চোখের পলকে দুধ ছিন্ন হয় ঠিকই, কিন্তু সেই ছিন্ন দুধের গোলায় একটা গুমসানো গন্ধ থেকে যায়। গোবর্ধন ভিনিগারের বদলে গোঁড়া লেবুর রস ব্যবহার করতে লাগল। তার কার্যকারিতা একই, উপরন্তু হালকা তাজা লেবুর সুগন্ধ মেশে। কোনো কোনো নেশাড়ুর অবশ্য তাতে আৰুলি বিঘ্নিত হয়। ক্রমশ তার থেকেও উন্নত, কোনোরকম গন্ধবিহীন গোলা গোবর্ধন তৈরি করতে লাগল ছিন্ন দুধের অবশিষ্ট জল ব্যবহার করে।
আবিষ্কারের নেশায় পেয়ে বসল গোবর্ধনকে। বালুসাইয়ের মধ্যে তালক্ষীর ভরে এক নতুন মিঠাই উদ্ভাবন করেছিলেন তার এক মামা, কটকে বিখ্যাত হয়েছে এই নতুন মিঠাই তালুসাই। কিন্তু এ যেন আরও ঢের অভিনব। শুধুমাত্র দুধকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে এমন সুস্বাদু ও অভিনব খাদ্য সৃষ্টি করা যায় কেই-বা জানত?
দুধ, আর চিনি। এতকাল ধরে যে চিনি ময়রারা ব্যবহার করে এসেছে, আখের রস জ্বাল দিয়ে শ্যাওলার মধ্যে দিয়ে তাকে পরিশ্রুত করায় সেই চিনিতে নানারকম জৈব পদার্থ মিশে থাকে, তার রঙও হয় লাল। কিছুকাল হলো দুফে নামে এক ফরাসি সাহেব হুগলি খালের ধারে নতুন চিনির কল বানিয়েছে। সেখানে লোফের আকারে ধবধবে সাদা চিনি তৈরি হয়। সেই চিনি ফুটন্ত জলে ফেললে যে রস তৈরি হয়ে ওঠে সেটি আশ্চর্য স্বছ, প্রায় কাকচক্ষুর মতো।
একদিন— ‘জয় জগন্নাথ! জয় ধম্মোঠাকুর!’ বলে সেই ফুটন্ত রসে ছিন্ন দুধের গোলা পাকিয়ে ফেলে দিল গোবর্ধন।
এবং, মি’লেডি, বাকিটা ইতিহাস। গোলাগুলি তো খুলে এলই না— যা গোবর্ধন আশঙ্কা করেছিল— উলটে বরং আরও সুগোল আর শোলার মতো নরম ও স্থিতিস্থাপক হয়ে এল। সত্যিই যেন এক ঐশ্বরিক মির্যাকল ঘটে গেল, সৃষ্টি হলো নতুন মিঠাই – রসগোলা!
গোবর্ধন ময়রার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল মৎস্যভূমি ছাড়িয়ে দূরদূরান্তরে, ভক্ত নেশাড়ু দিশি ফিরিঙ্গি নির্বিশেষে ধর্মতলায় আসতে লাগল এই দেবভোগ্য উদ্ভাবনের আস্বাদ নিতে।
যথারীতি সুখ্যাতিকে অনুসরণ করে এল কুখ্যাতিও। রাখালদাস ন্যায়চূড়ামণি গত হবার পর সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজের মাথা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন ঘনশ্যাম ন্যায়চঞ্চু; চন্ডীমন্ডপে তাঁর হেঁতালের লাঠিটি ঠুকে তিনি ঘোষণা করলেন-
‘এই রসগোলা শুধু যে অস্পৃশ্য স্থানে ম্লেচ্ছদের পৌরোহিত্যে বানানো হচ্ছে তাই তো নয়, গোমাতা ভগবতীর অম্লান সৃষ্টি যে দুগ্ধ, তাকে অম্লের দ্বারা ছিন্ন করা ঘোর অশাস্ত্রীয় কাজ। সাতগাঁর কোনো মন্দিরে কখনো যেন দেবতার ভোগে মিষ্টান্ন হিসেবে নিবেদন না হয় এই রসগোলা!’
সমাজে কুলপতির পদে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আদিরামবাটির রামানুজ বলে উঠল— ‘আপনি বোধহয় পুরোটা অবগত নন, ন্যায়চঞ্চুমশাই! এই রসগোলায় ব্যবহার হয় যে চিনি, তা কিন্তু কাশীর চিনি নয়। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি। ফিরিঙ্গি সাহেবের কলের চিনি পশুর হাড়ের পোড়া ছাই দিয়ে পরিশ্রুত করা হয়।’
চণ্ডীমন্ডপে শ্রোতাদের মাঝে ছিছিক্কার উঠল, ঘৃণায় শিহরিত হলেন কেউ কেউ।
‘হ্যাঁ!’ রামানুজ বলল। ‘তাই শুধু দেবস্থানেই নয়, এই ঘৃণ্য বস্তুটি জিভে ছোঁয়ানোও পাপ!’
সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজে নিষিদ্ধ খাদ্যবস্তুর তালিকায় উঠল রসগোলা। কিন্তু তাতে করে কি আর তরুণ রসনাকে বেঁধে রাখা যায়? গোপনে ধর্মতলার গোবর্ধন ময়রার পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠল ব্রাহ্মণপাড়ার উঠতি ছেলেছোকরারা, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য রামানুজের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পাগলরাম।
ধবধবে সাদা মাকরানার মার্বেলগুলির মতো হালকা ও সহজপাচ্য রসগোলার চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। প্রতিদিন ছাড়িগঙ্গার ধারের গ্রাম থেকে নৌকায় ঘড়া ঘড়া দুধ আসে, পাহাড়প্রমাণ জ্বালানি কাঠ আসে হুগলির উজানে বন থেকে।
একদিন সেই জ্বালানি কাঠের নৌকায় চেপে গোবর্ধন ময়রার রসগোলা খ্যাতির টানে চলে এল বছর তের-চোদ্দর একটি ফুটফুটে ছেলে। তার নাম ননীগোপাল ঘোষ, ত্রিবেণীর উত্তরে গুপ্তিপাড়া গ্রামে বাড়ি। ননী রসগোলা খেতে চায়, এদিকে ট্যাকে ফুটো পয়সাও নেই।
‘আমি তো আর দানছত্তর খুলে বসিনি, ঘোষের পো!’ গোবর্ধন বলে। ‘দুধ কাঠ চিনি সবই নগদ টাকা ফেলে কিনতে হয়। ফ্যালো কড়ি মাখো তেল!’
শেষকালে ছটি রসগোলার বিনিময়ে এক পাঁজা কাঠ চ্যালা করে দিল ননী। জানা গেল, গোবর্ধনের মতোই সেও হালুইকরের ঘরের ছেলে, বাড়ি থেকে পালিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে বেরিয়েছে। তিন বেলার খোরাকি আর সামান্য হাতখরচা দিয়ে ছেলেটাকে দোকানে রেখে দিল গোবর্ধন।
শুধু কাঠ চ্যালা করতেই নয়, চুলো ধরাতে, এমনি ভিয়েনের কাজও একটু-আধটু জানে ননী। এখন বটতলার দোকানে গেলেই দেখা যায়, মস্ত চ্যাটালো কড়ায় ডাবু হাতা ঘুরিয়ে নিবিষ্ট মনে দুধ জ্বাল দিচ্ছে গোবর্ধন, ননী বাঁশের হাপরে ফুঁ দিয়ে উনুনে ঢিমে আঁচে মৃদু হাওয়া দিচ্ছে। কড়ার মাঝে ঘন হয়ে আসা দুধ বগবগ করে চৈতন্যধারার মতো, সরু বাখারির কাঠি দিয়ে পরতের পর পরত সর তুলে কড়ার গায়ে লেপে দিতে থাকে গোবর্ধন, তালপাতার পাখা দিয়ে দুধের ওপর বাতাস করে ননী।
শুধু রসগোলাই তো নয়, গোবর্ধন ময়রার দোকানে ভাঙের গুলি শরবতেরও কদর আছে। দুপুর গড়ালে ফিরিঙ্গিডাঙার সাহেবরা আসতে শুরু করে নৌকায় পালকিতে। তাদের নেশার দ্রব্য প্রস্তুত করে গোবর্ধন, ননী মাটির লম্বা ভাঁড়ে ঢেলে নিয়ে গিয়ে পরিবেশন করে। গোবর্ধন যখন নিবিষ্ট মনে দুধ জ্বাল দেয় কিংবা ছানা চটকে গোল্লা পাকায়, তখন আনমনে গুনগুন করে সুর ভাঁজে। ননী সেই সুর তুলে নিয়ে তাতে এলোমেলো পাঁচালির লাইন বসিয়ে গেয়ে ওঠে। খদ্দেররা কেউ ওকে গালি দিলে সে সুর করে টিটকিরি দেয়, কখনো— ‘হ্যাট-ক্যাট-ম্যাট’ ফিরিঙ্গি বুলিও গুঁজে দেয় দুচারটে।
বাবার হাতে চ্যালা কাঠের পিটুনি খেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার পর মায়ের জন্য, ছোটো ভাইবোনেদের জন্য মন উচাটন হয়েছিল ননীর। কিন্তু গোবর্ধনের দোকানে এসে সে মজে গিয়েছে, যাব যাব করেও আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেনি। প্রতিদিন কত ধরনের মানুষ যে এই বটতলায় আসে। ধর্মঠাকুরের থানে হত্যে দিতে আসা গরীবগুর্বো আতুর থেকে শুরু করে সন্ন্যাসী ফকির আর গোবর্ধনের দোকানের দাওয়ায় ফিরিঙ্গি আর বাবুদের দল, কত বিচিত্র তাদের চেহারা বেশভূষা বুলি, আউলে বাতুলদের গলায় কতরকমের গান এক নতুন অচেনা বৈচিত্র্যময় পৃথিবী, যার সম্পর্কে কোনো ধারণা গুপ্তিপাড়ার অজগ্রামে জীবনের চোদ্দটা বছর ননীর ছিল না।
‘এ আর কী দেখছিস!’ গোবর্ধন বলে। ‘দাড়া, জ্যৈষ্ঠ পুন্নিমেটা আসতে দে, তখন দেখবি!’
একদিন কোয়ার্সভিলে গিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেল ননীর। নদীর পাড় ধরে চওড়া শানবাঁধানো পথ, আম কাঠালের বাগানে ঘেরা সারি সারি ভিলা, তাদের দুধসাদা দেয়ালে পঙ্খের কাজ, লাল টালির চাল, গা বেয়ে অচেনা ফুলের গাছ লতিয়েছে, বিশাল গির্জা, ঘড়িঘর, ট্যাভার্ন, হুগলি নদীতে কতরকমের জাহাজ আর জলে মুখ থুবড়ে পড়া কেল্লার ধ্বংসাবশেষ।
দোকানে ফিরে গোল গোল চোখ করে সে গোবর্ধনকাকাকে কী দেখেছে বলছে, খাটিয়ায় আধশোয়া অ্যান্টনি সাহেব কাঠের চিরুনি দিয়ে তার দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল-
‘কোয়ার্সভিল দেখেই এই? কলকাতায় গেলে তোর চোখ খুলে চড়ক গাছের মাথায় উঠে পড়বে রে ছোড়া!’
ননী জানতে পারে, ভাটির দিকে কোয়ার্সভিলের থেকেও ঢের বড়ো আর আশ্চর্য শহর কলকাতা। সেখানে প্রহরে প্রহরে কেল্লায় তোপ দাগা হয়।
‘কেন? তোপ দাগা হয় কেন?’
‘যাতে ঘোড়া মানুষ সবাই সারাক্ষণ ছোটে, যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে!’ অ্যান্টনি বলে।
‘ঘুমিয়ে পড়লে কী হবে?’
‘একবার ঘুমিয়ে পড়লে জেগে ওঠার পর শহরটা এত বদলে যাবে যে আর কিছু চিনতেই পারবে না!’
গোবর্ধনের আশ্রয়ে ননীর দুবেলা ভাতের অভাব নেই, ভাতের পাতে সরবাটা ঘি আছে, পুজোপার্বণে ধর্মঠাকুরের থানে প্রসাদী ফলমূল অন্নসত্র আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, যে জিনিসটার কাঙাল হয়ে সে ঘর ছেড়েছে, গোবর্ধনের দিক থেকে ওর প্রতি স্নেহ আছে। হয়তো একটু বেশিই আছে। ননীর মধ্যে নাকি নিজের ছেড়ে আসা— ‘আমি’-টাকে দেখতে পায় গোবর্ধন। আর কী পায় কে জানে? রাত্রিবেলা ধোঁয়ায় মলিন অপরিসর দোকানে হাঁড়িকুড়ির একপাশে চাটাই কাথার বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে তার বহিঃপ্রকাশ আধোঘুমের ভেতরে টের পায় ননী। গোবর্ধন ওকে আদর করে, সর্বাঙ্গে চুমু খায়, কখনো শঙ্খলাগা সাপের মতো ওকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে ধরে, কখনো কখনো ওর নিজের রোমহীন স্তন ননীর মুখে গুঁজে দিয়ে ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে ঝিমধরা গলায় ওর নিজের দেশের ঘুমপাড়ানি গান গায়, কখনো এই ধর্মতলায় বটের গহীনে দেখা একদল ন্যাড়ামাথা নীল জোব্বা- পরা নারীপুরুষের অবাধ দেহমিলনের আচারের বর্ণনা দিতে দিতে ননীর কৈশোরের অগ্রচ্ছদা টেনে সরিয়ে ওর কোমল পৌরুষকে জাগাতে চায়, নিজের দুই উরুর কবোষ্ণ আর্দ্রতার ভেতরে তাকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। বটের দেশে দুঃস্বপ্নে জেগে- ওঠা একাকী গাঙশালিখের ডাক আর উনুনে নিভন্ত আঁচে বিকীরিত রক্তলাল আলোর বিবমিষার ভেতর রোজ রাতে ননী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, আর নয়, এবার এখান থেকেও পালাবে সে। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই দোকানের চারপাশে এত কিছু অভূতপূর্ব ব্যাপার ঘটতে থাকে যে সেই প্রতিজ্ঞার কথা আর তার মনে থাকে না।
বৈশাখ মাস শেষ হতে চলল, জ্যৈষ্ঠের গাজন পূর্ণিমা আর খুব বেশি দেরি নেই। এক বিকেলে অ্যান্টনি সাহেব কলকাতা থেকে নিয়ে এল এক বিচিত্র বস্তু। খড় আর গোলপাতায় জড়ানো সেই ভারি বস্তুটা নৌকার খোল থেকে তুলে দুজন মাঝি ধরাধরি করে এনে ফেলল গোবর্ধনের দোকানের দাওয়ায়। মোড়ক খুলতে বেরিয়ে এল এক বিশাল চৌকোনা নীলাভ স্ফটিক যার গা থেকে আলো ঠিকরোচ্ছে, হিমশীতল বাষ্প নির্গত হচ্ছে।
‘এ যে বরফ!’ গোবর্ধনের মুখ হাঁ হয়ে যায় চুলোর মতো। ‘এত বড়ো?’
হান্স অ্যান্টনি কিছু বলে না, হাসে। ওর মুখের অভিব্যক্তি উপভোগ করে।
চোখের পলকে ভিড় জমে যায় অতিকায় বরফের স্ফটিকটি ঘিরে।
‘কতদিন ধরে শিলাবৃষ্টির শিল জমিয়ে জমিয়ে তৈরি হয়েছে গো?’ গোবর্ধন জিজ্ঞেস করে।
‘এ নির্ঘাৎ হিমালয় পাহাড়ের মাথা থেকে খসে পড়েছে!’ এক পুণ্যার্থী বলে। ‘তারপর নদীতে ভাসিয়ে আনা হয়েছে এতদূর!’
‘মুখপোড়াদের কথা শোন!’ অ্যান্টনি সাহেব বলে। ‘এই বরফ জাহাজে কলকাতায় এসেছে সেই মার্কিন মুলুক থেকে।’
‘ফিরিঙ্গির ব্যাটা বলে কী গো!’ রসগোলার টানে আসা সাতগাঁর এক মাতবর টিপ্পনী কাটে। ‘মার্কিন মুলুকটা কি তবে ভেসে ভেসে সোনাগাজির মাগিহাটায় চলে এল?’
‘বটেই তো!’ গোবর্ধন বলে। ‘বরফ কি চিনেমাটি যে তাকে জাহাজে পুরে আনা যাবে? গলে যাবে যে!’
‘আজ সকাল থেকে কয় ছিলিম টেনেছ, ছায়েব?’ মাতবরটি বলে। তার স্যাঙাৎ যোগ করে–
‘সঙ্গে আর কী সরেস বস্তু পেঁদিয়েছ বল দি’নি? আমরাও এট্টু চেখে দেখি!’
‘ওরে ম্যাকমারা পাতকুয়ার ব্যাঙ!’ অ্যান্টনি এতক্ষণে গরগর করে ওঠে। ‘নিজের মুলো নিজের পোঙায় গুঁজে খুব যে দেখি পোঙিৎ হয়েচিস। এই বরফ আমেরিকা থেকে এয়েচে, এ যদি মিছে কথা হয় তো শ্যামা মায়ের দিব্যি কুঠ হয়ে আমার জিভ খসে যাক!’
তিনদিন পরে কলকাতা থেকে আসা এক ইংরেজের মারফৎ জানা গেল, হাস অ্যান্টনি মিথ্যে বলেনি।
মি’লেডি, ফ্রেডেরিক টিউডর নামে বস্টনের এক তরুণ ব্যবসায়ী নানান জিনিসের বিকিকিনির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এমন একটি জিনিসের ব্যবসার ফন্দি আঁটল যা তার বাসভূমির আশেপাশে অঢেল পরিমাণে ছড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, বরফ। ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র হিমযুগের প্রকোপ গোটা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়েছে, ম্যাসাচুসেটসের আশেপাশে বিশাল মিঠে জলের লেকগুলো জমে গিয়ে রূপান্তরিত হয়েছে বিশুদ্ধ নীলাভ বরফে। টিউডর আইস কোম্পানি নাম দিয়ে নতুন এক সংস্থা খুলল ফ্রেডেরিক, কাঠ চেরাই কলের লম্বা করাত আনিয়ে লেকের বরফ চৌকোনা করে কেটে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে আনালো বন্দরে।
‘এ এক উন্মাদ প্রকল্প!’ বস্টনের বিনিয়োগকারীরা একযোগে বলল।
‘ক্রিস্টোফার কলম্বাস নামে যে হিস্পানিটা ইন্ডিয়া যাবে বলে নতুন এই মুলুকে এসে পড়ল, তার থেকেও বড়ো উন্মাদ প্রকল্প কি?’ ফ্রেডেরিক জবাব দিল।
প্রথমবার যখন ১৮০ টন বরফ পাঠানো হল, বিষুব গ্রীষ্মের আতপ্ত মহাসাগর পেরিয়ে চারমাস বাদে যখন সেই জাহাজ এসে ভিড়ল কলকাতার বন্দরে, গলে যাবার পরেও যত পরিমাণ রয়ে গেল সে কিছু কম নয়। কলকাতায় খবরটা ছড়ালো প্লেগের চেয়েও দ্রুত। সাহেব-মেমের দল জাহাজঘাটায় ভিড় জমালো। সেই অত্যাশ্চর্য পণ্য চাক্ষুষ করেও সুখ, স্পর্শ করলে কিংবা জিভে ছোঁয়ালে তো কথাই নেই।
সেই বরফের একটা টুকরো নগদ মূল্যে কিনে এনেছিল অ্যান্টনি সাহেব, ধর্মতলার আফিমখোর সঙ্গীসাথীদের তাক লাগিয়ে দেবে বলে। গাজনের সময় ভক্তরা দেহে বাণ ফুঁড়ে, অঙ্গারের ওপর হেঁটে ভোজবাজি দেখায়। গ্রীষ্মের তপ্ত বিকেলে বড়ো একখণ্ড বরফ ভোজবাজি বই তো কী?
গোবর্ধনের কাছে খন্ডা চেয়ে নিয়ে খানিকটা ঝুরো বরফ চেঁছে অ্যান্টনি ননীর হাতে দিল। একই সঙ্গে বিস্ময় মুগ্ধতা আর আতঙ্কের অনির্বচনীয় হিমপোড়া অনুভূতিতে মুখে পুরে দিল সে।
‘কেমন লাগছে?’ সাহেব শুধোয়।
ননীর মুখে বাক্যি ফোটে না। চোখ বন্ধ করে জিভের ওপরে রেখে চুষতে চুষতে ননী টের পায় তিন-তিনটি মহাসাগর পেরিয়ে বয়ে আসা নোনা বাণিজ্যবায়ু, পাইনবনের সুগন্ধ, গোলার্ধ ব্যেপে হিমবাহের ধীর চলন।
স্ফটিকটি তুলে এনে দোকানের সামনে বাঁশের মাচায় রাখা হলো, যেন এক নতুন বিগ্রহ। এবং তার থেকে টুকরো ভেঙে নিয়ে গোবর্ধন ভাঙের শরবতে মিশিয়ে দিল।
প্রথম ভাঁড়টি সে সসম্ভ্রমে তুলে দিল অ্যান্টনি সাহেবের হাতে।
ঘন এলাচগন্ধী সবুজাভ তরলে চুমুক দিয়ে লালচে গোঁফজোড়া মেরজাইয়ের আস্তিনে মুছে সাহেব ঘোষণা করল— ‘এই সেই শীতল দোব্য যা আমার শ্যামা মায়ের সোয়ামি রোজ কৈলাসে বসে পান করে!’
