সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.৭
৫.৭
মি’লেডি, দাবানলের মতো মন্বন্তর জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে যখন, কোম্পানির আনকোরা নবীন অফিসারেরা— যাদের অধীনে একেকটি জেলার আয়তন ইংল্যান্ডের একটি কাউন্টির থেকেও বড়ো— সম্পূর্ণ দিশাহীন হয়ে কলকাতায় গভর্নরের অফিসে লম্বা লম্বা রিপোর্ট পাঠাতে লাগল এই মর্মে যে, সাধারণ মানুষ সঞ্চিত বীজধান, চাষের ক্ষেতে ইঁদুরের গর্তে সঞ্চিত ধান, এমনকি ইঁদুর হত্যা করিয়া খাইতে শুরু করিয়াছে, ইহার ফলে উদরঘটিত পীড়ায় মরিতেছে, এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের লেখা দীর্ঘ রিপোর্টগুলো নতুন ঘোড়ার ডাকব্যবস্থা মারফৎ নতুন সরকারি রাস্তা দিয়ে হেড কোয়ার্টারে গিয়ে পৌঁছচ্ছিল এই মর্মে আর্জি জানিয়ে যে, মহামান্য সরকার বাহাদুর সম্যক বিচার করিয়া উপযুক্ত আদেশনামা প্রেরণ করুন যে এমত পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা লওয়া হইবে, এবং সেই প্রতিবেদন সাতদিন পরে কলকাতায় পৌঁছোনোর পর মহামান্য সরকার বাহাদুর গভর্নমেন্ট হাউসে পারিষদ সহ বড়া খানা এবং ক্ল্যারেটের সহযোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিষয়টি বিবেচনা করে যখন জানতে চাইছেন পরিস্থিতিটিকে বিধিসম্মত মন্বন্তর বলা যাইবে কী না, কারণ লোকে বীজধান ও ইঁদুর প্রভৃতি প্রাণীর মাংস খাইলেও মানুষের অভক্ষ্য গাছের পাতা কিংবা পোকামাকড় খাইতে শুরু করিয়াছে কি না, এবং সেই পত্র আরও সাতদিন পর সন্ধ্যার ডাকে যখন সদর কাছারিতে এসে পৌঁছচ্ছে, এবং প্রত্যুত্তরে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যখন জানাচ্ছেন যে, না মহামান্য হুজুর, মানুষ এখনও অভক্ষ্য গাছের পাতা খাইতে শুরু করে নাই, তবে ইহাদের শাস্ত্রে নিষিদ্ধ পাঁচ আঙুল বিশিষ্ট নয় এমন প্রাণী এবং শম্বুক জাতীয় খোলস বিশিষ্ট জলজ প্রাণী যথেচ্ছ খাইতেছে, এবং আরও সাতদিন পর সেই বার্তা গভর্নর জেনারেলের কাছে পৌঁছলে তিনি যখন তাঁর কৌঁসুলিদের সঙ্গে কাউন্সিল রুমে বসে পাইপে তামাক ভরে ধোঁয়া সেবন করতে করতে বিচার করছেন যে শাস্ত্রে নিষিদ্ধ প্রাণী ভক্ষণ হলেই তাকে সরকারিভাবে মন্বন্তর বলা যায় কি না, এবং গভীর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মহামান্য ইন্দ্রলুপ্তে বিন্দু বিন্দু স্বেদ ফুটে উঠছে, এবং পাস্খাপুলারের দল আরও জোরে জোরে দড়ি টানছে, এবং এই মর্মে জেলায় জেলায় বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হচ্ছে যে অশাস্ত্রীয় প্রাণী ভক্ষণ হইলেও যতক্ষণ পুরবাসীগন তাহাদের সস্তান বিক্রয় করিয়া না দিতেছে ততক্ষণ এই বিপর্যয়কে বিধিসম্মত মন্বন্তর বলা যাইবে কি না, এবং সাতদিন পরে সেই বিজ্ঞপ্তির উত্তরে ম্যাজিস্ট্রেট জানাচ্ছে যে, না ইয়োর এক্সেলেন্সি, এখনও সন্তান বিক্রয় শুরু হয় নাই বটে তবে লোকে অভক্ষ্য বন্য লতাপাতা খাইতেছে, এবং সেব্যাপারে অবগত হয়ে মহামান্য গভর্নর বাহাদুর ভেনিসীয় ঝাড়বাতির আলোর নীচে বসে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করছেন যে, যদি না কুলনারীরা দেহ ব্যবসা করিতে শুরু করে তাহা হইলে ইহাকে প্রকৃতই মন্বন্তর বলা যাইবে কি না তাহা বিচারসাপেক্ষ, এবং এক পক্ষকাল পরে যখন বার্তা আসছে যে, না, নারীরা এখনও দেহব্যবসা শুরু করে নাই তবে সন্তানদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করিতেছে, তখন গভর্নর হৌস থেকে ডাক মারফৎ পত্রে জানতে চাওয়া হচ্ছে যে, মানুষ কি এখনও মৃত পশুর মাংস খাইতে শুরু করিয়াছে, তার জবাবী প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে যে না, তবে পুরনারীরা দেহ বিক্রয় শুরু করিয়াছে, এবং এই প্রতিবেদন কলকাতায় এসে পৌঁছতে সাত দিনের জায়গায় এগারো দিন লেগে যাচ্ছে, তার কারণ পথিমধ্যে ক্ষুধার জ্বালায় উন্মত্ত জনতা সরকারি ডাকের ঘোড়া অপহরণ করে তার মাংস ভক্ষণ করে ফেলছে, এবং তৎপর মহামান্য গভর্নর জেনারেল যখন বিশেষ দ্রুতগামী ডাক মারফৎ জানতে চাইছেন অভুক্ত পুরবাসীগণ মনুষ্য মাংস খাইতে শুরু করিয়াছে কি না, এবং এরূপ ঘটিতে থাকিলে এই পরিস্থিতিকে সরকারিভাবে মন্বন্তর ঘোষণা করিতে কোনো বাধা নাই, তার প্রত্যুত্তর নিয়ে হেড কোয়ার্টারে আসছে জেলাশাসক স্বয়ং, চারদিন চার রাত ধরে ঘোড়ায় চেপে, পথে নয় বার ঘোড়া বদল করে, এবং মহামান্য সরকার বাহাদুরের সমীপে জানাচ্ছে যে হ্যাঁ, ইয়োর এক্সেলেন্সি, জেলার মানুষ শুধু যে মনুষ্যমাংস ভক্ষণ করিতেছে তাহাই নয়, তাহারা সকলেই মরিয়াছে, এমনকি বাংলোয় কালেক্টার সাহেবের থান্ডারবক্স সাফ করিবার জন্য একজন জমাদারও জীবিত নাই, ফলত জেলা সদরে কালাতিপাত অতীব কঠিন, প্রকৃতপ্রস্তাবে অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে।
*
গোবর্ধনের স্বীকারোক্তি শোনার পর সেদিন রাত্রিবেলা ঘুম আসছিল না ডোঙা শর্মার। ছাউনির ভেতর শুয়ে বাইরে যজ্ঞিডুমুর গাছে বাঁধা গোবর্ধনের ঝিমধরা কান্নার শব্দ ঝিঁঝির কলতানে মিশে থেকে থেকে ভেসে আসছিল। সেই ধ্বনিতে ডোঙার মনে পড়ে যাচ্ছিল ছেড়ে আসা গ্রামের বাড়ির কথা, মাঝরাতে খিদের জ্বালায় ছোটো ভাইবোনেদের ঘুমের মধ্যে চাপা ফোঁপানি, মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের খর মেজাজ, তেলহীন জটপড়া চুলে উকুনের সংসার, সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকিয়ে পাঁকের ডোবা ছেনে বড়দির আনা কোঁচড়ভরা গেঁড়িগুগলি, পাথর ঠুকে ভেঙে আঁশটে নিষিদ্ধ গন্ধ, ঠাকুরঘরে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে অসহায় দারুবিগ্রহের মুখে আঁকা বাবার ফ্যালফেলে চোখ, মেজদির চুলে কাদা, কলাপাতায় ঋতুস্রাবের ছিটে…
পালিয়ে এসেছিল ডোঙা। সব ক্ষোভ আর হতাশা জড়ো করে বাড়ির পেছনে বাগানে বাজে-পড়া তালগাছের ডোঙা কুঁদে পালিয়ে এল যখন, ভাবেনি এই দুঃস্বপ্ন ওর পিছু ছাড়বে না। পাশ ফিরে দেখে নুটু হারীতকে জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে, মিহি নাক ডাকছে দুজনের। রাততাড়ুয়া হাওয়া বইতে শুরু হয়েছে। ছাউনির তালের পাতায় সড়সড় শব্দ, বাইরে ফোঁপানির শব্দটা থেমে গিয়েছে কখন যেন। মাদুর ছেড়ে উঠে ডোঙা পা টিপে টিপে বাইরে এসে গাছপাতার নীলাভ অন্ধকারে দেখল ডুমুর গাছের নীচে গোবর্ধন নেই। ভয়ে পাথর হয়ে গেল ডোঙা শর্মা। ওর কথাতেই ছেলেরা সকালে গুরুদেব ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হয়েছে, এবার গোবর্ধন পালানোর দায়টা সম্পূর্ণ ওর ঘাড়ে এসে পড়বে। দুজনের মধ্যে যোগসাজস আছে এমন কথাও উঠতে পারে— ডোঙা যে সাতগাঁয় বহিরাগত, দোখনো।
চুপিসারে ঘাটে এসে তালডোঙার রশি খুলল, পাড় ঘেঁষে দাঁড় বেয়ে দক্ষিণে হুগলি খালের দিকে চলল। চৈত্রের মরা নদী, জলের ওপর পাতলা কুয়াশার সর জমেছে। বাতাসে হালকা শিরশিরানি। অন্ধকারের ভেতর ডোঙা গাজির বাগান পেছনে ফেলে, চাষের মাঠ, মেছোদের জালের খুঁটি ছাড়িয়ে, বর্গিব্যাটারির কাছে এসে দেখল রাতচরা বাদুড়েরা ফিরছে। আলো ফুটতে আর খুব বেশি দেরি নেই। হুগলি খালের দিকটায় ইতিউতি বাদাবনে ঝুপসি ছায়া, তারার আলোয় চিকচিক করছে সাস্তা আনার হেলে-পড়া মাস্তুল। এদিকটায় এর আগে কোনোদিন আসেনি ডোঙা, কিন্তু গন্তব্য নিয়ে মনে কোনো সংশয় নেই। নদী ছেড়ে বাঁদিকে লগি ঠেলে খালের মুখে ঢুকে উঁচু পাড়ে কুমোরদের পাড়া দেখে উঠে পড়ল।
আগের দিন সন্ধ্যায় ভাটি জ্বলেছিল। এখন ভেতরে ঢুকে কেউ একে একে মাটির হাঁড়ি ওপরে এক বৃদ্ধের হাতে চালান করছে। সদ্যপোড়া টনটনে লাল পাত্র কৌপিন-পরা, মাথায় গামছা জড়ানো বৃদ্ধ টোকা মেরে মেরে পরখ করে স্তূপ করে সাজিয়ে রাখছে। ভিজে পায়ে ডোঙাকে উঠে আসতে দেখে হাত নেড়ে ওকে ভাটির ধারে এসে ওম নিতে বলল। কাছে আসতে ওর গলায় পৈতে দেখে বলে উঠল–‘এ তল্লাটে কোন রসের খোঁজে গো ঠাকুর?’
‘আমি আমার গুরুদেবের সন্ধানে এসেছি’ ডোঙা বলে।
‘তোমার গুরুদেব এ পাড়ায় আসতে যাবে কেন মরতে?’
‘খাড়াও বাপু!’ ভাঁটির ভেতর থেকে অচেনা পুরুষ কন্ঠ বলে ওঠে। ‘এ কি সেই গুরুদেব যার জন্যে কাটুনিডাঙায় মাটির হাঁড়ি সরা যায়?’
‘তাই হবে,’ ডোঙা ভাঁটির ভেতর উঁকি দিয়ে বলে। ‘কোন ঘরে গেলে ওঁকে পাওয়া যাবে বলতে পারো?’
‘বড়ো অকৈতব বামনাই বটে তোমার গুরুর,’ অদৃশ্য মানুষটি বলে— ‘মাগীটা নিত্যি এসে সরা তিজেল নিয়ে যায়। উনি নাকি নিজে হাতে গঙ্গাজলে চালকলা ফুটিয়ে খায়।’
কাটুনিডাঙায় জলের ওপর খোড়ো কুঁড়েগুলোয় একটি দুটি প্রদীপ তখনও মিটমিট করছে জোনাকির মতো। যে কুঁড়েটার বর্ণনা ওরা দিল সেটি একটু একটেরে, একসারি বাবলা গাছের আড়ালে। গাছের ডালে পানকৌড়ির দল লম্বা ডানা ঝুলিয়ে নড়াচড়া শুরু করেছে দিন ফোটার জন্য। ভোরের আগে ফিকে আলোয় ডোঙা দেখল কুঁড়েটা বেশ ছিমছাম, দুপাশে কালো গেরিমাটির আলপনা লেপা, উঁচু বাঁশের দাওয়া। বন্ধ দরজার বাইরে হেলান দেওয়া রয়েছে একজোড়া ভারি খড়ম।
দীর্ঘক্ষণ ইতস্তত করে ডোঙা অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে দরজায় টোকা মারে। ‘গুরুদেব’ বলে ডেকে উঠতে অনুভব করে গলায় ছাই জমেছে। ফের কাতর কন্ঠে ডাকে—
‘গুরুদেব।’
অনেকক্ষণ পরে, প্রায় অনন্ত কাল পরে
যতক্ষণে খালের ধারে শালুককুঁড়ি
ফোটে, ডোঙার বুকে ঢেঁকির পাড় স্তিমিত হয়ে আসে, পানকৌড়িরা একটি দুটি করে বাবলা গাছ থেকে জলে নামে দরজার ওপাশে মৃদু নুপুরের নিক্কন শোনা গেল। তারপরে শোনা গেল পরিচিত কন্ঠস্বর—
‘কে?’
‘আমি ত্রৈলোক্য গুরুদেব, ত্রৈলোক্যনাথ শৰ্মা।’
‘এখানে আসার হেতু?’
‘আশ্রমে বড়ো বিপদ, গুরুদেব। নুটু হারীত গোবর্ধনদাদাকে মেরে যজ্ঞিডুমুর গাছে বেঁধে রেখেছিল, কিন্তু এখন ওকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।’
কয়েক মুহূর্ত পরে বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসে বুনোরামের শান্ত কঠোর কন্ঠস্বর।
‘তুমি আশ্রমে ফিরে যাও ত্রৈলোক্যনাথ। এখনই এই স্থান পরিত্যাগ কর!’
সেদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আশ্রমে ফিরে ডোঙা শর্মা দেখল কেউ কোথাও নেই। তালপাতার ছাউনি ভেঙে তছনছ করা হয়েছে, চারিদিকে ভাঙা মাটির পাত্র ছড়ানো। যে পাথরের চাটানে বসে বুনোরাম অলঙ্কার শাস্ত্রের পাঠ নিতেন, তার গায়ে কেউ খোলামকুচি দিয়ে লিখে রেখেছে:
পতিত গুরু
পাপের বাসা
*
পরদিন বেলা এগারোটার জোয়ারে কলকাতা থেকে সাতগাঁর অভিমুখে বজরা ভাসালেন ইউনুস আক্সফার্দি। সকালে ভালো করে সূর্য ওঠেনি, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আস্তরণে ঢাকা আকাশ, চরাচর জুড়ে এক অদ্ভুত সীসেরং আলো। বেলা বাড়তে দক্ষিণ দিক থেকে হাওয়া বইতে শুরু হলো; মেঘে ছাওয়া আকাশ আর পাখিদের মধ্যে এক বিচিত্র অস্থিরতা। হুগলির জলে ঢেউয়ের বিক্ষোভ যেন গলন্ত ইস্পাতের মতো। মনে সবিশেষ স্ফূর্তি নিয়েই বজরায় চড়েছিলেন আক্সফার্দি সাহেব, পুথি থেকে কপি করা পাতাগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলেন। এগারোটির মধ্যে এখনও একটি পুথির অর্ধেকের কিছু কম অংশ এবং দুটি সম্পূর্ণ পুথি কপি করা বাকি। এছাড়া একটি পুথি এলোমেলোভাবে বাঁধা, কয়েকটি পাতে লিপি ঝাপসা হয়ে অপাঠ্য হওয়ায় হাত দেওয়া যায়নি। হিসেব করে দেখলেন—এই গতিতে চললে, কোর্টের কাজকর্ম মিটিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুদিন করে যদি আশ্রমে যাওয়া যায় তাহলে কাজটা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি শেষ হবে। তারপর পান্ডুলিপিগুলো একত্র করে একটি ছাপা গ্রন্থের পরিকল্পনা করা যায়। এই ব্যাপারে তিনি সোসাইটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। সোসাইটির নিজস্ব তহবিল থেকেই অর্থ সংস্থান হবে, এ জন্য কোম্পানির কাছে হাত পাতার দরকার নেই। কিন্তু এই লিপির জন্য বিশেষ টাইপ ফন্ট? সেটা কীভাবে সম্ভব হবে?
এইসব ভাবতে ভাবতে, হাতে লেখা নোটগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে— ইতিমধ্যে বজরা প্রায় বিশ লিগ উজিয়ে এসেছে, ডান পাড়ে ব্যারাকপুরের টানা ছাউনিগুলো দেখা যাচ্ছে কাগজ থেকে চোখ তুলে জানলার বাইরে তাকালেন ইউনুস। এক অদ্ভুত দৃশ্য: সকালের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো সতেজ হাওয়ার ঘোলে ঘুরতে ঘুরতে, জমতে জমতে এক অতিকায় ছত্রাকের আকার ধারণ করেছে। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপরে বসে মাঝ আকাশে সেই দৃশ্য দেখলে বুক কেমন ছমছম করে ওঠে।
ইতিমধ্যে দাঁড়িদের সর্দার এসে আর্দালি মারফৎ সাহেবকে জানালো লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। এমতাবস্থায় আর না এগিয়ে কলকাতায় ফিরে যাওয়াই ভালো। সাহেব হুঁশিয়রিতে কর্ণপাত করেন না, জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িদের উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলেন—‘কষে টানো! ডরো মৎ!’
তাঁর কন্ঠস্বর ছড়িয়ে যায় দমকা হাওয়ায়। ঝড়ের লক্ষণ স্পষ্ট, কিন্তু দুদিকেই তীর তো খুব দূরে নয়। তেমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বজরা টেনে তীরে উঠে পড়লেই হবে। এ দেশে আসার সময় দু-দুটো ঝড়ের কবলে তিনি পড়েছেন, তাও কি না ভারত মহাসাগরের বুকে। আর এ তো সামান্য নদী।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই যা ঘটতে শুরু হলো তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না ইউনুস আক্সফার্দি। চোখের নিমেষে ঘন কালো স্তম্ভের মতো মেঘের গায়ে রুপোলি ধার ফুটে উঠে উঠল— যেন কালো রোমশ রাক্ষসের উজ্জ্বল দাতের সারি। আলাদিনের জিন, অদৃশ্য বোতলের ভেতর থেকে গল গল করে বের হয়ে আকাশ ফুঁড়ে উঠছে, উঠতে উঠতে আচমকা পাক খেয়ে ঘুরে নেমে আসছে নীচের দিকে। এক বিচিত্র ঝড়ের ঘুর্ণি ফেটে পড়ল। তার দাপটে নদীতীরে তাল সুপুরি নারকেলের সারি মাথা দোলায় খ্যাপা হাতির মতো, মট মট করে ভেঙে পড়তে থাকে। এদিকে বজরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বন বন করে পাক খেতে থাকে বিক্ষুব্ধ জলে। দিশাহারা দাঁড়িরা সাহেবের উপস্থিতি ভুলে চিৎকার করে একে অপরকে গাল পাড়ে, কেউ দরিয়ার পাঁচ পীরের নাম করে বদর বদর ধ্বনি দেয়। ‘কিনারে টানো! কিনারে টানো!’ ইউনুস হাঁকেন, কিন্তু কে কার কথা শোনে। ইতিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তীরের থেকে সশব্দে গাছ পড়ার শব্দ ভেসে আসছে বজরার চালে ছাটের খইফোটা ধ্বনি ছাপিয়ে। কুঁড়েঘরের খোড়ো চাল উড়ছে, ঘাটে বাঁধা ডিঙি পানসিগুলো রশি ছিঁড়ে তাঁতের মাকুর মতো বন বন করে আকাশে উড়ে পড়ছে, কালো জল বিচিত্র রোষে ফুঁসতে ফুঁসতে তীব্র চপেটাঘাত করছে বজরার খোলে। সব মিলিয়ে ভারত মহাসাগরের বুকে ঝড়ে পড়ার থেকে কিছু কম ভীতিপ্রদ তো নয়ই, বরং তীরে কী ঘটছে দেখা যাওয়ায় দৃশ্যত আরও অচেনা আর ভয়ঙ্কর।
এবার সেই দৃশ্যের ওপর অনন্ত জলের পরদা নেমে এল। আকাশ ভাঙল। হাওয়া ধাক্কায়, বৃষ্টির তোড়ে বজরার মাথায় পাল্কিটা রশি ছিঁড়ে উড়ে পড়ল আকাশে, ছিটকে টগবগে ফুটন্ত জলে গিয়ে পড়লেন সাহেব। আকাশে মাথা তুলে দেখলেন পাল্কিটা বনবন করে শূন্যে উঠে ফটাশ করে ফেটে পড়ল, পেটের ভেতর থেকে দিস্তা দিস্তা কাগজ উড়তে লাগল যেন বনতিতিরের ঝাঁক।
উড়ে উড়ে ছড়িয়ে গরগরে জলে গিয়ে পড়ে তাদের ভেসে যাওয়া দেখার মতো অবস্থা সাহেবের আর ছিল না। মনে হলো এই বিক্ষুব্ধ জলরাশি বুঝি এবার গিলে নেবে তাঁকেও — হায় ঈশ্বর! স্বদেশভূমি থেকে এত দূরে এবার বুঝি সলিল সমাধি হবে। এবং সেটা কি না হবে নিতান্তই এক নদীর বুকে? হোয়াইটহল ইভনিং পোস্ট-এ সংবাদটা কীভাবে ছাপা হবে? Puisne Judge Drowns in the Hugli? Storm Kills Calcutta’s Scholar Judge? সেই খবরটা দেখে আনার কী প্রতিক্রিয়া হবে? আনা, প্রিয় আনা…
ডুবে যেতে যেতে স্ত্রী আনা মারিয়ার মুখচ্ছবি দেখতে পান ইউনুস আক্সকার্দি।
.
মি’লেডি, সেবার চার ঘন্টা ব্যাপী বিধ্বংসী ঝড়ের প্রকোপে লন্ডভন্ড হল গাঙ্গেয় বঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশ। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলো কলকাতা শহরে; ব্ল্যাক টাউনে অসংখ্য কাচা বাড়ি ভেঙে তছনছ হলো, ভেঙে পড়ল পুরোনো মাটির গড়ের অবশিষ্ট অংশ, খিদিরপুরে জাহাজঘাটায় একটি দুই মাস্তুলের ওলন্দাজ স্কুনার উড়ে গিয়ে পড়ল বাগজোলার খালে। প্রবল প্লাবনে গঙ্গা খাত বদল করল। বন্যার পরে দেখা দিল গুটি বসন্তের মারী।
সে যাত্রায় রক্ষা পেলেন ইউনুস সাহেব, তবে দীর্ঘ পাঁচ মাসের শ্রম জলাঞ্জলি গেল। হারিয়ে গেল এগারোটি পুথির অমূল্য কপি।
