সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.১
১২.১
মি’লেডি, কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায়। মে মাসে প্যারিসে গণঅভ্যুত্থান হলো। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন কমিউনিস্ট দলের শ্রমিক সংগঠনের হরতাল, পুলিশের সঙ্গে রাস্তায় প্রায় গণযুদ্ধ সব মিলিয়ে সরকার পড়ে যাবার উপক্রম। দু মাস বাদে নির্বাচনে আগের দল ক্ষমতায় ফিরল বটে, কিন্তু বড়োসড়ো পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। কয়েক হাজার মাইল দূরে এককালের ফরাসী উপনিবেশে সেই পরিবর্তনের ঢেউ এসে লাগল।
ভারতে তাদের অধিকৃত শহরগুলো ছেড়ে যাওয়ার সময়ে স্থানীয় ফরাসী ও মিশ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদাকে মর্যাদা দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ইন্সতিত্যুত দ্য ফঁস, মূল উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি ভাষা সংস্কৃতির বিস্তার। ফ্রান্সের বিদেশ ও সংস্কৃতি মন্ত্ৰক থেকে অনুদান বরাদ্দ হয়, সাতগাঁর বসন্ত চক্রবর্তীর মতো অনেকেই প্যারিসে প্রশিক্ষণ নিতে যাবার সুযোগ পায়। কিন্তু উপনিবেশ-পরবর্তী বিশ্বে ক্রমশ সেসব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে থাকে, ফরাসি ইন্সটিটিউট হয়ে ওঠে পুরোনো রং-জ্বলা স্মৃতির মহাফেজখানা। সরকারী অনুদান কমে, শুরু হয় কর্মীসংকোচন। পারীর সেই ঐতিহাসিক বসন্তের পর বছর খানেকের মধ্যেই বদলের ধাক্কা এসে লাগল। বাইশ জন কর্মীর কাছে প্রস্তাব এল— ‘হয় অবসর নাও, নয়তো এক তৃতীয়াংশ বেতনে কাজ করো।’
সেই তালিকায় বসন্তও ছিল। নতুন বছরের গোড়ায় সে সপরিবারে সাতগাঁয় ফিরে এল, কোয়ার্সভিলে তার পুরোনো কর্মস্থলে যোগ দিল। তিতলিও ফিরে এল ক্লুনির সিস্টারদের কনভেন্টে। কানাইকে সাতগাঁ আদর্শ বিদ্যানিকেতনে ভর্তি করা হল। কিন্তু তিতলি এবার আর কিছুতেই বাড়িতে থেকে ইস্কুলে যেতে চাইল না, বাধ্য হয়ে তাকে কনভেন্টের হস্টেলে রাখা হলো।
পন্ডিচেরির সমুদ্রতীরবর্তী আবহাওয়ায় তিতলির হাঁপানির অসুখ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এছাড়া সাতগাঁ ছেড়ে যাওয়াটা ওদের কারোর পক্ষেই সুখকর হয়নি। সাজানো ছিমছাম সৈকত শহরে স্বাধীন সংসার করার শখ ঘুচে যেতে নতুনবউয়ের সময় লাগেনি। বসন্তও প্রতি পদক্ষেপে টের পেয়েছে সাতগাঁয়ে আত্মীয় পরিজনের পরিমন্ডল থেকে দূরে গিয়ে সংসার পাতার চাপ। এছাড়া আর্থিক দিকটা ছিলই। আদিরামবাটিতে চিরকাল শিষ্যবাড়ি থেকে সোম্বচ্ছরের চালটা ঘিটা এসেছে, এছাড়া ফার্মেসির আয় থেকে সংসারের নিত্যকার বাজার হতো। বসন্তর চাকরিটা নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় নতুনবউয়ের আশা ছিল দাদা অলোক পাশে এসে দাঁড়াবে; আর কিছু না হোক অন্তত তিতলির হস্টেলে থেকে পড়াশোনার খরচটা দেবে। কিন্তু সেসব কিছুই করল না সে। কৃষ্ণনগরের সম্পত্তি ছেলের নামে উইল করে গিয়েছিলেন বাবা, তাঁর মৃত্যুর পর প্যারিস থেকে এসে সেসব কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিল। নতুনবউ আবিষ্কার করল নাতনির জন্য একটি পোশাকি নাম আর কিছু আদ্যিকেলে গয়না ছাড়া মেয়ের জন্য আর কিছুই রেখে জাননি বাবা। সেবার কানাইকে নিয়ে সাতগাঁয়ে এসে শিউলিকে থাকতে দেখে তার মনে হয়েছিল ভাগ্য কী ঘোর বৈষম্যময়। তখনই ফার্মেসির আয়ের হিসেব ঠাকুরঝির কাছ থেকে বুঝে নিতে শুরু করে নতুনবউ।
বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসার পর থেকে এতটাই উপেক্ষিত সে, যে প্রথম-প্রথম যে নামে সকলে ডাকত সেই নামটা আর কোনোদিন ঘুচল না। এমনকি নিজের ছেলেমেয়েও ডাকে নতুনবউ বলে। মা মারা যাবার পর আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। শরীরটাও জুতের নেই। তিতলি হবার সময় পেট কাটার পর থেকে হজমের গোলমাল, অনিদ্রা, মাথা-ধরা পিছু ছাড়েনি। বসন্তকে বললে সে শ্বশুরমশাইয়ের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলবে–
‘সকালে উঠে ঝাঁটা নিয়ে পুরো উঠোনটা ঝাঁট দাও, দেখবে রোগবালাই পালাবার পথ পাবে না। মাকে দেখনি, সারাদিন কেমন চরকির মতো ছুটে বেড়াতো?’
হস্টেলে থাকতে শুরু করার পর নিজের পেটের মেয়েটাও যেন পর হয়ে গিয়েছে। ছুটির দিন তিতলিটা হস্টেল থেকে বাড়িতে এলে অনেক উৎসাহ নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে নতুনবউ। ছোটোবেলা থেকে ওর প্রিয় পদ ওর মায়ের হাতে পোস্তর বড়া, প্যারিসে বসে যার বর্ণনা শুনে বসন্তর মন গলেছিল সেই বাইরেটা মুচমুচে ভেতরে নরম। কিন্তু ‘ল্যে প্লু পাহক্যে’ আর হয় না। কখনো বাইরেটা পুড়ে যায় ভেতরটা কাঁচা থাকে, কখনো মাত্রাছাড়া নুন হয়ে যায়। চিরকাল ছেলেমেয়েকে থালায় ভাত তরকারি একসঙ্গে মেখে গোল গোল মন্ড বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওভাবে মেখে দিলে তিতলি আর খায় না। হস্টেল থেকে এক বেলার জন্য বাড়িতে এসে মা আর বাবার পরস্পরের প্রতি অভিযোগের ফিরিস্তি আর সালিশি শুনে শুনে কানে তালা লেগে যায় তার। ইদানীং আর প্রতি রবিবার আসেও না।
তিতলি আসুক বা না আসুক, রোজ কিছুটা সময় নতুনবউকে রান্নাঘরে দিতেই হয়। বামুনদিকে হাতে হাতে এগিয়ে দিয়ে যোগাড় দিতে হয়, সন্ধ্যাবেলা রুটি বেলে দিতে হয়। জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে বামুনদি, একা হাতে সবকিছু আর পেরে ওঠে না আগের মতো। সকালে স্বামীপুত্রের অফিসের ইস্কুলের ভাত বেড়ে দেবার পর সময়টুকু তার একান্ত নিজের, দোতলায় শোবার ঘরে গিয়ে দোর দেয়। তার নিজের যৌবনের ঔজ্জ্বল্য যেমন অস্তমিত, বাপের বাড়ি থেকে আনা তার ৩৫৩টি দিশি বিলিতি পুতুলেরও যৌবন অস্তাচলে। বিদেশ-বিভুঁই ঘুরে এসে তারা রং-চটা হয়েছে; কয়েকটির হাত-পা ভেঙেছে, পিডিলাইটের আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়েছে। বসন্তর দাড়ি কামানোর বুরুশ দিয়ে রোজ একটি একটি করে তাদের প্রত্যেকটির ধুলো ঝাড়তে দুপুর গড়িয়ে যায়। তারপর আছে ঘরের আসবাবের ধুলো ঝাড়া।
এক ছুটির দিন বসন্ত বিছানায় গা এলিয়ে খবরের কাগজে শব্দছক করতে করতে বলল–
‘ধুলো ঝাড়ার একরকম যন্ত্র কেনা হয়েছে আপিসে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ইলেকট্রিকে চলে। ভাবছি বাড়ির জন্যে একটা কিনলে কেমন হয়? রোজ রোজ তোমার এই খাটনি কমবে।
নতুনবউ কোনো উত্তর দেয়নি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা মুছছিল, আয়নার ভেতর দিয়ে তাকাল। প্রতিবিম্বে চোখাচোখি হতেই বসন্ত ফের শব্দছকে ফিরে যায়। আচমকাই তার মনে পড়ে যায় বহুকাল আগের এক দুপুর, নতুনবউ ঠিক এইরকম ঘোলাটে চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে, এক ঘর লোকের মাঝে বলেছিল— ‘পোঁদে নেই চাম, হরেকৃষ্ণ নাম!’
বর্তমানে ঘোলাটে চাহনির কারণ অবশ্য বিয়ের যৌতুক-পাওয়া ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা; মাঝখানে পারা চটে গিয়ে ঝাপসা দেখায়। তার মধ্যে বিয়ের আগের সেই সৌভাগ্যলক্ষ্মীকে আর খুঁজে পায় না নতুনবউ। যে ছিল কৃষ্ণনগরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী, যার মুখের আদলে প্রতিমা গড়ত শহরের নামজাদা মৃৎশিল্পীরা, যাকে ফরাসী বিস্ক পুতুলের মতো ফর্সা সুদর্শন বর এনে দেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল অলোক, এত বছর ধরে সেই স্বপ্নভঙ্গের খোলামকুচি বুকের ভেতরে জমতে জমতে, কাউকে মনের কথা বলতে না পেরে গুমরে গুমরে সৌভাগ্যলক্ষ্মীর রূপ গত হয়েছে। দেহে বিষণ্ণ মেদ, দুই গালে মেচেতার মতো ছোপ, দেবীপ্রতিমার মতো একমাথা কোঁকড়ানো চুল ঝরে গিয়েছে পন্ডিচেরির নোনা আবহাওয়ায়। গেঁটে বাতে ধরেছে, চাঁদের কলার সঙ্গে তাল রেখে জোয়ার-ভাটার মতো বাড়ে কমে, কোমরে হাঁটুতে গ্রন্থিগুলো টনটন করে। বাগানে ইঁদারায় হেমন্তর জোয়ার মাপার জলঘড়ির থেকেও নিখুঁত জানান দেয়।
.
কপিকলের গায়ে সেই জলঘড়িটা এখনও আছে। ডায়ালের চিহ্নগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে, জলে ভাসমান শোলার টুকরো ক্ষয়ে গিয়েছে, তবু এখনও কাজ করে। এখনও দিনে দুবার ইঁদারায় জোয়ার-ভাটা খেলে। কিন্তু হেমন্তর ওদিকে আর দৃষ্টি নেই। আরও জটিল ও সূক্ষ্ম এক অত্যাশ্চর্য কল বানাতে শুরু করেছে সে।
সরোজার মৃত্যু এলোমেলো করে দিয়েছে হেমন্তর জীবন। অশৌচের সময় সেই যে চুলদাড়ি কাটা বন্ধ করেছিল, ঘাট-কামানোর দিনেও নাপিতের হাতে ক্ষুর ছোঁয়াতে অস্বীকার করে। আত্মীয়েরা আড়ালে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সামনাসামনি কিছু বলেনি। বংশের কালাপাহাড় সে, মেথর খেপিয়ে মিছিল করেছে ব্রাহ্মণপাড়ায়, ওর কাছ থেকে কোনো কিছু অপ্রত্যাশিত নয়। ক্রমশ যে নৈঃশব্দ্য এঁটে বসেছিল আদিরামবাটিতে, সেটি যেন ওকে ঘিরে ক্রমশ বুনে উঠল নিশ্ছিদ্র রেশমগুটির মতো।
পার্টি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসার পরে-পরেই সেটা শুরু হয়, যবে থেকে হেমন্ত সেলুলয়েডে আলোছায়ার বিক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ডুবে গেল। ডার্করুমে লাল আলোর ভেতর দৃষ্টি ক্রমশ সয়ে আসছে–এদিকে বাইরে দিনের আলো মরে এসে সন্ধ্যা নামছে, আমের বোলে গুটি ধরছে–দরোজা-জানলা আঁটা দক্ষিণের ঘরে হেমন্ত আই-লুপের ভেতর দিয়ে প্রত্যক্ষ করছে এক আশ্চর্য মাধ্যমের যাদু, যেখানে বস্তুর তৃতীয় মাত্রা বিলুপ্ত হয়।
সরোজার মৃত্যুর পর শিউলি এসে যখন ছিল, নানাভাবে সে চেষ্টা করেছে ওর চেয়ে সাড়ে তিন বছরের বড়ো দাদাটাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার। একদিন দুপুরবেলায় হেমন্ত পায়খানায় গিয়েছে, শিউলি ঝাঁটা হাতে ওর ঘরে ঢুকে বহুদিনের জমা ধুলো পরিষ্কার করল, মেঝেয় ছড়িয়ে থাকা বাতিল যন্ত্রাংশ সেলুলয়েডের টুকরো সরালো, ঘড়ি রেডিও ক্যামেরা দম-দেওয়া খেলনাগুলো (যে খেলনাগুলো সে বিনামূল্যে সারিয়ে দিত, কিন্তু এত সময় নিত যে ইতিমধ্যে সেই শিশুরা বড়ো হয়ে গেছে এবং তাদের খেলনার অভাব মিটে গেছে) আলাদা করে গুছিয়ে রাখল, দেয়ালে সাঁটা ডার্করুমের কালো কাগজ সরিয়ে মাকড়শার জালের আস্তরণ পরিষ্কার করল, বহুকাল পর ঘরে স্বাভাবিক আলো ফিরিয়ে আনল। ঘরে ফিরে সেই দৃশ্য দেখে ক্রোধে উন্মাদ হলো হেমন্ত, ঘর থেকে বের হলো না, শিউলি ও বামুনদির শত অনুনয়েও সেই রাত্রে কিছু দাঁতে কাটল না। এবং এই ঘটনার পর থেকে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলে ঘরে শিকল টেনে তালা ঝোলাতে লাগল। চাবিটা সে বেঁধে রাখত গলার পৈতেয়, যেটা পার্টি ছেড়ে আসার পরদিন থেকে সে পরতে শুরু করে।
জটিল কলকব্জার প্রতি আশৈশব মোহ থেকে হেমন্ত যে প্রযুক্তির অতিলৌকিক মরীচিকার পথে হাঁটতে শুরু করেছে, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হলো যবে থেকে সে বিকল যন্ত্র সারাইয়ের প্রতিভা হারিয়ে ফেলতে লাগল। খেলনা হোক কিংবা ঘড়ি অথবা রেডিও, কলকব্জা খুলে সেগুলি ফের আগের সংস্থানে বসানোর দক্ষতা ভুলে যেতে লাগল। ঘরে জমতে শুরু হলো নানা ধরনের যন্ত্রাংশ। এই সময়েই ওর আপন মনে কথা বলার অভ্যাসটা শুরু হয়।
পন্ডিচেরি থেকে ফিরে বসন্ত যেন ছোটো ভাইটাকে চিনতে পারল না। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ির জঙ্গল, মাথায় টাক ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, শরীর শুকিয়ে অসম্ভব রোগা হয়ে গিয়েছে, চোখদুটো ঠেলে উঠেছে দুর্ভিক্ষ পীড়িতের মতো। ঘরের দেয়ালে ডার্করুমের কালো কাগজ আর নেই, তবে পেনসিলের আঁকিবুকিতে প্রতিটা ইঞ্চি ভরে উঠেছে। বাইরে থেকে উঁকি দিলে মনে হয় যেন তারায় ভরা রাতের আকাশ। এরই মধ্যে একদিন কীভাবে যেন ধুলোর মেয়ে সর্বজয়া দক্ষিণের ঘরে ঢুকে গ্রুন্ডিগ রেডিওর কাঠের বাক্সের মধ্যে তিনটি ছানার জন্ম দিল। এখন কোনো কারণে বাইরে বেরোতে হলে আর দরজায় তালা ঝোলায় না হেমন্ত। এক দুপুরে সবাই যখন দিবানিদ্রা দিচ্ছে, ভাঁড়ারের থেকে একটা বড়ো হার্মাদি সিন্দুক টেনে নিয়ে গেল ওর ঘরে, তার মধ্যে ভরে রাখল ওর সব যন্ত্রপাতি কাগজপত্র।
‘হায় আদিরাম! ওই খ্যাংরাকাঠির মতো চেহারা নিয়ে কী করে অমন ভারি সিন্দুকটা নিয়ে গেল গো?’ বামুনদি গালে হাত দিয়ে বলল।
‘ওর মধ্যে হঠযোগীদের শক্তি ভর করেছে!’ বিশুকা বলল।
দুপুরবেলা রান্নাঘরে হেমন্তর ভাত বেড়ে সানকি চাপা দিয়ে রাখে বামুনদি। সবার খাওয়া হয়ে গেলে বিকেল নাগাদ চুপিসারে ঢুকে ভাত তরকারি ডাল সব একসঙ্গে চটকে মেখে দলা পাকিয়ে মুখে পোরে সে। একমুখ দাড়ির জন্য বোঝা যায় না, ইতিমধ্যে ওর বেশিরভাগ দাঁত পড়ে গিয়েছে। পার্টি কমিউনে থাকাকালীন অম্লের ব্যামো ধরেছিল, সেটা মাঝে মাঝে চাগাড় দেয়। শিউলি শেষবার এসে দাদাকে জোর করে কিছু টাকা হাতখরচ দিয়েছিল। বাড়িতে দর্জি ডাকিয়ে মাপ নিয়ে শার্ট প্যান্ট বানিয়ে দিয়েছিল দু সেট। কিন্তু হেমন্ত সেসব ছুঁয়েও দেখেনি, এ বাড়ির সব পুরুষদের মতোই শিষ্যবাড়ির তত্ত্বে আসা কোরা ধুতি পরে। টাকাগুলো দিয়ে কোয়ার্সভিল থেকে অ্যামমিটার, সল্ডারিং রড ও কিছু কিছু রেডিওর যন্ত্রাংশ আনিয়েছিল।
হেমন্ত যে এক আশ্চর্য যন্ত্র নির্মাণ করছে, সে ব্যাপারে এক কার্তিকের সন্ধ্যাবেলা অন্ধকার উঠোনে দাঁড়িয়ে বিশুকাকে বলেছিল। সেদিন বিদ্যুৎ ছিল না, নিমগাছের মাথায় জোনাকির মতো নক্ষত্র দপ্ দপ্ করছে।
‘যত তারা আকাশে চোখে দেখছ, এরা বেশিরভাগ বহু বহু যুগ আগে মরে গিয়েছে। তাদের আলো এখনও পৃথিবীতে আসছে। যত মানুষ মরে গিয়েছে, তাদের গলার স্বর এমন ভেসে রয়েছে। অঙ্ক কষে তার সঠিক ওয়েভ লেংথ বের করে নিতে পারলে মরে যাওয়া মানুষের কন্ঠস্বর শোনা যাবে ক্রিস্টাল রেডিওর মতো।’
‘এ আর তুই নতুন কী বললি?’ বিশুকা বলেছিল। ‘মামাদাদু তো কোনো যন্ত্র ছাড়াই অ্যাক্রয়েড ঘোষের গলার স্বর শুনতে পেয়েছিলেন!’
ইন্সটিটিউটে বাঁধা মাইনের চাকরিটা বিপর্যস্ত হবার পর থেকে অবসাদে ভুগতে শুরু করেছে বসন্ত। সাতগাঁয়ে ফিরে আসার পরেও তার প্রশমন হলো না। যে কোয়ার্সভিল শহরটা ফ্রান্সের ছিটমহল হয়ে থাকার সমর্থনে রেফারেন্ডামের সময় বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচার করেছে সে, ভোটাভুটির পর ঘড়িঘরের মাথায় ভারতীয় তেরঙ্গা উড়ছে খবর পেয়ে কেঁদে ভাসিয়েছে, পন্ডিচেরি থেকে ফেরার পর সেই শহরটার জীর্ণ ধূসর দশা যেন আরও প্রকট হয়ে ফুটে উঠল বসন্তর চোখে। এদিকে অফিসে উড়োজাহাজের ডাকে আসা লে মাঁদ আর লে ফিগারো-র পাতায় পাতায় সাদাকালো ছবিতে ওর প্রিয় পারীর চেনা ইমারতগুলোর দেয়ালে দেয়ালে কার্ল মার্ক্সের মুখের স্টেনসিল, আলকাতরায় লেখা শ্লোগান GREVE ILLIMITE! SOIS JEUNE ET TAIS TOI! মে মাসের সেই গণঅভ্যুত্থানে ওদেশে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ততদিনে স্পষ্ট। আদিরামবাটিতে ফিরে তার ক্ষোভের নিশানা হয়ে উঠল হেমন্ত, যদিও সে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়েছে বহুকাল আগে।
এক মুখ গোঁফদাড়িতে ঢাকা অবিশ্বস্ত চেহারা, ঘর থেকে বেরোয় না, সারাদিন যন্ত্রপাতি নিয়ে কীসব খুটখাট করে আর দেয়ালে হিজিবিজি লেখে, কারোর সঙ্গে কথা বলে না। একদিন বিশুকাকে ডেকে বসন্ত বলল–
‘হিমুকে দেখে তো মনে হচ্ছে মাথাটা গ্যাছে। পাগলের ডাক্তার দেখানো উচিৎ না?’
একটু অবাকই হল বিশু। বহুকাল আগে একবার গাজির বাগানে পড়ে গিয়ে পা কাটার পর থেকে ছোটো ভাইয়ের প্রতি বসন্তর স্নেহ আর প্রশ্রয়ের অভাব ছিল না। এমনকি হেমন্ত যখন কমিউনিস্টদের দলে নাম লেখায়, শহরে মেথর-মিছিল করে, তখনও সে প্রতিবাদের সুরে গলা মেলায়নি। হেমন্ত যখন পার্টি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে এল, ওকে ছবি তোলার সরঞ্জাম কিনে দিয়েছে।
‘মাথার ডাক্তার দেখাতেই পারিস।’ বিশুকা বলল। ‘কিন্তু কেন?’
‘পাগল হতে আর কী বাকি আছে বিশ্বকা? কীসব নাকি যন্তর বানাচ্ছে মড়াদের সঙ্গে কথা বলার জন্য।’
‘তোদের মা তো কোনোরকম যন্তর ছাড়াই নদীতে ডুব দিয়ে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারত রে। অবশ্য শুধু জ্যান্ত মানুষের সঙ্গেই।’
*
বহুদিন পরে এক শনিবার বিকেলে শিউলির বানিয়ে দেওয়া নতুন শার্ট প্যান্ট পরে পায়ে জুতো গলিয়ে হেমন্তকে প্রথম বাড়ি থেকে বেরোতে দেখা গেল।
‘ফুলবাবু সেজে কোদ্দিকে চললি রে?’ বিশুকা বলল।
উত্তর না দিয়ে, কোনোদিকে দৃকপাত না করে হেমন্ত রেলস্টেশনে গিয়ে টিকিট কাটল, ট্রেনে উঠে চলে গেল পোর্তোহাটায় পার্টি অফিসে। ইতিমধ্যে পার্টি ভাগ হয়েছে, তার মার্কসবাদী শরিক আর্মানি ব্যবসায়ীর সেই দোতলা কোঠাবাড়িটা দখল করেছে, হাতে টিনের ঘর তুলেছে। দলে নতুন সদস্য যোগ দিয়েছে। তারা কেউ হেমন্তকে দেখে চিনতে পারল না। একমুখ দাড়িগোঁফ, শীর্ণকায়, পরনে নতুন ঢোলা পোশাক, হাবেভাবে যেন ভিন জগতের ছাপ। কিউবা নয়তো বলিভিয়া থেকে বুঝি কোনো গেরিলা কমরেড এসে পড়েছেন, ওরা ভাবল।
‘ওয়েলকাম কমরেড! হাউ মে উই হেল্প ইউ?’ এক তরুণ বলল।
একতলার ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে এদিক-ওদিক তাকালো হেমন্ত।
‘দিনুবাবু? উনি কি নেই?’
ছেলেটি বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে হেমন্তকে নিয়ে এল তিনতলায় টিনের ঘরে। ছাপাখানাটা একতলা থেকে এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে, নতুন যন্ত্র বসেছে, চারিদিকে ছড়ানো টাইপ কেস, গ্যালি আর ফর্মার বান্ডিল। এরই মাঝে দিনুবাবু একই রকম আছেন নাকের ওপর চশমা, সামনে ঝুঁকে পড়া, পরনে ঢোলা পাজামা আর হলদেটে গেঞ্জির ওপর নীল এপ্রন। এখনও তিনি মেশিনম্যান। তবে আর ট্রেডলে চাপ দিয়ে নয়, বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রে কাজ করেন।
আগন্তুককে দেখে চিনে উঠতে দিনুবাবুর কয়েক সেকেন্ড লাগল। এরপর হেমন্তকে কমরেড বলে সম্বোধন করে আলিঙ্গন করবেন নাকি ছাপার কালি-লাগা হাতে করমর্দন করবেন ভেবে উঠতে পারলেন না।
‘আমি জ্যোৎস্নাময়ের খোঁজে এসেছি,’ হেমন্ত বলল। ওঁর ঠিকানাটা দিতে পারেন আমায়?’
‘কমরেড জ্যোৎস্নাময়? কিন্তু তিনি তো ইদানীং রাশিয়ায় থাকেন।’ দীনুবাবু বললেন।
‘আমি জানি,’ হেমন্ত বলল। ‘সেজন্যই ঠিকানার খোঁজে এসেছি।’
তিন বছর আগে কমরেড জ্যোৎস্নাময় ঘোষ রাশিয়ান ভাষা শিখে প্রগতি প্রকাশনে অনুবাদকের কাজ নিয়ে চলে গিয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ওঁর মস্কোর বাসার ঠিকানা যোগাড় করে হেমন্তকে দিলেন দিনুবাবু। পোর্তোহাটার পুরোনো কমরেডদের মধ্যে হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল খবরটা, এবং ক্রমশ দানা বেঁধে উঠে একটি তত্ত্বের আকার নিল: দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হৃদয়ে প্রেমের আবেগের কাছে চিরকাল পরাজিত হয়।
ইতিমধ্যে জ্যোৎস্নাময়ের সঙ্গে আবীরার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, মার্কসবাদী দলে সদস্যপদ ছেড়ে আবীরা একটি উগ্র লেনিনপন্থী দলে নাম লিখিয়েছে। সেই খবর হেমন্তর কাছে ছিল কি? জানা যায়নি। তবে ঠিক কী প্রয়োজনে সে জ্যোৎস্নাময়কে চিঠি লিখেছিল সেটা জানা গেল সেবার ডিসেম্বরে, জ্যোৎস্নাময় যখন শীতের ছুটিতে দেশে ফিরলেন। এক সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে এসে লম্বা লাইকা সিগারেটে টান দিতে দিতে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জানালেন–
‘দেখুন কমরেড, ডায়ালেক্টিকাল মেটিরিয়ালিজম হৃদয়ে প্রেমের আবেগের কাছে পরাজিত হয় এই তত্ত্বটা বেশ ক্লীশে, রাশিয়ানরা যাকে বলে উস্তারিয়েশি। তার থেকে ঢের নতুন বিচিত্র একটি তত্ত্ব খাড়া করেছেন আমাদের এক্স-কমরেড হেমন্ত। জগদীশচন্দ্র বোসের সাহায্য নিয়েই নাকি বিপ্লবী অ্যাক্রয়েড ঘোষ মৃতের আত্মাদের সঙ্গে কমিউনিকেট করতেন, এক বিশেষ কম্পাঙ্কের মাইক্রোওয়েভ ধ্বনিপ্রবাহ সম্প্রচার করতেন। হেমন্তর থিয়োরি হলো, আকাশে নক্ষত্রেরা মরে যাবার বহুকাল পরেও তাদের আলো যেমন পৃথিবীতে আসে, সেভাবেই মৃত মানুষদেরও একটি বিকীরণ মহাকাশে থাকে। বিশেষ মাত্রার তরঙ্গপ্রবাহ সম্প্রচার করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এবং সেটাই হেমন্ত করার চেষ্টা করছেন কিছুদিন ধরে। অনেক অঙ্ক কষেও তিনি সেই সঠিক কম্পাঙ্ক এখনও পর্যন্ত বের করতে পারেননি। উনি আমায় লিখেছেন, যদি আমি সোভিয়েত স্পেস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজ নিই মীর মহাকাশযানের রেডারে পৃথিবীর বায়ুমন্ডল থেকে হেমন্তর পাঠানো তরঙ্গ ধরা পড়ছে কি না। তিন পাতা চিঠি, সেই সঙ্গে আরও পাঁচ পাতা হিজিবিজি ফর্মুলা।’
‘আপনি কী করলেন?’ দীনুবাবু জিজ্ঞেস করেন।–‘স্পেস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন?’
জ্যোৎস্নাময় একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে হাসতে শুরু করেন, তারপর কাশতে শুরু করেন। কাশির দমক সামলে বলেন—‘দেখুন কমরেড, রাশিয়ায় কিন্তু আমাদের মতো পাগলাগারদ নেই। জানেন তো? পাগলদের ওরা সাইবেরিয়ায় জঙ্গল কাটতে পাঠায়।’
‘চিঠিটার একটা উত্তরও দিলেন না?’
‘দিয়েছি, তবে ঠিক উত্তর নয়। রুশ থেকে বাংলায় আমার অনুবাদ করা দুটো কল্পবিজ্ঞানের বই পাঠিয়ে দিয়েছি।’
